অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন – টীকা

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের সপ্তম অধ্যায় ‘মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন’ থেকে কিছু ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Contents Show

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল সপ্তম অধ্যায়: মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

স্থিতিশীল উন্নয়ন (Sustainable Development) সম্পর্কে টীকা লেখো। 

স্থিতিশীল উন্নয়নের সংজ্ঞা – ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন (Brundtland Commission)-এর মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ না করে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর জন্য যে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাকে স্থিতিশীল উন্নয়ন (Sustainable Development) বলা হয়।

স্থিতিশীল উন্নয়ন

স্থিতিশীল উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ –

  • জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • জল, বায়ু, সৌরশক্তি প্রভৃতি প্রবহমান সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি।
  • বিভিন্ন দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বনসৃজনের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা।
  • বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সৌহার্দ্য স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।
  • দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন করা।
  • পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা।
  • প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা ও গুরুত্ব অনুযায়ী তাদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা প্রভৃতি।

চিপকো আন্দোলন (Chipko Movement) সম্পর্কে টীকা লেখো। 

অথবা, সুন্দরলাল বহুগুণার পরিবেশ আন্দোলন সম্পর্কে লেখো। 

চিপকো আন্দোলনের স্থান – ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশের গাড়োয়াল জেলার মণ্ডল গ্রাম।

চিপকো আন্দোলনের সময় – 1973 সালের এপ্রিল মাস।

চিপকো আন্দোলনের নামকরণ – ‘চিপকো’ শব্দের অর্থ চেপে ধরা বা জড়িয়ে ধরা। এই আন্দোলনটি ছিল গাছ কাটার বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। ঠিকাদাররা গাছ কাটতে এলে গ্রামবাসী মহিলারা গাছকে জড়িয়ে ধরতেন। তাই একে চিপকো আন্দোলন বলে।

চিপকো আন্দোলনের কারণ – হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে নানা সমস্যা তৈরি হয়—অধিবাসীরা প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছিলেন না, ভূমিক্ষয় বেড়ে যায় এবং চাষের জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই সেই অঞ্চলের মানুষ গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন গান্ধিবাদী নেতা শ্রী সুন্দরলাল বহুগুণা ও শ্রী চণ্ডীপ্রসাদ ভাট।

চিপকো আন্দোলনের প্রভাব – হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গাছ কাটার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে ওঠে। বড়ো গাছ কাটা নিষিদ্ধ হয় এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও পরিবেশ সংরক্ষণে উৎসাহিত হয়।

স্থিতিশীল উন্নয়ন

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সম্পর্কে টীকা লেখো। 

গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে যৌথ উদ্যোগে নর্মদা নদী উপত্যকা প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনই নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন নামে পরিচিত।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কারণ – 1961 সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে 30টি বড়ো, 135টি মাঝারি ও 3000টি ছোটো বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। এর ফলে প্রায় 54 হাজার হেক্টর জমি ও প্রচুর বনভূমি নষ্ট হওয়ার এবং 92টি গ্রাম জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এই বিপুল ক্ষতির কথা চিন্তা করে প্রথমে বাবা আমটে এবং পরে মেধা পাটেকর তীব্র আন্দোলন সংঘটিত করেন (যাকে সংক্ষেপে NBA বলা হয়)। 1989 সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় 50 হাজার মানুষ হারসুদ উপত্যকায় সমবেত হয়ে প্রকল্প বন্ধ করার আহ্বান জানান।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের প্রভাব – এই আন্দোলন সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষকে পরিবেশের ওপর বৃহৎ নদীবাঁধ প্রকল্পের ক্ষতিকর দিকগুলি সম্পর্কে সচেতন করেছিল।

সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন (Silent Valley Movement) সম্পর্কে টীকা লেখো।

কেরালার পালঘাট জেলার এক অরণ্যসংকুল ত্রিভুজাকৃতি উপত্যকা হল সাইলেন্ট ভ্যালি। এই গভীর জঙ্গলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক পর্যন্ত শোনা যায় না বলে এর নাম নীরব উপত্যকা বা সাইলেন্ট ভ্যালি।

সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলনে সরকারের পরিকল্পনা – কথিত আছে পাণ্ডবেরা রাজ্য হারিয়ে এই উপত্যকায় এসে বসবাস করেছিলেন। এই উপত্যকার মাঝখান দিয়ে কুন্তি পুমা (পুমা = নদী) খাড়াভাবে নেমে গেছে। এই নদীতে বাঁধ দিয়ে 120-240 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছিল রাজ্য সরকার।

সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলনের কারণ – এই প্রকল্প রূপায়িত হলে যেসব ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, সেগুলি হল –

  • শতাধিক প্রজাতির গাছ, লতা, গুল্ম, ফার্ন, অর্কিড বিনষ্ট হবে,
  • বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গিরগিটি, কেঁচো, ব্যাং, মৌমাছি, মশা, মথ, বোলতা, প্রজাপতির স্বাভাবিক জীবন বিপন্ন হবে,
  • খাদ্যশৃঙ্খল (Food Chain), খাদ্য জালিকা (Food Web), শক্তি প্রবাহ (Energy Flow) তথা জীববৈচিত্র্য (Bio-diversity) নষ্ট হবে। উপরোক্ত কারণে কেরালা শাস্ত্রসাহিত্য পরিষদ (KSSP) রাজ্য জুড়ে আন্দোলনে নামে।

সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলনের প্রভাব – পরিবেশপ্রেমী আন্দোলনকারীদের প্রবল চাপে রাজ্য সরকার 1980 সালে সাইলেন্ট ভ্যালি প্রকল্পটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে।

সাইলেন্ট ভ্যালি জাতীয় উদ্যান

তেহরী বাঁধ (Tehri Dam) বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে টীকা লেখো। 

তেহরী বাঁধ (Tehri Dam) বিরোধী আন্দোলনে সরকারি পরিকল্পনা – সোভিয়েত রাশিয়ার আর্থিক সহযোগিতায় উত্তরপ্রদেশের উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের পাদপ্রান্তে গঙ্গা ও ভিলগঙ্গা নদী দুটির সংযোগস্থলে প্রায় 260.5 মিটার উঁচু তেহরী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল –

  • প্রায় 2,70,000 হেক্টর অনাবাদী জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করা,
  • প্রায় 6,40,000 হেক্টর চাষজমিতে উন্নত জলসেচ ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং
  • প্রায় 1000 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা।

তেহরী বাঁধ (Tehri Dam) বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব – সুন্দরলাল বহুগুণার নেতৃত্বে 1977 খ্রিস্টাব্দ এই প্রকল্পটির বিরোধিতায় ‘তেহরী বাঁধ বিরোধী সংগ্রাম সমিতি’ গঠিত হয়।

তেহরী বাঁধ (Tehri Dam) বিরোধী আন্দোলনের কারণ – তাঁদের মতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যেসব ক্ষতি হবে, সেগুলি হল –

  • তেহরী প্রকল্পটি গাড়োয়াল হিমালয়ের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় জলাধারের বিশাল জলরাশির চাপে প্রবল ভূমিকম্প হবে,
  • তেহরী শহরের নিকটবর্তী প্রায় 100টি গ্রাম জলমগ্ন হবে,
  • প্রায় 85,000 মানুষ গৃহহীন হবে,
  • বিস্তীর্ণ উর্বর কৃষিজমি জলমগ্ন ও অনুর্বর হয়ে পড়বে,
  • বিভিন্ন ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্র (হরিদ্বার, হৃষীকেশ, দেবপ্রয়াগ) ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
উত্তরাখণ্ড

গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান (Ganga Action Plan = GAP) সম্পর্কে টীকা লেখো। 

ভারতের জাতীয় সম্পদ তথা সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী গঙ্গা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে গঙ্গার জল দূষিত হচ্ছে, যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় 1986 সালের 14 জুন গঙ্গার তীরে বারাণসী শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গঙ্গা উন্নয়ন প্রকল্পের’ (Ganga Action Plan) শুভ সূচনা করেন।

গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের কর্মসূচি –

এই প্রকল্পের কর্মসূচিগুলি হল –

  • নর্দমার ও খালের দূষিত জল সরাসরি গঙ্গায় না ফেলা,
  • দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত জল ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য জল দূষণমুক্ত করে গঙ্গায় ছাড়তে হবে,
  • স্নানের ঘাট মেরামত ও সৌন্দর্যায়ন করা,
  • শ্মশান ঘাটে বৈদ্যুতিক চুল্লি নির্মাণ করা,
  • স্যানিটারি-শৌচাগার নির্মাণ করা,
  • গঙ্গার ভাঙন প্রতিরোধ করা ও গঙ্গার পাড় বাঁধানো,
  • শিল্পকেন্দ্রগুলির দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা,
  • গঙ্গায় ন্যূনতম জলপ্রবাহের ব্যবস্থা করা,
  • জনমত গঠন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা,
  • উপযুক্ত কঠোর ‘পরিবেশ আইন প্রণয়ন’ ও আইনের বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের অধীনস্থ এলাকা

ফুকুশিমা রাসায়নিক দুর্ঘটনা (Fukushima Chemical Accident) সম্পর্কে টীকা লেখো। 

অথবা, একটি সাম্প্রতিক রাসায়নিক দুর্ঘটনা সম্পর্কে টীকা লেখো। 

পারমাণবিক শক্তি থেকে সস্তায় প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও এই শক্তি মোটেই পরিবেশবান্ধব নয়। কোনো প্রাকৃতিক কারণ (ভূমিকম্প, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি) অথবা যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা কর্তব্যরত মানুষদের অবহেলায় যদি সেখানকার পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে, তবে সেখানকার নাগরিকদের জীবন বিপন্ন হতে বাধ্য। যেমন – 2011 সালের 11 মার্চ জাপানের টোকিও শহরে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তার প্রভাবে সৃষ্ট ‘সুনামি’-র আঘাতে ফুকুশিমার পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রায় 3 লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফুকুশিমা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য, তদন্ত কমিটি বলছে, জাপানিদের গাফিলতির জন্য এই পরমাণু দুর্ঘটনা ঘটেছিল, কারণ ফুকুশিমার পারমাণবিক চুল্লিগুলি ভূমিকম্প ও সুনামি প্রতিরোধক ছিল না।

ফুকুশিমা রাসায়নিক দুর্ঘটনা

ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা (Bhopal Gas Tragedy) সম্পর্কে টীকা লেখো।

1984 সালের 3 ডিসেম্বর গভীর রাতে মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানির কীটনাশক তৈরির কারখানায় ‘মিথাইল আইসোসায়ানেট’ বা সংক্ষেপে MIC গ্যাস ভরতি 2-3টি ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে, এই বিষাক্ত গ্যাস চারপাশে প্রায় চল্লিশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ফলাফল –

1. এই দুর্ঘটনার ফলে আশপাশের অঞ্চলের বহু মানুষ গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা প্রায় 2,900 জন, প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানা (দুর্ঘটনার পর)

2. অনেকে ফুসফুস ও মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হয়।

3. প্রসূতি মায়েরা পরবর্তীকালে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেয়।

4. ভারত সরকার, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের দাবিতে নানা মামলা-মোকদ্দমা করে এই সংস্থার বিরুদ্ধে।

ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার কুপ্রভাব

মিনামাটা বিপর্যয় সম্পর্কে টীকা লেখো।

জাপানের সমুদ্র উপকূলের মিনামাটা অঞ্চলে 1953-1960 সালের মধ্যে পারদসংক্রামিত মাছ খেয়ে প্রায় 100-এর বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং কয়েক হাজার মানুষ রোগাক্রান্ত হয়। এই দুর্ঘটনা মিনামাটা বিপর্যয় নামে পরিচিত।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায় যে, মিনামাটার এক রাসায়নিক কারখানা থেকে পারদ সমুদ্রের জলে মেশে। এই পারদ সহজেই জল থেকে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। অত্যধিক পারদ সংক্রামিত এই মাছ খেয়েই মানুষ রোগাক্রান্ত হয় এবং মারা যায়।

মিনামাটা বিপর্যয়

চেরনোবিল দুর্ঘটনা (Chernobyl Disaster) সম্পর্কে টীকা লেখো।

1986 সালের 28 এপ্রিল ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে 4নং রিঅ্যাক্টরে ঘটা বিপর্যয় ঘটেছিল তা পৃথিবীর পরমাণু দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ও মারাত্মক। এই কেন্দ্রের একটি পরমাণু চুল্লির উষ্ণতা বেড়ে 2000°C-এ পৌঁছোয়, ফলে সেটি গলে যায়। তেজস্ক্রিয় কণা ও ছাই বায়ুপ্রবাহ ও মেঘের মাধ্যমে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে।

চেরনোবিল দুর্ঘটনার প্রভাব –

  • এই দুর্ঘটনায় 31 জনের মৃত্যু ঘটে এবং বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • তেজস্ক্রিয় উপাদানগুলি বৃষ্টির জলে ধুয়ে জল ও মাটিকে দূষিত করে।
  • ওই অঞ্চলের কৃষিজমি এখনো চাষের অনুপযোগী।
  • জমি থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে ছড়িয়ে পড়ে।
  • এই দুর্ঘটনায় যে আলফা, গামা, বিটা রশ্মি বেরোয় তা বায়ুমণ্ডলকে ব্যাপকভাবে দূষিত করে। বিজ্ঞানীদের অনুমান যে, চেরনোবিলের পরিবেশে এই দুর্ঘটনার প্রভাব আগামী 100 বছর ধরে থাকবে।
চেরনোবিল দুর্ঘটনা

বসুন্ধরা সম্মেলন (Earth Summit) সম্পর্কে টীকা লেখো।

রাষ্ট্রসংঘের তত্ত্বাবধানে 1992 সালের 3-14 জুন ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলি পর্যালোচনা করার জন্য Earth Summit বা বসুন্ধরা সম্মেলন আয়োজিত হয়। পরিবেশের প্রাকৃতিক বা আর্থ সামাজিক নানান সমস্যা সমাধানের জন্য, স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে 21 দফা কর্মসূচি গৃহীত হয় যা এজেন্ডা21 নামে খ্যাত। যেমন –

  • জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ,
  • দারিদ্র্য দূরীকরণ,
  • ভূমিসম্পদের সার্বিক পরিকল্পনা,
  • বাস্তুতন্ত্র রক্ষা,
  • তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত বন্দোবস্ত করা,
  • সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষা,
  • জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার,
  • অরণ্য বিনাশ রোধ করা ইত্যাদি।

এই সম্মেলনে পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে পরিবেশ সংক্রান্ত দায়দায়িত্বের জন্য বিতর্ক দেখা দেয়, যা উত্তর-দক্ষিণ বিতর্ক বা North-South Debate নামে পরিচিত।

চেরনোবিল দুর্ঘটনা

গ্রিনবেঞ্চ (Green Bench) সম্পর্কে টীকা লেখো।

ভারতে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্টগুলিতে পরিবেশ সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বেঞ্চ বসানোর ব্যবস্থা হয়েছে। এটি গ্রিনবেঞ্চ বা পরিবেশ আদালত নামে পরিচিত। আমাদের রাজ্যে কলকাতা হাইকোর্টে 1986 সালে এই বেঞ্চ গঠিত হয়।

এই আদালতে অভিযোগের ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে –

  • বেআইনি পুকুর বা জলাশয় ভরাট,
  • গাছকাটা,
  • শিল্পকারখানাগুলির দূষণ,
  • যানবাহনের দূষণ,
  • জঞ্জাল থেকে দূষণ,
  • ক্ষতিকর শব্দদূষণ ইত্যাদি।

জনসাধারণ যাতে সহজেই গ্রিনবেঞ্চের সুবিধা নিতে পারে তার জন্য আইনবদ্ধ আপিল ছাড়াও একটি চিঠি লিখে আপিল করার সুবিধা আছে।।

বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) সম্পর্কে টীকা লেখো।

মানুষের অবিবেচিত কার্যকলাপ এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4), জলীয় বাষ্প, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) প্রভৃতির সামগ্রিক কার্যকলাপে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঘটনাই বিশ্ব উষ্ণায়ন নামে পরিচিত।

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব –

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বেড়ে গেলে –

  • মেরু অঞ্চলের বরফ গলে গেলে সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলি প্লাবিত হবে।
  • দাবানল সৃষ্টির মাধ্যমে বনভূমি ব্যাপক পরিমাণ ধ্বংস হবে।
  • পৃথিবীর কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
  • প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের কাঠামো ধ্বংস হবে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব

মরুকরণ (Desertification) সম্পর্কে টীকা লেখো।

পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে মরু অঞ্চলের আয়তন বৃদ্ধিকে মরুকরণ বলা হয়।

মরুকরণের কারণ –

  • অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মরুভূমি সংলগ্ন বৃক্ষচ্ছেদন,
  • মরুপ্রান্তে অবাধ চাষ-আবাদ করা,
  • কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার,
  • অবাধ পশুচারণ,
  • মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করা,
  • অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত জলসেচ করায় মাটিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি প্রভৃতি।

মরুকরণের গুরুত্ব – সম্প্রতি পৃথিবীর প্রায় 20% অঞ্চলের এবং প্রায় 10 কোটি মানুষ মরুকরণের ফলে ক্রমশ বাস্তুহারা হয়ে চলেছে।

মরুকরণ

আর্সেনিক দূষণ (Arsenic Contamination) সম্পর্কে টীকা লেখো।

ভৌমজল কিংবা পানযোগ্য প্রতি লিটার জলে বিষাক্ত ধাতব যৌগ আর্সেনিক 0.05 মিলিগ্রামের (mg) বেশি থাকলে জলটি আর্সেনিক দূষণের পর্যায়ে আসে।

আর্সেনিক দূষণের সৃষ্টির কারণ – অবৈজ্ঞানিক প্রথায় ক্রমাগত ভৌমজল আহরণের ফলে মৃত্তিকায় সৃষ্ট ফাঁকা স্তরে থাকা মুক্ত আর্সেনিক বাতাসের সংস্পর্শে এসে বিষাক্ত আর্সেনেট লবনে পরিণত হয় এবং জলে দ্রবণীয় হয়ে ভৌমজলকে দূষিত করে।

আর্সেনিক দূষণের প্রভাব –

  • মানুষের ত্বক, স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
  • হাতের চেটো ও পায়ের তলায় কালো ছোপ সৃষ্টি করে, একে ব্ল্যাকফুট রোগ বলে।
  • ফুসফুস প্রদাহ, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাসমার সৃষ্টি করে।
  • যকৃতের পচন, ত্বক ও মূত্রথলির ক্যানসারও আর্সেনিক দূষণের ফলে ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গের জেলাভিত্তিক আর্সেনিক এর পরিমাণ

ফাইলিন (Phailin) সম্পর্কে টীকা লেখো।

2013 সালের 12 অক্টোবর ওড়িশার গোপালপুর এলাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে যে ঘূর্ণিঝড় তাণ্ডব চালায় তা ফাইলিন নামে পরিচিত।

ফাইলিনের প্রকৃতি – এই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় 210-220 কিমি।

ফাইলিনের প্রভাব –

  • ঝড়ের দাপটে গাছপালা, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • ইলেকট্রিকের তারসহ খুঁটি উপরে পড়ে।
  • সমুদ্রের জল রাস্তায় চলে এসে রাস্তাকে প্লাবিত করে।
  • বহু গবাদিপশু মারা যায়।
  • কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘূর্ণিঝড় ফাইলিনের গতিপথ

গ্রিন হাউস প্রভাব (Green House Effect) সম্পর্কে টীকা লেখো।

শীতের দেশে শাকসবজি চাষ করার জন্য কাচের ঘর তৈরি করা হয়। এই ঘরে ক্ষুদ্র তরঙ্গরূপে আসা সূর্যের আলো সহজে প্রবেশ করে, কিন্তু বৃহৎ তরঙ্গরূপে বেরোনোর সময় কাচের দেয়াল বাধা দেয়। ফলে, কাচের ঘরের ভিতরের শাকসবজি প্রয়োজন মতো আলো ও তাপ পেয়ে থাকে। এই কাচের ঘরে সবুজ শাকসবজি চাষ হয় বলে একে বলা হয় গ্রিন হাউস বা সবুজ ঘর। তাপ আসে রাতে সেই তাপ বৃহৎ তরঙ্গরূপে ফিরে যায়। কিন্তু বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি মিলিতভাবে বায়ুমণ্ডলে কাচের দেয়ালের মতো অদৃশ্য গ্যাসীয় স্তরের সৃষ্টি করেছে। এই স্তর পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে ফিরে যাওয়া তাপকে কিছুটা শুষে নেয়। ফলে, বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। একেই গ্রিনহাউস প্রভাব বলে।

গ্রিনহাউস

ঝুমচাষ (Jhum Cultivation) সম্পর্কে টীকা লেখো।

উত্তর ও উত্তর-পূর্বের পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিকৃত একটি প্রাচীন কৃষিপ্রথা হল ঝুমচাষ।

ঝুমচাষের পদ্ধতি – এখানে উপজাতিরা বনজঙ্গল পুড়িয়ে সেই ছাই মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে বিভিন্ন নিম্নমানের ফসল (কাসাভা, ট্যাপিওকা প্রভৃতি) চাষ করে।

ঝুমচাষের প্রভাব –

  • এই চাষের মাধ্যমে স্থানীয় অরণ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।
  • বনভূমি পোড়ানোর ছাই স্থানীয় বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে।
  • প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঝুমচাষের উদাহরণ – ভারতে মেঘালয়ের খাসি, জয়ন্তিয়া পাহাড়ে ঝুমচাষ হয়।

ঝুমচাষ

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের সপ্তম অধ্যায় ‘মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন’ থেকে কিছু ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর