এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দ্বিতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘বনভোজনের ব্যাপার’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
বিংশ শতকের বাংলা উপন্যাস ও ছোটোগল্পের বিশিষ্ট লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় 1917 খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুরের বালিয়াডাঙ্গীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস বাংলাদেশের বরিশালের বাসুদেবপাড়া। তাঁর আসল নাম তারকনাথ, কিন্তু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নামে লেখা শুরু করেন এবং এই নামেই পরিচিত হন। 1941 খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ পাস করেন। বাংলা সাহিত্যে ছোটোগল্প বিষয়ে গবেষণার জন্য ডি.লিট উপাধি পান। কলকাতার সিটি কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনার পর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন এবং অল্পদিনেই কৃতী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ছাত্রজীবনে কবিতা রচনায় ব্রতী হলেও পরে গল্প, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি রচনায় বিশিষ্টতার পরিচয় দেন। সমালোচনা ও সাংবাদিকতায় কৃতিত্ব দেখান। ‘বসুমতি’ পত্রিকার পক্ষ থেকে সংবাদসাহিত্যের জন্য প্রথম পুরস্কার পান। পরে ‘দেশ’ পত্রিকায় নিয়মিত ‘সুনন্দ’ ছদ্মনামে মজাদার রচনায় পাঠকহৃদয় জয় করেন। কয়েকটি চিত্রনাট্য রচনাতেও তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় আছে। তাঁর ‘উপনিবেশ’ (তিন খণ্ড), ‘বীতংস’ (গল্পগ্রন্থ), ‘সূর্যসারথি’, ‘তিমিরতীর্থ’, ‘আলোর সরণি’, ‘শিলালিপি’, ‘বৈতালিক’, ‘ইতিহাস’, ‘একতলা’, ‘পদসঞ্চার’, ‘সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী’ প্রভৃতি রচনাকর্ম বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। ছোটোদের জন্য টেনিদার কীর্তি-সমন্বিত রচনাগুলি সমস্ত শ্রেণির পাঠককে মুগ্ধ করে। 1970 খ্রিস্টাব্দের 8 নভেম্বর তাঁর লোকান্তর ঘটে।
উৎস
‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পটি ‘টেনিদা সমগ্র’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
পাঠপ্রসঙ্গ
বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ সৃষ্টি পটলডাঙার টেনিদা চরিত্র। এই চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় অমরত্ব পেয়েছেন। সমস্ত শ্রেণির পাঠক তথা শিশু ও কিশোরদের কাছে ভীষণ প্রিয় এই চরিত্রটি। মজাদার, পেটুক এবং দুঃসাহস দেখানোর প্রয়াস—তা যে যথার্থ নয়—সেটা যখন বোঝা যায়, তখন পাঠকচিত্ত অনাবিল আনন্দে ভরে যায়। বনভোজনের পরিকল্পনা, যাত্রাপথের বর্ণনা এবং বাগানবাড়িতে পৌঁছোনোর পর কীভাবে বনভোজন ফলভোজনে সমাপ্ত হল—তার জীবন্ত চিত্র অঙ্কিত। সরস বর্ণনার গুণে গল্পটি শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার রেশ থেকে যায়। এজন্য পাঠ্যগল্পটি রসসম্পৃক্ত ও চিত্তগ্রাহী সম্পদ হয়ে থাকবে।
বিষয়সংক্ষেপ
হাবুল সেন, টেনিদা, ক্যাবলা বনভোজনের রান্নার আলোচনায় তৎপর ছিল। হাবুল কয়েকটি ভালো খাবারের প্রসঙ্গ তুললে ভোজনরসিক টেনিদার উৎসাহের অবধি নেই। বক্তা প্যালা অতি সাধারণমানের প্রতিদিনের জীবনযাপনের মতো রান্নার প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে টেনিদা ক্রুদ্ধ হয় এবং ক্যাবলার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাবুল তৎপর হয় এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে ঠিক হয়—পিকনিকের জন্যে ভালো রান্না না হলে চলে না।
খরচের বহর দেখে আলোচনা বাতিল হয় এবং শেষপর্যন্ত চড়ুইভাতিতে খিচুড়ির পরিকল্পনা অনুযায়ী কে কী আনবে তা চূড়ান্ত হয়। খিচুড়ির সঙ্গে ডিমভাজা ভীষণ জমবে এবং রাজহাঁসের বড়ো ডিম আনার দায়িত্ব পড়ে প্যালার উপর। পরে ভন্টাদের বাড়ি থেকে ডিম আনতে গিয়ে প্যালা রাজহাঁসের ঠোক্কর খেয়ে পালিয়ে আসে। পরের দিন সকালে মার্টিন রেলে শ্যামবাজার স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হয়, কিন্তু টেনিদার জারিজুরিতে লেডিকেনির হাঁড়ি শেষ হয়ে যায়। যাত্রাপথের নানা সংকটের কারণে মাদ্রাজি হাঁসের ডিম ভেঙে শেষ হয়। আচারের অবস্থাও তথৈবচ এবং রসগোল্লার হাঁড়ি যায় ভেঙে। সব আয়োজন পণ্ড হয়ে যায়।
নির্দিষ্ট বাগানে পৌঁছে শুরু হয় রান্নার আয়োজন। টেনিদা নিজে কাজ করে না, বরং সকলকে ফরমাশ করিয়ে কাজ হাসিল করে। কাঁচা তেলে মাছ দেওয়ায় মাছ ভেঙে শেষ। বাগানের গাছে পাকা জলপাই দেখে সবাই লোভাসক্ত হয়ে ওঠে। কাঁঠাল গাছের মাথায় বাঁদরের দল দেখা যায়। রান্নার আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। বেলা বেড়ে যাওয়ায় সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত। পুকুরের ঘাটে চারজন শোকার্ত হয়ে বসে থাকে এবং চড়ুইভাতির চারটে বেজে যায় অর্থাৎ সর্বাংশ পণ্ড হয়। পরিশেষে প্যালা বাগানের জলপাই পাকার সংবাদ দিলে ক্ষুধার্ত টেনিদার নেতৃত্বে সবাই পাকা জলপাই-এর সন্ধানে ছুটে যায়।
নামকরণ
সাহিত্যের সমস্ত শাখায় নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণে সাহিত্যকর্মের গভীর বিষয়টি পাঠকের ভাবনায় এসে যায় এবং পাঠক বিষয়ের গভীরে সহজে প্রবেশ করতে পারে। বনভোজন বা পিকনিকের আলোচনা থেকে শুরু করে অর্থের অভাবে ভীষণ ভালো ভালো রান্না থেকে সরে সাধারণভাবে আনন্দ উপভোগের প্রয়াস গল্পে আছে। যুক্তি-তর্ক-বিবেচনা ইত্যাদি নিয়েই কাহিনি বর্ণিত। টেনিদার অদ্ভুত ভাবনায় সঙ্গীদের মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়। বনভোজনের জন্য নির্দিষ্ট দিনে শ্যামবাজার থেকে মার্টিন রেলে বাগুইআটি পেরিয়ে চারটে স্টেশন পরে এক বাগানবাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্যালার রাজহাঁসের ডিম সংগ্রহের প্রয়াস, রাজহাঁসের কামড় খাওয়া এবং ট্রেন থেকে নেমে যাত্রাপথে নানা সংকট, কীভাবে অতিক্রম হয়—তা ভেবে মজার পরিবেশ তৈরি হয়। বনভোজনের আনন্দ পাওয়ার অভিপ্রায়ের সম্মিলিত প্রয়াসে গল্পের পরিণতিতে দেখা যায়, খিচুড়ি রান্নার আয়োজন শুরু হয়। হাবুল, প্যালা বাগানের পাকা জলপাই খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করে। পরে টেনিদার খিচুড়ি রান্নার কথা মনে পড়ায় দ্রুত এসে দেখে যায় একটা গোদা বাঁদর নারকেল গাছে হেলান দেওয়া ঘুমন্ত টেনিদার পিঠ চুলকে দিচ্ছে। আর চার-পাঁচটা বাঁদর মুঠো মুঠো চাল-ডাল মুখে পুরছে। চিৎকার করলে বাঁদরগুলো চাল-ডাল-আলুর পুঁটলি নিয়ে কাঁঠাল গাছের মাথায় উঠে যায়। বনভোজন আর হয় না, শোকাহত সবাই খিদের হাত থেকে বাঁচতে পাকা জলপাই-এর সন্ধানে ছুটে যায়। বনভোজনের প্রচেষ্টা এবং তার নির্মম পরিণতির দিক গল্পে বর্ণিত হওয়ায় নামকরণটি যে যথার্থ সার্থক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দ্বিতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘বনভোজনের ব্যাপার’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





Leave a Comment