অষ্টম শ্রেণি বাংলা – পরবাসী – বিষয়সংক্ষেপ

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’ কবিতাটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে কবির পরিচিতি, কবিতার উৎস, পাঠপ্রসঙ্গ, সারসংক্ষেপ, নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পরবাসী’ কবিতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং কবিতাটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কবি ও কবিতার সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে; তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরবাসী - বিষয়সংক্ষেপ - অষ্টম শ্রেণি বাংলা

কবি পরিচিতি

শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র দে এবং মনোহারিণী দেবীর পঞ্চম সন্তান বিষ্ণু দে-র জন্ম হয় কলকাতার পটলডাঙায়, যদিও তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল হাওড়ায়। তাঁর জন্ম হয় 18 জুলাই, 1909 খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যু ঘটে 3 ডিসেম্বর, 1982 খ্রিস্টাব্দে।

1927 খ্রিস্টাব্দে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। 1933 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. পাস করেন। এরপর একে একে রিপন কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং মৌলানা আজাদ কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটে।

রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বিষ্ণু দে একজন বিশ্বতোমুখী কবিপ্রতিভা, যিনি স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। তিনি মার্কসবাদে বিশ্বাসী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ছিলেন। সংগীত ও চিত্রকলাতেও তাঁর অনুসন্ধিৎসা ছিল প্রখর। ‘পরিচয়’, ‘সাহিত্যপত্র’ প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি ছিলেন নিয়মিত গ্রন্থ-সমালোচক। ‘সাহিত্যপত্র’ পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।

বন্ধু-সান্নিধ্যের দিক থেকে তিনি ছিলেন ভাগ্যবান। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শম্ভু মিত্র, যামিনী রায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখ জ্ঞানীগুণীর সান্নিধ্যে আসেন তিনি।

তাঁর কবিতা প্রকাশের আরম্ভ 1925-1926 থেকেই। তাঁর কবিতা প্রথম থেকেই পাঠককে অন্যতর এক কাব্যরীতির সন্ধান দেয়। ‘চোরাবালি’, ‘সন্দীপের চর’, সর্বোপরি ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ বাংলা কবিতার জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল এবং এর জন্য তিনি 1965 খ্রিস্টাব্দে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার পান। এরপর 1973 খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’ এবং ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার’-এ তিনি সম্মানিত হন।

কবি বিষ্ণু দে-র রচনাসমূহ:

  • কাব্যগ্রন্থসমূহ: ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’, ‘চোরাবালি’, ‘পূর্বলেখ’, ‘সন্দীপের চর’, ‘অন্বিষ্ট’, ‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ’, ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’, ‘আমার হৃদয়ে বাঁচো’ এবং আরও বহু কাব্যগ্রন্থ রয়েছে।
  • কবিতা সংকলন: ‘বিষ্ণু দে-র শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘রুশতী পঞ্চশতী’, ‘কবিতা সমগ্র-1’, ‘কবিতা সমগ্র-2’, ‘বিষ্ণু দে-র প্রেমের কবিতা’। এ ছাড়াও বাংলা প্রবন্ধগ্রন্থ, ইংরেজি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং বহু অনুবাদগ্রন্থও রয়েছে।

বিষয়সংক্ষেপ

একদিন যা ছিল সুন্দর ও স্বাভাবিক, তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। দু-দিকে বনের মাঝে যে আঁকাবাঁকা পথ, তা সারি সারি গাছের ফাঁকফোকর থেকে আসা সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে। প্রকৃতির তালে তাল মিলিয়ে দু-পাশের গাছপালা যেমন দাঁড়িয়ে রয়েছে, ঠিক তেমনটি রেখেই মাঝের পথটি যেন সাবলীল ছন্দে এঁকেবেঁকে চলেছে। রাতেরও একটা অদ্ভুত মোহময় আলো থাকে। আর সেই আলো-আঁধারিতে মাঝে মাঝেই দেখা যায় শ্বাপদের লুব্ধ চোখ। কচি কচি খরগোশেরা আনন্দে নৃত্যের তালে তালে যেন লাফিয়ে চলেছে।

টিলা অঞ্চলে সাধারণত কাঁকুড়ে মাটি দেখা যায় এবং এ মাটিতেই পলাশ গাছের আধিক্য। সেই নিটোল টিলায় পলাশ ফুলের যে ঝোপ হয়ে থাকে, সেখানে হঠাৎই আনন্দ-পুলকে বনময়ূরের যে পেখম তুলে নাচ, তা যেন কত্থক নৃত্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। মাথা গোঁজার ক্ষণস্থায়ী ঠাঁই যে তাঁবু, তার ছায়ায় নদীর তরঙ্গে সোনালি সেতারের মতো যে সংগীত-সুষমা এবং বনময়ূরের নৃত্য, তা যেন একই সুরে মিলে গেছে।

সন্ধেবেলায় চারণভূমির কিনারে চঞ্চলা হরিণী নদীতে চুপি চুপি আসে, জল খায়; ঠিক এই মুহূর্তে কবির স্মরণে আসে অন্ধমুনির তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তাঁর পুত্র সিন্ধুমুনির নদী থেকে কলসি করে জল তোলার শব্দের কথা। হরিণের জলপানের শব্দ কীভাবে একজন শিকারিকে প্রলুব্ধ করে আহ্বান জানায়, তা কবি সুন্দরভাবে চিত্রায়িত করেছেন। চিতাও তার বিহার সেরে ফেরে যেন। বুনো এক অদ্ভুত ভয়ংকর কথাকলি নাচের মতো বেগবতী ছন্দে চিতা চলে যায়।

গাছগাছালি, বনবনানী সব সাফ হয়ে গেছে। বিস্তর এলাকা শুকনো প্রান্তর বই আর কিছুই নয়। বসতি উঠে গেছে। সজীব নয়, কেবল শুকনো হাওয়া হাহাকার করে ফেরে। গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ হয়ে গেছে। গ্রামও নেই, নতুন শহরেরও পত্তন হচ্ছে না। এমতাবস্থায় ময়ূর তার সৌন্দর্যের গরিমায় ভোগবাদী দুনিয়ার কাছে আজ পণ্যে পরিণত।

মানুষ আজ বোবা বনে গেছে। ভীষণই অসহায় যেন; সমগ্র প্রকৃতি তথা নদী, গাছ, পাহাড় আজ অপ্রয়োজনীয়। প্রকৃতি, মানুষ, গ্রাম—সবই ছিন্নমূল তথা উদ্বাস্তু। প্রকৃতি ও মানুষ আজ এখানে, কাল ওখানে—যেন এক তাঁবুর বাসিন্দা। সারা দেশে তাঁবু বয়ে বয়ে আর কাহাতক ঘোরা যায়! সুতরাং নিজের দেশেই নিজে পরবাসী, নিজের ঘরেই নিজে বেঘর। কবি কবিতার শেষ চরণে আক্ষেপ করে বলেছেন—পরবাসী কবে তার স্বভূমি গড়ে তুলতে পারবে? তবে সম্ভবত এই পিছিয়ে যাওয়া বৃহৎ প্রকৃতি তথা মানুষ তথা পরবাসী আর কখনোই তার নিজ জমিতে পা রাখতে পারবে না।

নামকরণ

একটি গল্প বা কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা উপন্যাস, যাই হোক না কেন, তার নামকরণেই আভাস মেলে বিষয়বস্তুর তথা রচনাটির মূল বক্তব্যের। কবির কোন অভিপ্রায় কাজ করছে ওই নামকরণের পিছনে, তাও বুঝতে পারা যায় নামকরণের মধ্য দিয়েই। নামকরণ ঘটনাকেন্দ্রিক কিংবা চরিত্রকেন্দ্রিক বা ব্যঞ্জনাধর্মী সবরকমই হতে পারে। এখন কবি বিষ্ণু দে-র কবিতা ‘পরবাসী’ নামকরণটি কতটা সার্থক, তাই আমাদের বিচার্য।

কবিতাটির প্রথমে কবি প্রকৃতির নিপুণ চিত্রকর। নদী, অরণ্য, টিলা, পশুপাখি—সকলের প্রতিই তিনি সমান উদার। প্রকৃতির বর্ণচ্ছটা, ময়ূরের নৃত্যবিভঙ্গ, হরিণের জল খাওয়া কিংবা চিতার লুব্ধদৃষ্টি তাঁর নজর এড়ায় না। অন্ত্যমিলহীন অথচ এক অপূর্ব ছন্দে চিত্রায়িত করেছেন তিনি গ্রামবাংলার পথঘাটের সজীবতা, কিংবা সোনালি সেতারের অনুপ্রাসে বেজেছে নদীর কুলুকুলু সুরতরঙ্গ এবং শব্দসুষমা।

কবি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বানকে এবং চিতার হিংস্র কথাকলি রূপকের আঙ্গিকে তার চলে যাওয়ার ছন্দকে।

কিন্তু প্রথম তিনটি স্তবকে কবি যে আশার বার্তা দিয়েছেন, চতুর্থ স্তবক থেকে ঠিক ততটাই নৈরাশ্যের আঁধারে ডুবিয়ে দিয়েছেন পাঠককে। মার্কসীয় দর্শনপুষ্ট কবি এখানে বলেছেন প্রকৃতি আজ ধ্বংসপ্রায়। ময়ূর পণ্যে পরিণত। প্রকৃতি, মানুষ তথা কবি সকলেই আজ নিজভূমি থেকে উৎখাত তথা উদ্বাস্তু। আজ সকলেই নিজভূমে পরবাসী।

কবিমাত্রই পরবাসী। কেননা তাঁর বোধের জগৎ, তাঁর চেতনা, ভালোবাসা অত্যন্ত গভীর। তাঁর দর্শনে পৌঁছোতে পারে না সাধারণ মানুষ। তাই তিনি সর্বদাই বহুর মাঝে একা এবং নিজের বাসাতেই পরবাসী। প্রকৃতি ও মানুষ সকলেই উদ্বাস্তু। স্বস্থানেই পরবাসী। সুতরাং কবিতার নামকরণ একেবারেই সার্থক।


এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’ কবিতাটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

অষ্টম শ্রেণি বাংলা - ছোটোদের পথের পাঁচালী - সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

ব্যাকরণ বিভাগ - সাধু ও চলিত রীতি - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সাধু ও চলিত রীতি

ব্যাকরণ বিভাগ - সমাস - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সমাস

About The Author

Souvick

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সাধু ও চলিত রীতি

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সমাস

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – ক্রিয়ার কাল ও ক্রিয়ার ভাব

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়