আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘জলবায়ু অঞ্চল’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল ষষ্ঠ অধ্যায়: জলবায়ু অঞ্চল – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
জলবায়ু অঞ্চল (Climatic Region) কাকে বলে? জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। অথবা, জলবায়ু অঞ্চলের প্রকৃতি লেখো।
জলবায়ু অঞ্চল (Climatic Region) – পৃথিবীর কোনো বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যখন আবহাওয়া ও জলবায়ুর মূল উপাদানগুলি, যেমন – উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, বায়ুর চাপ, বায়ুর আর্দ্রতা, বাষ্পীভবন, বায়ুর গতিবেগ, মেঘাচ্ছন্নতা প্রভৃতির বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি সুদীর্ঘকাল ধরে প্রায় সমধর্মী হয়, তাকে জলবায়ু অঞ্চল বলে। যেমন – মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল, ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল, তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চল প্রভৃতি।
জলবায়ু অঞ্চলের প্রকৃতি/বৈশিষ্ট্য – পৃথিবীর প্রতিটি জলবায়ু অঞ্চলের নিম্নলিখিত প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যেমন –
- সীমা – পৃথিবীর প্রতিটি জলবায়ু অঞ্চল বৃহৎভাবে বিস্তৃত। তবে জলবায়ু অঞ্চলগুলি কোনো দৈশিক সীমানা মান্য করে না।
- পৃথকীকরণ – দুটি জলবায়ু অঞ্চলকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায় না। একটি জলবায়ু অঞ্চল ধীরে ধীরে অন্য একটি জলবায়ু অঞ্চলে মিশে যায়।
- নিয়ন্ত্রক – প্রতিটি জলবায়ু অঞ্চল উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, বাষ্পীভবন, মেঘাচ্ছন্নতা প্রভৃতির দীর্ঘকালীন ভারসাম্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
- উপঅঞ্চল – একটি বৃহৎ জলবায়ু অঞ্চলের মধ্যে অনেকগুলি ছোটো ছোটো উপঅঞ্চলের সৃষ্টি হতে পারে।
- রাজনৈতিক সীমানা – জলবায়ু অঞ্চলের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমানা থাকে না।
- মানুষের ওপর প্রভাব – জলবায়ু অঞ্চলগুলি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
- উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের ওপর প্রভাব – জলবায়ু অঞ্চলভেদে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিভিন্নতা দেখা যায়। যেমন অ্যানাকোন্ডা শুধুমাত্র নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায়।
পৃথিবীর প্রধান প্রধান জলবায়ু অঞ্চলগুলি কী কী উল্লেখ করো।
জলবায়ুবিদ কোপেন, ফ্লন, ট্রেওয়ার্থা প্রমুখ উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীকে বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর জলবায়ু অঞ্চলগুলিকে প্রধানত 5টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –
- ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চল (Tropical Climatic Region) –
- আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চল
- আর্দ্র ও শুষ্ক ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চল
- শুষ্ক জলবায়ু অঞ্চল (Dry Climatic Region) –
- উপমরু জলবায়ু অঞ্চল
- মরু জলবায়ু অঞ্চল
- নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু অঞ্চল (Temperate Climatic Region) –
- ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল
- আর্দ্র উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চল
- পশ্চিম ইউরোপীয় জলবায়ু অঞ্চল
- মহাদেশীয় জলবায়ু অঞ্চল (Continental Climatic Region) –
- আর্দ্র মহাদেশীয় জলবায়ু অঞ্চল
- মেরুবৃত্তীয় জলবায়ু অঞ্চল
- মেরুদেশীয় জলবায়ু অঞ্চল (Polar Climatic Region) –
- তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চল
- তুহিন জলবায়ু অঞ্চল
উপরিউক্ত প্রধান 5টি শ্রেণিবিভাগ ছাড়াও পার্বত্য জলবায়ু অঞ্চলও লক্ষ করা যায়।

নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের (Equatorial Climatic Region) অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য লেখো।
অথবা, নিরক্ষীয় বৃষ্টিঅরণ্য অঞ্চল (Equatorial Rainforest Region) -এর প্রকৃতি উল্লেখ করো।
অক্ষাংশগত অবস্থান – নিরক্ষীয় জলবায়ু পৃথিবীর উভয় গোলার্ধের 5°-10° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। তবে আদর্শ নিরক্ষীয় জলবায়ু প্রসঙ্গে জলবায়ুবিদ অস্টিন মিলার 2°-8° উত্তর অক্ষাংশের কথা বলেছেন।
ভৌগোলিক অবস্থান –
- আফ্রিকা মহাদেশ – কঙ্গো অববাহিকার কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, জাইরে, ক্যামেরুন, গ্যাবন, সিয়েরালিওন, আইভরি কোস্ট, গিনি, কেনিয়া, তানজানিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চল।
- দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ – আমাজন নদী অববাহিকার অন্তর্গত পেরু, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, উপকূলীয় গিয়ানা এবং ভেনিজুয়েলার অংশবিশেষ।
- মধ্য আমেরিকা – পানামা, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা, হন্ডুরাস প্রভৃতি দেশসমূহ।
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া – ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনস দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত এবং শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাংশের বেশ কিছু স্থানে নিরক্ষীয় জলবায়ু দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য –
- লম্ব সূর্যরশ্মি – সারাবছর সূর্য প্রায় লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা প্রায় 27°C থাকে।
- তাপমাত্রার দৈনিক প্রসর – দিনের তাপমাত্রা 38°-40°C হলেও রাতে তা 15°C-এ নেমে যায়। ফলে দৈনিক তাপমাত্রার প্রসর প্রায় 15°C।
- বাৎসরিক উষ্ণতার প্রসর – সারাবছর গ্রীষ্মকাল বিরাজ করায় বাৎসরিক উষ্ণতার প্রসর মাত্র 2°C।
- দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য – সারাবছর 12 ঘণ্টা দিন ও 12 ঘণ্টা রাত্রি হয়।
- বায়ুর চাপ ও শান্তবলয় – বায়ুর চাপ 1009-1012 মিলিবার থাকে। পরিচলন পদ্ধতিতে বায়ু ঊর্ধ্বগামী হয় বলে বায়ুপ্রবাহের বেগ বোঝা যায় না, তাই একে নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ITCZ (Inter Tropical Convergence Zone) বলা হয়।
- আর্দ্রতা ও মেঘাচ্ছন্নতা – বায়ুর আর্দ্রতা গড়ে 85%-90% থাকে। বিকালে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের সঞ্চার ঘটে।
- অত্যধিক বৃষ্টিপাত (4 O’clock Rain) – বছরে গড়ে প্রায় 200-250 সেমি বৃষ্টিপাত ঘটে। প্রতিদিন বিকাল 3-4টের সময় পরিচলন বৃষ্টি হয় বলে একে ‘4 O’clock Rain’ বলে।
- শীতল রাত – অপরাহ্নে বৃষ্টির পর রাতে আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে যায়। এজন্য নিরক্ষীয় অঞ্চলের রাত ‘ক্রান্তীয় শীতকাল’ বা ‘Winter of Tropics’ নামে পরিচিত।
- চিরহরিৎ অরণ্য – অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের কারণে চিরহরিৎ বা চিরসবুজ অরণ্য (Equatorial Rainforest) গড়ে উঠেছে।

নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আলোকপাত করো।
অথবা, নিরক্ষীয় জলবায়ুতে কীভাবে এখানকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও বণ্যপ্রাণী অভিযোজন ঘটিয়েছে?
নিরক্ষীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য –
স্বাভাবিক উদ্ভিদ (Natural Vegetation) – নিরক্ষীয় জলবায়ুতে সারাবছর ধরে অত্যধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত বিরাজ করায় এখানে অত্যন্ত ঘন, চিরসবুজ (Evergreen) ও বিভিন্ন স্তরবিশিষ্ট উদ্ভিদের বিকাশ ঘটেছে।
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেণিবিভাগ – নিরক্ষীয় জলবায়ুতে নিম্নোক্ত 3টি শ্রেণির উদ্ভিদ দেখা যায় –
- সেলভা প্রকৃতির উদ্ভিদ – ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকা সংলগ্ন চওড়া পাতাবিশিষ্ট, দীর্ঘ, চিরসবুজ উদ্ভিদের অরণ্য সেলভা নামে পরিচিত। প্রতি বর্গকিমিতে প্রায় 100-200টি প্রজাতির এবং 40-45 মিটার উচ্চতাযুক্ত উদ্ভিদ দেখা যায়। অধিক উষ্ণতা ও আর্দ্রতায় উদ্ভিদগুলি একটি চাঁদোয়া (Canopy) সৃষ্টি করেছে। এই দুর্ভেদ্য অরণ্যের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো জঙ্গল ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছাতে পারে না বলে, একে চিরগোধূলি অঞ্চল বলে। উদাহরণ – রোজ উড, আয়রন উড, ব্রাজিল নাট, রবার প্রভৃতি এই প্রকৃতির উদ্ভিদ।
- বীরুৎ প্রকৃতির উদ্ভিদ – এই সমস্ত উদ্ভিদ নিরক্ষীয় অঞ্চলের পাহাড়ের ঢালে, তলদেশে, ঝোপঝাড় কিংবা লতানো বা কোনো গাছকে জড়িয়ে অবস্থান করে। উদাহরণ – র্যাটন লতা, লাইকেন, সিঙ্কোনা, বিভিন্ন পরগাছা এই প্রকৃতির।
- অন্যান্য বৃক্ষ – নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে উপকূলভাগে প্রচুর পরিমাণে নারকেল, তাল, পাম প্রভৃতি উদ্ভিদ জন্মায়।

বন্যপ্রাণী সম্প্রদায় (Wildlife Community) – ঘন, দুর্ভেদ্য নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্যের বিভিন্ন প্রাণী এখানকার বনভূমির সঙ্গে নিবিড় অভিযোজন ঘটিয়ে থাকায় এই প্রাণীদের বেশিরভাগ সরীসৃপ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
ভূগোলবিদ J L Harrison এই অরণ্যের বন্যপ্রাণী সম্প্রদায়কে নিম্নোক্ত 3টি ভাগে ভাগ করেন –
- উচ্চস্তরীয় প্রাণীগোষ্ঠী – ম্যাকাও, টুকান প্রভৃতি পাখি, বিভিন্ন প্রজাপতি, বাদুড়, সোনালি বানর, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, ওরাংওটাং এই পর্যায়ভুক্ত প্রাণী।
- মধ্যস্তরীয় প্রাণীগোষ্ঠী – গোরিলা, হনুমান, বিভিন্ন প্রকার কীটপতঙ্গ, পতঙ্গভুক বাদুড়, বিলবার্ড এই পর্যায়ভুক্ত।
- ভূমিস্তরের প্রাণীগোষ্ঠী – এখানে বিভিন্ন প্রজাতির শূকর, শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, বাইসন, চিতাবাঘ, হাতি, শিয়াল, জলহস্তী, গন্ডার, জেব্রা ও বিষাক্ত সাপ থাকে।

জলাভূমির প্রাণী – এছাড়াও এই অঞ্চলের জলাভূমিতে দীর্ঘকায় অ্যানাকোন্ডা সাপ, হাঙর ও নানা জাতের কুমির বাস করে।
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টা বা ক্রিয়াকলাপ (Economic Activities) আলোচনা করো।
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল দুর্গম, বিপদসংকুল, অস্বাস্থ্যকর ও বন্য প্রকৃতির হলেও এখানে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করা যায়, যেমন –
- ফলমূল ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ – নিরক্ষীয় অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বিশেষত জাইরে অববাহিকার পিগমি, উচ্চ আমাজনের রেড ইন্ডিয়ান, মালয়েশিয়ার সেমাং প্রভৃতি উপজাতিরা বনভূমি থেকে ফলমূল, ভেষজ দ্রব্য, বিভিন্ন প্রকার আঠা (রবার) সংগ্রহ করে জীবিকা অর্জন করে।
- পশু শিকার – এখানকার মুরা, গুয়াত, ম্যাফিগোন, পিগমি, বান্টু প্রভৃতি উপজাতিরা বিভিন্ন বন্য জীবজন্তু শিকার ও নদী থেকে প্রাপ্ত মাছ, কুমির, কচ্ছপ প্রভৃতি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
- কৃষিকাজ – এখানে মূলত তিন ধরনের কৃষিকাজ পরিলক্ষিত হয়, যথা –
- স্থানান্তর কৃষি – অতি প্রাচীন প্রথায় এখানে বনভূমি পুড়িয়ে স্থানান্তর কৃষির মাধ্যমে ভুট্টা, ওল, কলা, মিষ্টি আলু প্রভৃতির চাষ করা হয়।
- নিবিড় কৃষি – নিরক্ষীয় অঞ্চলের ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার স্বল্প বনভূমিযুক্ত স্থানে নিবিড় কৃষির মাধ্যমে ধান চাষ করা হয়।
- বাগিচা কৃষি – অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বণিকদের দ্বারা এখানে বাগিচা কৃষির প্রচলন ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়, জাভা, সুমাত্রায় রবার চাষ, আফ্রিকার ঘানা, গ্যাবন, কঙ্গোয় কোকো ও পাম চাষ, ব্রাজিলে কফি চাষ করা হচ্ছে।

- খনিজ সম্পদ – নিরক্ষীয় অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে প্রাপ্ত খনিজ সম্পদকে কেন্দ্র করে সেখানকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। যেমন – মালয় উপদ্বীপে প্রাপ্ত টিন, আমাজনীয় অ্যামাপা অববাহিকার ম্যাঙ্গানিজ এবং সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও দ্বীপে প্রাপ্ত খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসকে কেন্দ্র করে এখানকার জীবনযাত্রা আবর্তিত হয়।
- শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদন – নিরক্ষীয় অঞ্চলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এখানকার স্থানীয় কৃষিজ, বনজ ও খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে বেশ কয়েকটি শিল্প গড়ে উঠেছে, যেমন – রবার উৎপাদন শিল্প, চিনি শিল্প, পাম তেলজাত দ্রব্য উৎপাদন শিল্প, কফি উৎপাদন শিল্প, টিন উৎপাদন শিল্প, খনিজ তেল পরিশোধন শিল্প প্রভৃতি।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর (Tropical Monsoon Climate) প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী তা আলোচনা করো।
উভয় গোলার্ধে ক্রান্তীয় অঞ্চলের 10°-30° অক্ষাংশের অন্তর্গত মৌসুমি জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ –
- প্রকৃতি – মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রক হল ঋতুভিত্তিক বায়ুপ্রবাহ। যেহেতু গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের ওপর দিয়ে আর্দ্র মৌসুমি বায়ু বয়ে আসে, তাই গ্রীষ্মকাল এখানে আর্দ্র-উষ্ণ প্রকৃতির হয়। শীতকালে স্থলভাগের ওপর দিয়ে বয়ে আসা মৌসুমি বায়ুর জন্য এখানে শীতকাল শুষ্ক প্রকৃতির হয়।
- উষ্ণতা – মৌসুমি জলবায়ুর গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে) সবচেয়ে উষ্ণ হওয়ায়, এই সময় তাপমাত্রা গড়ে 30°C-32°C বিরাজ করে। শীতকালীন (নভেম্বর-জানুয়ারি) গড় উষ্ণতা এখানে থাকে প্রায় 18°C-22°C।
- বায়ুর চাপ – সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই জলবায়ুতে শীত ও গ্রীষ্মে যথাক্রমে উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বিরাজ করে।
- বিপরীতমুখী বায়ুপ্রবাহ – মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে ঋতু ভেদে দুই বিপরীতধর্মী বায়ু প্রবাহিত হয়। যেমন – ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রীষ্মকালে আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং শীতকালে শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়।
- বৃষ্টিপাত – মৌসুমি জলবায়ুতে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় 100-150 সেমি। এর মধ্যে 70% বৃষ্টিপাত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঘটে থাকে। এখানে শীতকাল প্রায় বৃষ্টিহীন থাকে।
- মৌসুমি বায়ুর খামখেয়ালি চরিত্র – মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমন খামখেয়ালি প্রকৃতির। এই বায়ু কখনো আগে বা পরে আসে, আবার কখনো আগে বা পরে ফিরে যায়। মৌসুমি বায়ুর এই খামখেয়ালিপনার কারণে এই জলবায়ু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত ও অনিশ্চিত। ফলে, বন্যা বা খরার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
- ঋতু পর্যায় – মৌসুমি জলবায়ুতে পর্যায়ক্রমে চারটি প্রধান ঋতু দেখা যায় –
- গ্রীষ্ম (মার্চ-মে)
- বর্ষা (জুন-সেপ্টেম্বর)
- শরৎ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)
- শীত (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি)
- অন্যান্য – এই জলবায়ুতে প্রায়ই ঘূর্ণবাত বা সাইক্লোন এবং পশ্চিমি ঝঞ্ঝা ভয়াবহ প্রতিকূল আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের (Biodiversity) পরিচয় দাও।
অথবা, ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের বিবরণ দাও।
উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের 30°-40° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থানরত ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর, যার পরিচয় হল নিম্নরূপ –
স্বাভাবিক উদ্ভিদ (Natural Vegetation) ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের অধিক উষ্ণতা, অত্যধিক বাষ্পীভবন, শুষ্ক প্রকৃতির বায়ু এবং দীর্ঘ শুষ্ক ঋতু প্রভৃতি প্রাকৃতিক প্রভাবগুলির সঙ্গে অভিযোজন ঘটিয়ে এখানে মূলত তিন প্রকার স্বাভাবিক উদ্ভিদের সমাবেশ ঘটেছে, যথা –
1. সরলবর্গীয় (Coniferous) উদ্ভিদ – ভূমধ্যসাগরীয় উচ্চ পার্বত্যভূমিতে শঙ্কু আকৃতির, সূচালো পাতাবিশিষ্ট নরম প্রকৃতির সরলবর্গীয় উদ্ভিদ জন্মায়। যেমন – পাইন, ফার, সিডার, সাইপ্রাস, চ্যাপারেল প্রভৃতি।

2. চিরসবুজ (Evergreen) উদ্ভিদ – এই জলবায়ুর অন্তর্গত দুর্গম স্থলভাগগুলিতে দীর্ঘ শিকড় ও পুরু ছালযুক্ত চিরসবুজ উদ্ভিদ দেখা যায়। যেমন – ওক, কর্ক, জারা, কারি, ইউক্যালিপটাস, রোজ উড, উইলো প্রভৃতি।

3. ঝোপ ও গুল্ম (Bushes and Shrubs) জাতীয় উদ্ভিদ – দীর্ঘ শুষ্ক ঋতু, স্বল্প জলের প্রাপ্যতায় এখানকার বেশ কিছু উদ্ভিদ ঝোপ ও গুল্ম প্রকৃতির। যেমন – লরেল, ম্যাপল, রোজমেরি, ল্যাভেন্ডার প্রভৃতি।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের উদ্ভিদের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য –
- ভূমধ্যসাগরীয় উদ্ভিদগুলি দীর্ঘ পত্রবিশিষ্ট সূচালো বা ক্ষুদ্র গম্বুজাকার হয়।
- অতিরিক্ত বাষ্পীভবন এড়াতে গাছের ছাল পুরু হয়।
- উদ্ভিদের পাতায় মোমের মতো আস্তরণ থাকে।
- জলের সন্ধানে গাছগুলির শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
- শুষ্ক গ্রীষ্মকালের জন্য গাছগুলির ফল অম্লরসে ভরা থাকে (যেমন – আঙুর, জলপাই (Olive) প্রভৃতি)।
প্রাণী সম্প্রদায় (Animal Community) ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর বৃষ্টিহীন শুষ্ক গ্রীষ্মকাল, আর্দ্র শীতকালের জন্য তৃণভূমি বিশেষ জন্মায় না। এখানকার পার্বত্যভূমিতে গাধা, ভেড়া, ছাগল, খচ্চর প্রভৃতি পালিত হয় এবং উষ্ণ মরুসংলগ্ন এলাকায় মুরগি, উট, ঘোড়া প্রতিপালিত হয়।
মৌসুমি জলবায়ু জনজীবনে কীরূপ প্রভাব বিস্তার করে লেখো।
অথবা, মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে লেখো।
ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল হল বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। এখানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় 30 শতাংশ মানুষ বসবাস করে, যার ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিশাল প্রকৃতির, যেমন –
- কৃষিকাজ – সমতল ভূপ্রকৃতি, উর্বর মৃত্তিকা, বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চলের অবস্থান, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রাধান্যে এই অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চল গড়ে উঠেছে। এখানকার প্রায় 70% মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। মূলত নিবিড় কৃষি পদ্ধতিতে এখানে ধান, গম, ডাল, তৈলবীজ, পাট, তুলো, চিনাবাদাম, ইক্ষু, তিল, সরিষা এবং নানা ধরনের সবজির চাষ করা হয়। এই জলবায়ু অঞ্চলে এত বেশি ধান চাষ হয় যে একে ‘এশিয়ার ধানের গোলা’ বলা হয়। এ ছাড়াও এই অঞ্চলে বিভিন্ন রসালো ফল (আম, জাম, লিচু), চা, কফি, রবার উৎপাদন করা হয়।
- পশুজাত দ্রব্য উৎপাদন – এই জলবায়ু অঞ্চলে কোনো বিস্তীর্ণ তৃণভূমি না থাকলেও কৃষিকাজে এমনকি দুধ, পশম, ডিম, মাংস প্রভৃতির জন্য গৃহপালিত পশু রূপে গোরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি প্রভৃতি পালন করা হয়। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পুকুর ও জলাশয়ে বিভিন্ন মাছ চাষ করা হয়।
- বনজ সম্পদ আহরণ – ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের বিভিন্ন বনভূমিতে প্রাপ্ত শাল, সেগুন, পলাশ, মেহগনি প্রভৃতি মূল্যবান কাঠ থেকে বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র, জাহাজ প্রভৃতি নির্মিত হয়। এ ছাড়াও অরণ্য থেকে সংগৃহীত চন্দন তেল, রবার, ধুনা, মধু, লাক্ষা, মোম প্রভৃতির অর্থনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।
- খনিজ সম্পদ – এই অঞ্চল খনিজ সম্পদে বেশ সমৃদ্ধ। যেমন – ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে আকরিক লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, অভ্র, তামা, বক্সাইট প্রচুর পাওয়া যায় এবং উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম ভারতে খনিজ তেল, মায়ানমারে টাংস্টেন, সিসা, দস্তা, থাইল্যান্ডে টিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। চীনে কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অস্ট্রেলিয়ায় বক্সাইট, লৌহ আকরিক প্রভৃতি পাওয়া যায়।
- শিল্পদ্রব্য উৎপাদন – মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে প্রাপ্ত বিভিন্ন কৃষিজ ও খনিজ সম্পদ এবং এখানকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমিক বিভিন্ন শিল্পের সহায়ক হয়েছে। যেমন – ভারতে লৌহ-ইস্পাত, কার্পাস বয়ন, পাট, চিনি ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, বাংলাদেশে পাট ও বস্ত্রশিল্প, মায়ানমারে খনিজ তৈল শোধন শিল্প, থাইল্যান্ডে ইলেকট্রনিকস ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা – এই অঞ্চলের অধিকাংশ ভূপ্রকৃতিই সমতল হওয়ায় সড়কপথ, রেলপথ, জলপথ সব ধরনের পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত।
- ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা – পরিশেষে বলা যায়, এখানকার অনুকূল জলবায়ু, কৃষিজ, বনজ ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য, উন্নত প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো ভবিষ্যতে আরো নিত্যনতুন শিল্প তথা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটাবে।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু (Mediterranean Climate) অঞ্চলের অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
অক্ষাংশগত অবস্থান –
পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের 30°-40° অক্ষাংশীয় মহাদেশগুলির পশ্চিমাংশ ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর অন্তর্গত।
অবস্থান –
- ইউরোপের ফ্রান্স, স্পেন, পোর্তুগাল, গ্রিস, আলবেনিয়া, যুগোস্লাভিয়া, ইটালি, ক্রোয়েশিয়া।
- আফ্রিকার মিশর, মরক্কো, লিবিয়া, আলজিরিয়া, টিউনিশিয়া।
- এশিয়ার তুরস্ক, ইস্রায়েল, সিরিয়া, লেবানন এবং উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্নিয়ায় ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রভাব লক্ষ করা যায়।
1. প্রকৃতি – প্রকৃতিগতভাবে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে সারা বছর মেঘমুক্ত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে।
2. আর্দ্র শীতকাল ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল – শীতকালে সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এখানে আর্দ্র আবহাওয়া তৈরি হয়। অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালে শুষ্ক উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এই অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যায় বলে এখানে শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি হয়।
3. উষ্ণতা – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সারাবছর সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করলেও –
- গ্রীষ্মকালে – এই অঞ্চলের গড় উষ্ণতা থাকে 21°সে-27°সে।
- শীতকালে – এই অঞ্চলের তাপমাত্রা কমে গিয়ে 5°C-10°C হয়ে যায়।

4. বায়ুর চাপ – ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের অন্তর্গত হলেও সূর্যের উত্তরায়ণে এখানে গ্রীষ্মকালে উচ্চচাপ এবং সূর্যের দক্ষিণায়নে শীতকালে নিম্নচাপ বিরাজ করে।
5. স্থানীয় বায়ুর প্রভাব – এ ছাড়াও এই অঞ্চলে কয়েকটি স্থানীয় বায়ুর প্রভাব দেখা যায়। সেগুলি হল – ইটালিতে সিরক্কো, ফ্রান্সের রোণ নদী উপত্যকায় মিস্ট্রাল, স্পেনে লেভেস, মিশরে খামসিন প্রভৃতি।

6. বায়ুপ্রবাহ – সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের দ্বারা ভূমধ্যসাগরীয় বায়ুচাপ বলয়গুলি পরিবর্তিত হয় বলে গ্রীষ্মকালে এখানে শুষ্ক আয়ন বায়ু এবং শীতকালে আর্দ্র পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়।
7. ঘূর্ণিঝড়ের আগমন – এই অঞ্চলে মাঝে মাঝেই আগত ঘূর্ণিঝড় বৃষ্টিপাতের বণ্টন ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
8. জলবায়ুর ওপর সমুদ্রবায়ু ও সমুদ্রস্রোতের প্রভাব – এই অঞ্চলের জলবায়ুর ওপর পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব খুব বেশি। উপকূলীয় শীতল সমুদ্রস্রোত উষ্ণতাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে।
9. বৃষ্টিপাত – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র 25-100 সেমি। এই বৃষ্টিপাতের সবটাই প্রায় শীতকালে ঘটে থাকে। উপকূল থেকে ভিতরে বৃষ্টির পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পায়। এই অঞ্চলে শীতকালে বেশিরভাগ বৃষ্টি হয় বলে একে ‘শীতকালীন বৃষ্টিপাতের দেশ’ বলে।
10. তুষারপাত – সার্বিকভাবে এই জলবায়ুতে তুষারপাত না ঘটলেও মাঝে মাঝে ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যভাগে হালকা তুষারপাত ঘটে। প্রসঙ্গত বলা যায়, এই অঞ্চলের অধঃক্ষেপণ নির্ভর করে মূলত এখানে সৃষ্ট নিয়মিত ঘূর্ণবাতের ওপর।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের অধিবাসীদের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ (Economic Activity) আলোচনা করো।
অথবা, ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা (Socioeconomic Condition) কীরূপ তা উল্লেখ করো।
সমগ্র পৃথিবীর মোট স্থলভাগের 1% ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দ্বারা অধিকৃত হলেও পৃথিবীর প্রায় 5% মানুষ এখানে বাস করে। তাই এই অঞ্চলের অনুকূল পরিবেশে নিম্নলিখিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে, যেমন –
1. কৃষিকাজ – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, মাঝারি বৃষ্টিপাতের কারণে যে বিশেষ ধরনের কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাকে ভূমধ্যসাগরীয় কৃষি বলে। ফল ও সবজি উৎপাদন করে ট্রাকে করে নিকটবর্তী বাজারে চালান দেওয়া হয় বলে একে ট্রাক ফার্মিং (Truck Farming)ও বলে। এখানে উৎপাদিত ফসলগুলি হল নিম্নরূপ –
- ফল চাষ – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফল চাষের অনুকূল জলবায়ু থাকায় আঙুর, জলপাই, কমলালেবু, আপেল, ডুমুর, আখরোট, পিচ, খোবানি, নাসপাতি, চেরি, বাতাবি লেবু, কুল প্রভৃতি ফল প্রচুর উৎপন্ন হয়। এইসব ‘টক-মিষ্টি জাতীয়’ প্রচুর রসালো ফল উৎপাদনের জন্য অঞ্চলটি বিশ্ববিখ্যাত। সে কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে ‘প্রাকৃতিক ফল ভাণ্ডার’ বা ‘পৃথিবীর ফলের বাগান’ বা ‘পৃথিবীর ফলের ঝুড়ি’ (Fruit Basket of the World) বলা হয়।
- ফসল চাষ – এখানকার প্রধান উৎপাদিত খাদ্যশস্য হল গম। এ ছাড়া ধান, ভুট্টা, যব, মিলেট, ওক, বিট, গাজর, বাঁধাকপি, টম্যাটো, মটরশুঁটি, তামাক প্রভৃতি চাষ হয়।
- অন্যান্য চাষ – অন্যান্য কৃষিকাজের মধ্যে কর্ক, তুঁতগাছ (গুটিপোকা), তুলা, বাদাম (চেস্টনাট, ওয়ালনাট) প্রধান।

2. পশুপালন – ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে শুষ্ক গ্রীষ্মকাল ও আর্দ্র শীতকালের জন্য তৃণভূমি তেমন দেখা যায় না। তাই এখানে ঘোড়া বা গবাদিপশুর তুলনায় গাধা, ভেড়া, খচ্চর, ছাগল প্রভৃতি বেশি পালিত হয়। এ ছাড়া উষ্ণ মরুর কাছাকাছি অঞ্চলে উট, মুরগি বেশি পালন করা হয়।
3. মৎস্যশিকার – মৎস্যশিকার এই অঞ্চলের আরেকটি উপজীবিকা। স্থানীয় সমুদ্র থেকে এখানে প্রচুর সার্ডিন, হেরিং, ম্যাকারেল, টুনা প্রভৃতি পিলেজিক মৎস্য ধরা হয়। এখানকার ক্যালিফোর্নিয়া ‘সার্ডিন মাছের রাজধানী’ নামে পরিচিত।
4. খনিজ সম্পদ সংগ্রহ – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল খনিজ সম্পদে ততটা সমৃদ্ধ নয়। তবে এখানকার ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রাপ্ত খনিজ তেল, ফ্রান্সে বক্সাইট, ইটালিতে মারবেল, গন্ধক এবং স্পেনে প্রাপ্ত লোহাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে।
5. শিল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতি –
- ফলকেন্দ্রিক শিল্প – এই অঞ্চলে প্রাপ্ত ফল (আঙুর, জলপাই প্রভৃতি) প্রক্রিয়াকরণ করে ফ্রান্স, স্পেন, ইটালিতে কিশমিশ ও বিখ্যাত কয়েকটি মদ যেমন – শ্যাম্পেন, শেরি, কিয়ান্তি প্রস্তুত হয়। জলপাই (Olive) তেল থেকে সাবান ও নানা সুগন্ধি প্রসাধনী প্রস্তুত হয়। এ ছাড়াও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ যেমন – শিল্প জেলি, আচার, ফল সংরক্ষণ এবং ময়দা সংক্রান্ত বেকারি শিল্প গড়ে উঠেছে।
- কৃষিজ অন্যান্য ফসল কেন্দ্রিক শিল্প – এখানকার দক্ষিণ ফ্রান্স, ইটালি ও স্পেনের তুঁতগাছকে কেন্দ্র করে রেশম শিল্প গড়ে উঠেছে।
- খনিজ সম্পদ কেন্দ্রিক শিল্প – ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রাপ্ত খনিজ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি শিল্প গড়ে উঠেছে। যেমন – ফ্রান্স, ইটালি, যুগোস্লাভিয়ার লৌহ-ইস্পাত শিল্প, ক্যালিফোর্নিয়ার পেট্রোরসায়ন শিল্প (যেমন – সাবান তৈরি, বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী উৎপাদন প্রভৃতি)।
- পর্যটন শিল্প – এখানকার মনোরম জলবায়ু ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য ইটালি, ফ্রান্স, স্পেন, মিশর প্রভৃতি অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে।
- চলচ্চিত্র শিল্প – ভূমধ্যসাগরীয় মনোরম রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া, সমুদ্র নিকটস্থ অপরূপ শোভা ক্যালিফোর্নিয়ায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্প হলিউড গড়ে তুলেছে।

তুন্দ্রা জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করো।
তুন্দ্রা জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য
উত্তর গোলার্ধের এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এবং 66½° – 75° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থানরত তুন্দ্রা জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ –
- দীর্ঘস্থায়ী অতিশীতল শীতকাল – সূর্যের দক্ষিণায়নের ফলে বেশ কয়েক মাস একটানা দীর্ঘ রাত সৃষ্টি এবং তির্যক সূর্যরশ্মির প্রভাবে তুন্দ্রা অঞ্চলে বছরে প্রায় 4-7 মাস শীতকাল বিরাজ করে।
- স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকাল – সূর্যের উত্তরায়ণ ঘটলেও এই সূর্যালোক যেহেতু 23½° উত্তর অক্ষাংশে লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে মেরুসংলগ্ন এই অংশে মাত্র 2-3 মাসের জন্য গ্রীষ্ম ঋতু আসে। গ্রীষ্মকালে দিন 22-23 ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
- তাপমাত্রা – শীতকালে তির্যক সূর্যরশ্মি ও প্রচুর তুষারপাতের দরুন এখানে তাপমাত্রা -35°C থেকে -45°C থাকে। গ্রীষ্মকালে সূর্য তির্যকভাবে দিগন্ত রেখার নিকট থাকলেও এই সময় গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় 10°C।
- অধঃক্ষেপণ – তুন্দ্রা অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র 25-30 সেমির মধ্যে থাকে। এই বৃষ্টিপাতের অধিকাংশই গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাতের ফলে ঘটে। অঞ্চলটিতে দীর্ঘ শীতকালে প্রবল তুষারপাতের সৃষ্টি হয়।
- বায়ুচাপ – অক্ষাংশগত অবস্থান এবং অত্যন্ত তির্যকভাবে পতিত সূর্যরশ্মির কারণে এখানে সারাবছর উষ্ণতা কম থাকায় উচ্চচাপ বিরাজ করে।
- বায়ুপ্রবাহ – তুন্দ্রা অঞ্চলে মেরু বায়ুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘ শীতকালে এখানে প্রবল তুষার ঝড়ের (Blizzard) সৃষ্টি হয়, একে ‘পারগা’ বলে। এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় 175 কিমি।
- মেরুজ্যোতি – বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার থেকে তড়িদাহত অণুর চৌম্বক বিক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলে দীর্ঘ রাত্রিকালীন মায়াবী এক আলোকরশ্মির সৃষ্টি হয়। এই মেরুজ্যোতিকে সুমেরু প্রভা (Aurora Borealis) বলে।

তুন্দ্রা অঞ্চলের অধিবাসী এবং তাদের জীবনযাত্রা আলোচনা করো।
অথবা, তুন্দ্রা জলবায়ু এখানকার জীবনযাত্রাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
অধিবাসী সম্প্রদায় – হিমশীতল, অত্যন্ত প্রতিকূল তুন্দ্রা জলবায়ু মানুষের বসবাসের পক্ষে প্রায় অনুপযোগী। কিন্তু প্রকৃতির এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়েও এখানে বেশ কয়েকটি অর্ধযাযাবর (Semi-Nomadic) উপজাতি বসবাস করে। এরা হলো— আলাস্কা, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডীয় তুন্দ্রা অঞ্চলের রেড ইন্ডিয়ান ও এস্কিমো; নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ান তুন্দ্রা অঞ্চল সংলগ্ন ল্যাপ, ফিন, ইয়াকুত, স্যামোয়েদ, তুঙ্গুজ, চুকচি প্রভৃতি সম্প্রদায়।

জীবনযাত্রা –
- খাদ্য – এখানকার অধিকাংশ উপজাতি শিকারিজীবী হওয়ায় এরা শ্বেত ভল্লুক, শ্বেত শৃগাল, বলগা হরিণ প্রভৃতি প্রাণীর মাংস এবং সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সিল, তিমি, সিন্ধুঘোটক প্রভৃতি সামুদ্রিক প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। অন্যান্য খাদ্যের মধ্যে দুধ, বেরিফল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
- বস্ত্র – তীব্র শীতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এখানকার অধিবাসীরা সিল মাছের চামড়া নির্মিত জ্যাকেট পরিধান করে, একে ‘পারকা’ বলে। এরা মাথায় লোমশ টুপি, হাতে দস্তানা, পায়ে ‘স্কি’, মেরু খরগোশের চামড়ার মোজা ও হাঁটু পর্যন্ত চামড়ার পুরু জুতো ব্যবহার করে।
- বাসস্থান – তুন্দ্রা অঞ্চলের এস্কিমো সম্প্রদায়ের মানুষ রুক্ষ এবং তীব্র হিমশীতল বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে শীতকালে পাথর ও বরফ দিয়ে ‘ইগলু’ নামক গম্বুজাকৃতি ঘরের সৃষ্টি করে এবং গ্রীষ্মকালে সমুদ্র উপকূলে উইলো গাছের ডালের ফ্রেমে সিলমাছের চামড়া ঢেকে ‘টিউপিক’ নামক তাঁবু তৈরি করে।
- পশুপালন – তুন্দ্রা অঞ্চলের অধিবাসীরা দুধ ও মাংসের জন্য বলগা হরিণ এবং শিকার ও যাতায়াতের জন্য ‘হাস্কি’ কুকুর প্রতিপালন করে।
- যাযাবর বৃত্তি – এই অঞ্চলের অধিবাসীরা শিকারের মাধ্যমে খাদ্যসংগ্রহ এবং বলগা হরিণের প্রিয় খাদ্য মস ও লাইকেনের খোঁজে উত্তরের হিমমণ্ডল থেকে দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের দিকে সরে আসে।
- শিকার পদ্ধতি – এরা শিকার করতে ভূমিভাগে বলগা হরিণ ও হাস্কি কুকুরে টানা স্লেজগাড়ি এবং জলভাগে সিল মাছের চামড়া নির্মিত নৌকা ‘কায়াক’ ব্যবহার করে। বিভিন্ন পশুর হাড় দ্বারা হারপুন ও বর্শা তৈরি করে। সমুদ্রে কিংবা বরফের উপর শ্বাসছিদ্র (Breathing Hole) দেখে সিলমাছ শিকার করে এবং বরফের নীচে ‘ক্যাচে’ নামক থলিতে ভবিষ্যতের জন্য মাংস সঞ্চয় করে রাখে।
কোন্ জলবায়ু অঞ্চল আর্থ-সামাজিক দিক থেকে সবথেকে এগিয়ে আর কোন্ জলবায়ু অঞ্চল সবথেকে পিছিয়ে বলে তোমার মনে হয়? এই উন্নতি/অনুন্নতির কারণ হিসেবে তোমার মতামত লিখে ফেলো।
আর্থ-সামাজিক দিক থেকে এগিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল এবং সবথেকে পিছিয়ে নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল।
| উন্নতির/অনুন্নতির কারণ | ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল (উন্নত) | নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল (অনুন্নত) |
| জলবায়ুর প্রভাব | 1. এই অঞ্চলের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির। অর্থাৎ, উষ্ণতা খুব বেশি বা খুব কম নয়। এই আরামদায়ক আবহাওয়াই উন্নতির প্রধান কারণ। 2. গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় না। শীতকালে বৃষ্টি হলেও পরিমাণে কম। ফলে, সারাবছরই মেঘহীন রোদ ঝলমলে আবহাওয়া থাকে। | 1. এই অঞ্চলের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির। সারাবছর প্রচণ্ড গরম এবং বৃষ্টির জন্য ভ্যাপসা আবহাওয়া দেখা যায়, যা উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। 2. অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের জন্য চারদিকে গহন অরণ্য গড়ে উঠেছে। |
| অন্যান্য কারণ | 1. এখানকার অরণ্যের ওপর নির্ভর করে কাষ্ঠশিল্প উন্নতি লাভ করেছে। 2. মাঝারি বৃষ্টিপাত ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু কৃষিকাজকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। 3. মনোরম আবহাওয়ায় প্রচুর ফল চাষ হয়, যার ওপর নির্ভর করে নানান শিল্প গড়ে উঠেছে। 4. চলচ্চিত্র শিল্পে উন্নত এবং প্রাপ্ত খনিজ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে নানান ভারী শিল্প গড়ে উঠেছে। | 1. এই দুর্গম অরণ্য থেকে মূল্যবান কাঠ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই কাষ্ঠশিল্প তেমন উন্নত নয়। 2. চারদিকেই অরণ্য এবং অত্যধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের কারণে চাষবাস উন্নত নয়। 3. কিছু কিছু দেশে সামান্য বাগিচা কৃষি দেখা যায় (যেমন – সুমাত্রায় রবার চাষ)। 4. খনিজ সম্পদের ও কাঁচামালের অভাবে এখানে ভারী শিল্প তেমন গড়ে ওঠেনি। |
মানুষের জীবনযাত্রার ওপর জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ কী প্রভাব বিস্তার করে লেখো।
অথবা, ‘জীবনযাত্রায় জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ’ – এই প্রসঙ্গে পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত তৈরি করে শ্রেণিকক্ষে তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ও বিতর্ক সভার আয়োজন করতে পারো।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, জীবিকা, কর্মদক্ষতা ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ার কারণ জলবায়ুর প্রকৃতি।
- খাদ্য – জলবায়ুর পার্থক্যের জন্য মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের লোকেরা ধান থেকে প্রাপ্ত চাল, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর লোকেরা গম, নিরক্ষীয় বৃষ্টিঅরণ্য জলবায়ুর লোকেরা বন্য ফলমূল ও জীবজন্তু এবং শীতল তুন্দ্রা জলবায়ুর মানুষ সামুদ্রিক মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
- বস্ত্র বা পোশাক – উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের লোকেরা হালকা সুতির পোশাক এবং শীতল অঞ্চলের লোকেরা পশমের ও চামড়ার পোশাক পরিধান করে। যেমন – ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলের মানুষ সুতিবস্ত্র পরিধান করে ও তুন্দ্রা অঞ্চলের মানুষ চামড়া নির্মিত জ্যাকেট পারকা, লোমশ টুপি প্রভৃতি পরিধান করে।
- বাসস্থান – উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে মানুষের বাসস্থানের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন – প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে বাঁচতে এস্কিমোরা বরফের তৈরি ‘ইগলু’ নামক ঘরে বাস করে। আবার, যেখানে প্রচুর বৃষ্টি হয় সেখানে ঢালু ছাদযুক্ত বাড়ি দেখা যায়।
- জীবিকা – জলবায়ুর ভিন্নতার কারণে নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের আদিবাসীরা পশুশিকার, ফলমূল সংগ্রহ করে, মরুভূমির ও তৃণভূমির মানুষেরা পশুপালন করে, শীতল তুন্দ্রা জলবায়ুর মানুষেরা পশু ও মৎস্যশিকার করে এবং যেখানে প্রয়োজনমতো উষ্ণতা ও বৃষ্টির জল পাওয়া যায়, সেখানে মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকানির্বাহ করে। আবার, আর্দ্র জলবায়ু কার্পাস শিল্পের জন্য, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু শিল্প কারখানার কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির উপযুক্ত।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘জলবায়ু অঞ্চল’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলি স্কুল বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment