আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভেবে বলতো আপেক্ষিক আর্দ্রতার সঙ্গে উষ্ণতার সম্পর্ক কীরকম?
উষ্ণতার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতার সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা হ্রাস পায় এবং উষ্ণতা হ্রাস পেলে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। একটি উদাহরণের সাহায্যে এই সম্পর্ক সহজে বোঝানো যেতে পারে। ধরা যাক, 15°C উষ্ণতায় কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা 60%। এখন ওই বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে যদি 30°C হয়, তাহলে তার জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সুতরাং, একই পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকা সত্ত্বেও ওই বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে হবে প্রায় 30%। আবার, ওই বায়ুর উষ্ণতা কমে গিয়ে যদি 5°C হয়, তাহলে ওই একই পরিমাণ জলীয় বাষ্পতেই ওই বায়ু সম্পৃক্ত হয়ে যাবে, অর্থাৎ, আপেক্ষিক আর্দ্রতা হবে 100%।
বায়ুর জলীয় বাষ্পের ভূমিকা লেখো।
জলীয় বাষ্পের ভূমিকা –
- জলীয় বাষ্প ছাড়া মেঘ সৃষ্টি হতে পারে না। আর মেঘ না হলে বৃষ্টিপাত, তুষারপাত প্রভৃতি অধঃক্ষেপণ ঘটা সম্ভব নয়। তাই, অধঃক্ষেপণ সৃষ্টিতে জলীয় বাষ্পের ভূমিকা অপরিসীম।
- জলীয় বাষ্প সৌরকিরণ ও ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ, উভয়ই শোষণ করে। তাই বায়ুতে জলীয় বাষ্প বেশি হলে উষ্ণতা কিছুটা কম হয়।
- ঘনীভবনের সময় জলীয় বাষ্প লীনতাপ ত্যাগ করে, ফলে বায়ুর উষ্ণতা কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
- বায়ুতে অধিক জলীয় বাষ্প স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।
- বিভিন্ন শিল্পে জলীয় বাষ্পের প্রভাব দেখা যায়। যেমন – বয়নশিল্পের পক্ষে বায়ুর আর্দ্রতা অনুকূল। কিন্তু ময়দা, সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্পক্ষেত্রে অধিক আর্দ্রতা সমস্যার সৃষ্টি করে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কুয়াশা কী কী সমস্যার
কুয়াশা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বাধার সৃষ্টি করে সেগুলি হল –
- মানুষের দৃষ্টির প্রসারতা কমিয়ে দেয়।
- রাস্তায় যানবাহন চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
- বিমান ওঠানামা করতে পারে না।
- পর্বতারোহণে বাধার সৃষ্টি করে।
- ঘন কুয়াশা মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ সিক্ত করে দেয়।
- অতিরিক্ত কুয়াশা বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে দিতে পারে।
সম্পৃক্ত বায়ু (Saturated Air) কাকে বলে? এর বিশেষত্ব বা বৈশিষ্ট্য কী?
সম্পৃক্ত বায়ু (Saturated Air) – কোনো স্থানে নির্দিষ্ট উষ্ণতাযুক্ত বায়ুতে সর্বাধিক যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকা দরকার তার সমস্তটাই যখন সেই বায়ু ধারণ করে, তখন তাকে সম্পৃক্ত বায়ু বা পরিপৃক্ত বায়ু বলে।
সম্পৃক্ত বায়ুর বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব –
- সম্পৃক্ত বায়ু হল এমনই এক বায়ু, যা জলীয় বাষ্প ধারণের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্দেশ করে।
- এই বায়ুতে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প যুক্ত হলে তা ভূপৃষ্ঠেই ফিরে আসে।
- বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কে পৌঁছলে বায়ু সম্পৃক্ত হয়।
- বৃষ্টি বা তুষারপাত সৃষ্টিতে সম্পৃক্ত বায়ুর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
মানবজীবনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস কতখানি প্রয়োজন?
মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে রেডিয়ো, টিভি, খবরের কাগজ প্রভৃতির মাধ্যমে পাওয়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ – আগামী 24 ঘণ্টা বা 48 ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে সমুদ্রে মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতে যায়, বিমান চলাচল হয়, সমুদ্রে জাহাজ চলাচল কিংবা কোনো আগাম খারাপ আবহাওয়ার সতর্কতা নেওয়া যায়। বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেখে কৃষকরা তাদের চাষের প্রস্তুতি নেয়। শৈত্যপ্রবাহ, শিলাবৃষ্টি, হিমানি সম্প্রপাতের আগাম সতর্কতায় মানুষজন ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ করে দেয়। পরিবহণ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং কুয়াশার পূর্বাভাস থাকলে যান চলাচলে আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব হয়।
সিরাস মেঘের বৈশিষ্ট্য লেখো।
সিরাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এটি হালকা পালক সদৃশ একপ্রকার মেঘ।
- বিচ্ছিন্নভাবে বায়ুমণ্ডলে এই মেঘ অবস্থান করে।
- এই মেঘের গঠন অনেকটা রেশম বা তন্তু বুননের মতো।
- আকাশে এই মেঘ থাকা সত্ত্বেও সূর্যকে এর মধ্য দিয়ে দেখা যায়।
- ঘোড়ার লেজের মতো দেখতে হওয়ায় একে ‘Mare’s Tail’ বলে।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘকে ‘বজ্রমেঘ’ বলা হয় কেন?
বজ্রমেঘ বলার কারণ – কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে প্রচুর বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি হয় বলে একে বজ্রমেঘ বলে।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ সাদা, ধূসর ও কালো রঙের হয়।
- এই মেঘের নিম্নদেশ 1,500 ফুট উঁচুতে শুরু হয়ে শীর্ষদেশ প্রায় 12,000 ফুট ঊর্ধ্বে প্রসারিত হয়।
- এই মেঘের তলদেশ সমতল এবং উপরিভাগ চ্যাপটা গম্বুজের মতো।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে পরিচলন বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি হয় কেন?
অথবা, নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রতিদিন বিকেলের দিকে বৃষ্টিপাত হয় কেন?
জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ আর্দ্র বায়ু পরিচলন পদ্ধতিতে সোজা উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে সরাসরি বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে নেমে এলে তাকে পরিচলন বৃষ্টিপাত বলে। নিরক্ষীয় অঞ্চলের 5° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে বিকেল ও সন্ধেবেলা সর্বাধিক পরিচলন বৃষ্টিপাতের কারণগুলো হলো –
- লম্ব সূর্যরশ্মি – নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর প্রায় লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার তাপমাত্রা প্রায় 27°C-30°C থাকে, যার ফলে বাষ্পীভবনও বেশি ঘটে।
- বিস্তীর্ণ জলভাগ – এই অঞ্চলে প্রশান্ত, আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি পরিচলন বৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় জলীয় বাষ্পের জোগান দেয়।
- বায়ুর চাপ ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা – বায়ুর চাপ কম বলে ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ-আর্দ্র বায়ু বিকেলের দিকে দ্রুত শীতল হওয়ায় জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, ফলে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়তে থাকে।
- ঘনীভবন প্রক্রিয়া – অধিক আপেক্ষিক আর্দ্রতায় বায়ু সম্পৃক্ত হয়ে ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় জলকণায় পরিণত হয় এবং পরিচলন বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। উদাহরণ – আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকায় গড়ে 150-300 সেমি বৃষ্টিপাত হয়।

বায়ুমণ্ডলের সব মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত ঘটে না কেন?
বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণা, জলীয় বাষ্প বা ঘনীভূত জলকণার সম্মিলিত রূপ হলো মেঘ। কিন্তু সমস্ত প্রকার মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত ঘটে না, তার কারণগুলি হলো –
- জলকণার ব্যাস – অধিকাংশ সময় মেঘের জলকণার ব্যাস থাকে 10-15 মাইক্রন। যতক্ষণ না এই মেঘের জলকণাগুলির ব্যাস 2 মিলিমিটার বা তার বেশি হয়, ততক্ষণ জলকণাগুলি বৃষ্টিপাত ঘটায় না।
- জলকণার সংযুক্তকরণ – প্রতিটি মেঘ যখন বায়ুমণ্ডলে বিক্ষিপ্তভাবে ভেসে থাকে, তখন মেঘে থাকা বিভিন্ন জলকণা সংযুক্ত হবার সুযোগ পায় না, তাই বৃষ্টিপাতের অবস্থা তৈরি হয় না।
- আপেক্ষিক আর্দ্রতা – বায়ুমণ্ডলীয় আপেক্ষিক আর্দ্রতা 100% না থাকলে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হতে পারে না, তাই বৃষ্টিপাত হয় না।
- মেঘের অবস্থান – বায়ুমণ্ডলের মেঘ ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে চলে এলে তা শিশিরাঙ্কে (Dew Point) পৌঁছোতে পারে না। ফলে, ঘনীভবন না হওয়ার দরুন বৃষ্টিপাত ঘটে না।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে চিরহরিৎ গাছের অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে কেন?
নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে 5°-10° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে রোজউড, আয়রনউড, মেহগনি, আবলুশ প্রভৃতি চিরহরিৎ বৃক্ষের অরণ্য গড়ে উঠেছে। কারণ –
- অত্যধিক উষ্ণতা – এই অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারাবছর লম্বভাবে পতিত হওয়ার কারণে গড়ে প্রায় 27°C উষ্ণতা বিরাজ করে।
- অত্যধিক বৃষ্টিপাত – পরিচলন পদ্ধতিতে সারাবছর গড়ে প্রায় 200-250 সেমির বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
- প্রশস্ত পাতা – উচ্চ তাপমাত্রা ও অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে এখানকার গাছগুলি প্রচুর জল সংগ্রহ করে এবং পাতাগুলি বেশ প্রশস্ত হয়।
- আর্দ্র ভূমিভাগ – ভূমিভাগ সারাবছর আর্দ্র থাকায় এবং এখানকার বৃক্ষগুলির প্রয়োজনীয় জলের কোনো অভাব না থাকায়, এদের পাতাগুলি একসঙ্গে ঝরে পড়ে না। তাই অরণ্যগুলি চিরসবুজ প্রকৃতির হয়।
ভারতে কোন্ ধরনের বৃষ্টিপাত খুব বেশি দেখা যায় এবং কেন?
ভারতে সাধারণত শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ –
ভারতের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হয়। এই উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু আরবসাগরীয় ও বঙ্গোপসাগরীয়—এই দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। আরবসাগরীয় শাখা পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে বাধা পেয়ে পর্বতের প্রতিবাত ঢালে বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং বঙ্গোপসাগরীয় শাখা হিমালয় পর্বতের দক্ষিণ ঢালে ও মেঘালয়ের খাসি, জয়ন্তিয়া প্রভৃতি পাহাড়ে বাধা পেয়ে উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়।
মুম্বাইয়ের তুলনায় পুণেতে বৃষ্টিপাত কম হয় কেন?
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আরবসাগরীয় শাখা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলের পশ্চিমঘাট পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পাহাড়ের পশ্চিম দিকের প্রতিবাত ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত (350-500 সেমি) ঘটায়। মুম্বাই পশ্চিম দিকে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। তারপর এই বায়ু পশ্চিমঘাট পর্বত অতিক্রম করে পূর্ব দিকের দাক্ষিণাত্য মালভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলীয় বাষ্পের ঘাটতির জন্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় (60-65 সেমি)। পুণে পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব দিকে (বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে) অবস্থিত হওয়ায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হয়। তাই মুম্বাইয়ের তুলনায় পুণেতে বৃষ্টিপাত কম হয়।

নিরক্ষীয় অঞ্চলে বিকেলের দিকে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ সৃষ্টি হয় কেন?
নিরক্ষীয় অঞ্চলের 5°-10° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে স্থলভাগ অপেক্ষা জলভাগের পরিমাণ বেশি। যেহেতু এই অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয়, তাই এই অঞ্চলের বাৎসরিক গড় তাপমাত্রাও প্রায় 27°C থাকে। ফলে, এই উচ্চ তাপমাত্রায় এখানকার বিস্তীর্ণ জলরাশি থেকে সৃষ্ট জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পরিচলন পদ্ধতিতে ঊর্ধ্বগামী হয় এবং বিকেলের দিকে তা স্তূপাকার মেঘে পরিণত হয়। এরপর জলীয় বাষ্প আরো বেশি করে যখন ওই মেঘে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ সৃষ্টি করে। প্রসঙ্গত, এই মেঘ থেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত প্রতিদিন বিকেল কিংবা সন্ধ্যার সময় অধঃক্ষিপ্ত হয়।
মৌসুমি বায়ুর কোন্ শাখার প্রভাবে চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত হয় এবং কেন?
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বঙ্গোপসাগরীয় শাখা চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে থাকে। কারণ – মার্চ-মে মাস পর্যন্ত ক্রান্তীয় অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ার কারণে মধ্যভারতে গভীর নিম্নচাপ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয় এবং বঙ্গোপসাগরের জলভাগে উচ্চচাপ বিরাজ করে। এই অবস্থায় বঙ্গোপসাগরীয় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু যখন ভারতে প্রবেশ করে, তার একটি অংশ উত্তর-পূর্বের পার্বত্য অঞ্চলে খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে বাধা পেয়ে চেরাপুঞ্জি-মৌসিনরাম অঞ্চলে বার্ষিক 1300 সেমিরও বেশি শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়।

চেরাপুঞ্জি ও শিলং-এর মধ্যে দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও দুটি জায়গার মধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণগত তারতম্য হয় কেন?
মার্চ-এপ্রিল মাসে কর্কটক্রান্তি রেখা সংলগ্ন (23½° উত্তর) অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় মধ্যভারতে গভীর নিম্নচাপ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। এই সময় বঙ্গোপসাগরীয় অংশে উচ্চচাপ বিরাজ করায় সেখান থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসি পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পর্বতের গা বেয়ে উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে চেরাপুঞ্জিতে প্রায় 11,777 মিমি শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি ঘটায়।
অপরদিকে, চেরাপুঞ্জি থেকে শিলং-এর দূরত্ব মাত্র 56 কিমি হলেও শিলং খাসি পাহাড়ের অনুবাত ঢালে (বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে) অবস্থিত হওয়ায় এখানে মাত্র 2,207 মিমি বৃষ্টি হয়। কারণ, চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত ঘটানোর পর ওই বায়ু যখন শিলং-এ পৌঁছোয়, তখন তাতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যথেষ্ট কমে যায়। এই কারণে চেরাপুঞ্জি ও শিলং-এর মধ্যে দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও বৃষ্টিপাতের পরিমাণগত তারতম্য দেখা যায়।
বাতাসে ধূলিকণা না থাকলে মেঘ ও বৃষ্টি হত না – কারণ কী?
পৃথিবীর বিভিন্ন জলভাগ থেকে জল সূর্যতাপে বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মেশে এবং ধীরে ধীরে বাতাস হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। উপরের শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে ওই জলীয় বাষ্প শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ধূলিকণাকে আশ্রয় করে জলকণায় পরিণত হয় এবং অসংখ্য জলকণা মেঘরূপে আকাশে ভেসে বেড়ায়। মেঘের মধ্যে জলকণাগুলি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড়ো হলে বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে ঝরে পড়ে। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে মেঘ ও বৃষ্টির প্রধান উপাদান জলবিন্দু, যা ধূলিকণা না থাকলে তৈরি হত না। তাই বাতাসে ধূলিকণা না থাকলে মেঘ বা বৃষ্টিও হত না।
বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলতে কী বোঝো?
অথবা, কেন অনুবাত ঢালে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল তৈরি হয়?
অথবা, শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে অনুবাত ঢালে কম বৃষ্টি হয় কেন? – ব্যাখ্যা করো।
বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের সংজ্ঞা – প্রতিবাত ঢালের তুলনায় পর্বতের অনুবাত ঢালে বৃষ্টিপাত খুবই কম হওয়ার কারণে এই দিকের অঞ্চলকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে।
বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল সৃষ্টির কারণ – জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ বায়ু পর্বতের প্রতিবাত ঢাল বেয়ে উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটানোর পর যখন পর্বতের বিপরীত দিকে অনুবাত ঢালে পৌঁছোয়, তখন সেখানে তেমন বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে না, কারণ –
- এই বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ একেবারে কমে যায়।
- এই বায়ু উপর থেকে নীচে নামে বলে এর উষ্ণতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
ফলে বায়ুর জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ু অসম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এই দুই কারণে প্রতিবাত ঢালের তুলনায় অনুবাত ঢালে খুবই কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলা হয়। উদাহরণ – পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব ঢাল এবং মেঘালয়ের রাজধানী শিলং প্রভৃতি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের উদাহরণ।
শুষ্ক অঞ্চলে শিশির কম পড়ে কেন?
বায়ু মধ্যস্থিত জলীয় বাষ্প শীতল ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে দ্রুত ঘনীভূত হয়ে ঘাস বা গাছের পাতার ওপর জলবিন্দুর আকারে সঞ্চিত হলে, তাকে শিশির বলে। অর্থাৎ, শিশির হলো জলীয় বাষ্পের ঘনীভবনের ফলে জলকণায় পরিণত হওয়ার একটি রূপ। শুষ্ক অঞ্চলের বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ খুব কম থাকায় ঘনীভবন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জলীয় বাষ্পের অভাব দেখা যায়। তাই শুষ্ক অঞ্চলে আর্দ্র অঞ্চল অপেক্ষা কম শিশির পড়ে।
শীতকালে জলাশয়ের ওপর কুয়াশা বেশি দেখা যায় কেন?
শীতকালে জলাশয়ের ওপর কুয়াশা বেশি দেখা যায়, তার কারণগুলো হলো –
- শীতকালে সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ে, ফলে গড় তাপমাত্রা অনেক কম থাকে।
- স্থলভাগ অপেক্ষা জলভাগ রাত্রিবেলায় অধিক শীতল থাকে।
- অধিক শীতলতার সংস্পর্শে বায়ুমণ্ডলের মধ্যস্থ জলীয় বাষ্প জলাশয়ের ওপর বেশি পরিমাণে ঘনীভূত হয়ে কুয়াশার সৃষ্টি করে।
শিশির ও কুয়াশা অধঃক্ষেপণ নয় কেন?
শিশির ও কুয়াশা হলো ঘনীভবনের রূপ বিশেষ। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু শীতল স্থানের সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়ে গাছের পাতা ও ঘাসের ওপর শিশির রূপে সঞ্চিত হয়। আবার, জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন অঞ্চলে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ছোটো ছোটো জলকণায় পরিণত হয়ে ধোঁয়ার আকারে কুয়াশা রূপে ভেসে বেড়ায়। অন্যদিকে, বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণা ও তুষার কণায় পরিণত হয়ে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে, তাকে অধঃক্ষেপণ বলে। শিশির ও কুয়াশা যেহেতু ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন অঞ্চলেই সৃষ্টি হয় এবং আকাশ থেকে পতিত হয় না, তাই এরা অধঃক্ষেপণ নয়।

গ্রীষ্মকালে পরিচলন বৃষ্টিপাত বেশি হয় কেন?
গ্রীষ্মকালে কোনো অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বেশি হয়। ফলে বাষ্পীভবনের হার বেশি হওয়ায় জলভাগ থেকে বিপুল পরিমাণ জলরাশি জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। জলীয় বাষ্পের জোগান বৃদ্ধি পাওয়ায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, ফলে জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আয়তনে বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠে পরিচলন বৃষ্টিরূপে অধঃক্ষিপ্ত হয়। তাই, গ্রীষ্মকালে পরিচলন বৃষ্টিপাত বেশি হয়।
বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হয় কেন?
বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হওয়ার কারণগুলি হলো –
- সূর্যরশ্মির পতনকোণ – পৃথিবীপৃষ্ঠে সূর্যকিরণ লম্বভাবে পড়ার ফলে তা জলাশয়ের জলকে বেশি উত্তপ্ত করে, ফলে সেখানে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হয়। আবার যেখানে সূর্যকিরণ তির্যকভাবে পড়ে, সেখানে জলাশয়ের জল কম উত্তপ্ত হয়, ফলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম হয়।
- জলভাগের উপস্থিতি ও বায়ুর উষ্ণতা – যে স্থানে জলভাগের বিস্তৃতি বেশি, সেই অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বাষ্পীভবনের হার বেশি হয় এবং জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বেশি হয় (যেমন – নিরক্ষীয় অঞ্চল)। আবার কোনো স্থানে জলভাগের বিস্তৃতি বেশি হওয়া সত্ত্বেও উষ্ণতা যদি কম হয়, তবে বাষ্পীভবনের হার কম হওয়ায় বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও কম হয়।
- অরণ্যের উপস্থিতি – গভীর অরণ্যভূমিতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। অথচ স্বল্প অরণ্যযুক্ত অঞ্চলে বা মরু অঞ্চলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম হয়। এর কারণ, অরণ্যরাজির প্রস্বেদন বা বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর জলীয় বাষ্প বাতাসে যুক্ত হয়।
মেঘমুক্ত রাত্রি অপেক্ষা মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি বেশি গরম হয় কেন?
আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে সূর্য থেকে আগত তাপ বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি বিকিরিত হয়ে রাত্রির মধ্যে পৃথিবীকে সহজেই ঠান্ডা করে তাপের ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু রাত্রি মেঘাচ্ছন্ন হলে বায়ুমণ্ডলে থাকা মেঘ ওই তাপের বিকিরণে বাধা দেয়। ফলে পুনরায় ওই উত্তাপ ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তরকে গরম করে আবহাওয়াকে ক্রমশ গুমোট করে তোলে। তাই মেঘমুক্ত রাত্রি অপেক্ষা মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি বেশি উত্তপ্ত হয়।

শরৎকালে বা শীতকালে ভোরবেলা ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটলে পা ভিজে যায় কেন?
শরৎকালে বা শীতকালে মেঘমুক্ত রাতে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে অধিক শীতল হয়ে পড়ে। ফলে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলবিন্দুতে পরিণত হয় এবং ভোররাতে ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দুরূপে জমা হতে থাকে। তাই ভোরবেলা ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটলে পা ভিজে যায়। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এই শিশির বিন্দুগুলি ক্রমশ বাষ্পীভূত হয়ে যায়।
শহরাঞ্চলে বা শিল্পাঞ্চলে কুয়াশা খুব বেশি দেখা যায় কেন?
শহরাঞ্চলে বা শিল্পাঞ্চলে প্রচুর যানবাহন চলাচল ও শিল্পকারখানার অবস্থানের জন্য বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা, কার্বন কণা ও ছাই ভাসতে থাকে। ভোররাতে ভূপৃষ্ঠ অত্যন্ত শীতল হয়ে পড়লে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুর জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে এইসব
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment