আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, “জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. ‘ইলবার্ট বিল’ কী? এই বিলের বিরুদ্ধে কারা আন্দোলন করেন?
1873 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার ‘কোড অব ক্রিমিনাল-ল’ পাস করে। এই আইন দ্বারা ইউরোপীয় ম্যাজিস্ট্রেটগণ চরম ক্ষমতার অধিকারী হন। ভারতীয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ কোনো ইংরেজ আসামির বিচার করতে পারতেন না। এই বৈষম্য দূর করার জন্য 1883 খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড রিপনের উদ্যোগে এবং স্যার পি. ইলবার্টের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সুপারিশগুলি ‘ইলবার্ট বিল’ নামে খ্যাত, যাতে পূর্ব অনুসৃত ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বৈষম্য দূর করা হয়।
‘ইলবার্ট বিল’ পাস হলে ইউরোপীয় বিচারকদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি জে. ব্রানসনের নেতৃত্বে কেলভিন, জে. কেসুইক প্রমুখ বিচারপতি ইউরোপীয়দের নিরাপত্তা বিধানের জন্য গড়ে তোলেন ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’।
2. ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন কার নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল? ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? কাদের উদ্যোগে কলকাতায় সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়? এই সভায় কে সভাপতিত্ব করেন?
1876 খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারতসভা তৈরি হয়।
ভারতসভা প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল—
- ভারতব্যাপী শক্তিশালী জনমত গঠন করা।
- ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার করা।
- দেশবাসীকে গণআন্দোলনে শামিল করা।
- সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার বয়স 19 থেকে বাড়িয়ে 23 করা ইত্যাদি।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর উদ্যোগে 1883 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সর্বভারতীয় সম্মেলন বা জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন রামতনু লাহিড়ী।
3. ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
1876 খ্রিস্টাব্দে ‘রাষ্ট্রগুরু’ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য –
ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল—
- ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা।
- হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলা।
- সারা ভারতে জনমুখী আন্দোলন গড়ে তুলে একটি শক্তিশালী জনমত গঠন করা।
- সরকারের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল আইনের (যেমন—সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন, অস্ত্র আইন, সিভিল সার্ভিস বিরোধী আইন) বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা।
4. লর্ড লিটনের দমনমূলক আইনগুলির পরিচয় দাও।
সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড লিটন (1876-1880 খ্রিস্টাব্দ) ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এর জন্য তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলি নিয়ে সংবাদপত্রগুলি লিটনের সমালোচনা শুরু করে। ক্ষুব্ধ লিটন এই বিষয়ে একটি আইন জারি করেন।
দেশীয় মুদ্রণ আইন – 1878 খ্রিস্টাব্দে ‘Vernacular Press Act’ জারি করে তিনি দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করেন। আইনে বলা হয়, দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি সরকার বিরোধী কোনো বক্তব্য প্রচার করতে পারবে না। এই আইন অমান্য করলে সংবাদপত্রের ছাপাখানা সরকার বাজেয়াপ্ত করবে।
অস্ত্র আইন – ভারতীয়দের ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ দমন করার জন্য লর্ড লিটন অস্ত্র আইন জারি করেন (1878 খ্রিস্টাব্দ)। এই আইনে ভারতীয়দের নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখার জন্য সরকারের কাছে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
5. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
কংগ্রেসের উদ্দেশ্য – জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কংগ্রেস তার চারটি মূল উদ্দেশ্য ঘোষণা করে। এগুলি হল —
- ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ সেবকদের সঙ্গে সৌহার্দ্য স্থাপন করা।
- বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করে প্রাদেশিকতার মনোভাব দূর করা।
- শিক্ষিত কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাজসংস্কারের উপায় নির্ধারণ করা,
- পরবর্তী এক বছরের জন্য কংগ্রেসের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
এই উদ্দেশ্যে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে 9টি প্রস্তাব সরকারের নিকটে পেশ করা হয়, যেমন —
- ভারতীয় প্রশাসনের তদন্তের জন্য একটি রাজকীয় কমিশন গঠন,
- ভারত সচিবের পরামর্শ সভার বিলুপ্তি,
- উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পাঞ্জাব ও অযোধ্যায় আইনসভা গঠন,
- সামরিক ব্যয় হ্রাস,
- উচ্চ রাজকার্যে নিয়োগের জন্য একই সঙ্গে ভারত ও ইংল্যান্ডে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
6. তোমার কি মনে হয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল উচ্চবর্গের মানুষের সংগঠন?
আঞ্চলিক স্বার্থ দূর করে গণতান্ত্রিক ও সার্বিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে কংগ্রেস পরিচালিত হবে বলে সূচনায় নেতারা আশা করেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয়, গোড়া থেকেই কংগ্রেসের মধ্যে নানান দুর্বলতা ছিল।
- সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব কংগ্রেসের মধ্যে ছিল না।
- তা ছাড়া, আঞ্চলিক, লিঙ্গগত, শ্রেণিগত প্রতিনিধিত্ব সমান ছিল না। কংগ্রেসের নেতারা উচ্চবর্গের হওয়ার ফলে তাদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা খুব প্রখর ছিল। সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ এবং তাদের অভাব অভিযোগ কংগ্রেসের মূলদাবির অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
- ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উঁচু পেশার মানুষ কংগ্রেসের নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন।
- ভৌগোলিক দিক থেকে দেখলে বোম্বাই প্রদেশের নেতারা কংগ্রেসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের 72 জনের মধ্যে 38 জন ছিলেন বোম্বাই প্রেসিডেন্সির।
- জাতীয় কংগ্রেস দেশের সকল শ্রেণির সংগঠন বলে দাবি করলেও কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির শিক্ষিত পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও জমিদার ছিল এই সংগঠনের প্রধান স্তম্ভ।
- কংগ্রেসের উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কংগ্রেসের সব আন্দোলনই উচ্চশ্রেণির স্বার্থের দিকে তাকিয়ে পরিচালিত হত। এর ফলে কংগ্রেস তার আন্দোলন ও কর্মসূচিগুলিতে জাতীয় চরিত্র হারিয়েছিল।
7. জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কাদের কেন চরমপন্থী বলা হয়? তাঁদের লক্ষ্য কী ছিল?
জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয় আন্দোলনের (1885-1905 খ্রিস্টাব্দ) লক্ষ্য ও কার্যকলাপ নিয়ে কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। ফলে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে উদ্ভব হয় একটি নতুন গোষ্ঠী, যাঁরা কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদন নীতি ও রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তির ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। তাঁদের বলা হয় ‘চরমপন্থী’।
এই চরমপন্থায় বিশ্বাসী কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন লালা লাজপৎ রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ।
এই চরমপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রশ্নে চারটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছিলেন। যেমন—
- ভারতের ঐতিহ্যশালী ও সনাতন সংস্কৃতির ওপর আস্থা রেখে জাতীয় আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা।
- তাদের লক্ষ্যই ছিল—‘ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণমুক্ত পূর্ণ স্বাধীনতা’।
- ভারতবাসীকে জাতীয়তাবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল আন্দোলনে অবতীর্ণ করা।
- আবেদন-নিবেদন নীতি ত্যাগ করে আত্মশক্তি দিয়ে ও আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করা।
8. ‘নরমপন্থী’-দের দাবি ও কর্মসূচি কী ছিল?
নরমপন্থীরা মনে করতেন ব্রিটিশ শাসক ছিল ‘বিধির বিধান’। তাঁরা চাইতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও শাসনের আওতায় থেকে ভারত আংশিক স্বশাসন ভোগ করুক। নরমপন্থীরা আশা করতেন, একসময় ভারতবাসীরা স্বশাসনের উপযুক্ত হয়ে উঠবে এবং সেই সময় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ভারতীয়দের স্বশাসনের দাবি স্বীকার করে নেবে। নরমপন্থীরা বেশ কয়েকটি দাবি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।
দাবি –
- আইনসভাগুলিতে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।
- কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার বিশেষ সম্প্রসারণ।
- আইনসভার সদস্যদের নির্বাচন।
- সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের নিয়োগ বৃদ্ধি।
- সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার বয়স 19-এর বদলে 23 বছর ও ভারতে এই পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কর্মসূচি –
- প্রথম দিকে কংগ্রেসের কার্যক্রম ছিল বার্ষিক অধিবেশনকেন্দ্রিক।
- ব্রিটিশ শাসকের কাছে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে দাবি উপস্থাপিত করা।
- কিছু প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করা।
- সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া ইত্যাদি।
9. নরমপন্থীদের সঙ্গে চরমপন্থীদের পার্থক্যগুলি লেখো।
নরমপন্থীদের সঙ্গে চরমপন্থীদের পার্থক্য –
- নরমপন্থীরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। অপরদিকে চরমপন্থীরা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে আন্দোলন করতেন।
- নরমপন্থীরা পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের কথা বলতেন না। তাঁরা স্বশাসনের কথা বলতেন। চরমপন্থীরা ‘স্বরাজ’-এর কথা বলতেন। ‘স্বরাজ’-এর অর্থ পূর্ণ স্বাধীনতা বা চরম স্বাধীনতা।
- নরমপন্থীরা উচ্চবর্ণের মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতেন। সাধারণ মানুষের কথা, তাদের দাবি ও কর্মসূচিতে স্থান পায়নি। কিন্তু চরমপন্থীরা ধর্মের পরিচয়কে গুরুত্ব দিতেন। কৃষক, ছাত্র, যুবক প্রভৃতি শ্রেণির দাবিও চরমপন্থীদের কর্মসূচিতে স্থান পেত।
- নরমপন্থীরা দেশীয় শিক্ষা, দেশীয় শিল্প, দেশীয় বস্ত্রের বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন না। অপরদিকে চরমপন্থীরা এই বিষয়গুলিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
- নরমপন্থী নেতারা ইংরেজি শিক্ষা থেকে পাওয়া জাতীয়তাবাদের ধারণা দিয়ে ভারতবর্ষকে আধুনিক করার কথা ভেবেছিলেন। অপরদিকে চরমপন্থীরা ইংরেজি শিক্ষাজাত জাতীয়তাবাদের ধারণার সমালোচনা করেছিলেন।
10. রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় -টীকা লেখো।
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। 1848 খ্রিস্টাব্দে এই বরেণ্য দেশনায়কের আবির্ভাব ঘটে। বাল্যকালেই তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আই.সি.এস (I.C.S) পরীক্ষায় পাস করেন। কিছুদিন সরকারি চাকরি করার পর তিনি অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। এই সময় থেকেই তিনি তাঁর বাগ্মিতার জন্য বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
রাজনৈতিক জীবন –
- 1876 খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতসভা’ গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যের মধ্য দিয়ে ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।
- তিনি 1883 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় একটি সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেন। এর সভাপতিত্ব করেন রামতনু লাহিড়ী।
- তাঁরই উদ্যোগে 1885 খ্রিস্টাব্দে কলকাতার এই সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের পুনা (1895 খ্রিস্টাব্দ) এবং আমেদাবাদ (1902 খ্রিস্টাব্দ) অধিবেশনের সভাপতির পদ অলংকৃত করেন।
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরই উদ্যোগে 1905 খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে ‘মিলন মন্দির’ ও জাতীয় ধনভাণ্ডার। কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে, তিনি 1918 খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন ‘মডারেট কনফারেন্স’ নামে একটি জাতীয় মঞ্চ।
1925 খ্রিস্টাব্দে এই মহান দেশনায়ক পরলোকগমন করেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য তিনি রাষ্ট্রগুরু, দেশনায়ক, মুকুটহীন রাজা প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হন।
11. ‘সুরাট ভাঙন’ বলতে কী বোঝো? সুরাট ভাঙনের প্রত্যক্ষ কারণ কী? সুরাট অধিবেশনের গুরুত্ব কী?
1907 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের বাৎসরিক সুরাট অধিবেশনে জাতীয় কংগ্রেস নীতিগত প্রশ্নে স্পষ্ট দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়—একটি নরমপন্থী, অন্যটি চরমপন্থী। তাই কংগ্রেসের এই অধিবেশনকে বলা হয় ‘সুরাট ভাঙন’।
সুরাট ভাঙনের প্রত্যক্ষ কারণ – (ক) নরমপন্থী কংগ্রেসি নেতারা চেয়েছিলেন স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন কেবল বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। অন্যদিকে চরমপন্থীদের মত ছিল এই আন্দোলন সারা ভারতে প্রসারিত হোক। (খ) আবার ‘বয়কট’ বলতে নরমপন্থীরা বুঝতেন শুধু বিলিতি পণ্য বর্জন। কিন্তু চরমপন্থীদের দাবি ছিল, বিলিতি পণ্য বর্জনের সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসী ইংরেজ সরকারের সঙ্গে সমস্ত রকমের সংশ্রব ত্যাগ করুক।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ—
- এই অধিবেশনেই নরমপন্থী ও চরমপন্থী কংগ্রেসিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়। যার ফলে জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে গিয়ে দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়—একটি নরমপন্থী, অন্যটি চরমপন্থী।
- জাতীয় কংগ্রেস দ্বিধাবিভক্ত হলে ভারতের জাতীয় আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।
12. কার্জন কেন বাংলাকে ভাগ করতে চেয়েছিলেন? কার্জনের যুক্তি কি যথার্থ ছিল? তোমার মত কী?
বাংলা ভাগের পিছনে কার্জনের যুক্তি 1905 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের কারণ হিসেবে লর্ড কার্জন ও তাঁর ঔপনিবেশিক সরকার প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দেখিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত এলাকা বিরাট হওয়ার ফলে এখানকার প্রশাসনিক কাজ ছিল অসুবিধাজনক ও ব্যয়বহুল। এ জন্য বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যুক্তির যথার্থতা – কার্জনের কেবলমাত্র প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তি যথার্থ ছিল না। বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল ধর্মকে ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সরকারের ভেদনীতিকে দায়ী করেছিল। বাংলা ও বাঙালিদের সরকার বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
13. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা উল্লেখ করো।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে বাংলায় একাধিক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হত। এইসব পত্রিকার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ বা বঙ্গ-বিভাজনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করা হয়, তেমনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে জনমতও গঠন করা হয়।
বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রথম সরকার-বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ করে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকা। 1905 খ্রিস্টাব্দের 13 জুলাই এই পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র বয়কট আন্দোলনের ডাক দেন। ফলে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বর্জন বা বয়কট আন্দোলনের সূচনা হয়। এর প্রভাবে সাড়া দিয়ে বীরভূম, বাগেরহাট, যশোহর প্রভৃতি অঞ্চলে প্রতিবাদ সভা হয় এবং 7 আগস্ট কলকাতার টাউনহলে ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যান্য একাধিক পত্রিকাও এই বিরোধিতায় সরব হয়। যেমন— ‘বেঙ্গলি’ সংবাদপত্রে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একে ‘একটি গভীর জাতীয় বিপর্যয়’ (A national calamity) বলে অভিহিত করেন। ‘সন্ধ্যা’ ও ‘হিতবাদী’ পত্রিকাও এক্ষেত্রে কঠোর বিরোধিতার স্বর চড়া করেছিল। ‘ডেইলি নিউজ’ (Daily News) একে ‘বজ্রপাত’ বা ‘জাতীয় বেদনা’ বলে অভিহিত করে। এমনকি ‘ইংলিশম্যান’, ‘স্টেটসম্যান’ প্রভৃতি পত্রিকাও সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।
14. ‘স্বরাজ’ সম্পর্কে চরমপন্থীদের ধারণাগুলি ব্যাখ্যা করো।
প্রথম পর্বে কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতারা ব্রিটিশ শাসনে ভারতের আংশিক স্বশাসনের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু চরমপন্থীদের দাবি ছিল ‘স্বরাজ’ অর্জন করা।
চরমপন্থী নেতারা ‘স্বরাজ’-এর ধারণাকে বিভিন্ন ভাবে ব্যক্ত করেছেন।
- বিপিনচন্দ্র পাল – বাংলার চরমপন্থী নেতা বিপিনচন্দ্র পাল মনে করতেন স্বরাজ মানে হল চূড়ান্ত স্বাধীনতা। ব্রিটিশদের অধীনে ‘স্বরাজ’ অর্জন কখনোই সম্ভব নয়। এই মতকে সমর্থন করতেন অরবিন্দ ঘোষ।
- বালগঙ্গাধর তিলক – ব্রিটিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে স্বরাজ প্রতিষ্ঠা হবে।
- অন্যান্য নেতৃবৃন্দ – ‘স্বরাজ’ সম্পর্কে অন্য নেতাদের ধারণা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বশাসনের অধিকারই ‘স্বরাজ’। চরমপন্থীরা আবেদন-নিবেদন নীতির বদলে সক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
15. ভারতীয় রাজনীতিতে ভারতসভার গুরুত্ব কী ছিল?
1876 খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পরাধীন ভারতের রাজনীতিতে ভারতসভা হল এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
ভারতসভার গুরুত্ব –
- ভারতবাসীর বাক্স্বাধীনতায় লাগাম টানার জন্য ব্রিটিশ সরকার 1878 খ্রিস্টাব্দে দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন জারি করে। এই কালা আইনের বিরুদ্ধে ভারতসভা আন্দোলন পরিচালনা করে। শেষপর্যন্ত আন্দোলনের চাপে সরকার এই আইনের কয়েকটি ধারা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
- ‘ভারতসভা’-র উদ্যোগে ইলবার্ট বিলের পক্ষে আন্দোলন সংগঠিত হয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষ প্রকট হয়ে ওঠে, তেমনই অন্যদিকে ভারতবাসী উপলব্ধি করে যে, সংঘবদ্ধ লড়াই ছাড়া সরকারকে কোনোমতেই প্রভাবিত করা যাবে না।
- ভারতসভার উদ্যোগে 1883 খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম কলিকাতায় একটি সর্বভারতীয় বা জাতীয় সম্মেলন আহূত হয়। অনেকেরই মত যে, এই সভার উদ্যোগেই এবং এখান থেকেই জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি রচিত হয়।
- পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতসভার প্রচেষ্টায় ভারতীয়দের মধ্যে যে জাতীয়তাবোধ তথা জাতীয় সংহতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল তা বলাই বাহুল্য।
16. ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ কবে কার নেতৃত্বে গঠিত হয়? এর ব্যর্থতার দুটি কারণ উল্লেখ করো।
1906 খ্রিস্টাব্দের 11 মার্চ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠিত হয়।
ব্যর্থতার কারণ –
নানা কারণে এই ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ তার আন্দোলন থেকে পথভ্রষ্ট হয়, যেমন—
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ভারতবর্ষে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করে। ছাত্ররা দলে দলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অংশ-গ্রহণ করে। কিন্তু এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত করলে শীঘ্রই তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।
- এ ছাড়া স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের সরকারি চাকরির সুযোগ ছিল না। ফলে ধীরে ধীরে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি তার গুরুত্ব হারায়।
17. টীকা লেখো – ‘ইন্ডিয়ান লিগ’।
1885 খ্রিস্টাব্দে ‘জাতীয় কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্বে ভারতে যে ক-টি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ইন্ডিয়ান লিগ।
ইন্ডিয়ান লিগ –
- প্রতিষ্ঠা – ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ ও তাঁর অগ্রজ হেমন্তকুমার ঘোষ 1875 খ্রিস্টাব্দে ‘ইন্ডিয়ান লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘মুখার্জিস ম্যাগাজিন’-এর সম্পাদক শম্ভুনাথ মুখার্জি ছিলেন ইন্ডিয়ান লিগের প্রথম সভাপতি।
- উদ্দেশ্য – ইন্ডিয়ান লিগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- অবদান – অনেকের মতে, এটি ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির একটি। এই প্রতিষ্ঠান ভারতে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং ভারতের সমস্ত শহরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা গড়ে তোলার দাবি জানায়। ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় একে ‘ভারতীয় জনসাধারণের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক জাগরণের ইঙ্গিত’ বলে দাবি করা হয়।
- দুর্বলতা – কিন্তু অচিরেই এই সভার সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানের প্রধান দুই সদস্য আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর সদস্যপদ ত্যাগ করেন। ফলে ইন্ডিয়ান লিগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
18. টীকা লেখো – রাসবিহারী বসু।
ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় নেতা ছিলেন রাসবিহারী বসু। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন একজন সরকারি চাকুরিজীবী। পরে তিনি পাঞ্জাব ও উত্তর ভারতে বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
রাসবিহারী বসুর রাজনৈতিক কার্যকলাপ –
1886 খ্রিস্টাব্দে (বইয়ের ছবিতে 1885 থাকলেও সঠিক সাল 1886) চন্দননগরে তাঁর জন্ম হয়। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য ছিলেন। চাকরি-সূত্রে তিনি পাঞ্জাব যান। সেখানেই তিনি তাঁর বিপ্লবী কার্যকলাপ শুরু করেন। 1912 খ্রিস্টাব্দে তাঁরই পরিকল্পনা অনুযায়ী বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জর ওপর বোমা নিক্ষেপ করেন তাঁর সহযোগী বসন্ত বিশ্বাস। সন্দেহের তীর রাসবিহারী বসুর দিকে যায়। তাঁর নামে সরকার ‘দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা’ শুরু করে। বাধ্য হয়ে তিনি বেনারস ও উত্তরপ্রদেশে আত্মগোপন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি লালা হরদয়ালের ‘গদর পার্টি’-র সঙ্গে মিলিত হয়ে পাঞ্জাবে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। ঘটনার সূত্র ধরে তাঁর বিরুদ্ধে ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’ (1915) দায়ের হয়। বাধ্য হয়ে তিনি ‘পি. এন. ঠাকুর’ ছদ্মনাম নিয়ে জাপানে চলে যান। 1942 খ্রিস্টাব্দে তিনি জাপানের হাতে বন্দি 25 হাজার ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ (ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ-এর সহায়তায়) প্রতিষ্ঠা করেন।
1945 খ্রিস্টাব্দে এই মহান দেশপ্রেমিকের জীবনাবসান হয় এবং শেষ হয় ভারতীয় বিপ্লববাদের এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
19. বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বাংলায় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল কেন?
বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ শুরু করেছিল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল। এইসব গুপ্ত সমিতির মধ্যে ‘অনুশীলন সমিতি’, ‘ঢাকা অনুশীলন সমিতি’, ‘যুগান্তর দল’ এবং ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ ছিল প্রধান। 1908 খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়লে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ প্রবল হয়ে ওঠে।
গুপ্ত সমিতিগুলি গড়ে ওঠার কারণ –
- ব্রিটিশ দমননীতির ফলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন ব্যর্থ হলে বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেয়, এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে।
- জনগণের জন্য প্রকৃত আন্দোলনের কর্মসূচি তৈরি করতে না পেরে বিপ্লবীরা ব্যক্তিগত স্তরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে আগ্রহী হয়ে পড়ে।
- বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীরা অত্যাচারী ইংরেজ অফিসার, কর্মচারী ও পুলিশদের হত্যা করে সত্যিকারের প্রতিশোধ নিতে চাইত।
- গুপ্ত সমিতিগুলি গোপনে কাজ করায় পুলিশ সহজে এদের নাগাল পেত না।
20. ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে স্মরণীয় কেন?
বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে – মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কের আমরণ সংগ্রাম এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
- উদ্দেশ্য – 1876-77 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে দুর্ভিক্ষ কবলিত মানুষের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের উদাসীনতা ও নির্দয় মনোভাব দেখে বাসুদেব ফাড়কে অত্যন্ত বিচলিত হন এবং এদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার শপথ নেন।
- বিপ্লবী দল গঠন – এই উদ্দেশ্যে 1879 খ্রিস্টাব্দে তিনি কোলি, ভিল, রামোশি প্রভৃতি উপজাতি যুবকদের নিয়ে মহারাষ্ট্রের অরণ্যে একটি দেশপ্রেমী ও বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। দলের আর্থিক সঙ্গতির জন্য তিনি ধনী মহাজন ও সুদখোরদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। ব্রিটিশদের বিব্রত করার জন্য তিনি রেল ও তার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতেন এবং জেল ভেঙে কয়েদিদের মুক্তি দিতেন।
মূল্যায়ন – যদিও শেষপর্যন্ত ফাড়কের বিপ্লবী আন্দোলন বেশি দূর প্রসারিত হয়নি। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 1879 খ্রিস্টাব্দে আটক করে। বিচারে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। এডেন জেলে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয় এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁকে “ভারতের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের জনক” বলে অভিহিত করেছেন।
21. টীকা লেখো – ক্ষুদিরাম বসু।
ভূমিকা – বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে ক্ষুদিরাম বসু এক প্রাতঃস্মরণীয় নাম। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে 1908 খ্রিস্টাব্দে কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে তিনি যে দেশপ্রেমের নজির সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও দেশবাসীকে রোমাঞ্চিত করে।
রাজনৈতিক কার্যকলাপ – বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের চলাকালে ক্ষুদিরাম বসু জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। এই সময় তিনি ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
কিংসফোর্ড হত্যার ষড়যন্ত্র – কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড ছিলেন অত্যন্ত অত্যাচারী। যুগান্তর গোষ্ঠী তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব দেন ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে। এই খবর পেয়ে প্রশাসন কিংসফোর্ডকে মজফফরপুরে বদলি করে দেয়। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীও সেখানে যান। তাঁরা কিংসফোর্ডের গতিবিধির ওপর নজরদারি করতে থাকেন। কিন্তু সময় মতো তিনি বের হননি। পরে কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে তাঁরা যে-গাড়িতে বোমা ছোঁড়েন (1908 খ্রিস্টাব্দের 30 এপ্রিল), সে গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা। এদের দুজনেরই মৃত্যু ঘটে।
ক্ষুদিরামের ফাঁসি – বোমা ছুড়েই তাঁরা আত্মগোপন করেন। কিন্তু 1 মে ওয়ানি (Waini) রেলস্টেশনে ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন। তবে ধরা পড়ার আগেই প্রফুল্ল চাকী রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। শুরু হয় ক্ষুদিরামের বিচার। তাঁর হয়ে মামলা লড়েন কালিপদ বসু।
মূল্যায়ন – শেষপর্যন্ত ক্ষুদিরামের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। দিন ধার্য হয় 1908 খ্রিস্টাব্দের 11 আগস্ট। ফাঁসির মঞ্চে ভারতমাতার জয়গান গেয়ে হাসিমুখে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। এইভাবে শেষ হয় বাংলার অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরাম বসুর মুক্তিযুদ্ধ।
22. ভারতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ কী ছিল?
বিশ শতকের প্রথম তিন দশকে ভারতে বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কিন্তু নানা কারণে এই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
বিপ্লবী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণ –
- সমন্বয়ের অভাব – ভারতের বিপ্লবী সংগঠনগুলির মধ্যে একতা ও সমন্বয়ের অভাব ছিল। এগুলি ভারতের নানা প্রান্তে, বিশেষ করে বাংলা, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রে সংগঠিত হয়েছিল। ফলে তা কখনোই জাতীয় আন্দোলন রূপে গড়ে ওঠেনি।
- জনসমর্থনের অভাব – বিপ্লবী আন্দোলনগুলিতে জনসমর্থনের অভাব ছিল স্পষ্ট। শিক্ষিত যুবসমাজ ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য শ্রেণি এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে ছিল।
- উগ্র হিন্দুত্ববাদ – ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেরণা ছিল উপনিষদ সহ বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্র। তেমনি এই আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন হিন্দু বিপ্লবীরাই। ফলে মুসলমান সম্প্রদায় এ সম্পর্কে অনুৎসাহী ছিল।
- সাংগঠনিক ত্রুটি – বিপ্লবী নেতারা দেশের সাধারণ মানুষকে এই বিপ্লবী আন্দোলনের যোগদান করাতে পারেননি। ফলে বিপ্লববাদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভয় ও সন্দেহ বাসা বেঁধেছিল।
মন্তব্য – সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমন নীতির কাছে ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন যে ব্যর্থ হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।
23. বাংলার বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে লেখো।
বাংলার বিপ্লববাদ – বাংলা ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে শরীরচর্চার জন্য বিভিন্ন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলায় বিপ্লবী প্রচেষ্টার প্রকৃত সূচনা হয় বিশ শতকের শুরুতে। 1902 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় তিনটি এবং মেদিনীপুরে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে সতীশচন্দ্র বসুর ‘অনুশীলন সমিতি’ ছিল বিখ্যাত। 1906 খ্রিস্টাব্দে পুলিনবিহারী দাসের নেতৃত্বে ‘ঢাকা অনুশীলন সমিতি’ গঠিত হয়। বাংলায় বেশ কয়েকটি নতুন সমিতি গড়ে ওঠে। এদের কার্যকলাপ চলত অত্যন্ত গোপনে। সমিতিগুলির উদ্যোগে বাংলার বিপ্লবীদের নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ‘যুগান্তর’ পত্রিকা হয়ে ওঠে বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের মুখপত্র। বিপ্লবীদের কার্যকলাপের জন্য প্রয়োজন হত অর্থের। স্বদেশি ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বোমা তৈরি করা হত।
1907 খ্রিস্টাব্দে ফ্রেজার সাহেবকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। 1908 খ্রিস্টাব্দের 30 এপ্রিল ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী বাংলার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে মারার উদ্যোগ নেন। কিন্তু ভুলবশত বোমার আঘাতে 2 জন নিরীহ মহিলা প্রাণ হারান। এর পরে প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হয়।
বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে। মানিকতলার বোমা কারখানার হদিশ পেয়ে ব্রিটিশ সরকার অনেক বিপ্লবীকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর ফলে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
24. মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন কী? তুমি কি মনে করো এই আইন ভারতীয়দের আশা পূরণ করতে পেরেছিল?
মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন – উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে হিন্দু ও মুসলমানরা পৃথকভাবে ব্রিটিশদের কাছে প্রতিনিধিত্বমূলক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানাতে শুরু করে। চরমপন্থী আন্দোলন এবং বাংলা ও মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের ফলে ব্রিটিশ সরকার শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। 1909 খ্রিস্টাব্দে ভারতের বড়োলাট লর্ড মিন্টো এবং ভারতসচিব জন মর্লে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট’ বা ভারতীয় পরিষদ আইন পাস করেন। এই আইন অনুযায়ী—
- বড়োলাটের কার্যনির্বাহক পরিষদে ও প্রাদেশিক আইন পরিষদে সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়।
- ভারতীয়দের প্রতি উদার মনোভাব দেখানো হয়।
- মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।
- কার্যনির্বাহক পরিষদে ভারতীয় সদস্য গ্রহণ করা হয় (যেমন— সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ)।
মূল্যায়ন – আমার মনে হয় এই আইন ভারতীয়দের আশা পূরণ করতে পারেনি। ভারতবাসীদের হাতে প্রকৃত কোনো ক্ষমতা অর্পিত হয়নি। পৃথক মুসলমান নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা মুসলমান প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, ব্রিটিশ সরকার চরমপন্থীদের বিপরীতে নরমপন্থীদের কাছে টেনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করতে চেয়েছিল। অপরদিকে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এই আইনের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
25. ভারত থেকে ‘সম্পদ নির্গমন’-এর ফলে ভারতবর্ষের অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল?
সম্পদ নির্গমন তত্ত্ব – ভারতের ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারতবর্ষকে ধীরে ধীরে ব্রিটেনের শিল্পের জন্য কাঁচামাল জোগানোর উৎসে পরিণত করেছিল। ব্রিটেনের শিল্পের স্বার্থে ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন এবং ভারতকে ব্রিটেনের শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের বাজারে পরিণত করাই ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বৈশিষ্ট্য। ভারতের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ব্রিটেনের শিল্পের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ভারতীয় শিল্প ও কৃষি ধ্বংস হয়। ব্রিটিশ মূলধন বিনিয়োগের যাবতীয় লাভ চলে যায় ব্রিটেনে; সেই সঙ্গে চলে যায় দেশের যাবতীয় সম্পদ।
ভারতীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব – সম্পদ নির্গমনের ফলে ভারতের অর্থনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।
- ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় পণ্য পিছিয়ে পড়ে।
- শিল্পায়ন ব্যাহত হওয়ায় কৃষির ওপর চাপ বাড়ে।
- দেশের অধিকাংশ লোক কৃষিনির্ভর, কিন্তু কৃষির উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে দেশের দারিদ্র্য বেড়ে যায়। আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক না থাকায় কম দামে বিদেশি পণ্য বিক্রি হয়, ফলে দেশীয় পণ্য বাজার হারায়।
26. ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের অবদান কী ছিল?
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে বালগঙ্গাধর তিলক এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তি। তিনি ছিলেন চরমপন্থী কংগ্রেসি আন্দোলনের প্রধান নেতা।
- জাতীয় চেতনার জাগরণ – ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনার জাগরণে বালগঙ্গাধর তিলকের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ‘মারাঠা’ (ইংরেজি) ও ‘কেশরী’ (মারাঠি) পত্রিকায় নিয়মিতভাবে সরকারি কাজ ও নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। মারাঠাবাসীর মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার জন্য তিনি গণপতি ও শিবাজি উৎসব পালন করেন।
- স্বদেশি আন্দোলন – তিনি বাংলার বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করেন। সেজন্য তিনি মহারাষ্ট্রে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন পালন করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, “বয়কট ও নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আমাদের অস্ত্র।”
- হোমরুল আন্দোলন – 1916 খ্রিস্টাব্দে তিলক হোমরুল আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলনে তাঁর লক্ষ্য ছিল শাসনতান্ত্রিক উপায়ে ভারতের স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা। সেজন্য তিনি সদর্পে ঘোষণা করেন, “স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার…।” তিলকের নেতৃত্বে হোমরুল আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশবাসীর মধ্যে স্বরাজের দাবি জোরদার হয়।
মূল্যায়ন – এইভাবে তিলকের নেতৃত্বে আদর্শ, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ দেশবাসীকে জাতীয়তাবোধের আদর্শে উদ্দীপিত করে। তাই এই মহান দেশনেতা সম্পর্কে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ বলেছিলেন, “তিলকই জাতীয় আন্দোলনকে জনতার কাছে পৌঁছে দেন।”
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, “জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন