অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ – বিষয়সংক্ষেপ

Rahul

আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়, ‘জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ’-এর ‘বিষয়সংক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই অংশটি পড়ার ফলে অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়াবলি বুঝতে সুবিধা হবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – বিষয়সংক্ষেপ

উনিশ শতকে ভারতে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ ঘটে। এই সময়পর্বে নানা ভাবে ভারতের বুকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল এই শতককে ‘ভারতের সভা-সমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই সময় গঠিত সভা-সমিতির মধ্যে অন্যতম ছিল—জমিদার সভা (1838 খ্রিষ্টাব্দ), ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (1851 খ্রিষ্টাব্দ), ব্রিটিশ ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান লিগ (1875 খ্রিষ্টাব্দ), ভারতসভা (1876 খ্রিষ্টাব্দ) ইত্যাদি।

উপরোক্ত সভাগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতসভা’। এই সভার উদ্যোগে 1883 ও 1885 খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় দু-বার দুটি সর্বভারতীয় সম্মেলন আহূত হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেস নামক একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। কিন্তু 1885 খ্রিষ্টাব্দে অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম নামে একজন ব্রিটিশ আধিকারিক বোম্বাইয়ে (অধুনা মুম্বাই) জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। 1885 খ্রিষ্টাব্দের 28 ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের গোকুল দাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলন বসে। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি হন। ওই সময়েই সুরেন্দ্রনাথের ভারতসভা জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়।

কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দু-দশকের কার্যকলাপ নরমপন্থী মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই সময় কংগ্রেস নেতারা চেয়েছিলেন এদেশে ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্ব। তাঁরা চেয়েছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের জন্য কিছু সুবিধাদি আদায় করতে। তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকে স্বায়ত্ত্বশাসন পেতে চেয়েছিলেন।

সরকারকে বিরক্ত করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে বিক্ষুব্ধ ভাব দানা বাঁধতে থাকে। নরমপন্থী নেতাদের আবেদনে সাড়া না দেওয়ায় বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বাড়ে। তাঁরা চেয়েছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে গিয়ে ব্রিটিশদের বাধ্য করে স্বরাজ আদায় করতে। এই মতের প্রবক্তারা ছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। তাঁদের বলা হত চরমপন্থী। স্বভাবতই দুই মতাদর্শের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কংগ্রেসের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। 1907 খ্রিষ্টাব্দে সুরাটে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে তাঁদের বিরোধ চরম আকার নেয়। কংগ্রেস দু’দলে দ্বিখণ্ডিত হয়। যদিও 1916 খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের লখনউ অধিবেশনে দুই দলের মিলন ঘটে।

অন্যদিকে 1905 খ্রিষ্টাব্দে বড়লাট লর্ড কার্জন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা দুর্বল করার জন্য বাংলা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 16 অক্টোবর তার দিন ধার্য হয়। কিন্তু এই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আপামর বাঙালি প্রতিবাদ জানায়। শুরু হয় স্বদেশি বিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনের দুটি দিক ছিল—যথা স্বদেশি আন্দোলন ও বয়কট আন্দোলন।

স্বদেশি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতে অনেক জাতীয় শিল্প, দোকান, কারখানা, বিদ্যালয় ইত্যাদি গড়ে ওঠে। দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ বয়কট আন্দোলনে যোগ দেয়। শেষে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে 1911 খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ বা প্রত্যাহার করে নেয়।

চরমপন্থী আন্দোলনের দুর্বলতার মধ্য দিয়ে ভারতে বিপ্লববাদী কার্যকলাপ দেখা দেয়। বাংলা, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে এই আন্দোলন জোরদার হয়। 1902 খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় অনুশীলন সমিতি। এটি ছিল একটি বিপ্লবী সংগঠন। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—সতীশচন্দ্র বসু, প্রমথনাথ মিত্র, অরবিন্দ ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ প্রমুখ নেতা। দলীয় মতাদর্শ নিয়ে অনুশীলন সমিতির ভিতরে দ্বন্দ্ব বাধে। এই অবস্থায় বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, উল্লাসকর দত্ত, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ মিলে 1906 খ্রিষ্টাব্দে গড়ে তোলেন যুগান্তর গোষ্ঠী।

এই পটভূমিকায় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁরা 1908 খ্রিষ্টাব্দে মজফ্ফরপুর যাত্রা করেন। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। প্রফুল্ল চাকি ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন। ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়েন এবং বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। এই পর্যায়ের বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের আর এক খ্যাতনামা বিপ্লবী ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘাযতীন। তিনি এদেশ থেকে ব্রিটিশ সরকারের উচ্ছেদের জন্য এক বৃহৎ বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নেন। কিন্তু তা ফাঁস হয়ে যায়। 1915 খ্রিষ্টাব্দে বুড়িবালামের তীরে ইংরেজদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে তিনি আহত হয়ে ধরা পড়েন। 1915 খ্রিষ্টাব্দের 9 সেপ্টেম্বর তিনি বালেশ্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়, “জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ”-এর “বিষয়সংক্ষেপ” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাটি অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো সহজে বুঝতে সাহায্য করবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, মতামত জানাতে চাও বা আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো কিংবা আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারো—তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিষয়সংক্ষেপ