অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় ‘শিলা’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Contents Show

আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব লেখো।

আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য –

  • প্রাথমিক শিলা – পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হয়েছে বলে আগ্নেয় শিলাকে প্রাথমিক শিলা বলা হয়।
  • কেলাসযুক্ত – এই শিলা কেলাসিত ও স্ফটিকযুক্ত হয়।
  • রাসায়নিক ধর্ম – এই শিলা আম্লিক ও ক্ষারকীয় উভয় প্রকৃতিরই হয়।
  • কাঠিন্য – কঠিন ও ভারী হওয়ায় সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
  • অস্তরীভূত – আগ্নেয় পদার্থ একসঙ্গে জমাট বাঁধে বলে কোনো স্তরভেদ বা স্তরায়ণ তল দেখা যায় না। তাই একে অস্তরীভূত (Unstratified) শিলাও বলা হয়।
  • জলধারণ ক্ষমতা – এই শিলায় কোনো ছিদ্র না থাকায় জলধারণ করতে পারে না।
  • কণাবিন্যাস – এই শিলার কণাগুলি অত্যন্ত ঘনসন্নিবিষ্ট।
  • জীবাশ্মের অনুপস্থিতি – আগ্নেয় শিলায় কোনো জীবাশ্ম থাকে না।
  • খনিজের উপস্থিতি – আগ্নেয় শিলায় মূল্যবান খনিজ (সোনা, রুপো, সিসা, দস্তা) পাওয়া যায়।
  • দারণ ও ফাটল – এই শিলায় উল্লম্ব দারণ (Joint) ও ফাটল (Crack) দেখা যায়, যা দিয়ে শিলার মধ্যে জল প্রবেশ করতে পারে।
  • রং – এই শিলার রং হালকা (গ্রানাইট) থেকে গাঢ় (ব্যাসল্ট) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • ভূমিরূপ – ব্যাসল্ট জাতীয় আগ্নেয় শিলায় চ্যাপটা ও গ্রানাইট জাতীয় আগ্নেয় শিলায় গোলাকৃতির ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়।

আগ্নেয় শিলায় কীভাবে কেলাস গঠিত হয়?

উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে শীতল হয়ে কঠিন অবস্থায় আসার সময় জলের অণু খনিজের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হয়ে কেলাস গঠন করে, যা দেখতে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল।

আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি হওয়ার সময় তার মধ্যে গরম খনিজ জল শিরার মতো অবস্থান করে। শিলা ঠান্ডা হলে ওই শিরার আকারে থাকা খনিজ জলের অণু কেলাস গঠন করে।

কোয়ার্টজ, ক্যালসাইট, হিরে প্রভৃতি খনিজে কেলাসের গঠন ভালোভাবে দেখা যায়। কেলাস ঘনকাকৃতি বা ষড়ভুজাকৃতির হয়।

ক্যালসাইট (ষড়ভুজের ক্রিস্টাল)

আগ্নেয় শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়? অথবা, নিঃসারী আগ্নেয় শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?

প্রারম্ভিক পর্যায় – পৃথিবীর সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে কঠিন হয়ে পৃথিবীর উপরের আবরণ বা ভূত্বকরূপে প্রথমে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি হয়। তাই আগ্নেয় শিলা প্রাথমিক শিলা নামে পরিচিত।

পরবর্তী পর্যায় – এই কঠিন ভূত্বকের নীচে অর্থাৎ, ভূ-অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন – সিলিকন, লোহা, নিকেল, ম্যাগনেশিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় ম্যাগমারূপে আছে। এই ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের প্রবল চাপে ভূত্বকের কোনো দুর্বল ফাটল, ছিদ্রপথ বা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসে নিঃসারী আগ্নেয় শিলা গঠন করে। অথবা, ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে উদবেদী (Intrusive) আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন প্রকার শিলার উৎপত্তি

পাললিক শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়?

পাললিক শিলা নিম্নলিখিত পর্যায়ে সৃষ্টি হয় –

  • শিলার ক্ষয় – আগ্নেয় শিলা সৃষ্টির পর বহুদিন ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন – নদী, হিমবাহ, বায়ু, সমুদ্রতরঙ্গ, উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পলি, বালি, কাদা প্রভৃতি সূক্ষ্ম পদার্থে পরিণত হয়।
  • অপসারণ – এইসব সূক্ষ্ম পদার্থ নদী, বায়ু, হিমবাহ দ্বারা পরিবাহিত হয়ে সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে।
  • সঞ্চয় – এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে পলির পর পলির স্তর পড়তে থাকে।
  • সংঘবদ্ধকরণ – কালক্রমে নীচের পলির স্তর, ওপরের পলিস্তর ও জলরাশির প্রবল চাপে এবং ভূগর্ভের তাপে জমাট বেঁধে পাললিক শিলায় পরিণত হয়।

পাললিক শিলার বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব লেখো।

পাললিক শিলার বৈশিষ্ট্য –

  • স্তরবিন্যাস – স্তরে স্তরে পলি জমে গঠিত হয় বলে পাললিক শিলার অপর নাম স্তরীভূত শিলা।
  • স্তরায়ণ তল – একটি স্তর আর একটি থেকে যে তল দ্বারা আলাদা থাকে, তাকে স্তরায়ণ তল বলে।
  • জীবাশ্মের উপস্থিতি – একমাত্র পাললিক শিলাস্তরের মধ্যেই জীবাশ্ম থাকে।
  • কাঠিন্য – অন্যান্য শিলার তুলনায় কাঠিন্য কম, হালকা ও ভঙ্গুর। এর ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভিন্ন রকম হয়।
  • প্রবেশ্যতা – এই শিলা ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় জল প্রবেশ করতে পারে। তাই একে প্রবেশ্য শিলা (Permeable Rock) বলে।
  • সম্পদের উপস্থিতি – কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
  • কেলাস – এই শিলায় কেলাসগুলি দেখা যায় না।
  • প্রকৃতি – ভঙ্গুর প্রকৃতির হওয়ায় সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
  • দাগ বা চিহ্নের ছাপ – স্থলভাগে পাললিক শিলায় কাদায় চিড় খাওয়া দাগ থাকে এবং সমুদ্রগর্ভের পাললিক শিলায় ঢেউয়ের দাগ (রিপল) থাকে।

রূপান্তরিত শিলা সৃষ্টির কারণগুলি লেখো।

অথবা, শিলা রূপান্তরিত হওয়ার কারণগুলি কী কী?

মূলত চারটি কারণে আগ্নেয় বা পাললিক শিলা রূপান্তরিত হয়ে রূপান্তরিত শিলা সৃষ্টি হয়। যথা –

  • প্রচণ্ড চাপ – প্রবল ভূ-আলোড়নের ফলে শিলাস্তরে প্রচণ্ড চাপ পড়ে শিলার রূপান্তর ঘটে। যেমন – শেল থেকে স্লেট সৃষ্টি।
  • অত্যধিক তাপ – ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত ম্যাগমা বা ভূপৃষ্ঠস্থ উত্তপ্ত লাভার সংস্পর্শে এসে শিলার রূপান্তর ঘটে। যেমন – পিট কয়লা থেকে গ্রাফাইট।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া – জলের উপস্থিতির কারণে ভূ-অভ্যন্তরের বিভিন্ন খনিজের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে শিলার রূপান্তর হয়। যেমন – অ্যান্ডালুসাইট থেকে সিলিমেনাইট।
  • গতিশীলতা – ওপরের শিলাস্তরের নিম্নমুখী প্রবল চাপে নীচের শিলাস্তর গতিশীল হয়ে পড়লে ঘর্ষণজনিত কারণে শিলার রূপান্তর ঘটে। যেমন – স্লেট থেকে ফিলাইট।

রূপান্তরিত শিলার বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব লেখো।

রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত শিলার বৈশিষ্ট্য –

  • কাঠিন্য – আগ্নেয় বা পাললিক শিলা রূপান্তরিত হলে তা পূর্বের তুলনায় বেশি কঠিন হয়। ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।
  • স্ফটিক – আগ্নেয় শিলা রূপান্তরিত হলে আরো মসৃণ, চকচকে ও স্ফটিকগুলি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • জীবাশ্মের অনুপস্থিতি – রূপান্তরিত শিলায় জীবাশ্ম থাকে না, অত্যধিক চাপ ও তাপে তা নষ্ট হয়ে যায়।
  • খনিজের উপস্থিতি – রূপান্তরের ফলে শিলামধ্যস্থ খনিজ পদার্থগুলির পুনর্বিন্যাস হয়। একই ধরনের খনিজ একই দিকে চলে আসে বলে খনিজ সম্পদ সংগ্রহের সুবিধা হয়।
  • চিহ্ন – রূপান্তরিত শিলায় অনেক সময় সূক্ষ্ম পাতের বিন্যাস বা মোটা স্তরের দাগ দেখা যায়।
  • শিলাকণার বিন্যাস – রূপান্তরিত নিস্ শিলায় শিলাকণা সমান্তরাল, ফিলাইটে তরঙ্গায়িত, সিস্টে পত্রায়িত, মার্বেলে কেলাসিত, কোয়ার্টজাইটে মসৃণ ও চকচকে হয়ে থাকে।

রূপান্তরিত শিলায় মূল শিলার বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না কেন?

অনেক সময় আগ্নেয় ও পাললিক শিলা ভূগর্ভের অত্যধিক চাপের জন্য, উত্তপ্ত তরল পদার্থ শিলার সংস্পর্শে আসার জন্য, অথবা রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে আগের চেয়ে আরো কঠিন ও কেলাসিত হয়ে নতুন আর এক ধরনের শিলায় রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলা গঠন করে। প্রাথমিক শিলা পরিবর্তনের জন্য নতুন শিলার বর্ণ, কাঠিন্য, ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা ও খনিজ গঠনের পরিবর্তন ঘটে। ফলে, রূপান্তরিত শিলায় মূল শিলার বৈশিষ্ট্য আর পাওয়া যায় না।

শিলা থেকে কীভাবে মাটি সৃষ্টি হয়?

শিলা থেকে মৃত্তিকা সৃষ্টি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় পেডোজেনেসিস (Pedogenesis)। এটি কয়েকটি পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে সৃষ্টি হয় যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো –

  • আবহবিকার (Weathering) – এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন – নদী, বায়ু, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি দ্বারা বহুদিন ধরে আদি শিলা (Parent Rock) ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
  • সংযোজন (Addition) – এরপর সেই চূর্ণবিচূর্ণ শিলার সঙ্গে বিভিন্ন জৈব পদার্থ (Organic Matter) যেমন – ঝরে পড়া পাতা, মৃত ও পচনশীল উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহ প্রভৃতি মিশ্রিত হয়।
  • অপসারণ (Transportation) – তৃতীয় পর্যায়ে বৃষ্টির জল, নদীর জল, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতির মাধ্যমে সেই চূর্ণবিচূর্ণ শিলাখণ্ডের কিছুটা অপসারিত হয়।
  • রেগোলিথের উৎপত্তি (Formation of Regolith) – অপসারণের পর যে অবশিষ্ট অংশ পড়ে থাকে, তাকে বলা হয় রেগোলিথ। এই রেগোলিথই হলো মৃত্তিকার মূল উপাদান।

এভাবে কালক্রমে বিভিন্ন ভৌত-রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রেগোলিথ ভূত্বকের ওপরে খনিজ ও জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ পাতলা কোমল স্তররূপে বিকাশ লাভ করে, যা মাটি (Soil) নামে পরিচিত।

শিলা থেকে মাটি সৃষ্টি

বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত শিলার রূপান্তরের নাম ছকের মাধ্যমে দেখাও।

আগ্নেয় শিলা থেকে রূপান্তরিত শিলা –

  • গ্রানাইট → নিস্
  • ব্যাসল্ট → অ্যাম্ফিবোলাইট
  • গ্যাব্রো → সার্পেন্টাইন

পাললিক শিলা থেকে রূপান্তরিত শিলা –

  • কাদাপাথর → স্লেট
  • বেলেপাথর → কোয়ার্টজাইট
  • চুনাপাথর → মার্বেল
  • পিট কয়লা → গ্রাফাইট

রূপান্তরিত শিলা থেকে রূপান্তরিত শিলা –

  • স্লেট → ফিলাইট
  • ফিলাইট → সিস্ট
  • অ্যাম্ফিবোলাইট → গ্রানুলাইট
আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত শিলার রূপান্তর

রেললাইনের মাঝে থাকা শিলার নাম কী? কেন এই ধরনের শিলা এখানে রাখা হয়?

রেললাইনে ব্যাসল্ট শিলা রাখা হয়। ব্যাসল্ট হলো এক ধরনের আগ্নেয় শিলা। পাইরক্সিন, কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, লোহা, অলিভিন ইত্যাদি খনিজের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় এটি খুব শক্ত প্রকৃতির হয়। খুব ভারী ও ক্ষয় প্রতিরোধী এই শিলা রেললাইনের মাঝে থাকায় লাইনগুলি ট্রেন যাওয়ার পরেও স্থানচ্যুত হয় না এবং রোদ, বৃষ্টির জল, বায়ু দ্বারা সহজে ক্ষয়প্রাপ্তও হয় না।

খনিজের প্রভাব লেখো।

প্রকৃতি তথা মানবজীবনে খনিজের প্রভাব অনেক। যথা –

  • ভূমির ওপর প্রভাব – লোহা অথবা বক্সাইট সমৃদ্ধ ভূমির উপরিস্তর লাল রঙের ও শক্ত হয়। জিপসামযুক্ত ভূমি হালকা হলুদ রঙের ও নরম হয়। নরম ক্যালসাইট খনিজ থাকলে তা ক্ষয়প্রবণ চুনাপাথর সৃষ্টি করে।
  • শিলার ওপর প্রভাব – খনিজ তেল, কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাস যেখানে পাওয়া যায় সেই অঞ্চল যথেষ্ট নরম, প্রবেশ্য ও সচ্ছিদ্র পাললিক শিলায় গঠিত হয়।
  • মাটির ওপর প্রভাব – মাটি অতিরিক্ত খনিজযুক্ত হলে (ল্যাটেরাইট মাটি) মাটির উর্বরতা কম হয়। ফলে, চাষবাস ভালো হয় না।
  • অর্থনৈতিক প্রভাব – যে অঞ্চলে লোহা, তামা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ প্রভৃতি খনিজ সম্পদ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় (যেমন- ভারতের খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার ছোটোনাগপুর মালভূমি), সেখানে খনিভিত্তিক নানা শিল্প গড়ে ওঠে। মানুষ খনিতে ও শিল্প-কারখানায় কাজ পায়।

আগ্নেয় শিলাকে ‘প্রাথমিক শিলা’ বলা হয় কেন?

অথবা, কোন্ শিলাকে ‘প্রাথমিক শিলা’ বলে ও কেন?

পৃথিবী উত্তপ্ত জ্বলন্ত গ্যাসীয় পিণ্ড থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে প্রথমে তরল এবং পরে কঠিন অবস্থায় (ভূত্বক) পরিণত হয়েছে। এই উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে কঠিন অবস্থায় পরিণত হওয়ার সময় ভূ-অভ্যন্তরে ম্যাগমা জমে এবং ভূপৃষ্ঠে লাভা জমে প্রথমে যে শিলার সৃষ্টি হয় তা হল আগ্নেয় শিলা। পৃথিবীতে আগ্নেয় শিলা প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল বলে একে প্রাথমিক শিলা (Primary Rock) বলে।

গ্রানাইট শিলায় গঠিত ভূমিরূপ গোলাকার হয় কেন?

গ্রানাইট উদ্ভেদী পাতালিক শ্রেণির আগ্নেয় শিলা। এই শিলার সান্দ্রতা বেশি, তাই ম্যাগমা বেশি দূরে প্রবাহিত না হয়ে একস্থানে জমে গম্বুজাকৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। পরে বায়ুর উষ্ণতার প্রভাবে এই শিলায় আবহবিকার (এক্সফোলিয়েশন বা শল্কমোচন) ঘটে গোলাকার ভূমিরূপ গঠন করে। গ্রানাইটের উপরিস্তরের ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হলে গ্রানাইট শিলাস্তূপ উন্মোচিত হয়ে টর জাতীয় ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। কর্ণাটকের মালনাদ মালভূমিতে এই ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়।

কয়লা, খনিজ তেল একমাত্র পাললিক শিলায় পাওয়া যায় কেন?

প্রায় 30-35 কোটি বছর আগে ভূ-আলোড়নের ফলে পৃথিবীর উদ্ভিদরাজি ভূগর্ভে চাপা পড়ে যায় এবং ভূগর্ভের চাপ ও তাপে উদ্ভিদের মধ্যের কার্বন স্তরীভূত হয়ে কয়লায় পরিণত হয়।

আবার, প্রায় 7-10 কোটি বছর আগে পাললিক শিলাস্তরে প্রাণীজগৎ চাপা পড়ে। ভূগর্ভের চাপ ও তাপে তাদের দেহাবশেষ হাইড্রোজেন ও কার্বনের দ্রবণে পরিণত হয়ে খনিজ তেলের সৃষ্টি হয়। খনিজ তেলের ওপরের ফাঁকা স্তরে প্রাকৃতিক গ্যাস অবস্থান করে।

অর্থাৎ, পাললিক শিলাস্তরের মধ্যে উদ্ভিদ, প্রাণী চাপা পড়ে কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস গড়ে ওঠে। তাই একমাত্র পাললিক শিলায় কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায

কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাললিক শিলায় পাওয়া যায়

ব্যাসল্ট শিলায় গঠিত ভূমিরূপ চ্যাপটা আকৃতির হয় কেন?

ব্যাসল্ট নিঃসারী লাভা শ্রেণির আগ্নেয় শিলা। এই শিলার সান্দ্রতা কম হওয়ায় তরল লাভা অনেক দূর প্রবাহিত হয়। ভূত্বকের ফাটলের মধ্য দিয়ে লাভা নির্গত হয়ে অনুভূমিকভাবে ধীরে ধীরে ও স্তরে স্তরে জমে ধাপজাতীয় চ্যাপটা আকৃতির ভূমিরূপ তৈরি করে। এই ধাপগুলিকে ট্র্যাপ বলে। ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির এই ধরনের ভূমিরূপকে ডেকান ট্র্যাপ বলে।

আগ্নেয় শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায় না কেন?

স্তরে স্তরে পলি সঞ্চিত হয়ে পাললিক শিলা সৃষ্টি হওয়ার সময় উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ প্রস্তরীভূত হয়ে জীবাশ্মে পরিণত হয়। কিন্তু আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি হওয়ার সময় উত্তপ্ত গলিত আগ্নেয় পদার্থসমূহ জমাট বেঁধে শীতল হয়ে এই শিলার সৃষ্টি করে। এই সময় কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীদেহ চাপা পড়লে তা প্রচণ্ড উত্তাপে ভস্মীভূত হয়ে যায়, তাই জীবাশ্ম গঠিত হতে পারে না। তাই আগ্নেয় শিলায় কোনো জীবাশ্ম দেখা যায় না।

পাললিক শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায় কেন?

পাললিক শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায় কারণ –

  • নদী, সমুদ্র বা হ্রদের তলায় স্তরে স্তরে পলি জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহও তার মধ্যে চাপা পড়ে যায়।
  • পরবর্তীকালে পলি জমাটবদ্ধ হয়ে পাললিক শিলা গঠনের সময় ওইসব উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহ ধীরে ধীরে প্রস্তরীভূত হয়ে যায় এবং শিলাস্তরের ওপর তার ছাপ সৃষ্টি হয়। এইজন্য জীবাশ্ম শুধুমাত্র পাললিক শিলাতেই দেখা যায়।
  • উদাহরণ – টেথিস সাগরের বিশাল পলি সঞ্চিত হওয়ার সময় তার জীবকুল জীবাশ্মে পরিণত হয় ও এই কারণে হিমালয় পর্বতগাত্রে জীবাশ্ম পাওয়া যায়।
জীবাশ্ম

পাললিক শিলার অপর নাম স্তরীভূত শিলা কেন?

অথবা, কোন্ শিলাকে ‘স্তরীভূত শিলা’ বলা হয় এবং কেন?

ভূত্বকের বিভিন্ন শিলা নদী, হিমবাহ, বায়ু প্রভৃতি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পলি, নুড়ি, বালি সৃষ্টি করে। এরা প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা বাহিত হয়ে নদী, হ্রদ বা সমুদ্রের তলদেশে স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়ে পাললিক শিলা সৃষ্টি করে। পলিকণার রং, আয়তন, গ্রথন এবং বেধ দ্বারা স্তরগুলিকে পৃথক করা যায়। স্তরে স্তরে পলি সঞ্চিত হয়ে পাললিক শিলার উদ্ভব হওয়ায় একে স্তরীভূত শিলাও বলে।

স্তরায়ন তল

ছোটোনাগপুর মালভূমিকে ভারতের খনিজ ভাণ্ডার বলা হয়।

ভারতে উত্তোলিত মোট খনিজ সম্পদের প্রায় 33% ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে পাওয়া যায়। এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত খনিজ পদার্থগুলি হল – কয়লা, আকরিক লোহা, তামা, অভ্র, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, গ্রাফাইট ইত্যাদি। ভারতে মোট কয়লা সঞ্চয়ের 70%, অভ্র সঞ্চয়ের 50%, তামা সঞ্চয়ের 95% এখানে আছে। ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে এতরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় বলে একে ‘ভারতের খনিজ ভাণ্ডার’ বলা হয়।

পাললিক শিলায় কেলাস গঠন হয় না কেন?

বিভিন্ন খনিজের সঙ্গে জলের অণু দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হয়ে কেলাস গঠন করে। আগ্নেয় শিলা তৈরি হওয়ার সময় তার মধ্যে গরম খনিজ জল থেকে যায় যা পরবর্তীকালে ঠান্ডা হয়ে শিলার মধ্যে খনিজ জলের অণু কেলাস গঠন করে। কিন্তু জলাশয়ের তলদেশে স্তরে স্তরে পলি সঞ্চিত হয়ে পাললিক শিলা গঠনকালে কণামধ্যস্থ জল অপসৃত হওয়ায় খনিজ জলের অণু কেলাস গঠিত হতে পারে গঠন হয় না। সেইজন্য এই শিলায় কেলাস গঠন হয় না।

কোন্ শিলা থেকে খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করতে সুবিধা হয় এবং কেন?

অথবা, রূপান্তরিত শিলা থেকে খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করতে সুবিধা হয় কেন?

প্রচণ্ড চাপে, তাপে বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আগ্নেয় ও পাললিক শিলা রূপান্তরিত হয়। রূপান্তরের ফলে শিলার ভিতরের খনিজ অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। তখন একই ধর্মবিশিষ্ট খনিজ পদার্থগুলির পুনর্বিন্যাস ঘটে এবং তারা একদিকে কাছাকাছি চলে আসে। ফলে, রূপান্তরিত শিলা থেকে বাণিজ্যিকভাবে খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করতে সুবিধা হয়।

চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চল নির্মাণকার্যের জন্য উপযুক্ত নয় কেন?

চুনাপাথর বা ক্যালশিয়াম কার্বনেট সাধারণ জলে দ্রবীভূত না হলেও বৃষ্টির জল বা অ্যাসিড মিশ্রিত জলে খুব দ্রুত বিক্রিয়া করে এই ক্যালশিয়াম কার্বনেট ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেটে রূপান্তরিত হয়। ফলে, শিলার ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে চুনাপাথরের মেঝেতে দারণ, ফাটল ও গর্তের সৃষ্টি হয়। তাই চুনাপাথর গঠিত অঞ্চলে ক্ষয়কার্যের হার বেশি হওয়ায় বাঁধ, বহুতল বাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ করলে ওই নির্মাণের নিম্নত


আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় ‘শিলা’ থেকে কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - টীকা

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল – ‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’ (চতুর্থ অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – শিলা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর