আমরা আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’-এর উপবিভাগ ‘ভূমিকম্প’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির স্কুল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (Competitive Exams) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
P তরঙ্গ সম্পর্কে টীকা লেখো।
P তরঙ্গের সংজ্ঞা – ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন যে তরঙ্গ সর্বপ্রথম ভূপৃষ্ঠে পৌঁছোয়, তাকে প্রাথমিক তরঙ্গ (Primary wave) বা P তরঙ্গ বলে। বৈশিষ্ট্য –
- কম্পনের দিক – এটি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। কারণ- তরঙ্গ যেদিকে যায় মাধ্যমের কণাগুলি সেই দিকে কাঁপতে থাকে।
- শক্তি – সর্বাধিক শক্তিশালী তরঙ্গ।
- তরঙ্গদৈর্ঘ্য – তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুব ছোটো।
- মাধ্যম – কঠিন, তরল সকল মাধ্যমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী 5-14 কিমি/সেকেন্ড।
- পুশ তরঙ্গ – ভূত্বকে এসে খুব জোরে ধাক্কা দেয় বলে এর নাম পুশ তরঙ্গ (Push wave)।
S তরঙ্গ সম্পর্কে টীকা লেখো।
S তরঙ্গের সংজ্ঞা – ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন যে তরঙ্গ P তরঙ্গের পর ভূপৃষ্ঠে পৌঁছোয়, তাকে গৌণ তরঙ্গ (Secondary wave) বা S তরঙ্গ বলে। বৈশিষ্ট্য –
- কম্পনের দিক – এটি অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। কারণ- তরঙ্গ যেদিকে প্রবাহিত হয় মাধ্যমের কণাগুলি তার সমকোণে কাঁপতে থাকে।
- শক্তি – কম শক্তিশালী তরঙ্গ।
- তরঙ্গদৈর্ঘ্য – তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোটো।
- মাধ্যম – কেবলমাত্র কঠিন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – গতিবেগ কম, প্রতি সেকেন্ডে 3.5-7.2 কিমি।
সুনামি (Tsunami) সম্পর্কে টীকা লেখো।
সুনামি শব্দের অর্থ – জাপানি শব্দ ‘Tsunami’ -র অর্থ বন্দর বা পোতাশ্রয় সংলগ্ন তরঙ্গ। (‘Tsu’ = বন্দর এবং ‘nami’ = তরঙ্গ বা ঢেউ)।
সুনামির সংজ্ঞা – সমুদ্রের তলদেশে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হলে সমুদ্রে বিশাল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়, একে জাপানি ভাষায় সুনামি (Tsunami) বলে।
সুনামির উৎপত্তি – সমুদ্রগর্ভে ভূমিকম্প, পার্বত্য অঞ্চলে ধস, হিমানী সম্প্রপাত, অগ্ন্যুৎপাত বা সমুদ্রে বড়ো উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সমুদ্রবক্ষে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রবক্ষে স্থানচ্যুতি ঘটে উপকেন্দ্রের সব জল অনেক উঁচু হয়ে তরঙ্গের আকারে প্রচণ্ড গতিতে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে। এর ফলে উপকূল অঞ্চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাস অর্থাৎ, সুনামির সৃষ্টি হয়।

সুনামির বৈশিষ্ট্য –
- সুনামির গতি থাকে 300-1000 কিমি/ঘণ্টা।
- উপকূলের কাছে সুনামির উচ্চতা থাকে 30-40 মিটার।
- মনুষ্যকুলের ওপর প্রভাব – এই জলোচ্ছ্বাস সমুদ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। সম্পত্তি ও জীবনহানি ঘটায়।
সুনামির উদাহরণ – 2011 সালের 11 মার্চে জাপানে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের (রিখটার স্কেলে তীব্রতা 9.0) ফলে 33 ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট সুনামির সৃষ্টি হয়।

L তরঙ্গ সম্পর্কে টীকা লেখো।
L তরঙ্গের সংজ্ঞা – যে ভূমিকম্প তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠ বরাবর চারদিকে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তাকে পৃষ্ঠ তরঙ্গ (Long wave / Surface wave) বা L তরঙ্গ বলে।
L তরঙ্গের শ্রেণিবিভাগ –
- অনুভূমিকভাবে প্রবাহিত লাভ (Love) তরঙ্গ ও
- উপবৃত্তাকার গতিতে প্রবাহিত র্যালে (Rayleigh) তরঙ্গ।
L তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য –
- কম্পনের দিক – এই তরঙ্গ তির্যক তরঙ্গ। কারণ – তরঙ্গ যেদিকে প্রবাহিত হয় মাধ্যমের কণাগুলি সেদিকে তির্যকভাবে ওঠানামা করে।
- শক্তি – ভূপৃষ্ঠের উপর এটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।
- তরঙ্গদৈর্ঘ্য – তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বড়ো।
- মাধ্যম – প্রধানত কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- গতিবেগ – 3-4 কিমি/সেকেন্ড।
রিখটার স্কেল (Richter Scale) সম্পর্কে টীকা লেখো।
রিখটার স্কেলের সংজ্ঞা – সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের ওপর বসানো যে স্কেলের সাহায্যে ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) পরিমাপ করা হয়, তাকে রিখটার স্কেল বলে।
রিখটার স্কেলের আবিষ্কারক – 1935 সালে ভূকম্পবিদ চার্লস রিখটার এই স্কেল আবিষ্কার করেন, তাই একে রিখটার স্কেল নাম দেওয়া হয়েছে।
রিখটার স্কেলের উদ্দেশ্য – ভূপৃষ্ঠের কম্পন ভূকম্পলিখ (Seismograph) যন্ত্রের সাহায্যে লিপিবদ্ধ করে তা থেকে গাণিতিক পদ্ধতিতে ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ধারণ করাই হল এর উদ্দেশ্য।
রিখটার স্কেলের বৈশিষ্ট্য –
- রিখটার স্কেলের মাত্রাক্রম 0 থেকে 10 পর্যন্ত।
- এই স্কেল অনুযায়ী ভূমিকম্পের মাত্রা প্রতি এক একক বাড়ার অর্থ, সেই ভূমিকম্পের তরঙ্গের বিস্তার আগের এককের থেকে 10 গুণ বেশি।
- রিখটার স্কেলে 6-এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয়।
রিখটার স্কেলের উদাহরণ – 2004 সালের ভারত মহাসাগরের তলদেশের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে 8.9।

সিসমোগ্রাফ (Seismograph) সম্পর্কে টীকা লেখো।
সিসমোগ্রাফের অর্থ – গ্রিক শব্দ ‘সিসমোস’ (Seismos) থেকে ‘Seismo’ এসেছে যার অর্থ ‘ভূকম্পন’ এবং Graph-এর অর্থ লেখচিত্র।
সিসমোগ্রাফের সংজ্ঞা – ভূমিকম্পের উৎস, কম্পনের তীব্রতা, সময় ও গতিবিধি নির্ণয় করার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তাকে সিসমোগ্রাফ বা ভূমিকম্পলিখ যন্ত্র বলে।
সিসমোগ্রাফের আবিষ্কারক – 1892 সালে ইংরেজ ভূতত্ত্ববিদ জন মিলনে (Milney) প্রথম এই যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
সিসমোগ্রাফের বৈশিষ্ট্য –
- এই যন্ত্রের ভিত মাটির গভীরে শক্ত করে বসানো থাকে।
- কম্পনের সময় যন্ত্রে লাগানো কাগজে আঁকাবাঁকা রেখা ফুটে ওঠে। একে সিসমোগ্রাম বলে।
- আধুনিক সিসমোগ্রাফে আলোকরশ্মি বা কম্পিউটারের সাহায্যে ভূমিকম্পের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তীব্রতা লিপিবদ্ধ করা যাচ্ছে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Centre) ও উপকেন্দ্র (Epicentre) সম্পর্কে টীকা লেখো।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Centre) – ভূপৃষ্ঠের নীচে ভূ-অভ্যন্তরে যে স্থান থেকে ভূমিকম্পের উদ্ভব হয়, তাকে বলে ভূমিকম্পের কেন্দ্র। অধিকাংশ ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠ থেকে 50-100 কিমি গভীরে হয়ে থাকে।
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র (Epicentre) – ভূমিকম্প কেন্দ্র থেকে ঠিক উল্লম্ব দিকে অর্থাৎ, সমকোণে অবস্থিত ভূপৃষ্ঠের যে স্থানে প্রথম কম্পন পৌঁছায়, তাকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বলে। এখানেই ভূমিকম্পের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় এবং উপকেন্দ্র থেকে চারদিকে তীব্রতা ক্রমশ কমতে থাকে।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘অস্থিত পৃথিবী’ এর উপবিভাগ ‘ভূমিকম্প’ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে (Telegram) যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment