আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের সপ্তম অধ্যায় ‘মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির স্কুলের ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল সপ্তম অধ্যায়: মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন (গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন ও উত্তর)
মানুষের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যাবলিগুলি কী কী উল্লেখ করো। অথবা, অর্থনৈতিক কার্যাবলির শ্রেণিবিভাগ করো।
মানুষের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যাবলিগুলি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত –

1. প্রাথমিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি (Primary Economic Activity)
- সংজ্ঞা – প্রকৃতি থেকে সরাসরি সম্পদ সংগ্রহকে কেন্দ্র করে মানুষের যে অর্থনৈতিক কার্যাবলি গড়ে ওঠে, তাকে প্রাথমিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি বলে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই অর্থনীতিতে নিযুক্ত মানুষ সর্বদা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল থাকে।
- এখানে যা কিছু উৎপন্ন হয়, তার সম্পূর্ণটাই স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কাজে লাগে।
- উদাহরণ – কৃষিকাজ, মৎস্য সংগ্রহ, বনভূমি থেকে ফলমূল ও লতাপাতা সংগ্রহ, বন্যপ্রাণী শিকার, খনিজ সম্পদ আহরণ প্রভৃতি।

2. গৌণ বা সহায়ক অর্থনৈতিক কার্যাবলি (Secondary Economic Activity)
- সংজ্ঞা – প্রাথমিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি থেকে সংগৃহীত উপাদানগুলিকে প্রক্রিয়াকরণ করে, তাকে অধিকতর উপযোগী দ্রব্যে পরিণত করাকে কেন্দ্র করে মানুষের যে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ গড়ে ওঠে, তাকে গৌণ বা সহায়ক অর্থনৈতিক কার্যাবলি বলে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এখানে বিভিন্ন মূল্যবান ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হয়।
- এই কাজে প্রযুক্তি এবং মূলধনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
- উদাহরণ – শিল্প স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের একত্রীকরণ ইত্যাদি।

3. পরিষেবামূলক অর্থনৈতিক কার্যাবলি (Tertiary Economic Activity)
- সংজ্ঞা – যে ধরনের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের দ্বারা মানুষকে বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা প্রদান করা হয়, তাকে পরিষেবামূলক অর্থনৈতিক কার্যাবলি বলে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই অর্থনীতি মানুষের পছন্দের অনেক সুযোগ তৈরি করে দেয়।
- এটি উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি করে।
- উদাহরণ – ব্যাংক, বিমা, পরিবহণ, শিক্ষা, চিকিৎসাব্যবস্থা ইত্যাদি।

মানুষের বিভিন্ন কাজগুলিকে তাদের ধরন অনুসারে নীচের ছকে লিখে ফেলো। এইসব কাজ পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
অথবা, মানুষের কার্যাবলি পরিবেশের অবনমনকে কীরূপে প্রভাবিত করে?
মানুষের বিভিন্ন কাজ এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব নীচের ছকে আলোচনা করা হলো –
| প্রকৃতি নির্ভর | প্রযুক্তি নির্ভর | সেবামূলক | |
| বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্র | 1. কৃষিকাজ, 2. পশুপালন, 3. কাষ্ঠ সংগ্রহ, 4. মৎস্য সংগ্রহ, 5. খনিজ সম্পদ সংগ্রহ প্রভৃতি। | 1. বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রশিল্প, 2. বাঁধ নির্মাণ, 3. রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি। | 1. ব্যাংকিং, বিমা ব্যবস্থা, 2. পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, 3. শিক্ষাদান, 4. চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রভৃতি। |
| পরিবেশের ওপর প্রভাব | 1. কৃষিকাজে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির উর্বরতা বিনাশ করার সঙ্গে সঙ্গে জলদূষণ ঘটায়। 2. অতিরিক্ত পশুচারণ ও কাঠসংগ্রহ তৃণভূমি ও বনভূমির বিনাশ ঘটিয়ে পরিবেশের অবনমন ঘটায়। 3. অতিরিক্ত মৎস্য সংগ্রহ জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট করে। 4. খনিজ সম্পদ সংগ্রহের সময় প্রচুর খনিজকণা, ধূলিকণা বাতাসে মিশে দূষণ ঘটায়। | 1. শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণ ঘটায়। বর্জ্যপদার্থ, নোংরা জল নির্গত হয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে। 2. বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য বাঁধ নির্মাণ করতে গিয়ে পরিবেশের অবনমন ঘটে। বাঁধের পিছনে জলাধারে জলের চাপে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। 3. পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তা নির্মাণের সময় প্রচুর উদ্ভিদ বিনষ্ট হয়, ডিনামাইট বিস্ফোরণের ফলে শব্দ দূষণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের অবনমন ঘটে। 4. তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য, ছাই, ধোঁয়া পরিবেশের অবনমন ঘটায়। | 1. পরিবহণ ব্যবস্থায় যানবাহন থেকে প্রচুর ধোঁয়া, ধুলো বাতাসে মিশে বাতাসকে চরমভাবে দূষিত করে। 2. বিভিন্ন পরিষেবামূলক কাজে উৎপন্ন নানা ধরনের বর্জ্যপদার্থ পরিবেশের অবনমন ঘটায়। যেমন – হাসপাতালের বর্জ্যপদার্থ। |
পরিবেশের অবনমন কী?
অথবা, পরিবেশের অবনমনের কারণগুলি লেখো।
অথবা, পরিবেশ অবনমন কীভাবে ঘটে?
পরিবেশের অবনমনের সংজ্ঞা – প্রকৃতির নেতিবাচক ক্রিয়াকলাপ এবং মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত যথেচ্ছ কার্যাবলির ফলে পরিবেশের গুণমান হ্রাস পেয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য ও সহনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। একে পরিবেশের অবনমন বলে।
পরিবেশের অবনমনের উদাহরণ – অতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদনের কারণে ভূমিক্ষয়, বন্যা, বায়ুদূষণ, মরুভূমির প্রসার প্রভৃতি।
পরিবেশ অবনমনের কারণ
পরিবেশ অবনমনের কারণগুলিকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায় –
1. প্রাকৃতিক কারণ – যে-সকল প্রাকৃতিক ঘটনাবলির কারণে পরিবেশের অবনমন ঘটে সেগুলি হলো –
- অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ছাই, ভস্ম, SO₂ প্রভৃতি গ্যাস নির্গমন।
- ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, দাবানল, ঝড়, ধস, অম্লবৃষ্টি, সুনামি।
- জৈবপদার্থের পচনের ফলে মিথেন গ্যাসের উৎপত্তি প্রভৃতি।
- প্রভাব – এর ফলে ভূপৃষ্ঠের গঠন পরিবর্তিত হয়, জীবের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং সামগ্রিকভাবে পরিবেশের অবনমন ঘটে।
2. মনুষ্যসৃষ্ট কারণ –
- দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
- জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, খনিজ তেল) দহন।
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
- যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাসবাদ, পারমাণবিক ও সামরিক পরীক্ষা।
- কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার।
- বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিরোধ ও জলাধার নির্মাণ।
- যথেচ্ছ পরিমাণে বৃক্ষচ্ছেদন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
- পারমাণবিক চুল্লি ও শিল্পের বর্জ্যপদার্থ নির্গমন।
পরিবেশ অবনমনের প্রভাব বা ফলাফলগুলি আলোচনা করো।
অথবা, পরিবেশ অবনমনের ফলে কী ঘটে?
পরিবেশ অবনমনের প্রকৃতির ওপর প্রভাব –
- প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস – পরিবেশগত অবনমনের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির বুক থেকে যাবতীয় সম্পদ ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। এর ফলস্বরূপ প্রকৃতি হয়ে ওঠে নিঃস্ব এবং সম্পদহারা।
- দূষণ সৃষ্টি –
- বায়ুদূষণ – মোটরগাড়ি, কলকারখানা চালানোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, খনিজ তেল) দহনের ফলে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- জলদূষণ – গৃহস্থালির, শিল্পকারখানার নানান দূষিত বর্জ্য জলে মেশার ফলে জল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং শিলাস্তর থেকে যথেচ্ছভাবে জল তোলার ফলে ও বৃষ্টিপাত হ্রাসের ফলে জলাভাব দেখা দিচ্ছে।
- মৃত্তিকা দূষণ – জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাড়িতে ব্যবহৃত দৈনন্দিন বর্জ্যপদার্থ ও মনুষ্যজাত বর্জ্যপদার্থ যত্রতত্র পরিত্যাগ করার ফলে মৃত্তিকা দূষিত হচ্ছে।
- খরা ও বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি – বৃক্ষচ্ছেদনের কারণে বায়ুতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পেয়ে বায়ুদূষণ হবে। বৃষ্টিপাত হ্রাস পাবে, ফলে খরার সৃষ্টি হবে। ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পাবে। এই ক্ষয়িত মাটি নদীর তলদেশে সঞ্চিত হলে নদীর গভীরতা হ্রাস পাবে। ফলে, জলের পরিমাণ বাড়লে নদীতে বন্যা দেখা দেবে।
- ভূমিকম্প ও ধসের প্রকোপ বৃদ্ধি – পার্বত্য ঢালে বৃক্ষচ্ছেদনের কারণে ধস নামে এবং ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। আবার, জলাধার নির্মাণের কারণে জলাধারের নীচে জলের প্রবল চাপে দুর্বল অংশে ভূমিকম্প ঘটে। (যেমন – মহারাষ্ট্রের কয়না, 1967)।
- বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন – বায়ু দূষণ ও বিশ্ব উন্নায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলবে এবং সমুদ্রতল বৃদ্ধি পেয়ে উপকূল অঞ্চল প্লাবিত হবে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটবে।
- প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস – সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।
- ভূমির উর্বরতা হ্রাস – কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির আশায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ ধীরে ধীরে মাটির উর্বরতা হ্রাস করবে। ফলে, উৎপাদন হ্রাস পাবে।
- মরুকরণ – ক্রমাগত বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে মরুভূমির বিস্তার ঘটবে অর্থাৎ, মরুকরণ (Desertification) প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

জীবজগতের ওপর প্রভাব –
- জীববৈচিত্র্য হ্রাস – পরিবেশগত অবনমনের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতি থেকে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণীর বিলুপ্তি-জীববৈচিত্র্যের হ্রাস ঘটছে, যেমন – রেড পাণ্ডা, এশিয়ার সিংহ, নেকড়ে বাঘ প্রভৃতি প্রাণী সম্প্রদায় আজ বিপন্ন।
- বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব – পরিবেশের গুণমান নষ্ট হলে উদ্ভিদের মিউটেশন ও জিনগত কাঠামো ধ্বংস, ধসারোগ, ক্লোরোফিল হ্রাসের পাশাপাশি মানবদেহে ক্যানসার, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, পীতজ্বর, ডিপথেরিয়া প্রভৃতি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
অর্থনীতির ওপর প্রভাব –
মুদ্রাস্ফীতি – পরিবেশের সামগ্রিক অধঃপতন বা অবনমনের ফলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিরাট পার্থক্য ঘটে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি জিনিসের চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু জোগান সেই তুলনায় অনেক কম। বহু মূল্য দিয়ে সেই ইপ্সিত জিনিসটি সংগ্রহ করতে হচ্ছে – ফলে, দিনের পর দিন ক্রমশ মুদ্রাস্ফীতি ঘটে চলেছে।
মানবসভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে পরিবেশ অবনমনের সম্পর্ক আলোচনা করো।
এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীতে মানবসভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে মানুষ তার যাবতীয় কাজকর্মের মধ্য দিয়ে সভ্যতাকে যেমন অগ্রগামী করেছে, তেমনি এই কালের যাত্রাপথে বিভিন্নভাবে পরিবেশের অবনমনও ঘটিয়েছে, যেমন –
- প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগ – সভ্যতার এই যুগে মানুষ পশু শিকার, ফলমূল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন যাযাবর বৃত্তির মধ্যে দিয়ে অরণ্য কিংবা গুহাবাসী হয়ে জীবনযাপন করত। সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর মানুষের যাবতীয় চাহিদা এই যুগে খুবই সামান্য ছিল।
- ঐতিহাসিক যুগ – আগুনের ব্যবহার, পশুপালন এবং কৃষিকাজের মধ্যে দিয়ে মানুষ ঐতিহাসিক যুগে প্রবেশ করে। চাকার আবিষ্কার মানবসভ্যতার গতি বাড়িয়ে দেয়। এই সময় পর্যন্ত পরিবেশের যে সামান্য ক্ষতি হত তা হোমিওস্ট্যাটিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিজে থেকেই পূরণ হয়ে যেত।
- শিল্পবিপ্লবের যুগ – কিন্তু মানবজাতির অপরিসীম চাহিদা ও দুর্নিবার লোভ তাকে বিপথে চালু করেছে, যার ফলস্বরূপ সে তার পরিবেশের ধ্বংসসাধনে লিপ্ত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের শিল্পবিপ্লব যেমন একদিকে আধুনিক সভ্যতার সূচনা করেছিল তেমনি অপরদিকে পরিবেশ অবনমনের দ্বার খুলে দিয়েছিল।
- সর্বাধুনিক যুগ – ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে পৃথিবীতে সর্বাধুনিক যুগ আত্মপ্রকাশ করে। এ যুগে সারা বিশ্বে শিল্প, বিজ্ঞান, চিকিৎসার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে গড়ে উঠতে থাকে শহর-নগর, প্রসারলাভ করতে থাকে কৃষিভূমি, তৈরি হতে থাকে রাস্তাঘাট, শিল্পকারখানা। ফলস্বরূপ, ধ্বংস হতে থাকে অরণ্য। মানুষ নির্বিচারে ব্যবহার করতে শুরু করে জল, মাটি, অরণ্য, কয়লা, খনিজ তেল, লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি। এর ওপর বিংশ শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধ, সামরিক অস্ত্র (পারমাণবিক অস্ত্র) পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিবেশের অবনমনকে একধাপে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতি ও শিল্পায়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে পরিবেশের যে বিপুল পরিবর্তন হচ্ছে তা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব সমগ্র জীবকুলের ওপর অভিশাপরূপে নেমে আসছে।
পরিবেশের অবনমন নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি লেখো।
অথবা, কী হবে ভবিষ্যৎ মানব সমাজের? এই অবনমন নিয়ন্ত্রণের উপায়ই বা কী?
সভ্যতার অগ্রগতি ও লাগামছাড়া উন্নয়নের ফলে পরিবেশের গুণমান ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। পরিবেশের এই অবনমন মানবসভ্যতাকে এক সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাই পরিবেশ অবনমনের গতি বন্ধ করতে আমাদের বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যেমন –
- শিক্ষা ও সচেতনতা পরিবেশ – অবনমনের অন্যতম কারণ হল দারিদ্র্যতা ও শিক্ষার অভাব। তাই পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হবে। মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে এবং পরিবেশ শিক্ষাকে আবশ্যিক পাঠ হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু করতে হবে।
- সম্পদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ – প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার (অরণ্য, মৎস্য, খনিজ) নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে (কয়লা, খনিজ তেল) পরিবেশবান্ধব শক্তি (সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ প্রভৃতি) বেশি ব্যবহার করতে হবে।
- সম্পদের পুনর্ব্যবহার – বিভিন্ন কলকারখানাকে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উৎসাহী করতে হবে। সম্পদের পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ – জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের সম্পদ ও জনসংখ্যার মধ্যে যাতে ভারসাম্য থাকে তার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
- পরিকল্পিত উন্নয়ন – উন্নয়ন পরিকল্পনা যেমন – রাস্তা নির্মাণ, নদী পরিকল্পনা, নগরায়ণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি, শিল্পস্থাপন প্রভৃতি কার্যকর করার সময় পরিবেশের যতটা সম্ভব কম ক্ষতি হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
- জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ – বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদকে তার নিজস্ব পরিবেশে বাঁচিয়ে রেখে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে।
- বনসৃজন বৃদ্ধি – প্রচুর পরিমাণে গাছপালা লাগিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। বৃক্ষ কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) শোষণ করে ও অক্সিজেন (O₂) ত্যাগ করে পরিবেশে এই দুই উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- উপযুক্ত ভূমির ব্যবহার – জমির অবস্থান, মাটির চরিত্র এবং জমির অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে জমির ওপর যে-কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর জন্য উপযুক্ত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
- প্রচার মাধ্যমের দ্বারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি – সর্বোপরি বিভিন্ন প্রকার প্রচার মাধ্যম যেমন – খবরের কাগজ, রেডিয়ো, টেলিভিশন প্রভৃতি দ্বারা পরিবেশ অবনমনের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং এই অবনমন রোধে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
- আইন প্রণয়ন – পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং দক্ষতার সঙ্গে তা প্রয়োগ করতে হবে।
সাম্প্রতিক উদাহরণসহ ভারতের পরিবেশ অবনমনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
অথবা, মানুষের উন্নয়নমূলক কার্যাবলি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে আলোচনা করো।
ভারতবর্ষ একটি উন্নয়নশীল দেশ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিবেশ অবনমন ও বিপর্যয় ঘটে চলেছে। সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ভারতে পরিবেশ অবনমনের জন্য প্রতিবছর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় 80 বিলিয়ন ডলার।
WHO-র রিপোর্ট অনুযায়ী G-20 দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে দূষিত 20টি শহরের মধ্যে 13টি ভারতে অবস্থিত। দূষণের তীব্রতা বোঝাতে সাম্প্রতিক দুটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হল।
সবুজ বিপ্লব ও পরিবেশের অবনমন – উনিশ শতকের ষাটের দশকে ভারতবর্ষকে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর করা ও বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি বন্ধ করার লক্ষ্যে মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানায় গম উৎপাদনে যে অভূতপূর্ব সাফল্য আসে, তাকে সবুজ বিপ্লব বলে।
সাম্প্রতিক সমস্যা –
সবুজ বিপ্লব ভারতীয় কৃষিতে সাফল্য আনলেও এর দ্বারা কতকগুলি পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন –
- জীববৈচিত্র্য হ্রাস – সবুজ বিপ্লবকালীন মাটিতে যে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় তাতে স্থানীয় জীবজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- জমির লবণতা বৃদ্ধি – একই জমিতে বারবার চাষ ও অতিরিক্ত জলসেচের ফলে হরিয়ানার পাঞ্জাব, কৃষিজমিগুলিতে লবণতা বৃদ্ধি পায়।

- মাটির উর্বরতা হ্রাস – জমির উৎপাদনক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। মাটির মধ্যে জীবাণু, ভাইরাস, পুষ্টি মৌল, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতির ঘাটতি দেখা যায়। ফলে, মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়।
- জিনগত ত্রুটি – অধিক উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহারে ফসলে জিনগত নানা ত্রুটি দেখা দেয়। এই সব শস্য যখন মানুষ ও গবাদিপশু গ্রহণ করে তখন তা তাদের নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে।
- জীবনহানি – কৃষিতে অতিরিক্ত জলসেচের ফলে ভূগর্ভের জলস্তর হ্রাস পায়। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যবহৃত হওয়ায় কৃষি ঋণগ্রস্ত হয়ে সম্প্রতি পাঞ্জাব, হরিয়ানায় বহু কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
- জলাভূমি ভরাট ও পরিবেশের অবনমন – পূর্ব কলকাতাসহ ভারতের বেশ কিছু শহরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল জলাভূমি ভরাট করে বহুতল বাড়ি তৈরি করা।
- সাম্প্রতিক সমস্যা – সাময়িকভাবে এর মাধ্যমে বাস্তু সমস্যা মিটলেও কতকগুলি পরিবেশগত সমস্যা এখানে দেখা দেয়, যেমন –
- জলাভূমি ভরাটের ফলে ভূগর্ভের জলতল ক্রমশ কমে যায়।
- জলজ বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ ঘটে।
- স্থানীয় শহরাঞ্চলের জল, মাটি, বাতাস আরো দূষিত হয়ে পড়ে।
- ভূমিধসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের সপ্তম অধ্যায় ‘মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment