অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: অস্থিত পৃথিবী (পাতসংস্থান তত্ত্ব) – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-র অন্তর্গত ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ উপবিভাগ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো স্কুল পরীক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

Contents Show

অভিসারী পাত সীমান্তের (Convergent Plate Margin) বৈশিষ্ট্য লেখো।

অভিসারী পাত সীমান্তের বৈশিষ্ট্য –

  • অভিসারী পাত সীমান্তে দুটি পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয়। এই পাত সীমানায় নতুন সুউচ্চ ভূমিরূপের উৎপত্তি হয় (উদাহরণ – হিমালয়)।
  • এখানে ভূগর্ভের উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা অথবা সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত পললরাশিতে পার্শ্বচাপের ফলে পলিরাশি উত্থিত হয়।
  • এই সীমান্তকে ‘বিনাশকারী বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমান্ত’ বলা হয়।
  • এই অঞ্চলে ভূত্বকীয় অংশ সংকুচিত হয়।
  • এই সীমান্তকে ‘দুর্ঘটনাময় অঞ্চল’ (Accidental Margin) বলে।
  • এই সীমান্তটি সর্বদা অস্থির থাকে।
  • এই সীমান্ত বরাবর ব্যাপক ভূকম্পন, অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রখাত, ভঙ্গিল পর্বত, আগ্নেয়গিরি, পাতের নিমজ্জন (মহাদেশীয় পাতের নীচে মহাসাগরীয় পাতের অনুপ্রবেশ) প্রভৃতি ঘটনা ঘটে থাকে।

বেনিয়ফ জোন ও সূচার লাইন কী?

বেনিয়ফ জোন – অভিসারী পাত সীমানায় যে ঢালু তল বরাবর বা যে কোণে হেলে ভারী মহাসাগরীয় পাতটি হালকা মহাদেশীয় পাতের নীচে নিমজ্জিত হয়, তাকে ভূতত্ত্ববিদ বেনিয়ফের নামানুসারে বেনিয়ফ জোন বলা হয়। এই অঞ্চলের গড় ঢাল 45°। এই অঞ্চল অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ।

সিউচার লাইন – দুটি অভিসারী পাত প্রথম যে রেখা বরাবর মিলিত হয়, তাকে সিউচার লাইন বলে। উদাহরণ – হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের সিন্ধু-সীবনরেখা সিউচার লাইনের নিদর্শন।

প্রতিসারী বা অপসারী পাত সীমান্তের (Divergent Plate Margin) বৈশিষ্ট্য লেখো।

প্রতিসারী বা অপসারী পাত সীমান্তের বৈশিষ্ট্য –

  • প্রতিসারী বা অপসারী পাত সীমান্তে দুটি পাত পরস্পরের থেকে দূরে সরে যায়।
  • এই পাত সীমানায় নতুন ভূমিরূপের উৎপত্তি হয় (মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা)।
  • এখান থেকে ভূগর্ভের উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা উত্থিত হয়।
  • এই পাত সীমান্তকে ‘গঠনকারী পাত সীমান্ত’ বলা হয়।
  • এই স্থলে সমুদ্রতল সম্প্রসারিত (Sea floor spreading) হয়।
  • এই পাত সীমান্তে চ্যুতি, ফাঁক, গ্রস্ত উপত্যকা, অগ্ন্যুৎপাত, আগ্নেয়পর্বত, আগ্নেয় দ্বীপমালা প্রভৃতি গড়ে ওঠে।

নিরপেক্ষ বা প্রতিগামী পাত সীমান্তের (Conservative Plate Margin) বৈশিষ্ট্য লেখো।

নিরপেক্ষ বা প্রতিগামী পাত সীমান্তের বৈশিষ্ট্য –

  • নিরপেক্ষ বা প্রতিগামী পাত সীমান্তে দুটি পাত সমান্তরালভাবে পাশাপাশি একই অভিমুখে বা বিপরীত অভিমুখে চলমান থাকে।
  • নিরপেক্ষ পাত সীমান্তে কোনোরূপ সংঘর্ষ হয় না।
  • এই সীমান্তে ভূমিরূপের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না।
  • এই অঞ্চলটি সর্বদা স্থির থাকে।
  • এই সীমানায় ভূত্বকে ফাটল বা চ্যুতি, দারণ সৃষ্টি হয়।
  • এই সীমানায় গঠনমূলক বা ধ্বংসাত্মক কোনো ক্রিয়াকলাপ হয় না, সেজন্য একে নিরপেক্ষ পাত সীমান্ত বলে।
  • এই সীমান্তে সামান্য পরিমাণে ভূমিকম্প ও ভূ-আলোড়ন ঘটে থাকে।
  • এই পাত সীমানাকে ‘ট্রান্সফর্ম পাত সীমানা’ বলে।

অভিসারী পাত সীমান্তকে ‘বিনাশকারী পাত সীমান্ত’ বলা হয় কেন?

অভিসারী পাত সীমান্তকে ‘বিনাশকারী পাত সীমান্ত’ বলা হয়। কারণ –

  • মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হলে ভারী মহাসাগরীয় পাত, মহাদেশীয় পাতের নীচে প্রবেশ করে ও সামুদ্রিক খাত সৃষ্টি করে। যেমন – প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাত।
  • নিমজ্জিত পাতের কিছু অংশ অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে অত্যধিক উষ্ণতায় গলতে থাকে।
  • এইভাবে দুটি পাতের সংঘর্ষ হলে নিমজ্জিত অংশটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই অভিসারী পাতসীমানাকে বিনাশকারী বা ধ্বংসাত্মক পাতসীমানা (Destructive Plate Margin) বলে।

অপসারী পাতসীমানাকে গঠনকারী পাতসীমানা বলা হয় কেন?

অপসারী পাতসীমানাকে গঠনকারী পাতসীমানা বলা হয়। কারণ –

  • দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ায় পাতদ্বয়ের সংযোগস্থলে ফাটল বৃদ্ধি পায় ও ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা উঠে এসে মহাসাগরীয় ভূত্বক সৃষ্টি করে।
  • এই পাত সীমানা বরাবর সমুদ্রবক্ষের বিস্তার ঘটে বা আয়তন বৃদ্ধি পায়। যেমন – মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা।
  • দুটি পাত পরস্পর বিপরীতে সরে যাওয়ায় গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়। যেমন – আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি।
  • এই পাতসীমানা বরাবর উত্তপ্ত ম্যাগমা ফাটলের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে সঞ্চিত হয়ে শৈলশিরা সৃষ্টি করে। যেমন – মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা।

নবীন ভঙ্গিল পর্বতকে কেন ‘নবীন’ বলা হয়? এবং প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বতকে কেন ‘প্রাচীন’ বলা হয়?

পৃথিবীর সৃষ্টি আজ থেকে প্রায় 460 কোটি বছর আগে। অন্তত 60 কোটি বছর ধরে ভূ-অভ্যন্তরে চলছে পরিচলন স্রোত ও পাতসঞ্চরণ। এই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ের সাপেক্ষে প্রায় 4 থেকে 5 কোটি বছর আগে মহাদেশীয় পাতের অভিসারী চলনের ফলে গড়ে উঠেছে হিমালয়, আন্দিজ, রকি, আল্পস্-এর মতো ভঙ্গিল পর্বতগুলি। তাই এদেরকে ‘নবীন’ ভঙ্গিল পর্বত বলা হয়।

অপরদিকে কিছু ভঙ্গিল পর্বত যেমন – আরাবল্লি, অ্যাপালেশিয়ান, ইউরাল প্রভৃতি সৃষ্টি হয় প্রায় 30 থেকে 40 কোটি বছর আগে। তাই এগুলিকে ‘প্রাচীন’ ভঙ্গিল পর্বত আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

হিমালয়ের উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে কেন?

হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে দুটি অভিসারী পাতের পরস্পর সংঘর্ষ। ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে ভারী ভারতীয় পাত, ইউরেশীয় পাতের তলদেশে প্রবেশ করে এবং টেথিস মহীখাতের বিপুল পলিরাশি উত্থিত হয়ে সৃষ্টি হয় হিমালয় পর্বতমালার। অর্থাৎ, হিমালয় পর্বত দুটি অভিসারী পাতের সীমানায় অবস্থিত যেখানে ভারতীয় পাত অতি দ্রুত গতিতে (বছরে 16 সেমি) ইউরেশীয় পাতের তলদেশে প্রবেশ করছে।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে মেসোজোয়িক যুগ পর্যন্ত ভারতীয় ভূখণ্ড আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে অখণ্ড ভূভাগরূপে অবস্থান করত। একে বলা হত গণ্ডোয়ানাল্যান্ড। এরপর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতীয় পাত তিব্বতীয় পাতের নীচে ঢুকে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় হিমালয় পর্বতমালার। সুতরাং, যতদিন পাতের চলন থাকবে ততদিন হিমালয়ের উচ্চতা বাড়তে থাকবে।

পাতসংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী হিমালয় পর্বতের উৎপত্তি

পাতসঞ্চরণ আমরা বুঝতে পারি না কেন?

পৃথিবীতে অবস্থিত বিভিন্ন পাতগুলি সর্বদাই গতিশীল। GPS (Global Positioning System) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমেরিকান পাত বছরে 2-3 সেমি করে সরছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত বছরে 10 সেমি করে পশ্চিমে অগ্রসর হচ্ছে। আবার, ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাতটি বছরে 8-10 সেমি হারে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এই পাতগুলি সর্বদা গতিশীল হলেও আমরা তা বুঝতে পারি না, কারণ এদের গতি অত্যন্ত ধীর। তাই আমরা এই চলন দেখতেও পাই না বা অনুভবও করতে পারি না। শুধুমাত্র ভূমিকম্পের সময় এদের গতি হঠাৎ অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় আমরা তা অনুভব করতে পারি।

ট্রান্সফর্ম পাতসীমানা কেন ‘নিরপেক্ষ পাতসীমানা’ নামে পরিচিত?

যখন দুটি পাত পাশাপাশি পরস্পরকে অতিক্রম করে চলে যায়, তখন তাকে ট্রান্সফর্ম পাতসীমানা বলে। এই পাতসীমানাকে নিরপেক্ষ পাতসীমানা বলা হয়, কারণ – এই পাত সীমানা বরাবর দীর্ঘ চ্যুতির সৃষ্টি হলেও কোনো নতুন ভূমিরূপ সৃষ্টি হয় না অথবা কোনো ভূমিরূপ ধ্বংসপ্রাপ্তও হয় না। দুটি পাতের ঘর্ষণে ভূমিকম্প হলেও ভূমিরূপে বিশাল কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। ভূমিরূপ গঠনে এই পাতের চলন নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করায় একে নিরপেক্ষ পাতসীমানা বলা হয়।

মেলাঙ্গে ও ফ্লেকটেকটনিকস্ কী?

মেলাঙ্গে – দুটি পাতের পরস্পর সংঘর্ষের ফলে যখন সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয় সেখানে পাললিক শিলা, উচ্চচাপে রূপান্তরিত শিলা, বিভিন্ন পাতের টুকরো, আগ্নেয় পদার্থ প্রভৃতির সমন্বয়ে একটি মিশ্র পদার্থের সৃষ্টি হয়। একে মেলাঙ্গে বলে।

ফ্লেকটেকটনিকস্ – একটি মহাদেশ ও একটি মহাসাগরীয় পাত পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হলে কখনো কখনো মহাসাগরীয় পাতটির একটি ফালির মতো অংশ মহাদেশীয়


আমরা অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ থেকে যে ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি, তা অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের বা চাকরির পরীক্ষার্থীদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির স্কুল পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসতে দেখা যায়। আশা করি এই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি আপনাদের প্রস্তুতির জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনার যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগাযোগ করতে পারেন। পোস্টটি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ!

Please Share This Article

Related Posts

অস্থিত পৃথিবী - পাতসংস্থান তত্ত্ব - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – দ্বিতীয় অধ্যায়: পাতসংস্থান তত্ত্ব – অস্থিত পৃথিবী – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অস্থিত পৃথিবী - পাতসংস্থান তত্ত্ব - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: অস্থিত পৃথিবী – পাতসংস্থান তত্ত্ব – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অস্থিত পৃথিবী - পাতসংস্থান তত্ত্ব - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - টীকা

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল দ্বিতীয় অধ্যায়: অস্থিত পৃথিবী – পাতসংস্থান তত্ত্ব – টীকা

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – দ্বিতীয় অধ্যায়: পাতসংস্থান তত্ত্ব – অস্থিত পৃথিবী – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: অস্থিত পৃথিবী – পাতসংস্থান তত্ত্ব – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল দ্বিতীয় অধ্যায়: অস্থিত পৃথিবী – পাতসংস্থান তত্ত্ব – টীকা

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: অস্থিত পৃথিবী (পাতসংস্থান তত্ত্ব) – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল দ্বিতীয় অধ্যায়: অস্থিত পৃথিবী – পাতসংস্থান তত্ত্ব – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর