আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের চতুর্থ অধ্যায় ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিত্রসহ পৃথিবীর চাপবলয়গুলির পরিচয় দাও।
অথবা, পৃথিবীর চাপবলয়গুলির সৃষ্টির কারণ আলোচনা করো।
অথবা, পৃথিবীতে কটা বায়ুচাপ বলয় আছে তাদের নাম লিখে ফেলো।
অথবা, নিরক্ষীয় ও মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়গুলিতে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ আলোচনা করো।
বায়ুচাপ বলয়ের সংজ্ঞা – ভূপৃষ্ঠে বায়ুর চাপ কোথাও কম, কোথাও বেশি। নিম্নচাপ বা উচ্চচাপ ভূপৃষ্ঠকে এক-একটি অঞ্চলে ভাগ করে বলয়ের মতো ঘিরে রেখেছে। এদের বায়ুচাপ বলয় বলা হয়।
চাপবলয়ের শ্রেণিবিভাগ – পৃথিবীতে সাতটি স্থায়ী চাপবলয় আছে; সেগুলি হল –
- নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়,
- কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়,
- মকরীয় উচ্চচাপ বলয়,
- সুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়,
- কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়,
- সুমেরু উচ্চচাপ বলয়,
- কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।
এই চাপবলয়গুলির অবস্থান ও সৃষ্টির কারণ আলোচনা করা হল –
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ ও শান্তবলয় –
- অবস্থান – নিরক্ষরেখার (0°) উভয়পাশে 5° উত্তর থেকে 5° দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে এই চাপবলয়টি অবস্থান করছে।
- সৃষ্টির কারণ –
- নিরক্ষরেখার উভয়দিকে 5°-10° অক্ষাংশের মধ্যে সূর্যকিরণ প্রায় সারাবছর লম্বভাবে পড়ে। ফলে, এখানকার বায়ু উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয় এবং হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে, চাপ কম হয়।
- এখানে স্থলভাগ অপেক্ষা জলভাগ বেশি থাকায় প্রখর সূর্যতাপে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ে। জলীয় বাষ্প হালকা বলে সহজেই তা উপরে উঠে প্রসারিত হয়। ফলে, চাপ কম হয়।
- পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য এখানকার উপরের দিকে ওঠা উষ্ণ ও আর্দ্র হালকা বায়ু উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ছিটকে যায়। সেজন্য বায়ুর চাপ কম হয়।
- নিরক্ষীয় শান্তবলয় – নিরক্ষীয় অঞ্চলের বায়ু উষ্ণ ও হালকা হওয়ায় বায়ুপ্রবাহ সবসময় ঊর্ধ্বগামী হয়। এখানে বায়ুর সমান্তরাল বা পার্শ্বপ্রবাহ বিশেষ বোঝা যায় না। তাই বায়ুমণ্ডলে সবসময় শান্তভাব লক্ষ করা যায়। সেজন্য একে ‘নিরক্ষীয় শান্তবলয়’ (Doldrums) বলে।

কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় –
- অবস্থান – উভয় গোলার্ধে 25°-35° অক্ষাংশের মধ্যে কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় দুটি অবস্থান করে।
- সৃষ্টির কারণ –
- নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তপ্ত বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠলে পৃথিবীর আবর্তন গতির প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ছিটকে যায় এবং ক্রমশ শীতল ও ভারী হয়ে এই বায়ু দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলে (25°-35° অক্ষাংশ) নেমে আসে।
- আবার, সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী বায়ু এখানে এসে পৌঁছোয়। ফলে, দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলে দুটি শীতল ও ভারী বায়ু মিলিত হওয়ায় বায়ুর পরিমাণ ও ঘনত্ব বেড়ে যায়, তাই উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।
- ক্রান্তীয় শান্তবলয় – ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বায়ুপ্রবাহ না হওয়ায় বায়ুমণ্ডলে সর্বদাই শান্তভাব বজায় থাকে। সেজন্য দুটি অঞ্চলকে ক্রান্তীয় শান্তবলয় (Horse Latitudes) বলে।
সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় –
- অবস্থান – উভয় গোলার্ধের 60°-70° অক্ষরেখার মধ্যে অবস্থিত।
- সৃষ্টির কারণ –
- দুই গোলার্ধের মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের উষ্ণতা মেরু অঞ্চলের তুলনায় বেশি। ফলে, এই অঞ্চলের বায়ু হালকা হয়ে উপরে ওঠে ও প্রসারিত হয়।
- পৃথিবীর আবর্তন বেগও এই অংশে দুই মেরুর তুলনায় বেশি হওয়ায় উপরে ওঠা বায়ু উত্তর ও দক্ষিণে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ফলে, এখানে বায়ুর পরিমাণ বা ঘনত্ব কমে যায় এবং নিম্নচাপ বিরাজ করে।
- মেরুসীমান্তীয় শান্তবলয় – এখানে বায়ু মূলত ঊর্ধ্বগামী হওয়ায় বায়ুপ্রবাহ বোঝা যায় না। তাই এই অঞ্চলকে মেরুসীমান্তীয় শান্তবলয় বলে।
সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ বলয় –
- অবস্থান – উভয় গোলার্ধের 80° অক্ষরেখা থেকে মেরুবিন্দু (90°) পর্যন্ত সুমেরু ও কুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয় বিরাজ করছে।
- সৃষ্টির কারণ –
- দুই মেরুপ্রদেশ সারাবছর বরফে আবৃত থাকায় বায়ু খুব শীতল ও ভারী হয়।
- সূর্যকিরণ সারাবছর তির্যকভাবে পতিত হওয়ায় উষ্ণতার অভাবে বায়ুতে জলীয় বাষ্প থাকে না এবং
- সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত প্রদেশের ঊর্ধ্বগামী বায়ুর কিছু অংশ দুই মেরু অঞ্চলে নেমে আসে। ফলে, এখানে উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়েছে।
উদাহরণসহ বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ করো।
বায়ুপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি, উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে বায়ুকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা – নিয়ত বায়ু, সাময়িক বায়ু, আকস্মিক বায়ু, ও স্থানীয় বায়ু।

1. নিয়ত বায়ু (Planetary wind) – যে বায়ু পৃথিবীর স্থায়ী বায়ুচাপ বলয়গুলির ওপর নির্ভর করে সারাবছর নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে এবং নির্দিষ্ট গতিতে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলে। প্রবাহের দিক, গতি ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে নিয়ত বায়ু তিন ধরনের। যথা –
- আয়ন বায়ু (Trade Winds)
- পশ্চিমা বায়ু (Westerlies)
- মেরু বায়ু (Polar Winds)
2. সাময়িক বায়ু (Periodic wind) – যে বায়ু সারাবছর প্রবাহিত না হয়ে কোনো বিশেষ ঋতুতে বা দিন ও রাত্রির নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে সাময়িক বায়ু বলে। সাময়িক বায়ুগুলি হল –
- সমুদ্রবায়ু
- স্থলবায়ু
- মৌসুমি বায়ু
3. আকস্মিক বায়ু (Sudden wind) – হঠাৎ বায়ুচাপের পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিতভাবে ভূপৃষ্ঠের স্বল্প পরিসর স্থানে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আকস্মিক বায়ু বলে। এটা দু-ধরনের –
- ঘূর্ণবাত (Cyclone)
- প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anticyclone)
4. স্থানীয় বায়ু (Local wind) – কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভূপ্রকৃতি, স্থল ও জলভাগের বণ্টন, অক্ষাংশ, মৃত্তিকা প্রভৃতির তারতম্যের জন্য স্থানীয়ভাবে বায়ুচাপের তারতম্য ঘটে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে স্থানীয় বায়ু বলে। এটা দু-ধরনের। যথা –
- উষ্ণ স্থানীয় বায়ু,
- শীতল স্থানীয় বায়ু।
বায়ুর চাপবলয়গুলির সীমানা পরিবর্তন বলতে কী বোঝো?
অথবা, বায়ুচাপ বলয়ের স্থান পরিবর্তন কোন্ জলবায়ু অঞ্চলকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা আলোচনা করো।
বায়ুচাপ বলয়ের স্থান পরিবর্তন বা নিয়ত বায়ুর স্থান পরিবর্তন – বায়ুর চাপ বায়ুর উষ্ণতার ওপর নির্ভর করে আর বায়ুর উষ্ণতা নির্ভর করে বিভিন্ন অক্ষাংশে সূর্যরশ্মির পতনকোণের ওপর। সূর্যের বার্ষিক আপাতগতির (রবিমার্গ) জন্য একই অক্ষাংশে প্রতিদিন মধ্যাহ্নে সূর্যরশ্মির পতনকোণের মান এক হয় না। ফলে, অক্ষাংশভেদে বায়ুর উষ্ণতার পরিবর্তন ঘটে, যার জন্য চাপেরও পরিবর্তন ঘটে।
এই কারণে সূর্যের উত্তরায়ণের সময় বায়ুচাপ বলয়গুলি 5°-10° উত্তরে এবং দক্ষিণায়নের সময় বায়ুচাপ বলয়গুলি 5°-10° দক্ষিণে ক্রমশ সরে যায়। একেই বলে বায়ুচাপ বলয়ের সীমানা/স্থান পরিবর্তন। এর সঙ্গে সঙ্গে নিয়ত বায়ুপ্রবাহও তার স্থান পরিবর্তন করে। তবে নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় চাপবলয়গুলি উত্তর-দক্ষিণে বেশি সরে, মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় ও মেরুদেশীয় চাপবলয়গুলি তুলনায় কম সরে। সাধারণত উভয় গোলার্ধে 25°-40° অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই প্রভাব বেশি দেখা যায়।
বায়ুচাপ বলয়ের স্থান পরিবর্তনের কারণ –
- স্থলভাগ ও জলভাগের অসম বণ্টন,
- পৃথিবীর আপাত পরিক্রমণ গতির ফল,
- সূর্যরশ্মির পতনকোণের পার্থক্য,
- ভূমিরূপের উচ্চতার পার্থক্য,
- নিরক্ষরেখা থেকে মেরু পর্যন্ত পৃথিবীর আবর্তন বেগের বিভিন্নতা প্রভৃতি কারণে বায়ুচাপ বলয়গুলির স্থান পরিবর্তন ঘটে।

বায়ুচাপ বলয়ের স্থান পরিবর্তনের প্রভাব – সূর্যের উত্তরায়ণের সময় নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় 5°-10° উত্তরে সরে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর গোলার্ধে প্রবেশ করে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার, এই সময় কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় উত্তরে সরে যাওয়ায় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুষ্ক হয়।
দক্ষিণায়নের সময় শীতকালে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব আসে এবং পশ্চিমাংশে বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু পূর্বাংশে বৃষ্টিপাত হয় না। আবার, গ্রীষ্মকালে আয়ন বায়ু উত্তরে সরে গেলে এই অঞ্চলের পূর্বভাগে বৃষ্টিপাত হয় (যেমন – আর্জেন্টিনার দক্ষিণাংশ বা সুদান), কিন্তু পশ্চিমভাগে বৃষ্টিপাত হয় না (যেমন – চিলির দক্ষিণাংশ)। সুতরাং, সূর্যের আপাত বার্ষিক গতির সঙ্গে বায়ুর চাপবলয়গুলি ও নিয়ত বায়ুপ্রবাহ বিশেষভাবে সম্পর্কিত। শুধু তাই নয়, বৃষ্টিপাতও সূর্যের অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই বলা হয়, ‘বৃষ্টিপাত সূর্যকে অনুসরণ করে’ (Rain follows the sun)।
চিত্রসহ নিয়ত বায়ুপ্রবাহের বর্ণনা দাও।
অথবা, আয়ন বায়ু ও পশ্চিমা বায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সংজ্ঞা – ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে সারাবছর নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে, নির্দিষ্ট পথে ও প্রায় একই গতিতে যেসব বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু (Planetary wind) বলে।
নিয়ত বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ – পৃথিবী সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলে কয়েকটি স্থায়ী উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বলয় আছে, যাদের মধ্যে সমতা বজায় রাখার জন্য নিয়মিতভাবে নিয়ত বায়ু প্রবাহিত হয়। ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তরে প্রধানত তিনটি নিয়ত বায়ুপ্রবাহ লক্ষ করা যায়। সেগুলি হল –
- আয়ন বায়ু
- পশ্চিমা বায়ু
- মেরু বায়ু
আয়ন বায়ু (Trade Wind)
সংজ্ঞা – ‘আয়ন’ শব্দের অর্থ হল ‘পথ’। কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারাবছর ধরে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আয়ন বায়ু বলে।
আয়ন বায়ুর বৈশিষ্ট্য –
- বিস্তার – উভয় গোলার্ধে গড়ে 5°-25° অক্ষরেখার মধ্যে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
- শ্রেণিবিভাগ – আয়ন বায়ু দু-প্রকার। ফেরেলের সূত্র অনুসারে আয়ন বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে ‘উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে ‘দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু’ রূপে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ুর গতিবেগ 16 কিমি/ঘণ্টা এবং দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ুর গতিবেগ 22-30 কিমি/ঘণ্টা।
- বাণিজ্য বায়ু – প্রাচীনকালে এই বায়ুর প্রবাহপথ ধরে পালতোলা জাহাজে বাণিজ্য চলত বলে একে বাণিজ্য বায়ু বলা হয়।
- প্রভাব –
- আয়ন বায়ুর প্রভাবে মহাদেশগুলির পূর্ব দিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
- এই বায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিম দিকে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় 5টি বড়ো বড়ো মরুভূমির (সাহারা, কালাহারি, আটাকামা, গ্রেট অস্ট্রেলিয়ান মরুভূমি, সোনোরান) সৃষ্টি হয়েছে।

পশ্চিমা বায়ু (Westerly Wind)
সংজ্ঞা – কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে দুটি বায়ু প্রবাহিত হয়, তাদের পশ্চিমা বায়ু বলে।
পশ্চিমা বায়ুর বৈশিষ্ট্য –
- বিস্তার – উভয় গোলার্ধে 35°-60° অক্ষরেখার মধ্যে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
- শ্রেণিবিভাগ – পশ্চিমা বায়ুও ফেরেলের সূত্রানুসারে উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে বেঁকে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু’ রূপে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে ‘উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু’ রূপে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – দক্ষিণ গোলার্ধের তুলনায় উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগের বিস্তার বেশি হওয়ায় ঘর্ষণজনিত বাধার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর বেগ উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর তুলনায় কম হয়।
- বিভিন্ন নাম – পশ্চিমা বায়ু দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার জন্য অত্যন্ত দ্রুত বেগে শব্দ করতে করতে বয়ে চলে। একে 40° দক্ষিণ অক্ষাংশে ‘গর্জনশীল চল্লিশা’, 50° দক্ষিণ অক্ষাংশে ‘ক্রোধোন্মত্ত পঞ্চাশ’ এবং 60° দক্ষিণ অক্ষাংশে ‘তীক্ষ্ণ চিৎকারকারী ষাট’ নাম দেওয়া হয়েছে।
- প্রভাব –
- পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে মহাদেশগুলির পশ্চিমদিকে অধিক বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে শীতকালে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
- এই বায়ুর প্রবাহপথে মহাদেশগুলির মধ্যভাগে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে সুবিস্তৃত তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে। যেমন – উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, দক্ষিণ আমেরিকার পম্পাস ইত্যাদি।
- ঘূর্ণবাত – পশ্চিমা বায়ু দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলে ঘূর্ণবাত ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের আধিক্য লক্ষ করা যায়।
- শক্তি – পশ্চিমা বায়ু গ্রীষ্মকালে দুর্বল ও শীতকালে অধিক শক্তিশালী হয়।
মেরু বায়ু (Polar Wind)
সংজ্ঞা – দুই মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে যে শীতল ও শুষ্ক বায়ু মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে মেরু বায়ু বলে।
মেরু বায়ুর বৈশিষ্ট্য –
- বিস্তার – উভয় গোলার্ধে 70°-80° অক্ষরেখার মধ্যে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
- শ্রেণিবিভাগ – মেরু বায়ু দু-ধরনের হয়। ফেরেলের সূত্রানুসারে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে ‘উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু’ রূপে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে ‘দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু’ রূপে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণ গোলার্ধে উন্মুক্ত সমুদ্র বেশি থাকায় মেরু বায়ু দক্ষিণ গোলার্ধে বেশি বেগে প্রবাহিত হয়।
- প্রকৃতি – এই বায়ু অত্যধিক শীতল ও শুষ্ক হয়।
- প্রভাব –
- অত্যধিক শীতল অঞ্চলে মেরু বায়ুর উৎপত্তি হওয়ায় এই বায়ু যে যে অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানে উষ্ণতা হ্রাস পায়।
- এই বায়ুর প্রভাবে তুষারপাত ও তুষার ঝড় হয়।
- দক্ষিণ গোলার্ধে মেরু বায়ুর সঙ্গে সামুদ্রিক বায়ুর সংঘর্ষে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তে ঝড়ের সৃষ্টি হয়।
চাপবলয়ের সঙ্গে নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সম্পর্ক আলোচনা করো।
চাপবলয় – চাপবলয়ের সঙ্গে বায়ুপ্রবাহের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বায়ুচাপের পার্থক্যের জন্যই বায়ু প্রবাহিত হয়। পৃথিবীতে সাতটি নির্দিষ্ট বায়ুচাপ বলয় রয়েছে –
- নিরক্ষীয় নিম্নচাপবলয়,
- কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়,
- মকরীয় উচ্চচাপ বলয়,
- সুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়,
- কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়,
- সুমেরু উচ্চচাপ বলয় ও
- কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।
নিয়ত বায়ু – ভূপৃষ্ঠের স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় থেকে স্থায়ী নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারাবছর ধরে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট গতিতে এবং নির্দিষ্ট দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ুপ্রবাহ বলে। নিয়ত বায়ু তিন রকমের হয় – আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু।
নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়গুলির সম্পর্ক –
আয়ন বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়ের সম্পর্ক –
উভয় গোলার্ধে ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে 5°-25° অক্ষরেখার মধ্যে সারাবছর নির্দিষ্ট পথে আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়।
এই বায়ু উত্তর গোলার্ধে কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু নামে ছুটে আসে।
একইভাবে দক্ষিণ গোলার্ধে মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নামে প্রবাহিত হয়।

পশ্চিমা বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়ের সম্পর্ক –
উত্তর গোলার্ধে 35°-60° অক্ষাংশের মধ্যে ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে পশ্চিমা বায়ু বলে।
এই বায়ু উত্তর গোলার্ধে কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে সুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু রূপে প্রবাহিত হতে থাকে।
দক্ষিণ গোলার্ধে মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে বামদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু রূপে প্রবাহিত হতে থাকে।
মেরু বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়ের সম্পর্ক –
উভয় গোলার্ধে 70°-80° অক্ষরেখার মধ্যে মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে মেরু বায়ু বলে।
উত্তর গোলার্ধের সুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে তীব্র শীতল ও শুষ্ক বায়ু সুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু রূপে প্রবাহিত হয়।
দক্ষিণ গোলার্ধের কুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে তীব্র শীতল ও শুষ্ক বায়ু কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু রূপে প্রবাহিত হতে থাকে।
সাময়িক বায়ুর সংজ্ঞা দাও। সাময়িক বায়ুর শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করো।
সাময়িক বায়ুর সংজ্ঞা – যে সমস্ত বায়ুপ্রবাহ সারাবছর প্রবাহিত না হয়ে কোনো দিনের বা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রবাহিত হয়, সেই সমস্ত বায়ুপ্রবাহকে সাময়িক বায়ুপ্রবাহ (Periodical Wind) বলা হয়। যেমন – মৌসুমি বায়ু, স্থলবায়ু, সমুদ্রবায়ু।
সাময়িক বায়ুর সৃষ্টির কারণ – দিনের বিভিন্ন সময়ে এবং বছরের বিভিন্ন ঋতুতে উষ্ণতা এবং বায়ুচাপের মধ্যে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এই তাপ ও চাপের তারতম্যের জন্য সাময়িক বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়।
সাময়িক বায়ুর শ্রেণিবিভাগ – বায়ুপ্রবাহের স্থান, কাল ও প্রকৃতি অনুসারে সাময়িক বায়ুপ্রবাহকে প্রধানত 5টি ভাগে ভাগ করা যায়, সেগুলি হল –
1. সমুদ্রবায়ু (Sea Breeze) – স্থলভাগ ও জলভাগ পাশাপাশি অবস্থান করলে দিনেরবেলায় স্থলভাগ, জলভাগ অপেক্ষা অধিক উষ্ণ হয় এবং সেখানে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। কিন্তু জলভাগ তত উষ্ণ হয় না বলে সেখানে উচ্চচাপ বিরাজ করে। এর ফলে মধ্যাহ্নের পর থেকে বিকাল পর্যন্ত সময়ে জলভাগের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে স্থলভাগের নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে সমুদ্রবায়ু বলে। উল্লেখ্য, অপরাহ্নে এই বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় 15-25 কিমি পর্যন্ত হয়। কলকাতা, দিঘা, পুরীতে গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যাবেলায় সমুদ্রবায়ুর প্রভাবে আরামবোধ হয়।
2. স্থলবায়ু (Land Breeze) – সন্ধ্যার পর থেকে স্থলভাগ ক্রমাগত তাপ বিকিরণ করে শীতল হতে শুরু করে। রাত্রির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থলভাগ এইভাবে দ্রুত শীতল হয় ও সেখানে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, সমুদ্রজল ততটা দ্রুত শীতল হতে পারে না। ফলে, রাত্রিবেলায় সমুদ্রের ওপরকার বায়ুমণ্ডলে নিম্নচাপ এবং স্থলভাগের ওপরকার বায়ুমণ্ডলে উচ্চচাপ বিরাজ করে। সেই কারণে মধ্যরাত্রি থেকে ভোরবেলা পর্যন্ত স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে স্থলবায়ু বলে। উল্লেখ্য, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে এই বায়ু বিশেষভাবে অনুভব করা যায়।

3. মৌসুমি বায়ু (Monsoon Wind) – আরবি শব্দ ‘মৌসিম’ কথার অর্থ ‘ঋতু’। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে (76 খ্রিস্টাব্দে) মিশরীয় নাবিক ‘হিপ্পালাস’ (Hippalus) মৌসুমি বায়ু আবিষ্কার করেন। মে-জুন মাসে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থলভাগ প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেই স্থানের বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং ওই স্থানে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। তখন দক্ষিণ গোলার্ধের অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণ দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু রূপে ওই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য ছুটে আসে। প্রবাহপথে জলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে প্রচুর জলীয় বাষ্পে পরিপূর্ণ এই বায়ুর দ্বারা প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
অন্যদিকে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ গোলার্ধের জলভাগ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগ থেকে এই বায়ু দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে প্রবাহিত হয়। তবে জলীয় বাষ্প না থাকার জন্য এই বায়ু দ্বারা সাধারণত বৃষ্টিপাত হয় না। উল্লেখ্য, সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ু – এই দুটি দৈনিক বায়ুপ্রবাহের বৃহত্তর এবং ঋতুগত সংস্করণ হল মৌসুমি বায়ু।
4. অ্যানাবেটিক বায়ু (Anabatic Wind) – দিনেরবেলায় সূর্যকিরণের প্রভাবে পর্বতের দু-পাশের ঢালের উপরিভাগের বায়ু অধিক উষ্ণ হয়, কিন্তু উপত্যকার মধ্যবর্তী অংশের বায়ু ততটা উত্তপ্ত হতে পারে না। ফলে, সেখানকার বায়ুতে উচ্চচাপ বিরাজ করে। অথচ পর্বতের পাদদেশ উষ্ণ থাকায় এই অঞ্চল থেকে উষ্ণ ও হালকা বায়ু পর্বতের ঢাল বরাবর ঊর্ধ্বগামী হয়। একে বলা হয় উপত্যকা বায়ু বা অ্যানাবেটিক বায়ু।

প্রভাব – এরকম তারতম্যের কারণে ইউরোপের অনেক অংশে জনবসতি ও কৃষিকাজ পর্বতের পাদদেশে না হয়ে উপরের অংশে হয়ে থাকে।
5. ক্যাটাবেটিক বায়ু (Katabatic Wind) – রাত্রিবেলায় পর্বতের উপরিভাগ অতি দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল ও ভারী হয়ে যায়। ফলে, পর্বতের ঢাল বেয়ে ওই ভারী উচ্চচাপের বায়ু নীচের দিকে উপত্যকায় নামতে থাকে। এর ফলে, পর্বতের নীচের উষ্ণ বায়ু উপরের দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এইরূপ নিম্নগামী বায়ুপ্রবাহকে পার্বত্য বায়ু বা ক্যাটাবেটিক বায়ু বলে।

মৌসুমি বায়ু কাকে বলে? মৌসুমি বায়ুর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
মৌসুমি বায়ু – আরবি শব্দ ‘মৌসিম’ বা মালয়ী শব্দ ‘মনসিন’ থেকে ‘মৌসুমি’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘ঋতু’। ঋতু অনুসারে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। মৌসুমি বায়ুকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –
- গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু ও
- শীতকালীন মৌসুমি বায়ু।
গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু – গ্রীষ্মকালে মহাদেশের অভ্যন্তরভাগ সূর্যের তাপে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সেখানে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এই সময় ভারত মহাসাগরের জল তুলনায় ঠান্ডা থাকায় সেখানে উচ্চচাপ বিরাজ করে। ফলে, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে। একে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু বলে। জলভাগের ওপর দিয়ে আসায় এটি প্রচুর জলীয় বাষ্প ধারণ করে এবং স্থলভাগে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়।
![অষ্টম শ্রেণির ভূগোল - চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর 9 গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু [জুলাই]](https://solutionwbbse.com/wp-content/uploads/2026/03/%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%AE%E0%A7%8C%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%81-%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87.webp)
শীতকালীন মৌসুমি বায়ু – শীতকালে মহাদেশের অভ্যন্তরভাগে কম উষ্ণতার জন্য উচ্চচাপ বিরাজ করে। কিন্তু এই সময় ভারত মহাসাগরে জল অনেক বেশি উষ্ণ হওয়ায় সেখানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। ফলে, শীতকালে স্থলভাগ থেকে ঠান্ডা বায়ু সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। একে শীতকালীন মৌসুমি বায়ু বলে। এই বায়ু স্থলভাগ থেকে প্রবাহিত হওয়ায় জলীয় বাষ্পহীন ও শুষ্ক হয়। তাই এর প্রভাবে বৃষ্টি তেমন হয় না।

আকস্মিক বায়ু (Sudden Wind) বা অনিয়মিত বায়ুপ্রবাহের (Irregular Wind) সংজ্ঞা দাও, ও শ্রেণিবিভাগ করে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
সংজ্ঞা – ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানে বায়ুর চাপের তারতম্য হেতু আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলে যেসব বায়ুপ্রবাহ হঠাৎ আবির্ভূত হয় এবং কিছুক্ষণ অবস্থানের পর আবার হঠাৎই অন্তর্হিত হয়, তাকে আকস্মিক বায়ুপ্রবাহ বলে। এই বায়ু চাপবলয়কে অনুসরণ করে না ও এদের আসা-যাওয়ার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। প্রবল গতিবেগসম্পন্ন এই বায়ুপ্রবাহকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, সেগুলি হল –

1. ঘূর্ণবাত (Cyclone) বা নিম্নচাপজনিত বায়ুপ্রবাহ – পৃথিবীপৃষ্ঠের কোনো স্বল্প পরিসর স্থান হঠাৎ খুব উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেই স্থানের বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং সেখানে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়, তখন চারদিক থেকে শীতল ও ভারী বায়ু সেই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবল বেগে ঘূর্ণাকারে ছুটে আসে। এইরূপ নিম্নচাপ বিশিষ্ট ঝড়কে ঘূর্ণবাত (Cyclone) বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- এই ঘূর্ণবাত উত্তর গোলার্ধে বামদিকে অর্থাৎ, ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Anti-clockwise direction) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ডানদিকে অর্থাৎ, ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clock-wise direction) ঘূর্ণায়মান অবস্থায় কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয়।
- এই ঘূর্ণবাত দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে।
- স্বল্প সময় ধরে স্থায়ী হয়।
পৃথিবীর দুটি অঞ্চলে প্রধানত ঘূর্ণবাত সৃষ্টি হয়। যথা –
2. প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anti Cyclone) বা উচ্চচাপজনিত বায়ুপ্রবাহ – পৃথিবীর নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল এবং হিমমণ্ডলের অন্তর্গত স্বল্প পরিসর কোনো স্থান যদি কোনো কারণে হঠাৎ খুব শীতল ও ভারী হয়ে পড়ে, তাহলে সেখানকার বায়ুমণ্ডলে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়, কিন্তু তখন ওই উচ্চচাপ কেন্দ্রের বাইরে শীতলতা ও বায়ুর চাপ উভয়ই কম থাকে। ফলে, ওই উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে শীতল ও শুষ্ক বায়ু চারদিকের নিম্নচাপ অভিমুখে কুণ্ডলী আকারে প্রবাহিত হয়। এইরূপ বহির্মুখী এবং অধোগামী ঘূর্ণি বায়ুকে প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anti cyclone) বলে।
বৈশিষ্ট্য –
- এই বায়ুর ঘূর্ণপ্রবাহ ঘূর্ণবাতের বিপরীত দিকে অর্থাৎ, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে গিয়ে কুণ্ডলী আকারে ঘুরতে ঘুরতে প্রবাহিত হয়।
- প্রতীপ ঘূর্ণবাতের আগমনে আবহাওয়া মনোরম হয়ে যায়।
- আকাশ পরিষ্কার, মেঘমুক্ত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল হয়ে যায়।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের চতুর্থ অধ্যায় ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment