এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘পল্লীসমাজ’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পল্লীসমাজ’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে 15 সেপ্টেম্বর, 1876 খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মতিলাল চট্টোপাধ্যায়, মাতা ভুবনমোহিনী দেবী। শরৎচন্দ্রের ছেলেবেলা ভাগলপুরে তাঁর মাতুলালয়ে কাটে। এখান থেকেই তিনি এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। যদিও তিনি মহাবিদ্যালয়ে যান, তবু তাঁর লেখাপড়া তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। 27 বছর বয়সে কর্মসূত্রে তিনি বার্মা যান এবং 1916 খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে ফিরে এসে কলকাতার নিকটবর্তী হাওড়া জেলার বাজে শিবপুরে থাকেন। দশ বছর পরে তিনি রূপনারায়ণ নদীর তীরবর্তী নিজ বাসভূমি সামতাবেড় গ্রামে আসেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কলকাতায় একটি গৃহ নির্মাণ করেন। 1938 খ্রিস্টাব্দের 16 জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলির মধ্যে আছে ‘বড়দিদি’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দেবদাস’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘বিরাজবৌ’, ‘পরিণীতা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবী’, ‘শেষ প্রশ্ন’, ‘বিপ্রদাস’ ইত্যাদি।
উৎস
‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের একাদশ পরিচ্ছেদ থেকে এই গল্পাংশ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিষয়সংক্ষেপ
রমেশ চণ্ডীমণ্ডপে গোপাল সরকারের সঙ্গে বসে জমিদারির হিসাব দেখছিল। সেই সময় গ্রামের কৃষকেরা এসে তার কাছে কেঁদে পড়ে তাদের একশো বিঘার মাঠ উদ্ধার করার জন্য। মাঠের দক্ষিণ ধারের বাঁধটি ছিল ঘোষাল ও মুখুয্যেদের। সেই বাঁধ খুলে দিয়ে মাঠের ধান রক্ষা করা সম্ভব, কিন্তু বছরে দুশো টাকার মাছ বিক্রি হয় বলে জমিদার বেণীবাবু কড়া পাহারায় সেই বাঁধ আটকে রেখেছেন। কৃষকদের দুর্দশা দূর করার জন্য রমেশ বেণীবাবুর কাছে ছুটে যায় জলার বাঁধ কেটে দেওয়ার আর্জি নিয়ে। কিন্তু জমিদারবাবু তাঁর লোকসান করে বাঁধ কেটে দিতে একেবারেই রাজি হন না। বরং উলটে তিনি রমেশকে অপমান করতে থাকেন। অগত্যা রমেশ ছুটে যায় রমার কাছে। রমাও যেহেতু এই জমির অংশীদার, তাই তার অনুমতি মিললে বাঁধ কাটা সম্ভব হতে পারে বলে রমেশের মনে হয়। কিন্তু রমার কাছ থেকেও সে অনুমতি আদায় করতে সমর্থ হয় না। তখন সে নিজেই জোর করে বাঁধ কাটিয়ে দেবে বলে স্থির করে এবং রমার কাছ থেকে বিদায় নেয়।
রাত্রি এগারোটার সময়ে চণ্ডীমণ্ডপের বারান্দার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় প্রৌঢ় মুসলমান আকবরকে। তার মুখের উপর রক্ত জমাট বেঁধে গেছে এবং গায়ের কাপড়ও রক্তে লাল। জমিদার বেণীবাবু তাকে থানায় গিয়ে রমেশের নামে অভিযোগ জানাতে বললে আকবর কিছুতেই তাতে রাজি হয় না। উপরন্তু সে ছোটবাবু অর্থাৎ রমেশের বীরত্বের প্রশংসা করতে থাকে। সে বর্ণনা করে, কীভাবে রমেশ বাঁধ কেটে গাঁয়ের মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। বেণী তাকে বেইমান বললে আকবর দৃপ্ত কণ্ঠে তার প্রতিবাদ জানায়। রমাও আকবরকে অনুরোধ করে রমেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য, কিন্তু আকবর তার সিদ্ধান্ত বদল করে না। ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে আকবর বাড়ির পথে এগোয়। বেণী রাগে অন্ধ হয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু রমেশের বীরত্বের কাহিনি মনে করে রমার চোখ জলে ভরে যায়।
নামকরণ
দরদি কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তৎকালীন সামাজিক জটিলতা ও জাতিভেদ প্রথায় অত্যন্ত পীড়িত হয়েছিলেন। তারই প্রতিচ্ছবি পল্লিবাংলার প্রেক্ষাপটে ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে। তারিণী ঘোষাল এবং যদু মুখুয্যের বিবাদ দীর্ঘদিনের। তারিণী ঘোষালের মৃত্যুর পর তার পুত্র রমেশ রুরকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পাঠরত। রমেশ কুঁয়াপুরে ফিরে পিতৃশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করতে গিয়ে সামাজিক দলাদলির নগ্ন চিত্রটি উপলব্ধি করতে পারে। বড়কর্তার পুত্র বেণী ঘোষাল এবং কয়েকজন সমাজপতি তার এই পিতৃশ্রাদ্ধ সুষ্ঠুভাবে যাতে সম্পন্ন না হয়, সেজন্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করে। এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে রমেশের বাল্যসখী যদু মুখুয্যের বিধবা কন্যা রমা। রমেশের মানসিক উদারতার কথা বেণী ঘোষালের মা বিশ্বেশ্বরী জানতেন। তিনি রমেশকে দুর্বল, অসহায় গ্রামবাসীর পাশে থাকার অনুরোধ জানান। রমেশ, বেণী ঘোষাল, ধর্মদাস, ভৈরব আচার্য, গোবিন্দ, মাসি, আকবর—এদের মধ্য দিয়ে গ্রাম্য জীবনের ঘৃণ্য রাজনীতি, উচ্চবিত্তের শোষণ এবং নিম্নবিত্তের অসহায়তাকে শরৎচন্দ্র তুলে ধরেছেন। এইসব চরিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। সমস্ত দিক বিচারে ‘পল্লীসমাজ’ নামটি যথার্থ হয়েছে বলেই মনে হয়।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘পল্লীসমাজ’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





Leave a Comment