অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় ‘শিলা’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিলা (Rock) কাকে বলে? শিলার শ্রেণিবিভাগ করো।

শিলার সংজ্ঞা – এক বা একাধিক খনিজের সমসত্ত্ব ও অসমসত্ত্ব মিশ্রণ, যা দিয়ে পৃথিবীর উপরের শক্ত আবরণ ভূত্বক গঠিত, তাদের একত্রে শিলা (Rock) বলে। আর যে খনিজ দিয়ে শিলা গঠিত তা হল এক বা একাধিক অজৈব মৌলিক পদার্থের যৌগ। উদাহরণ – গ্রানাইট শিলা কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, মাইকা, ও হর্নব্লেন্ড খনিজ দ্বারা গঠিত।

শিলার শ্রেণিবিভাগ – উৎপত্তি ও গঠন অনুযায়ী শিলাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিম্নে শিলার শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলো –

শিলার শ্রেণিবিভাগ

আগ্নেয় শিলা কাকে বলে? উৎপত্তি অনুযায়ী আগ্নেয় শিলার শ্রেণিবিভাগ করো।

আগ্নেয় শিলার সংজ্ঞা – আগ্নেয় শিলা কথাটির ইংরাজি প্রতিশব্দ হল ‘Igneous Rock’। ‘Igneous’ শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Ignis’ থেকে এসেছে যার অর্থ হল ‘অগ্নি’। ভূ-অভ্যন্তরের উত্তপ্ত তরল ম্যাগমা ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে শীতল ও কঠিন হয়ে কিংবা ম্যাগমা অগ্ন্যুৎপাতের সময় বাইরে বেরিয়ে এসে ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে শীতল ও জমাটবদ্ধ হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে, তাকে আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock) বলে। পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় এর আরেক নাম প্রাথমিক শিলা বা আদিশিলা। এই শিলায় কোনো স্তর থাকে না বলে এর আরেক নাম অস্তরীভূত শিলা। উদাহরণ – ব্যাসল্ট ও গ্রানাইট।

আগ্নেয় শিলার শ্রেণিবিভাগ – উৎপত্তি ও গঠন অনুসারে আগ্নেয় শিলাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

  • নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive Igneous Rock) – ভূ-অভ্যন্তরের তাপ ও চাপের তারতম্যের ফলে উত্তপ্ত তরল ম্যাগমা ভূত্বকের আগ্নেয়গিরি বা ফাটলের মধ্যে দিয়ে ভূপৃষ্ঠে লাভারূপে নির্গত হয়। শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এই লাভা দ্রুত শীতল ও কঠিন হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে, তাকে নিঃসারী আগ্নেয় শিলা বলে। উদাহরণ – ব্যাসল্ট। খুব দ্রুত জমাট বাঁধে বলে এর দানাগুলো খুব সূক্ষ্ম হয়।
  • উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলা (Intrusive Igneous Rock) – ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা অনেক সময় ভূপৃষ্ঠে পৌঁছোতে না পেরে ভূ-অভ্যন্তরের ফাটলের মধ্যে সঞ্চিত হয় এবং ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে, তাকে উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলা বলে। ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে বলে কণাগুলি বড়ো আকৃতির হয়। উদাহরণ – গ্রানাইট।

ভূগর্ভের কোন্ গভীরতায় শিলার উৎপত্তি হচ্ছে সেই অনুযায়ী উদ্ভেদী শিলাকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

  1. পাতালিক শিলা (Plutonic Rock) – যে শিলা ভূপৃষ্ঠের অনেক নীচে (১০ কিমি-এর অধিক) ম্যাগমা জমাটবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়, তাকে পাতালিক শিলা বলে। এই শিলা ধীরে ধীরে শীতল হয় বলে এর কণাগুলি বড়ো আকৃতির হয়। উদাহরণ – গ্রানাইট, গ্যাব্রো, পেরিডোটাইট।
  2. উপ-পাতালিক শিলা (Hypabyssal Rock) – যেসব উদ্ভেদী শিলা ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি ম্যাগমা জমাটবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়, তাকে উপ-পাতালিক শিলা বলে। অতি দ্রুত শীতল ও জমাটবদ্ধ হয় বলে এই প্রকার শিলার কণাগুলি অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম আকৃতির হয়। উদাহরণ – পর্ফাইরি, ডলেরাইট।
আগ্নেয় শিলার উৎপত্তি

পাললিক শিলা কাকে বলে? পাললিক শিলার শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করো।

পাললিক শিলা (Sedimentary Rock) – পাললিক শিলার ইংরেজি প্রতিশব্দ Sedimentary Rock যা ল্যাটিন শব্দ ‘Sedimentum’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হল ‘অধঃক্ষেপণ’। পাললিক শিলা কথাটি এসেছে ‘পলি’ বা ‘পলল’ থেকে। পৃথিবীপৃষ্ঠের আগ্নেয় শিলা ও রূপান্তরিত শিলা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ঘাত-প্রতিঘাতে অতি সূক্ষ্ম শিলাকণায় পরিণত হয়, যা পুনরায় সমুদ্রগর্ভ বা বিশাল জলাশয়ে নদী, হিমবাহ বা বায়ু দ্বারা বাহিত হয়ে আয়তন ও ভর অনুযায়ী স্তরে স্তরে সজ্জিত হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে, তাকে পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ – বেলেপাথর, কাদাপাথর।

পললের গঠন অনুসারে –

  • যান্ত্রিক উপায়ে সৃষ্ট পাললিক শিলা (Mechanically formed Sedimentary Rock) – বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ঘাত-প্রতিঘাতে ভূপৃষ্ঠের শিলাসমূহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে কোনো প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা পরিবাহিত হয়ে কোনো অবনমিত অঞ্চলে (সমুদ্র, নদী বা হ্রদের তলদেশে) স্তরে স্তরে সঞ্চিত ও কঠিন হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে, তাকে যান্ত্রিক উপায়ে সৃষ্ট পাললিক শিলা বলে। এই শিলা তিন প্রকারের। যথা-
    • প্রস্তরময় – যে পাললিক শিলা 2 মিমি-এর বেশি ব্যাসযুক্ত দানা দ্বারা গঠিত, তাকে প্রস্তরময় পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ – কংগ্লোমারেট, ব্রেক্সিয়া।
    • বালুকাময় – 0.6-2.0 মিমি ব্যাসযুক্ত দানা দিয়ে গঠিত পাললিক শিলাকে বালুকাময় পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ – গ্রেওয়াক বেলেপাথর, কোয়ার্টজ বেলেপাথর।
    • কর্দমময় – 0.06 মিমি-এর কম ব্যাসযুক্ত দানা দিয়ে গঠিত শিলাকে কর্দমময় পাললিক শিলা বলে। উদাহরণ – কাদাপাথর, শেল।
  • রাসায়নিক উপায়ে সৃষ্ট পাললিক শিলা (Chemically formed Sedimentary Rock) – প্রধানত চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে বৃষ্টির জল বাতাসের অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। অন্যদিকে, চুনাপাথর নদীর জল দ্বারা দ্রবীভূত হয়ে কোনো গহ্বরে সঞ্চিত হয়ে কালক্রমে কঠিন শিলায় পরিণত হয়। একে রাসায়নিক উপায়ে সৃষ্ট পাললিক শিলা বলে। যেমন – ডলোমাইট, ক্যালসাইট, জিপসাম।
  • জৈব উপায়ে সৃষ্ট পাললিক শিলা (Organically formed Sedimentary Rock) – ভূ-আন্দোলনে বা প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ বা জীবাশ্ম ভূগর্ভে অথবা সমুদ্রের নীচে স্তরে স্তরে জমে কালক্রমে শিলায় পরিণত হয়, একে জৈব পাললিক শিলা বলে। যেমন – কয়লা, চুনাপাথর।

পললের উৎপত্তি অনুসারে –

  • সংঘাত শিলা (Clastic Rock) – গ্রিক শব্দ ‘Clastic’ কথার অর্থ ‘ভগ্ন’। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির (জল, বায়ুপ্রবাহ, নদী প্রভৃতি) প্রভাবে আগ্নেয় ও পাললিক শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পলিতে পরিণত হয় এবং সেই পলি সঞ্চিত হয়ে যে পাললিক শিলা সৃষ্টি হয়, তার নাম সংঘাত শিলা। এক্ষেত্রে শিলার রাসায়নিক ধর্মের কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন – বেলেপাথর, কাদাপাথর প্রভৃতি।
  • অসংঘাত শিলা (Non-Clastic Rock) – যান্ত্রিক বিচূর্ণন ব্যতিরেকে অর্থাৎ, সংঘাত ভিন্ন অন্য কোনো উপায়ে (রাসায়নিক ও জৈব) যেসব পাললিক শিলার সৃষ্টি হয়, তাকে অসংঘাত শিলা বলে। যেমন – ডলোমাইট, জিপসাম, চক প্রভৃতি।

রূপান্তরিত শিলা কাকে বলে? রূপান্তরিত শিলার শ্রেণিবিভাগ করো।

রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rock) – গ্রিক ভাষায় ‘Metamorphic’ কথাটির অর্থ ‘রূপান্তর’। বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয় ও পাললিক শিলা দীর্ঘদিন ধরে ভূ-অভ্যন্তরের প্রচণ্ড চাপ ও তাপে অথবা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরোনো ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের পরিবর্তন ঘটিয়ে কেলাসিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক ধরনের শিলায় পরিণত হয়। এই ধরনের শিলাকে রূপান্তরিত শিলা বলে। আগ্নেয় ও পাললিক শিলার কেবলমাত্র রূপান্তর ঘটে না, রূপান্তরিত শিলারও পরবর্তীকালে রূপান্তর ঘটে। উদাহরণ –

  • আগ্নেয় শিলার রূপান্তর – গ্রানাইট → নিস।
  • পাললিক শিলার রূপান্তর – চুনাপাথর → মার্বেল।
  • রূপান্তরিত শিলার রূপান্তর – স্লেট → ফাইলাইট → সিস্ট।

রূপান্তরিত শিলার ব্যাপকতা অনুসারে –

  1. আঞ্চলিক রূপান্তর (Regional Metamorphism) – প্রবল ভূ-আলোড়নের ফলে যখন প্রচণ্ড চাপে ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে শিলার রূপান্তর ঘটে, তাকে আঞ্চলিক রূপান্তর বলে। যেমন – কাদাপাথর → স্লেট।
  2. স্থানীয় রূপান্তর (Local Metamorphism) – যখন ক্ষুদ্র অঞ্চল জুড়ে শিলার রূপান্তর ঘটে, তাকে স্থানীয় রূপান্তর বলে। সাধারণত অগ্ন্যুৎপাতের সময় উত্তপ্ত লাভার সংস্পর্শে এই রূপান্তর ঘটে, তাই একে স্পর্শ রূপান্তরও বলে।
  3. গতিশীল রূপান্তর (Dynamic Metamorphism) – অত্যধিক চাপের প্রভাবে শিলায় ফাটল সৃষ্টি হলে বা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলে তা এক নতুন রূপান্তরিত শিলার জন্ম দেয়, একে গতিশীল রূপান্তর বলে। যেমন – মাইলোনাইট।
শিলার রূপান্তর

রূপান্তরিত শিলার উৎপত্তি অনুসারে –

  1. উত্তাপের ফলে সৃষ্ট – ভূপৃষ্ঠের শিলাসমূহ কোনোভাবে উত্তপ্ত ম্যাগমার সংস্পর্শে এলে শিলার রূপান্তর ঘটে। যেমন – চুনাপাথর → (তাপে) → মার্বেল।
  2. চাপের ফলে সৃষ্ট – ভূপৃষ্ঠের শিলাসমূহ ভূ-আলোড়নের ফলে ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে ওপরের শিলাস্তরের প্রবল চাপে শিলার রূপান্তর ঘটে। যেমন – শেল → (চাপে) → স্লেট।
  3. রাসায়নিক প্রক্রিয়ার প্রভাবে – বৃষ্টি, নদী, সমুদ্র প্রভৃতির জল ভূগর্ভে প্রবেশ করে অথবা ভূপৃষ্ঠের কার্বনেটযুক্ত শিলার সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে এবং এই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ ও চাপ শিলার রূপান্তর ঘটায়। অনেক সময় শিলামধ্যস্থ জল রাসায়নিক বিক্রিয়ার দ্বারা শিলার রূপান্তর ঘটায়। যেমন – কায়ানাইট + কোয়ার্টজ + জল → পায়রোফিলাইট।
চাপের প্রভাবে শেল থেকে স্লেটে রূপান্তর

খনিজ কাকে বলে? শিলাগঠনকারী খনিজগুলি কী কী? প্রধান প্রধান খনিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

খনিজ (Mineral) – শিলার মধ্যে অবস্থিত নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংযুক্তি বিশিষ্ট, নির্দিষ্ট পারমাণবিক গঠনযুক্ত, কেলাসিত মৌলিক বা যৌগিক পদার্থকে খনিজ বলে। উদাহরণ – মৌলিক খনিজ হিরে, যৌগিক খনিজ অর্থোক্লেজ ফেল্ডসপার।

শিলাগঠনকারী খনিজ – শিলাগঠনকারী প্রধান প্রধান খনিজগুলি হল – কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, মাইকা বা অভ্র, জিপসাম, ক্যালসাইট, অ্যাম্ফিবোল, পাইরক্সিন, লৌহ, অলিভিন, হর্নব্লেন্ড প্রভৃতি।

কয়েকটি প্রধান খনিজের পরিচয় –

কোয়ার্টজ – এর রাসায়নিক সংগঠন – সিলিকা, অক্সিজেন।

  • বৈশিষ্ট্য – কোয়ার্টজ খুব কঠিন হয়। এটি গ্রানাইট, ব্যাসল্ট প্রভৃতি শিলার মূল উপাদান। কোয়ার্টজ থাকায় এই শিলাগুলি বেশ ক্ষয়প্রতিরোধী। কোয়ার্টজ সাদা রঙের হয়। এগুলি সাধারণত ষড়ভুজাকৃতি কেলাসাকার হয়। এটি ইস্পাতের চেয়ে বেশি শক্ত।
  • অবস্থান – গ্রানাইট, বেলেপাথর।
  • ব্যবহার – কোয়ার্টজ গয়না তৈরিতে, কাচ ও পাথর কাটতে ব্যবহৃত হয়।
কোয়ার্টজ

ফেল্ডসপার – সাদা রঙের প্ল্যাজিওক্লেজ ফেল্ডসপারের মূল রাসায়নিক উপাদান সোডিয়াম। গোলাপি অর্থোক্লেজ ফেল্ডসপারের মূল উপাদান পটাশিয়াম।

  • বৈশিষ্ট্য – এগুলি সাদা বা গোলাপি রঙের হয়। এগুলি স্লেটের মতো মসৃণ, প্রায় কাচের মতো শক্ত এবং অস্বচ্ছ প্রকৃতির।
  • অবস্থান – গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট।
  • ব্যবহার – কাচ তৈরিতে ও সেরামিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
ফেল্ডসপার

অভ্র – এর রাসায়নিক সংগঠন – পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লৌহের অ্যালুমিনো সিলিকেট।

  • বৈশিষ্ট্য – এগুলি অত্যন্ত চকচকে ও মসৃণ হয়। অভ্র পাতলা ও ভঙ্গুর প্রকৃতির। অভ্র সাদা রঙের মাসকোভাইট বা কালো রঙের বায়োটাইট জাতীয় হয়ে থাকে। এটি তাপ ও বিদ্যুতের কুপরিবাহী। এর উপস্থিতির জন্য গ্রানাইট চিকচিক করে।
  • অবস্থান – গ্রানাইট, সিস্ট, নিস।
  • ব্যবহার – বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রস্তুতিতে, প্রতিমার সাজে, রং শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
অভ্র

জিপসাম – এর রাসায়নিক সংগঠন – ক্যালশিয়াম সালফেট।

  • বৈশিষ্ট্য – জিপসাম বেশ নরম হয় এবং হালকা হলুদ রঙের হয়ে থাকে।
  • অবস্থান – পাললিক শিলা।
  • ব্যবহার – সিমেন্ট শিল্পে, নির্মাণকার্যে, সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
জিপসাম ক্রিস্টাল

শিলার ব্যবহার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করো।

অথবা, মানুষের জীবনে শিলার গুরুত্ব লেখো।

মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ও দৈনন্দিন জীবনে শিলার ব্যবহার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব –

আগ্নেয় শিলার ব্যবহার –

  1. নির্মাণকার্যে – বাড়ি, বাড়ির মেঝে তৈরিতে গ্রানাইট পাথর ব্যবহৃত হয়। রামেশ্বরম, মাদুরাই, মহাবলীপুরমের প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলি গ্রানাইট পাথরে তৈরি।
  2. রেললাইন নির্মাণে – রাস্তাঘাট, রেললাইন, ট্রামলাইনে ব্যাসল্ট শিলার টুকরো ব্যবহৃত হয়।
  3. বাঁধ নির্মাণে – জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী জলাধার ও বাঁধ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।
  4. খনিজ সংগ্রহ – আগ্নেয় শিলা থেকে সোনা, রুপো, সিসা, দস্তা প্রভৃতি খনিজ সংগৃহীত হয়।
  5. কৃষিকাজ – ব্যাসল্ট শিলা থেকে সৃষ্ট কালো মাটিতে গম ও তুলো চাষ খুব ভালো হয়।
গ্রানাইটের তৈরি মহাবলীপুরম মন্দির

পাললিক শিলার ব্যবহার –

  1. বাড়িঘর নির্মাণকার্যে – বিভিন্ন ধরনের প্রাসাদ, দুর্গ নির্মাণে বেলেপাথর ব্যবহৃত হয়। দিল্লির লালকেল্লা, রাজস্থানের দুর্গ, সাঁচীস্তূপ বেলেপাথরে নির্মিত।
  2. শিল্পক্ষেত্রে – চুনাপাথর, ডলোমাইট ব্যবহৃত হয় সিমেন্ট শিল্পে, লৌহ-ইস্পাত শিল্পে, রাসায়নিক শিল্পে ও গৃহ নির্মাণে।
  3. কৃষিকার্যে – পাললিক শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সৃষ্ট পলি থেকে পলিমাটি তৈরি হয়। পলিমাটি কৃষিকার্যে অত্যন্ত উপযোগী।
  4. বাসনপত্র তৈরিতে – ফায়ার ক্লে, চায়না ক্লে বা চিনামাটি কাদাপাথরের রূপভেদ। চিনামাটি থেকে বাসনপত্র তৈরি হয়।
  5. ভৌমজল – সচ্ছিদ্র পাললিক শিলায় ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয় ঘটে। সেই ভৌমজল মানুষের পানীয়, কৃষি, শিল্প ইত্যাদির প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করে।
  6. খনিজ সম্পদ – পাললিক শিলায় কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি অমূল্য সম্পদ পাওয়া যায়।
বেলেপাথর দিয়ে তৈরি লালকেল্লা
চিনামাটির পাত্র

রূপান্তরিত শিলার ব্যবহার –

  1. নির্মাণকার্যে – মার্বেল থেকে নানা শৌখিন দ্রব্যাদি, প্রাসাদ, মন্দির ইত্যাদি নির্মিত হয়। যেমন – আগ্রার তাজমহল, মার্বেল প্যালেস, কলকাতার GPO ইত্যাদি। পাহাড়ি অঞ্চলে স্লেট পাথর মেঝে ও ছাদ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
  2. শিল্পক্ষেত্রে – গ্রাফাইট থেকে পেনসিলের শিষ, স্লেট পাথর লেখার কাজে ব্যবহৃত হয়।
  3. খনিজ সংগ্রহ – শিলা রূপান্তরিত হলে ধাতব ও অধাতব খনিজ একদিকে চলে আসে। ফলে খনিজ সংগ্রহের সুবিধা হয়।
পেনসিল
মারবেলের তৈরি তাজমহল

বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গঠনে শিলার প্রভাব আলোচনা করো।

বিভিন্ন প্রকার শিলাগঠিত অঞ্চলের ভূমিরূপ বিভিন্ন ধরনের হয়। যেমন –

  1. গোলাকৃতির ভূমি – গ্রানাইট শিলাগঠিত অঞ্চল সাধারণত গোলাকৃতির হয়, কারণ আবহবিকারের শল্কমোচন পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রানাইট শিলার উপরিভাগ পেঁয়াজের খোসার মতো উঠে যায়। একে টর (Tor) বলে। উদাহরণ – ছোটোনাগপুরের মালভূমি।
  2. চ্যাপটা ভূমিরূপ – ব্যাসল্ট শিলাগঠিত অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে লাভা নিঃসরণে চ্যাপটা বা সমতল প্রকৃতির ধাপযুক্ত ভূমিরূপ (ট্র্যাপ) সৃষ্টি হয়। উদাহরণ – দাক্ষিণাত্য মালভূমি।
  3. কার্স্ট ভূমিরূপ – চুনাপাথর ও ডলোমাইটযুক্ত অঞ্চলে ফাটল ও ছোটো-বড়ো গর্তযুক্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। চুনাপাথরের গুহায় স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট ও স্তম্ভ প্রভৃতি গড়ে ওঠে। উদাহরণ – দেরাদুনের তপকেশ্বর অঞ্চল।
  4. খাড়া ঢালযুক্ত ভূমিরূপ – বেলেপাথরযুক্ত অঞ্চলের নদীগুলিতে খাড়া পাড় লক্ষ করা যায়।
  5. জলপ্রপাত সৃষ্টি – কোয়ার্টজাইট গঠিত অঞ্চলে খাড়া ঢালবিশিষ্ট জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়।
  6. মোনাডনক – কঠিন শিলাগঠিত অঞ্চলে উচ্চভূমি (মোনাডনক) অবস্থান করে। উদাহরণ – রাঁচি মালভূমি।
  7. সমতল ও নিম্নভূমি – কোমল শিলাযুক্ত স্থানে সমতল ও নিম্নভূমি সৃষ্টি হয়। উদাহরণ – গাঙ্গেয় সমভূমি।
  8. অবশিষ্ট পর্বত – একটি বিস্তীর্ণ কোমল শিলা দ্বারা গঠিত অঞ্চলের মাঝে যদি কোনো স্থানে কঠিন শিলা অবস্থান করে, তবে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয় পেয়ে অবনমিত হয় এবং কঠিন শিলা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষয় পেয়ে অবশিষ্ট পর্বতরূপে দাঁড়িয়ে থাকে।
  9. ক্ষয়প্রাপ্ত সমভূমি – পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত অঞ্চল খুব সহজে এবং অতি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্ষয়জাত সমভূমিতে পরিণত হয়।

শিলাচক্র (Rock cycle) বলতে কী বোঝো?

অথবা, চিত্রসহ শিলাচক্রের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

  • ভূ-অভ্যন্তরের উত্তপ্ত ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের কোনো দুর্বল ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে অগ্ন্যুদ্গমের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে লাভারূপে এসে অথবা ভূত্বকের মধ্যেই শীতল ও কঠিন হয়ে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি হয়।
  • পরে এই শিলা নদী, বায়ু, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও অপসারিত হয়ে সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে বহুকাল ধরে সঞ্চিত ও কঠিন হয়ে পাললিক শিলায় পরিণত হয়।
  • এই আগ্নেয় ও পাললিক দু-ধরনের শিলাই ভীষণ তাপ, চাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলায় পরিণত হয়।
  • এই রূপান্তরিত শিলা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও অপসারিত হয়ে সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে সঞ্চিত হয়ে পুনরায় পাললিক শিলায় পরিণত হতে পারে।
  • আবার, এই তিন ধরনের শিলাই প্রবল ভূ-আলোড়নের ফলে ভূগর্ভে প্রবেশ করে তাপে গলে গিয়ে ম্যাগমাতে পরিণত হয়। এই ম্যাগমা থেকে পুনরায় আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি হয়।

এইভাবে প্রকৃতিতে শিলার উৎপত্তি ও এক শিলা থেকে অন্য শিলায় রূপান্তর চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলেছে। একেই শিলাচক্র বলে।

শিলাচক্র

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় ‘শিলা’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - টীকা

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর