আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায়, “ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধির রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
1891 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফেরার পর কিছুদিন গান্ধীজি মুম্বইয়ে আইন ব্যবসায় নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু পরের বছরেই আইন ব্যাবসার সূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল-এ চলে যান।
দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধিজির রাজনৈতিক জীবন –
- ব্রিটিশ সরকারের বর্ণবিদ্বেষ নীতি – ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখত। ভারতীয়দের তারা বলত অর্ধ বর্বর জাতি। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন গান্ধীজি ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা শুরু করেন। সেই বিরোধিতায় হাতিয়ার ছিল অহিংস সত্যাগ্রহ।
- গান্ধিজির প্রতিবাদ – 1906 খ্রিস্টাব্দে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ‘এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ বিধিবদ্ধ করেন, তখন গান্ধীজি এই অপমানকর আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। গান্ধিজির নেতৃত্বে বহু ভারতীয় ওই আইনের বিরোধিতা করে কারাবরণ করে—গান্ধীজি নিজে দু-মাসের জন্য কারারুদ্ধ হন। এই আন্দোলনের ফলে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এই আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এরপর 1913 খ্রিস্টাব্দে নিউ ক্যাসেল কয়লাখনি অঞ্চলের কয়েক হাজার ভারতীয় শ্রমিক গান্ধিজির নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ করে। গান্ধীজিকে গ্রেফতার করে নয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের প্রধান জেনারেল স্মার্টস গান্ধিজির সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন। 1914 খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত গান্ধি-স্মার্টস চুক্তির ফলে ভারতীয়দের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়।
2. ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধির আবির্ভাব কীভাবে হয়েছিল? গান্ধির আবির্ভাব কি সঠিক সময়ে হয়েছিল বলে তুমি মনে কর?
ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধির আবির্ভাব – ভারতীয় রাজনীতিতে আসার আগে মহাত্মা গান্ধি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হয়েছিলেন। এই আন্দোলন থেকে গান্ধিবাদী সত্যাগ্রহের ধারণা তৈরি হয়েছিল। এর পরেই তিনি ভারতে ফিরে আসেন। 1915 খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কয়েকটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে নরমপন্থী এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী তাদের আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন কিন্তু সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি। দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গণমুখী আন্দোলন পরিচালনা করার মতো একজন নেতাও সেই সময় ভারতীয় রাজনীতিতে ছিলেন না। সেই সময়ে চম্পারণ ও খেড়া সত্যাগ্রহের মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধির আবির্ভাব ঘটে।
মন্তব্য – আমার মনে হয় গান্ধিজির আবির্ভাব সঠিক সময়ে হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালনার অনেক নেতা ছিলেন। কিন্তু সমগ্র দেশকে পরিচালনা করার মতো একজন নেতা গান্ধিজির আবির্ভাবের আগে ছিলেন না। স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল বিভিন্ন মত ও বিভিন্ন ধারায়। গণমুখী আন্দোলন পরিচালনা করার মতো নেতা একমাত্র ছিলেন গান্ধীজি। তাঁরই আহ্বানে দেশের অগণিত মানুষ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। গান্ধিজির আহ্বান ভারতবাসীর কাছে ছিল মন্ত্রের মতো।
3. ‘অহিংস’ ও ‘সত্যাগ্রহ’ সম্পর্কে গান্ধিজির ধারণা কী ছিল? তোমার কি মনে হয় অহিংস অসহযোগ আন্দোলন গান্ধিজির আদর্শকে সফল করেছিল?
মহাত্মা গান্ধির ‘অহিংস’ ও ‘সত্যাগ্রহ’ এই আদর্শ দুটি একসঙ্গে ‘অহিংসা সত্যাগ্রহ’ নামে পরিচিত। গান্ধি মনে করতেন সত্যের খোঁজ করাই মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ফলে সত্যের প্রতি আগ্রহ বা সত্যের প্রতি নিষ্ঠা রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। গান্ধিজির আন্দোলনের চরিত্র ছিল গণমুখী। তিনি মনে করতেন, জনগণকে আন্দোলনে শামিল করলে অহিংস সত্যাগ্রহ সফল হবে।
অসহযোগ আন্দোলন ও গান্ধির আদর্শ –
গান্ধীজি হিংসার পথে আন্দোলন পরিচালিত করা পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন বেশিরভাগ মানুষকে আন্দোলনে শামিল করতে পারলে অহিংস সত্যাগ্রহ সফল হবে। জনগণকেও এই আদর্শের সঙ্গে একমত হতে হবে। শুধু তাই নয়, জনগণকে এই আদর্শ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন যখন দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল, ঠিক সেই সময়ে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরা গ্রামের হিংসাশ্রয়ী জনতা থানা আক্রমণ করেন এবং পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনায় মর্মাহত হয়ে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। তিনি মনে করেছিলেন, চৌরিচৌরার ঘটনা তাঁর আদর্শের পরিপন্থী।
4. ভারতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কী প্রভাব পড়েছিল?
1918 খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ঠিকই, কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এর ব্যতিক্রম ছিল না ভারতবর্ষও।
ভারতবর্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব –
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব –
- করের বোঝা – ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিপুল অর্থ যুদ্ধখাতে ব্যয় করে। তাই ভারতীয়দের ওপর চাপানো হয় অতিরিক্ত করের বোঝা। শুধু আয়করই বাড়ানো হয় 2 শতাংশ থেকে 11 শতাংশ। জাতীয় ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় 30 শতাংশ।
- আর্থিক মন্দা – 1929 খ্রিস্টাব্দের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার জের ভারতেও আছড়ে পড়ে। এর ফলে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- শিল্পের ক্ষতি – প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ভারতের বাজার বিদেশি পণ্যে ছেয়ে যায়। আবার দেশি পণ্যের ওপর অস্বাভাবিক শুল্কের বোঝা চাপানো হয়। তাতে দেশি শিল্পগুলি অচল হয়ে পড়ে।
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি – এই সময় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায় (80-100 শতাংশ)। অন্যদিকে কৃষিজ পণ্যের দাম হ্রাস পায়। যা এক অর্থনৈতিক অচলাবস্থার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব –
- প্রতিশ্রুতিভঙ্গ – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতকে সঙ্গে পেতে ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীকে যে সমস্ত সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সুযোগসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা যুদ্ধশেষে পালন করেনি। ফলে দেশে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ ধূমায়িত হয়।
- চরমপন্থার উদ্ভব – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে চরমপন্থা মতাদর্শ তথা বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে।
মন্তব্য – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এইভাবে ভারতীয় অর্থনীতিতে যেমন তৈরি হয় এক ভয়াবহ দৈন্যদশা, তেমনি রাজনৈতিক পরিবেশও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
5. মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের উদ্দেশ্য কী ছিল? এই আইনের শর্তাবলি উল্লেখ করো।
অথবা, টীকা লেখো – মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন।
ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসন সংস্কারের জন্য 1919 খ্রিস্টাব্দে যে সংস্কার আইন ঘোষণা করে, তা মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন নামে পরিচিত।
মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন –
উদ্দেশ্য – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয়দের সাহায্য লাভের জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিশ্রুতিতে বলা হয় যে, যুদ্ধ শেষে ভারতে দায়িত্বশীল সরকার গঠনে ভারতীয় প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। উপরন্তু সরকার ভারতের জন্য একটি শাসন-সংস্কার আইন বলবৎ করবে। এই উদ্দেশ্যে গঠিত হয় ‘মন্টেগু-চেমসফোর্ড কমিটি’। তাতে বলা হয়—
- শাসন বিভাগে ভারতীয়দের নিয়োগ করা হবে।
- ভারতে একটি দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা হবে।
- প্রাদেশিক সরকারগুলিতে ভারতীয়দের বেশি করে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
সংস্কার আইনের শর্তাবলি – এই আইনের শর্তাবলি নীচে উল্লেখ করা হল—
- মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা হয়, যথা—সংরক্ষিত বিষয় (পুলিশ-প্রশাসন, অর্থ, বিচার) এবং হস্তান্তরিত বিষয় (শিক্ষা, স্বাস্থ্য)।
- কেন্দ্রীয় আইনসভার হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। বড়লাট অর্ডিন্যান্স জারি করে তা করতে পারতেন। 7 জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় ‘কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহক পরিষদ’।
- কেন্দ্রে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয়। যথা—রাষ্ট্রীয় পরিষদ (নিম্নকক্ষ) ও আইনসভা (উচ্চকক্ষ)।
- উভয় কক্ষের সদস্যদের সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নির্বাচনের কথা বলা হয়।
সমালোচনা – এই আইন ভারতীয়দের আশাহত করে। কারণ—
- এর দ্বারা ভারতে কোনো দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হয়নি। বড়লাটের হাতেই আইন প্রণয়নের যাবতীয় ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল।
- প্রদেশগুলিতেও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
- আইনসভার সদস্য নির্বাচনে সর্বসাধারণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
- উপরন্তু সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচন করার জন্য স্বভাবতই সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে উস্কানি দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িক সংহতি ও জাতীয় ঐক্যের পথে তা সুখকর হয়নি।
6. মহাত্মা গান্ধিজির নেতৃত্বে পরিচালিত তিনটি সফল সত্যাগ্রহের পরিচয় দাও।
ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পূর্বে গান্ধিজি 1917-18 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনটি সত্যাগ্রহ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনগুলি সফলও হয়।
গান্ধিজির তিনটি সত্যাগ্রহ আন্দোলন –
- চম্পারণ আন্দোলন – বিহারের চম্পারণের কৃষকরা নীলকর সাহেবদের চাপে ‘তিন কাঠিয়া প্রথা’ অনুসারে বিঘা প্রতি 3 কাঠা জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য হত। তিনি মজরুল হক, আচার্য কৃপালনি, মহাদেব দেশাই প্রমুখ তরুণ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ‘তিন কাঠিয়া’ প্রথার বিরুদ্ধে চম্পারণের চাষিদের পাশে দাঁড়ান। শেষ পর্যন্ত সরকার ‘চম্পারণ কৃষি বিল’ দ্বারা তিনকাঠিয়া প্রথা রদ করে।
- খেড়া আন্দোলন – গুজরাটের খেড়া জেলায় গরিব কৃষকদের নিয়ে সরকারের রাজস্বনীতির বিরুদ্ধে গান্ধিজি যে ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন করেন তাতে তিনি সাফল্য পান।
- আমেদাবাদ আন্দোলন – এরপর গান্ধিজি গুজরাটের আমেদাবাদে ধর্মঘটী মিলশ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। এই আন্দোলনেও তিনি সাহায্য লাভ করেন। এই আন্দোলনের ফলে মিল মালিকরা শ্রমিকদের 35 শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব মেনে নেয়।
সাফল্য – সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সাফল্য পেয়ে গান্ধিজি দ্রুত ভারতীয়দের রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসেন। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, চম্পারণের সত্যাগ্রহ হল সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গান্ধিজির উত্থানের প্রথম পদক্ষেপ। ড. জুডিথ ব্রাউন বলেছেন যে, খেড়া সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গান্ধিজির রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছিল। যাই হোক, আসলে তিনি এই আন্দোলনগুলির মধ্য দিয়ে গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তদের যোগসূত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
7. চম্পারণ আন্দোলনের বিবরণ দাও।
সর্বভারতীয় রাজনীতিতে যোগদানের আগে 1917–1918 খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি তিনটি আঞ্চলিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই তিনটি আন্দোলন ছিল—চম্পারণ নীল আন্দোলন, গুজরাটের খেড়াতে কৃষকের খাজনা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন এবং আমেদাবাদ শ্রমিক আন্দোলন।
চম্পারণ নীল আন্দোলন –
আন্দোলনের কারণ – বিহারের চম্পারণ জেলার নীলচাষিরা বহুদিন ধরে নীলকর সাহেবদের দ্বারা অত্যাচারিত হচ্ছিল। তিন কাঠিয়া প্রথা অনুসারে এখানকার চাষিরা বিঘা প্রতি 3 কাঠা জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য হত। এই প্রথা বন্ধের দাবিতে চাষিরা সোচ্চার হয়।
গান্ধিজির নেতৃত্ব – এই অবস্থায় 1917 খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি চম্পারণ অভিমুখে যাত্রা করেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মজর-উল-হক, নরহরি পারিখ, আচার্য কৃপালনী প্রমুখের সঙ্গে নিয়ে গান্ধিজি চম্পারণে নীল চাষিদের সঙ্গে নিয়ে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। কিন্তু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গান্ধিজিকে চম্পারণ ত্যাগ করতে আদেশ দেন। গান্ধিজি এই আদেশ অমান্য করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। 1917 খ্রিস্টাব্দে 18 এপ্রিল তাঁর বিচার হয়। বিচারে সরকার গান্ধিজিকে মুক্তি দেয়।
ফলাফল/গুরুত্ব – বিচারে সরকার গান্ধিজিকে মুক্তি দিয়ে তাঁকেই চম্পারণ নীল চাষিদের অবস্থা অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়। সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটির বিচারে নীলচাষিদের বড় জয় হয়। এরপর সরকার দাবি মেনে নেয় এবং— i. ‘চম্পারণ কৃষি বিল’ দ্বারা তিনকাঠিয়া প্রথার অবসান ঘটায়। ii. এলাকার খাজনার হারও 20-25 শতাংশ হ্রাস করা হয়। iii. এই আন্দোলনই ভারতে গান্ধিজির নেতৃত্বে প্রথম ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন। iv. ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, চম্পারণ সত্যাগ্রহ হল সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গান্ধিজির উত্থানের প্রথম পদক্ষেপ।
8. খেড়া বা কায়রা সত্যাগ্রহ আন্দোলন (1918) সম্পর্কে কী জান?
1918 খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের খেড়া জেলায় খরা ও ফসলহানি সত্ত্বেও সরকার কৃষকদের ওপর রাজস্ব আদায়ে জোর দেয়। এই অবস্থায় মহাত্মা গান্ধি এখানকার কৃষকদের নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে খেড়া বা কায়রা সত্যাগ্রহের সূচনা করেন।
খেড়া সত্যাগ্রহের গুরুত্ব –
- সত্যাগ্রহের সাফল্য – প্রায় দু-সপ্তাহ ধরে খেড়া জেলার কৃষকরা সত্যাগ্রহ চালায়। শেষপর্যন্ত সরকার আন্দোলনকারীদের কাছে নতি স্বীকার করে। সরকার কৃষকদের অধিকাংশ দাবিদাওয়া মেনে নেয় এবং তাদের খাজনা মকুব করে।
- প্রথম প্রকৃত কৃষক সত্যাগ্রহ – ঐতিহাসিক হার্ডিম্যান একে ভারতের রাজনীতিতে ‘প্রথম প্রকৃত কৃষক সত্যাগ্রহ’ বলে অভিহিত করেছেন।
- নতুন রাজনৈতিক চেতনা – ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন—খেড়া সত্যাগ্রহ একটি আঞ্চলিক আন্দোলন হলেও এটি ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের চরিত্রের রূপান্তর ঘটিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যে রুখে দাঁড়ানো যায়, তা প্রমাণিত হয় এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
- জাতীয় আন্দোলনের পরিধি – খেড়া সত্যাগ্রহের মধ্য দিয়ে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এই মতের সমর্থক ড. জুডিথ ব্রাউন। তিনি বলেছেন—গান্ধিজি গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটা যোগসূত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মন্তব্য – খেড়া সত্যাগ্রহের সাফল্যের হাত ধরে গান্ধিজি দ্রুত ভারতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন ভারতীয় রাজনীতির মূল ভরকেন্দ্র।
9. রাওলাট আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কী ছিল? এর শর্তাবলি আলোচনা করো। এর ফল কী হয়েছিল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা না দেওয়ায় ভারতীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে ভারতে সকল প্রকার বৈপ্লবিক কার্যকলাপ ও রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের জন্য কুখ্যাত আইনজীবী সিডনি রাওলাট পাঁচ সদস্যের ‘সিডনি কমিশন’ (Sedition Committee) গঠন করেন। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার 1919 খ্রিস্টাব্দের 21 মার্চ ‘রাওলাট আইন’ নামে এক দমনমূলক আইন পাস করে।
শর্তাবলি –
- সরকারবিরোধী যে-কোনো প্রচার দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
- সমস্ত জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে হবে।
- সন্দেহজনক যে-কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটক করা যাবে।
- সরকারবিরোধী সভা-সমিতি বন্ধ করতে হবে।
- সরকার বিনা অনুমতিতে যে-কোনো ব্যক্তির ঘরবাড়ি তল্লাশি চালাতে পারবে। vi. এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা চলবে না।
প্রতিক্রিয়া –
এই আইন প্রবর্তনের ফলে ভারতীয়দের ব্যক্তিস্বাধীনতা নষ্ট হয়ে যায়। দেশময় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিলটি পাস হয়ে গেলে মহম্মদ আলি জিন্নাহ, মদনমোহন মালব্য প্রমুখ আইন পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। মহম্মদ আলি জিন্নাহ লেখেন—“যে সরকার শান্তির সময় এই ধরনের নির্মম আইনের আশ্রয় নিয়েছেন, সেই সরকার কখনোই নিজেকে সভ্য সরকার বলে দাবি করতে পারে না।” অমৃতবাজার পত্রিকা এই আইনকে ‘এক ভয়াবহ ভ্রান্তি’ (a gigantic blunder) বলে বর্ণনা করেছে। তিলক ‘কেশরী’ পত্রিকায় এই আইনকে ‘অত্যাচার উৎপীড়নের দানবীয় যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। গান্ধিজি রাওলাট আইনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন—‘উকিল নেহি, দলিল নেহি, আপিল নেহি’। ভারতবাসীর তীব্র অসন্তোষ সম্পর্কে বিপিনচন্দ্র বলেছেন— “The entire country was electrified.”
রাওলাট আইন ভারতবাসীকে ভীরুতার বদলে নতুন করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর থেকে গান্ধিজি ব্রিটিশ শাসনকে ‘শয়তান রাজ’ বলেছেন।
10. অসহযোগ আন্দোলনের কারণ আলোচনা করো।
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে 1920 খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধি পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কারণ এই প্রথম কংগ্রেস ‘স্বরাজ’ অর্জনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের কারণ –
- অর্থসংকট – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশ জুড়ে এক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বৃদ্ধি পায় বেকারত্ব। ফলে প্রকট হয় কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির চাপা অসন্তোষ।
- প্রতিশ্রুতিভঙ্গ – বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন বিভিন্ন উপনিবেশগুলিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্পণের কথা বলেন। ভারত এ ব্যাপারে উৎসাহিত হলেও যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
- সংস্কার আইনের ব্যর্থতা – 1919 খ্রিস্টাব্দের ‘মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন’ ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ফলে ভারতবাসী আশাহত হয়।
- রাওলাট আইন – ভারতীয়দের বিপ্লবাত্মক প্রয়াস ও সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার জন্য সরকার 1919 খ্রিস্টাব্দে দমনমূলক ‘রাওলাট আইন’ ঘোষণা করে।
- জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড – এরূপ পরিস্থিতিতে 1919 খ্রিস্টাব্দের জালিয়ানওয়ালাবাগের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঘৃতাহুতি দিয়েছিল।
- অসহযোগ প্রস্তাব – মর্মাহত গান্ধিজি 1920 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কংগ্রেসের এক বিশেষ অধিবেশনে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব রাখেন। তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। শেষপর্যন্ত ওই বছর 1 অক্টোবর গান্ধিজির নেতৃত্বে শুরু হয় অহিংস অসহযোগ আন্দোলন।
11. অসহযোগ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
1920 খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে সংগঠিত এবং পরিচালিত ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন ছিল ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
অসহযোগ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য –
- প্রত্যক্ষ সংগ্রাম – অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই প্রথম জাতীয় কংগ্রেস তার 35 বছরের ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি’ নীতি ত্যাগ করে সরকার-বিরোধিতার নীতি গ্রহণ করে।
- সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ – অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রথম শহুরে মধ্যবিত্তদের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামের মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
- দারিদ্র্যমোচন – ‘স্বরাজ’ আদর্শ দ্বারা গান্ধিজি কেবল ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি চাননি; তিনি অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন।
- নারীজাতির অংশগ্রহণ – এই আন্দোলনে বাসন্তী দেবী, সরোজিনী নাইডু, ঊর্মিলা দেবী প্রমুখ বঙ্গনারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে ভারতের জাতীয় আন্দোলন এক আলাদা মাত্রা পায়।
- সমাজসংস্কার – এই সময় জাতীয় কংগ্রেস মদ্যপান নিবারণ, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, জাতীয় শিক্ষার প্রসার প্রভৃতি বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
- গণ আন্দোলন – পরিশেষে, জওহরলাল নেহরুর সুরে সুর মিলিয়ে বলা যায় যে, এই আন্দোলন প্রকৃত অর্থে ছিল একটি ‘গণ আন্দোলন’, কারণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।
12. অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি সম্পর্কে কী জান?
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে 1920 খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত অসহযোগ আন্দোলন এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সারা দেশে দারুণ উদ্দীপনা সহকারে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়।
আন্দোলনের উদ্দেশ্য –
অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল—
- দমনমূলক রাওলাট আইন বাতিল করা।
- জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সরকারি কর্মচারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।
- খিলাফত সমস্যার সুষ্ঠু মীমাংসা করা।
- ভারতবাসীকে সাম্প্রদায়িকতা ও অস্পৃশ্যতার হাত থেকে রক্ষা করা।
- ভারতের স্বরাজ অধিকার অর্জন করা।
- সমস্ত সরকারি সভা ও সমিতি বর্জন করা।
- আইনসভা থেকে কংগ্রেসি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিরত থাকা।
- ভারতীয় সেনাদের বিদেশ যাত্রা থেকে বিরত করা ইত্যাদি।
আন্দোলনের কর্মসূচি –
এই আন্দোলনের কর্মসূচির দুটি দিক ছিল, যথা —
ইতিবাচক বা গঠনমূলক – অর্থাৎ, স্বাদেশিকতার প্রসার ঘটানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলা, তিলক স্বরাজ তহবিল স্থাপন, দেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা গড়ে তোলা এবং দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশি বোর্ড গঠন করা।
নেতিবাচক বা বর্জনমূলক –
- সরকারি আদালত, স্কুল-কলেজ, সরকারি উপাধি, বিলেতি পণ্য বর্জন করা।
- সরকারি আইনসভা ও তার নির্বাচন বর্জন করা ইত্যাদি।
13. অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ কী?
প্রবল উৎসাহের সঙ্গে দেশবাসী-গান্ধিজির ডাকে সাড়া দিয়ে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হয়। কিন্তু ক্রমে আন্দোলনে হিংসা প্রবেশ করে এবং দু-বছরের মধ্যেই এই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ –
- অহিংসা নীতি – সারা দেশজুড়ে যখন অসহযোগ আন্দোলন দারুণ উদ্দীপনা সহকারে পালিত হচ্ছে, ঠিক তখন চৌরিচৌরা হত্যাকাণ্ড ঘটে। আন্দোলনে হিংসা প্রবেশ করায় গান্ধিজি 1922 খ্রিস্টাব্দের 25 ফেব্রুয়ারি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
- ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা – এই আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আন্দোলন। গান্ধিজিই ছিলেন এই আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা। সুতরাং, তাঁর ইচ্ছায় ও নির্দেশে আন্দোলন যেমন শুরু হয়েছিল, তেমনি শেষও হয়েছিল।
- সমর্থনহীনতা – ড. বি. এন পান্ডের মতে এই আন্দোলন ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থনহীনতা। দেখা গেছে জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে অনেকেই সরকারি চাকরি, স্কুল, আদালত ইত্যাদিতে পুনরায় যোগদান করেছে।
- যৌথ আন্দোলন – অনেকের মতে, খিলাফত আন্দোলন-এর সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন যুক্ত করায় যৌথ আন্দোলনের গতি রুদ্ধ হয়। কারণ খিলাফতিরা গান্ধিজির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেনি।
মন্তব্য – সরকারি দমন নীতি ছিল এই আন্দোলনের ব্যর্থতার আরও একটি কারণ। গান্ধি সহ কংগ্রেসের বড়ো বড়ো নেতাদের সরকার গ্রেফতার করে। কংগ্রেসকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। মিটিং-মিছিল বন্ধ করা হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর চলে ব্যাপক ধরপাকড় ও নৃশংস অত্যাচার।
14. অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হল কেন? এর প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?
ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধি পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন ছিল প্রথম সর্ববৃহৎ গণ আন্দোলন। কিন্তু দু-বছর কাটতে না কাটতেই তিনি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
আন্দোলন প্রত্যাহারের কারণ –
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল 1922 খ্রিস্টাব্দের চৌরিচৌরা হত্যাকাণ্ড।
- চৌরিচৌরা হত্যাকাণ্ড – অসহযোগ আন্দোলন ধীরে ধীরে হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন চলাকালে সবচেয়ে হিংসাত্মক ঘটনা ছিল চৌরিচৌরা হত্যাকাণ্ড। 1922 খ্রিস্টাব্দের 5 ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামের পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ অসহযোগ আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর গুলি চালালে সত্যাগ্রহীরা উত্তেজিত হয়ে পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে এবং তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে 22 জন পুলিশকর্মী আগুনে পুড়ে মারা যায়।
- গান্ধিজির ব্যাখ্যা – এই চাঞ্চল্যকর ও হিংসাত্মক ঘটনায় গান্ধিজি অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি অনুধাবন করেন যে—
- অহিংস সংগ্রামের জন্য দেশ এখনও প্রস্তুত নয়।
- হিংসা বাড়লে সরকারও যে হিংস্র হয়ে উঠবে এবিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন।
- অপরপক্ষে সত্যাগ্রহের পূজারি গান্ধিজি কখনোই তাঁর অহিংস নীতি থেকে বিচ্যুত হতে চাননি। আন্দোলনে হিংসা প্রবেশ করলে তাই তিনি 1922 খ্রিস্টাব্দের 25 ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
প্রতিক্রিয়া –
গান্ধিজির এরূপ আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশবাসী হতাশায় ভেঙে পড়ে। ক্ষুব্ধ হন কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। সুভাষচন্দ্র বসু এর তীব্র নিন্দা করেছিলেন। তিনি গান্ধিজির এই সিদ্ধান্তকে ‘একটি পর্বত প্রমাণ ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধিজির এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় বিপর্যয় বলেছেন।
15. আইন অমান্য আন্দোলনের কারণ আলোচনা করো।
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে আইন অমান্য আন্দোলন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই আন্দোলন জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল।
আইন অমান্য আন্দোলনের কারণ –
- অর্থনৈতিক মন্দা – ভারতের বিপুল পরিমাণ অর্থ, জনসম্পদ ও রসদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য ব্যয় করা হয়। 1929 খ্রিস্টাব্দের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ভারতীয় অর্থনীতিতে দারুণ প্রভাব ফেলে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ভারতীয়গণ ক্ষুব্ধ হয়।
- রাজনৈতিক ঘটনাবলি – সমকালীন ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ভারতীয় রাজনীতিতে এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। যেমন— সরকারি দমননীতি ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতি, সাইমন কমিশনের ভারত বিরোধী নীতি, স্যান্ডার্স হত্যা, অনশনে বিপ্লবী যতীন দাসের মৃত্যু, কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব প্রভৃতি।
- গান্ধিজির প্রস্তাব – এই পরিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধি 1930 খ্রিস্টাব্দে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা মারফত সরকারের নিকট বন্দিমুক্তি, করের বোঝা হ্রাস ও লবণ কর বাতিল করা সহ মোট 11 দফা প্রস্তাব রাখলে বড়লাট লর্ড আরউইন তা বাতিল করে দেন।
- আন্দোলনের সূচনা – তাই গান্ধিজির সামনে আন্দোলন পরিচালনা করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। 1930 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের সবরমতী সম্মেলনে গান্ধিজির আইন-অমান্য আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই বছরই তিনি ডান্ডি অভিযান করেন এবং গুজরাটের ডান্ডি নামক স্থানে লবণ আইন ভঙ্গ করে আইন-অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন।
16. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণ নির্ণয় করো।
1942 খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কারণ এই আন্দোলন ছিল গান্ধিজি পরিচালিত ভারতবাসীর প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি ও কারণ –
- আগস্ট প্রস্তাবের ব্যর্থতা – বড়লাট লর্ড লিনলিথগো 1940 খ্রিস্টাব্দের 8 আগস্ট ঘোষণা করেন যে, সরকার ভারতীয়দের ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস প্রদান করবে। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস এই সময় ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পরিবর্তে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিল।
- ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতা – 1942 খ্রিস্টাব্দে ক্রিপসের প্রস্তাবও ব্যর্থ হয়। কারণ এই প্রস্তাবে সরাসরি ভারতীয়দের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়নি। ক্রিপসের প্রস্তাবে দেশভাগের ষড়যন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। তা ছাড়া প্রস্তাবিত সংবিধান সভায় নির্বাচন দ্বারা ভারতীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের কথা বলা হয়নি।
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। যার প্রভাব ভারতেও পড়ে। ফলে দেশে দেখা দেয় খাদ্য সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব। এই সমস্ত কারণে ভারতের সর্বশ্রেণির মানুষ অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।
- জাপানের আক্রমণের সম্ভাবনা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনায় ভীত হয়ে ভারতকে ‘যুদ্ধরত দেশ’ বলে ঘোষণা করে। এইভাবে ভারতকে অনাবশ্যকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে গান্ধিজি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন।
- প্রস্তাব গ্রহণ – এরূপ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সামনে সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। 1942 খ্রিস্টাব্দের 26 এপ্রিল গান্ধিজি ‘হরিজন’ পত্রিকায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই বছরই কংগ্রেসের ওয়ার্ধা অধিবেশনে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
17. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও তার ব্যর্থতার কারণ নির্ণয় করো।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল শেষ পর্বে সংঘটিত 1942 খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব বা ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন। কারণ, এই আন্দোলন ছিল গান্ধিজি পরিচালিত প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য –
- স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে প্রথম দেখা যায় জনজাগরণ, অর্থাৎ আন্দোলনের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা শহরের সীমা অতিক্রম করে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
- কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্দোলন ছিল হিংসাশ্রয়ী, তবে তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। সরকারি দমননীতি উপেক্ষা করে মানুষ বহুস্থানে গড়ে তোলে গণপ্রতিরোধ। অনেক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় সরকার’।
- 1942 খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব সর্বভারতীয় গণ আন্দোলনের রূপ পেলেও, দক্ষিণ ভারতে আন্দোলনের প্রভাব তেমন পড়েনি।
- এই আন্দোলন ছিল মহাত্মা গান্ধি পরিচালিত প্রথম ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’।
- গবেষক জ্ঞানেন্দ্র পান্ডের মতে, গান্ধিজি এই গণ আন্দোলনে দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তবে একথা সত্য যে, গান্ধিজি কখনোই অহিংসার পথ থেকে বিচ্যুত হননি। আসলে এই আন্দোলনের চরিত্র ছিল দুটি বিপরীতধর্মী মনোভাবের মিশ্রণ।
ব্যর্থতার কারণ –
নানা কারণে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্যর্থ হয়, যেমন—
- প্রথমেই বলা দরকার যে, গান্ধিজিসহ কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ব্রিটিশের জেলে আটক ছিলেন। তাই আন্দোলনকারীরা নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার গান্ধিজির অনুপস্থিতিকেই এই আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দেখেছেন।
- রাহুল সংকৃত্যায়নের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, কমিউনিস্ট পার্টি, মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি দল ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন সমর্থন করেনি।
- 1943 খ্রিস্টাব্দের বাংলার ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের দরুন আন্দোলনে ভাটা পড়ে। এই সময় কংগ্রেসি স্বেচ্ছাসেবীগণ আন্দোলন থেকে সরে এসে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
- সরকারি দমননীতিতে আন্দোলনকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। পুলিশি অত্যাচার চরমে পৌঁছোয়। এই সময় সারাদেশে 60 হাজারের বেশি বিদ্রোহীকে বন্দি করা হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন প্রায় 740 জন বিদ্রোহী।
18. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব লেখো।
দারুণ উদ্দীপনা সহকারে গান্ধিজির ডাকে 1942 খ্রিস্টাব্দে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলেও নানা কারণে তা ব্যর্থ হয়। ব্যর্থ হলেও ভারতীয় রাজনীতিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব –
- স্বাধীনতা আন্দোলন – ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ভারতবাসীর প্রকৃত স্বাধীনতা আন্দোলন। কারণ, গান্ধিজি ইংরেজদের ভারত ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, তারা এদেশ না ছাড়লে সারা দেশে আগুন জ্বলবে। তিনি আরও বলেন যে, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এটিই হবে দেশবাসীর ‘চূড়ান্ত সংগ্রাম’। তাই তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’।
- গণ আন্দোলন – গান্ধিজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতবাসী ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শামিল হয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও গণ উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল, তা ছিল একটি জাতীয়তাবাদী গণ আন্দোলনেরই প্রতিচ্ছবি। এই মতের সমর্থক হলেন গবেষক জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি – মুসলিম লিগ ভারত ছাড়ো আন্দোলন বয়কট করলেও দেশের বৃহত্তর মুসলিম সমাজ হিন্দুদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই গণ আন্দোলনে শামিল হয়। ফলে নানান প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই সময় ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট ছিল।
- স্বাধীনতার পথ প্রস্তুত – এই আন্দোলনে ভারতীয়দের স্বতঃস্ফূর্ততা ও একতার ভাব দেখে ব্রিটিশ সরকারের বুঝতে দেরি হয়নি যে, এদেশে তাদের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। একথা বলেছিলেন স্বয়ং লর্ড ওয়াভেল।
মন্তব্য – পরিশেষে ঐতিহাসিক অম্বা প্রসাদের সুরে সুর মিলিয়ে বলা যায় যে, 1942 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা 1947 খ্রিস্টাব্দের ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তি প্রস্তুত করে।
19. গান্ধিজি অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলন সমন্বয়সাধন করেছিলেন—এর যৌক্তিকতা বিচার করো।
1918 খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি পরাজিত তুরস্কের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তুরস্ককে খণ্ডিত করে। তুরস্কের সুলতান ছিলেন মুসলিম দুনিয়ার ধর্মগুরু বা খলিফা। সুলতানের সিংহাসনচ্যুতি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। এই ক্ষোভ থেকেই মুসলমানদের মধ্যে খিলাফত আন্দোলনের জন্ম হয়।
খিলাফত আন্দোলনকে সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে পরিণত করার জন্য গান্ধিজি কংগ্রেসকে খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করার প্রস্তাব দেন। গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনকে যুক্ত করে যৌথ আন্দোলন আরম্ভ করেন।
যৌক্তিকতা –
সমালোচকদের মতে, গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফতকে যুক্ত করে মারাত্মক ভুল করেন কারণ—
- খিলাফত আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল খলিফার সিংহাসন ফিরিয়ে দেওয়া। এই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের কোনো সম্পর্কই ছিল না। এটি ছিল ভারতের বাইরের আন্দোলন।
- খিলাফত আন্দোলন ধর্মভিত্তিক আন্দোলন। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, খিলাফত আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠতে পারেনি। ইসলামের মর্যাদা রক্ষাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তাই কংগ্রেসের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় দাবিকে সমর্থন করে আন্দোলনে অবতীর্ণ হওয়া উচিত হয়নি।
- দুটি ভিন্ন আদর্শের আন্দোলনকে একত্রিত করে গান্ধিজি পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধি ঘটান। গান্ধিজি হিন্দু-মুসলিম ঐক্য বৃদ্ধি করতে গিয়ে পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে জোরদার করে তোলেন।
- গান্ধিজির আকস্মিক মত পরিবর্তন মুসলিম সমাজকে বিক্ষুব্ধ করে।
মূল্যায়ন – এইসব সমালোচনার উত্তরে বলা যায়, গান্ধিজির লক্ষ্য ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপন ও জাতীয় সংহতি রক্ষা, যা খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করার মাধ্যমে সম্ভবপর হয়েছিল। এর আগে পর্যন্ত মুসলিম সমাজ সরকারের অনুগত ছিল, কিন্তু এই আন্দোলনের মাধ্যমে সেই আনুগত্যে ফাটল ধরে।
20. খান আবদুল গফ্ফর খান – টীকা লেখো।
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে খান আবদুল গফ্ফর খান এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তি। তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আইন অমান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
খান আবদুল গফ্ফর খান –
- খান আবদুল গফ্ফর খানের আদর্শ – খান আবদুল গফ্ফর খান ছিলেন একজন গান্ধিবাদী নেতা। তিনি ছিলেন গান্ধিজির অহিংসা নীতির পূজারী। পাঠান উপজাতিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও অহিংসার আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন।
- দল গঠন – তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পাঠান উপজাতিদের নিয়ে ‘খোদা-ই-খিদমতগার’ (বা ঈশ্বরের সেবক) নামক এক দল গড়ে তোলেন। তাঁর দলের সদস্যরা লাল কোর্তা পরিধান করত বলে এই দল ‘লালকোর্তা বাহিনী’ নামে পরিচিত হয়।
- কার্যকলাপ – 1931 খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আইন অমান্য আন্দোলন জোরদার হয়। ওই অঞ্চলে সর্বত্র জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সভা-সমিতি, মিটিং, মিছিল, শোভাযাত্রা প্রভৃতি কর্মসূচি গৃহীত হয়। পুলিশের লাঠি ও গুলি উপেক্ষা করে মানুষ এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেয়।
মূল্যায়ন – খান আবদুল গফ্ফর খানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও তাঁর গান্ধিবাদী আদর্শের জন্য তিনি ভারতীয় ইতিহাসেই ‘সীমান্ত গান্ধি’ নামে পরিচিত। শুধু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়, তিনি সেবামূলক কাজেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এজন্য তিনি গড়ে তোলেন ‘আঞ্জুমান-ই-ইসলাহ্ আফগানিয়া’ (Anjuman-e-Islah-e-Afghania) নামক একটি প্রতিষ্ঠান।
21. ‘রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান’ বা ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ সম্পর্কে লেখো।
বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তাঁদের বিপ্লবী আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব হল ‘রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান’।
বিনয়-বাদল-দীনেশ –
- বিপ্লবী কার্যকলাপ – ঢাকা মেডিকেল কলেজের কৃতি ছাত্র ছিলেন বিপ্লবী বিনয় বসু। 1930 খ্রিস্টাব্দে তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর লেম্যানকে (Lowman) গুলি করে হত্যা করেন। কুখ্যাত পুলিশ অফিসার হাডসন (Hudson) অল্পের জন্য রক্ষা পান। এই ঘটনার পর বিনয় বসু কলকাতায় চলে আসেন। এখানে তিনি বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ (Bengal Volunteers) দলে যোগদান করেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বাদল গুপ্তের সাক্ষাৎ হয়।
- রাইটার্স অভিযান – পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁরা রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুসারে 1930 খ্রিস্টাব্দের 8 ডিসেম্বর পুলিশের ছদ্মবেশে তাঁরা রাইটার্স বিল্ডিং-এ প্রবেশ করেন। বিনয় বসু কারা বিভাগের কুখ্যাত ইনস্পেক্টর সিম্পসনকে (Simpson) গুলি করে হত্যা করেন।
- অলিন্দ যুদ্ধ – সিম্পসনকে হত্যার পর তাঁরা ‘বন্দে-মাতরম্’ ধ্বনি দিতে দিতে পূর্বদিকের বারান্দায় ছুটে যান। এখানেই নেলসন, মার, প্রেনটিস প্রমুখ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে বিনয়-বাদল-দীনেশের গুলি বিনিময় হয়। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট (Tegart) বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিং ঘিরে ফেলেন। পুলিশ ইনস্পেক্টর গ্রেগের (Gregg) নেতৃত্বে একদল পুলিশ রাইটার্সের মধ্যে প্রবেশ করেন। তাঁদের সঙ্গেই বিপ্লবীরা রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বারান্দায় লড়াই-এ লিপ্ত হন। কিন্তু একসময় বিপ্লবীদের গুলি ফুরিয়ে আসে। তাই ধরা পড়ার আগে তাঁরা আত্মহত্যার পরিকল্পনা নেন। বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। বিনয় বসু ও দীনেশ গুপ্ত মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বিনয় বসু মারা যান। কিছুদিন চিকিৎসার পর দীনেশ গুপ্ত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়।
22. ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে মাস্টারদা সূর্য সেনের ভূমিকা নির্ণয় করো।
ভূমিকা – ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। তাঁরই নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন হয়।
সূর্য সেন ও তাঁর বিপ্লবী কার্যকলাপ –
- বিপ্লবী দল গঠন – এদেশ থেকে ব্রিটিশদের উৎখাত করার জন্য সূর্য সেন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি 64 জন বিপ্লবী ভাই-বোনদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বাহিনী’ (Indian Republican Army)। এই বাহিনীর উল্লেখ্য সদস্য-সদস্যাগণ ছিলেন—লোকনাথ বল, গণেশ ঘোষ, নির্মল সেন, অনন্ত সিংহ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাস প্রমুখ।
- চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন – 1930 খ্রিস্টাব্দের 18 এপ্রিল ভারতীয় বিপ্লববাদের এক স্মরণীয় দিন। ওইদিন রাত্রি 10টায় ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বাহিনী 4টি দলে বিভক্ত হয়। অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একটি দল চট্টগ্রামের পুলিশের অস্ত্রাগার লুঠ করে। সেখান থেকে তাঁরা প্রচুর রাইফেল, রিভলবার, গাদা বন্দুক লুণ্ঠন করেন। আর-একদল বিপ্লবীরা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে পুলিশ লাইনে পৌঁছোন এবং সেখানে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবীদের তুমুল লড়াই হয়। প্রীতিলতাকে গ্রেফতার করতে এলে সে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে।
- জালালাবাদের লড়াই – অন্যদিকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী চট্টগ্রাম মুক্ত করতে তৎপর হয়। এই অবস্থায় বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের কাছে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। 1930 খ্রিস্টাব্দের 22 এপ্রিল বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ঘটনাস্থলেই 11 জন বিপ্লবী মারা যান। ব্রিটিশের পক্ষে 64 জন নিহত হয়।
- সূর্য সেনের ফাঁসি – চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদের লড়াইয়ের পর ব্রিটিশ বাহিনী মাস্টারদা ও তাঁর বাহিনীকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার মামলা শুরু হওয়ার পর সূর্য সেন মাইন ফাটিয়ে জেলের পাঁচিল উড়িয়ে দিয়ে বন্দিদের মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। নেত্র সেন নামে এক বিশ্বাসঘাতক 1933 খ্রিস্টাব্দে সূর্য সেনকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়। 1934 খ্রিস্টাব্দের 12 জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হয়। এইভাবে সমাপ্ত হয় ভারতমাতার বিপ্লবী সন্তানদের এক বীরত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক অধ্যায়।
23. ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব আলোচনা করো।
1942 খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজির ডাকে একদিকে ভারতে যখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন চলছে, অন্যদিকে সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’। ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো (Linlithgow) ভারতকে জার্মানির বিরুদ্ধে একতরফা ‘যুদ্ধরত দেশ’ বলে ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল।
রাজনীতি –
বিশ্বযুদ্ধে জাপান যোগ দিয়েছিল 1941 খ্রিস্টাব্দে। এর ফলে ভারতবর্ষ জাপানের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ইংরেজ ভয় পায়। ভারতের সামগ্রিক সাহায্য পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার উদগ্রীব ছিল। এই অবস্থায় সরকার ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য 1942 খ্রিস্টাব্দে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস-এর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছিল।
- ক্রিপসের প্রস্তাব –
- যুদ্ধের পর ভারতকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হবে।
- ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সভা গঠন করা হবে এবং ওই সভাই ভারতের জন্য নতুন সংবিধান তৈরি করবে। ক্রিপসের প্রস্তাব ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দল প্রত্যাখ্যান করে।
- নেতাজির ভূমিকা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে নেতাজি ইংরেজ বিরোধী শক্তি জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। এজন্য তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর ‘দিল্লি চলো’ আহ্বানে দেশবাসী উদ্বেলিত হয়েছিল। দেশকে ইংরেজ শাসন মুক্ত করতে না-পারলেও তাঁর আত্মত্যাগ ভারতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অর্থনীতি –
- খাদ্য সংকট – যুদ্ধের ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ ছাড়া 1943 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মন্বন্তরে বহু মানুষ মারা যায়। ছোটো ছোটো ব্যবসায়ী, শিল্পী, শ্রমিক কাজ না-পেয়ে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়ে। কালোবাজারি, মজুতদারি দেশের খাদ্য সংকটকে ভয়াবহ করে তোলে।
- মুদ্রাস্ফীতি – খাদ্য ও বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ফলে জিনিসপত্রের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। কিন্তু মন্বন্তরের মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
24. 1939 খ্রিস্টাব্দের ত্রিপুরী কংগ্রেসের গুরুত্ব লেখো।
ভারতের ইতিহাসে 1939 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গান্ধিজি ছিলেন কংগ্রেসের অবিসংবাদী নেতা। সেই সময় কংগ্রেসের মধ্যে বামমনোভাবাপন্ন একদল যুবনেতার উত্থান হয়। 1938 খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসু সর্বসম্মতভাবে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরের বছর ত্রিপুরী কংগ্রেসের অধিবেশনেও 8 জন বিক্ষুব্ধ বামপন্থী নেতা পুনরায় সুভাষচন্দ্রকে সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত করতে চাইলে গান্ধিজি ও তাঁর অনুগামী দক্ষিণপন্থীরা এর বিরোধিতা করেন। গান্ধিজি সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে পট্টভি সীতারামাইয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড় করান। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসু জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি পদে নিযুক্ত হন।
গুরুত্ব –
- ত্রিপুরী কংগ্রেসের নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র বসু 203 ভোটের ব্যবধানে সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হয়ে বামশক্তির উত্থান ঘটান।
- গান্ধিজি নিজের মনোনীত প্রার্থীর পরাজয়ের শোকে বলে ফেলেন– “সীতারামাইয়ার পরাজয় আমার পরাজয়।” সুভাষচন্দ্র বসু সভাপতি নির্বাচিত হলেও গান্ধিজি ও তাঁর অনুগত দক্ষিণপন্থীরা সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তীব্র অসহযোগিতা শুরু করেন।
- সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল প্রমুখ গান্ধি অনুগামীরা এই সময় সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতা করে ওয়ার্কিং কমিটি থেকে ইস্তফা দেন।
- সুভাষচন্দ্র বসু বাধ্য হয়ে 1939 খ্রিস্টাব্দের 29 এপ্রিল নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির পদ থেকে ইস্তফা দেন।
- এরপর সুভাষচন্দ্র 1939 খ্রিস্টাব্দের 3 মে কংগ্রেসের মধ্যেই ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ নামক একটি আলাদা দল গঠন করেন।
- কংগ্রেস থেকে তিন বছরের জন্য তাঁকে নির্বাসিত করা হলে তিনি আর কংগ্রেসে ফিরে আসেননি।
সুভাষচন্দ্র বসু ঘোষণা করেন– “ভারতে শ্রেষ্ঠ মানুষটির সমর্থন লাভে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তাই তিনি পদত্যাগ করছেন।”
25. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভূমিকার মূল্যায়ন করো।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ লগ্নে আজাদ হিন্দ বাহিনীর উত্থান একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রাম ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ ফৌজ –
আজাদ হিন্দ বাহিনী ও নেতাজি – 1942 খ্রিস্টাব্দের 1 সেপ্টেম্বর রাসবিহারী বসু জাপানিদের হাতে বন্দি ভারতীয় সেনাদের নিয়ে ‘আজাদ-হিন্দ-বাহিনী’ গড়ে তোলেন। পরের বছর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মনোনীত হন। এরপর তিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীকে উন্নত ও শক্তিশালী করে তুলতে মনোযোগী হন। তিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীকে আজাদ-ব্রিগেড, ঝাঁসি ব্রিগেড, গান্ধি ব্রিগেড, নেহেরু ব্রিগেড, সুভাষ ব্রিগেড প্রভৃতি বিভাগে বিভক্ত করেন। প্রবাসী ভারতীয়গণ নেতাজির ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। তাঁদের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় ‘আজাদ-হিন্দ-বাহিনী’ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর অভিযান – 1943 খ্রিস্টাব্দের 21 অক্টোবর ‘আজাদ হিন্দ বাহিনী’ সিঙ্গাপুরে ‘স্বাধীন ভারত সরকার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর নেতাজি ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি দেশবাসীকে এই যুদ্ধে শামিল হতে আহ্বান জানান। ফলে দেশে ও বিদেশে ভারতবাসীর মধ্যে এক নজিরবিহীন উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। 1944 খ্রিস্টাব্দের 4 জানুয়ারি রেঙ্গুনে উক্ত সরকারের প্রধান সামরিক দপ্তর স্থাপিত হয়। এরপর আজাদ হিন্দ বাহিনী ভারত আক্রমণের ডাক দেয়। 19 মার্চ আজাদ হিন্দ বাহিনী ইম্ফল হয়ে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায় পৌঁছোয়। সেখানে তাঁরা ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন।
আত্মসমর্পণ – কিন্তু 1945 খ্রিস্টাব্দের 15 আগস্ট জাপান মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করার ফলে আজাদ হিন্দ বাহিনীর অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। নেতাজির নির্দেশে আজাদ হিন্দ বাহিনী মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর অবদান – আজাদ হিন্দ বাহিনীর উত্থান ব্যর্থ হলেও ভারতের মুক্তি আন্দোলনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, কারণ—
- দেশ ও বিদেশে আজাদ হিন্দ বাহিনী যে দেশপ্রেম, ত্যাগ, সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও বীরত্বের আদর্শ রচনা করেছিলেন, তা জাতীয় জীবনে এনেছিল মুক্তির স্বাদ।
- আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরত্ব ও ত্যাগের আদর্শ ভারতীয় নৌবাহিনীকেও উজ্জীবিত করে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাঁরাও 1946 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলে ধরে।
- ব্রিটিশ সরকারের একথা বুঝতে দেরি হয়নি যে এদেশে তাদের সাম্রাজ্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে।
- ব্যতিক্রম ছিল না ছাত্র-যুব সম্প্রদায়। আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরত্ব তাদেরও অনুপ্রাণিত করে। আজাদ হিন্দ বাহিনীর ধৃত সেনাদের বিচারের প্রতিবাদে এবং বরেণ্য দেশ সেবকদের মুক্তির দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে।
26. ভারতের মুক্তিসংগ্রামে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তথা আজাদ হিন্দ বাহিনীর অবদান কী?
সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর উত্থান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর অবদান –
- জাতীয় চেতনার স্ফূরণ – নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম দেশবাসী ও প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে এক গণ উন্মাদনা সৃষ্টি করে। সুভাষচন্দ্র বসু ঘোষণা করেন, “তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” তাঁর আহ্বানে দেশবাসী উদ্বেলিত হয়।
- সাম্প্রদায়িক ঐক্য – আজাদ হিন্দ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে। তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুর দেশপ্রেমের আদর্শ। সেখানে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি বা প্রাদেশিক সংকীর্ণতা ছিল না। সকলেরই লক্ষ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা। ফলে আজাদ হিন্দ বাহিনীর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মধ্যে এক গভীর ঐক্যানুভূতি গড়ে ওঠে।
- নৌবিদ্রোহের সূচনা – একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীর সেনাদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম দেখে নৌবিদ্রোহীরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মাত্র 6 দিন ধরে চলেছিল এই বিদ্রোহ। আর তাতেই ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করেছিল যে, এদেশে ব্রিটিশ শক্তিরও দিন শেষ।
- ছাত্র আন্দোলন – আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরগাথা যতই প্রকাশিত হতে থাকে, ভারতের ছাত্র সমাজ ততই স্বাধীনতা চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে থাকে। তার প্রমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ভারতের ছাত্র আন্দোলন। 21 নভেম্বর বাংলায় ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়। 1946 খ্রিস্টাব্দের 12 ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পালিত হয় ‘রশিদ আলি দিবস’।
27. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান লেখো।
“ভিক্ষায় কোনোদিন স্বাধীনতা আসে না, রক্ত না ঝরালে কখনও স্বরাজ পাওয়া যায় না।” এই ক্ষাত্রবাণী ঘোষণার দ্বারা ভারতমায়ের শৃঙ্খলমোচনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র বসুর আবির্ভাব ঘটে। তাঁর আবির্ভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়। ড. রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন— “নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এমন একজন দেশপ্রেমিক যিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাতির সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।” মহাত্মা গান্ধী সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘a patriot of the patriot’ বলে অভিহিত করেছেন।
- প্রথমজীবন – সুভাষচন্দ্র বসু 1897 খ্রিস্টাব্দের 23 জানুয়ারি কটকে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জানকীনাথ বসু ও মা প্রভাবতী দেবী। আই.সি.এস. পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান পেয়েও লোভনীয় চাকরি পরিত্যাগ করে দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনে আত্মনিয়োগ করেন।
- রাজনীতিতে অংশগ্রহণ – দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, অরবিন্দ ঘোষ ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন। 1921 খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। কিন্তু সাফল্যের মুহূর্তে অসহযোগ আন্দোলন বন্ধের নির্দেশ দিলে গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তীকালে চিত্তরঞ্জন দাশের শিষ্যরূপে স্বরাজ্য দলে যোগদান করেন।
- ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন – ত্রিপুরি কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে গান্ধী-সুভাষ দ্বন্দ্ব শুরু হলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে 1939 খ্রিস্টাব্দে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন। তিনি চেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ স্বরাজের লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করতে।
- আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ও দায়িত্ব গ্রহণ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে 1942 খ্রিস্টাব্দে রাসবিহারী বসু আজাদ হিন্দ বাহিনী (I.N.A) গঠন করেন। 1943 খ্রিস্টাব্দে রাসবিহারী বসু I.N.A-এর দায়িত্ব সুভাষচন্দ্রের হাতে তুলে দেন। আজাদ হিন্দ বাহিনী তাঁকে ‘নেতাজি’ আখ্যায় ভূষিত করে।
- আজাদ হিন্দ বাহিনীর পুনর্গঠন – আজাদ হিন্দ বাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে তিনি একে পুনর্গঠন করেন। শাহনওয়াজ খান, হাবিবুর রহমান, জি.এস. ধীলন, লক্ষ্মী স্বামীনাথন প্রমুখ সঙ্গী নিয়ে তিনি এই বাহিনীকে পাঁচটি ব্রিগেডে ভাগ করেন। যথা— লক্ষ্মী ব্রিগেড, গান্ধী ব্রিগেড, আজাদ ব্রিগেড, নেহরু ব্রিগেড ও সুভাষ ব্রিগেড নামে।
- আজাদ হিন্দ বাহিনীর অভিযান – 1943 খ্রিস্টাব্দের 21 অক্টোবর সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ 9টি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। সুভাষচন্দ্র বসু বলেন— “দিল্লির পথ স্বাধীনতার পথ, দিল্লি চলো।” রেঙ্গুনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে এই বাহিনী ইম্ফল ও কোহিমা দখল করে। ভারত ভূখণ্ডের প্রায় 150 মাইল এলাকা তারা দখল করে নেয়।
জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করলে জাপান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। জাপানের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হলে আজাদ হিন্দ বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়। 1945 খ্রিস্টাব্দের 15 আগস্ট জাপান মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করলে আজাদ হিন্দ বাহিনীও আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। তথাপি নেতাজি ঘোষণা করেন— “পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা ভারতকে পদানত রাখতে পারে। ভারত স্বাধীন হবে।”
মূল্যায়ন – আজাদ হিন্দ ফৌজ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে না পারলেও দেশমাতৃকার মুক্তি অর্জনে যে আত্মত্যাগ তারা প্রদর্শন করেছিল তা সমগ্র দেশবাসীর মনে প্রবল উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটায়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন— “আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈনিকদের মৃত্যু বৃথা যায়নি।” ব্রিটিশ লেখক ফিলিপ ম্যাসনের মতে, “আজাদ-হিন্দ-বাহিনীর ধৃত সেনাদের বিচার ব্রিটিশ শাসনের অবসান অবধারিত করে তুলেছিল।”
28. আজাদ হিন্দ বাহিনীর মুক্তির দাবিতে কলকাতায় যে ছাত্র আন্দোলন হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
ভূমিকা – আজাদ হিন্দ বাহিনীর ধৃত 20 হাজার সেনাদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ এনে ব্রিটিশ সরকার দিল্লির লালকেল্লায় তাঁদের বিচারের আয়োজন করে। এই বিচারের বিরুদ্ধে কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন জোরদার হয়।
কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন –
- পুলিশের গুলি – 1945 খ্রিস্টাব্দের 21 নভেম্বর কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র কংগ্রেস’, ‘ছাত্রব্লক’, ‘ছাত্র ফেডারেশন’ এবং ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রবৃন্দ। তারা মিছিল করে ডালহৌসি স্কোয়ারে ঢুকতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। নিহত হয় একজন ছাত্র। পরের দু-দিনও চলে ব্যাপক গোলমাল। ছাত্র আন্দোলন বন্ধ করতে পুলিশ আবার গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে 33 জন ছাত্র সহ বহু লোক আহত হয়।
- রশিদ আলি দিবস – ক্যাপটেন রশিদ আলির 7 বছরের কারাদণ্ডাদেশ ঘোষিত হলে কলকাতায় ছাত্রসমাজ আন্দোলনে শামিল হয়। 1946 খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ কলকাতা আবার উত্তপ্ত হয়। রশিদ আলির মুক্তির দাবিতে মুসলিম ছাত্র লিগ সহ হিন্দু ছাত্ররাও ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটীদের উপর পুলিশ গুলি চালালে, 12 ফেব্রুয়ারি কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রশিদ আলি দিবস পালিত হয়।
- স্বরূপ – ওইদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দেন হোসেন সুরাবর্দী, সোমনাথ লাহিড়ী প্রমুখ নেতা। এরপর লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল ডালহৌসি স্কোয়ারের দিকে অগ্রসর হয়। অবস্থা বেগতিক বুঝে ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে নিরস্ত্র মিছিলের ওপর গুলি চালায়। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়।
ফলাফল – ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকলাপে সরকার পিছু হঠতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের বিচার বাতিল করতে সরকার বাধ্য হয়।
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায়, “ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





Leave a Comment