এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘স্বাধীনতা’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

স্বাধীনতা বলতে কী বোঝো? কী কী বিষয়ে মানুষের স্বাধীনতা প্রয়োজন বলে তুমি মনে করো?
‘স্বাধীনতা’ হল মানবমনের এক জাগ্রত স্বাধিকারবোধ। এই বোধের অন্যতম ভাবটি হল, অন্যের অধীনে না থাকার মানসিকতা। মানুষের মনে অনেক বিষয়েই স্বাধীনতা বা স্বাধিকারবোধ কাজ করে। তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হল— বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কাজ করার স্বাধীনতা, বেঁচে থাকার স্বাধীনতা ইত্যাদি। তবে সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করেন, মানুষের উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতাবোধটি হল আর্থিক স্বাধীনতা।
মানুষ পরাধীন হয় কখন?
মানুষ পরাধীন হয় তখনই, যখন বলপূর্বক কোনো মানুষের স্বাধীন সত্তাকে হরণ করে নেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায় রাজনীতিগতভাবে ক্ষমতা দখল করে, মারণাস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে নেওয়া হয়। এতে মানুষের স্বাধীনতাবোধের অপমৃত্যু হয়। তখনই মানুষ অন্যের অধীন হয়ে পড়ে। নিজের উপর আর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
পরাধীন মানুষের স্বাধীনতা পাওয়ার পথগুলি কী কী?
পরাধীন মানুষ চিরকাল পরাধীনতা বহন করে না। পৃথিবীর রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বারে বারে মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে এবং একসময় সেই দাসত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করে আবার সে পরম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। মানুষের হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার পথ মূলত সংগ্রামের। পরাধীনতা দানকারী বৈরী শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সে অপরাজেয় নয়। কারণ আজ যে শক্তি নমিত, একদিন সে অন্তরের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জেগে উঠবেই। এই হল জীবননীতি। সুতরাং মানুষের একাগ্র ও একত্র সম্মিলনই পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের এক বিশিষ্ট পথ। স্বাধীনতার সপক্ষে নরম নরম বাণী ও অনুনয়-বিনয়ের কোনো মূল্য নেই। অতএব তীব্র গণসংগ্রাম, প্রবল আন্দোলন, আপামর মানুষের একত্রে জেগে ওঠা এবং রাজনৈতিক অভ্যুত্থান দ্বারাই স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব।
‘স্বাধীনতা’ কবিতাটির মধ্যে দুটি ‘পক্ষ’ আছে— ‘আমি-পক্ষ’ আর ‘তুমি-পক্ষ’। এই ‘আমি-পক্ষ’ আর ‘তুমি-পক্ষ’-এর স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। এইক্ষেত্রে ‘সে-পক্ষ’ নেই কেন?
‘স্বাধীনতা’ কবিতাটি একটি অনুবাদ কবিতা, যেখানে কবিতার মধ্যে পরাধীন মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও তার স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়েছে। কবিতাটি অনূদিত এবং ভিনদেশি হলেও এর মধ্যে প্রত্যক্ষরূপ লাভ করেছে এই বিষয়টি যে, পৃথিবীর সব পরাধীন মানুষেরই স্বাধীনতার স্বপ্নলালন ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন বাসনা বুঝি এক। কবিতায় স্পষ্টতই দুটি পক্ষের বিমূর্ত উল্লেখ রয়েছে। একটি ‘আমি-পক্ষ’, যার প্রবক্তা কবিতার কথক; আর অন্যটি ‘তুমি-পক্ষ’, অর্থাৎ যাদের উদ্দেশে কবিতার বাণী বিঘোষিত হয়েছে। ‘আমি’ এই উত্তম পুরুষটি কবিতার কথক, যিনি পরাধীন মানবমনের প্রতীক। বক্তা যাকে উদ্দেশ করে কিছু বলতে চাইছেন অর্থাৎ ‘তোমার’ এই সম্বোধনে যাকে উল্লিখিত করেছেন সেও স্বাধীনতাকামী। কথক স্বাধীনতা কিংবা স্বাধীনতাহীনতা সম্পর্কে তাকে সচেতন করতে চাইছেন। এটি মধ্যম পুরুষ। এখানে ‘সে-পক্ষ’, অর্থাৎ প্রথম পুরুষের অস্তিত্ব নেই। এই পক্ষই সম্ভবত স্বাধীনতা ভোগ করে এবং মানুষকে পরাধীনতা দান করে। বক্তার অভিযোগ এদের বিরুদ্ধেই। কবিতায় এ পক্ষ উহ্য।
‘সময়ে / সবই হবে, কাল একটা নূতন দিন’— কবিতার মধ্যে উদ্ধৃতিচিহ্নের ভিতরে থাকা কথাটি কার / কাদের কথা বলে তোমার মনে হয়? তারা এ ধরনের কথা বলেন কেন?
কবিতার মধ্যে উদ্ধৃতিচিহ্নের ভিতরে থাকা কথাটি তাদের, যারা নিরাশাবাদী; যারা ভাবে বেশ তো আছি, যেমন চলছে তেমন চলুক। আসলে মনুষ্যসমাজে এমন এক প্রকার মানুষ থাকে, যারা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িক সুখকেই বড়ো সুখ বলে মনে করে। দিন চলে গেলেই এদের হয়। এদের মধ্যে প্রতিবাদী-প্রতিরোধী কোনো শক্তি নেই। পরাধীনতায় বা স্বাধীনতাহীনতায় বেঁচে থাকায় যারা সন্তুষ্ট, যারা আত্মসুখী, আজ নয় কাল— করে যাদের দিন চলে, কবিতার কথক এদের আপ্তবাক্যে সন্তুষ্ট নন। তাঁর কাছে আজকের মূল্যই সর্বাধিক। কালের প্রত্যাশায় থেকে ভবিষ্যৎ অন্ধকার করতে চান না তিনি। তারা এ ধরনের কথা এজন্যই বলে, কারণ তারা নিজেদের বর্তমান অবস্থায় যথেষ্ট সন্তুষ্ট। অবস্থা পরিবর্তনের দ্বারা ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে তারা ভয় পায়।
‘আগামীকালের রুটি / দিয়ে কি আজ বাঁচা যায়’— এখানে ‘আগামীকাল’ আর ‘আজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এখানে ‘আগামীকাল’ বলতে দূর ভবিষ্যৎকে নির্দেশ করা হয়েছে আর ‘আজ’ বলতে নিকট ভবিষ্যৎ বা বর্তমানকে নির্দেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘আগামীকাল’ হল সেই ভবিষ্যৎ যা আশার আলো বহন করে নাও আসতে পারে। ‘আজ’ হল ‘এখনই’, যখন আমি আমার প্রয়োজনকে যথার্থ বুঝে নিতে পারি। কবির বক্তব্য— মানুষের যখন ক্ষুধার উদ্রেক হয়, তখন সেই আগুন নেভানোর জন্য তার সেই মুহূর্তেই খাবারের প্রয়োজন। আগামীকাল রুটির ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি থাকলে তাতে জঠরের আগুন নেভে না। ক্ষুধাও প্রবল থেকে প্রবলতর হয়। কাল রুটি পাব বলে আজ প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে থাকা যেমন যায় না, তেমনি কবে স্বাধীনতা পাব এই আশা নিয়ে জীবনধারণ সম্ভব নয়। স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে হয় এবং তা এখনই। মৃত্যু হলে এর আর কী দরকার!
‘মৃত্যুর পরে তো আমার কোনো / স্বাধীনতার প্রয়োজন হবে না,’— পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
স্বাধীনতা হল এক গভীরতম ভোগের বিষয়। কেননা এই জীবনবোধের মধ্য দিয়ে চলমান যে-কোনো মানুষই সার্বিক সুখী। পরাধীন মানুষ কখনও যথার্থ সুখী হতে পারে না। মানুষ যখন বেঁচে থাকে, তখন তার স্বাধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার প্রশ্ন দেখা দেয়। মৃত মানুষের যেহেতু জৈবনিক কোনো লক্ষণ থাকে না, সেহেতু স্বাধীনতা ভোগ করার তার কোনো প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। অতএব যদি স্বাধীনতা প্রয়োজন হয় তবে তা অর্জন করতে হবে এখনই। পরাধীনতায় কাতর হতে হতে মৃত্যু হয় যদি, তবে সে মৃত্যু হবে আক্ষেপের। স্বাধীনতা ভোগ করে জীবনপথ পার হওয়াই শ্রেষ্ঠ বাঁচা।
‘স্বাধীনতা একটা শক্তিশালী বীজপ্রবাহ,’— পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
বীজ হল একটা সত্তা। স্বাধীনতাবোধও তেমনই এক সত্তা, যা বীজাকারে মানবহৃদয়ের অন্দরে নিহিত থাকে। জন্মগ্রহণ করেই মানুষ এক প্রকার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু পিতা-মাতা যদি পরাধীন দেশের নাগরিক হয়, তবে জন্মলাভ করেই পরাধীনতা তার আপনিই অর্পিত হয়। পরাধীন মানুষ যতই নির্যাতিত হোক, তার অন্তরে কিন্তু স্বাধীনতার বীজটি লালিত হতে থাকে হৃদয়ের রসে জারিত হয়ে। বীজ যেমন উপযুক্ত উপাদান পেলে অঙ্কুরিত হয়, তেমনই স্বাধীনতাও বীজপ্রবাহ-স্বরূপ উপযুক্ত ইন্ধন পেলে বোধের প্রসার ঘটায়। কখনো কখনো এই বোধ উন্মাদনার আকার নিয়ে বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে। তখনই স্বাধীনতা অর্জনের পথ পরিষ্কৃত হয়।
