এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘একটি চড়ুই পাখি’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘চতুর চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই বাসা বাঁধে।’ – চড়ুইপাখিকে এখানে ‘চতুর’ বলা হলো কেন?
‘বাসা’ কথাটির মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়টি লুকিয়ে আছে। এখানে পাখিটি জনহীন পরিবেশে কবির ভাঙাচোরা ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। সে যেন জানে, একাকিত্ব কবিকে এমনই গ্রাস করেছে যে, চাইলেও কবি তাকে তাড়িয়ে দেবেন না। তার বুদ্ধির ক্ষিপ্রতার জোরেই সে যেন কবিমনকে বুঝতে পেরেছে। আরও বুঝেছে, সে-ই কবির একক ঘরে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। সেই অর্থেই ‘চতুর’ কথাটি ব্যবহৃত।
কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলি দৃষ্টান্তসহ আলোচনা করো।
আধুনিক কবি তারাপদ রায় রচিত ‘একটি চড়ুই পাখি’ কবিতায় কবি বেশ কিছু চিত্রকল্পের সাহায্য নিয়েছেন, অর্থাৎ কথার মাধ্যমে চিত্র এঁকে যেতে চেয়েছেন। ‘সন্ধ্যা ফেরে’ – সন্ধ্যার আগমন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ছড়ায় শব্দের টুকরো’ – চড়ুইয়ের সংগৃহীত ধান ও খড়ের ঘর্ষণে অনুরণিত শব্দকে এই চিত্রকল্পে কবি তুলে ধরেছেন। ‘রাত্রির নির্জন ঘরে’ – রাতের নির্জনতাকে গভীর করে তুলতেই এর ব্যবহার।
‘হয়তো ভাবে’ – চড়ুইপাখি কী ভাবে বলে কবি মনে করেন?
কবি তারাপদ রায় রচিত ‘একটি চড়ুই পাখি’ কবিতা অনুযায়ী, একটি নির্জন কক্ষে কবির বাস। পাখিটি মনে করে, বিধাতার কৃপায় কবির অনুপস্থিতিতে এই কক্ষের সবকিছুই তার হয়ে যাবে। যেমন – টেবিলে রাখা ফুলদানি, বইখাতা আর যাবতীয় সামগ্রী।
‘আবার কার্নিশে বসে চাহনিতে তাচ্ছিল্য মজার,’ – তাচ্ছিল্যভরা মজার চাহনিতে তাকিয়ে চড়ুই কী ভাবে?
তাচ্ছিল্যভরা মজার চাহনিতে তাকিয়ে চড়ুইপাখিটি যেন অবজ্ঞার সঙ্গে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে যে, নিতান্ত দয়ার শরীর বলেই কবির নিঃসঙ্গতা অনুভব করে সে অন্যত্র চলে যায়নি।
চড়ুইপাখিকে কেন্দ্র করে কবির ভাবনা কীভাবে আবর্তিত হয়েছে, তা কবিতা অনুসরণে আলোচনা করো।
চড়ুই পাখিকে কেন্দ্র করে কবির মনে গভীর একাকিত্ব এবং একই সঙ্গে এক অদ্ভুত নির্ভরতা ও মায়ার সৃষ্টি হয়েছে। নির্জন ঘরে চড়ুইটি কবির নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী। সারা দিন পর যখন চড়ুইটি ঘরে ফেরে, তার কিচিরমিচির শব্দে ঘরটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং কবির একাকিত্ব কিছুটা হলেও দূর হয়। আবার কবির মনে মজাও জাগে এই ভেবে যে, চড়ুইটি হয়তো ভাবে কবি না থাকলে এই ঘরের সবকিছু তার হয়ে যাবে, কিংবা সে নেহাত দয়া করেই কবির এই ভাঙাচোরা ঘরে রয়েছে। এভাবেই একটি ছোট্ট পাখিকে কেন্দ্র করে কবির মনে একাকিত্ব, সংশয় এবং নির্ভরতার ভাবনাগুলি সুন্দরভাবে আবর্তিত হয়েছে।
‘তবুও যায় না চলে এতটুকু দয়া করে পাখি’ – পঙ্ক্তিটিতে কবি-মানসিকতার কীরূপ প্রতিফলন লক্ষ করা যায়?
কবি বড়োই নিঃসঙ্গ, সারাদিন একাকী গৃহের কক্ষে তিনি থাকেন। দিনাবসানে পাখিটি যখন ধান ও খড়ের টুকরো নিয়ে ফিরে আসে, তার সংগৃহীত জিনিসের গোছগাছ আর কিচিরমিচির শব্দে মুহূর্তের মধ্যে কবির নির্জন কক্ষ এক অজানা সুরের মূর্ছনায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। কবিমনও আলোড়িত হয়। নির্জন ঘরে কবির একাকিত্ব অনুভব করেই কৃপাবশত সে এখানে থেকে যায় বলে কবির মনে হয়েছে।
ছোটো চড়ুইপাখির জীবনবৃত্ত কীভাবে কবিতার ক্ষুদ্র পরিসরে আঁকা হয়েছে, তার পরিচয় দাও।
আধুনিক কবি তারাপদ রায় রচিত ‘একটি চড়ুই পাখি’ কবিতায় কবি বাংলার অতিপরিচিত চড়ুইপাখির বুদ্ধিমত্তা, চাতুর্যশীলতা ও স্বাধীনভাবে বিচরণের চিত্রটি অতি সুন্দরভাবে পরিবেশন করেছেন। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কবিজীবনের নিঃসঙ্গতা মোচনে পাখিটি কীভাবে সাহায্য করেছে, সেই প্রসঙ্গ। সবসময় সে যেন কবিমনকে ভরিয়ে রাখতে পেরেছে। দিনাবসানে সে কবির কক্ষটিতে ফিরে আসে খড়কুটো ও ধান সংগ্রহ করে। একদিকে কবির অগোচরে সে কবির কক্ষেও যেমন স্থান করে নিয়েছে, তেমনি কবির মনেও স্থান করে নিতে পেরেছে। স্বাধীন বা মুক্ত মনোভাবের জন্য সে ইচ্ছামতো এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় পালেদের, বোসেদের বাড়ি চলে যেতে পারে। নেহাতই একটা বন্ধনকে সে ছিন্ন করতে না পেরে একই জায়গায় স্থির হয়েছে।
‘কৌতূহলী দুই চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে’ – চড়ুইপাখির চোখ ‘কৌতূহলী’ কেন? তার চোখে কবির সংসারের কোন্ চালচিত্র ধরা পড়ে?
চড়ুইপাখি কৌতূহলী, কারণ সাধারণত অট্টালিকা জনপূর্ণ হয়। কিন্তু এই বাড়িতে কোথায় যেন একটা শূন্যতা তাকে বিস্মিত করে তোলে। আধুনিক জীবনে নিঃসঙ্গতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে ঘরটিতে। তাই চড়ুইটির মনে হয়, কবির অনুপস্থিতিতে বিধাতার কৃপায় কক্ষের সর্বস্ব তারই হয়ে যাবে। সাংসারিক জীবনের টানাপোড়েন অনেক সময় মানুষকে বিপর্যস্ত করে দেয়, কিন্তু এখানে নিঃসঙ্গ এক মানুষের একাকিত্ব বড়ো বেশি করে পাঠকের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। এই একাকিত্ব কখনও এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, একটি চড়ুইপাখির এই কক্ষে থাকা না-থাকা কবিমনকে উতলা করে তোলে। তাই তিনি এই কবিতায় বলেছেন, চড়ুইয়ের মধ্যে দয়ামায়া আছে বলেই সে কৃপা করে এই গৃহে স্থিত হয়। ইচ্ছা করলেই সে পারে তার বাসা বদল করতে। অসহায় কবির গভীর একাকিত্ব এই কবিতাকে বেদনাবিধুর করে তুলেছে।
‘রাত্রির নির্জন ঘরে আমি আর চড়ুই একাকী’ – পঙ্ক্তিটিতে ‘একাকী’ শব্দটি প্রয়োগের সার্থকতা বুঝিয়ে দাও।
কবির জীবনে একাকিত্ব কোথায় যেন এক গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে। আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড়ো ব্যাধি আত্মকেন্দ্রিকতা, আর তার থেকে বহু মানুষের জীবনে একাকিত্বের ক্ষত সৃষ্টি হয়। এই জনহীন কক্ষে কবি আর সঙ্গী চড়ুইটিও সঙ্গীবিহীন। সেই অর্থেই ‘একাকী’ শব্দটি নিঃসঙ্গ জীবনের বেদনাকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।
‘একটি চড়ুই পাখি’ ছাড়া কবিতাটির অন্য কোনো নামকরণ করো। কেন তুমি এমন নাম দিতে চাও, তা বুঝিয়ে লেখো।
‘একটি চড়ুই পাখি’ ছাড়া ‘একলা ঘরে আমি ও চড়ুই’ – এই নামকরণ কবিতায় প্রয়োগ করা যায়। মূলত কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে দুটি প্রাণী রয়েছে। কবিতানুযায়ী এরা দুজনেই একা। তবে কবির একাকিত্ব গভীর। আমরা মনে করি, কোনো মানুষ এক মুহূর্তে অন্য মানুষের সহযোগিতা, সহৃদয়তা বা ভালোবাসা পেলে তার অন্তর আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষত জীবনের শেষ লগ্নে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই একাকিত্ব প্রবল হয়ে ওঠে; তখন একটা চড়ুইপাখির কক্ষে আনাগোনা, বাসা প্রস্তুত করাও কবিমনকে ভরিয়ে তোলে। একা থাকার কষ্ট খানিকটা তিনি ভুলে থাকেন। তাই একলা ঘরে কবি ও চড়ুইয়ের অবস্থান বোঝাতেই এই ধরনের নামকরণ।
‘অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে সেই / সেও ফেরে; এ বাড়ির খড়কুটো, ও বাড়ির ধান / ছড়ায় শব্দের টুকরো, ঘর জুড়ে কিচিমিচি গান।’ – পঙ্ক্তিগুলির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
কবি তারাপদ রায় ‘একটি চড়ুই পাখি’ কবিতায় তাঁর ঘরে আশ্রয় নেওয়া একটি চড়ুইপাখির দৈনন্দিন জীবনযাপনের যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন, তা যেন এক হিসেবে প্রতিদিনের সাধারণ মানুষেরই কর্মব্যস্ত জীবনের ছবি। দিনের শেষে যখন প্রকৃতির বুকে সন্ধে নামে, তখন সারাদিন বাইরে জীবনধারণের প্রয়োজনে কাটিয়ে ঘরমুখী মানুষের মতো কবির ঘরে বাসা বেঁধে থাকা চড়ুইটিও তার বাসায় ফেরে। বাসাকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য খড়কুটো নিয়ে সে আসে, নিয়ে আসে আহারের ধান। এসব নিয়ে তার নানারকম ধ্বনি এবং কিচিরমিচির গানে কবির ঘরে অপূর্ব ঐকতান বেজে ওঠে। এই ধ্বনি যেন কবির কানে সকল প্রাণীর বেঁচে থাকার, সুন্দরভাবে বসবাস করার আনন্দধ্বনি রচনা করে। কবি এই চড়ুইপাখির প্রাণস্পন্দনকে গভীরভাবে এই সমস্ত শব্দের মধ্য দিয়ে অনুভব করেন।
‘হয়তো ভাবে লোকটা চলে গেলে এই ঘর জানলা দোর, টেবিলে ফুলদানি, বই-খাতা / এ সব আমারই হবে; আমাকেই দেবেন বিধাতা।’ – পঙ্ক্তিগুলির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
কবি তারাপদ রায় তাঁর ঘরে বাসা বেঁধে বাস করা চড়ুইপাখিটির হাবভাব লক্ষ করে তার মনের মধ্যে যেন নিজের মতো করে ডুব দিয়েছেন এবং সেইভাবেই নিজের কল্পনায় রচনা করেছেন চড়ুইটির মানসিক অবস্থার ছবিটি। তাঁর মনে হয়েছে যে, এই চড়ুইপাখিটির দৃষ্টিতে রয়েছে প্রবল কৌতূহলী বৈষয়িক ভাব। এই ঘরের বাসিন্দা হিসেবে হয়তো পাখিটির এমনও মনে হতে পারে যে, কবি এই ঘর থেকে সরে গেলেই এই ঘর এবং ঘরের মধ্যকার সবকিছু (যেমন – টেবিল, ফুলদানি, বইখাতা) সমস্ত কিছুরই মালিকানা সে পাবে। যেহেতু কবির সঙ্গে সে এই ঘরে বাস করে, সেহেতু কবি চলে গেলে কবির এই ঘর এবং তাঁর ব্যবহৃত যা কিছু আছে, সবকিছুর উত্তরাধিকারী সে-ই হবে; কবির এমনটাই মনে হয়। মানুষ যেমন করে কারও চলে যাওয়ার পর তার জিনিসপত্র বা সম্পত্তির উপর ন্যায্যভাবে অধিকার লাভ করে, কবি এখানে চড়ুইপাখির মনকেও সেই মানুষের মনের মতো করেই অনুভব করতে চেয়েছেন।
‘ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি’ – এখানে কোন্ ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে?
কবি তারাপদ রায় তাঁর ‘একটি চড়ুই পাখি’ কবিতায় তাঁর ঘরে আশ্রয় নিয়ে বাসা বেঁধে বাস করা একটি চড়ুইপাখির মন-মেজাজের ছবিটি আপন কবিকল্পনার মায়ায় খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, এই চড়ুইপাখিটি হয়তো এমনটাও ভাবতে পারে যে, তার মনে খুব মায়াদয়া আছে বলেই সে করুণা করে কবির এই বাজে ঘরটাতেও বাস করছে। যদি সে কবিকে মায়াদয়া না করত, তবে যেকোনো মুহূর্তে সে এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় পালেদের বা বোসেদের অনেক ভালো বাড়িতে গিয়ে বাসা বাঁধতে পারত। চড়ুইপাখিটি নিজের সম্পর্কে হয়তো এমন অহংকারী ভাব পোষণ করে বলে কবি মনে করছেন। চড়ুইটি যে কবিকে তুচ্ছ মনে করে এবং করুণার দৃষ্টিতে দেখে, এমন ভাবনাও কবির মনে তৈরি হয়েছে। আসলে কবি এখানে অনেক মানুষের মধ্যে যে ধরনের অহংকারী ভাব এবং অন্যকে তাচ্ছিল্য করে করুণা করার মানসিকতা কাজ করে, সেটাই চড়ুইপাখির উপর আরোপ করেছেন।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘একটি চড়ুই পাখি’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন