আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের নবম অধ্যায়, “ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ কেন?
1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকরী করা হয়। ওই দিন ভারতবর্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
- ঐতিহাসিক গুরুত্ব – 1929 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরুর প্রস্তাব মতো 1930 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। এই প্রথা 1947 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি পর্যন্ত চালু ছিল।
- প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে গুরুত্ব – 1947 খ্রিস্টাব্দে ভারত স্বাধীনতা লাভ করলে 26 জানুয়ারি দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণ করে জাতীয়তাবাদী নেতারা দিনটিকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকরী হয় এবং ওই দিনটি প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়।
2. ভারতকে কেন গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হয়? দেশ পরিচালনায় সংবিধানের ভূমিকা কী?
- গণতান্ত্রিক দেশ – ভারতকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ বলা হয়। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক (অর্থাৎ, 18 বছর বা তার বেশি) ভারতীয় নাগরিকের ভোটে এখানে সরকার গঠিত হয়। ভারতের মানুষ দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে।
- যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশ – ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রয়েছে। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রে একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং 29টি রাজ্যে রয়েছে রাজ্য সরকার। ক্ষমতা বণ্টন করা হয়েছে 97টি কেন্দ্রীয় তালিকা ও 62টি রাজ্য তালিকা অনুযায়ী।
- সংবিধানের ভূমিকা – কোনো দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো, দেশের মানুষ ও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের সংবিধানের ওপর। সংবিধান ছাড়া কোনো দেশ চলতে পারে না। সংবিধানই হল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। শাসন, বিচার, পররাষ্ট্রনীতি—সব কিছুই চলে সংবিধান অনুসারে। যদি তা না হত, তাহলে দেশে অরাজকতা চলত। কেউ কাউকে বা কোনো আইনকে তোয়াক্কা করত না। সংবিধান আছে বলে দেশ চলছে, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় আছে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত আছে।
3. ভারতকে সার্বভৌম ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয় কেন?
ভারত সার্বভৌম ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র
- সার্বভৌম – ভারত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চরম বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থার আদেশ, নির্দেশ বা অনুরোধ ভারত মানতে বাধ্য নয়।
- সমাজতান্ত্রিক – সাধারণভাবে উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর রাষ্ট্র তথা সমাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর সমান বণ্টনকে সমাজতন্ত্র বোঝায়। কিন্তু ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সমাজতান্ত্রিক শব্দটি যুক্ত হয়েছে অন্য অর্থে। এখানে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানানির্ভর মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এইসব কারণে ভারত হল একটি সার্বভৌম ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
4. ভারতকে ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ বলা হয় কেন?
1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি ভারতের সংবিধান কার্যকরী করার সময় থেকে ভারতকে ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করা হয়। ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ শব্দ দুটির মধ্যে রয়েছে সামাজিক, নৈতিক ও জনকল্যাণের ধারণা।
- গণতান্ত্রিক – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের ভাষায় গণতন্ত্র হল—জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা ও জনগণের শাসন। ভারতের ক্ষেত্রে জনগণই হল সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস। সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয়। সুতরাং, ভারত হল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
- প্রজাতন্ত্র – ভারতে কোনো বংশানুক্রমিক রাজপদ বা রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই। এখানে জনপ্রতিনিধিমূলক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।
5. ভারতের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ আদর্শ কেন গ্রহণ করা হয়েছে?
অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতে নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক মিলনে এক বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রবাহমান ধারাকে বজায় রাখতে ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো একটি বিশেষ ধর্মকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পক্ষপাতিত্ব অথবা বিরোধিতা—কোনোটিই করবে না। ভারতের প্রত্যেক নাগরিক ধর্মীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন।
6. ভারতীয় সংবিধানে উল্লিখিত ‘প্রস্তাবনার’ উদ্দেশ্য কী ছিল?
ভারতীয় সংবিধান মার্কিন সংবিধানের প্রস্তাবনার অনুকরণে সৃষ্টি। প্রস্তাবনা থেকে সংবিধান রচয়িতাদের উদ্দেশ্য এবং সংবিধানের আদর্শ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। প্রস্তাবনাকে বলা হয় ‘সংবিধানের বিবেক’ বা ‘সংবিধানের আত্মা’। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্র’ বলা হয়েছিল। কিন্তু 1976 খ্রিস্টাব্দে 42তম সংবিধান সংশোধনীতে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আদর্শ দুটি যুক্ত হয়ে ভারত ‘সার্বভৌম’, ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘গণতান্ত্রিক’, সাধারণতন্ত্র রূপে পরিগণিত হয়েছে।
7. ‘সংবিধান সভা’ বলতে কী বোঝো? এই সভার কাজ কী?
ভারতের সংবিধান রচনা করার জন্য বিভিন্ন প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সভাকে সংবিধান সভা বা পরিষদ বলা হয়। এটি ‘গণপরিষদ’ নামেও পরিচিত। 1946 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার সংবিধান সভা গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ওই বছরের ডিসেম্বরে দিল্লির ‘কনস্টিটিউশন হলে’ সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল 389।
ভারতের জন্য একটি সংবিধান তৈরি করাই হল সংবিধান সভার কাজ।
8. ভারতীয় গণতন্ত্রের ত্রুটিগুলি উল্লেখ করো।
এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতীয় সংবিধান রচিত হলেও, সমালোচকগণ এর মধ্যে নানান ত্রুটি লক্ষ করেছেন।
- অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দেখা দিয়েছে ধনবৈষম্য ও অর্থনৈতিক শোষণ। মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি শ্রেণি ভারতের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করার ফলে ভারতীয় সমাজজীবনে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
- অস্পৃশ্যতা নামক অভিশাপ এখনও ভারতীয় জনজীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। বিহারের হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ আজও বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় কর্তৃক পদদলিত হচ্ছে।
- ভারতে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
- ভারতে ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র’ সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কারণ নির্বাচনে দলীয় কারচুপি অবাধ নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে।
- আবার, কখনো-কখনো সরকার ‘অর্ডিন্যান্স’ (এসমা, মিসা) প্রয়োগ করে মানুষের কিছু মৌলিক অধিকার বাতিল করেছে।
9. ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ কী নামে পরিচিত? কে এই সভাকে পরিচালনা করেন? এই সভা কীভাবে গঠিত হয়?
ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষকে বলা হয় রাজ্যসভা। এই সভা পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি পরিচালনা করেন। এই সভার গঠন—
- অনধিক 250 জন সদস্য/সদস্যাকে নিয়ে গঠিত হয় রাজ্যসভা।
- বিভিন্ন ক্ষেত্রের বারোজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করেন।
- এই সভার সদস্যদের ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
- ন্যূনতম বয়স হতে হবে 30 বছর।
- রাজ্যসভা স্থায়ী সভা। সদস্যরা ছ-বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
10. কেন্দ্রীয় আইনসভা – টীকা লেখো।
কেন্দ্রীয় আইনসভা – ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা রাষ্ট্রপতি ও দু-কক্ষবিশিষ্ট একটি আইনসভা নিয়ে গঠিত।
উচ্চকক্ষ – কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চকক্ষকে ‘রাজ্যসভা’ বলা হয়। ভারতীয় সংবিধান অনুসারে অনধিক 250 জন সদস্য নিয়ে রাজ্যসভা গঠিত হয়। রাজ্যসভার সদস্যরা ছ-বছরের জন্য নির্বাচিত হন। পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন।
নিম্নকক্ষ – কেন্দ্রীয় আইনসভার নিম্নকক্ষকে ‘লোকসভা’ বলা হয়। সংবিধানে বর্তমান লোকসভার সদস্যসংখ্যা 552 করা হয়েছে। সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষভাবে জনগণের দ্বারা লোকসভার প্রায় সকল সদস্য পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ বা স্পিকার।
কাজ – কেন্দ্রীয় আইনসভা আইন রচনা, সংবিধান সংশোধন, করের হার নির্দিষ্ট করা প্রভৃতি নানা কাজ করে থাকে।
11. সরকারের কয়টি ভাগ? এগুলির কোনটি কী কাজ করে? বিচার বিভাগকে কেন আলাদা করে রাখা হয়?
একটি সরকারের তিনটি ভাগ বা স্তম্ভ। সেগুলি হল—আইন, বিচার ও শাসনবিভাগ।
- আইন বিভাগের কাজ হল দেশ পরিচালনা করার জন্য আইন তৈরি করা। বিচার বিভাগের কাজ হল দেশের সংবিধান অনুসারে বিচার কাজ চলছে কি না তা দেখা। শাসনবিভাগের কাজ হল আইন মোতাবেক দেশ শাসন করা।
- দেশের বিচার বিভাগকে অন্য দুটি বিভাগ থেকে আলাদা করে রাখা হয়। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। দেশের মানুষ যাতে সুবিচার পায়, সেখানে যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে, আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যেন কোনো অপরাধী বেরিয়ে যেতে না পারে, সেদিক থেকে যত্নবান হতে হয়। দেখতে হয় জনগণ সুবিচার পাচ্ছে কি না। বিচারব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্র বলে কিছু হয় না।
12. সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতাগুলি কী কী?
ভারতীয় বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ নাম হল সুপ্রিমকোর্ট। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্ট একজন প্রধান বিচারপতি ও 25 জন সহকারী বিচারপতি নিয়ে গঠিত। প্রয়োজনে বিচারপতিদের সংখ্যা পরিবর্তন করার ক্ষমতা ভারতীয় সংবিধানের আছে। এ ছাড়া সংবিধানের 128 নং ধারা অনুযায়ী অস্থায়ী বিচারপতিও রাখা হয়। সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি স্বয়ং।
ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের চার ধরনের ক্ষমতা আছে, যথা—
- ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট হল ভারতীয় সংবিধানের বিশ্লেষক ও রক্ষক। রাজ্যের সঙ্গে রাজ্যের বা রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের বিরোধ সুপ্রিমকোর্ট নিষ্পত্তি করে।
- হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপিলগুলি সুপ্রিমকোর্ট তার ক্ষমতা বলে বিচার করতে পারে।
- আইন সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট তার ব্যাখ্যা ও রায় জানতে চাইতে পারে।
- কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে সুপ্রিমকোর্ট তার বিশেষ ক্ষমতা বলে আদেশ বা নির্দেশ জারি করতে পারে।
13. পশ্চিমবঙ্গের স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা তালিকার মাধ্যমে প্রকাশ করো।

14. পৌরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি কী কী কাজ করে?
পৌরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েত হল স্বায়ত্বশাসনমূলক দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ হল—
পৌরসভা – পৌরসভা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সেবামূলক বিভিন্ন কাজ করে। যেমন, এলাকার রাস্তাঘাট ঠিক করা, পানীয় জলের সমস্যা দূর করা, রাস্তা আলোকিত করা, এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বৃক্ষরোপণ করে পরিবেশ উন্নত করা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি উন্নত করা, এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা ইত্যাদি। এক কথায় পৌর এলাকার মানুষ পৌর পরিসেবা ঠিকমতো পাচ্ছে কি না সেদিকে নজর দেওয়া।
গ্রাম পঞ্চায়েত – গ্রামের উন্নয়ন পরিচালনা তথা দেখভাল করে গ্রাম পঞ্চায়েত। এর অধীন রয়েছে পঞ্চায়েত প্রধান, গ্রাম সংসদ ও অন্যান্য সভা। এরা তাদের জন্য নানাবিধ কাজ করে। যেমন—পানীয় জল সরবরাহ করা, রাস্তাঘাট তৈরি করা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলি সমৃদ্ধ করা, বনসৃজন ঘটানো ইত্যাদি।
15. পৌরসভা কীভাবে গড়ে ওঠে?
প্রতিটি পৌর অঞ্চলকে কতগুলি ওয়ার্ড-এ ভাগ করা হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
কাউন্সিলর – পৌরসভার নির্বাচিত সদস্যদের ‘কাউন্সিলর’ বলা হয়। কোনো ব্যক্তি ওই এলাকার ভোটার হলেই এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন। গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের মতোই কাউন্সিলরদের যোগ্যতা থাকতে হয়।
পৌরসভা – পৌর এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত পরিষদকে ‘পৌরসভা’ বলা হয়। কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত এই পরিষদের কার্যকাল 5 বছর। কাউন্সিলর পরিষদ নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে ভাইস-চেয়ারম্যানরূপে নির্বাচন করে।
16. সরকার নির্ধারিত অনগ্রসরতার মাপকাঠিগুলি কী?
অনগ্রসরতার মাপকাঠি – সরকার নির্ধারিত অনগ্রসরতার কয়েকটি মাপকাঠি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। যেমন—
- যাঁরা সমাজের নীচুস্তরে অবস্থান করেন।
- যাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলন কম।
- যাঁদের মধ্যে অতিঅল্পসংখ্যক ব্যক্তি সরকারি চাকরি পেয়েছেন এবং
- যাঁদের মধ্যে শিল্পবাণিজ্যের প্রসার কম। ওপরের মাপকাঠির অধীন মানুষদের অনগ্রসর জাতি ও উপজাতি বলা হয়।
17. সংখ্যালঘু জনজাতি সম্পর্কে কী জান?
সংখ্যালঘু জনজাতি সমাজে সংখ্যার ভিত্তিতেই ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
সংবিধান অনুযায়ী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার রক্ষা করা। রাষ্ট্র সংখ্যালঘু নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সুনিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ। পাশাপাশি, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা প্রদান করাও সরকারের অপরিহার্য কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এছাড়া, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্তরে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সরকারের দায়িত্ব।
মন্তব্য – সংখ্যার ভিত্তিতে সংখ্যালঘু ধারণা ব্যবহার হয়নি। ভাষার দিক দিয়ে সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে যেমন — সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ‘অলচিকি’ লিপিকে ভারতের সংবিধানে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
18. রাজ্যসভায় কে সভাপতিত্ব করেন? ওই সভার সদস্য সংখ্যা কত? উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর কী কী যোগ্যতা থাকা দরকার?
রাজ্যসভায় উপরাষ্ট্রপতি পদাধিকার বলে সভাপতিত্ব করেন। রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল—250 জন। উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর যোগ্যতা নিম্নরূপ –
- ভারতের নাগরিক হতে হবে।
- ন্যূনতম বয়স হতে হবে 35 বছর।
- রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকা চাই।
- কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকা চলবে না।
19. কেন্দ্রীয় আইনসভা কীভাবে গঠিত হয়? লোকসভায় কে সভাপতিত্ব করেন? লোকসভার গঠন প্রণালী লেখো।
রাষ্ট্রপতি ও সংসদের দুটি কক্ষ—রাজ্যসভা এবং লোকসভা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠিত হয়। লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন ‘স্পিকার’ বা ‘অধ্যক্ষ’। লোকসভার গঠন প্রণালী ভারতের লোকসভা অনধিক 552 জন সদস্য নিয়ে গঠিত হতে পারে। সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের মাধ্যমে লোকসভার সদস্যরা নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি 2 জন ইঙ্গ-ভারতীয় সদস্য মনোনীত করেন। সদস্যদের মধ্য থেকে এবং সদস্যদের ভোটে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। লোকসভার সদস্য পদের প্রার্থীকে কমপক্ষে 25 বছর বয়স্ক হতে হবে। তিনি অবশ্যই ভারতীয় নাগরিক হবেন। লোকসভার সদস্যরা 5 বছরের জন্য নির্বাচিত হন। লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা গোষ্ঠীর নেতা হন ‘প্রধানমন্ত্রী’। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সভার কাজ পরিচালনা করেন।
20. রাজ্যের আইনসভা কীভাবে গঠিত হয়? বিধানসভার গঠন প্রণালী আলোচনা করো।
ভারতের সংবিধান অনুসারে প্রতিটি রাজ্যে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি করে আইনসভা রয়েছে। কোনো রাজ্যের আইনসভা এক কক্ষযুক্ত আবার কোনো রাজ্যের দ্বিকক্ষযুক্ত আইনসভা রয়েছে। এক কক্ষযুক্ত আইনসভার নাম বিধানসভা। দ্বিকক্ষযুক্ত আইনসভায় উচ্চকক্ষ হল বিধান পরিষদ ও নিম্নকক্ষ হল বিধানসভা। পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট। রাজ্যের আইনসভা রাজ্যপাল, বিধানসভা এবং বিধান পরিষদ নিয়ে গঠিত হয়।
বিধানসভার গঠন প্রণালী –
- 25 বছর বা তার বেশি যে-কোনো ভারতীয় নাগরিক বিধানসভার সদস্য হওয়ার যোগ্য।
- সাধারণভাবে বিধানসভার মেয়াদকাল 5 বছর। তবে রাজ্যপাল মনে করলে তার আগেও বিধানসভা ভেঙে দিতে পারেন।
- বিধানসভার সদস্যরা প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন।
- রাজ্যপাল 1 জন ইঙ্গ-ভারতীয় সদস্য মনোনীত করেন।
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের নবম অধ্যায়, “ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন