আমরা আমাদের আজকের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবিভাগ ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ থেকে কিছু বাছাই করা ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির স্কুলের ভূগোল পরীক্ষার (Class 8 Geography Exam) পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (Competitive Exams) প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাত কী? পাতসংস্থান তত্ত্বটি লেখো।
সংজ্ঞা – সিয়াল ও সিমা সহ পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগরীয় তলে অবস্থিত কতকগুলি কঠিন (Solid) ও অনমনীয় (Rigid) খণ্ড যা গুরুমণ্ডলের ওপর ভাসমান ও চলনশীল, এই খণ্ডগুলিকেই পাত (Plate) বলে।
পাতসংস্থান তত্ত্ব (Plate Tectonic Theory) –
প্রবক্তাগণ – 1960-এর দশকে উইলসন, মরগান, পিঁচো প্রমুখ ভূবিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফরাসি বিজ্ঞানী জেভিয়ার লে পিঁচো-র (Xavier Le Pichon) তত্ত্বটি উল্লেখযোগ্য।

তত্ত্ব বা মতবাদের উৎপত্তি – এই তত্ত্বটি প্রধানত দুটি মতবাদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল। যথা –
- মহাদেশসমূহের সঞ্চরণ (Continental Drift)।
- সমুদ্রবক্ষ বা সমুদ্রতলের সম্প্রসারণ (Seafloor Spreading)।
মূল বিষয়বস্তু – এই মতবাদ অনুসারে শিলামণ্ডলের উপরিভাগ বা ভূত্বক কয়েকটি পাত বা প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত। এই পাতগুলি গুরুমণ্ডলের উপরিভাগের অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসমান অবস্থায় আছে। ভূগর্ভস্থ ম্যাগমায় প্রচণ্ড চাপ ও তাপে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয়। এই স্রোতের প্রভাবেই পাতগুলি চলমান হয়।
পাতগুলির গতিশীলতার কারণ –
- ভূ-অভ্যন্তরস্থ গলিত ম্যাগমায় পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয়। তার ফলে পাতগুলি গতিশীল হয়।
- মহাদেশীয় পাতের তলায় মহাসাগরীয় পাতের অনুপ্রবেশের দরুন ঘর্ষণ সৃষ্টি হয় ও পাতগুলি গতিশীল হয়।
- পাতের ভারসাম্যহীনতার কারণেও পাতগুলি গতিশীল হয়।
- মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত শৈলশিরাও পাতগুলির বিপরীতমুখী গমনের জন্য দায়ী।
- ভূ-আলোড়নের ফলেও পাতের চলন ঘটে।
- ভূ-অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনের ফলে উদ্ভূত তাপশক্তির দ্বারাও পাতের চলন ঘটে।
পাতসমূহ –
পাত ভূগাঠনিক তত্ত্বানুযায়ী সমগ্র শিলামণ্ডল বা অশ্মমণ্ডলটি 6টি বৃহৎ বা প্রধান পাত (প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত, ইউরেশীয় পাত, আমেরিকান পাত, ভারত-অস্ট্রেলীয় পাত, আফ্রিকান পাত এবং আন্টার্কটিক পাত), 4টি মাঝারি পাত এবং 20টির অধিক ছোটো বা ক্ষুদ্র পাতে বিভক্ত আছে।
পাতসঞ্চালনের ফলাফল –
পাতগুলি গতিশীল হওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠে যেসব অবস্থার সৃষ্টি হয়, সেগুলি হল –
- দুটি পাত পরস্পরের থেকে দূরে সরে গেলে, সেখানে প্রথমে ভূমিকম্প, পরে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়।
- বিপরীতগামী দুটি সামুদ্রিক পাতের অপসারণের ফলে সমুদ্রের আয়তন বৃদ্ধি পায়।
- দুটি সামুদ্রিক পাতের সংঘর্ষের ফলে সমুদ্রের মাঝখানে সুগভীর সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয়।
- সামুদ্রিক পাত ও মহাদেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে পর্বত বা দ্বীপপুঞ্জের উৎপত্তি হয়।
- দুটি মহাদেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে তাদের মাঝখানে অবস্থিত সাগর ও উপসাগরের সঞ্চিত পাললিক শিলাস্তর ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। উদাহরণ – হিমালয় ও আল্পস্।
পাতের চলনের ফলে কী কী ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়?
অথবা, বিভিন্ন প্রকার পাত সীমানার চিত্রসহ বিবরণ দাও।
অথবা, অভিসারী ও অপসারী পাত সীমানায় পাতের চলনের প্রভাবে কী ঘটনা ঘটে?
পৃথিবীর পাতগুলি মূলত তিনভাবে সঞ্চারিত হয় এবং তিন ধরনের পাত সীমানার সৃষ্টি করে। যথা –
অভিসারী পাত সীমানা (Convergent Plate Margin) –
যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের দিকে এগোতে থাকে, তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে এবং এই পাত সঞ্চরণ অভিসারী পাতসঞ্চরণ নামে পরিচিত।
উদাহরণ – আমেরিকান পাত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের সীমানা।

ফলাফল ও সৃষ্ট ভূমিরূপ –
- এরূপ চলনের ফলে ভারী পাতটি হালকা পাতের নীচে প্রবেশ করে এবং কিছু অংশ অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে গলতে শুরু করে। তাই একে বিনাশকারী পাত সীমানা বলা হয়।
- এই পাত সীমানা বরাবর সামুদ্রিক খাতের সৃষ্টি হয়।
- দুটি পাতের অভিসারী চলনের ফলে মাঝের শিলাস্তরে ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি হয়। যেমন – হিমালয়।
- নীচে প্রবেশ করা পাতের গলিত পদার্থ সীমানা বরাবর বাইরে বেরিয়ে এসে একাধিক আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয়দ্বীপ সৃষ্টি করে।
- এই পাত সীমানা অস্থির হওয়ায় ভূমিকম্প হয়।
অপসারী পাত সীমানা (Divergent Plate Margin) –
যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পর থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে, তাকে অপসারী বা প্রতিসারী পাত সীমানা বলে এবং এরূপ পাতসঞ্চরণ প্রতিসারী পাতসঞ্চরণ নামে পরিচিত।
উদাহরণ – উত্তর আমেরিকান ও ইউরোপের পাত সীমানা।

ফলাফল ও সৃষ্ট ভূমিরূপ –
- দুটি পাত ক্রমশ পরস্পরের থেকে দূরে সরে গেলে মাঝের ফাটল বরাবর ভূ-অভ্যন্তর থেকে উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা উঠে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে নতুন ভূত্বক গঠন করে। তাই একে গঠনকারী পাত সীমানা বলে।
- সামুদ্রিক শৈলশিরার উৎপত্তি ঘটে।
- সমুদ্রবক্ষের বিস্তৃতি ঘটে।
নিরপেক্ষ পাত সীমানা (Conservative Plate Margin) –
যে পাত সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের সমান্তরালে পাশাপাশি সঞ্চারিত হয়, তাকে নিরপেক্ষ পাত সীমানা এবং এই সঞ্চরণকে নিরপেক্ষ পাতসঞ্চরণ বলে।
উদাহরণ – ক্যালিফোর্নিয়ার সান-আন্দ্রিজ চ্যুতি এই সীমানার উদাহরণ।

ফলাফল ও সৃষ্ট ভূমিরূপ –
- এরূপ পাত সীমানার কোনো নতুন ভূত্বক সৃষ্টি হয় না, আবার পুরোনো ভূত্বক ধ্বংস হয় না।
- এই অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠে দীর্ঘ ফাটল ও চ্যুতি সৃষ্টি হয়।
- এই সীমানায় প্রায়শই ভূমিকম্প ও ভূ-আলোড়ন ঘটে।
পাতসঞ্চরণ বা পাতের চলনের কারণগুলি লেখো।
পাতের চলনের প্রধান কারণগুলি হল –
- ম্যাগমা উত্থান – অপসারী পাত সীমানা বরাবর ম্যাগমার উত্থানের ফলে তা পার্শ্ববর্তী পাতদুটিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়, ফলে, পাত গতিশীল হয়।
- অভিকর্ষ টান (Gravitational Pull) – পাত সীমানা বরাবর যখন ম্যাগমা সঞ্চিত হয়ে শৈলশিরা সৃষ্টি করে, তখন তার পার্শ্বঢাল বরাবর অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে পাতের সঞ্চরণ হয়।
- পাতের নিমজ্জনজনিত টান – একটি পাতের যখন নিমজ্জন ঘটে তখন নিমজ্জিত প্রান্তের বিপরীত অংশে টানজনিত বলের সৃষ্টি হয় যা পাতগুলিকে সঞ্চালিত করে।
- পরিচলন স্রোত (Convectional current) – গুরুমণ্ডলে সৃষ্ট তাপের পরিচলন স্রোত যেখানে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দুদিকে ছড়িয়ে যায়, সেখানে পাতগুলি পরস্পর বিপরীত দিকে সরতে থাকে এবং যেখানে দুদিক থেকে আসা দুটি নিম্নমুখী পরিচলন স্রোতের মিলন ঘটে সেখানে পাতগুলিও পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে।
পরিচলন স্রোত (Convectional Current) সম্পর্কে লেখো।
সংজ্ঞা – পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপের অসমতার কারণে গুরুমণ্ডলে যে তাপপ্রবাহ দেখা যায়, তা পরিচলন স্রোত নামে পরিচিত।
পরিচলন স্রোতের প্রবক্তা – বিজ্ঞানী আর্থার হোমস্ 1944 সালে প্রথম পরিচলন স্রোতের কথা বলেন।
পরিচলন কক্ষ – পরিচলন স্রোতের প্রভাবে ম্যাগমা চেম্বারে অবস্থিত ম্যাগমা গতিশীল হয়ে পড়ে। এই গলিত পদার্থ ওপরে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে ভূত্বকের কাছাকাছি দুদিকে সরে যায়। অতঃপর ওই স্রোত নিম্নমুখী হয়ে পরিচলন কক্ষের (Convectional Cell) সৃষ্টি করে।
পরিচলন স্রোতের প্রভাব – পরিচলন স্রোতের প্রভাবেই পাতগুলি পরস্পর পরস্পরের কাছে আসে বা দূরে সরে যায়।

আমরা অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ থেকে যে ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি, তা অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের বা চাকরির পরীক্ষার্থীদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির স্কুল পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসতে দেখা যায়। আশা করি এই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি আপনাদের প্রস্তুতির জন্য উপকারী হয়েছে।
ধন্যবাদ।





Leave a Comment