এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের অন্তর্গত ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ শীর্ষক কবিতাটি ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের কত সংখ্যক কবিতা? ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ কবিতায় কবি জীবনানন্দের কবি-মানসিকতার পরিচয় কীভাবে ধরা দিয়েছে, তা বুঝিয়ে দাও?
‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ কবিতাটি ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের 25 সংখ্যক কবিতা।
রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা কাব্যসাহিত্যে একজন স্মরণীয় কবি হলেন জীবনানন্দ দাশ। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের প্রতিটি কবিতায় জন্মভূমির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। বাংলার মাঠঘাট, পাখপাখালি, নদীনালা অর্থাৎ প্রকৃতি তাঁর কবিতায় সজীব হয়ে উঠেছে। নিসর্গপ্রকৃতি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে কাব্যিক রূপ ধারণ করেছে। আলোচ্য কবিতাটিতেও তার প্রমাণ দেখতে পাই।
সাধারণভাবে জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি মানুষের মনকে আলোড়িত করে। কবির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। গ্রামীণ দুপুরের ক্লান্ত রোদ্দুর তাঁর মনে এখনও উজ্জ্বল। সেই রোদের গন্ধে কত স্বপ্নময় কাহিনি লুকিয়ে আছে—তা আর কেউ জানে না, জানেন কেবল কবি, গাঁয়ের প্রান্তর আর ওই প্রান্তরের শঙ্খচিল। শুষ্ক পাতা যেমনভাবে ঝরে যায়, তেমনভাবেই ঝরে গেছে শালিকের স্বর, নকশাপেড়ে শাড়ি পরিহিতা মেয়েটি ওই রোদের ভিতর। জীবনের রুক্ষ গদ্যকে কবি তাঁর কল্পনার স্পর্শে কাব্যিক ও ছন্দময় করে তুলেছেন আলোচ্য কবিতায়।
জীবনানন্দ একজন কবি, তাই তাঁর কাব্যচেতনার কোমল স্পর্শে বুনো চালতার ছন্দহীন শাখাগুলির অবস্থিতিও ছন্দময় হয়ে উঠেছে কবিতায়। ‘জলে তার মুখখানা দেখা যায়’—এই উক্তি কবিত্বরসে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোদের বুকে ভিজে বেদনার গন্ধ কেবল কবিই অনুভব করতে পারেন। আর তাঁর লেখনীতেই তা পাঠকের মনে কাব্যরসের সঞ্চার ঘটায়। আলোচ্য কবিতায় তারই প্রমাণ পাওয়া গেল। এভাবেই ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ কবিতায় কবির কবিমানসিকতার প্রকাশ লক্ষ করা যায়।
কবিতাটির গঠন-প্রকৌশল আলোচনা করো।
‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের কবিতাগুলিতে কবি প্রচলিত রচনারীতির বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। এই কাব্যের কবিতাগুলি সনেট আকারে লেখা হয়েছে। সনেটের নিয়ম অনুসারে 14টি চরণে কবিতাটি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম আটটি চরণ অর্থাৎ অষ্টক এবং পরের ছয়টি চরণ অর্থাৎ যটক—এভাবে কবিতাটি গঠিত। অষ্টকে কবিতার ভাববস্তু বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আর ষটকে তা পরিণতি পেয়েছে।
কবিতাটি সনেটের ক খ খ ক, ক খ খ ক, ঙ চ ছ, ঙ চ ছ—এই রীতি অনুসারে নির্মিত হয়েছে। তবে অষ্টম চরণের শেষ ধ্বনিটির ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম ঘটেছে। রীতি অনুসারে সেখানে ‘ছে’ ধ্বনির প্রয়োগের বদলে ‘সে’ ধ্বনিটি ব্যবহৃত হয়েছে।
কবিতাটির 12টি চরণে 22টি করে বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ ও সপ্তম চরণে যথাক্রমে 21টি ও 23টি বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে প্রতিটি চরণে সমসংখ্যক বর্ণ এখানে নেই—যা একটি ত্রুটি।
তবুও আলোচ্য চতুর্দশপদী কবিতাটি একটি সনেট হয়ে উঠেছে।
‘গন্ধ লেগে আছে রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার’—কবিতায় কীভাবে এই অপরূপ বিষণ্ণতার স্পর্শ এসে লেগেছে, তা যথাযথ পঙক্তি উদ্ধৃত করে আলোচনা করো।
প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি জীবনানন্দ দাশের ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য কবিতায় এক বিষণ্ণতার ছবি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
কবি গ্রামীণ প্রকৃতির কোলে বড়ো হয়েছেন, গ্রামের প্রকৃতি তাই তাঁর হৃদয়ে গেঁথে আছে। সেই দ্বিপ্রহরগুলি তো তাঁর মনের মণিকোঠায় সযত্নে স্থান করে নিয়েছে। দ্বিপ্রহরের রোদ কত স্বপ্ন নিয়ে ধরা দিত—
“রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের— কোন গল্প, কী কাহিনি, কী স্বপ্ন যে বাঁধিয়াছে ঘর আমার হৃদয়ে, আহা, কেউ তাহা জানেনাকো—।”
কবির স্বপ্ন হয়তো হারিয়ে গেছে; যে গল্পকাহিনি হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল তারাও কোথাও উধাও হয়ে গেছে, আজ তার কোনো হিসেব নেই। স্মৃতি এখানে বেদনা হয়ে ঝরে পড়েছে।
“শালিকের স্বর,
ভাঙা মঠ-নশাপেড়ে শাড়িখানা মেয়েটির রৌদ্রের ভিতর”
অথবা
“রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার গন্ধ লেগে আছে, আহা, কেঁদে-কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে।”
কবি তার গাঁয়ের দু-প্রহরকে ভালোবাসেন। কিন্তু সেই দ্বিপ্রহরের কথা বলতে গিয়ে যেসব অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন যেমন—ভাঙা মঠ, বুনো চালতা শাখা নুয়ে পড়া, ঝাঁঝরা-ফোঁপরা ডিঙি, রৌদ্রে ভিজে বেদনার গন্ধ—সে সব কিছু মিলে এক অসহায় বিষণ্ণতার ছবিই কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে।
‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ কবিতাটির ভাববস্তু আলোচনা করো।
কবি জীবনানন্দ দাশ গ্রামবাংলার কোলে বেড়ে ওঠা একজন কবি, ফলে গাঁয়ের প্রকৃতি তাঁর অনুভূতিতে সর্বদাই আলোড়ন তোলে। কবি স্মৃতির ডিঙিতে ভর করে চলে যেতে চান ফেলে আসা দিনগুলিতে। যেখানে তাঁর মনে জেগে ওঠে দ্বিপ্রহরের রোদের গন্ধ। সেই গন্ধে কত স্বপ্ন, কত গল্পকাহিনি লুকিয়ে আছে। তা আর কেউ না জানলেও কবির মতোই জানে গাঁয়ের প্রান্তর আর প্রান্তরের শঙ্খচিল, যাদের কাছে কবি কথা শিখেছেন বহু বহু যুগ ধরে—শুধু এই জন্মেই নয়। যে মেয়েটি নকশাপেড়ে শাড়ি পরেছিল রোদের মধ্যে, হলুদ পাতাদের ঝরে পড়ার মতো সেও ঝরে গেছে। বহুদিন ধরে একটি ঝাঁঝরা-ফোঁপরা ডিঙি হিজলের সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছে, মালিকের দেখা নেই; অথবা ছন্দহীনভাবে বুনো চালতা ঘাসের উপরে নুয়ে জলসিড়ি নদীর ধারে পড়ে আছে। সবেতেই একটা অযত্নের ছাপ কবির চোখে ধরা পড়েছে। তবুও ওই দ্বিপ্রহরকে কবি ভালোবাসেন। ওই দ্বিপ্রহরের ভিজে রোদে কত কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনাপূর্ণ গন্ধ অনুভব করেন কবি।
সমগ্র কবিতায় কবি যেমন তাঁর জন্মভূমির মমতাময় দ্বিপ্রহরের কথা তুলে ধরেছেন, তেমনই এক সীমাহীন বিষণ্ণতাও কবিতাটির সর্বাঙ্গ জুড়ে আছে।
‘কোনোদিন এই দিকে আসিবে না আর’—প্রসঙ্গসহ উক্তিটির তাৎপর্য আলোচনা করো।
প্রসঙ্গ – প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি জীবনানন্দ দাশের ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’ নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি তাঁর পাড়াগাঁর জীবনের চিত্র আলোচ্য কবিতায় তুলে ধরেছেন। কবি ভালোবাসতেন তাঁর পাড়াগাঁর দ্বিপ্রহরকে, কারণ দ্বিপ্রহরের বহু গল্পকাহিনির স্মৃতি তাঁর মনোজগৎকে আলোড়িত করে চলে। সেই প্রসঙ্গ ধরেই কবি আলোচ্য উদ্ধৃতিটির অবতারণা করেছেন।
তাৎপর্য – কবি দেখেন জলসিড়ি নদীর তীরে বহুকাল ধরে হিজল গাছের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে একটি ডিঙি নৌকা। ঝাঁঝরা-ফোঁপরা হয়ে আছে সেটি। কিন্তু কে যে ডিঙিটির মালিক তা জানেন না কবি, কারণ মালিক বহুদিন আসেনি ডিঙিটির কাছে। কবির অনুমান মালিক হয়তো আর কোনোদিনই আসবে না। সময় গড়িয়ে চলে অসীমের পানে। বহুসময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, হয়তো পাতা যেমন ঝরে পড়ে বৃন্ত থেকে, তেমনই মালিকও হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। তাই ডিঙি বাঁধাই রয়েছে হিজলে মালিকের দেখা নেই। নিদারুণ বিষণ্ণতার ছবি প্রকাশ করেছেন কবি প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মাধ্যমে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের অন্তর্গত ‘পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment