অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘ভূমিকম্প’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভূমিকম্পের কারণগুলি সংক্ষেপে লেখো।

ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা – প্রাকৃতিক কারণ ও কৃত্রিম কারণ।

প্রাকৃতিক কারণ –

  • পাত সঞ্চালন – দুটি পাত পরস্পর ধাক্কা খেলে (অভিসারী), একটি পাত অপর পাত থেকে দূরে সরে গেলে (অপসারী) এবং একটি পাতের সঙ্গে আরেকটি পাতের পাশাপাশি ঘর্ষণের ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
  • নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চল – নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে প্রবল পার্শ্বচাপে শিলায় ভাঁজ পড়ার সময় ভূমিকম্প হয়।
  • অগ্ন্যুদ্গম – প্রচণ্ড বিস্ফোরণসহ অগ্ন্যুদ্গম ঘটলে আগ্নেয়গিরির চারপাশে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
  • বাষ্পরাশির চাপ – ভূগর্ভে বাষ্পরাশির চাপ বেড়ে গেলে তা ভূত্বকের নীচে প্রবল ধাক্কা দেয়। ফলে, ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
  • ধস – পার্বত্য অঞ্চলে বৃষ্টির জন্য বিশাল ধস নামলে ভূমিকম্প হয়।
  • হিমানী সম্প্রপাত – পার্বত্য অঞ্চলে বরফের স্তূপ নীচে আছড়ে পড়লে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
  • উল্কাপাত – অনেক সময় বৃহৎ উল্কার সঙ্গে পৃথিবীপৃষ্ঠের সংঘর্ষের দরুন ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে।
  • কার্স্ট অঞ্চলে ছাদের ধস – চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে ভূ-অভ্যন্তরের গুহায় জলধারার ক্ষয়কাজের জন্য ছাদ ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং একসময় ধসে পড়ে, এর ফলেও ভূমিকম্প হয়।

কৃত্রিম কারণ –

  • জলাধার নির্মাণ – নদীতে বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি করলে সঞ্চিত জলরাশির প্রচণ্ড চাপে ভূমিকম্প হতে পারে। যেমন – 1967 সালে মহারাষ্ট্রের কয়না বাঁধের জলাধারে জলরাশির চাপে ভূমিকম্প হয়েছিল।

অন্যান্য কারণ –

  • পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে।
  • ডিনামাইট ফাটালে।
  • খনি, গহ্বর বা সুড়ঙ্গ খনন করলে তার ছাদ ধসে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

ভূমিকম্পের ফলাফল আলোচনা করো।

ভূমিকম্পের ফলাফল সুদূরপ্রসারী। যেমন –

  • চ্যুতি সৃষ্টি – ভূপৃষ্ঠে চ্যুতি, ফাটল প্রভৃতি সৃষ্টি হয়ে গ্রস্ত উপত্যকা ও স্তূপ পর্বত গঠিত হতে পারে।
  • ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি – কোমল পাললিক শিলায় ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি হতে পারে।
  • নদীর গতিপথ পরিবর্তন – নদীর গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে। যেমন – 1887 সালের ভূমিকম্পের ফলে অসমে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছিল।
  • হ্রদ সৃষ্টি – নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়ে নতুন নদী বা হ্রদের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন – 12 মে, 2015-এর নেপালের ভূমিকম্পে কালিগণ্ডকী নদী একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি করেছে।
  • বন্যা – জলাধারের চাপে ভূমিকম্প হলে বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
  • দ্বীপ গঠন – উপকূল অঞ্চল বসে গিয়ে সমুদ্রে পরিণত হয়। আবার, সমুদ্র তলদেশ উঁচু হয়ে নতুন ভূভাগ বা দ্বীপ গঠন করে। যেমন – 26 সেপ্টেম্বর 2013-এ পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে আরব সাগরে জেগে ওঠে কাদার দ্বীপ।
  • সুনামি – সমুদ্র তলদেশে ভূমিকম্প হলে বিশাল জলোচ্ছ্বাস বা সুনামি দেখা দেয়, যার ফলে উপকূল অঞ্চলে প্রবল ক্ষয়ক্ষতি হয়। যেমন – 2004 সালের 26 ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে ঘটে যাওয়া বিশাল সুনামি।
  • মূল্যবান খনিজ – ভূমিকম্পে সৃষ্ট বিদারণ থেকে পানীয় জল ও মূল্যবান খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়।
  • ধস ও হিমানী সম্প্রপাত – পার্বত্য অঞ্চলে বিরাট ধস নামতে পারে এবং ভয়ংকর হিমানী সম্প্রপাত ঘটতে পারে।
  • মানবজীবনে প্রভাব – ভূমিকম্পের ফলে শহর, নগর, জনপদ, রাস্তাঘাট, ঐতিহ্যসম্পন্ন ইমারত, রেলপথ নিমেষের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। অগণিত মানুষ, জীবজন্তু মারা যায়; ধনসম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

পৃথিবীর প্রধান ভূমিকম্প বলয়গুলির পরিচয় দাও।

পৃথিবীতে প্রধান তিনটি ভূমিকম্প বলয় লক্ষ করা যায়। যথা –

  • প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয় – প্রশান্ত মহাসাগরকে উপকূল বরাবর মালার মতো ঘিরে থাকা এই বলয়ে পৃথিবীর প্রায় 70 শতাংশ ভূমিকম্প হয়ে থাকে। এই বলয়ে অবস্থিত জাপানকে ‘ভূমিকম্পের দেশ’ বলে। এই বলয়ে অবস্থিত আগ্নেয়গিরিগুলি হল – জাপানের ফুজিয়ামা, ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া, USA-এর সেন্ট হেলেন্স প্রভৃতি।
  • মধ্য মহাদেশীয় বলয় – মেক্সিকো থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর, আল্পস্, ককেশাস, হিমালয় হয়ে বিস্তৃত মধ্য মহাদেশীয় ভূমিকম্প বলয় বা মধ্য পৃথিবীর পার্বত্য বলয়। এখানে পৃথিবীর 20 শতাংশ ভূমিকম্প ঘটে। এখানকার উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরিগুলি হল – ইটালির ভিসুভিয়াস, সিসিলির স্ট্রম্বোলি প্রভৃতি।
  • মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা বলয় – এটি মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা ও তার নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। এই বলয়ে পৃথিবীর 10 শতাংশ ভূমিকম্প ঘটে থাকে।
পৃথিবীর প্রধান প্রধান আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প বলয়

ভূমিকম্পের পূর্বাভাসগুলি লেখো।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। এখনও পর্যন্ত কোনো যন্ত্রপাতি বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি, যার দ্বারা ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করে ভূমিকম্পের কিছুটা পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে। যেমন –

  • পাতের গতিপ্রকৃতি – সঞ্চরণশীল পাতগুলির গতি ও দিকের হঠাৎ কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা গেলে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায়।
  • শিলার বক্রতা – টিল্টমিটার যন্ত্রের সাহায্যে শিলার উত্থান ও বক্রতা দ্বারা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায়।
  • প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণ – ক্যাটফিশ ও মাগুর মাছ চঞ্চল হয়ে ওঠে, ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, গোরু, শূকর ও হনুমানের কান খাড়া হয়ে যায়, ঘোড়া ভীত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে, হাতির মধ্যে চঞ্চলতা লক্ষ করা যায়, পায়রা ঊর্ধ্বে উঠে যায়। যেমন – 1891 খ্রিস্টাব্দে জাপানের নবি শহরের হাতিদের চঞ্চলতা লক্ষ করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
  • প্রাকৃতিক পরিবর্তন – আকাশে অসময়ে রামধনু ওঠে, কুয়োর জলে রেডন গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, উষ্ণ প্রস্রবণে হিলিয়াম গ্যাসের প্রাধান্য বাড়ে।
  • উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ – উপগ্রহ মারফত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলি থেকে তড়িৎচুম্বকীয় নির্গমন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
  • ভৌমজলসীমার পরিবর্তন – ভৌমজলের সীমার পরিবর্তন লক্ষ করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘ভূমিকম্প’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

অস্থিত পৃথিবী - ভূমিকম্প - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অস্থিত পৃথিবী - ভূমিকম্প - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অস্থিত পৃথিবী - ভূমিকম্প - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – অস্থিত পৃথিবী – ভূমিকম্প – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর