আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘জলবায়ু অঞ্চল’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল ষষ্ঠ অধ্যায়: জলবায়ু অঞ্চল – গুরুত্বপূর্ণ টীকা
পিগমি সম্পর্কে টীকা লেখো।
- বাসভূমি – আফ্রিকার জাইরে নদী অববাহিকা।
- খাদ্য – বনের ফলমূল এবং সব ধরনের পশুপাখিদের এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
- পোশাক – কালো রঙের বেঁটেখাটো এই মানুষগুলি জঙ্গলের লতাপাতা, গাছের ছাল ও জীবজন্তুর চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক পরিধান করে।
- বাসস্থান – এরা যাযাবর প্রকৃতির হয়, তাই স্থায়ী বাসগৃহ নেই। গাছের ডালপালা ও পাতা দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে। ঘরগুলি চারদিকে গোল হয়ে গড়ে ওঠে। মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় এরা আগুন জ্বালিয়ে নাচগান করে।
- জীবিকা – পিগমিরা আদিম খাদ্য সংগ্রহকারী। বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ ও পশুশিকার এদের প্রধান জীবিকা।
চাঁদোয়া (Canopy) সম্পর্কে টীকা লেখো।
নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্য জলবায়ুতে সারাবছর ধরে অত্যধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের ফলে এখানকার উদ্ভিদগুলি খুব ঘনসন্নিবিষ্টভাবে জন্মায়। পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অভিযোজন ঘটিয়ে তাদের ডালপালা ও পাতাগুলিকে প্রশস্তভাবে মেলে ধরায় ওপরে যে ছাতা বা সামিয়ানার ন্যায় অংশের সৃষ্টি হয়, তাকে চাঁদোয়া (Canopy) বলে।
প্রভাব – নিরক্ষীয় অঞ্চলে এই চাঁদোয়া ভেদ করে সূর্যের আলো ভূমিভাগে পৌঁছোয় না বলে দিনের বেলাতেও এখানে মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থাকে।

রেড ইন্ডিয়ান সম্পর্কে টীকা লেখো।
- বাসভূমি – দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকার সেলভা অরণ্যে এদের বাস।
- খাদ্য – বনের ফলমূল এদের প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া বন থেকে জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং জল থেকে মাছ, কচ্ছপ, কাঁকড়া প্রভৃতি শিকার করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
- পোশাক – এরা হালকা সুতির তৈরি পোশাক পরিধান করে। মাথায় কারুকার্য করা টুপি পরে।
- বাসস্থান – এরা দলবেঁধে বনের কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে সেখানে গাছের ডালপালা, পাতা ও ঘাস দিয়ে ঘর তৈরি করে বাস করে।
- জীবিকা – ফলমূল সংগ্রহ, পশু ও মৎস্যশিকার এদের প্রধান জীবিকা। তবে অনেকে ঘরের পাশে ওল, কলা, মিষ্টি আলু চাষ করে।

সেমাঙ সম্পর্কে টীকা লেখো।
- বাসভূমি – দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপে এদের বাস।
- খাদ্য – বনের ফলমূল, শিকার করা পশুর মাংস, মাছ এদের প্রধান খাদ্য।
- পোশাক – এরা গাছের ছাল ও পশুর চামড়ার তৈরি পোশাক পরিধান করে।
- বাসস্থান – এরা এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। তাই স্থায়ী ঘরবাড়ি নেই। এরা সাধারণত গাছের উপর মাচা তৈরি করে ছোটো ছোটো ঘর নির্মাণ করে।
- জীবিকা – বনের ফলমূল সংগ্রহ ও পশুশিকার এদের প্রধান জীবিকা। তবে বহু সেমাং রবার বাগিচায় কাজ করে।

বান্টু সম্পর্কে টীকা লেখো।
- বাসভূমি – আফ্রিকার জাইরে নদী অববাহিকার অপেক্ষাকৃত কম ঘন অরণ্যে এরা বাস করে।
- খাদ্য – কলা, মিষ্টি আলু, ওল, কুমড়ো, ভুট্টা প্রভৃতি বান্টুদের প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া এরা মাছ, মাংস, কচ্ছপ প্রভৃতি খেয়ে থাকে।
- পোশাক – পুরুষেরা আলখাল্লার মতো লম্বা পোশাক ও মহিলারা রঙিন জামাকাপড় পরে।
- বাসস্থান – এরা মাটিতে খুঁটি পুঁতে উঁচু মাচা তৈরি করে তার ওপর গোলাকৃতি ঘর বানায়।
- জীবিকা – এরা গাছপালা পুড়িয়ে জমি তৈরি করে স্থানান্তর কৃষিকাজের মাধ্যমে ওল, আলু, ভুট্টা প্রভৃতি চাষ করে। এ ছাড়া এরা কলা, কফি প্রভৃতি উৎপাদন করে এবং ভেড়া, ছাগল, মুরগি প্রভৃতি পালন করে।
মৌসুমি জলবায়ুর ঋতুচক্র সম্পর্কে টীকা লেখো।
মৌসুমি জলবায়ুর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঋতুচক্র বা ঋতুপর্যায়। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম—এই দুই বিপরীতধর্মী মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাবর্তন অনুসারে এই অঞ্চলের জলবায়ুতে চারটি ঋতু চক্রাকারে আবর্তিত হয়। যথা –
- উত্তর গোলার্ধে –
- বৃষ্টিহীন শীতকাল (ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস)।
- বৃষ্টিহীন উষ্ণ গ্রীষ্মকাল (মার্চ থেকে মে মাস)।
- আর্দ্র মৌসুমি বায়ুর আগমনকাল বা বর্ষাকাল (জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস)।
- মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনকাল বা শরৎকাল (অক্টোবর ও নভেম্বর মাস)।
- দক্ষিণ গোলার্ধে – মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে ঠিক এই সময়গুলিতেই বিপরীত ঋতু বিরাজ করে। এই অঞ্চলে বর্ষাকালের আসা-যাওয়ার সময় এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দুটিই অত্যন্ত অনিশ্চিত।
ম্যানগ্রোভ অরণ্য (Mangrove) সম্পর্কে টীকা লেখো।
ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের লবণাক্ত মৃত্তিকায় যে বিশেষ ধরনের উদ্ভিদের সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়, তাকে ম্যানগ্রোভ অরণ্য বলে।
প্রকৃতি – লবণাক্ত জলাভূমিতে শোষণ ও শ্বাসকার্য ব্যাহত হওয়ায় এদের শ্বাসমূল থাকে এবং ঠেসমূল এই উদ্ভিদগুলিকে জোয়ারভাঁটা ও সমুদ্রস্রোতের হাত থেকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে। উদাহরণ – সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, গোলপাতা, হোগলা প্রভৃতি।

পশ্চিমি ঝঞ্ঝা (Western Disturbance) সম্পর্কে টীকা লেখো।
সংজ্ঞা – শীতকালে মাঝে মাঝে দু-চারদিন একটানা আকাশ মেঘলা থাকে ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়। একে পশ্চিমি ঝঞ্ঝা বলে।
নামকরণ – শীতকালের শান্ত আবহাওয়ার মধ্যে পশ্চিমা বায়ু এসে ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করে বলে এর নাম পশ্চিমি ঝঞ্ঝা বা পশ্চিমি ঝামেলা হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য –
- ভূমধ্যসাগর থেকে পশ্চিমা বায়ু এসে বৃষ্টিপাত ও পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাত ঘটায়।
- এর প্রভাবে শীতের প্রকোপ আরো বেড়ে যায়।
- শীতকালে ফসল চাষে এই বৃষ্টি সাহায্য করে।
মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভা সম্পর্কে টীকা লেখো।
সুমেরু অঞ্চলে (23 সেপ্টেম্বর থেকে 21 মার্চ) এবং কুমেরু অঞ্চলে (21 মার্চ থেকে 23 সেপ্টেম্বর) যখন টানা 6 মাস রাত্রি চলে, তখন আকাশে মাঝে মাঝে বর্ণময় জ্যোতি দেখা যায়, একে মেরুজ্যোতি বলে।
- সৃষ্টি – বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ারে বিভিন্ন গ্যাসীয় অণু এবং সূর্যরশ্মির সংঘর্ষে যে আলোকতরঙ্গ সৃষ্টি হয়, সেগুলি তড়িৎচৌম্বকীয় বিক্ষেপণের দ্বারা সুমেরুতে সুমেরুপ্রভা (Aurora Borealis) এবং কুমেরুতে কুমেরুপ্রভা (Aurora Australis) নামে পরিচিত।
- প্রভাব – উভয় মেরু অঞ্চলে 6 মাস রাত্রিকালীন এই মেরুপ্রভা সেখানে কিছুটা আলোর আভাস দেয়।

এস্কিমো সম্পর্কে টীকা লেখো।
‘এস্কিমো’ হলো তুন্দ্রা জলবায়ুর অন্তর্গত এক বিশেষ উপজাতি। এই ‘এস্কিমো’ শব্দের অর্থ ‘কাঁচামাংস খাদক’।
- বাসস্থান – দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের উপকূলভাগ, পূর্ব সাইবেরিয়া, আলাস্কা ও কানাডার উত্তরাংশে এই উপজাতির বাস।
- প্রকৃতি – হিমশীতল তুন্দ্রা জলবায়ুতে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে এরা বেঁচে থাকে। বাসস্থান হিসেবে বরফের ঘর ‘ইগলু’ এবং চামড়ার তাঁবু ‘টিউপিক’-কে এরা ব্যবহার করে। খাদ্যের জন্য এরা স্থলভাগের বলগা হরিণ, মেরু শৃগাল এবং সমুদ্রের বিভিন্ন মাছ, সিন্ধুঘোটক, সিল প্রভৃতি শিকারের ওপর নির্ভরশীল। প্রসঙ্গত, তুন্দ্রা অঞ্চলে এই এস্কিমো উপজাতি ‘ইনুইট’, ‘ইউপিক’, ‘অ্যালিউট’ প্রভৃতি নামেও পরিচিত।

ইগলু সম্পর্কে টীকা লেখো।
তুন্দ্রা অঞ্চলের অধিবাসী বিশেষত এস্কিমোরা শীতকালে তুষারপাত ও তুষারঝড়ের প্রকোপ থেকে বাঁচতে কঠিন বরফের চাঁইকে ইঁটের মতো চৌকো চৌকো করে ভেঙে তা দিয়ে গম্বুজের মতো বা উলটানো বাটির মতো এক ধরনের ঘর তৈরি করে। এই ঘরকে ইগলু (Igloo) বলে। এস্কিমো ভাষায় ‘ইগলু’ শব্দের অর্থ ‘গৃহ’।
এই ঘরে প্রবেশ করার জন্য ছোটো সুড়ঙ্গের মতো দরজা থাকে, যেখান দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। ঘরের মেঝেতে সিলমাছের চামড়া পেতে তার ওপর শুকনো ঘাস বা মস বিছিয়ে দেওয়া হয়। ইগলুর ভিতরটা গরম রাখার জন্য সিলমাছের চর্বির তেল ও শুকনো মসের পলতে দিয়ে পাথরের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়।

‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ সম্পর্কে টীকা লেখো।
অথবা, ‘নিশীথ সূর্য’ যখন দেখা যায় তখন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আবহাওয়া কেমন থাকে?
21 মার্চ থেকে 23 সেপ্টেম্বর পর্যন্ত 186 দিন সময়কালে সুমেরুবৃত্ত (66½° উঃ) থেকে সুমেরুবিন্দুর (90° উঃ) মধ্যবর্তী অঞ্চলে অর্থাৎ, উত্তর মেরু সংলগ্ন অঞ্চলে যখন একটানা 6 মাস দিন হয়, তখন দক্ষিণ মেরুতে একটানা 6 মাস রাত্রি চলতে থাকে। এই সময়ে নরওয়ের উত্তর সীমায় অবস্থিত হ্যামারফেস্ট বন্দরে (70½° উঃ) স্থানীয় ঘড়ির সময়ানুসারে গভীর রাত্রিতেও আকাশে সূর্যের আলো দেখা যায়। সেজন্য এই আলোকে ‘নিশীথ সূর্য’ (Midnight Sun) এবং এই অঞ্চলকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ (Land of Midnight Sun) বলা হয়।
টিউপিক সম্পর্কে টীকা লেখো।
তুন্দ্রা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে বরফ গলতে শুরু করে। তাই বরফের তৈরি ইগলুতে বাস করা যায় না। সেজন্য এখানকার অধিবাসীরা সিলমাছ ও জীবজন্তুর চামড়া দিয়ে একপ্রকার তাঁবু তৈরি করে বাস করে। এই তাঁবুগুলি ‘টিউপিক’ নামে পরিচিত। গ্রীষ্মকালে বরফগলা জলে ভেসে আসা কাঠ ও তিমিমাছের পাঁজরের বড়ো হাড় দিয়ে এই তাঁবুর কাঠামো তৈরি করা হয়। এই তাঁবুর আচ্ছাদন তৈরি করতে প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি সিলমাছের চামড়া সেলাই করতে হয়।

কায়াক সম্পর্কে টীকা লেখো।
‘কায়াক’ শব্দের অর্থ ‘মনুষ্য নির্মিত নৌকা বা শিকারি নৌকা’। তুন্দ্রা অঞ্চলের অধিবাসীরা সিলমাছের চামড়ার তৈরি যে বিশেষ ধরনের নৌকা ব্যবহার করে, তাকে কায়াক বলে।
- প্রকৃতি – এই কায়াক সাধারণত লম্বায় 5.2 মিটার, চওড়ায় 50-55 সেমি এবং গভীরতায় প্রায় 18-20 সেমি হয়ে থাকে।
- ব্যবহার – তুন্দ্রা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে যখন সিল, সিন্ধুঘোটক, শার্ক, তিমি কিংবা অন্যান্য মাছের সমাগম ঘটে, তখন এখানকার অধিবাসীরা কায়াকে করে সমুদ্রে শিকারে নেমে পড়ে।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘জলবায়ু অঞ্চল’ থেকে কিছু ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment