এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

বিরামচিহ্ন ব্যবহারের দিক থেকে ‘পরবাসী’ কবিতাটির শেষ স্তবকের বিশিষ্টতা কোথায়? এর থেকে কবিমানসিকতার কী পরিচয় পাওয়া যায়?
বিরামচিহ্ন ব্যবহারের দিক থেকে কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে দেখতে পাই, প্রথম চারটি স্তবক যেখানে মূলত কমা (,) এবং দাঁড়ি (।)-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে পঞ্চম স্তবকটা একেবারেই অন্যরকম। অর্থাৎ পঞ্চম স্তবকের চারটি চরণই কিন্তু জিজ্ঞাসা চিহ্ন (?) দিয়ে শেষ করেছেন কবি। প্রথম চরণে তিনি বলেছেন—কেন এই দেশে মানুষ মৌন আর অসহায়? দ্বিতীয় চরণে দেখি—আমাদের দেশের নদী, গাছ, পাহাড় অর্থাৎ পুরো প্রকৃতিজগৎকে এত গৌণ (ছোটো) করে দেখা হচ্ছে কেন? তৃতীয় চরণে প্রকাশ পেয়েছে কবির সারাদেশে তাঁবু বয়ে বয়ে কেবল ঘোরার ক্লান্তির কথা। আর চতুর্থ এবং সর্বশেষ চরণে কবি নিজেকেই পরবাসীরূপে চিহ্নিত করে বলেছেন—তিনি কবে নিজের বাসযোগ্য একটা ভূমি পাবেন? শেষ স্তবকে কবি একটি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছলেন এবং সেই সিদ্ধান্তকে সর্বজনীন করার জন্য এবং কিছুটা সমভাবাপন্নদের কাছ থেকে সমমর্মিতা আকর্ষণের জন্যও কবি এই প্রশ্নগুলো হাজির করেছেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কবি জানেন এবং এর মধ্য দিয়ে কবির একটি প্রতিবাদী মনের প্রকাশ ঘটেছে।
কবি নিজেকে পরবাসী বলেছেন কেন?
‘পরবাসী’ কবিতাটির প্রথমেই কবি বিষ্ণু দে প্রকৃতির বৈচিত্র্যের কথা বলেছেন। সেখানে প্রকৃতির খেয়ালে চলা আঁকাবাঁকা পথ, পলাশের ঝোপ, তাঁবুর ছায়া, ময়ূরের নৃত্য, হরিণের সাবধানে জল খাওয়া, কিংবা চিতার হিংস্র ছন্দ—সমস্ত ছবিই নিপুণ হাতে কবি এঁকেছেন। কিন্তু চতুর্থ স্তবক থেকে কবি আশাহীন। তিনি সেখানে দেখিয়েছেন বসতিহীন খাঁ খাঁ প্রান্তর, শুকনো হাওয়ার হাহাকার, গ্রামের অপমৃত্যু, ময়ূরের পণ্যে পরিণত হওয়ার কথা। যেন এক নিরাশার অতলে ডুব দিয়েছেন কবি এবং সেখানে মানুষ ও প্রকৃতি সব গৌণ—সব উদ্বাস্তু। প্রকৃতি এবং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের ভিটেছাড়া হয়ে আজীবন যাযাবরবৃত্তির ভয়ংকর জীবনের কথাই কবি বলেছেন। সেখানে তিনি নিজেকেই সর্বশেষে তুলে ধরেছেন পরবাসী হিসেবে। আসলে সব কবিরাই পরবাসী। কেননা কবিরা বোধ, আবেগ এবং ভালোবাসা নিয়ে বাঁচেন। এ সমস্ত কিছুই কিন্তু পণ্যবাদী দুনিয়ার কাছে ছিন্নমূল হয়ে যাচ্ছে। তাই কবি এবং সমস্ত মানবতাবাদী মানুষই পরবাসী।
‘জঙ্গল সাফ, গ্রাম মরে গেছে, শহরের/পত্তন নেই’ – প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই পঙক্তির প্রাসঙ্গিকতা বিচার করো।
প্রকৃতি এবং মানুষের সম্পর্ক এক এবং অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ অসহায়। মানুষ ছাড়া প্রকৃতি প্রাণহীন। উভয়ে উভয়ের পরিপূরক। প্রকৃতি মানুষকে লালন করে। সেই প্রকৃতিকে শহর বানানোর অর্থই হল গ্রামের মৃত্যু। আবার শহরও কিন্তু জঙ্গলের আবহাওয়াকেই বয়ে বেড়ায়। জঙ্গলের একটা নিয়মকানুন আছে, কিন্তু শহরে সেই নিয়ম সম্ভব নয়। তাই প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পীড়ন করে, গ্রাম-সভ্যতাকে বিনষ্ট করে শহর গড়ে উঠছে—যে শহরের সঠিক পত্তন হচ্ছে না। প্রকৃতি ছাড়া শহরের অস্তিত্ব বিপন্ন। সুতরাং মানুষ ও প্রকৃতির এক সুগভীর সম্পর্কের নিরিখে উদ্ধৃত চরণটি আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। আজও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশ-প্রকৃতি নষ্ট করে উন্নয়ন হচ্ছে। ফলত, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনে গ্রাম এবং শহর দুই-ই বিনষ্ট হচ্ছে। মানুষ হচ্ছে যাযাবর। তাই এই পিছিয়ে যাওয়া বৃহৎ প্রকৃতি কোনোদিনই আর নিজ জমিতে পা রাখতে পারবে না।
‘পরবাসী’ কবিতার প্রথম তিনটি স্তবক ও শেষ দুটি স্তবকের মধ্যে বক্তব্য বিষয়ের কোনো পার্থক্য থাকলে তা নিজের ভাষায় লেখো।
কবি বিষ্ণু দে-র ‘পরবাসী’ কবিতার প্রথম তিনটি স্তবক এবং শেষ দুটি স্তবকের মধ্যে একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক তো রয়েছেই; কিন্তু প্রথমে কবি যা বলেছেন, অর্থাৎ প্রথম তিনটিতে যা ছিল, তা পরের স্তবক দুটিতে আর নেই। যেমন কবিতার শুরুতেই কবি বলেছেন ‘দুই দিকে বন’। তার মানে তখন বনের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু তৃতীয় স্তবকের শুরুতেই তিনি বলেছেন—’কোথায় সে বন’, অর্থাৎ যে বন একদিন ছিল তা আজ হারিয়ে গেছে। দ্বিতীয় স্তবকে দেখি নিটোল টিলার অপরূপ পলাশ ফুলের আধিক্য দেখে হঠাৎই পুলকে আপ্লুত বনময়ূর। তাই সে যেন কত্থক নাচের মতোই পা তুলে এবং পেখম বিস্তার করে নাচতে থাকে। কিন্তু এই কবিই আবার তৃতীয় স্তবকের শেষে এসে বললেন—’ময়ূর মরেছে পণ্যে’—অর্থাৎ স্বার্থপর, আগ্রাসী ও ভোগবাদী দুনিয়ার কাছে নান্দনিকতার সেরা ময়ূরও আজ পণ্যে পরিণত। শুধু ময়ূর নয়, বন-বনানী, জঙ্গল ও গ্রাম সবই পণ্যসামগ্রী। দ্বিতীয় স্তবকে আরও দেখি, সেখানে নদীর সুমধুর শব্দতরঙ্গের সঙ্গে কবি সোনালি সেতারের সুষমাকে মিলিয়েছেন। সেখানে আবার শেষ স্তবকে এসে দেখি এর ঠিক উল্টো। অর্থাৎ সেখানে কবি বলেন—’কেন নদী গাছ পাহাড় এমন গৌণ?’ অতএব দেখা যাচ্ছে গ্রাম, গ্রাম্যতা, সাধারণ সুন্দর জীবনযাত্রার উচ্ছেদ; পরিবর্তে বনানী কাঠে, বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল শুকনো প্রান্তরে, বন্যপ্রাণী তথা খরগোশ, ময়ূর সবই ভোজ্য কিংবা পণ্যে রূপায়িত। সুতরাং উদ্বাস্তু প্রকৃতি, মানুষ আজ এখানে, কাল ওখানে—যেন তাঁবুর বাসিন্দা।
‘পরবাসী’ কবিতাতে কবির ভাবনা কেমন করে এগিয়েছে তা কবিতার গঠন আলোচনা করে বোঝাও।
‘পরবাসী’ কবিতাটিতে অন্ত্যমিল নেই, অথচ একটা অসাধারণ ছন্দের মিল লক্ষ করা যায়। মোট 5টি স্তবকে কবিতাটি লিপিবদ্ধ। প্রথম তিনটি স্তবকে কবিতার যে সুর ছিল, তৃতীয় স্তবকে এসেই তা যেন হোঁচট খেয়ে যায়। কবিতাটিতে বিশেষ্য-বিশেষণের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবির ভাবনা প্রকাশের পথ পেয়েছে। যেমন—’ঝিকিমিকি পথ’, ‘নিটোল টিলা’, ‘বন্যপ্রাণ’ কিংবা ‘কত্থক বেগ’ ইত্যাদি। কবিতাটিতে দ্বৈত শব্দ প্রয়োগে একটা তৃতীয় অর্থ তৈরি হয়েছে, যা কবিতাটিকে একটি বিশেষ মাত্রা দিয়ে কবিতার গঠনশৈলী নির্মাণে সহায়তা করেছে। যেমন—’কচি কচি’ বহুবচন বোঝাতে, ‘থেকে থেকে’ মানে মাঝে মাঝেই, ‘তালে তালে’ প্রকৃতির খেয়ালে ইত্যাদি। কানে আরাম লাগে এমন অনুপ্রাস অলংকারের মাধ্যমে কবি শব্দচয়ন করেছেন। যেমন—’নিটোল টিলা’, ‘সোনালি সেতার’ প্রভৃতি। তৃতীয় স্তবকের পর কবির ভাবনা মোড় নিয়েছে। চলতে চলতে হঠাৎ এই বাঁক নেওয়া কবিতার গঠনের দিক থেকে স্বতন্ত্রতা এনেছে এবং কবিতাটিকে এক ধ্রুপদী আঙ্গিকে ভূষিত করে বিশেষ মাত্রা জুগিয়েছে।
কবিতাটির নাম ‘পরবাসী’ দেওয়ার ক্ষেত্রে কবির কী কী চিন্তা কাজ করেছে বলে তোমার মনে হয়? তুমি কবিতাটির বিকল্প নাম দাও এবং সে নামকরণের ক্ষেত্রে তোমার যুক্তি সাজাও।
‘পরবাসী’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ প্রবাসী নয়, এর প্রকৃত অর্থ নিজের বাস থেকে বাসহীন হওয়া। এবং সেই অর্থে সব কবিরাই পরবাসী। কেননা কবিরা বোধ, আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে বাঁচেন; আর এ সমস্ত কিছুই পণ্যবাদী দুনিয়ার কাছে ছিন্নমূল হয়ে যাচ্ছে। তাই কবি এবং সমস্ত মানবতাবাদী মানুষ মাত্রই পরবাসী। কবিতাতে কবি প্রথম ছত্র থেকে শেষ ছত্র পর্যন্ত প্রকৃতি ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের ভিটেছাড়া হওয়ার উদ্বাস্তু জীবনে আজীবন যাযাবরবৃত্তির ভয়ংকর পাঁকের কথা বলেছেন। এই কারণেই ‘পরবাসী’ এই নামের বেদনাময় সৌন্দর্যের অবতারণা করেছেন কবি। লোভের কাছে ও পণ্যের কাছে পরাহত মানবতা—নিজভূমে পরবাসী। সুতরাং কবির চিন্তাভাবনা রূপ পেয়েছে ‘পরবাসী’ কবিতায়। কবিতাটির বিকল্প নাম হতেই পারে। যেমন—’ছিন্নমূল’, ‘প্রশ্ন’, কিংবা ‘প্রকৃতি বনাম’। প্রকৃতি, মানুষ, গ্রাম সবই বর্তমানে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। এ কারণেই ‘ছিন্নমূল’ নামটির প্রাসঙ্গিকতা। কবিতার শেষ স্তবকে কবি সমভাবাপন্নদের কাছ থেকে সহমর্মিতা আকর্ষণের জন্য কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত করেছেন। এ কারণে ‘প্রশ্ন’ নামটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। একদিকে প্রকৃতির শ্যামলিমা এবং অপরদিকে ভোগবাদী দুনিয়ার তীব্র লোভের আকর্ষণ—তাই ‘প্রকৃতি বনাম’ নামটিও সুপ্রযুক্ত হতে পারে।
‘পরবাসী’ কবিতায় ‘সিন্ধুমুনির হরিণ’ আহ্বানের মধ্যে একটি পৌরাণিক গল্প নিহিত রয়েছে – গল্পটি বিবৃত করো।
হরিণ যে একটা প্রচ্ছন্ন আমন্ত্রণ তথা উসকানি দেয় শিকারিকে তার জল খাওয়ার মধ্যে, তারই রূপক এই ‘হরিণ আহ্বান’। পৌরাণিক কাহিনিটি হল, রাজা দশরথ মৃগয়া করতে বেরিয়েছেন। ওদিকে অন্ধমুনির পুত্র সিন্ধুমুনি অন্ধ মা-বাবার জন্য কলসি করে জল আনতে গেছে নদীতে, যেটি ওই জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। হরিণের জলপানের শব্দ এবং কলসিতে জল ভরার শব্দ সমান। সিন্ধুমুনির সেই জল ভরার শব্দ শুনে শিকার খুঁজে বেড়ানো দশরথ দূর থেকে ভাবলেন, হরিণই জল খাচ্ছে। দূর থেকে তিনি তৎক্ষণাৎ এক শব্দভেদী বাণ ছুঁড়লেন হরিণটির উদ্দেশে—যা না দেখে কেবল শব্দ শুনেই ছোঁড়া যায়। ফলে অব্যর্থ লক্ষ্য হয়ে সেই বাণ সিন্ধুমুনির বুকে বিঁধল। আর্তকণ্ঠ শুনে দশরথ দৌড়ে এসে দেখেন এক কিশোর তারই বাণে মৃত্যুশয্যায়। সিন্ধুমুনি কোনোরকমে তাকে বাবা-মায়ের কাছে দশরথকে নিয়ে যেতে বলেন। দশরথ সেই কথামতো কাজ করলেন। সিন্ধুমুনি মারা যান। একমাত্র পুত্রের শোকে অধীর অন্ধমুনি দশরথকে এই বলে অভিশাপ দেন যে, তিনিও পুত্রশোকে মারা যাবেন। অপুত্রক দশরথ দুঃখ পেলেও খুশি হন পুত্রসন্তান সম্ভাবনায়।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পরবাসী’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment