অষ্টম শ্রেণির ভূগোল (চতুর্থ অধ্যায়) – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের চতুর্থ অধ্যায় ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক (চাকরির) পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Contents Show

বায়ুচাপ বলয় (Wind pressure zone) কাকে বলে? পৃথিবীর প্রধান প্রধান বায়ুচাপ বলয়গুলির নাম লেখো।

অক্ষাংশভেদে সূর্যরশ্মির পতনকোণের তারতম্যের জন্য উষ্ণতারও তারতম্য ঘটে। আর বায়ুচাপের ওপর উষ্ণতার প্রভাব সর্বাধিক হওয়ায় বায়ুচাপেরও তারতম্য ঘটে। ফলে, পৃথিবীকে পূর্ব-পশ্চিমে বলয় আকারে বেষ্টন করে কয়েকটি প্রায় সমচাপযুক্ত অঞ্চল অবস্থান করে, এদের বায়ুচাপ বলয় বলে। সমগ্র পৃথিবীতে ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় দেখা যায়।

এগুলি হল –

বায়ুচাপ বলয়বিস্তার
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়0°-10° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ
কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়25°-35° উত্তর অক্ষাংশ
মকরীয় উচ্চচাপ বলয়25°-35° দক্ষিণ অক্ষাংশ
সুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়60°-70° উত্তর অক্ষাংশ
কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়60°-70° দক্ষিণ অক্ষাংশ
সুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয়80°-90° উত্তর অক্ষাংশ
কুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয়80°-90° দক্ষিণ অক্ষাংশ

নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (Equatorial low pressure zone) সৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করো।

নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ –

  • সূর্যরশ্মির পতনকোণ – নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে বায়ুর ঘনত্ব কমে গিয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
  • স্থলভাগ ও জলভাগের বণ্টন – এই অঞ্চলে স্থলভাগের তুলনায় জলভাগের পরিমাণ বেশি বলে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু সাধারণ বায়ুর চেয়ে হালকা হওয়ায় বায়ুর চাপ কম থাকে।
  • পৃথিবীর আবর্তন গতি – নিরক্ষীয় অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন গতিবেগ সর্বাধিক হওয়ায় উষ্ণ, হালকা ঊর্ধ্বমুখী বায়ু দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে বিক্ষিপ্ত হয়।
সূর্যরশ্মির পতনকোণ

বায়ুচাপ কক্ষ কাকে বলে?

পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলি পূর্ব-পশ্চিম অক্ষাংশ বরাবর অবস্থিত হলেও স্থলভাগ ও জলভাগের প্রকৃতিগত পার্থক্যের কারণে চাপবলয়গুলির মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জলভাগ সমপ্রকৃতির হওয়ায় চাপবলয়গুলি বলয়াকারে অবস্থান করে। অন্যদিকে স্থলভাগ অসমপ্রকৃতির অর্থাৎ, স্থলভাগে ভূপ্রকৃতি, উদ্ভিদ, মৃত্তিকা প্রভৃতির তারতম্য থাকায় চাপ বলয়গুলি বলয়াকারে না থেকে ছোট ছোট কক্ষের আকারে অবস্থান করে। একেই বায়ুচাপ কক্ষ (Pressure Cell) বলে। উদাহরণ – সাইবেরীয় উচ্চচাপ কক্ষ।

কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় (Tropical High Pressure Zone) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?

অবস্থান – উভয় গোলার্ধে 25°-35° অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় দুটি অবস্থিত।

উচ্চচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ –

  • সূর্যরশ্মির পতনকোণ – ক্রান্তীয় অঞ্চলে সূর্য বছরের অধিকাংশ সময় তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় এখানকার বায়ু শীতল ও ভারী হয়। অর্থাৎ, ঘনত্ব বেশি হয়।
  • জলীয় বাষ্পের স্বল্পতা – সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ায় বাষ্পীভবনের হার কম হয়। ফলে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম হয়। শুষ্ক বায়ু আর্দ্র বায়ুর তুলনায় ভারী হওয়ায় উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।
  • পৃথিবীর আবর্তন গতি – নিরক্ষীয় অঞ্চলের ঊর্ধ্বমুখী উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য ছিটকে উত্তর ও দক্ষিণে সরে যায় এবং শীতল ও ভারী হয়ে দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে নেমে আসে। ফলে বায়ুর ঘনত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুচাপও বৃদ্ধি পায়।
  • কোরিওলিস বলের প্রভাব – সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের শীতল ও ভারী বায়ু কোরিওলিস বলের প্রভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠ বরাবর অগ্রসর হয়ে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি অঞ্চলের দিকে আসে।
  • বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ – দুটি বিপরীতধর্মী বাতাস ক্রান্তীয় অঞ্চলে মিলিত হয়ে বায়ুর পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যার ফলে বায়ুর ঘনত্ব তথা বায়ুচাপ বৃদ্ধি পায়।

সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (Sub Polar Low Pressure Zone) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?

অবস্থান – উভয় গোলার্ধের 60°-70° অক্ষরেখার মধ্যে এই দুটি নিম্নচাপ বলয় অবস্থিত।

নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ –

  • উষ্ণতা – মেরু অঞ্চলের তুলনায় মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের উষ্ণতা কিছুটা বেশি হওয়ায়, বায়ু তুলনামূলক উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে প্রসারিত হয়।
  • পৃথিবীর আবর্তন বেগ – পৃথিবীর আবর্তনের বেগ মেরুদ্বয়ের তুলনায় দুই মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলে বেশি বলে এই অঞ্চলের বায়ু বাইরের দিকে বিক্ষিপ্ত হয়। ফলে বায়ুর ঘনত্ব কমে গিয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
  • সমুদ্রস্রোতের প্রভাব – ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ সমুদ্রস্রোত প্রচুর তাপ এই অঞ্চলে বয়ে নিয়ে আসে, ফলে এখানকার উষ্ণতা বেড়ে যায়। উষ্ণ হালকা বায়ুর ঘনত্ব কম হওয়ায় নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়।
  • জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি – মেরু অঞ্চল থেকে আগত শীতল শুষ্ক বায়ুর সঙ্গে ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে আগত উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর সংঘর্ষে বায়ু ঊর্ধ্বগামী হয়। জলীয় বাষ্পের প্রাচুর্যের জন্য বিশেষত জলভাগে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু হালকা বলে বায়ুচাপ কম হয়।
দুটি স্রোতের মিলনস্থলে সৃষ্ট নিম্নচাপ

সুমেরু ও কুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ (Polar High Pressure Zone) বলয় কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?

অবস্থান – উভয় গোলার্ধের 80° অক্ষরেখা থেকে মেরু (90°) পর্যন্ত অঞ্চলে এই দুটি উচ্চচাপ বলয় অবস্থান করে।

উচ্চচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ –

  • সূর্যরশ্মির পতনকোণ – এখানে সূর্যরশ্মি অত্যন্ত তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় উষ্ণতা অত্যন্ত কম থাকে, এমনকি গ্রীষ্মকালেও উষ্ণতা হিমাঙ্কের (0°C) নীচে থাকে। ফলে এই অঞ্চলের শীতল, ভারী ও অধিক ঘনত্বযুক্ত বায়ু উচ্চচাপের সৃষ্টি করে।
  • জলীয় বাষ্পের স্বল্পতা – সৌরতাপের অভাবে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকায় শুষ্ক বায়ু ভারী হয়।
  • পৃথিবীর আবর্তন বেগ – এই অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন গতির বেগ সবচেয়ে কম থাকায় বায়ু বিক্ষিপ্ত হয় না। ফলে বায়ুর ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।
  • বায়ুর নিমজ্জন – আবর্তন গতির জন্য মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের ঊর্ধ্বগামী বিক্ষিপ্ত বায়ু এই অঞ্চলে শীতল ও ভারী হয়ে নীচে নেমে আসে, যা বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ বৃদ্ধি করে।

বায়ুপ্রবাহের কারণগুলি লেখো।

ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে অনুভূমিকভাবে বায়ুর চলাচলকে বায়ুপ্রবাহ বলে। এই বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণগুলি হল –

  • কোরিওলিস বল – পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে গতিশীল বায়ুর ওপর কোরিওলিস বল কাজ করে এবং বায়ুপ্রবাহের দিকের বিক্ষেপ ঘটায়। এই কারণে উত্তর গোলার্ধে বায়ু ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় (ফেরেলের সূত্র)।
  • বায়ুচাপের পার্থক্য – জলের সমোচ্চশীলতা ধর্মের মতোই বায়ু সর্বদা উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে নিম্নচাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
  • বায়ুর উষ্ণতার পার্থক্য – সূর্যরশ্মির প্রভাবে বায়ু উত্তপ্ত হলে প্রসারিত হয়। বায়ুর ঘনত্ব ও আপেক্ষিক গুরুত্ব কমে যায়, ফলে বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং এই নিম্নচাপ অঞ্চলটি শূন্য হয়ে যায়। এই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য পার্শ্ববর্তী উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে ভারী বায়ু নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ছুটে আসে।
  • কেন্দ্র বহির্মুখী বল – পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির জন্য এক কেন্দ্র বহির্মুখী বলের সৃষ্টি হয়, যার প্রভাবে বায়ুর বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বায়ু উপরের দিকে উঠে উভয় মেরুর দিকে ছিটকে যায়।
  • ঘর্ষণজনিত প্রভাব – অসমতল স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে (পাহাড়, পর্বত, অট্টালিকা, উদ্ভিদ) ঘর্ষণজনিত বাধার ফলে বায়ুর গতিবেগ কমে যায় এবং দিক পরিবর্তন ঘটে। তবে জলভাগে এরূপ বাধা না থাকায় বায়ু দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হয়।

প্রতীপ ঘূর্ণবাতের বৈশিষ্ট্য লেখো।

সংজ্ঞা – কোনো জায়গায় উষ্ণতা অতিমাত্রায় হ্রাসের কারণে বায়ুচাপ বেড়ে গেলে উচ্চচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয় এবং বাইরের দিকে নিম্নচাপ বিরাজ করে। এই অবস্থায় বায়ু উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়। একে প্রতীপ ঘূর্ণবাত বলে।

প্রতীপ ঘূর্ণবাতের বৈশিষ্ট্য –

  • প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
  • এই বায়ু শীতল, বহির্মুখী ও নিম্নগামী হয়।
  • এই বায়ুর গতিবেগ ঘূর্ণবাতের তুলনায় অনেকটা কম থাকে।
  • সাধারণত উচ্চ অক্ষাংশে প্রতীপ ঘূর্ণবাত সৃষ্টি হয়।
  • প্রতীপ ঘূর্ণবাতের অবস্থানে মেঘমুক্ত, শান্ত ও রোদ ঝলমলে আবহাওয়া দেখা যায়।

সমচাপরেখা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্য লেখো।

সমচাপরেখা – বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত জানুয়ারি ও জুলাই মাসে) পৃথিবীর যেসব স্থানে বায়ুর চাপ একই রকম থাকে, মানচিত্রে সেই স্থানগুলিকে একটি কাল্পনিক রেখার দ্বারা যুক্ত করলে যে বক্ররেখা পাওয়া যায়, তাকে সমচাপরেখা বা Isobar বলে।

সমচাপরেখার বৈশিষ্ট্য –

  • সমচাপরেখায় বায়ুচাপকে মিলিবার (mb) এককে প্রকাশ করা হয়। পৃথিবীতে বায়ুচাপ সাধারণত 980 mb থেকে 1050 mb-এর মধ্যে থাকে।
  • সমচাপরেখায় বায়ুচাপের পরিমাণগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুচাপের সমতুল্য হিসেবে দেখানো হয়।
  • সাধারণত স্থলভাগের ওপর সমচাপরেখাগুলি আঁকাবাঁকাভাবে বিস্তৃত হয় এবং জলভাগের ওপর প্রায় সমান্তরালে বিস্তৃত হয়। সমচাপরেখাগুলি কখনোই পরস্পরকে স্পর্শ বা অতিক্রম করে না।
  • সমচাপরেখাগুলি যেখানে পরস্পরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, বুঝতে হবে সেই অঞ্চলে বায়ুচাপের পার্থক্য বা ঢাল বেশি। ঘনসন্নিবিষ্ট সমচাপরেখার অর্থ হল বায়ুপ্রবাহের গতিবেগের প্রাবল্য।
  • সমচাপরেখাগুলি সাধারণত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তার লাভ করে।
  • নিরক্ষরেখা থেকে ক্রমশ উত্তরে বা দক্ষিণে সমচাপরেখাগুলির মান বাড়তে থাকে।
  • সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বায়ুচাপ উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগের ওপর দেখা যায়।
সমচাপরেখা

অক্টোবর মাসেও আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে! বর্ষার সময়কাল কি পিছিয়ে যাচ্ছে? জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে এর কি কোনো সম্পর্ক আছে? মতামত জানাও।

সাম্প্রতিককালে পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ব্যাপকভাবে শিল্পের প্রসার ঘটছে। সমগ্র পৃথিবীতে জনবিস্ফোরণ হওয়ায় তৃণভূমি, কৃষিজমি ও বনভূমি ধ্বংস করে সেখানে কংক্রিটের বাড়ি ও নিত্যনতুন কলকারখানা স্থাপিত হচ্ছে। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। ফলস্বরূপ, বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄) সহ গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করছে—যাকে আমরা ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’ (Global Warming) বলে থাকি।

সর্বোপরি, বায়ুমণ্ডলে ওজোন গ্যাসের (O₃) স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV Ray) পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে। এর সামগ্রিক প্রভাবে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তন (Climate Change) ঘটছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিক নিয়ম বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বর্ষার সময়কাল পিছিয়ে যাচ্ছে বা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ঠিক এই কারণেই অনেক সময় অক্টোবর মাসেও আকাশে ঘন কালো মেঘের সঞ্চার ও বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায়।

সাহারা মরুভূমি কেন আফ্রিকার পশ্চিম দিকে সৃষ্টি হয়েছে?

অথবা, পৃথিবীর অধিকাংশ মরুভূমিগুলি মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তে গড়ে উঠেছে কেন?
অথবা, ক্রান্তীয় অঞ্চলে মহাদেশের পশ্চিম দিকে পৃথিবীর অধিকাংশ মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে কেন?

আফ্রিকার সাহারা, কালাহারি, উত্তর আমেরিকার সোনেরান, দক্ষিণ আমেরিকার আটাকামা, এশিয়ার থর ও আরব মরুভূমি সবগুলিই মহাদেশের পশ্চিমাংশে গড়ে উঠেছে। এর কারণ –

  • ক্রমশ উষ্ণ আয়ন বায়ু – ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হওয়ার জন্য আয়ন বায়ুর উষ্ণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। মূলত স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া আয়ন বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়, ফলে বায়ু সম্পৃক্ত হতে পারে না। তাই বৃষ্টি হয় না।
  • জলীয় বাষ্পহীন আয়ন বায়ু – আয়ন বায়ুর যে অংশ সমুদ্রের উপর দিয়ে আসার সময় জলীয় বাষ্প গ্রহণ করে আর্দ্র হয়ে ওঠে, তা মহাদেশের পূর্বদিক দিয়ে প্রবেশ করার ফলে পূর্বাংশে বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পশ্চিম দিকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে জলীয় বাষ্পের অভাবে আর বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে না।
  • গোলযোগহীন বায়ু – এই অঞ্চল কর্কটক্রান্তীয় ও মকরক্রান্তীয় শান্তবলয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বায়ু সর্বদা উপর থেকে নীচে নেমে আসে। ফলে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু প্রবেশ করতে পারে না। তাই এখানে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ না ঘটায় বৃষ্টিপাতও হয় না।
মহাদেশের পশ্চিমাংশে সৃষ্ট মরুভূমিসমূহ

পশ্চিমা বায়ুর প্রবাহপথে মহাদেশের পূর্ব ও মধ্য অংশে পৃথিবীর অধিকাংশ নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে কেন?

পশ্চিমা বায়ুর প্রবাহপথে মহাদেশের পূর্ব ও মধ্য অংশে পৃথিবীর অধিকাংশ নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি যেমন – মধ্য এশিয়ার স্তেপ, উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, দক্ষিণ আমেরিকার পম্পাস, আফ্রিকার ভেল্ড, অস্ট্রেলিয়ার ডাউনস্ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ –

  • শীতকালে জলভাগ থেকে স্থলভাগ বেশি উষ্ণ থাকায় পশ্চিমা বায়ু সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচুর জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে।
  • এই জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুর প্রবাহপথে প্রথমে মহাদেশের পশ্চিমাংশ অবস্থান করায় বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত এই অংশেই ঘটে যায়।
  • পরবর্তীতে এই বায়ু যখন মহাদেশের পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় তখন তাতে জলীয় বাষ্প ক্রমশ কমতে থাকে। ফলে, মহাদেশের পূর্বাংশে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি হলেও মধ্যভাগে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়, যার ফলে এখানে নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমা বায়ুর প্রবাহপথে সৃষ্ট তৃণভূমি

উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় কেন?

পার্বত্য অঞ্চলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কারণগুলি হল –

  • পৃথিবী সংলগ্ন বায়ুস্তরে বায়ুর ঘনত্ব সর্বাধিক থাকে। যতই উপরে ওঠা যায়, ততই বায়ুর ঘনত্ব কমতে থাকে। উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বায়ুর ঘনত্ব কম থাকায় তাতে অক্সিজেনের পরিমাণও কম থাকে।
  • পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রতি 110 মিটার উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বায়ুর চাপ 1.34 মিলিবার হারে কমতে থাকে।
  • ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন অঞ্চলে বায়ুর চাপ ও মানুষের দেহের ভিতরকার বায়ুর চাপ সমান থাকে। কিন্তু পর্বতের উঁচু অংশে গেলে মানুষের দেহের ভিতরের বায়ুর চাপের সঙ্গে বাইরের বায়ুর চাপের পার্থক্য ঘটে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সেজন্য পর্বতারোহীরা অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করেন।
উচ্চতা ও বায়ুর চাপ

পর্বতের উপত্যকার তুলনায় উঁচু অংশে বেশি জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়  কেন?

অথবা, হিমাচল প্রদেশের কুলু ও কাংড়া উপত্যকার মাঝের অংশের তুলনায় পর্বতের উঁচু ঢালে জনবসতি কিছুটা বেশি দেখা যায় কেন?

পার্বত্য উপত্যকার তুলনায় উঁচু অংশে বেশি জনবসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। কারণ –

  • শীতল পার্বত্য অঞ্চলে দিনেরবেলা সূর্যের তাপে উপত্যকার নীচের অংশের তুলনায় উপরের অংশের দু-দিকের ঢালের বায়ু বেশি উষ্ণ হয়। তাই মানুষের কাছে উপত্যকার নিম্ন অংশের তুলনায় উপরের অংশ বেশি আরামদায়ক।
  • আবার, রাতেরবেলা উপত্যকার নীচের অংশের তুলনায় উপরের অংশ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে পড়ে। ফলে, উপরের অংশে উচ্চচাপ ও নীচের অংশে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় পর্বতের ঢাল বরাবর শীতল বায়ু উপত্যকার নীচে নামে (ক্যাটাবেটিক বায়ু) এবং উপত্যকার অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বায়ুকে ঠেলে উপরের দিকে তুলে দেয়, যার জন্য উপরের অংশের উষ্ণতা কিছুটা বেড়ে যায়।
  • দিনে ও রাতে উপত্যকার নীচের অংশের তুলনায় উপত্যকার উপরের অংশের দুই ঢালে উষ্ণতা অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় শীতল পার্বত্য উপত্যকাগুলির (যেমন কুলু ও কাংড়া উপত্যকা) উপরের ঢালেই জনবসতি বেশি দেখা যায়।

‘বৃষ্টিপাত সূর্যকে অনুসরণ করে’ – ব্যাখ্যা করো।

বায়ুচাপ বলয়গুলির সীমানা পরিবর্তন উভয় গোলার্ধে 30°-40° অক্ষরেখার মধ্যের স্থানগুলির জলবায়ুর ওপর সর্বাধিক প্রভাব ফেলে। এই স্থানগুলিতে গ্রীষ্মকালে আয়ন বায়ু এবং শীতকালে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে আয়ন বায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পূর্বাংশে বৃষ্টি হয়, কিন্তু পশ্চিম দিকে বৃষ্টিপাত তেমন হয় না। আবার, শীতকালে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিমাংশে বৃষ্টি হয়, কিন্তু পূর্বাংশে আর বৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ, সূর্যের আপাত বার্ষিক গতির কারণে বায়ুচাপ বলয় ও নিয়ত বায়ুর স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাতের তারতম্য ঘটে। তাই বলা হয়, ‘বৃষ্টিপাত সূর্যকে অনুসরণ করে’ (The rain follows the Sun)।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুল্ক এবং শীতকাল আর্দ্র কেন?

অথবা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টি হয় কেন?

বায়ুচাপ বলয়গুলির স্থান পরিবর্তন ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলকে (30°-45° অক্ষাংশ) বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। সূর্য যখন 21 জুন গ্রীষ্মকালে কর্কটক্রান্তিরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়, তখন উত্তর গোলার্ধে উত্তরায়ণের জন্য বায়ুচাপ বলয়গুলি 5°-10° উত্তরে সরে যাওয়ায় এই অঞ্চলটি শুষ্ক আয়ন বায়ুর অধীনে আসে, ফলে বৃষ্টিপাত হয় না। কিন্তু 22 ডিসেম্বর শীতকালে যখন সূর্য মকরক্রান্তিরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়, তখন দক্ষিণায়নের সঙ্গে সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়গুলি 5°-10° দক্ষিণে সরে যাওয়ায় অঞ্চলটি পশ্চিমা বায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়। মহাসাগরের ওপর দিয়ে আসা আর্দ্র পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল অপেক্ষা শীতকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। তাই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিকে ‘শীতকালীন বৃষ্টির দেশ’-ও বলা হয়।

দুই ক্রান্তীয় অঞ্চল এবং দুই মেরু অঞ্চলে বায়ুর ঘনত্ব বেশি হয় কেন?

কর্কটক্রান্তীয় ও মকরক্রান্তীয় অঞ্চলে নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে। আবার, নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ ঊর্ধ্বগামী বায়ু এবং মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের শীতল ভারী বায়ু এই অঞ্চলে নেমে আসায় বায়ুর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, ফলে বায়ুর ঘনত্বও বৃদ্ধি পায়।

সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চলে সূর্য সারাবছর অত্যন্ত তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় শীতল বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে। আবার, মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের বিক্ষিপ্ত বায়ু এই অঞ্চলে নেমে আসে। এই অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন গতিবেগ কম থাকায় বায়ু বিক্ষিপ্ত হয় না। ফলে, এই অঞ্চলে শীতল ও ভারী বায়ুর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘনত্বও বৃদ্ধি পায়।

আয়ন বায়ুকে ‘বাণিজ্য বায়ু’ বলা হয় কেন?

আয়ন বায়ুর ইংরেজি নাম ‘Trade Wind’, যার অর্থ ‘বাণিজ্য বায়ু’। ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে উভয় গোলার্ধের 5°-25° অক্ষাংশের মধ্যে সারাবছর নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট পথে নির্দিষ্ট গতিতে একইদিকে আয়ন বায়ু (আয়ন শব্দের অর্থ ‘পথ’) প্রবাহিত হয়। প্রাচীনকালে এই বায়ুপ্রবাহের নির্দিষ্ট পথ ধরে নাবিকেরা পালতোলা জাহাজে করে বাণিজ্য করত বলে এই বায়ুকে ‘বাণিজ্য বায়ু’ নামকরণ করা হয়েছে।

দুই মেরু বিন্দুর কাছে উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয় কেন?

দুই মেরুপ্রদেশ সারাবছর বরফে আবৃত থাকায় বায়ু খুব শীতল ও ভারী হয়। সূর্যকিরণ সারাবছর তির্যকভাবে পতিত হওয়ায় উষ্ণতার অভাবে বায়ুতে জলীয় বাষ্প থাকে না এবং সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত প্রদেশের ঊর্ধ্বগামী বায়ুর কিছু অংশ দুই মেরু অঞ্চলে নেমে আসে। ফলে, এখানে উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়েছে।

স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ুর বৃহত্তম রূপ মৌসুমি বায়ু কেন?

গ্রীষ্মকালে প্রবল উষ্ণতার কারণে ভারতবর্ষে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে সমুদ্র (আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর) থেকে বাতাস স্থলভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুরূপে প্রবেশ করে। একে গ্রীষ্ম মৌসুমি বা মৌসুমি বায়ুর আগমনকাল বলে।

আবার, শীতকালে স্থলভাগ সূর্যকিরণ কম পাওয়ায় স্থলভাগে উচ্চচাপ ও সমুদ্রে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এর কারণে স্থলভাগ থেকে বাতাস উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুরূপে সমুদ্রের দিকে যায়। একে শীতকালীন মৌসুমি বা মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাগমনকাল বলা হয়।

যেহেতু স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ুর উৎপত্তি দিন-রাত্রির উষ্ণতা ও চাপের তারতম্যের জন্যে ঘটে, ঠিক একইভাবে মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তি শীত-গ্রীষ্ম ঋতুতে উষ্ণতা ও চাপের তারতম্যের জন্য ঘটে। তাই মৌসুমি বায়ুকে ট্রেওয়ার্থা, ফন প্রমুখ আবহবিদগণ ‘সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ুর বৃহৎ সংস্করণ’ বলেছেন।

নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়কে শান্তবলয় বলে কেন?

সংজ্ঞা – শান্ত অবস্থা বিরাজ করার জন্য নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়কে নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রাম বলে।

অবস্থান – 5° উত্তর থেকে 5° দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে নিরক্ষীয় শান্তবলয় অবস্থিত।

নামকরণ – ‘ডোলড্রাম’ নাবিকদের পারিভাষিক শব্দ। এর ইংরাজি অর্থ ‘ডিপ্রেস্ট’ অর্থাৎ, অবদমিত বা শান্ত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে পালতোলা জাহাজ চালানোর সময় জাহাজগুলি প্রায় থেমে যেত। তাই নাবিকেরা এই অঞ্চলের নামকরণ করেন ‘ডোলড্রাম’।

উৎপত্তি – নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ার ফলে এখানে উষ্ণতা খুব বেশি। তাই বায়ু সহজেই উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। একারণে এখানে বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী স্রোত দেখা যায়। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বায়ু প্রবাহিত হতে দেখা যায় না। ফলে, বায়ু চলাচল বোঝা যায় না ও চারদিকে শান্ত অবস্থা বিরাজ করে।

শীতকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি হয় না কেন?

শীতকালে সূর্যের দক্ষিণায়নের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে শুষ্ক ও শীতল মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। স্থলভাগের উপর দিয়ে এই বায়ু প্রবাহিত হয় বলে এতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ খুব কম থাকে। ফলে, শীতকালে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের অভাবে এই মৌসুমি বায়ু দ্বারা বৃষ্টিপাত হয় না।

দক্ষিণ গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ুর গতিবেগ বেশি কেন?

উত্তর গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ুর প্রবাহপথে জলভাগ অপেক্ষা স্থলভাগের বিস্তার বেশি হওয়ায় ঘর্ষণজনিত বাধার কারণে বায়ুর গতিবেগ কম হয়। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের বিস্তার বেশি হওয়ায় পশ্চিমা বায়ু এখানে প্রবল গতিতে বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হয়। তাই এখানে পশ্চিমা বায়ুকে ‘সাহসী পশ্চিমা বায়ু’ বা ‘প্রবল পশ্চিমা বায়ু’ বলে। 40° দক্ষিণ অক্ষরেখাকে গর্জনশীল চল্লিশা, 50° দক্ষিণ অক্ষরেখাকে ভয়ঙ্কর পঞ্চাশা (Furious Fifties), 60° দক্ষিণ অক্ষরেখাকে তীক্ষ্ণনিনাদী ষাট (Screaming Sixties) বলে।

মৌসুমি বায়ুকে সাময়িক বায়ু বলার কারণ কী?

সারাবছর প্রবাহিত না হয়ে বছরের বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে সাময়িক বায়ুপ্রবাহ বলে। মৌসুমি বায়ু সারাবছর প্রবাহিত না হয়ে গ্রীষ্ম ও শীত দুটি নির্দিষ্ট ঋতুতে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয় (যেমন – গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে)। তাই মৌসুমি বায়ুকে সাময়িক বায়ু বলা হয়।

পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মকাল অপেক্ষা শীতকালে বেশি বৃষ্টিপাত হয় কেন?

শীতকালে উপক্রান্তীয় অঞ্চলে (35°-60° অক্ষাংশ) সমুদ্র অপেক্ষা স্থলভাগ অধিক শীতল থাকে এবং স্থলভাগের অনেকাংশ বিশেষত উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে। ফলে, শীতকালে পশ্চিমা বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় শীতল ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এলে ঘনীভবনের হার দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে অধিক বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়।

কখন বায়ু দ্রুত গতিতে ও কখন ধীর গতিতে প্রবাহিত হয়?

অথবা, স্থলভাগের তুলনায় জলভাগে বায়ুর গতিবেগ বেশি হয় কেন?

বায়ুর গতিবেগের পার্থক্যের কারণগুলি হল –

  • বায়ুচাপের তারতম্য – বায়ু সাধারণত উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। দুটি অঞ্চলের মধ্যে চাপের পার্থক্য যত বেশি হয়, বায়ু তত দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হয় এবং চাপের পার্থক্য কমলে বায়ু ধীর গতিতে প্রবাহিত হয়।
  • স্থলভাগ ও জলভাগের অবস্থান – স্থলভাগের ওপর অবস্থিত পাহাড়, পর্বত, ঘরবাড়ি, গাছপালা প্রভৃতি বায়ুর প্রবাহপথে ঘর্ষণজনিত বাধার সৃষ্টি করে। ফলে বায়ুর গতিবেগ কম হয়। কিন্তু জলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বায়ু এরূপ কোনো ঘর্ষণজনিত বাধায় বাধাপ্রাপ্ত হয় না। তাই জলভাগের উপর বায়ুর গতিবেগ বেশি হয়।

কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়কে ‘শান্তবলয়’ বলার কারণ কী?

উভয় গোলার্ধে 25°-35° অক্ষরেখার মধ্যে অবস্থিত ক্রান্তীয় (কর্কটীয় ও মকরীয়) উচ্চচাপ বলয়ে নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে বিক্ষিপ্ত হওয়া বায়ু শীতল ও ভারী হয়ে নীচের দিকে নামতে থাকে। ফলে বায়ুর অনুভূমিক প্রবাহ না হওয়ায় বায়ুপ্রবাহ বোঝা যায় না। বলয় দুটিতে শান্তভাব বিরাজ করে। তাই কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়কে ‘শান্তবলয়’ বলা হয়।

মেরু বায়ু শীতল হয় কেন?

মেরু বায়ু মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় (80°-90° উত্তর/দক্ষিণ) থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর এই দুই মেরুদেশীয় অংশে সূর্যরশ্মি সারাবছরই অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ায় উষ্ণতা প্রায় হিমাঙ্কের নীচে থাকে। এই অতিশীতল অঞ্চল থেকে মেরু বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় এই বায়ুও অত্যন্ত শীতল হয়।

অশ্ব অক্ষাংশ বরাবর পালতোলা জাহাজগুলি গতিহীন হয়ে পড়ত কেন?

অশ্ব অক্ষাংশ অর্থাৎ, উভয় গোলার্ধে 25°-35° অক্ষাংশের মধ্যে কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে শীতল ও ভারী বায়ুর নিম্নমুখী স্রোত লক্ষ করা যায়, বায়ুর কোনো অনুভূমিক প্রবাহ দেখা যায় না। ফলে, বায়ুপ্রবাহের অভাবে এখানে পালতোলা জাহাজগুলি গতিহীন হয়ে পড়ত।

ভোরবেলা স্থলবায়ু এবং বিকালবেলা সমুদ্রবায়ুর গতিবেগ বেড়ে যায় কেন?

রাতেরবেলা স্থলভাগের উচ্চচাপ থেকে সমুদ্রের নিম্নচাপের দিকে স্থলবায়ু প্রবাহিত হয়। ভোরের দিকে এই দুই স্থানের চাপের পার্থক্য সর্বাধিক হয়ে পড়ে বলে স্থলবায়ুর গতি বেড়ে যায়। অপরদিকে, দিনেরবেলা সমুদ্রের উচ্চচাপ থেকে স্থলভাগের নিম্নচাপের দিকে সমুদ্রবায়ু প্রবাহিত হয়। ক্রমশ বিকালে বা সন্ধের দিকে এই দুই স্থানের মধ্যে চাপের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি হয়। তাই এই সময় সমুদ্রবায়ুর গতিবেগ বেড়ে যায়।

প্রতীপ ঘূর্ণবাতে শান্ত আবহাওয়া বিরাজ করে কেন?

প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ু উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে চারদিকের নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের মধ্যে পার্থক্য কম হওয়ায় বায়ুর গতিবেগ কম হয়। আবার, এই বায়ু নিম্নমুখী হওয়ায় ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকে ও জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে, ঘনীভূত হয়ে মেঘ সৃষ্টি করতে পারে না, বৃষ্টিও হয় না। এই কারণে প্রতীপ ঘূর্ণবাতে মেঘমুক্ত, শান্ত ও রোদ ঝলমলে আবহাওয়া দেখা যায়।

নিরক্ষীয় অঞ্চলের বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি কেন?

নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় উষ্ণতা অনেক বেশি হয়। আবার, নিরক্ষীয় অঞ্চলে স্থলভাগের তুলনায় জলভাগের পরিমাণ বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবে অধিক উষ্ণতায় জল বাষ্পীভূত হয়ে প্রচুর জলীয় বাষ্প বাতাসে মেশে।

দিনে স্থলভাগে নিম্নচাপ ও জলভাগে উচ্চচাপ এবং রাতে স্থলভাগে উচ্চচাপ ও জলভাগে নিম্নচাপ বিরাজ করে। এরকম কেন হয়?

দিনে জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ অতি দ্রুত সূর্যতাপে উষ্ণ হয়ে ওঠে। তাই স্থলভাগে বায়ু হালকা হয়ে পড়ে ও চাপ কম হয়, কিন্তু ওই একই সময়ে জলভাগের উষ্ণতা কম হওয়ায় সেখানে উচ্চচাপ দেখা যায়। আবার, রাতেরবেলা জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে ওঠে, ফলে স্থলভাগে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ওই একই সময়ে কম তাপ বিকিরণের জন্য জলভাগের উষ্ণতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, তাই সেখানে নিম্নচাপ বিরাজ করে।

পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিমাংশে বেশি বৃষ্টি হয় কেন?

উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধের উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হওয়ার সময় সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসার কারণে জলীয় বাষ্প ধারণ করে এসে মহাদেশের পশ্চিমাংশ দিয়ে প্রবেশ করে। তাই এই দুই পশ্চিমা বায়ু মহাদেশের পশ্চিমভাগে বেশি বৃষ্টিপাত ঘটায়।


আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের চতুর্থ অধ্যায় ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল (চতুর্থ অধ্যায়) – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - টীকা

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল (চতুর্থ অধ্যায়) – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল (চতুর্থ অধ্যায়) – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর