আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’ এর উপবিভাগ ‘দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব লেখো।
বিভিন্ন কারণে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। এগুলি হল –
- অবস্থানগত গুরুত্ব – অক্ষাংশের বিচারে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের কিছু অংশ উত্তর গোলার্ধে ও বেশির ভাগ অংশ দক্ষিণ গোলার্ধে পড়ে। আবার, দ্রাঘিমার বিচারে এই মহাদেশটি পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত। তবে মহাদেশটির 15% স্থান উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করায় মোটামুটিভাবে একে ‘দক্ষিণ গোলার্ধের মহাদেশ’ বলা হয়। মহাদেশটির উপকূলভাগ ভগ্ন নয় বলে এখানে উন্নতমানের বন্দর বা পোতাশ্রয় তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি।
- ভূপ্রাকৃতিক গুরুত্ব – এই মহাদেশের পশ্চিম প্রান্ত বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম ও তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশ্রেণি আন্দিজ (দৈর্ঘ্য প্রায় 7,200 কিমি)। এই পর্বতশ্রেণি বরাবর বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি ও পর্বতবেষ্টিত মালভূমি অবস্থান করছে। মহাদেশটির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশে রয়েছে সুপ্রাচীন ব্রাজিল উচ্চভূমি।
- নদনদীর গুরুত্ব – পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো নদী (জলপ্রবাহ বিচারে) আমাজন এই মহাদেশের উত্তর অংশ দিয়ে প্রবাহিত। এ ছাড়া রয়েছে উত্তরে ওরিনোকো এবং দক্ষিণে রিও-ডি-লা-প্লাটা নদী।
- জলবায়ুগত গুরুত্ব – এই মহাদেশের জলবায়ু বৈচিত্র্যপূর্ণ। মহাদেশটির উত্তর দিকে নিরক্ষীয় জলবায়ু, পশ্চিম দিকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু এবং আটাকামা ও প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে শুষ্ক জলবায়ু দেখা যায়।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর গুরুত্ব – জলবায়ুর তারতম্যের জন্য এখানকার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের স্বাভাবিক উদ্ভিদ দেখা যায়। এখানকার আমাজন অববাহিকায় পৃথিবীর বৃহত্তম সেলভা অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে। এই অরণ্যে মেহগনি, রবার, এবনি, ব্রাজিল নাট প্রভৃতি মূল্যবান গাছ ও নানা বনজ সম্পদ পাওয়া যায়। এখানকার অরণ্যে নানান শাখাচারী (Arboreal) প্রাণী যেমন – সাপ, মাছি (সেটসি), রক্তচোষা জোঁক, পাখি, বানর ইত্যাদি ও জলজ প্রাণী কুমির, ভয়ংকর মাছ (পিরানহা) প্রভৃতি দেখা যায়।
- খনিজ সম্পদের গুরুত্ব – দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন মালভূমি অঞ্চলে নানাবিধ খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য হল – ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল; ব্রাজিল ও চিলির আকরিক লৌহ; চিলি ও পেরুর তামা, রুপো, নাইট্রেট; বলিভিয়ার টিন; সুরিনাম ও গিয়ানার বক্সাইট প্রভৃতি।
- শিল্পগত গুরুত্ব – ব্রাজিলের লৌহ-ইস্পাত শিল্প, কার্পাস শিল্প, চিনি শিল্প; চিলির তামা শিল্প; ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল শোধন শিল্প; আর্জেন্টিনার মাংস সংরক্ষণ ও প্যাকিং, চামড়া শিল্প, ডেয়ারি শিল্প প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
- কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্ব – দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ কৃষিকার্যে বিশেষ উন্নত নয়। এই মহাদেশের কোকো, কফি, রবার প্রভৃতি বাগিচা ফসলের চাষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে গম, তুলা, আখ, তামাক, ভুট্টা প্রভৃতি ফসলের চাষ করা হচ্ছে।
- পশুপালনগত গুরুত্ব – এই মহাদেশে পম্পাস, ল্যানোস, ক্যাম্পোস প্রভৃতি বিস্তীর্ণ তৃণভূমি দেখা যায়। এইসব তৃণভূমিতে ব্যাপকভাবে পশুপালন করা হয়।
- সম্ভাবনাময় মহাদেশ – অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, কাঁচামালের প্রাচুর্য, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী অসংখ্য খরস্রোতা নদী – এগুলিকে সুষ্ঠুভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হলে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ আমেরিকা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ মহাদেশে পরিণত হবে।
দক্ষিণ আমেরিকার ভূপ্রাকৃতিক বিভাগগুলি কী কী? যেকোনো একটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
অথবা, পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলের বিবরণ দাও।
অথবা, দক্ষিণ আমেরিকার ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ করো। যেকোনো একটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশকে ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অনুসারে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়; যথা –
- পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল,
- উত্তর ও পূর্বভাগের উচ্চভূমি ও দক্ষিণের মালভূমি,
- মধ্যভাগের বিস্তীর্ণ সমভূমি, এবং
- উপকূলের সমভূমি ও দ্বীপসমূহ।

নিম্নে পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –
পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল –
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তরে ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণে হর্ন অন্তরীপ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ধরে প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছে প্রায় 7,200 কিমি দীর্ঘ আন্দিজ পর্বতমালা। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা এবং এর গড় উচ্চতা প্রায় 3,600 মিটার। হিমালয়ের মতো আন্দিজও টার্শিয়ারি যুগে সৃষ্ট নবীন ভঙ্গিল পর্বত।পর্বতশ্রেণি – পশ্চিম থেকে পূর্বে 3টি পর্বতশ্রেণি নিয়ে আন্দিজ পর্বতমালা গঠিত হয়েছে। এগুলি হলো যথাক্রমে –
- কর্ডিলেরা অক্সিডেন্টাল,
- কর্ডিলেরা সেন্ট্রাল, এবং
- কর্ডিলেরা ওরিয়েন্টাল।
2. পর্বতশৃঙ্গ – আন্দিজ পর্বতশ্রেণিতে প্রায় 50টির ওপর সুউচ্চ শৃঙ্গ আছে। আন্দিজের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো অ্যাকোনকাগুয়া (প্রায় 6,960 মিটার), এটি চিলিতে অবস্থিত। অন্যান্য শৃঙ্গগুলি হলো –
- বোনেটে (6,872 মিটার),
- ইলিমালি (6,457 মিটার),
- চিম্বোরাজো (6,272 মিটার),
- কটোপ্যাক্সি (5,896 মিটার) প্রভৃতি।
3. আগ্নেয়গিরি – আন্দিজের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া হলো একটি মৃত আগ্নেয়গিরি। কটোপ্যাক্সি ও চিম্বোরাজো হলো দুটি বিখ্যাত সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
4. পর্বতবেষ্টিত মালভূমি – আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্বতবেষ্টিত মালভূমি; যেমন –
- বলিভিয়া মালভূমি (পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতবেষ্টিত মালভূমি),
- ইকুয়েডর মালভূমি,
- অল্টিপ্লানো মালভূমি,
- পেরু মালভূমি প্রভৃতি।

5. হ্রদ – আন্দিজ পর্বতে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কয়েকটি হ্রদ। যেমন – চিলি ও আর্জেন্টিনায় রয়েছে রাঙ্কো, টোডো, লস-সান্টো; পেরুর জুনিন; বলিভিয়ার পুপো প্রভৃতি। পেরু ও বলিভিয়ার সীমান্তে অবস্থিত টিটিকাকা পৃথিবীর উচ্চতম হ্রদ।

6. গিরিপথ – আন্দিজ পর্বতের মাঝে মাঝে গিরিপথের (Pass) সৃষ্টি হয়েছে। উসপাল্লাটা (লা-কুমব্রে) পাস আর্জেন্টিনার মেন্ডোজা শহর ও চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করছে।

দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর ও পূর্বের উচ্চভূমি ও দক্ষিণের মালভূমির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব অংশে প্রাচীন শিলা দ্বারা গঠিত উচ্চভূমি লক্ষ করা যায়। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়ের ফলে এই অঞ্চলটি বর্তমানে বেশ নিচু হয়ে গেছে। আমাজন নদীর অববাহিকা এই উচ্চভূমিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে –
- গিয়ানা উচ্চভূমি
- ব্রাজিল উচ্চভূমি
গিয়ানা উচ্চভূমি – গড়ে প্রায় 800 মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট গিয়ানা উচ্চভূমি দক্ষিণে আমাজন অববাহিকা ও উত্তরে ওরিনোকো অববাহিকার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত। গিয়ানা উচ্চভূমি উত্তর ও পূর্ব উপকূলের দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে। গিয়ানা উচ্চভূমির ‘অ্যাঞ্জেল’ জলপ্রপাতটি পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত। ভেনেজুয়েলা-গিয়ানা সীমান্তে অবস্থিত রোরাইমা (উচ্চতা 2,769 মিটার) গিয়ানা উচ্চভূমির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

ব্রাজিল উচ্চভূমি – ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বিস্তীর্ণ উচ্চভূমিকে ব্রাজিল উচ্চভূমি বলা হয়ে থাকে। এই উচ্চভূমিটি প্রাচীন গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ বলে মনে করা হয়। এই অঞ্চল প্রাচীন ব্যাসল্ট আগ্নেয়শিলা, বালি, পাথর ও লাভা দ্বারা গঠিত। অসংখ্য মালভূমি, গোলাকার পাহাড় ও মৃত আগ্নেয়গিরির মোচাকৃতি চূড়া এই উচ্চভূমিতে দেখা যায়। প্রায় ত্রিভুজাকৃতি এই উচ্চভূমির গড় উচ্চতা প্রায় 1,000 মিটার। এখানকার উত্তরের প্রধান পর্বতগুলি হলো— সিয়েরা গেরাল ডে গয়াস, চাপাদা দায়ামানটিনা, সিয়েরা এস্পিনহাকো; এবং দক্ষিণের পর্বতগুলি হলো— সিয়েরা গেরাল, সিয়েরা দে মন্টিকুয়েরা প্রভৃতি।

এই অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে আমাজন উপত্যকার সমতলভূমিতে মিশে গেছে। এর দক্ষিণাংশ দক্ষিণ-পশ্চিমে ঢালু হয়ে পারানা উপত্যকার সমভূমিতে মিশেছে। পূর্ব উপকূলের সংলগ্ন অংশে এই উচ্চভূমির উচ্চতা বেশি। ব্রাজিল উচ্চভূমির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত ‘পিকো-দা-বানডেইরা’ (Pico da Bandeira) ব্রাজিল উচ্চভূমির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
মাটোগ্রাসো মালভূমি – ব্রাজিলের উচ্চভূমি ও আন্দিজ পর্বতের মাঝে মাটোগ্রাসো নামে এক বিস্তীর্ণ উচ্চ মালভূমি রয়েছে। এটি আমাজন ও লা-প্লাটা নদী দুটির মাঝে দাঁড়িয়ে থেকে জলবিভাজিকার কাজ করছে। এই মালভূমি ব্রাজিলের উচ্চভূমি ও আন্দিজ পর্বতের মাঝে অবস্থান করে, পশ্চিমে আন্দিজ পর্বতমালাকে পূর্বে ব্রাজিলের উচ্চভূমির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই মালভূমিতে রয়েছে বিখ্যাত জলপ্রপাত ইগুয়াসু।

প্যাটাগোনিয়া মালভূমি – দক্ষিণে আর্জেন্টিনার পশ্চিমে প্রাচীন শিল্ড অঞ্চলটি ‘প্যাটাগোনিয়া মালভূমি’ নামে পরিচিত। এটি অনেকটা টেবিলের মতো আকৃতিবিশিষ্ট ভূমিরূপ, যা বর্তমানে ক্ষয়কার্যের প্রভাবে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানে স্থানে লাভাগঠিত ভূমিও দেখা যায়।

দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যভাগের বিস্তীর্ণ সমভূমি এবং উপকূলের সমভূমি ও দ্বীপসমূহের বিবরণ দাও।
মধ্যভাগের বিস্তীর্ণ সমভূমি – পশ্চিমে আন্দিজ পার্বত্য ও অঞ্চল এবং পূর্বের উচ্চভূমির মধ্যে মধ্যভাগের বিশাল সমভূমি অঞ্চল অবস্থিত, যা আয়তনে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের অর্ধেকের চেয়েও বড়ো। ওরিনোকো, আমাজন পারানা-প্যারাগুয়ে এই তিনটি নদীর অববাহিকা দ্বারা এই সমভূমি অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে। গঠন বৈচিত্র্য অনুসারে মধ্যভাগের সমভূমিকে চার ভাগে ভাগ করা যায় –
- ওরিনোকো নদী অববাহিকার ল্যানোস সমভূমি,
- আমাজন নদী অববাহিকার সেলভা সমভূমি,
- পারানা-প্যারাগুয়ে নদী অববাহিকার গ্রানচাকো সমভূমি এবং
- উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনার পম্পাস সমভূমি।
উপকূলের সমভূমি ও দ্বীপসমূহ –
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল এবং আন্দিজ পর্বতের মাঝখানে থাকা অঞ্চলটি উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত মহাদেশের সমগ্র পশ্চিম উপকূল জুড়ে একফালি সরু ফিতার মতো বিস্তার লাভ করেছে। এই অঞ্চলের মধ্যভাগে আটাকামা নামে 1,100 কিমি দীর্ঘ মরুভূমি রয়েছে যা পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক ও খরাপ্রবণ অঞ্চল। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উত্তর অংশে কিছু স্থান উপকূল থেকে প্রায় 1,600 কিমি দূরে অবস্থিত, কিন্তু দক্ষিণের বহু স্থান সমুদ্রের 160 কিমির মধ্যেই অবস্থিত। এখানকার উপকূলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 32,000 কিমি। উপকূলভাগ অভগ্ন হওয়ায় এখানে উপসাগর, উপদ্বীপ প্রভৃতির সংখ্যা খুবই কম। এই মহাদেশের বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে দক্ষিণে টিয়েরা ডেল ফুয়েগো ও তার উত্তর-পূর্ব দিকের ফক্ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং এর পূর্ব দিকে অবস্থিত দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপ উল্লেখযোগ্য।
দক্ষিণ আমেরিকার নদনদীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান তিনটি নদী হল – আমাজন, ওরিনোকো এবং রিও-ডি-লা-প্লাটা। এ ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল পারানা, মারানন, সাওফ্রান্সিসকো প্রভৃতি।
ওরিনোকো নদী – দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উত্তরতম প্রান্তে অবস্থিত ওরিনোকো নদীটি ভেনেজুয়েলা ও ব্রাজিলের মধ্যে অবস্থিত গিয়ানা উচ্চভূমির পারিমা পর্বত থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর উত্তর দিকে ভেনেজুয়েলার ওপর দিয়ে অসংখ্য উপনদীসহ প্রায় 2,150 কিমি পথ প্রবাহিত হয়ে অবশেষে ত্রিনিদাদ দ্বীপের বিপরীতে বদ্বীপ সৃষ্টি করে আটলান্টিক মহাসাগরে এসে পড়েছে। এর বামতটের উপনদীর মধ্যে মেটা, আপুরে এবং ডানতটের উপনদীর মধ্যে কারোনি উল্লেখযোগ্য। কারোনি নদীর অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত।
2. লা-প্লাটা নদী – পারানা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে – এই তিনটি নদীর মিলিত প্রবাহকে একত্রে লা-প্লাটা (3,500 কিমি) বা রিও-ডি-লা-প্লাটা নদী বলে। মাটোগ্রোসো মালভূমি থেকে উৎপন্ন প্যারাগুয়ে নদী ও ব্রাজিলের উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন পারানা নদীর মিলিত প্রবাহ পারানা নামে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এর পর উত্তর-পূর্ব দিক থেকে উরুগুয়ে নদী পারানার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ওই মিলিত জলধারা লা-প্লাটা বা রিও-ডি-লা-প্লাটা নামে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে।
3. পারানা নদী – ব্রাজিল উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন পারানাইবা ও রিও গ্রান্দে নদীর মিলিত প্রবাহ হল পারানা। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় 3,200 কিমি। পারানা নদী দক্ষিণবাহিনী হয়ে প্রথমে ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে সীমানা, পরে প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনা সীমানা এবং আরো পরে আর্জেন্টিনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রিও-ডি-লা-প্লাটার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পারানার বামতীরের উপনদী হল – টেটে, ইভাই, ইগুয়াসু এবং ডানতীরের উপনদী হল – প্যারাগুয়ে, ভার্দো, সালাডো ইত্যাদি।
4. আমাজন নদী – পৃথিবীর বৃহত্তম ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী হল আমাজন। এই নদীটির দৈর্ঘ্য 6,437 কিমি। আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলের মিসমি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন মারানন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে উৎপন্ন উকায়েলি ও ওয়ায়াগা নদীর মিলিত প্রবাহ আমাজন নামে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। মোহানার কাছে আমাজন প্রায় 400 কিমি চওড়া। আমাজনের উপনদীর সংখ্যা 1,000-এর বেশি। এর বামতীরের উল্লেখযোগ্য উপনদীগুলি হল – নাপো, জাপুরা, নেগ্রো এবং ডানতীরের উল্লেখযোগ্য উপনদীগুলি হল – জুরুয়া, পুরুস, মদিরা প্রভৃতি।

5. মারানন নদী – মারানন নদীর উৎস হল লাওরি-কাওচা হ্রদ। অনেকে মনে করেন মারানন নদীটি আমাজন নদীর মূল স্রোত। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় 1,600 কিমি।
6. সাওফ্রান্সিসকো নদী – ব্রাজিলের উচ্চভূমি অঞ্চলের দীর্ঘতম প্রধান নদী হল সাওফ্রান্সিসকো। ব্রাজিলের মিনাস গেরাইস উচ্চভূমিতে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে বাহিয়া ও পের্নামবুকো সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। উচ্চভূমি থেকে নামার সময় অনেক খরস্রোত ও ক্ষুদ্র জলপ্রপাত সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রবাহে নদীটির প্রায় 1,400 কিমি পথ নাব্য। এই নদীর প্রবাহপথে পাওলো আফোনসো জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ু কী কী উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়, তা উল্লেখ করো।
অথবা, দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ুর বৈচিত্র্যের কারণগুলি উল্লেখ করো।
দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ু নিম্নলিখিত কারণগুলির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় –
- অক্ষাংশ – দক্ষিণ আমেরিকার অবস্থান 12° উত্তর থেকে 55°59′ দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে এবং নিরক্ষরেখা ও মকরক্রান্তি রেখা এই মহাদেশের ওপর দিয়ে বিস্তৃত। ফলে, এই মহাদেশের উত্তর-মধ্য অংশে জলবায়ু উষ্ণ-আর্দ্র এবং দক্ষিণে নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির।
- মহাদেশের আকৃতি – দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশটি ত্রিভুজাকার। এর উত্তরভাগ প্রশস্ত হওয়ায় সামুদ্রিক প্রভাব মহাদেশের অভ্যন্তরভাগ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারে না। আবার, দক্ষিণ দিকটি ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার জন্য সামুদ্রিক প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। ফলে, জলবায়ুর তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
- পর্বতশ্রেণির অবস্থান – আন্দিজ পর্বতের অবস্থান মহাদেশের জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে। উচ্চতা অধিক হওয়ার জন্য পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়া শীতল ও আরামদায়ক। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আগত জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতের পশ্চিম ঢালে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পূর্ব ঢালে কম বৃষ্টিপাতের কারণে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে।
- সমুদ্র থেকে দূরত্ব – মহাদেশটির দক্ষিণাংশ সংকীর্ণ বলে ওখানে সামুদ্রিক প্রভাবে জলবায়ু কিছুটা সমভাবাপন্ন থাকে। উত্তরাংশ প্রশস্ত হওয়ায় সমুদ্র থেকে দূরত্বের জন্য অনেক স্থানের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন।
- সমুদ্রস্রোতের প্রভাব – শীতল পেরু স্রোত বা হামবোল্ড স্রোত দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে ওই উপকূল শীতল ও শুষ্ক থাকে। অপরদিকে, উষ্ণ ব্রাজিল স্রোতের প্রভাবে পূর্ব উপকূলের ব্রাজিলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
- বায়ুপ্রবাহ – উত্তরাংশে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু, দক্ষিণাংশে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এই দুই আয়ন বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়। আবার, দক্ষিণাংশে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে পশ্চিম উপকূলে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দেখা যায়।
- বৃষ্টিপাত ও বনভূমি – এই মহাদেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাতের তারতম্যের জন্য বিভিন্ন রকম জলবায়ুর উৎপত্তি হয়েছে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রচুর পরিচলন বৃষ্টিপাতের জন্য গভীর বনভূমি সৃষ্টি হয়েছে। এই জন্য অঞ্চলটি শীতল ও স্যাঁতসেঁতে প্রকৃতির।
দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ুর পরিচয় দাও।
অথবা, দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উষ্ণতা –
- জানুয়ারি মাস – বছরের এই সময় মধ্যাহ্নে সূর্যরশ্মি নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিকে লম্বভাবে কিরণ দেয়। ফলে, নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিকে গ্রীষ্ম ঋতু এবং উত্তর দিকে শীত ঋতু দেখা যায়।
- জুলাই মাস – এই সময় মধ্যাহ্নে সূর্যরশ্মি নিরক্ষরেখার উত্তর দিকে লম্বভাবে কিরণ দেয়। সুতরাং, উত্তরাংশে গ্রীষ্ম ঋতু ও দক্ষিণাংশে শীত ঋতু দেখা যায়।
বৃষ্টিপাত –
- আয়ন বায়ুর প্রভাব – দক্ষিণ আমেরিকায় 30° দক্ষিণ সমাক্ষরেখার উত্তরে অবস্থিত অঞ্চলে সারাবছরই আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয় বলে পূর্বাংশে, বিশেষত আমাজন বেসিনে সারাবছরই পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে কমলেও পশ্চিম দিকে আন্দিজ পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আয়ন বায়ু শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব – 40° দক্ষিণ সমাক্ষরেখার দক্ষিণে যেখানে সারাবছর উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়, সেখানে সারাবছরই বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে কমতে থাকে এবং আন্দিজ পর্বতের পূর্ব দিকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের সৃষ্টি হয়ে প্যাটাগোনিয়া মালভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
বায়ুপ্রবাহ –
- নিরক্ষরেখার উত্তর দিকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু ও দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়।
- 40° দক্ষিণ সমাক্ষরেখা থেকে মহাদেশটির দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে থাকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু।
- 30° দক্ষিণ ও 40° দক্ষিণ সমাক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চল গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং শীতকালে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে আসে।
দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ু কয় ভাগে বিভক্ত ও কী কী—আলোচনা করো।
উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে দক্ষিণ আমেরিকাকে নয়টি জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা যায় –
- নিরক্ষীয় জলবায়ু,
- ক্রান্তীয় সাভানা জলবায়ু,
- ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু,
- ক্রান্তীয় মরু জলবায়ু,
- ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু,
- নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু,
- স্তেপ জলবায়ু,
- সামুদ্রিক জলবায়ু,
- পার্বত্য জলবায়ু।
1. নিরক্ষীয় জলবায়ু –
অবস্থান – নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে আমাজন অববাহিকা বরাবর অর্থাৎ ব্রাজিলের মধ্যভাগ, গিয়ানা, সুরিনাম ও ভেনিজুয়েলার দক্ষিণ অংশে এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- জলবায়ু সারাবছর উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির হয়। কোনো ঋতু পরিবর্তন হয় না এবং শীত ও গ্রীষ্মে তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকে।
- বার্ষিক গড় উষ্ণতা 25°-27°C।
- বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 250-300 সেমি। প্রায় প্রতিদিন অপরাহ্নে পরিচলন পদ্ধতিতে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত হয়। কোনো কোনো জায়গায় প্রায় 1000 সেমির অধিক বৃষ্টিপাত হয়।
2. ক্রান্তীয় সাভানা জলবায়ু –
অবস্থান – গিয়ানা উচ্চভূমির ল্যানোস ও ব্রাজিলের উচ্চভূমি ক্যাম্পোস অঞ্চলে এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও আর্দ্র এবং শীতকাল শীতল ও শুষ্ক প্রকৃতির।
- গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা 28°-30°C এবং শীতকালীন গড় উষ্ণতা 22°-25°C।
- বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 100-150 সেমি।
3. ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু –
অবস্থান – ব্রাজিলের পূর্ব উপকূল বরাবর এই প্রকার জলবায়ু দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল আর্দ্র ও শীতকাল শুষ্ক প্রকৃতির।
- সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ আয়ন বায়ুর প্রভাবে প্রধানত গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 200 সেমির বেশি।
4. ক্রান্তীয় মরু জলবায়ু –
অবস্থান – দক্ষিণ পেরু ও উত্তর চিলিতে অবস্থিত আটাকামা মরুভূমি এই জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও শীতকাল বেশ শীতল।
- এই অঞ্চলটি পৃথিবীর শুষ্কতম অঞ্চল। বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 25 সেমির কম।
5. ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু –
অবস্থান – মধ্য চিলিতে অবস্থিত আটাকামা মরুভূমির দক্ষিণাংশে এইরূপ জলবায়ু দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও শুষ্ক এবং শীতকাল আর্দ্র প্রকৃতির হয়।
- বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 75 সেমি।
6. নাতিশীতোষ্ণ মরু জলবায়ু –
অবস্থান – পম্পাস তৃণভূমি সংলগ্ন প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে এই প্রকার জলবায়ু দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল উষ্ণ এবং শীতকাল বেশ শীতল।
- পশ্চিমা বায়ুর বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার জন্য এই অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় 25 সেমি।
7. স্তেপ জলবায়ু –
অবস্থান – আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের পম্পাস তৃণভূমি অঞ্চলে এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- এখানে গ্রীষ্মকালে উষ্ণতা মাঝারি (25°C) এবং শীতকালে বেশ কম (10°C)।
- সমুদ্র নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে জলবায়ু মৃদুভাবাপন্ন।
- বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 50-75 সেমি।
8. শীতল সামুদ্রিক জলবায়ু –
অবস্থান – দক্ষিণ চিলির উপকূল বরাবর এই প্রকার জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- এখানে গ্রীষ্মকাল অপেক্ষাকৃত শীতল এবং শীতকাল বেশ শীতল।
- এখানে সারাবছর পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে 100-150 সেমি বৃষ্টিপাত হয়।
9. পার্বত্য জলবায়ু –
অবস্থান – দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর থেকে দক্ষিণে আন্দিজ পর্বত বরাবর এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
বৈশিষ্ট্য –
- অধিক উচ্চতার কারণে এখানে সারাবছর শীতল অবস্থা বিরাজ করে।
- আন্দিজ পর্বতের উত্তরাংশের পূর্ব ঢালে আয়ন বায়ুর প্রভাবে এবং দক্ষিণাংশের পশ্চিম ঢালে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটে।

দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের স্বাভাবিক উদ্ভিদকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা ও জলবায়ুর জন্য এই মহাদেশের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন প্রকৃতির স্বাভাবিক উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়েছে। এইসব স্বাভাবিক উদ্ভিদকে প্রধানত নয়টি ভাগে ভাগ করা যায়, সেগুলি হল –
1. নিরক্ষীয় চিরহরিৎ (সেলভা) অরণ্য –
অবস্থান – এই মহাদেশের আমাজন নদীর অববাহিকা, ওরিনোকো নদীর অববাহিকা, এবং ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, মুরিনামের দক্ষিণাংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও অধিক উষ্ণতার জন্য নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য –
- গাছগুলি চিরসবুজ।
- গাছের পাতা বড়ো বড়ো।
- এই অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ একসঙ্গে বেড়ে ওঠে বলে জঙ্গল খুব ঘন ও দুর্ভেদ্য হয়, ফলে অরণ্যের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো সহজে প্রবেশ করতে পারে না। সেজন্য এই স্থানকে ‘গোধূলি অঞ্চল’ (Region of Twilight) বলা হয়।
- এই অরণ্যে চারটি স্তরের স্বাভাবিক উদ্ভিদ লক্ষ করা যায়।
- বনভূমির কাঠ খুব শক্ত ও গাঁটযুক্ত। এই অরণ্যের স্থানীয় নাম সেলভা।
- এই অরণ্যে রোজ উড, আয়রন উড, ব্রাজিল নাট, হেভিয়া, মেহগনি, আবলুশ, বাঁশ, বেত প্রভৃতি গাছ দেখা যায়।
2. সাভানা তৃণভূমি –
অবস্থান – দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের নিরক্ষীয় জলবায়ুর দক্ষিণাংশে গিয়ানা উচ্চভূমি ও ব্রাজিল উচ্চভূমির নদী উপত্যকায় এই সাভানা তৃণভূমি অবস্থান করছে। ব্রাজিলে এই তৃণভূমি ক্যাম্পোস এবং ওরিনোকো নদী অববাহিকায় ল্যানোস নামে পরিচিত।
বৈশিষ্ট্য –
- এই সাভানা তৃণভূমিতে বিভিন্ন উচ্চতার লম্বা লম্বা (প্রায় 4 মিটার), শক্ত, মোটা, কর্কশ জাতীয় ঘাস জন্মায়।
- এই তৃণের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে শাল, সেগুন প্রভৃতি পর্ণমোচী বৃক্ষ দেখা যায়।
3. ক্রান্তীয় পর্ণমোচী উদ্ভিদ –
অবস্থান – ব্রাজিলের পূর্বাংশে আয়ন বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয় ও শীতকাল শুষ্ক থাকায় এখানে পর্ণমোচী জাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্য –
- উদ্ভিদগুলি সারাবছর ধরে অল্পবিস্তর পাতা ও বাকল ঝরায়।
- পিরানা, শাল, সেগুন, পাইন, জারুল, মেহগনি, কুল প্রভৃতি এখানকার উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদ।
4. ক্রান্তীয় মরু উদ্ভিদ –
অবস্থান – দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমে আটাকামা মরুভূমিতে বৃষ্টিপাত খুব কম হওয়ায় এখানে কাঁটাজাতীয় মরু উদ্ভিদ বিস্তারলাভ করেছে।
বৈশিষ্ট্য –
- বৃষ্টিহীন শুষ্ক জলবায়ুর জন্য এখানে গুল্ম, ঝোপঝাড় জাতীয় গাছ জন্মায়।
- বাষ্পীভবন রোধ করার জন্য গাছের পাতাগুলি কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
- উদ্ভিদের শিকড়গুলি জলের সন্ধানে মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে।
- ক্যাকটাস, অ্যাকাসিয়া প্রভৃতি এখানকার প্রধান উদ্ভিদ।
5. ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্য –
অবস্থান – মধ্য চিলির অন্তর্গত আটাকামা মরুভূমির দক্ষিণাংশে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে এই ভূমধ্যসাগরীয় বনভূমির সৃষ্টি হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য –
- বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকালে আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য উদ্ভিদগুলির কাণ্ড পুরু ছালে ঢাকা থাকে এবং শিকড় খুব লম্বা হয়ে মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে।
- পাতার ওপর মোমের মতো আবরণ দেখা যায়।
- গাছের বীজগুলি ঘন রসের আবরণে ঢাকা থাকে।
- প্রধান বৃক্ষগুলি টক-মিষ্টি জাতীয় ফল ধারণ করে।
- এখানে ওক, লরেল, বাবলা, ক্যাকটাস, অ্যাকাসিয়া প্রভৃতি কণ্টকজাতীয় গাছ এবং রোজমেরি, ল্যাভেন্ডার প্রভৃতি গুল্ম ও ঝোপঝাড় জাতীয় গাছ জন্মায়।
6. শীতল সামুদ্রিক অঞ্চলের মিশ্র অরণ্য –
অবস্থান – চিলির দক্ষিণাংশে শীতল সামুদ্রিক জলবায়ুযুক্ত অঞ্চলে এইরূপ মিশ্র বনভূমি দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্য –
- এখানে চিরহরিৎ বা চিরসবুজ ও পর্ণমোচী বৃক্ষের মিশ্র অরণ্য দেখা যায়।
- সারাবছর অল্প বৃষ্টিপাতের জন্য এখানে পর্ণমোচী অরণ্য গড়ে উঠেছে।
- পাইন, ফার প্রভৃতি সরলবর্গীয় বৃক্ষ এবং ওক, বিচ, ম্যাপল, এলম, পপলার প্রভৃতি শক্ত কাঠের বনভূমি গড়ে উঠেছে।
7. নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি বা পম্পাস তৃণভূমি –
অবস্থান – আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের উত্তর-পূর্বাংশে এই নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি (পম্পাস) বিস্তৃত আছে। বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতার পার্থক্য অনুসারে এই তৃণগুলি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ক্রমশ ছোটো হতে থাকে।
বৈশিষ্ট্য –
- এখানকার ঘাসগুলি সাভানা তৃণভূমির মতো লম্বা নয়।
- ঘাসগুলি বর্ষজীবী ও নরম প্রকৃতির।
- এখানে ব্রিজা, প্যানিকাম প্রভৃতি ঘাস জন্মায়।
- গবাদিপশু ও মেষচারণের পক্ষে এই তৃণভূমি বিশেষ উপযোগী।
8. নাতিশীতোষ্ণ মরু অরণ্য –
অবস্থান – দক্ষিণ আমেরিকার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলটি পশ্চিমা বায়ুর গতিপথে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত, সেজন্য অঞ্চলটি মরু প্রকৃতির।
বৈশিষ্ট্য –
- গ্রীষ্মকাল অত্যন্ত উষ্ণ এবং বৃষ্টিহীন।
- অঞ্চলটি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
- সে কারণে এখানে বৃক্ষের পরিবর্তে ঝোপঝাড়, কাঁটাজাতীয় গাছ ও ঘাস জন্মায়।
9. পার্বত্য অরণ্য –
অবস্থান – সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিমাংশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত আন্দিজ পর্বতের বিভিন্ন উচ্চতায় উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্য লক্ষ করা যায়, ফলে নানাপ্রকার উদ্ভিদের বনভূমি গড়ে উঠেছে।
বৈশিষ্ট্য –
- আন্দিজ পর্বতের পূর্ব ঢালে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় চিরহরিৎ অরণ্যভূমি গড়ে উঠেছে।
- পর্বতের অধিক উচ্চতায় ঘাস, লাইকেন জাতীয় আল্পীয় উদ্ভিদ জন্মায়।
- তার নীচে সরলবর্গীয় বনভূমি (পাইন, ফার)।
- পর্বতের নীচের দিকে পর্ণমোচী বৃক্ষের বনভূমি (ওক, বিচ, বার্চ, এলম) দেখা যায়।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’ এর উপবিভাগ ‘দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য‘ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment