আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক (Competitive) পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বজ্রমেঘ (Thunder Cloud) সম্পর্কে টীকা লেখো।
বজ্রমেঘের সংজ্ঞা – কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে প্রচুর বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি হয় বলে একে বজ্রমেঘ বলে।
বজ্রমেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ সাদা, ধূসর ও কালো রঙের হয়।
- এই মেঘের নিম্নদেশ 1,500 ফুট উঁচুতে শুরু হয়ে শীর্ষদেশ প্রায় 12,000 ফুট ঊর্ধ্বে প্রসারিত হয়।
- এই মেঘের তলদেশ সমতল এবং উপরিভাগ চ্যাপটা গম্বুজের মতো।

সমবর্ষণ রেখা (Isohyet) সম্পর্কে টীকা লেখো।
পৃথিবীর যে-সকল স্থানে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একই রকম বা সমান সেই সকল স্থানগুলিকে একটি কাল্পনিক রেখা দ্বারা যোগ করলে যে রেখা পাওয়া যায়, তাকে সমবর্ষণ রেখা বলে। এই রেখা সর্বদা ইঞ্চি বা সেমি-তে প্রকাশ করা হয়। মানচিত্রে সমবর্ষণ রেখার সাহায্যে বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্ভিদের প্রকৃতি, কৃষিকার্যের ধরন, মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠে।
সমবর্ষণ রেখার বৈশিষ্ট্য –
- পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের তারতম্য হওয়ার জন্য সমবর্ষণ রেখা বণ্টনের ক্ষেত্রে তার প্রভাব লক্ষ করা যায়।
- সমবর্ষণ রেখাগুলি সমোয় রেখার মতো আঁকাবাঁকা হয়।
- পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এই অঞ্চলে সমবর্ষণ রেখাগুলির মান সর্বাধিক (1200 সেমি বা তার বেশি)। মরু অঞ্চলের দিকে এর মান ক্রমশ কমতে থাকে।

শিলাবৃষ্টি (Hailstorm) সম্পর্কে টীকা লেখো।
শিলাবৃষ্টির সংজ্ঞা – উচ্চ আকাশে শিশিরাঙ্ক তাপমাত্রায় ঘনীভূত জলীয় বাষ্প অনেক সময় 5-50 মিলিমিটার ব্যাসযুক্ত ছোটো বড়ো বরফকণায় পরিণত হয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে প্রবলবেগে বিক্ষিপ্তভাবে যখন মেঘ কিউমুলোনিম্বাস থেকে ছুটে আসে, তাকে শিলাবৃষ্টি বলে।
শিলাবৃষ্টির সৃষ্টির সময় – ক্রান্তীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল ও বসন্তকালে শিলাবৃষ্টি ঘটে।
শিলাবৃষ্টির প্রভাব – শিলাবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে থাকে।

আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative Humidity) সম্পর্কে টীকা লেখো।
আপেক্ষিক আর্দ্রতার সংজ্ঞা – কোনো নির্দিষ্ট উষ্ণতায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প বর্তমান আছে এবং ওই একই উষ্ণতায় একই আয়তনের বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্পের প্রয়োজন হয়, তাদের অনুপাতকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা সর্বদা শতকরা হারে পূর্ণমানে প্রকাশ করা হয়।
আপেক্ষিক আর্দ্রতার সূত্র –
আপেক্ষিক আর্দ্রতার উদাহরণ – ধরা যাক, 30°C উষ্ণতায় 100 ঘনসেমি বায়ুতে জলীয় বাষ্প আছে 40 গ্রাম এবং ওই একই উষ্ণতায় সমআয়তনের বায়ুর জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা হল 50 গ্রাম।
সুতরাং, আপেক্ষিক আর্দ্রতা হবে = \(\left(\frac{40}{50}\times100\right)\%=80\%\)
আপেক্ষিক আর্দ্রতার নির্ণায়ক যন্ত্র – হাইগ্রোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা পরিমাপ করা হয়।
শিশিরাঙ্ক (Dew Point) সম্পর্কে টীকা লেখো।
যে অবস্থায় বায়ু আর জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে না এবং অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প শিশির আকারে জমতে থাকে, তাকে শিশিরাঙ্ক বলে। যে তাপমাত্রায় শিশিরাঙ্ক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে শিশিরাঙ্কের তাপমাত্রা (Dew Point Temperature) বলে। কোনো স্থানের বায়ু ধীরে ধীরে শীতল হলে উষ্ণতা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছোলে ওই বায়ুতে উপস্থিত জলীয় বাষ্প দ্বারা বায়ু সম্পৃক্ত হয়ে ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় শিশির কণার সৃষ্টি হয়। শিশিরাঙ্কে বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা সর্বাধিক (100%) হয়।
কুয়াশা (Fog) সম্পর্কে টীকা লেখো।
কুয়াশার সংজ্ঞা – দীর্ঘ শীতল রাত্রি ও মেঘমুক্ত আকাশে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন অঞ্চলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ধোঁয়ার ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা বায়ুতে ভেসে বেড়ায়। একে কুয়াশা বলে।
কুয়াশার বৈশিষ্ট্য –
- শীতকালে জলাশয়ের ওপর বেশি কুয়াশা দেখা যায়।
- বেলা বাড়লে ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা দূরীভূত হয়। তবে ভূপৃষ্ঠ বেশি শীতল হয়ে পড়লে কুয়াশা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়।
কুয়াশার প্রভাব –
- কুয়াশা দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়।
- কুয়াশা রেল, সড়ক, বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
- শহরাঞ্চলে কুয়াশা ধূলিকণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে ধোঁয়াশায় সৃষ্টি করে তা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কুপ্রভাব বিস্তার করে। এর প্রভাবে মানুষের ফুসফুসের রোগ দেখা যায়।
- অতিরিক্ত কুয়াশার প্রভাবে ফসলের ক্ষতি হয়।
শিশির (Dew) সম্পর্কে টীকা লেখো।
শিশিরের সংজ্ঞা – শরৎ, হেমন্ত বা শীতের মেঘমুক্ত রাত্রিতে যখন বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প শীতল ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে দ্রুত ঘনীভূত হয়ে ছোটো ছোটো জলকণায় পরিণত হয়, তখন তাকে শিশির বলে।
শিশিরের স্থান – ঘাস, গাছের পাতা, খড়ের চালের ওপর শিশির জমা হয়।
শিশিরের সৃষ্টির শর্ত –
- তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কে পৌঁছোতে হবে।
- মেঘমুক্ত দীর্ঘ রাত্রি।
- স্থির বাতাস।
শিশিরের সৃষ্টির পদ্ধতি – মেঘমুক্ত রাত্রিতে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে পড়ে বলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু তাড়াতাড়ি ঘনীভূত হয়ে বেশি মাত্রায় শিশির সঞ্চিত করে।
রেনগজ (Raingauge) সম্পর্কে টীকা লেখো।
রেনগজের সংজ্ঞা – বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাপতে যে যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়, তাকে রেনগজ (Raingauge) বলে।
রেনগজের আবিষ্কারক – ক্রিস্টোফার ওরেন 1662 খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মতভাবে রেনগজ আবিষ্কার করেন।
রেনগজের বর্ণনা – যন্ত্রটিতে 13 সেমি ব্যাসযুক্ত একটি চোঙের মধ্যে একটি 13 সেমি ব্যাসের ফানেল (Funnel) এমনভাবে বসানো থাকে, যাতে ফানেলের মধ্যে পড়া বৃষ্টির জল একটুও নষ্ট না হয়ে ভিতরের বোতলে জমা হয়। বাইরের জলের ছিটে যাতে ভিতরে না পড়ে, তাই যন্ত্রটি ভূমি থেকে প্রায় 30 সেমি উপরে রাখা হয়। 24 ঘণ্টা বা নির্দিষ্ট সময় পরে বোতলে যে পরিমাণ বৃষ্টির জল জমে তা মাপনি চোঙের মধ্যে ঢেলে বৃষ্টির পরিমাণ মাপা হয়।

ঘূর্ণবাতের চোখ (Eye of Cyclone) সম্পর্কে টীকা লেখো।
ঘূর্ণবাতের চোখের সংজ্ঞা – শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রের গভীর নিম্নচাপযুক্ত শান্ত আবহাওয়া বিশিষ্ট অংশকে ঘূর্ণবাতের চোখ বা ঝড়ের চক্ষু বলে।
ঘূর্ণবাতের চোখের বৈশিষ্ট্য –
- এখানে আকাশ পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত থাকে।
- এখানকার বায়ু অত্যন্ত হালকা হওয়ায় এখান থেকে আকাশ দৃশ্যমান হয়।
- ঘূর্ণবাতের অগ্রমানকালে চক্ষুটি যখন যেখানে অবস্থান করে সেখানে বৃষ্টিপাত হয় না।
- ঘূর্ণবাত চক্ষুর পরিধি সর্বাধিক 80 কিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (Rainshadow Region) সম্পর্কে টীকা লেখো।
সমুদ্র থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু তার প্রবাহপথে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত কোনো পর্বতে বাধা পেলে পর্বতের গা বেয়ে উপরে উঠে যায়। ঊর্ধ্বগামী এই বায়ু প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে এবং বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে ক্রমশ বড়ো হতে থাকে এবং পর্বতের যে ঢাল বেয়ে বায়ু উপরে উঠে এসেছে, সেই প্রতিবাত ঢালে (Windward Side) প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। পর্বত অতিক্রম করে এই বায়ু যখন বিপরীত ঢাল অর্থাৎ, অনুবাত ঢালে (Leeward Side) এসে পৌঁছোয় তখন তাতে আর জলীয় বাষ্প থাকে ঘন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাই এই ঢালে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (Rainshadow Region) বলে।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘ সম্পর্কে টীকা লেখো।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘ – এই ধরনের মেঘ যে-কোনো উচ্চতায় তৈরি হয়ে থাকে।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ অত্যন্ত ঘন ও গভীর প্রকৃতির।
- এটি ধূসর কালো কিংবা ঘন কালো প্রকৃতির।
- এই মেঘ ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে অবস্থান করে, তবে এর আকৃতি ও উচ্চতা একটি বিশালাকৃতির পর্বতের মতো। তলদেশ প্রায় সমতল কিন্তু উপরিভাগ চ্যাপটা প্রকৃতির হয়।
- বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে উত্তর-পশ্চিম আকাশে এই মেঘ দৃষ্টিগোচর হয়।
- প্রচণ্ড বজ্রপাত ঘটানোর জন্য এই মেঘের অপর নাম ‘বজ্রমেঘ’ (Thunder Cloud)।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘের প্রভাব – এই মেঘ থেকে প্রচণ্ড বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে কিছু ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment