আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘অগ্ন্যুদ্গম’ (Volcanism) থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির স্কুলের ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক (চাকরির) পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অগ্ন্যুদ্গম কীভাবে হয়?
অথবা, অগ্ন্যুদ্গমের কারণ লেখো।
অগ্ন্যুদ্গমের প্রধান কারণগুলি হল –
- তাপ ও চাপজনিত কারণ – পৃথিবীর অভ্যন্তর অত্যন্ত উত্তপ্ত। গুরুমণ্ডলের 2000° সেলসিয়াসে স্বাভাবিকভাবে শিলা গলে যাওয়ার কথা, কিন্তু প্রবল চাপে শিলার গলনাঙ্ক বেড়ে যায়, ফলে শিলা আংশিক গলে প্লাস্টিকের মতো প্রবাহিত হয়। তবে বহিঃগুরুমণ্ডলের কোনো কোনো অংশে শিলা সম্পূর্ণ গলে যায়। এই গলিত ম্যাগমা ভূ-আলোড়নের কারণে ভূগর্ভে চাপ ও তাপের বৈষম্য হলেই ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে ও অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
- পাতসঞ্চরণ – যখন দুটি পাত পরস্পরের দিকে আসে (অভিসারী) তখন নিমজ্জিত ভারী পাতের কিছু অংশ গলে গিয়ে ফাটল পথে বাইরে বেরিয়ে আসে। যখন দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে যায় (অপসারী), তখন মাঝের দীর্ঘ ফাটল দিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাগমা বেরিয়ে আসে। নিরপেক্ষ পাত সীমানায় সৃষ্ট ট্রান্সফর্ম চ্যুতি বরাবর ম্যাগমা বেরিয়ে আসে।
- ভূত্বকে দুর্বল স্থানের অস্তিত্ব – ভূত্বকে বিভিন্ন জায়গায় দুর্বল স্থান, ফাটল, ছিদ্রপথ (Vent), চ্যুতি থাকলে সেই স্থানগুলি বহির্মুখী ম্যাগমার চাপ সহ্য করতে পারে না, ফলে অগ্ন্যুদ্গম ঘটায়।
- ভূগর্ভে গ্যাসীয় চাপ বৃদ্ধি – ভূগর্ভে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন গ্যাস উৎপন্ন হয় যা চাপের সৃষ্টি করে ও অগ্ন্যুদ্গম ঘটায়।
- ভূ-অভ্যন্তরে জলের প্রবেশ – ভূত্বকে ফাটলের মাধ্যমে জল প্রবেশ করলে তা উত্তাপের কারণে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এই জলীয় বাষ্প ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেয় ও ম্যাগমা উপরে উঠে এসে অগ্ন্যুদ্গম ঘটায়।

প্রকৃতি ও সময়কাল অনুসারে আগ্নেয়গিরির শ্রেণিবিভাগ করো।
আগ্নেয়গিরির প্রকৃতি ও অগ্ন্যুৎপাতের সময়কালের ব্যাপ্তি অনুসারে আগ্নেয়গিরিকে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল –
- জীবন্ত/সক্রিয় আগ্নেয়গিরি (Active Volcano)
- সুপ্ত আগ্নেয়গিরি (Dormant Volcano)
- মৃত আগ্নেয়গিরি (Extinct Volcano)
জীবন্ত/সক্রিয় আগ্নেয়গিরি (Active Volcano) –
- সংজ্ঞা – পৃথিবীপৃষ্ঠের যেসব আগ্নেয়গিরিতে উৎপত্তির সময়কাল থেকে আজও পর্যন্ত অগ্ন্যুৎপাত হয়ে চলেছে, অথবা ঘন ঘন অগ্ন্যুৎপাত হয়, তাকে জীবন্ত বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলে। এই জীবন্ত আগ্নেয়গিরি আবার দুই প্রকার, সেগুলি হল –
- অবিরাম আগ্নেয়গিরি (Incessant Volcano) –
- সংজ্ঞা – পৃথিবীর যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে প্রতিনিয়ত বা অনবরত অগ্ন্যুৎপাত হতে থাকে, সেগুলিকে অবিরাম আগ্নেয়গিরি বলে।
- উদাহরণ – ইটালির ভিসুভিয়াস।
- সংজ্ঞা – পৃথিবীর যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে প্রতিনিয়ত বা অনবরত অগ্ন্যুৎপাত হতে থাকে, সেগুলিকে অবিরাম আগ্নেয়গিরি বলে।
- সবিরাম আগ্নেয়গিরি (Intermittent Volcano) –
- সংজ্ঞা – যেসব জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে কিছুদিনের ব্যবধানে বা কয়েক বছর পরে পরে আগ্নেয় পদার্থ নির্গত হয়, সেগুলিকে সবিরাম আগ্নেয়গিরি বলে।
- উদাহরণ – ইটালির স্ট্রম্বোলি, হাওয়াই দ্বীপের মৌনালোয়া, ভারতের ব্যারেন ও নারকন্ডাম প্রভৃতি।
- অবিরাম আগ্নেয়গিরি (Incessant Volcano) –

সুপ্ত আগ্নেয়গিরি (Dormant Volcano) –
- সংজ্ঞা – পৃথিবীপৃষ্ঠের যেসব আগ্নেয়গিরি অতীতে জীবন্ত ছিল, বর্তমানে অগ্ন্যুৎপাত আপাতত বন্ধ আছে, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে যে-কোনো সময় অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাকে সুপ্ত বা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি বলে।
- উদাহরণ – জাপানের ফুজিয়ামা বা মাউন্ট ফুজি, ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া।

মৃত আগ্নেয়গিরি (Extinct/Dead Volcano) –
- সংজ্ঞা – যেসব আগ্নেয়গিরিতে উৎপত্তির সময় অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে, বর্তমানে আগ্নেয় পদার্থ নির্গত হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তাকে মৃত বা নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলে।
- উদাহরণ – মায়ানমারের মাউন্ট পোপা, মেক্সিকোর পারিকুটিন।
বিভিন্ন ধরনের অগ্ন্যুদ্গম নিয়ে আলোচনা করো।
বিভিন্ন ধরনের অগ্ন্যুদ্গম –
- হাওয়াই ও আইসল্যান্ডীয় ধরনের (Hawaiian Type) – এই ধরনের অগ্ন্যুদ্গমে বিস্ফোরণ ছাড়া ধীরভাবে লাভা বেরিয়ে আসে। হাওয়াই ও আইসল্যান্ডের আগ্নেয়গিরিতে দেখা যায় বলে এরূপ নামকরণ।
- ভালকানো ধরনের (Vulcanian Type) – প্রচুর পরিমাণে লাভা, গ্যাস, ভস্ম, বাষ্প একসঙ্গে বিস্ফোরণ আকারে বেরিয়ে ফুলকপির মতো গাঢ় কালো মেঘের সৃষ্টি করে। ভূমধ্যসাগরে লিপারি দ্বীপের ভালকানো আগ্নেয়গিরির নামানুসারে নামকরণ।
- স্ট্রম্বোলি ধরনের (Strombolian Type) – প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অগ্ন্যুদ্গম হয়। এই ধরনের অগ্ন্যুদ্গমে নির্গত জ্বলন্ত গ্যাসের উজ্জ্বল আলো বহু দূর থেকে দেখা যায়। তাই স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরিকে ভূমধ্যসাগরের আলোকস্তম্ভ বলে।
- পিলি ধরনের (Pelean Type) – ভয়াবহ বিধ্বংসী অগ্ন্যুদ্গম ঘটে। প্রচুর পরিমাণে গ্যাস, বাষ্প, শিলাচূর্ণ, ভস্ম নির্গত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পিলি আগ্নেয়গিরির নামানুসারে নামকরণ।
- প্লিনি ধরনের (Plinian Type) – প্রচণ্ড বিস্ফোরণে গ্যাস শিলাচূর্ণ, ছাইভস্ম জ্বালামুখ থেকে আকাশে বহুদূর উঠে যায়। ঐতিহাসিক প্লিনি আবিষ্কার করায় এরূপ নামকরণ।

আমরা আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর অন্তর্গত ‘অগ্ন্যুদ্গম’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে শেয়ার বাটনে ক্লিক করে এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জন বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ!





Leave a Comment