এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘ছন্নছাড়া’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে কবির পরিচিতি, কবিতার উৎস, কবিতার পাঠপ্রসঙ্গ, কবিতার সারসংক্ষেপ, কবিতার নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং কবিতাটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কবি ও কবিতার সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কবি পরিচিতি
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বাংলা সাহিত্যের একজন অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। 1903 খ্রিস্টাব্দে অধুনা বাংলাদেশের নোয়াখালিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র 13 বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর কলকাতায় চলে এসে তিনি স্কুলশিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি সাউথ সাবার্বান কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বিচারবিভাগীয় কর্মে নিযুক্ত ছিলেন। ‘নীহারিকা দেবী’ ছদ্মনামে তিনি প্রথম সাহিত্য রচনা শুরু করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেছেন। তিনি ‘কল্লোল’ পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন কিছু সময়ের জন্য। তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো— ‘বেদে’, ‘আকস্মিক’, ‘বিবাহের চেয়ে বড়ো’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘প্রথম কদম ফুল’ ইত্যাদি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্পসংকলনের নাম হলো— ‘অকাল বসন্ত’, ‘অধিবাস’, ‘পলায়ন’, ‘কাঠ-খড়-কেরোসিন’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও ‘অমাবস্যা’, ‘আমরা’, ‘নীল আকাশ’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘উত্তরায়ণ’ ইত্যাদি নামে কতকগুলি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ তিনি রচনা করেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, গিরিশচন্দ্র প্রমুখের আত্মজীবনীও রচনা করেছিলেন। 1976 খ্রিস্টাব্দে প্রথিতযশা এই ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন।
পাঠপ্রসঙ্গ
বিংশ শতাব্দীর কবিদের মধ্যে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত একজন বিবেকবান কবি-সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি যখন কলম ধরেন তখন অশান্ত বাংলার বুকে মানবিকতা সুদূরে নির্বাসিত। সেখানে আছে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং হতভাগ্য বেকারদের প্রতি তীব্র অবহেলা। কিন্তু তারাই শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, অমানবিক মানুষদের প্রকৃত শিক্ষক। সবার আগে তারাই ছুটে যায় মানুষের ত্রাণকর্তা রূপে। তাই ‘ছন্নছাড়া’ কবিতাটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিষয়সংক্ষেপ
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত একটি জরুরি কাজে ট্যাক্সি করে যাওয়ার সময় একটি ডালপালাহীন, শুষ্ক, জীর্ণ, কঙ্কালসার গাছ দেখতে পান। বিগত সবুজের কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিকে গাছের প্রেতচ্ছায়া বলেও ব্যঙ্গ করলেন তিনি। দূরে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একদল ছন্নছাড়া বেকার ছেলেদের দেখে ড্রাইভার এড়িয়ে যেতে চাইলেও, কবি ওখান দিয়েই যেতে চান। ড্রাইভারের কথা অনুযায়ী বিরাট ‘নেই’ রাজ্যের বাসিন্দা ছেলেগুলিকে কাছ থেকে দেখতে চান তিনি। কারণ যাদের জন্য কলেজে সিট নেই, অফিসে চাকরি নেই, কারখানায় কাজ নেই; শুধু নেই-নেই আর নেই। অবহেলিত মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতি নেই কারও কণামাত্র ভালোবাসা— সেই স্ফুলিঙ্গহীন ভিজে বারুদের স্তূপকে কবি কাছ থেকে দেখতে চান। ট্যাক্সি ওদের সামনে দাঁড়াতেই, ওরা লিফট পেয়েছে বলে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠেই ছুটে চলল অনতিদূরে এক গাড়ি চাপা পড়া বেওয়ারিশ ভিখিরির দিকে। রক্তমাংসে দলা পাকিয়ে যাওয়া মানুষটা তথা ভিখিরির এখনও প্রাণ আছে বলে তারা আনন্দে নেচে উঠল, আর সেইসঙ্গে প্রাণের স্পন্দনে ছন্দময় হয়ে উঠল প্রকৃতি। জীর্ণ, শীর্ণ, কঙ্কালসার প্রেতচ্ছায়ারূপী গাছটায় লাগল সবুজের প্রলেপ। পাষাণরূপ হৃদয়ে লাগল কোমলতার ছোঁয়া; তৃপ্ত হলো প্রকৃতি। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠল।
নামকরণ
নামকরণ সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নামকরণের মধ্য দিয়ে পাঠক বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মতো মূল বিষয়টি পাঠ করার আগেই রচনাটি সম্পর্কে খানিক ধারণা লাভ করতে পারেন। সাহিত্যে নামকরণ নানা উপায়ে হতে পারে; যথা— চরিত্রকেন্দ্রিক, ঘটনাকেন্দ্রিক, ব্যঞ্জনাধর্মী ইত্যাদি।
জরুরি কাজে যাওয়ার পথে কবি একদল ছন্নছাড়া বেকার যুবকের দেখা পান। সমাজের চোখে তারা ব্রাত্য এবং তাদের জীবনে শুধু ‘নেই’-এর হাহাকার। কিন্তু একটি গাড়ি চাপা পড়া মুমূর্ষু ভিখিরিকে বাঁচাতে এই ছন্নছাড়া ছেলেরাই সবার আগে উচ্ছ্বাসের সাথে ছুটে যায়। তাদের এই নিঃস্বার্থ মানবিকতায় মুগ্ধ হয়ে কবি দেখেন, জীর্ণ প্রকৃতির বুকেও যেন প্রাণের স্পন্দন ফিরে এসেছে।
কল্লোলীয় আধুনিকতা হলো তথাকথিত অপ্রাসঙ্গিক রোমান্টিকতার এক সময়োপযোগী জবাব। তাই ছন্নছাড়া বেকার দামালদের এই মানবিকতা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তাদের জীবনে সুখ-শান্তি-প্রেম সবই ছন্দহীন হওয়ায়, এই ঘটনা ছন্নছাড়া সমাজকে কোথায় যেন এক সূত্রে গেঁথে দিল। তাই কবিতার ব্যঞ্জনাকেন্দ্রিক নামকরণ হিসেবে ‘ছন্নছাড়া’ সার্থকভাবে প্রযুক্ত হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘ছন্নছাড়া’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন