আমরা আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের নবম অধ্যায় ‘উত্তর আমেরিকা’-এর উপবিভাগ ‘কানাডার শিল্ড অঞ্চল’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক (Competitive) পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: কানাডার শিল্ড অঞ্চল (উত্তর আমেরিকা) – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও নদনদীর পরিচয় দাও।
ভূপ্রকৃতি – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্বাংশে হাডসন উপসাগরের তিনদিক ঘিরে ‘V’ আকৃতিবিশিষ্ট কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলটি অবস্থান করছে। এই শিল্ড অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি হল –
- কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলটি পৃথিবীর অতিপ্রাচীন একটি ভূখণ্ড (মালভূমি বা উচ্চভূমি)।
- অতিপ্রাচীন এই কানাডিয়ান শিল্ড বা লরেন্সিয়ান শিল্ড (Laurentian Shield) অঞ্চলটি প্রধানত আগ্নেয় (গ্রানাইট) ও রূপান্তরিত শিলায় (নিস) গঠিত।
- বহু যুগ ধরে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে বর্তমানে এটি সমপ্রায়ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
- কানাডিয়ান শিল্ডের পূর্বাংশের গড় উচ্চতা প্রায় 900 মিটার, তবে সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটির গড় উচ্চতা প্রায় 350 মিটার।
- সমগ্র অঞ্চলটি দক্ষিণদিক থেকে উত্তরদিকে (হাডসন উপসাগর) ক্রমশ ঢালু। তাই নদীগুলি উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
- এর অধিকাংশ স্থান হিমবাহবাহিত মৃত্তিকা, গ্রাবরেখা, ড্রামলিন ও বোল্ডার ক্লে দ্বারা আবৃত।
- কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে অসংখ্য ছোটো বড়ো হ্রদ (গ্রেট বিয়ার, গ্রেট স্লেভ, উইনিপেগ, উইনিপেগোসিস, ম্যানিটোবা, নব, আথাবাস্কা, রেনডিয়ার প্রভৃতি) সৃষ্টি হয়েছে।
- এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পর্বতগুলি হল লরেনটাইড (2,500 মিটার), টর্নগ্যাট (1,800 মিটার), হ্যালিবার্টন প্রভৃতি।

নদনদী – কানাডিয়ান শিল্ডের ওপর দিয়ে অসংখ্য ছোটো ছোটো নদী বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীগুলি এখানকার ছোটো ছোটো বহু হ্রদকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। নদীগুলির গতিপথ অনুযায়ী এদের ভাগগুলি হল –
- উত্তরবাহিনী নদীসমূহ – কানাডিয়ান শিল্ডের উত্তরবাহিনী নদীগুলির মধ্যে চার্চিল, নেলসন, আলবানি, ফোর্ট জর্জ প্রভৃতি হাডসন উপসাগরে পড়েছে।
- দক্ষিণবাহিনী নদীসমূহ – দক্ষিণবাহিনী নদীগুলির মধ্যে অটোয়া সেন্ট লরেন্স নদীতে মিলিত হয়েছে।
- পূর্ববাহিনী নদীসমূহ – শিল্ড অঞ্চলের হ্যামিলটন নদীটি আটলান্টিক মহাসাগরে; আথাবাস্কা ও সাসকাচুয়ান নদীদ্বয় আথাবাস্কা হ্রদে; সাগুয়ানা ও রেড নদী উইনিপেগ হ্রদে পতিত হয়েছে।
কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের খনিজ সম্পদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
অথবা, “কানাডার শিল্ড অঞ্চল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ” – ব্যাখ্যা করো।
পৃথিবীর প্রাচীনতম এই কানাডিয়ান শিল্ড বা মালভূমি অঞ্চলটি নানাবিধ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এসব মূল্যবান খনিজ দ্রব্য আহরণের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলি হল –
- নিকেল – সাডবেরি পৃথিবীর বৃহত্তম নিকেল খনি। এখান থেকে বিশ্বের 50 শতাংশ নিকেল উত্তোলিত হয়। এ ছাড়াও থম্পসন, ফ্লিন ফ্লোন, লিন হ্রদ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে প্রচুর নিকেল সংগ্রহ করা হয়।
- আকরিক লোহা – ল্যাব্রাডর মালভূমি, কুইবেক, গ্রেট বিয়ার, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড ও সুপিরিয়র হ্রদ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে উৎকৃষ্ট মানের ম্যাগনেটাইট ও হেমাটাইট জাতীয় লৌহ আকরিক পাওয়া যায়।
- আকরিক তামা – তামা উত্তোলনে কানাডা পৃথিবীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। এর তাম্রখনিগুলি হল – সাডবেরি, নোরান্ডা, টিমিনস, লিন হ্রদ প্রভৃতি।
- সোনা – কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের টিমিনস, শেরিডন, ফ্লিন ফ্লোন, পারকুপাইন, গ্রেট বিয়ার হ্রদ প্রভৃতি স্থান স্বর্ণ উৎপাদনে প্রসিদ্ধ। টিমিনসের হলিঞ্জার পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণখনি (দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ পৃথিবীর বৃহত্তম স্বর্ণখনি)।
- কোবাল্ট – থম্পসন, সাডবেরি, লিন হ্রদ অঞ্চল। কোবাল্ট উত্তোলনে কানাডা বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে।
- ইউরেনিয়াম – এটি একটি মূল্যবান তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ। সুপিরিয়র ও অন্টারিও হ্রদের নিকটবর্তী ইউরেনিয়াম সিটি, পোর্ট রেডিয়াম, জর্জিয়া, সাসকাচুয়ান প্রভৃতি স্থান থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়।
- রূপা – গ্রেট বিয়ার, থম্পসন, নোরান্ডা প্রভৃতি স্থানে পাওয়া যায়।
- সিসা ও দস্তা – নোরান্ডা, ফ্লিন ফ্লোন, পাইন পয়েন্ট প্রভৃতি স্থান থেকে উত্তোলিত হয়।
- অন্যান্য খনিজ সম্পদ – কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদগুলি হল – অ্যাসবেস্টস, ম্যাঙ্গানিজ, প্ল্যাটিনাম, রেডিয়াম প্রভৃতি।
পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রকার মূল্যবান খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় কানাডার এই মালভূমি অঞ্চলকে ‘খনিজ ভাণ্ডার’ বলা হয়।

কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের প্রধান প্রধান শিল্প ও শিল্পকেন্দ্রগুলির পরিচয় দাও।
কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চল শিল্পে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার স্থানীয় খনিজ-বনজ-প্রাণীজ কাঁচামাল, উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা, কারিগরি দক্ষতা, শক্তি সম্পদের (জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ) প্রাচুর্য, কানাডা তথা সমগ্র বিশ্বের ব্যাপক চাহিদা ও উন্নত সুলভ পরিবহনের সাহায্যে এখানে শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এখানকার প্রধান শিল্পগুলি হলো –
- কাগজ শিল্প – এই অঞ্চলের সরলবর্গীয় বনভূমির নরম কাঠের ওপর নির্ভর করে কাগজ, কাষ্ঠমণ্ড, সেলুলোজ ও রেয়ন শিল্প গড়ে উঠেছে। নিউজপ্রিন্ট ও কাগজ উৎপাদনে কানাডা পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে। কাগজ শিল্পকেন্দ্রগুলি হলো – ভ্যাঙ্কুবার, পাইন পয়েন্ট, থান্ডার বে, অটোয়া, মন্ট্রিল, উইনিপেগ, টরন্টো প্রভৃতি স্থান।
- কৃত্রিম তন্তু বা রেয়ন শিল্প – রেয়ন শিল্পকেন্দ্রগুলি হলো – মন্ট্রিল, ভ্যাঙ্কুবার, অটোয়া, টরন্টো, উইনিপেগ প্রভৃতি স্থান।
- ধাতব শিল্প – সাডবেরি (নিকেল, তামা), টিমিন্স (স্বর্ণ), কুইবেক (লৌহ আকরিক), ফ্লিন ফ্লোন (সিসা, দস্তা), নোরান্ডা, থম্পসন (তামা, রূপা), অন্টারিও, মন্ট্রিল, টরন্টো প্রভৃতি শহরে ধাতু নিষ্কাশন শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

- লৌহ-ইস্পাত শিল্প – সল্ট সেন্ট মেরি লৌহ-ইস্পাত শিল্পের জন্য সুবিখ্যাত।
- ফার শিল্প – শিল্ড অঞ্চলের তুন্দ্রা ও তৈগা বনভূমির দীর্ঘ লোমযুক্ত জীবজন্তুর চামড়া থেকে ফার শিল্প (পোশাক) গড়ে উঠেছে। ফার শিল্পকেন্দ্রগুলি হলো – ভ্যাঙ্কুবার, মন্ট্রিল, টরন্টো, ফ্লিন ফ্লোন, উইনিপেগ প্রভৃতি।
- ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প – মন্ট্রিল, অটোয়া, টরন্টো, কুইবেক, সাডবেরি প্রভৃতি শহর ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের জন্য বিখ্যাত।
- অ্যালুমিনিয়াম শিল্প – মন্ট্রিল, ব্যানক্রফ্ট, আরভিদা প্রভৃতি শহরে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বক্সাইটের সাহায্যে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
- কাষ্ঠ শিল্প – কাগজ ছাড়াও স্থানীয় সরলবর্গীয় বনভূমির নরম অথচ টেকসই কাঠ থেকে জাহাজের মাস্তুল, পাটাতন, আসবাবপত্র, দেশলাই শিল্প (অন্টারিও, কুইবেক) গড়ে উঠেছে।
- ডেয়ারি শিল্প – প্রেইরি তৃণভূমির দুগ্ধপ্রদায়ী গবাদিপশুর ওপর নির্ভর করে ডেয়ারি শিল্প (কুইবেক) গড়ে উঠেছে।

কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চল কাষ্ঠ ও কাগজ শিল্পে উন্নত কেন?
কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চলের সুবিশাল বনভূমির কারণে কানাডা নিউজপ্রিন্ট উৎপাদনে পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে। এই কাগজ শিল্পকেন্দ্রগুলি হলো – ভ্যাঙ্কুবার, পাইন পয়েন্ট, অটোয়া, মন্ট্রিল, উইনিপেগ, টরন্টো, কুইবেক, বাকিংহাম প্রভৃতি। কাষ্ঠ ও কাগজ শিল্পের অভাবনীয় উন্নতির কারণগুলি হলো –
1. কাঁচামালের সুবিধা – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত কানাডার মধ্যভাগের (50°-70° উত্তর অক্ষাংশ) বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এক সুবিশাল সরলবর্গীয় বনভূমির সৃষ্টি হয়েছে, যা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অরণ্যভূমি (প্রথম ইউরেশিয়ার তৈগা)। এই অরণ্যের নরম কাঠ কাগজ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। অরণ্যের তলদেশ পরিষ্কার থাকে ফলে কাঠ সংগ্রহে বিশেষ সুবিধা হয় এবং একই প্রজাতির গাছ এক জায়গায় পাওয়া যায় বলে প্রয়োজনমতো কাঠ সংগ্রহ করা যায়।

2. সুলভ পরিবহন – শীতকালে এই অঞ্চলে তুষারপাত হয়। শীতকালের শেষদিকে বৃক্ষগুলির গুঁড়ি কেটে জমা বরফের ওপর ফেলে রাখা হয়। বসন্তকালে এই বরফ গলে গেলে গাছের গুঁড়িগুলি জলস্রোতে ভেসে এসে নদীর তীরের বড়ো বড়ো করাতকলগুলিতে (Saw Mill) পৌঁছায়। সেখানে গুঁড়িগুলিকে সাইজ করে কাটা হয়। বরফগলা জলস্রোতে গুঁড়িগুলিকে ভাসিয়ে করাতকলে আনার ফলে পরিবহন ব্যয় খুব কম হয়।

3. পর্যাপ্ত জলবিদ্যুৎ – শিল্ড অঞ্চলের খরস্রোতা নদীগুলি থেকে উৎপন্ন জলবিদ্যুৎ শক্তি কাগজ শিল্পের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের চাহিদা মেটায়।
4. উন্নত প্রযুক্তি – এখানে কারখানাগুলিতে কাঠচেরাই, কাগজ তৈরি প্রভৃতি কাজে অতি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

5. অন্যান্য কারণ – এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকের জোগান, প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ, সরকারি সহযোগিতা প্রভৃতি কারণে কাগজ শিল্প উন্নতি লাভ করেছে।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের নবম অধ্যায় ‘উত্তর আমেরিকা’-এর উপবিভাগ ‘কানাডার শিল্ড অঞ্চল’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া, নিচে থাকা শেয়ার বাটনের মাধ্যমে এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জন বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ!





Leave a Comment