আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের সপ্তম অধ্যায়, ‘ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন’-এর ‘বিষয়সংক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই অংশটি পড়ার ফলে অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়াবলি বুঝতে সুবিধা হবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দেয়। যেমন, 1915 খ্রিস্টাব্দে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে আসেন। পরের বছর গুজরাটে গড়ে তোলেন সবরমতী আশ্রম। এরপর তিনি 1917-1918 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে 3টি আঞ্চলিক আন্দোলনে (যথা—চম্পারণ কৃষক আন্দোলন, খেড়া সত্যাগ্রহ ও আমেদাবাদ শ্রমিক আন্দোলন) নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনগুলির সাফল্য শীঘ্রই তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে নিয়ে আসে। এই সময় থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধি যুগ শুরু হয়।
1919 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার ভারত বিদ্বেষী রাওলাট আইন ঘোষণা করলে গান্ধিজি প্রতিবাদে মুখর হন। তিনি দেশজুড়ে রাওলাট সত্যাগ্রহের ডাক দেন। কিন্তু ওই বছর 13 এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার রেগিন্যাল্ড ডায়ারের নির্দেশে জালিয়ানওয়ালাবাগের চারদিক ঘেরা মাঠে সেনাবাহিনী রাওলাট সত্যাগ্রহীদের ওপর নির্বিচারে গুলি ছোঁড়ে। তাতে বহু মানুষ হতাহত হয়।
এই ঘটনার পর গান্ধিজি 1920 খ্রিস্টাব্দে সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এর আগে ভারতে গড়ে ওঠা খিলাফত আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করেন। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়। কিন্তু গান্ধিজি 1922 খ্রিস্টাব্দে চৌরিচৌরা ঘটনার প্রেক্ষিতে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হলে, ভারতীয় রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। এমতাবস্থায় 1923 খ্রিস্টাব্দে চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠা করেন স্বরাজ দল। ভারতীয় রাজনীতিতে এই দল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর ক্রমে ক্রমে এই দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নানা কারণে গান্ধিজি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন। 1930 খ্রিস্টাব্দে তিনি ডান্ডি অভিযান করে সেখানে সমুদ্রের জল থেকে স্বহস্তে লবণ প্রস্তুত করে আইন-অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন। ক্রমে সারা ভারতবর্ষে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর পশ্চিম ভারতে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ‘সীমান্ত গান্ধি’ নামে খ্যাত খান আবদুল গফফর খান। 1931 খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট আরউইন গান্ধির সঙ্গে একটি চুক্তি দ্বারা তাঁর 6 দফা দাবি মেনে নিলে, গান্ধিজি পরের বছর আইন অমান্য প্রত্যাহার করে নেন এবং কথামত লন্ডনে আহূত দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি যোগদান করতে যান। কিন্তু সেখান থেকে তিনি খালি হাতে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে তিনি দেখলেন সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি পালিত হয়নি। এমতাবস্থায় তিনি দ্বিতীয়বার আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন। কিন্তু আন্দোলন চলাকালে 1934 খ্রিস্টাব্দে বিহারে ভূমিকম্প হলে গান্ধিজি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
এই পর্বে ভারতে বিপ্লবী আন্দোলন মাথাচাড়া দেয়। মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে 1930 খ্রিস্টাব্দের 18 এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়। এই বছর ডিসেম্বরে ‘বিবাদী’ খ্যাত বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অভিযান করেন। পাঞ্জাবে বিপ্লবী আন্দোলনে জোয়ার আনেন ভগৎ সিং।
বড়োলাট লর্ড লিনলিথগোর ‘আগস্ট প্রস্তাব’ (1940 খ্রিস্টাব্দ) ও ক্রিপসের প্রস্তাব (1942 খ্রিস্টাব্দ) ব্যর্থ হলে ভারতীয়দের বুঝতে দেরি হয়নি যে, ইংরেজরা ভারতের সাংবিধানিক সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে যথেষ্টই উদাসীন। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতকে একটি যুদ্ধরত দেশ ঘোষণা করলে গান্ধিজি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। এই পরিস্থিতিতে তিনি 1942 খ্রিস্টাব্দের 9 আগস্ট ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলন দেশ জুড়ে এক গণ উন্মাদনা সৃষ্টি করে। যদিও গান্ধিজি 1943 খ্রিস্টাব্দের বাংলার মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল তারকা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে 1941 খ্রিস্টাব্দের 17 জানুয়ারি তিনি গৃহত্যাগ করেন। কাবুল হয়ে তিনি বার্লিন পৌঁছান। সেখানে ‘আজাদ হিন্দুস্থান’ নামে একটি বেতারকেন্দ্র এবং ‘ভারতীয় লিজিয়ন’, ‘স্বাধীন ভারতীয় সংঘ’ ইত্যাদি গড়ে তোলেন। 1943 খ্রিস্টাব্দে তিনি সিঙ্গাপুরে রাসবিহারী বসু প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মনোনীত হন। তিনি নিজ হাতে এই বাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলেন। এরপর তিনি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁর এই অভিযান ব্যর্থ হয়। জানা যায় যে, 1945 খ্রিস্টাব্দের 18 আগস্ট ফরমোজা দ্বীপের তাইহোকু বিমানবন্দর থেকে মাঞ্চুরিয়া যাত্রাকালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
অন্যদিকে 1946 খ্রিস্টাব্দের 18 ফেব্রুয়ারি থেকে 23 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতীয় নৌকর্মী ও সেনারা বিদ্রোহ করে। শুরু হয় নৌবিদ্রোহ, কিন্তু নানা কারণে এই বিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের সপ্তম অধ্যায়, “ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন”-এর “বিষয়সংক্ষেপ” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাটি অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো সহজে বুঝতে সাহায্য করবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, মতামত জানাতে চাও বা আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো কিংবা আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারো—তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।





Leave a Comment