আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’-এর উপবিভাগ ‘দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির স্কুল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক (চাকরির) পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য (গুরুত্বপূর্ণ টীকা)
আটাকামা ও প্যাটাগোনিয়া মরুভূমি সম্পর্কে টীকা লেখো।
আটাকামা মরুভূমি –
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলীয় সংকীর্ণ অঞ্চল, পশ্চিমে ঢালু ও খাড়া ঢালবিশিষ্ট হয়ে আন্দিজ পর্বতের সঙ্গে মিশেছে। চিলি ও পেরুর সীমানা বরাবর অবস্থিত এই উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যভাগে আটাকামা নামে প্রায় 1,100 কিমি লম্বা মরুপ্রায়ভূমি বিরাজ করছে। এটি পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক ও খরাপ্রবণ অঞ্চল।
আটাকামা মরুভূমির জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য –
- এখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ এবং শীতকাল বেশ শীতল।
- বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 25 সেমির কম এবং এটি দক্ষিণ আমেরিকার শুষ্কতম অঞ্চল।
প্যাটাগোনিয়া মরুভূমি –
দক্ষিণে আর্জেন্টিনার পশ্চিমে প্রাচীন শিল্ড অঞ্চল প্যাটাগোনিয়া মরুপ্রায়ভূমি নামে পরিচিত। এটি প্রকৃতপক্ষে টেবিলের ন্যায় আকৃতিবিশিষ্ট মালভূমি, যা বর্তমানে মরুভূমির রূপ নিয়েছে। আন্দিজ পর্বতের পূর্বঢালে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত না হওয়ায় প্যাটাগোনিয়া মরুভূমি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে।
প্যাটাগোনিয়া মরুভূমির জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য –
- এখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও শীতকাল শীতল।
- বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 25 সেমি।

প্যারাগুয়ে নদী সম্পর্কে টীকা লেখো।
প্যারাগুয়ে নদীর উৎস ও পতনস্থল – ব্রাজিলের মাটোগ্রাসো উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে প্যারাগুয়ে নদী দক্ষিণবাহিনী হয়ে গ্রানচাকোর অসংখ্য জলাভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর কোরিয়েন্টিস শহরের নিকট পারানা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য –
- প্যারাগুয়ে হল পারানার উপনদী।
- এই নদীর দৈর্ঘ্য 2,425 কিমি।
- পারানা ও প্যারাগুয়ে যুগ্মনদী হিসেবে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম নদী অববাহিকা সৃষ্টি করেছে।
প্যারাগুয়ে নদীর উপনদী – প্যারাগুয়ের বামতীরের প্রধান উপনদী হলো—মিরান্ডা, অপা এবং ডানতীরের উপনদী হলো—পিল্কোমায়ো, জাউরু প্রভৃতি।

টিটিকাকা হ্রদ সম্পর্কে টীকা লেখো।
টিটিকাকা হ্রদের অবস্থান – পেরু ও বলিভিয়া সীমান্তে অবস্থিত টিটিকাকা দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম ও পৃথিবীর নাব্য হ্রদগুলির মধ্যে উচ্চতম।
টিটিকাকা হ্রদের বৈশিষ্ট্য –
- টিটিকাকা হ্রদ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 3,810 মিটার উচ্চে অবস্থিত।
- হ্রদটির গড় গভীরতা প্রায় 107 মিটার।
- হ্রদটি আন্দিজ পর্বতবেষ্টিত বলিভিয়া মালভূমিতে অবস্থিত এবং আয়তনে যথেষ্ট বড়ো।
- টিটিকাকা হ্রদের ক্ষেত্রমান প্রায় 8,372 বর্গকিমি।
- এই হ্রদে ছোটো ছোটো জাহাজ ও অন্যান্য নৌ-যান চলাচল করে।
- টিটিকাকা হ্রদ থেকে নির্গত দেসাগুয়াদেরো নদী পোপো হ্রদে মিশেছে।

ক্যাম্পোস ও ল্যানোস সম্পর্কে টীকা লেখো।
অবস্থান – দক্ষিণ আমেরিকায় নিরক্ষরেখার উত্তরে ও দক্ষিণে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ক্রান্তীয় তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে নিরক্ষরেখার দক্ষিণে ব্রাজিলের উচ্চভূমিতে যে ক্রান্তীয় তৃণভূমি রয়েছে, তার নাম ক্যাম্পোস। এ ছাড়া, নিরক্ষরেখার উত্তরে ভেনিজুয়েলার ওরিনোকো নদী উপত্যকার ক্রান্তীয় তৃণভূমিকে বলা হয় ল্যানোস।
বৈশিষ্ট্য –
- উভয় প্রকার তৃণভূমির জলবায়ু গ্রীষ্মকালে উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির এবং শীতকালে শুষ্ক প্রকৃতির।
- গ্রীষ্মকালে উষ্ণতা থাকে গড়ে 28°-30°C এবং শীতকালে 22°-25°C।
- এই অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় 100-150 সেমি।
- বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উভয় প্রকার তৃণভূমিতে বিভিন্ন উচ্চতার লম্বা ঘাস (প্রায় 4 মি পর্যন্ত লম্বা) এবং বিচ্ছিন্নভাবে শাল প্রভৃতি গাছ দেখা যায়।
- বছরের বেশিরভাগ সময় এই তৃণভূমি থাকে শুকনো ও হলদে রঙের, কিন্তু বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে এরা সবুজ হয়ে ওঠে।
- তৃণভূমির কোনো কোনো স্থানে গবাদিপশু প্রতিপালন করা হয়।
- তৃণভূমিতে নানা প্রকার তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণী দেখা যায়।
সাভানা তৃণভূমি সম্পর্কে টীকা লেখো।
সাভানা তৃণভূমির অবস্থান – আমাজন অববাহিকার উত্তর ও দক্ষিণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকায় বনভূমি পাতলা ও শেষভাগে তৃণভূমিতে পরিণত হয়। ওরিনোকো অববাহিকা, গিয়ানার উচ্চভূমি, ব্রাজিলের উচ্চভূমির পশ্চিম দিক, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনায় বছরে 50-100 সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে সাভানা তৃণভূমি দেখা যায়।
সাভানা তৃণভূমির জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও আর্দ্র এবং শীতকাল শুষ্ক প্রকৃতির।
- গ্রীষ্মকালে উষ্ণতা থাকে গড়ে 28°-30°C এবং শীতকালে 22°-25°C। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় 50-100 সেমি।
সাভানা তৃণভূমির উদ্ভিদের প্রকৃতি –
- এখানে বড়ো বড়ো ঘাস (4 মিটার দীর্ঘ) জন্মায়।
- ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু বৃক্ষ; যেমন – শাল, সেগুন প্রভৃতি জন্মায়।
সাভানা তৃণভূমির অপর নাম – এই তৃণভূমি ওরিনোকো ও গিয়ানার উচ্চভূমিতে ল্যানোস, ব্রাজিলের উচ্চভূমিতে ক্যাম্পোস এবং আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের উত্তরে গ্রানচাকো নামে পরিচিত।

গ্রানচাকো অরণ্য সম্পর্কে টীকা লেখো।
গ্রানচাকো অরণ্যের অবস্থান – ব্রাজিলের উচ্চভূমির দক্ষিণে পারানা-প্যারাগুয়ে নদী উপত্যকায় বহু মূল্যবান ও পাতাঝরা গাছের অরণ্যকে বলা হয় গ্রানচাকো।
গ্রানচাকো অরণ্যের বৈশিষ্ট্য – গ্রানচাকো একটি তৃণভূমিটি অঞ্চল বিশেষ। তৃণভূমি দেখতে শুকনো ও হলদে রঙের, কিন্তু বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে সবুজ হয়ে যায়।
গ্রানচাকো অরণ্যের উদ্ভিদসমূহ – এই তৃণভূমিতে লম্বা ঘাস, শাল, সেগুন প্রভৃতি গাছ জন্মায়। এইসব উদ্ভিদের কাঠ খুব শক্ত হয়। গ্রানচাকো তৃণভূমিতে কুইব্রাকো নামে বিশেষ এক ধরনের গাছ জন্মায়। এখানে বাবলা গাছের আঠা থেকে মূল্যবান আরবি গঁদ উৎপন্ন হয়।

ব্রাজিলের উচ্চভূমি সম্পর্কে টীকা লেখো।
ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বিস্তীর্ণ উচ্চভূমিকে ব্রাজিল উচ্চভূমি বলা হয়ে থাকে। এই উচ্চভূমিটি প্রাচীন গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ বলে মনে করা হয়। এই অঞ্চল প্রাচীন ব্যাসল্ট আগ্নেয়শিলা, বালি, পাথর ও লাভা দ্বারা গঠিত। অসংখ্য মালভূমি, গোলাকার পাহাড় ও মৃত আগ্নেয়গিরির মোচাকৃতি চূড়া এই উচ্চভূমিতে দেখা যায়।
প্রায় ত্রিভুজের মতো আকৃতিবিশিষ্ট এই উচ্চভূমির গড় উচ্চতা প্রায় 1,000 মিটার। এখানকার উত্তরের প্রধান পর্বতগুলি হলো—সিয়েরা গেরাল ডে গয়াস, চাপাদা ডায়ামানটিনা, সিয়েরা এসপিনহাকো এবং দক্ষিণের পর্বতগুলি হলো—সিয়েরা গেরাল, সিয়েরা দে মন্টিকুয়েরা প্রভৃতি।
এই অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে আমাজন উপত্যকার সমতলভূমিতে মিশে গেছে। এর দক্ষিণাংশ দক্ষিণ-পশ্চিমে ঢালু হয়ে পারানা উপত্যকার সমভূমিতে মিশেছে। পূর্ব উপকূলের সংলগ্ন অংশে এই উচ্চভূমির উচ্চতা বেশি। ব্রাজিল উচ্চভূমির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত পিকো-ডো-বানডাইরা হলো ব্রাজিল উচ্চভূমির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
আন্দিজ পর্বতমালা সম্পর্কে টীকা লেখো।
পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল – দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তরে ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণে হর্ন অন্তরীপ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছে প্রায় 7,200 কিমি দীর্ঘ আন্দিজ পর্বতমালা। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা এবং এর গড় উচ্চতা প্রায় 3,600 মিটার। হিমালয়ের মতো আন্দিজ টার্সিয়ারি যুগে সৃষ্ট নবীন ভঙ্গিল পর্বত।
পর্বতশ্রেণি – পশ্চিম থেকে পূর্বে 3টি পর্বতশ্রেণি নিয়ে আন্দিজ পর্বতমালা শুরু হয়েছে। এরা হল যথাক্রমে –
- কর্ডিলেরা অক্সিডেন্টাল,
- কর্ডিলেরা সেন্ট্রাল এবং
- কর্ডিলেরা ওরিয়েন্টাল।
পর্বতশৃঙ্গ – আন্দিজ পর্বতশ্রেণিতে প্রায় 50টির ওপর সুউচ্চ শৃঙ্গ আছে। আন্দিজের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল অ্যাকোনকাগুয়া (প্রায় 6,960 মিটার), এটি চিলিতে অবস্থিত। অন্যান্য শৃঙ্গগুলি হল –
- বোনেটে (6,872 মিটার),
- ইলিমালি (6,457 মিটার),
- চিম্বোরাজো (6,272 মিটার),
- কটোপ্যাক্সি (5,896 মিটার) প্রভৃতি।
আগ্নেয়গিরি – আন্দিজের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া হল একটি মৃত আগ্নেয়গিরি। কটোপ্যাক্সি ও চিম্বোরাজো হল দুটি বিখ্যাত সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
পর্বতবেষ্টিত মালভূমি – আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্বতবেষ্টিত মালভূমি; যেমন –
- বলিভিয়া মালভূমি (পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতবেষ্টিত মালভূমি),
- ইকুয়েডর মালভূমি,
- অল্টিপ্লানো মালভূমি,
- পেরু মালভূমি প্রভৃতি।
হ্রদ – আন্দিজ পর্বতে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কয়েকটি হ্রদ। যেমন—চিলি ও আর্জেন্টিনায় রয়েছে রাঙ্কো, টোডো, লস-সান্টোস; পেরুর জুনিন; বলিভিয়ার পোপো প্রভৃতি। পেরু ও বলিভিয়ার সীমান্তে অবস্থিত টিটিকাকা পৃথিবীর উচ্চতম হ্রদ।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’-এর উপবিভাগ ‘দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য‘ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির স্কুল বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জন বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ!





Leave a Comment