আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের নবম অধ্যায়, ‘ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার’-এর ‘বিষয়সংক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই অংশটি পড়ার ফলে অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়াবলি বুঝতে সুবিধা হবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

সংবিধান
সংবিধান হল কতগুলি আইনের সমষ্টি। ভারতের গণপরিষদ ভারতের সংবিধান রচনা করে। এই সংবিধান 1949 খ্রিস্টাব্দের 26 নভেম্বর গৃহীত হয় এবং 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি কার্যকর হয়।
সংবিধানের প্রস্তাবনা
সংবিধানের প্রস্তাবনাকে সংবিধানের বিবেক বা সংবিধানের আত্মা বলা হয়। এই প্রস্তাবনায় ভারতকে সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বলা হয়। 1976 খ্রিস্টাব্দে সংবিধানের 42তম সংশোধনীতে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ দুটি যুক্ত হয়েছে। এই সংবিধান রচনার কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন ড. বি আর আম্বেদকর।
কেন্দ্রীয় শাসন বিভাগ
গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থার উৎস ও রক্ষক জনগণ। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে কেন্দ্রের শাসন বিভাগ গঠিত হয়।
- ভারত রাষ্ট্রের প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি এক বিশেষ পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ।
- রাষ্ট্রপতির পরেই উপরাষ্ট্রপতির স্থান। তিনি পদাধিকার বলে রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি হন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান।
- রাষ্ট্রপতি ও দু-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, যথা—লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদ গঠিত। কেন্দ্রীয় আইনসভা আইন রচনা, সংবিধান সংশোধন, করের হার নির্দিষ্ট করা প্রভৃতি নানা কাজ করে থাকে।
রাজ্যসভা
কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চকক্ষকে ‘রাজ্যসভা’ বলা হয়। রাজ্যসভার সদস্যরা 6 বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুসারে অনধিক 250 জন সদস্য নিয়ে রাজ্যসভা গঠিত হয়।
লোকসভা
কেন্দ্রীয় আইনসভার নিম্নকক্ষকে ‘লোকসভা’ বলা হয়। লোকসভার সদস্যরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষভাবে জনগণের দ্বারা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুসারে লোকসভার সর্বাধিক সদস্যসংখ্যা 552। লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ বা স্পিকার।
ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান হলেও প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচালক। তাঁর পরামর্শমতো রাষ্ট্রপতি অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।
রাজ্যের আইনসভা
আইনসভা এককক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হতে পারে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম বিধান পরিষদ ও বিধানসভা। পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা হল এককক্ষবিশিষ্ট বিধানসভা।
রাজ্যপাল ও বিধানসভা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা গঠিত।
রাজ্যের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হলেন রাজ্যপাল। তিনি রাজ্যের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হন না। তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত হন।
বিধানসভা
সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে বিধানসভার সদস্যগণ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রধান হলেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হলেন যথাক্রমে, শ্রী প্রফুল্ল ঘোষ এবং শ্রীমতী মমতা ব্যানার্জি।
আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা
ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। এই শাসনব্যবস্থায় সাধারণ জনগণ তাঁদের স্থানীয় অঞ্চলে সরাসরি অংশ নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা গ্রামীণ ও পৌর দুটি ভাগে বিভক্ত। গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা ‘পঞ্চায়েত ব্যবস্থা’ এবং নগর স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা ‘পৌরব্যবস্থা’ নামে পরিচিত।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থা
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তিনটি স্তর রয়েছে, যথা— গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ।
- পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর হল ‘গ্রাম পঞ্চায়েত’। কতগুলি পরপর সংলগ্ন গ্রাম বা গ্রামের সমষ্টি নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা নির্ধারিত হয়।
- কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ব্লক বা পঞ্চায়েত সমিতি গঠিত হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের মতোই পাঁচ বছরের জন্য পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যরা নির্বাচিত হন। সমিতির সভায় সাধারণত সভাপতিত্ব করেন সভাপতি।
- গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যদের মতোই পাঁচ বছরের জন্য জেলা পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হন। জেলা পরিষদের সভায় সাধারণত সভাধিপতি সভাপতিত্ব করেন।
পৌরব্যবস্থা
প্রতিটি পৌর অঞ্চলকে কতগুলি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পৌর এলাকার কাউন্সিলরদের নিয়ে পৌরসভা গঠিত হয়। পৌরসভার সভায় সাধারণত সভাপতিত্ব করেন চেয়ারম্যান।
অনগ্রসর নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সংবিধান
ভারতে তফশিলি জাতি, হরিজন ও দলিত মানুষদের সামাজিকভাবে অস্পৃশ্য বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। সামাজিক অস্পৃশ্যতার সমস্যাকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে প্রথম জুড়ে দেন মহাত্মা গান্ধী। দলিতদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়।
মৌলিক অধিকার
ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের 6টি মৌলিক অধিকার, যথা—সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার স্বীকৃত।
অধিকার লাভের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের কিছু কর্তব্য রয়েছে। যেমন—জাতীয় পতাকা ও জাতীয় স্তোত্রের প্রতি সম্মান দেখানো, জাতীয় সেবামূলক কাজের আহ্বানে সাড়া দেওয়া, সার্বিক জাতীয় উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে চলা, 6 থেকে 14 বছর বয়স্ক সন্তান বা পোষ্যের শিক্ষার যথোচিত সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা প্রভৃতি।
পদ্ধতি
প্রথমে একটি বড়ো কলসি রাখা হত। সেই কলসিতে তারা ভোট দিত। ব্যালট পত্র হিসেবে ব্যবহার করা হত খোলামকুচি। তাতে তারা তাদের পছন্দের শাসকের পক্ষে নির্দিষ্ট চিহ্ন এঁকে দিত। ভোট শেষ হলে কলসি ভাঙা হত। যে ব্যক্তি বেশি খোলামকুচি পেতেন, তিনিই বিজয়ী হতেন এবং শাসক নির্বাচিত হতেন।
আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের নবম অধ্যায়, “ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার”-এর “বিষয়সংক্ষেপ” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাটি অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো সহজে বুঝতে সাহায্য করবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, মতামত জানাতে চাও বা আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো কিংবা আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারো—তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।





মন্তব্য করুন