‘আমাদেরও তো অন্য সকলের মতন / অধিকার রয়েছে, / দু-পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার, / দু-কাঠা জমির মালিকানার।’— পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
স্বাধীনতার অন্য নাম স্বাধিকার। এই স্বাধিকার বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। তা পল্লবিত হতে হতে জীবনের অজস্র চাহিদাকে স্পর্শ করে স্পর্ধিত হতে পারে। কিন্তু যদি স্বাধীনতা না থাকে, তখন মানুষের মধ্যে গুমরে মরা স্বাধিকার বোধেরই একদিন অপমৃত্যু ঘটে। কবি আপস করে বাঁচতে রাজি নন। তাঁর চাই অধিকার। অন্য সকলের মতো তিনি সেই অধিকারের প্রত্যাশী, যা তাঁর নিজভূমে তাঁকে দু-পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে। অর্থাৎ তিনি চান, সেই ভূমি যা তাঁর নিজস্ব, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেন। যে ভূমিতে শিকড় চালিয়ে তাঁর স্বাধিকারবোধ পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে।
‘স্বাধীনতা আমার প্রয়োজন / তোমার যেমন।’— পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
স্বাধীনতা এমন একটি নিজস্ব জীবনবোধ, যা প্রত্যেক মানুষেরই জন্মগত অধিকার, যা না থাকলে মানুষ জীবস্মৃত। এই স্বাধিকারবোধ অর্জনই তাঁর কাছে একমাত্র প্রত্যাশা। কারণ তিনি বাঁচার মতো বাঁচতে চান। তবে একা স্বাধীনতা অর্জন করে বাঁচা তাঁর প্রত্যাশা নয়। সকলেই স্বাধীনভাবে বাঁচুক এমন বোধে আক্রান্ত কবি স্বাধীনতাবোধকে প্রসারিত করে দিতে চেয়েছেন অন্যান্য স্বাধীনতাপ্রত্যাশীদের অন্তরে। স্বাধীনতা তাঁর নিশ্চিত প্রয়োজন, যেমন অন্যেরও।
‘স্বাধীনতা কোনোদিন আসবে না’— কবির এমন ধারণা কেন হয়েছিল?
কবি অর্থাৎ ‘স্বাধীনতা’ নামক অনুবাদ কবিতার কথক মনে করেন স্বাধীনতা হল মানুষের এক এমন স্বাধিকারবোধ, যা প্রয়োগ করতে গেলে চাই তীব্র আন্দোলন, ভয়ংকর শক্তির প্রবল প্রহার। ভয় বা সমঝোতা নয়, পিছিয়ে পড়া বা আপস নয়, স্বাধীনতার পথে স্বাধীনতা পেতে চাই চাওয়ার অধিকার। তা না হলে কোনোদিনই স্বাধীনতা আসবেবিধা না।
কবির কান কেন পচে গিয়েছিল?
যারা রক্ষণশীল, স্থবির, যারা বড়ো আন্দোলনে শামিল হতে ভয় পায় বা ‘যা পেয়েছি যথেষ্ট পেয়েছি’ ভেবে যারা সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকে, তাদের কথা শুনে কবির কান পচে গিয়েছিল। তাদের বক্তব্য হল— ‘সময়ে/সবই হবে, কাল একটা নূতন দিন।’ কবির বিশ্বাস এই কাল কোনোদিনই আসে না। আজ নয়, কাল হবে— ভেবে বেঁচে থাকতে তিনি রাজি নন।
মৃত্যু হওয়ার পূর্বেই কবি কী, কেন প্রার্থনা করেছিলেন?
মৃত্যু যেভাবেই আসুক না কেন, তা জীবন শেষ হয়ে যাওয়াকেই নির্দেশিত করে। তাই কবির সদম্ভ ঘোষণা— ‘মৃত্যুর পরে তো আমার কোনো / স্বাধীনতার প্রয়োজন হবে না,’ স্বাধীনতা নামক পরম পাওয়াটি তিনি আজই পেতে চান। কারণ তাঁর গভীর বিশ্বাস আগামীকালের রুটি দিয়ে আজ বাঁচা যায় না। তা ছাড়া কবি স্বাধীনতাকে মনে করেছেন একটা শক্তিশালী বীজপ্রবাহ, যা তলে তলে অঙ্কুরিত হয় এবং শিকড় বিস্তার করে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘স্বাধীনতা’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন