অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – ধ্বনি পরিবর্তন

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণের “ব্যাকরণ বিভাগ” থেকে “ধ্বনি পরিবর্তন” নিয়ে আলোচনা করবো। এই অংশ অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অষ্টম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

ব্যাকরণ বিভাগ - ধ্বনি পরিবর্তন - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা
Contents Show

ধ্বনি পরিবর্তন বলতে কী বোঝো?

মানুষের বাগ্যন্ত্রের সহজাত প্রবণতা হল উচ্চারণের সরলীকরণ। আমরা চাই শক্ত উচ্চারণকে নিজেদের মতো করে পালটে ফেলে সহজে উচ্চারণ করতে। বাগ্যন্ত্রের যে স্বাভাবিক ও সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমে এটি ঘটে, সেই রীতিকে বলে ধ্বনি পরিবর্তন। এর ফলে শব্দের অর্থ অক্ষুণ্ণই থাকে কিন্তু শব্দের বহিরঙ্গে নানা রূপান্তর ঘটে যায়। ব্যাকরণে এই পুরো বিষয়টিকেই বলে ধ্বনি পরিবর্তন। যেমন – চন্দ্র > চন্দ > চান্দ > চাঁদ।

ধ্বনি পরিবর্তনের মূল কারণগুলি উল্লেখ করো।

ধ্বনি পরিবর্তনের মূল কারণগুলি হল –

  • উচ্চারণের সুবিধা, অন্যমনস্কতা, আরামপ্রিয়তা, বিকৃতি শব্দমধ্যস্থ ধ্বনির বদল ঘটায়। যেমন – দেশি > দিশি, গামোছা > গামছা ইত্যাদি।
  • কারো উচ্চারণে ত্রুটি থাকলে বা শ্রোতার শুনতে ভুল হলেও অনেক সময় ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে। যেমন – ‘দণ্ড’ উচ্চারণের দোষে হয়ে যায় ‘ডন্ডো’।
  • অনেক সময় ভাষা মধ্যস্থিত শব্দে একটি ধ্বনির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অন্য ধ্বনি বদলে যায়, লোপ পায় বা নতুন ধ্বনি জন্মলাভ করে, ফলে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে।
  • অনেক সময় আবার অন্য জাতির শাসনে বা সুগভীর প্রভাবে একটি জাতির উচ্চারণরীতি ও ধ্বনি পরিবর্তিত হতে পারে।
  • প্রকৃতির কঠোরতা ও কোমলতা মানবচরিত্র গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাকেও প্রভাবিত করে এবং ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ধ্বনি পরিবর্তনের ক-টি ধারা ও কী কী?

ধ্বনি পরিবর্তনের তিনটি ধারা। যথা –

  1. ধ্বনির আগম,
  2. ধ্বনির লোপ,
  3. ধ্বনির রূপান্তর।

ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা ও তার শ্রেণিবিভাগ ছকের মাধ্যমে দেখাও।

ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা ও তার শ্রেণিবিভাগ ছক –

ধ্বনি পরিবর্তন

ধ্বনির আগম বলতে কী বোঝো? উদাহরণ দাও।

উচ্চারণের সুবিধার জন্য যখন কোনো শব্দের আদি, মধ্য বা অন্ত্যে স্বর কিংবা ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটে, তাকে ধ্বনির আগম বলা হয়। যেমন – বেঞ্চ > বেঞ্চি, ধনু > ধনুক ইত্যাদি।

‘স্বরাগম’ বলতে কী বোঝো?

উচ্চারণের সুবিধার্থে কোনো শব্দের আদি, মধ্য বা অন্ত্যে পূর্বে অনুপস্থিত কোনো স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে, তাকে স্বরাগম বলে। যেমন – স্পর্ধা > আস্পর্ধা, শ্লোক > শোলক, রাত্র > রাত্রি।

আদি স্বরাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের আদি বা শুরুতে স্বরধ্বনির আগমকে বলা হয় আদি স্বরাগম। যেমন – স্কুল> ইস্কুল, স্টেট > এস্টেট, স্টক > ইস্টক ইত্যাদি।

স্ক্রু > ইস্ক্রুপ। এখানে যে নিয়মে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটেছে, তা হল –

  1. আদি স্বরাগম
  2. অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম
  3. আদি ও অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম
  4. আদি ও অন্ত্য স্বরাগম

স্ক্রু > ইস্ক্রুপ। এখানে যে নিয়মে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটেছে, তা হল – 1. আদি স্বরাগম।

মধ্য স্বরাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের মধ্যে স্বরধ্বনির আগমনকে বলা হয় মধ্য স্বরাগম। – মধ্য স্বরাগমের অপর নাম স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ। ‘ভক্তি’ কথার অর্থ-পৃথক করে দেওয়া। নতুন স্বর এসে যুক্তব্যঞ্জন দুটিকে আলাদা করা হয় বলে এরূপ নামকরণ। যেমন – চন্দ্র > চন্দোর, জন্ম > জনম, চাকরি > চাকুরি ইত্যাদি।

মধ্য স্বরাগমের একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করো।

মধ্য স্বরাগমের একটি দৃষ্টান্ত হল – নয়ন নয়ান।

অন্ত্য স্বরাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের অন্ত্য বা শেষে স্বরধ্বনির আগমনকে বলা হয় অন্ত্য স্বরাগম। যেমন – বেঞ্চ > বেঞ্চি, দিশ > দিশা, মিষ্ট > মিষ্টি।

ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের আদি, মধ্য বা অন্ত্যে ব্যঞ্জনধ্বনির আগম ঘটলে, তাকে ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন – খোকা খোকন।

ব্যঞ্জনাগম কত প্রকার ও কী কী?

ব্যঞ্জনাগম তিন প্রকার। যথা – 1. আদি ব্যঞ্জনাগম, 2. মধ্য ব্যঞ্জনাগম ও 3. অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম।

আদি ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের আদি বা শুরুতে ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে, তাকে আদি ব্যঞ্জনাগম বলে। বাংলা ভাষায় আদি ব্যঞ্জনাগম প্রায় দুর্লভ। যেমন – ওঝা > রোজা, আম > রাম ইত্যাদি।

শব্দের শুরুতে ব্যাঞ্জনাগম ঘটেছে এমন একটি উদাহরণ দাও।

শব্দের শুরুতে ব্যঞ্জনাগম ঘটেছে এমন একটি উদাহরণ হল – ওঝা > রোজা।

মধ্য ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের ধ্বনিগুলির উচ্চারণকালে আমাদের জিভ অসতর্কভাবে দুটি ধ্বনির মাঝখানে কোনো অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ করে ফেলে এই প্রক্রিয়াকে মধ্য ব্যঞ্জনাগম বলে। বাংলায় এর উদাহরণ বিরল হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোখে পড়ে। যেমন – বানর > বান্দর, পোড়ামুখী > পোড়ারমুখী ইত্যাদি।

‘য়’-শ্রুতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

বাংলায় দুটি স্বরধ্বনি পাশাপাশি থাকলে তাদের মধ্যে ব্যঞ্জনধ্বনির অভাবের কারণে উচ্চারণের যে আড়ষ্টতা অনুভূত হয় তা কাটানোর জন্য ‘য়’-এই অর্ধস্ফুট ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে ‘য়’-শ্রুতি বলা হয়। যেমন – লাঠিআল > লাঠিয়াল, দেআল > দেয়াল ইত্যাদি।

‘ব’-শ্রুতি ঘটার কারণ কী?

দুটি স্বরধ্বনি পাশাপাশি থাকলে তাদের মধ্যে ব্যঞ্জনাধ্বনির অভাবের কারণে উচ্চারণের অসুবিধা সৃষ্টি হয়। এই অসুবিধা দূর করার জন্য অন্তঃস্থ ‘ব’ ধ্বনির আগমনের কারণে ‘ব’-শ্রুতি ঘটে। যেমন – নাআ > নাবা (নাওয়া)। ছাআ > আবা (ছাওয়া)।

অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের অন্ত্যে বা শেষে যুক্তব্যঞ্জন থাকলে উচ্চারণের সুবিধার্থে অনেক সময় ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটে। একে অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন – খোকা > খোকন, জমি > জমিন ইত্যাদি।

ধ্বনির লোপ বলতে কী বোঝায় একটি উদাহরণ দিয়ে দেখাও।

উচ্চারণ করার সময় কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো বর্ণের উপর ঝোঁক দিয়ে উচ্চারণ করার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ একটি বর্ণের উপর জোর দেওয়ার ফলে অন্য একটি ধ্বনি লুপ্ত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ধ্বনিলোপ। যেমন – অতসী > তিসি।

ধ্বনিলোপ কত প্রকার ও কী কী?

ধ্বনিলোপ দু-প্রকার। যথা –

  1. স্বরধ্বনিলোপ ও
  2. ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ।

স্বরধ্বনিলোপ বা স্বরলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

যে প্রক্রিয়ায় শব্দের অন্তর্গত স্বরধ্বনি লুপ্ত হয়, তাকে স্বরলোপ বলে। যেমন – বসু > বোস্ ইত্যাদি।

স্বরলোপ কত প্রকার ও কী কী?

স্বরলোপ তিন প্রকার। যথা –

  1. আদি স্বরলোপ,
  2. মধ্য স্বরলোপ,
  3. অন্ত্য স্বরলোপ।

আদি স্বরলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের আদিতে অর্থাৎ প্রথমে থাকা স্বরধ্বনিটি গৌণ হয়ে ক্রমশ ক্ষীণভাবে উচ্চারিত হয়ে শেষে একেবারে লোপ পেলে তাকে আদি স্বরলোপ বলে। যেমন – উদ্ধার > উধার > ধার (উ-লোপ), অলাবু > অলাউ > লাউ ইত্যাদি।

মধ্য স্বরলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত কোনো স্বরধ্বনির উচ্চারণ ক্ষীণ হতে হতে অবশেষে লুপ্ত হলে তাকে মধ্য স্বরলোপ বলে। যেমন – গামোছা > গামছা, জানালা > জানলা, বসতি > বস্তি ইত্যাদি।

অন্ত্য স্বরলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

স্বাভাবিক উচ্চারণে শব্দের শেষের দিকে শ্বাসের জোর কমে আসে এবং শব্দের শেষে অবস্থিত স্বর ক্ষীণভাবে উচ্চারিত হতে হতে শেষে একেবারে লোপ পেলে তাকে অন্ত্য স্বরলোপ বলে। যেমন – রাশি > রাশ, রাতি > রাত্, ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

পদের আদি, অন্ত্যে বা মধ্যে অবস্থিত ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সুবিধার্থে লুপ্ত হলে, তাকে ব্যঞ্জনলোপ বলে। যেমন-পাদোদক > পাদোক (দ-লুপ্ত)।

ব্যঞ্জনলোপ কত প্রকার ও কী কী?

ব্যঞ্জনলোপ তিন প্রকার। যথা –

  1. আদি ব্যঞ্জনলোপ,
  2. মধ্য ব্যঞ্জনলোপ,
  3. অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ।

আদি ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের আদি বা প্রথমে থাকা ব্যঞ্জনবর্ণের লুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে আদি ব্যঞ্জনলোপ। যেমন – স্থান > থান, স্ফটিক > ফটিক ইত্যাদি।

মধ্য ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের মধ্যে অবস্থিত ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে মধ্য ব্যঞ্জনলোপ। যেমন – বেহাই > বেয়াই, বেহান > বেয়ান, জামাইবাবু > জামাইবু, কার্পাস > কাপাস ইত্যাদি।

অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

শব্দের অন্ত্যে বা শেষে অবস্থিত ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ বলে। যেমন – বড়োদাদা > বড়দা, কাকিমা > কাকি, মামিমা > মামি, মাসিমা > মাসি ইত্যাদি।

ধ্বনির রূপান্তর বলতে কী বোঝো? উদাহরণ দাও।

ধ্বনি যখন লোপ পায় না বা অন্য কোনো নতুন ধ্বনির যখন আগম ঘটে না কিন্তু একে অপরের প্রভাবে যখন একটি ধ্বনি রূপান্তরিত হয়ে অন্য ধ্বনির রূপ লাভ করে, তখন সেই প্রক্রিয়াকে ধ্বনির রূপান্তর বলে। যেমন – করিয়া > কইর‍্যা > করে ইত্যাদি।

ধ্বনির রূপান্তরের প্রকার কী কী?

ধ্বনির রূপান্তর পাঁচ প্রকার। যথা –

  1. স্বরসংগতি,
  2. অপিনিহিতি,
  3. অভিশ্রুতি,
  4. বিপর্যাস,
  5. ব্যঞ্জনসংগতি বা সমীভবন।

স্বরসংগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দমধ্যস্থ অসম স্বরধ্বনি যখন সম বা এক বা প্রায় একরকম হয়ে যায়, তখন তাকে স্বরসংগতি বলে। যেমন – তুলা > তুলো, বুড়া > বুড়ো ইত্যাদি।

পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরের পরিবর্তন বা প্রগত স্বরসংগতির উদাহরণ দাও।

পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরের পরিবর্তনের উদাহরণ বা প্রগত স্বরসংগতির উদাহরণ হল – ছুতার > ছুতোর (পূর্ববর্তী ‘উ’-ধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী ‘আ’-ধ্বনি ‘ও’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)। কুলা > কুলো (পূর্ববর্তী ‘উ’-ধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী আ-ধ্বনি ও-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)। দুটি > দুটো (পূর্ববর্তী ‘উ’-ধ্বনির প্রভাবে ‘ই’-ধ্বনি ‘ও’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)। নৌকা > নৌকো ইত্যাদি (পূর্ববর্তী ‘ও’-ধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী ‘আ’-ধ্বনি ‘ও’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)।

পরবর্তী স্বরের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরের পরিবর্তন বা পরাগত স্বরসংগতির উদাহরণ দাও।

উত্তর পরবর্তী স্বরের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরের পরিবর্তন বা পরাগত স্বরসংগতির উদাহরণ হল – উড়া > ওড়া (পরবর্তী ‘আ’-ধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী ‘উ’-ধ্বনি ‘ও’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)। লিখা > লেখা (পরবর্তী ‘আ’-ধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী ‘ই’ ধ্বনি ‘এ’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)। দেশি > দিশি (পরবর্তী ‘ই’-ধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী ‘এ’-ধ্বনি ‘ই’-ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়)।

অপিনিহিতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

‘অপি’ উপসর্গের অর্থ আগে, নিহিতি শব্দের অর্থ নিয়ে আসা। ‘অপিনিহিতি’ নামটিই প্রক্রিয়াটির ইঙ্গিতবাহী। শব্দের মধ্যে অবস্থিত ‘ই’ বা ‘উ’ ধ্বনির নির্দিষ্ট স্থানের আগেই উচ্চারিত হওয়ার যে প্রবণতা বা রীতি, তাকেই অপিনিহিতি বলা হয়। যেমন – করিয়া > কইর‍্যা, রাখিয়া > রাইখ্যা, কালি > কাইল, আজি > আইজ। মাছুয়া > মাউছুয়া, নাটুয়া > নাউটুয়া ইত্যাদি।

‘ক্ষ’ ও ‘জ্ঞ’ এই দুই ক্ষেত্রে কীভাবে অপিনিহিতি লক্ষ করা যায়?

বাংলা ভাষায় ‘ক্ষ’-র উচ্চারণ ‘খিয়’ আর ‘জ্ঞ’-র উচ্চারণ ‘গাঁ’। এই কারণে শব্দে ‘ক্ষ’, ‘জ্ঞ’ থাকলে অপিনিহিতি ঘটে। যেমন – লক্ষ > লকখ্য > লইক্খো, যজ্ঞ > যগগ্যঁ > যইগগোঁ ইত্যাদি।

অভিশ্রুতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

অপিনিহিতির ফলে আগত ‘ই’-কার ‘উ’-কার পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সঙ্গে সন্ধিযুক্ত হয়ে যে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটায়, তাকে অভিশ্রুতি বলে। যেমন – 

করিয়া > কইয়্যা > করে, ভাবিয়া > ভাইব্যা > ভেবে,
আজি > আইজ > আজ,
মাছুয়া > মাউছুয়া > মেছো,
নটুয়া > নাউটুয়া > নেটো ইত্যাদি।

অভিশ্রুতিকে অপিনিহিতির পরবর্তী স্তর বলা হয় কেন?

অভিশ্রুতিকে অপিনিহিতির পরবর্তী স্তর বলা হয় কারণ অপিনিহিতির কারণে পূর্বে উচ্চারিত ‘ই’ বা ‘উ’-ধ্বনি সন্নিহিত স্বরধ্বনিগুলিকে প্রভাবিত করে, নিজেরাও প্রভাবিত হয় আর এর ফলেই যে ধ্বনি পরিবর্তন হয়, তার নাম অভিশ্রুতি। অর্থাৎ অপিনিহিতি না ঘটলে অভিশ্রুতি হতে পারবে না।

ধ্বনিবিপর্যয় বলতে কী বোঝো?

পদমধ্যস্থ দুই ধ্বনির অবস্থানের পরিবর্তনকে বিপর্যাস বা ধ্বনিবিপর্যয় বলে। অর্থাৎ উচ্চারণের ভুলে ধ্বনির স্থান অদলবদল হয়ে যাওয়াকেই ধ্বনিবিপর্যয় বলে। যেমন – পিশাচ > পিচাশ, বারাণসী > বাণারসী, বাক্স > বাস্ক ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনসংগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

উচ্চারণের সময় পদের মধ্যে অবস্থিত দুটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি পরস্পর এক বা অপরের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে’ অল্পবিস্তর সমতা লাভ করে। এই প্রক্রিয়াকে ব্যঞ্জনসংগতি বা সমীভবন বলে। যেমন – পক্ব > পক্ব, ভক্ত > ভত্ত, চন্দন > চন্নন ইত্যাদি।

সমীভবনকে ব্যঞ্জনসংগতি বলার কারণ কী?

সমী = সমান, ভবন = হওয়া।

ব্যঞ্জনসংগতিতে পূর্ববর্তী বা পরবর্তী ব্যঞ্জনবর্ণের প্রভাবে তার আশপাশের ব্যঞ্জনধ্বনিগুলি পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে সমান বা প্রায় সমান উচ্চারণ হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। সেকারণেই ৪ ব্যঞ্জনসংগতিকে সমীভবন বলা হয়।

ব্যঞ্জনসংগতি কত প্রকার ও কী কী? উদাহরণ দাও।

ব্যঞ্জনসংগতি তিন প্রকার। যথা –

  1. প্রগত ব্যাঞ্জনসংগতি।
  2. পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি।
  3. অন্য ব্যঞ্জনসংগতি।

প্রগত ব্যঞ্জনসংগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী অসম ব্যঞ্জনধ্বনিটি পরিবর্তিত হয়ে পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির মতো রূপ লাভ করলে, তাকে বলে প্রগত ব্যঞ্জনসংগতি। যেমন – পদ্ম > পদ্দ, গল্দা > গল্লা, চন্দন > চন্নন ইত্যাদি।

ভক্ত > ভত্ত – এক্ষেত্রে ধ্বনি পরিবর্তনের কোন্ নিয়মটি লক্ষ করা যায়?

ভক্ত > ভত্ত – এক্ষেত্রে ধ্বনি পরিবর্তনের পরাগত ব্যঞ্জনসংগতির নিয়ম লক্ষ করা যায়।

পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

পরবর্তী ব্যঞ্জনের প্রভাবে পূর্ববর্তী অসম ব্যঞ্জনটি পরবর্তী ব্যঞ্জনের মতো রূপ লাভ করলে, তাকে পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি বলা হয়। যেমন – কপূর > কপপুর, হরতাল > হত্তাল, পাঁচজন > পাঁজ্জন ইত্যাদি।

অন্যোন্য ব্যঞ্জনসংগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী অসম ব্যঞ্জন পরস্পরের প্রভাবে একজাতীয় ব্যঞ্জনে পরিবর্তিত হলে, তাকে বলা হয় অন্যোন্য ব্যঞ্জনসংগতি। যেমন – উৎ + শৃঙ্খল > উচ্ছৃঙ্খল, মহোৎসব > মোচ্ছব ইত্যাদি।

ঠিক বিকল্পটি বেছে নিয়ে বাক্যটি আবার লোখা।

যুক্তি> যুকতি হল –

  1. স্বরভক্তির উদাহরণ
  2. মধ্য স্বরাগমের উদাহরণ
  3. স্বরসংগতির উদাহরণ
  4. অপিনিহিতির উদাহরণ

উত্তর – 1. স্বরভক্তির উদাহরণ

ইঞ্চ > ইঞ্চি – এক্ষেত্রে ঘটেছে –

  1. মধ্য স্বরলোপ
  2. স্বরসংগতি
  3. অন্ত্য স্বরলোপ
  4. অন্ত্য স্বরাগম

উত্তর – 4. অন্ত্য স্বরাগম।

জানালা থেকে জানলা হয়েছে – 

  1. অভিশ্রুতির কারণে
  2. প্রগত সমীভবনের কারণে
  3. অন্যোন্য সমীভবনের কারণে
  4. মধ্য স্বরলোপের কারণে

উত্তর – 4. মধ্য স্বরলোপের কারণে

পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বর পরিবর্তিত হলে তাকে বলা হয় –

  1. মধ্যগত স্বরসংগতি
  2. অভিশ্রুতি
  3. প্রগত স্বরসংগতি
  4. সমীকরণ

উত্তর – 3. প্রগত স্বরসংগতি

ধোঁকা > ধুকো হল। এক্ষেত্রে ঘটেছে –

  1. অন্যোন্য সমীভবন
  2. অনোন্য স্বরসংগতি
  3. অপিনিহিতি
  4. মধ্য স্বরাগম

উত্তর – 2. অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি অসম স্বর, উভয়ে উভয়ের প্রভাবে রূপান্তরিত হয়ে এক বা একজাতীয় স্বরে বদলে গেলে তাকে অন্যোন্য স্বরসংগতি বলা হয়।

শব্দের মধ্যে ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত ‘ই’-কার বা ‘উ’ কারকে সেই ব্যঞ্জনধ্বনির আগেই উচ্চারণ করার রীতিটি হল –

  1. অভিশ্রুতি
  2. ব্যঞ্জনসংগতি
  3. অপিনিহিতি
  4. বিপর্যাস

উত্তর – অপিনিহিতি

রাখিয়া > রাইখ্যা > রেখে। এক্ষেত্রে ঘটেছে –

  1. ধ্বনি-বিপর্যয়
  2. মধ্য স্বরলোপ
  3. অন্ত্য স্বরলোপ
  4. অভিশ্রুতি

উত্তর – 4. অভিশ্রুতি

সমাক্ষরলোপের একটি দৃষ্টান্ত হল –

  1. ফলাহার > ফলার
  2. বড়দিদি > বড়দি
  3. পোষ্য > পুষ্যি
  4. দেশি > দিশি

উত্তর – 2. বড়দিদি > বড়দি

গাত্র > গা। এটি –

  1. অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপের উদাহরণ
  2. মধ্যগত স্বরসংগতির উদাহরণ
  3. অন্যোন্য স্বরসংগতির উদাহরণ
  4. সমাক্ষরলোপের উদাহরণ

উত্তর – 1. অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপের উদাহরণ

একাধিক ধ্বনি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার যোগফল হল –

  1. য়-শ্রুতি
  2. অপিনিহিতি
  3. অভিশ্রুতি
  4. ব-শ্রুতি

উত্তর – 3. অভিশ্রুতি

নীচের শব্দগুলিতে কোন্ ধ্বনি পরিবর্তনের রীতি অনুসরণ করা হয়েছে, তা নির্ণয় করো।

প্রদত্ত শব্দউত্তর
তাম্র > তম্ব > তাঁবাব-শ্রুতি
গোষ্ঠ > গোঠমধ্য ব্যঞ্জনলোপ
গাহে > গায়অন্ত্যব্যঞ্জনলোপ
চারি > চাইর‘ই’-কারের অপিনিহিতি
উডুম্বর > ডুমুরআদি স্বরলোপ
সীমা > সীমানাঅন্ত্য ব্যঞ্জনাগম
খাআ > খাবা‘ব-শ্রুতি
বটু > বটুকমধ্য ব্যঞ্জনাগম
মিশি + কালো > মিশকালোঅন্ত্য স্বরলোপ
রুই > উইআদি ব্যঞ্জনলোপ
দু-এক > দুয়েকয়-শ্রুতি
বিনা > বিনিস্বরসংগতি
কুলিয়ে > কুললেপ্রগত সমীভবন
তৎহিত > তদ্ধিতঅন্যোন্য সমীভবন
রাঁধনা > রান্নাপরাগত সমীভবন
মুকুট > মুটুকধ্বনিবিপর্যাস
চারটি > চাড্ডিঅনোন্য সমীভবন
যতদূর > যদ্দুরপরাগত সমীভবন
কবি > কোবিস্বরসংগতি
হ্রদ > হদ > দহবিপর্যাস

নিম্নলিখিত শব্দগুলির ধ্বনি পরিবর্তন করো –

প্রদত্ত শব্দধ্বনির পরিবর্তন
লাউঅলাবু > অলাউ > লাউ (আদি স্বরলোপ)।
অশথঅশ্বত্থ > অশথ (মধ্য ব্যঞ্জনলোপ)।
রাতরাতি > রাইত > রাত (অভিশ্রুতি)।
জগবন্ধুজগৎ + বন্ধু > জগবন্ধু (অন্ত্য ব্যঞ্জনালোপ)।
ছোড়দাছোটোদাদা > ছোড়দা (সমাক্ষরলোপ)।
কইর‍্যাকরিয়া > কইর‍্যা (অপিনিহিত)।
শোনাশুনা > শোনা (পরাগত স্বরসংগতি)।
সইত্যসত্য > সইত্য (অপিনিহিতি)।
চোখচক্ষু > চউস্ > চোখ (অভিশ্রুতি)।
বচ্ছরবৎসর > বচ্ছর (অন্যোন্য ব্যঞ্জনসংগতি)।
রিশকারিকশা > রিশকা (ধ্বনিবিপর্যয়)।
যদ্দুরযতদূর >যদ্দুর (পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি)।
ভাইব্যাভাবিয়া > ভাইব্যা (অপিনিহিত)।
আনলাআলনা > আনলা (ধ্বনিবিপর্যয়)।
মোচ্ছাবমহোৎসব > মোচ্ছব (অন্যোন্য ব্যঞ্জনসংগতি)।

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণের “ব্যাকরণ বিভাগ” থেকে “ধ্বনি পরিবর্তন” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই অংশটি অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অষ্টম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ব্যাকরণ বিভাগ - বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয় - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়

অষ্টম শ্রেণি - বাংলা - ব্যাকরণ বিভাগ- বাক্যের ভাব ও রূপান্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বাক্যের ভাব ও রূপান্তর

ব্যাকরণ বিভাগ - দল - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – দল

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বাক্যের ভাব ও রূপান্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – ধ্বনি পরিবর্তন

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – দল

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর