এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

জঙ্গলের কোন্ কোন্ প্রাণীর কথা কবি এই কবিতায় বলেছেন?
জঙ্গলের খরগোশ, বনময়ূর, হরিণ, চিতা—এই চারটি প্রাণীর কথা কবি এই কবিতায় বলেছেন।
সেতারের বিশেষণ হিসেবে কবি ‘সোনালি’ শব্দের ব্যবহার করেছেন কেন?
নদীর জলের উপর সূর্যের সোনার মতো উজ্জ্বল আলো পড়ে ঝিকমিক করে ‘সোনালি’ রং হয় এবং সেতারের সুমধুর শব্দতরঙ্গ নদীতরঙ্গের কলতানের মতোই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাই সোনালির উজ্জ্বলতা এবং সেতারের উজ্জ্বলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে নদীর আবহ তৈরি করেছে এবং ‘স’-এর অনুপ্রাসে ঋদ্ধ হয়ে সোনালি সেতারের বিশেষণে ভূষিত হয়েছে।
কথক ও কথাকলির কথা কবিতার মধ্যে কোন্ প্রসঙ্গে এসেছে?
সুডৌল কাঁকুরে মাটির টিলায় পলাশ ফুলের বন্যা দেখে হঠাৎ আনন্দ-আতিশয্যের প্রসঙ্গে বনময়ূরের ‘কথক’ নৃত্যশৈলীর কথা এবং জঙ্গলের বাঘ-চিতার লোলুপ ও হিংস্র ছন্দে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে একটা অদ্ভুত ভয়ংকর ‘কথাকলি’ নাচের মতো বেগবতী ছন্দের কথা কবিতায় এসেছে। কথাকলিতে চোখ এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রয়োগ বেশি থাকে, তাই চিতার ভঙ্গির সঙ্গে এর মিল। কথকের অনুচ্চারিত দেহভঙ্গি, গ্রীবাসূচনায় ময়ূরের ছন্দ মেলে।
‘সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান’ কবি কীভাবে শুনেছেন? (অথবা, ‘শুনেছি সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান’—’সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান’-এর পৌরাণিক প্রসঙ্গটি লেখো।)
নদীতীরে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হবার আগে পশুরা জলপান করতে আসে। তখন হরিণও আসে নিঃশব্দে। কিন্তু জলপানের শব্দ নির্জনতা ভঙ্গ করে। হরিণের জলপানের দৃশ্যটি কবিমনে রামায়ণ কাহিনির স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। মুনিপুত্র সিন্ধুর কলসিতে জল ভরার শব্দকে হরিণের জলপানের শব্দ ভেবে ভুল করে, শব্দভেদী বাণে তাকে বিদ্ধ করে দশরথের হত্যা করার কাহিনি ‘রামায়ণ’-এর আদিকাণ্ডে বর্ণিত। হরিণের জলপানধ্বনি কবিমনে সেই স্মৃতি জাগায় বলেই কবিও যেন সিন্ধুমুনির হরিণের আহ্বান শুনতে পান।
‘ময়ূর মরেছে পণ্যে’—এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ কী?
ময়ূর সৌন্দর্যে অতুলনীয়। কিন্তু তা শুধু অবলোকন করেই মানুষ তৃপ্ত নয়। ময়ূরের নখ থেকে পালক পর্যন্ত সব কিছুই মানুষের কাজে লাগে। ময়ূরের পেখম দিয়ে টুপি, তুলি তৈরি হয়; এমনকি ময়ূরের মাংসও খুব সুস্বাদু, যা মানুষ খায়। অর্থাৎ, ভোগবাদী দুনিয়া ময়ূরের মৃত্যু ঘটিয়ে তাকে পণ্যে পরিণত করেছে।
‘দুই দিকে বন, মাঝে ঝিকিমিকি পথ’—বনের মাঝে পথ ঝিকিমিকি কেন?
দু-দিকে বনের মাঝে গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের আলোর লুকোচুরি খেলা চলে। দিনের বেলা পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এবং রাত্রিবেলা জোনাকির আলোয় দু-দিকের বনের মাঝে পথ ঝিকিমিকি করে।
‘রাতের আলোয় থেকে-থেকে জ্বলে চোখ’—রাতের আলোয় থেকে থেকে চোখ জ্বলে কেন?
এখানে প্রথমত ‘রাতের আলো’ বলা হয়েছে, কারণ আলো অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যমে যাতায়াত করে বলে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার একেবারেই সম্ভব নয়। তাই রাতেরও এক ধরনের গা ছমছম করা মোহময় আলো থাকে। সেই আলোয় মাঝে মাঝেই দেখা যায় শ্বাপদের লুব্ধ চোখ—যা আলো-আঁধারিতেও জ্বলজ্বল করে।
নিটোল টিলায় পলাশ গাছের ঝোপ এবং ময়ূর কেন দেখা যায়?
‘পরবাসী’ কবিতাটিতে টিলার কথা বলা হয়েছে। এই টিলা অঞ্চল কাঁকুরে মাটিতেই হয় এবং এ মাটিতেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া পলাশ ফুল ফোটে। ঘন জঙ্গলে ময়ূর থাকে না, কেননা জায়গার অভাবে সে তার পেখম মেলতে পারে অমর্যাদা। তাই নিটোল সুডৌল টিলার পাশেই পলাশের ঝোপ এবং ময়ূর দেখতে পাওয়া যায়।
নদীর সাথে সোনালি সেতারের সম্পর্ক কোথায়?
নদীর জলে সূর্যরশ্মি পড়ে চিকচিক করে ঢেউয়ের মাথাগুলো। সেটা কবির কল্পনায় যেন সোনার মতো ঝকঝকে রোদের প্রভাবে সোনালি রং ধারণ করে। অন্যদিকে নদী আপন বেগে বয়ে চলে এবং নদীর স্রোতের যে তথাকথিত কুলুকুলু শব্দ, তা কবিচেতনার কাছে তিন তারবিশিষ্ট সেতারের শব্দতরঙ্গের সঙ্গে তুলনীয়।
‘চিতা চলে গেল’—চিতা কীভাবে চলে যায়?
চিতা যখন হাঁটে, তার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। আর তার পদচিহ্ন লেজ দিয়ে মুছতে মুছতে যায় দুরন্ত গতিতে। একটা অদ্ভুত রাজকীয়, অথচ ভয়ংকর কথাকলি নাচের মতো বেগবতী লুব্ধ হিংস্র ছন্দে চিতা চলে যায়।
‘সারাদেশময় তাঁবু ব’য়ে কত ঘুরব?’—কবি কেন তাঁবু বয়ে ঘোরার কথা বলেছেন?
‘তাঁবু’ কথাটির অর্থ হলো ‘মাথা গোঁজার ক্ষণস্থায়ী ঠাঁই’ বা ‘শিবির’। উচ্ছেদ হওয়া প্রকৃতি সারাজীবন ধরে তার উচ্ছেদের পূর্ববর্তী সুন্দর সরল জীবনকে বয়ে বেড়ায়। মূল বা শিকড় খুঁজে বেড়ায় প্রকৃতি কিংবা মানুষ। কিন্তু সে কোনো দিনই পায় না, আর পায় না বলেই কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয়—’সারাদেশময় তাঁবু ব’য়ে কত ঘুরব?’
কথক – টীকা লেখো:
ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্য আট ধরনের। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো কথক। প্রাচীনকালে যাযাবর জাতিকে বলা হতো কথাকার। তারা মুখে মুখে গল্প বলে বেড়াত। এই ‘কথাকার’ থেকেই কথকের উৎপত্তি। আর এই কথক নাচের মধ্য দিয়েও একটা ঘটনা বা কোনো গল্প বলা হয়। নৃত্যের আরম্ভে ঈশ্বরকে বন্দনা করে ধীরে ধীরে নাচ শুরু হয়। এর পর উঠতে উঠতে ক্রমশ নাটকীয় চরম মুহূর্তে চলে যায়। ছোটো নাচকে বলে ‘টুকরা’, বড়ো নাচকে বলে ‘তোড়া’। এর মধ্যে বোল থাকে যা তবলা থেকে আসে, যাকে বলে তবলার বোল। কথক ভারতীয় উচ্চাঙ্গ নৃত্যপদ্ধতি; বিশেষত জয়পুর, লখনউ এবং বেনারস ঘরানার নৃত্যশৈলী।
সেতার – টীকা লেখো:
‘সে’ কথাটির অর্থ ‘তিন’, অর্থাৎ তিনটি তারের সাহায্যে যে যন্ত্র বাজানো হয়, তাকে বলে সেতার। এটি একটি পারস্যদেশীয় বাদ্যযন্ত্র। ডান হাতের তর্জনীর দ্বারা সেতার বাজানো হয়। প্রায় আড়াইশো বছর আগে সেতারে চতুর্থ তার যোগ করা হয়েছিল। বিখ্যাত দু-একজন সেতারবাদক হলেন—মীর্জা আবদুল্লা (Mirza Abdollah), হামিদ মোতেবাসেম (Hamid Motebassem), রবিশঙ্কর প্রমুখ।
কথাকলি – টীকা লেখো:
ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য হলো কথাকলি। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীতে কথাকলি নৃত্যের উদ্ভব হয়। কেরালার যুদ্ধবিদ্যার অনুসরণেই এই ধ্রুপদি নৃত্যশৈলীর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ‘কথা’ শব্দের মানে ‘কাহিনি’ এবং ‘কলি’ শব্দের অর্থ ‘যুদ্ধ’। এই নৃত্যে মহাভারতের নল চরিত্রের চিত্রায়ণ, দুর্যোধন বধের কাহিনি, অর্জুন এবং ভগবান শিবের যুদ্ধের কাহিনি মঞ্চস্থ করা হয়। আগে সারারাতব্যাপী হতো, এখন সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হয়েছে। এই নৃত্যে 8 থেকে 10 বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 24টি মুদ্রায় ন-রকম অভিব্যক্তি উপস্থাপিত করা হয়। তবে কথাকলি নৃত্যে সাজসজ্জার প্রাধান্য মুখ্য। মুখের মেকআপে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়।
সিন্ধুমুনি – টীকা লেখো:
অন্ধমুনির পুত্র সিন্ধুমুনি রাজা দশরথের শব্দভেদী বাণে অকালে প্রাণ হারায়। হরিণের জলপানের শব্দ আর কলসিতে করে বাবা-মায়ের জন্য নদী থেকে সিন্ধুমুনির জল ভরার শব্দ এক হয়ে যাওয়ায় এই বিপত্তি ঘটে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ‘কালমৃগয়া’-তে সিন্ধুমুনির কথা রয়েছে।
পণ্য – টীকা লেখো:
যা বিক্রয় হওয়ার যোগ্য। মানুষ আজ আর মানবিকতার জায়গায় নেই, পণ্যের মতো হয়ে গেছে। মানুষের সব বিক্রি হয়—মর্যাদা বিক্রি হয়, শ্রম বিক্রি হয়, মন বিক্রি হয়। সর্বোপরি মানুষ তার মনুষ্যত্ব বিক্রি করে পশু হয়ে যায়। সে শুধু ময়ূরকেই পণ্যে পরিণত করে না, নিজেও পণ্যে পরিণত হয়।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment