আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের নবম অধ্যায়, “ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. ভারতীয় সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে লেখো।
বিশ্বের প্রতিটি দেশের একটি নিজস্ব সংবিধান আছে। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতের সংবিধান 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি কার্যকর হয়।
ভারতীয় সংবিধানের বৈশিষ্ট্য –
- বিশালতা ও জটিলতা – ভারতের সংবিধান বিশ্বের বৃহত্তম ও জটিলতম লিখিত সংবিধান। 22টি খণ্ডে বিভক্ত বিশাল এই সংবিধানের সূচনাকালে এর 395টি ধারা ও 8টি তফশিল ছিল। বর্তমানে রয়েছে প্রায় 450টি ধারা ও 12টি তফশিল।
- যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা – ভারতীয় সংবিধানে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং 28টি রাজ্যে রয়েছে রাজ্য সরকার। কোনো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সমগ্র দেশকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেন।
- নমনীয় ও কঠোর – ভারতীয় সংবিধান একদিকে যেমন নমনীয়, তেমন অপরদিকে কঠোর। কোনো ধারা পরিবর্তন করতে গেলে প্রস্তাবিত বিলটি রাজ্যসভা ও লোকসভার 2/3 অংশের ভোটাভুটিতে গৃহীত হতে হবে।
- ধর্মনিরপেক্ষতা – 1976 খ্রিস্টাব্দে সংশোধনী দ্বারা ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। অন্য কোনো রাষ্ট্রের মতো ভারতে কোনো রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই। দেশের সকল নাগরিকই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান।
- নির্দেশাত্মক নীতি – ভারতীয় সংবিধান ভারতবাসীর জন্য কতগুলি নির্দেশাত্মক নীতি সংরক্ষণ করেছে। যেমন—স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে জীবিকা অর্জনের সুযোগ, 14 বছর পর্যন্ত প্রত্যেকের বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ ইত্যাদি।
- মৌলিক অধিকার – ভারতীয় সংবিধানে জনগণের 6টি মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। যেমন—স্বাধীনতার অধিকার, স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার, শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার ইত্যাদি।
2. ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি সম্পর্কে ধারণা দাও।
ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকগণ 6টি মৌলিক অধিকার ভোগ করেন। যথা — সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার।
- সাম্যের অধিকার – ভারতবর্ষের সংবিধানের 14–18 নং ধারায় সাম্যের অধিকার ঘোষিত ও স্বীকৃত হয়েছে। ভারতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করেন।
- স্বাধীনতার অধিকার – সংবিধানের 19–22 নং ধারায় স্বাধীনতার অধিকার ঘোষিত ও স্বীকৃত হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকগণ কথা বলা, মতামত প্রকাশ, সমবেত হওয়া, যাতায়াত ও বসবাস করা, পেশা গ্রহণ প্রভৃতির স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন।
- শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার – সংবিধানের 23 ও 24 নং ধারায় নাগরিকদের শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মানুষ ক্রয়-বিক্রয়, বেগার খাটানোর বিরুদ্ধে নাগরিকগণ এই অধিকার প্রয়োগ করে থাকেন।
- ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার – সংবিধানের 25–28 নং ধারায় জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই অধিকারের মাধ্যমে ভারতের জনগণের ধর্মগ্রহণ, ধর্মপালন ও ধর্মপ্রচারের স্বাধীনতা রয়েছে।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার – সংবিধানের 29 ও 30 নং ধারায় ভারতের নাগরিকদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার ঘোষিত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার, বৈষম্যমূলক আচরণ না-করা, ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ না-করা প্রভৃতি এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
- সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার – সংবিধানের 32 ও 226 নং ধারায় সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অধিকারের মাধ্যমে মৌলিক অধিকারগুলি বলবৎ ও কার্যকর করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করা যায়।
3. ভারতের সংবিধানে লিপিবদ্ধ মৌলিক কর্তব্যগুলি লেখো।
মৌলিক কর্তব্য – ভারত রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি নাগরিকদের কিছু কর্তব্য রয়েছে। 1976 খ্রিস্টাব্দে 42nd সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নাগরিকদের 10টি মৌলিক কর্তব্য পালনের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে 2002 খ্রিস্টাব্দে 86th সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরও একটি কর্তব্য যুক্ত হয়েছে। এই 11টি মৌলিক কর্তব্য হল —
- সংবিধান, সংবিধানের আদর্শ, বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় স্তোত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো।
- স্বাধীনতা সংগ্রামের সুমহান আদর্শগুলি সংরক্ষণ ও অনুসরণ করা।
- ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও সংহতিকে সমর্থন ও সংরক্ষণ করা।
- দেশরক্ষা ও জাতীয় সেবামূলক কাজের আহ্বানে সাড়া দেওয়া।
- ধর্মগত, ভাষাগত ও আঞ্চলিক বা শ্রেণিগত বিভিন্নতার উর্ধ্বে ভারতীয় জনগণের ঐক্য ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা এবং নারীর মর্যাদাহানিকর প্রথাসমূহ ত্যাগ করা।
- জাতীয় মিশ্র সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্যের সম্মান ও সংরক্ষণ করা।
- বনভূমি, হ্রদ, নদনদী এবং বন্যপ্রাণীসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ এবং সমস্ত প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করা।
- বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, মানবিকতা, অনুসন্ধান ও সংস্কারের মানসিকতাকে গ্রহণ করা ও তার প্রসার ঘটানো।
- জাতীয় সম্পত্তি সংরক্ষণ ও হিংসা ত্যাগ করা।
- ব্যক্তিগত ও যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সার্বিক জাতীয় উন্নতিসাধন করা।
প্রত্যেক পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কর্তব্য তাঁর 6-14 বছর বয়স্ক শিশুর শিক্ষাদানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
4. ভারতবর্ষকে কেন সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বলা হয়েছে?
ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতবর্ষকে সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বভৌম – ভারতবর্ষ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চরম বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থার আদেশ, নির্দেশ অথবা অনুরোধ ভারত মানতে বাধ্য নয়।
সমাজতান্ত্রিক – রাষ্ট্র তথা সমাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদিত সম্পদ সমাজের সকলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করাকে সাধারণভাবে ‘সমাজতন্ত্র’ বলা হয়। কিন্তু ভারতে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত মালিকানানির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ – ভারতের নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই। বিশেষ কোনো ধর্মের হয়ে কথা বলা বা বিরোধিতা করা—কোনোটাই ভারত করে না। ভারতের প্রতিটি নাগরিক তাঁর নিজের বিশ্বাসমতো ধর্মাচরণ করতে পারেন।
গণতান্ত্রিক – ‘গণতন্ত্র’ বলতে জনগণের শাসনকে বোঝায়। ভারতের সংবিধানে গণতন্ত্র বলতে মূলত প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারকে বোঝানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভোট দিয়ে কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির আইনসভায় এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
সাধারণতন্ত্র – ভারতের শাসনব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনিও ভারতের জনগণ দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ভারতের শাসনতন্ত্রের উৎস ও রক্ষক হলেন জনগণ। এখানে বংশানুক্রমিক কোনো রাজা বা রানির স্থান নেই। সেজন্য ভারতবর্ষ হলো সাধারণতন্ত্র।
5. ভারতীয় গণপরিষদের গঠন ও কার্যাবলি আলোচনা করো।
অথবা, ভারতীয় গণপরিষদ কীভাবে গঠিত হয় আলোচনা করো। অথবা, ভারতীয় সংবিধান কীভাবে কার্যকর হয় তা আলোচনা করো।
দেশের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধি ও তাঁদের নিয়ে গঠিত পরিষদকেই বলা হয় গণপরিষদ।
ভারতীয় গণপরিষদ গঠন –
পটভূমি – জাতীয় কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তাদের জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করা। বহু আন্দোলনের পর শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার 1940 খ্রিস্টাব্দে ‘আগস্ট প্রস্তাব’ দ্বারা সেই দাবি মেনে নেয়। এরপর 1946 খ্রিস্টাব্দে ক্যাবিনেট মিশনের (মন্ত্রীমিশন) সিদ্ধান্তে সেই দাবিতে সিলমোহর পড়ে।
ক্যাবিনেট মিশনের সিদ্ধান্ত – ক্যাবিনেট মিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঠিক হয় 389 জন সদস্য নিয়ে ভারতীয়দের জন্য একটি গণপরিষদ গঠিত হবে। এর 292 জন প্রতিনিধিকে 11টি ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ থেকে নেওয়ার কথা বলা হয়। আবার এর মধ্যে 78 জন মুসলমান, 4 জন শিখ এবং 210 জন সাধারণ প্রতিনিধি হবেন। বাকি 93 জন সদস্য দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধি এবং 4 জন চিফ-কমিশনার শাসিত প্রদেশের প্রতিনিধি হবেন।
নির্বাচন – গণপরিষদ গঠনের জন্য 1946 খ্রিস্টাব্দের জুলাই-আগস্ট মাস নাগাদ নির্বাচন হয়। 296টি আসনের মধ্যে (4টি চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশসহ) কংগ্রেস পায় 208টি এবং মুসলিম লিগ পায় 73টি আসন। 9টি বাদে সব ক-টি সাধারণ আসন লাভ করে কংগ্রেস।
বাস্তবায়ন – এইভাবে ভারতের প্রথম গণপরিষদ গঠিত হয় এবং এর প্রথম অধিবেশন বসে 1946 খ্রিস্টাব্দের 9 ডিসেম্বর। 11 ডিসেম্বর এর স্থায়ী সভাপতি হন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।
গণপরিষদের কার্যাবলি –
- কমিটি গঠন – ভারতের সংবিধান রচনার জন্য ভারতীয় গণপরিষদ মোট 13টি কমিটি গঠন করে। এই কমিটিগুলির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য গঠিত হয় একটি ‘খসড়া কমিটি’।
- খসড়া কমিটি – খসড়া কমিটিতে ছিলেন 7 জন সদস্য। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ড. বি. আর. আম্বেদকর (ভীমরাও আম্বেদকর), কে. এম. মুন্সি (মূল টেক্সটে কে. এল. মুন্সি ছিল, সঠিক হবে কে. এম. মুন্সি), এন. গোপালস্বামী আয়েঙ্গার, আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আয়ার প্রমুখ। আম্বেদকর ছিলেন এই কমিটির সভাপতি।
- সংবিধান অনুমোদন – 1949 খ্রিস্টাব্দের 26 নভেম্বর ‘সংবিধানের খসড়া’ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও অনুমোদিত হয়। 1950 খ্রিস্টাব্দের 24 জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ অধিবেশন বসে।
- সংবিধান কার্যকর – 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়। এই সংবিধান অনুসারে ভারত একটি “সার্বভৌম-গণতান্ত্রিক-সাধারণতন্ত্র” (প্রজাতান্ত্রিক) রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
6. ভারতীয় গণপরিষদের প্রকৃতি আলোচনা করো।
ক্যাবিনেট মিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 1946 খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রাদেশিক আইনসভাগুলির সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়ে ভারতীয় গণপরিষদ গঠিত হয়। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ছিলেন ভারতীয় গণপরিষদের প্রথম স্থায়ী সভাপতি।
গণপরিষদের প্রকৃতি –
- আপসমুখিতা – ভারতীয় গণপরিষদ ছিল ইংরেজদের সঙ্গে কংগ্রেসের আপস-রফার ফসল।
- জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নয় – ভারতীয় গণপরিষদের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথমেই বলা দরকার যে, ভারতীয় গণপরিষদ একটি পূর্ণাঙ্গ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান ছিল না। কারণ এর সদস্যগণ ভারতীয়দের ভোটে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হননি। সে দিক দিয়ে বলা যায় যে, এই গণপরিষদ সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে আত্মপ্রকাশ করেনি।
- সর্বজনীন স্বীকৃত নয় – এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, এই গণপরিষদে ভারতের তৎকালীন সব রাজনৈতিক দলের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ভারতীয় গণপরিষদ সম্পূর্ণরূপে সর্বজনীন চরিত্রলাভে ব্যর্থ হয়।
- একদলীয় চরিত্র – মনে রাখতে হবে, ভারত বিভাজনের পর মুসলিম লিগের পাকিস্তানপন্থী প্রতিনিধিরা স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে ভারত রাষ্ট্রের গণপরিষদের অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন কংগ্রেসের। স্বভাবতই ভারতীয় গণপরিষদ কার্যত একটি একদলীয় সংস্থায় পরিণত হয়।
মন্তব্য – তাই অনেকেই ভারতীয় গণপরিষদ সম্পর্কে বলে থাকেন যে, গণপরিষদ হলো কংগ্রেস; আর কংগ্রেস ও গণপরিষদ হলো সমার্থক।
7. ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যকলাপের পরিচয় দাও।
ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যকলাপ – ভারতের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। তিনি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন। সংবিধান অনুসারে তিনি পাঁচ ধরনের কাজকর্ম বা ক্ষমতার অধিকারী—
- শাসনসংক্রান্ত,
- আইনসংক্রান্ত,
- অর্থসংক্রান্ত,
- বিচারসংক্রান্ত এবং
- জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত।
শাসনসংক্রান্ত – রাষ্ট্রপতির নামেই দেশের শাসনকাজ পরিচালিত হয়ে থাকে। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শমতো অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপাল, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ করেন। তিনি পদাধিকারবলে ভারতের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
আইনসংক্রান্ত – রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারে না। তিনি সংসদের অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত অথবা ভেঙে দিতে পারেন। তিনি সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দিতে পারেন আবার নাও পারেন (ভেটো ক্ষমতা)।
অর্থসংক্রান্ত – রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে সংসদে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব (বাজেট) পেশ করেন। তাঁর পূর্বানুমতি ছাড়া অর্থবিল সংসদে উত্থাপন করা যায় না।
বিচারসংক্রান্ত – রাষ্ট্রপতি যে-কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ডাদেশ কমাতে পারেন; অপরাধীর সাজা মকুব, স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তন করতে পারেন। এমনকি অপরাধীর ফাঁসি রদ করতে পারেন।
জরুরি অবস্থাসংক্রান্ত – রাষ্ট্রপতি কয়েকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। যেমন— যুদ্ধ, বিদেশি আক্রমণ বা সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে (জাতীয় জরুরি অবস্থা), কোনো রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে (রাষ্ট্রপতি শাসন), এবং দেশে চরম আর্থিক সংকট দেখা দিলে (আর্থিক জরুরি অবস্থা)।
8. রাজ্যের রাজ্যপালের কার্যকলাপের পরিচয় দাও।
রাজ্যপালের কার্যকলাপ – রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় সবার ওপরে রাজ্যপালের স্থান। তিনি রাজ্যের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশে রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য রাজ্যপালকে নিয়োগ করেন। তিনি রাজ্যের জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হন না। তিনিও পাঁচটি ক্ষমতা বা কাজকর্মের অধিকারী। যেমন— শাসনসংক্রান্ত, আইনসংক্রান্ত, অর্থসংক্রান্ত, বিচারসংক্রান্ত এবং স্বেচ্ছাধীন কাজকর্ম।
শাসনসংক্রান্ত – রাজ্যপালের নামেই রাজ্যের শাসন কাজ পরিচালিত হয়। তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। এ ছাড়াও তিনি রাজ্যের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ও সম্মানিত পদে ব্যক্তিদের নিয়োগ করেন।
আইনসংক্রান্ত – রাজ্য বিধানসভা বা আইনসভার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলেন রাজ্যপাল। তিনি রাজ্য আইনসভার অধিবেশন আহ্বান, মুলতুবি কিংবা স্থগিত রাখতে পারেন। তাঁর অনুমোদন ছাড়া বিধানসভায় গৃহীত কোনো বিল আইনে পরিণত হয় না।
অর্থসংক্রান্ত – রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়া কোনো অর্থবিল বিধানসভায় উত্থাপন করা যায় না। তিনি রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে রাজ্যের আয়ব্যয়ের হিসাব পেশ করেন।
বিচারসংক্রান্ত – রাজ্যপাল হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। তিনি রাজ্যের দেওয়ানি আদালত, জেলা জজ, দায়রা জজ প্রমুখকে নিয়োগ করেন।
স্বেচ্ছাধীন কাজকর্ম – রাজ্যপাল তাঁর বিশেষ স্বেচ্ছাধীন কাজকর্মের মাধ্যমে পাশের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনে, পৃথক উন্নয়ন পর্ষদ গঠনে ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের উন্নয়নে সক্রিয় হন।
9. ভারতীয় বিচারব্যবস্থার নিম্ন আদালতগুলির পরিচয় দাও।
ভারতের রাজ্যগুলিতে হাইকোর্টের নীচে বিচারকার্যগুলি সুসম্পন্ন করার জন্য রয়েছে বিভিন্ন নিম্ন আদালত। এই নিম্ন আদালতগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা—জেলা বিচারকের আদালত এবং মহানাগরিক বিচারকের আদালত।
গঠন ও কার্যাবলি – এই জেলা আদালতগুলিকে দুভাগে ভাগ করা হয়, যথা— দেওয়ানি আদালত এবং ফৌজদারি আদালত। জেলার দেওয়ানি আদালতগুলিকে 4টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা—
- জেলা বিচারকের আদালত – রাজ্যের প্রতিটি জেলায় থাকে একটি করে জেলা আদালত। এর অধীন রয়েছে মূল এলাকা ও আপিল এলাকা। এর প্রধান বিচারপতি হলেন District Judge বা জেলা বিচারক।
- অবর আদালত – জেলা আদালতের নীচে অবস্থান করে এই আদালতটি। এরও রয়েছে মূল এলাকা ও আপিল এলাকা।
- মহকুমা আদালত – অবর আদালতের নীচে অবস্থান করে মহকুমা আদালত বা মুন্সেফ আদালত।
- ন্যায় পঞ্চায়েত – দেওয়ানি আদালতের সর্বনিম্ন ‘একক’ হল ন্যায় পঞ্চায়েত।
আবার জেলার ফৌজদারি আদালতগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা—দায়রা আদালত, অবর ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত ও পঞ্চায়েত আদালত।

10. ভারতীয় সংসদের দুটি কক্ষের গঠনতন্ত্র বর্ণনা করো।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়। এই সংবিধান অনুসারে ভারতীয় প্রতিনিধিসভা বা পার্লামেন্ট বা সংসদ গড়ে ওঠে।
ভারতীয় সংসদের গঠনতন্ত্র –
ভারতের পার্লামেন্ট বা সংসদের দুটি ভাগ, যথা—রাজ্যসভা বা উচ্চকক্ষ এবং লোকসভা বা নিম্নকক্ষ।
রাজ্যসভা – রাজ্যসভার মোট সদস্য 250 জন। এর 238 জন সদস্য রাজ্য বিধানসভার সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হন। বাকি 12 জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি (80/3 নং ধারা) বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে মনোনয়ন করে থাকেন। প্রতি 2 বছর অন্তর রাজ্যসভার 1/3 অংশ সদস্য অবসর গ্রহণ করেন। রাজ্যসভায় অর্থবিল ছাড়া সমস্ত বিল উত্থাপন করা যায়। উল্লেখ্য যে, রাজ্যসভার সদস্য হতে গেলে ন্যূনতম 30 বছর বয়স হতে হবে।
লোকসভা – ভারতীয় সংবিধানের 81 নং ধারায় বলা হয়েছে যে, লোকসভায় অনধিক 550 জন সাংসদ রাজ্যের লোকসভা কেন্দ্রগুলি থেকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। এই ধারা অনুযায়ী, 500 জন সাংসদ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং বাকি 20 জন সাংসদ নির্বাচিত হবেন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে। এ ছাড়া 2 জনকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করতে পারেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায় থেকে। কমপক্ষে 25 বছর বয়সি ভারতীয় নাগরিক লোকসভার সদস্য হতে পারেন। লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার।
কেন্দ্রীয় সরকারের আইন প্রণয়নের যাবতীয় কাজ করেন রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যসভা ও লোকসভার সদস্যগণ।
11. পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
অথবা, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে?
ভারতের শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আঞ্চলিক বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন। পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা দুটি ভাগে বিভক্ত। (ক) গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা। (খ) পৌর স্বায়ত্তশাসন-ব্যবস্থা।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ আধিকারিকদের পদ মহিলা ও তফশিলি জাতি উপজাতি আইনানুসারে সংরক্ষণ নীতি কার্যকরী।
গ্রামীণ স্বায়ত্ত শাসনব্যবস্থা – গ্রামীণ স্বায়ত্ত শাসনব্যবস্থা পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নামে পরিচিত।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত — গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলাপরিষদ।
গ্রাম পঞ্চায়েত –
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর হল গ্রাম পঞ্চায়েত। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কয়েকটি গ্রামকে নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে একজনকে প্রধান ও আর-একজনকে উপপ্রধান নির্বাচিত করেন। আইন অনুসারে পঞ্চায়েতে প্রতিমাসে অন্তত একবার সভা ডাকা বাধ্যতামূলক। সভায় সভাপতিত্ব করেন গ্রাম প্রধান।
গঠন –
- প্রার্থীদের অধীনস্থ পঞ্চায়েত এলাকার ভোটার হতে হবে।
- কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কোনো কর্মী পঞ্চায়েতে প্রার্থী হতে পারবে না।
- সদস্যরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন।
সদস্য/সদস্যাদের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর।
পঞ্চায়েত সমিতি –
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তর হল পঞ্চায়েত সমিতি। কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি ও একজন সহসভাপতি নির্বাচিত করেন। পঞ্চায়েত আইন অনুসারে প্রতি তিন মাস অন্তর সমিতির সভা ডাকা হয়।
গঠন – গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অনুরূপ গঠন প্রণালী পঞ্চায়েত সমিতিতে কার্যকর।
জেলা পরিষদ – পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তৃতীয় স্তর হল জেলাপরিষদ। জেলাপরিষদদের প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রার্থীদের গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থীর সমতুল্য যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। আইন অনুসারে জেলাপরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্য থেকে একজন সভাধিপতি ও একজন সহসভাধিপতি নির্বাচন করেন। সভাপতি ও সহসভাধিপতি পূর্ণ সময়ের জন্য নিযুক্ত হন।
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের নবম অধ্যায়, “ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন