অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, “জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

1. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি আলোচনা করো।

উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে যে রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা ঘটেছিল, তারই ফলশ্রুতি হল জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের উদ্ভব ঘটে। 1885 খ্রিস্টাব্দে অ্যালান অক্টভিয়ান হিউম জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করলেও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন মত পোষণ করেন। পট্টভি সীতারামাইয়া লিখেছেন—“সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মূল কারণটি রহস্যাবৃত।”

1. কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার বিতর্ক –

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা কার মস্তিষ্কপ্রসূত, এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে—

  • থিওসফিস্ট অ্যানি বেসান্ত বলেন, জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা থিওসফিস্টদের মস্তিষ্কপ্রসূত।
  • পট্টভি সীতারামাইয়ার মতে, 1877 খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে যে সর্বভারতীয় দরবার হয়, সেখানেই কংগ্রেস গঠনের প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়।
  • লালা লাজপত রাই-এর মতে, কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পিছনে ডাফরিনের মস্তিষ্ক কাজ করেছিল। (‘Congress was a product of Dufferin’s brain.’)
  • কেউ কেউ মনে করেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারতসভা থেকে কংগ্রেসের সৃষ্টি হয়েছে।
  • রজনীপাম দত্ত মনে করেন, কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ‘হিউম-ডাফরিন ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি’ ছিল।

2. সেফটি ভালভ তন্তু –

হিউমের জীবনীকার ওয়েডারবার্ন বলেছেন—হিউম পুলিশের গোপন রিপোর্ট থেকে জানতে পেরেছিলেন যে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেইজন্য তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের ছাত্রদের কাছে একটি খোলা চিঠিতে জানান যে, ভারতের জনসাধারণের সার্বিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক সংস্থা গঠন করা জরুরি। ওয়েডারবার্নের মতে, এই পরিকল্পনা অনুসারে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয়দের আন্দোলন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য ‘সেফটি ভালভ’ বা ‘সুরক্ষা কপাট’ হিসেবে কংগ্রেসকে কাজে লাগানোই হিউমের উদ্দেশ্য ছিল। রজনীপাম দত্তের মতে, ডাফরিনের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্র এবং ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ পরিচালনা ও পক্ষপাতিত্বের ফলশ্রুতি হল জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। অবশ্য ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র, অমলেশ ত্রিপাঠী, অনিল শীল প্রমুখ হিউমের কৃতিত্বকে অস্বীকার করে বলেছেন, কংগ্রেস গঠনের পেছনে তাঁর কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার এই বিতর্কের সদুত্তর পাওয়া মুশকিল।

মূল্যায়ন – তবে 1885 খ্রিস্টাব্দে 28 ডিসেম্বর মুম্বইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজের হলে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর থেকে ভারতবাসী সম্পূর্ণরূপেই জাতীয় কংগ্রেসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে ড. তারাচাঁদ বলেছেন—‘কংগ্রেস ছিল দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।’

2. জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের (1885-1905 খ্রিস্টাব্দ) কার্যাবলি আলোচনা করো।

1885 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা থেকে 1905 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে জাতীয় কংগ্রেসের আদি পর্ব বলা হয়। ব্রিটিশের দমনমূলক শোষণ নীতির বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ক্ষোভ সমাধানের লক্ষ্যে জাতীয় কংগ্রেস তার কার্যাবলি সম্পাদন করে। ঐতিহাসিক তারাচাঁদের মতে, জাতীয় কংগ্রেস মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগঠন হলেও পরবর্তীকালে এটি ভারতবাসীর রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

বিভিন্ন কার্যকলাপ –

কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে চার রকমের দাবি ব্রিটিশ সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়— (ক) সাংবিধানিক সংস্কার, (খ) প্রশাসনিক সংস্কার, (গ) অর্থনৈতিক সংস্কার ও (ঘ) গণতান্ত্রিক দাবি।

সাংবিধানিক সংস্কার –

  • কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির আইনসভার সংস্কার।
  • ‘ইন্ডিয়া কাউন্সিল’ নামক ভারত সচিবের উপদেষ্টা পরিষদের বিলোপ সাধন।
  • ব্যবস্থাপক সভাতে জনসাধারণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্থান দেওয়া।
  • স্বায়ত্তশাসনের দাবি রাখা হয়।

প্রশাসনিক সংস্কার –

  • প্রশাসনকে ভারতীয়করণ করার দাবি তোলা হয়।
  • বিকেন্দ্রীকরণ নীতির ভিত্তিতে শাসন কাঠামো গড়ে তোলার দাবি রাখা হয়।
  • ইংল্যান্ডের অনুকরণে ভারতেও আই.সি.এস (ICS) পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
  • পুলিশ বিভাগের সংস্কার সাধন করা।
  • অস্ত্র আইন বাতিলের দাবি জানানো হয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার –

  • ধনসম্পদ নির্গমনের রাস্তা বন্ধ করার দাবি তোলা হয়।
  • ভারতে আধুনিক শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
  • কৃষিক্ষেত্রে ভূমিরাজস্ব হ্রাস করা, কৃষি-ব্যাংক স্থাপন ও সেচব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি তোলা হয়।
  • আয়কর, লবণ কর ও আবগারি শুল্কের হ্রাস ঘটানোর দাবি জানানো হয়।
  • জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনগুলিতে ইংরেজ শাসনের অর্থনীতির সংস্কারসাধনে জোর দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্রের মতে, ‘অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি সম্বন্ধে জাতীয় কংগ্রেসের এই কর্মসূচিগুলি দেশবাসীর সামনে ব্রিটিশের প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরা।’

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা –

সরকার যেসব অগণতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন করেছিল, কংগ্রেস তা প্রত্যাহারের দাবি করে। ব্রিটিশ প্রবর্তিত জুরি আইন (1823 খ্রিস্টাব্দ), নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন (1876 খ্রিস্টাব্দ), সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন (1878 খ্রিস্টাব্দ), অস্ত্র আইন (1878 খ্রিস্টাব্দ), কার্জনের বঙ্গভঙ্গ (1905 খ্রিস্টাব্দ) ইত্যাদি দমনমূলক আইনগুলির সংশোধনের বা বাতিলের দাবি জানায় কংগ্রেস।

মূল্যায়ন –

আদিপর্বের কংগ্রেস নেতারা আবেদন-নিবেদন নীতি গ্রহণ করে ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল সত্য, কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে ও ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হয়েছিল। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র বলেছেন, নরমপন্থীরা শক্তিশালী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। নরমপন্থী নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে বলেছেন—‘আমরা ব্যর্থ হয়তো। তবে আমাদের ব্যর্থতা দিয়েই দেশের সেবা করতে চাই।’

এখানে আপনার অনুরোধ অনুযায়ী ঐতিহাসিক তথ্য, বানান এবং যতিচিহ্ন (punctuation) যাচাই করে সংশোধিত টেক্সটটি দেওয়া হলো। সংখ্যাগুলো ইংরেজিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

3. কবে কোথায় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়? জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পিছনে অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের অবদান কী?

1885 খ্রিস্টাব্দের 28 ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসে।

হিউমের অবদান –

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পিছনে অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের অবদান অনস্বীকার্য। অনেক পণ্ডিতই তাঁকে জাতীয় কংগ্রেসের জনক বিবেচনা করেছেন। কারণ—

  • খোলা চিঠি – 1883 খ্রিস্টাব্দের 1 মার্চ হিউম কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লেখেন। তাতে বলা হয়—ভারতীয়দের মানসিক, নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য ‘কংগ্রেস’ নামক একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন।
  • জাতীয় সমিতি গঠন – এই উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নেতাদের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং 1883 খ্রিস্টাব্দে স্থাপন করেন ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’। ওই বছরই তিনি পুনেতে একটি সর্বভারতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেন, যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
  • জাতীয় কংগ্রেস গঠন – শেষপর্যন্ত তাঁর তৎপরতায় 1885 খ্রিস্টাব্দের 28 ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সভাপতিত্বে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসে। পরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারতসভা’ জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়।

মন্তব্য – যদি হিউমের প্রচেষ্টাকেই জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ ধরা হয়, তাহলে বলা যায় যে, হিউম চেয়েছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ভারতীয় গণবিক্ষোভকে অবদমিত করার জন্য কংগ্রেস নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘সেফটি ভালভ’ (Safety Valve) রূপে কাজে লাগাতে।

4. জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের সঙ্গে চরমপন্থী নেতাদের মনোমালিন্যের কারণ কী ছিল?

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম কুড়ি বছরের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পদ্ধতি ও লক্ষ্যের ওপর একদল তরুণ কংগ্রেসি নেতা আস্থা রাখতে পারেননি। তাঁরা এ প্রসঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতেন।

মনোমালিন্যের কারণ –

আন্দোলনের পদ্ধতি –

  • কিছু তরুণ কংগ্রেসি নেতা কংগ্রেসের নিয়মানুগ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথ ও ‘আবেদন-নিবেদন’ নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন।
  • পক্ষান্তরে, তাঁরা চেয়েছিলেন প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দ্বারা সরকারের কাছ থেকে দেশবাসীর দাবিদাওয়া আদায় করতে। এই জন্য অরবিন্দ ঘোষ কংগ্রেসের 3 ‘P’ নির্ভর (Prayer, Protest ও Petition) আন্দোলনকে “রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি” বলে কটাক্ষ করেন।
  • তাঁরা আদি কংগ্রেসীদের ‘নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ’ তত্ত্বের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি।
  • মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের সম্পর্ক ছিল না। এঁরা চেয়েছিলেন চরমপন্থী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

আন্দোলনের লক্ষ্য –

কংগ্রেসি আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়েও তাঁরা দ্বিমত পোষণ করতেন।

  • শুধুমাত্র শাসনতান্ত্রিক সংস্কার নয়;
  • শুধুমাত্র ব্রিটিশদের অধীন থেকে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন নয়; তাঁরা চেয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বহির্ভূত ভারতীয় স্বরাজ।
  • এঁরা চেয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে।
  • তাই তাঁরা চাননি যে, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন কেবল বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক।

5. ভারতে জাতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী নেতাদের উদ্ভব হয় কেন?

অথবা, ভারতে সংগ্ৰামী জাতীয় রাজনীতি উদ্ভবের কারণ কী?

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই নানা কারণে জাতীয় কংগ্রেসের ভিতর চরমপন্থী নেতাদের উদ্ভব হয়।

চরমপন্থী মতবাদ উদ্ভবের কারণ

  • আন্দোলনের ব্যর্থতা – আদি কংগ্রেসীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসননীতির প্রতি আবেদন-নিবেদন নীতির দ্বারা সরকারের কাছ থেকে ভারতীয়দের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদন নীতি ব্যর্থ হয়। ফলে একদল তরুণ কংগ্রেসি নেতার কংগ্রেস সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়।
  • ঔপনিবেশিক শোষণ – ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা ও দেশীয় শিল্প সম্পর্কে উদাসীনতা ভারতীয় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ শাসনে ভারতবর্ষ বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হয়। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেশবাসীকে বিপন্ন করে, তবুও সরকার উদাসীন থাকে।
  • সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি – ভারতীয়দের অধিকার খর্ব করা এবং কণ্ঠ রোধ করার জন্য সরকার একটার পর একটা কালাকানুন (যেমন—ইলবার্ট বিল বিতর্ক, অস্ত্র আইন, ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট, বিশ্ববিদ্যালয় আইন) পাশ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লর্ড কার্জনের ‘বিভাজন এবং শাসন নীতি’।
  • বঙ্গভঙ্গের ঘটনা – 1905 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন বঙ্গবিভাগের কথা ঘোষণা করলে বাংলায় শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলনের ব্যাপকতা নিয়ে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিরোধ বাধে। সেই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে 1907 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে। এখানেই জাতীয় কংগ্রেস দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়।

6. চরমপন্থী রাজনীতি কি নরমপন্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গড়ে উঠেছিল? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দেখাও।

জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থী রাজনীতির উদ্ভব হয়েছিল নরমপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে—এ বিষয়ে আমি একমত।

আমার যুক্তি –

  • সংগ্রামবিমুখতা – কংগ্রেসের সংগ্রামবিমুখ কর্মসূচি অধিকাংশ ভারতবাসীর মনঃপূত ছিল না। এর জন্য প্রথম পর্বের কংগ্রেস নেতারা ‘নরমপন্থী’ নামে পরিচিত ছিলেন।
  • নরমপন্থী রাজনীতির নিষ্ক্রিয়তা – নরমপন্থীরা কখনোই ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ চাননি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও শাসনের মধ্যে থেকেই আংশিক স্বশাসন ছিল তাঁদের কাম্য। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি নরমপন্থীদের কর্মসূচিতে ছিল না।
  • জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা – নরমপন্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান দেশের বৃহত্তর জনগণের অভাব-অভিযোগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
  • জমিদার, ব্যবসায়ী ও মহাজনদের স্বার্থ – প্রথম পর্বে কংগ্রেসের কার্যকলাপের পিছনে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। ফলে জমিদারদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কর্মসূচি কংগ্রেস গ্রহণ করতে পারত না। কৃষকদের স্বার্থে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ না-করায় কৃষকদের মধ্যে কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। একইভাবে ব্যবসায়ী ও মহাজনদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিকদের উন্নতির জন্য কংগ্রেসি আন্দোলনের প্রথম পর্বে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর ফলে কংগ্রেসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়।
  • সরকারের অবজ্ঞা – প্রথম পর্বের কংগ্রেস রাজনীতির লক্ষ্য ও কর্মসূচি ছিল সীমিত চরিত্রের। এতে জনগণের বিশেষ অংশগ্রহণ না-থাকায় ব্রিটিশ প্রশাসন জাতীয় কংগ্রেসকে গুরুত্ব দিত না।
  • গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব – কংগ্রেসের মধ্যে নরমপন্থী-চরমপন্থী দ্বন্দ্ব কংগ্রেসকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আন্দোলনের থেকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেশি হওয়ায় কংগ্রেসকে ব্যঙ্গ করা হত।
  • আর্থিক সংকট – জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের কার্যকলাপ পরিচালিত হত। জমিদাররা টাকা-পয়সা দেওয়া বন্ধ করে দিলে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার ক্ষেত্রে নরমপন্থীরা অর্থ সংকটে পড়েন। এর ফলে জমিদারদের স্বার্থরক্ষার্থে জনগণের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক না-থাকায় সেখান থেকেও আর্থিক সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।

7. দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কেন হয়? আইনটির শর্ত কী ছিল? এতে দেশবাসীর প্রতিক্রিয়া কী হয়?

জনমত গঠনের ক্ষেত্রে সংবাদপত্র হল একটি বলিষ্ঠ মাধ্যম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচার, শোষণের সমালোচনা করে। তাই সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধ করার জন্য লর্ড লিটন 1878 খ্রিস্টাব্দে ‘দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন’ (Vernacular Press Act, 1878) জারি করেন।

আইনের শর্ত –

এই আইনে বলা হয়—

  • সরকারবিরোধী কোনো সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না।
  • সংবাদপত্রে এমন কিছু ছাপা যাবে না যা ব্রিটিশ ও ভারতবাসীর মনে জাতিগত বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
  • কোনো সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশিত হলে সম্পাদককে গ্রেফতার এবং প্রয়োজনে মুদ্রণযন্ত্র সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে।

এই আইনকে অনেকে ‘শ্বাসরোধক আইন’ বা Gagging Act বলেছেন।

সংবাদপত্রের ভূমিকা

সেইসময় হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা নীলবিদ্রোহের সময় তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও সংবাদ প্রভাকর, ইন্ডিয়ান মিরর, অমৃতবাজার পত্রিকা, দি বেঙ্গলি ইত্যাদি পত্রিকা সরকারের তীব্র সমালোচনা করে।

প্রতিক্রিয়া –

এইভাবে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সুরেন্দ্রনাথের ভারতসভা সরকারের এই আচরণের তীব্র নিন্দা করে। এই আইনের আওতার বাইরে আসার জন্য বাংলা ভাষায় প্রকাশিত অমৃতবাজার পত্রিকা রাতারাতি ইংরেজি পত্রিকায় পরিণত হয়। কলকাতার টাউন হলে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপন 1882 খ্রিস্টাব্দে এই আইন প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

8. কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনের তাৎপর্য বর্ণনা করো।

1905 খ্রিস্টাব্দে বারাণসীতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশন থেকেই নরমপন্থী ও চরমপন্থী বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত 1907 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে এই বিভাজন চরম রূপ পায়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সুরাট বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে তাঁর ‘A Nation in Making’ গ্রন্থে লিখেছেন—সুরাটের ঘটনার ফলে জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান এবং এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

1907 খ্রিস্টাব্দে সুরাটে জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন হয় তাতে মোট 1600 জন প্রতিনিধি যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে 600 জন ছিলেন চরমপন্থী। চরমপন্থী সদস্যরা লালা লাজপত রাইকে সভাপতি নিযুক্ত করতে চান। অপরদিকে নরমপন্থীরা এই আবেদন খারিজ করে দিয়ে রাসবিহারী ঘোষকে সভাপতি নিযুক্ত করেন।

তাৎপর্য –

কংগ্রেসের সুরাট বিচ্ছেদ জাতীয় রাজনীতিতে ছিল এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

  • সুরাট বিচ্ছেদের ফলে কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ প্রকাশ্যে চলে আসে এবং জনমানসে কংগ্রেস সংগঠনটির প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
  • সুচতুর ব্রিটিশ নরমপন্থীদের কাছে টেনে নিয়ে এবং চরমপন্থীদের দূরে সরিয়ে দিয়ে উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ককে আরও বিষিয়ে দেয়। বড়োলাট মিন্টো ভারতসচিব মর্লেকে লেখেন—কংগ্রেস-বিচ্ছেদ আমাদের পক্ষে এক বিরাট জয়। (‘The Congress collapse at Surat was a great triumph for us’)
  • সুরাট বিচ্ছেদের সুদূরপ্রসারী ফলাফল হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের (1885 খ্রিস্টাব্দ-1905 খ্রিস্টাব্দ) পর থেকে গান্ধীযুগের পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে নরমপন্থীদের পরিবর্তে চরমপন্থীরাই মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।

মূল্যায়ন –

  • ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সুরাটের ঘটনা দুঃখজনক।
  • শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত বলেন, ‘কংগ্রেসের ইতিহাসে সুরাটের ঘটনা সর্বাপেক্ষা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।’
  • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সুরাটের ঘটনার ফলে জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান এবং এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

সুরাট বিচ্ছেদ সাময়িকভাবে হলেও ভারতের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় কংগ্রেসকে দুর্বল করে তোলে। এর ফলস্বরূপ জাতীয় আন্দোলন গতিহীন হয়ে পড়ে। প্রায় নয় বছর পর মূলত গান্ধীজির উদ্যোগে ‘লখনউ চুক্তি’র (1916 খ্রিস্টাব্দ) মাধ্যমে পুনরায় কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মিলন ঘটে।

9. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো।

1905 খ্রিস্টাব্দে ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করার ফলে বাংলার আপামর মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন –

1. ব্যক্তিগত উদ্যোগ – বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাঙালির মধ্যে বিভাজন দূর করার জন্য রাখিবন্ধন উৎসব পালন করেন। 16 অক্টোবর, 1905 রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর নেতৃত্বে বাংলায় ‘অরন্ধন দিবস’ পালিত হয়। আনন্দমোহন বসু গড়ে তোলেন ‘মিলন মন্দির’। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন গিরিজাসুন্দরী দেবী।

2. বয়কট আন্দোলন – এইসময় (13 জুলাই, 1905 খ্রিস্টাব্দ) কৃষ্ণকুমার মিত্র ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় বিলিতি পণ্য বয়কটের ডাক দেন। ফলে, ছাত্র, শিক্ষক ও নারীসমাজ বয়কট আন্দোলনে শামিল হয়। ছাত্ররা বিলিতি পেন-খাতা, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি প্রত্যাখ্যান করে। নারীসমাজ বিলিতি চুড়ি, কাপড় ও প্রসাধন দ্রব্য বর্জন করেন। তারা বিলিতি দ্রব্যের দোকানের সামনে পিকেটিং শুরু করে। বিলিতি বস্ত্র, লবণ ও চিনির গুদামে আগুন লাগানো হয়। বহু মানুষ বিদেশি খেতাব ও সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান করেন।

3. স্বদেশি আন্দোলন – এই আন্দোলনের একটি গঠনমূলক দিক ছিল স্বদেশি আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ভাষা, দেশি সাহিত্য, শিক্ষা ও দ্রব্য ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। গড়ে ওঠে একাধিক স্বদেশি শিল্প, যেমন—স্বদেশবান্ধব সমিতি (বরিশাল), জামশেদপুরের লৌহ-ইস্পাত কারখানা, বেঙ্গল কেমিক্যালস, জাতীয় সাবান কারখানা, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক, স্বদেশি জাহাজ কোম্পানি ইত্যাদি। এ ছাড়া গড়ে ওঠে চিনি, গুড়, দেশলাই ও ওষুধ তৈরির কারখানা।

4. জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন – জাতীয়তাবাদী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য 1906 খ্রিস্টাব্দে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (National Council of Education)। এই উদ্যোগের ফসল ছিল— BTI (বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট), বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল ও কলেজ ইত্যাদি।

মন্তব্য – বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের চাপে পড়ে ব্রিটিশ সরকার 1911 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

10. বঙ্গভঙ্গের পিছনে লর্ড কার্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? ভারতবাসী বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কেন?

বঙ্গভঙ্গের পিছনে লর্ড কার্জন যতই প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তি দেখান না কেন, তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা।

কার্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য –

1. বাঙালির ঐক্যে ফাটল – কার্জন চেয়েছিলেন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ (Divide and Rule) নীতি দ্বারা পূর্ব বাংলায় হিন্দুদের সংখ্যা লঘু করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তুলতে।

2. জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করা – তিনি জানতেন বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরলেই জাতীয় আন্দোলন দুর্বল হবে। কারণ সেই সময় বাংলা তথা বাঙালি ছিল ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার।

3. কংগ্রেসকে দুর্বল করা – সেইসময় (1905 খ্রিস্টাব্দ) জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছিলেন বাঙালি। সুতরাং, বাঙালির ঐক্য বিনষ্ট করা মানেই জাতীয় কংগ্রেসের ঐক্য ও সংহতিকে দুর্বল করা।

4. ব্রিটিশ আধিপত্যের স্থায়িত্ব – কার্জনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এদেশে ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা। অর্থাৎ, ব্রিটিশ শাসনকে দীর্ঘায়িত করে এদেশে তাদের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা।

5. ভারতবাসীর বিরোধিতার কারণ – বাংলার মানুষ কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত মানতে পারেনি, কারণ— i. তারা দেখেছিল কার্জন মুখে যতই ভালো যুক্তি দেখান না কেন, আসলে তিনি চেয়েছিলেন সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। ii. তিনি চেয়েছিলেন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি দ্বারা হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে এবং iii. রাজনৈতিকভাবে তাদের হীনবল করে জাতীয় আন্দোলনকে ব্যর্থ করতে।

11. লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ করেছিলেন কেন?

সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড কার্জনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা (1905 খ্রিস্টাব্দ)। বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার আড়ালে যে তিনজন ব্যক্তি দায়ী ছিলেন, তাঁরা হলেন— বড়োলাট লর্ড কার্জন, বাংলার ছোটোলাট অ্যান্ড্রু ফ্রেজার এবং ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব। সে সময়কার (1854 খ্রিস্টাব্দ) বাংলার প্রেসিডেন্সি গঠিত ছিল বাংলা, বিহার ও ওড়িশা নিয়ে। লর্ড কার্জন দীর্ঘদিন ধরেই চেয়েছিলেন বাংলা ও বাঙালিকে দুর্বল করে দিতে। কারণ, তিনি মনে করতেন বাংলা প্রেসিডেন্সিই ছিল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের মূল উৎস। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে পরবর্তী বড়োলাট লর্ড মিন্টো বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক কৌশল রূপে বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট ছিল।’

প্রশাসনিক উদ্দেশ্য –

  • বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে লর্ড কার্জনের বক্তব্য ছিল—
  • অত্যধিক জনসংখ্যার জন্য বাংলার প্রশাসন ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে।
  • কলকাতা রাজধানী হওয়ার জন্য, বহুদূরে অবস্থিত উত্তর-পূর্ব বাংলার উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
  • একজন শাসকের পক্ষে বিশালায়তনের অবিভক্ত বাংলার শাসনকাজ পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য –

প্রশাসনিক সুবিধার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাই ছিল লর্ড কার্জনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যেমন—

  • উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ছিল চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ক্ষতিকারক এই আন্দোলনের প্রভাব থেকে তিনি দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন।
  • জাতীয় কংগ্রেসের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। তখন কলকাতা থেকেই কংগ্রেস দল সমগ্র ভারতে আন্দোলন পরিচালনা করত। তাই কার্জন চেয়েছিলেন বঙ্গ বিভাজনের দ্বারা পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে দিয়ে, কলকাতাকেন্দ্রিক জাতীয় কংগ্রেসের কার্যকলাপের ওপর আঘাত হানতে। এ প্রসঙ্গে তাঁর উক্তি— ‘The Congress is tottering to its fall.’
  • বাংলাদেশ ভাগের মাধ্যমে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান— এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ঘটিয়ে, পরোক্ষভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে হীনবল করতে চেয়েছিলেন কার্জন।

মূল্যায়ন – ভারতবাসীরা বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা মানতে পারেনি। কারণ—

  • এই প্রস্তাব মেনে নিলে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদের সৃষ্টি হত।
  • বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার মতো চক্রান্ত ভারতের অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারত।

12. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা কী ছিল?

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সংবাদপত্রগুলি জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ঐতিহাসিক দেশাই-এর মতে— ‘The press was a powerful factor for the building and developing Indian Nationalism.’ বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ইংরেজি, বাংলা ও মুসলিম পত্রপত্রিকা প্রতিবাদে গর্জে ওঠে —

  • এই রাজনৈতিক অস্ত্রাঘাতের সমালোচনা করে সরব হয়েছিল ‘ইংলিশম্যান’, ‘স্টেটসম্যান’, ‘পাইওনিয়ার’। এমনকি লন্ডনের ‘ডেইলি নিউজ’ এই পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা বলে বর্ণনা করে।
  • কৃষ্ণকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় সর্বপ্রথম ‘বঙ্গের সর্বনাশ’ নামক প্রবন্ধে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।
  • মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতা সম্পাদিত ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচারিত হতে থাকে।
  • সুরেন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকায় বলা হয় যে, সরকার যদি মত পরিবর্তন না করে তাহলে সারা ভারতে আগুন জ্বলবে।
  • বিপিনচন্দ্র পাল সম্পাদিত ‘নিউ ইন্ডিয়া’ এবং অরবিন্দ ঘোষ সম্পাদিত ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকাটি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
  • ‘হিতবাদী’ পত্রিকাতে লেখা হয়, বিগত একশত পঞ্চাশ বছরে বাঙালির জীবনে এমন দুর্দিন আসেনি।
  • এ ছাড়াও এই সময়ে উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলি হল— সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘ডন’, শিশির কুমার ঘোষের ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’, সরলাদেবী সম্পাদিত ‘ভারতী’ প্রভৃতি।
  • জাতীয়তাবাদী মুসলিমগণ বয়কট ও স্বদেশির আদর্শ প্রচারের জন্য প্রকাশ করেন ‘দ্য মুসলমানস’ (The Mussalman)। এ ছাড়াও ‘দ্য মুঘল মানস’ পত্রিকাতে বয়কট ও স্বদেশির আদর্শ প্রচার করতে থাকে।

13. বঙ্গবিভাজনের প্রস্তাবের কী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

লর্ড কার্জনের বঙ্গ বিভাজনের দুরভিসন্ধি বুঝতে বাঙালির দেরি হয়নি। তাই তারা বঙ্গ বিভাজনের চক্রান্ত বন্ধ করতে আন্দোলনের পথ গ্রহণ করে।

বঙ্গ বিভাজন ও বাঙালির প্রতিক্রিয়া –

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন – বঙ্গভঙ্গের তারিখ ঘোষিত হওয়ার পর সারা দেশে স্বদেশি আন্দোলন পরিচালিত হয়। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন বাংলার ‘মুকুটহীন রাজা’ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সুরেন্দ্রনাথের পরে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বিপিনচন্দ্র পাল ও অরবিন্দ ঘোষ। সুরেন্দ্রনাথ ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে ‘জাতীয় বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেন। ড. সুমিত সরকার তাঁর ‘The Swadeshi Movement in Bengal’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই আন্দোলনে বাঙালি উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ছাত্ররাও স্কুল-কলেজ বয়কট করে দলমত নির্বিশেষে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।

অন্যান্য ঘটনা – 1905 খ্রিস্টাব্দের 16 অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের দিন হরতাল পালিত হয়। ওই দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাখিবন্ধনের’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাতে রাখি বেঁধে দেয়। শুধু তাই নয়, ওইদিন বাংলার নারীরা ‘অরন্ধন’ দিবস পালন করেন। দুই বাংলার মিলনকে চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্বে ‘ফেডারেশন হল’-এর ভিত্তি স্থাপন করা হয়। আন্দোলন পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজনে জাতীয় ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়। ওইদিন জাতীয় ভাণ্ডারে 70 হাজার টাকা জমা পড়ে।

মন্তব্য – সবশেষে বলা যায় যে, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বৃথা যায়নি। এই আন্দোলনের চাপের ফলে ব্রিটিশ সরকার শেষপর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ ভারতীয়দের কাছে নত হয়। তারা বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা রদ করতে বাধ্য হয়।

14. বঙ্গভঙ্গের কারণ কী? এর পিছনে সরকার কী যুক্তি দেখিয়েছিল?

বাঙালির জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করার জন্য লর্ড কার্জন সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী প্রদেশকে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করার কথা বলেন। একটি পূর্ববঙ্গ ও আসাম, অপরটি বাংলা প্রদেশ।

লর্ড কার্জনের বঙ্গ বিভাজনের যুক্তি ও উদ্দেশ্য –

প্রশাসনিক যুক্তি – সরকারের যুক্তি ছিল —

  • একজন ছোটোলাটের পক্ষে এই বিশাল বাংলা প্রদেশের শাসনভার পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
  • ফলে তিনি পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলিতে ভালো করে নজর দিতে পারেন না।
  • কলকাতা বাংলার যাবতীয় আন্দোলনের উৎসস্থল হওয়াতে পূর্ববঙ্গ, আসাম ও ওড়িশার উন্নতিতে ব্যাঘাত ঘটছে।
  • আসাম পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হলে আসামের চা, তেল, কয়লা প্রভৃতি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কম সময়ে ও খরচে রপ্তানি করা যাবে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য – কার্জনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাই প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল।

লর্ড কার্জন বাঙালির ঐক্যে ফাটল ধরাতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, ‘বেঙ্গলি ইউনাইটেড ইজ এ পাওয়ার’ (Bengali United is a Power)।

  • তিনি চেয়েছিলেন বাংলাকে ভাগ করে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষ ঢুকিয়ে দিতে।
  • এই সময় ভারতের জাতীয় রাজনীতির আখড়া ছিল কলকাতা। যদি বাঙালিরা কোনোভাবে সাম্প্রদায়িকতার ফাঁদে পা দেয়, তাহলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ। অর্থাৎ, জাতীয় কংগ্রেস তথা জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করা যাবে।
  • এই অভিসন্ধি করেই সরকার চেয়েছিল এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিকড় আরও গভীরভাবে প্রোথিত করতে।

মূল্যায়ন – কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় বাঙালি ইংরেজদের এই মরণফাঁদে পা দেয় নি। তারা ব্রিটিশদের চক্রান্ত ধরে ফেলে এবং এর বিরুদ্ধে শুরু করে আন্দোলন। আর তার ফলেই 1911 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবিভাজনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহৃত হয়।

15. স্বদেশি আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের একটি গঠনমূলক দিক ছিল ‘স্বদেশি আন্দোলন’। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, ‘স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন ছিল একই মুদ্রার দুটি দিক’। বয়কট আন্দোলনে যেমন বিদেশি দ্রব্য বর্জন করা হয়, তেমনই স্বদেশি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ভাষা, দেশীয় সাহিত্য, দেশীয় শিক্ষা এবং দেশীয় দ্রব্য ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

স্বদেশি আন্দোলন –

স্বদেশি শিল্প – এই সময় গড়ে ওঠে বহু স্বদেশি দোকান। অশ্বিনীকুমার দত্ত স্থাপন করেন ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’। জামসেদজি টাটা জামসেদপুরে গড়ে তোলেন লৌহ-ইস্পাত কারখানা। বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস্’। ডা. নীলরতন সরকার তৈরি করেন ‘জাতীয় সাবান কারখানা’, বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল’। এই সময় কলকাতায় গড়ে ওঠে ‘ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ’। পাঞ্জাবে গড়ে ওঠে ‘পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক’। মাদ্রাজে ‘স্বদেশি জাহাজ কোম্পানি’ গড়ে ওঠে। এ ছাড়া স্বদেশি অনুপ্রেরণায় ভারতের বিভিন্ন স্থানে ব্যাংক, চিনি, গুড়, সাবান, দেশলাই ও ওষুধ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন – 1906 খ্রিস্টাব্দে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। এর অধীনে অনেক স্কুল, কলেজ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। যেমন—বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল ও কলেজ, বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। ছাত্ররা দলে দলে এইসব স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হতে শুরু করে। শিক্ষকরাও এইসব প্রতিষ্ঠানগুলিতে পাঠদানে এগিয়ে আসেন।

ফলাফল ও গুরুত্ব – স্বদেশি আন্দোলন শেষপর্যন্ত সরকারি দমন নীতির কাছে হার মানে। কিন্তু এই আন্দোলনের গুরুত্ব কম ছিল না। যেমন—

  • সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব তুলে নেয়।
  • বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
  • স্বদেশি আন্দোলনের ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই ভারতে চরমপন্থী বিপ্লববাদ মাথা চাড়া দেয়।

16. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন বা স্বদেশি আন্দোলনের দুর্বলতার কারণগুলি উল্লেখ করো।

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন তথা স্বদেশি আন্দোলন ছিল এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কিন্তু নানা কারণে এই আন্দোলনে দুর্বলতার চিহ্ন ধরা পড়ে।

স্বদেশি আন্দোলনের দুর্বলতার কারণ –

  • মুসলিম লিগের জন্ম – স্বদেশি আন্দোলন চলাকালে (1906 খ্রিস্টাব্দ) ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লিগ। মুসলিম লিগ শুরু থেকেই স্বদেশি আন্দোলনের বিরোধিতা করে।
  • অর্থাভাব – জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি জমিদারদের আর্থিক আনুকূল্যে গড়ে উঠলেও, তা পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ছিল না।
  • সরকারি বদান্যতা – স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উত্তীর্ণ ছাত্রদের কাছে সরকারি চাকরির দরজা বন্ধ ছিল। তাই ছাত্ররা এই সব স্কুল-কলেজগুলির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে অচিরেই এই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে।
  • দমন নীতি – এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সরকারি আইন (যেমন—কার্লাইল সার্কুলার, লিয়ন সার্কুলার) ও দমনমূলক নীতি (যেমন—ধরপাকড়, জেলে পাঠানো, নির্যাতন ইত্যাদি)।
  • কংগ্রেসের বিরোধিতা – স্বদেশি আন্দোলনকে কংগ্রেস সবুজ সংকেত দিলেও, আন্দোলনের ব্যাপ্তি নিয়ে তাদের অনীহা ছিল। কংগ্রেস চায়নি এই আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ুক। কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলনকে কেবল বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন।

17. স্বদেশি আন্দোলনের গুরুত্ব আলোচনা করো।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন হিসেবে স্বদেশি আন্দোলনের অগ্রগতি ব্যর্থ হলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে সরকার 1911 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করে নিয়েছিল।

গুরুত্ব –

  • এই আন্দোলনের সূচনা বাংলায় ঘটলেও পরবর্তীকালে এটি জাতীয় আন্দোলনের মর্যাদা পেয়েছিল।
  • এই আন্দোলনকে ভিত্তি করে যে গণচেতনার উদ্ভব হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে ঐক্যবদ্ধ সুসংহত আন্দোলন পরিচালনায় সাহায্য করেছিল।
  • স্বদেশি আন্দোলনের সময় অনেক প্রভাবশালী নেতার কারাবাস হলে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এর ফলে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন সংগঠিত হয়। উইল ডুরান্টের মতে, ‘বিপ্লবী আন্দোলন এই সময় শুরু হয়।’ (It was in 1905 that the Indian revolution began.)
  • এই আন্দোলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সাড়া দিয়েছিল। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী প্রত্যেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
  • ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে ভাঙন ধরে। ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ 1906 খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা করেন। কংগ্রেস বিদ্বেষী সংগঠনরূপে আত্মপ্রকাশ করে মুসলিম লিগ হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বাড়ায়।
  • বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে সরাসরি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংঘর্ষের ডাক দিয়েছিল, যার মধ্যস্থতায় চরমপন্থার উন্মেষ ঘটে। গান্ধিজি বলেন— ‘প্রকৃতপক্ষে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার প্রথম অবস্থা।’
  • এই আন্দোলন দ্বারা সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছিল। কবিতা, গান, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, বিজ্ঞানে এর প্রভাব অনস্বীকার্য।

অবশ্যই, এখানে আপনার অনুরোধ অনুযায়ী পাঠ্যটি দেওয়া হলো। সমস্ত বাংলা সংখ্যাকে ইংরেজি সংখ্যায় (1, 2, 3…) রূপান্তর করা হয়েছে এবং বাকি লেখা বাংলাতেই রাখা হয়েছে।

18. স্বদেশি আন্দোলন ও তার প্রসারে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা আলোচনা করো।

ভারতে ইংরেজ শাসনকে নিষ্কণ্টক করতে ভাইসরয় লর্ড কার্জন 1905 খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রাণকেন্দ্র বাংলাকে দু-টুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন। তাই জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ যে-কোনো মূল্যে এই বঙ্গভঙ্গ রোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অঙ্গরূপে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন শুরু হলে রবীন্দ্রনাথ সেই আন্দোলনে স্বেচ্ছায় যোগ দেন।

  • কার্লাইল সার্কুলার বিরোধিতা – ছাত্রসমাজকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার লক্ষ্যে বাংলার ব্রিটিশ সরকারের চিফ সেক্রেটারি আর. ডব্লিউ. কার্লাইল 10 অক্টোবর (1905 খ্রিস্টাব্দ) এক দমনমূলক আইন জারি করেন। এই কালা আইনের বিরোধিতার জন্য কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক সভা আয়োজিত হয়। এই সভা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য নির্দেশ পাঠানো হয়।
  • রাখিবন্ধন উৎসব – 1905 খ্রিস্টাব্দে 16 অক্টোবর ছিল বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার দিন। ওই দিন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ-পরিকল্পিত রাখিবন্ধন ছিল ওই কর্মসূচির একটি প্রধান অঙ্গ। বাংলার দুটি অংশের জনগণ নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন অটুট রাখতে গঙ্গা স্নান করে পরস্পরের হাতে হলুদ সুতোর রাখি বেঁধে দিয়ে মাতৃভূমির ঐক্য বজায় রাখার শপথ নেয়।
  • দেশাত্মবোধক গান রচনা – রবীন্দ্রনাথ স্বদেশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গান ও কবিতা লেখেন যা আজও মানুষকে স্বদেশ-প্রেমে উদ্দীপিত করে। এইসব গানের উল্লেখযোগ্য হল ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’; ‘বাঙলার মাটি, বাঙলার জল’, ‘ও আমার দেশের মাটি’; ইত্যাদি।
  • স্বদেশ চিন্তা – রবীন্দ্রনাথ ‘স্বদেশি ভাণ্ডার’ (1897 খ্রিস্টাব্দ) নামে একটি তহবিল গঠন করেন। এ ছাড়াও শান্তিনিকেতনের অধীনে স্বদেশি ভাবনার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

মূল্যায়ন – স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর চিন্তা, কর্মধারা দেশের যুবশক্তির মনে গভীর উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল। তার কবিতা, গান, সাহিত্য, নাটক স্বদেশি ভাবধারার পুষ্ট হয়ে সংস্কৃতির জাগরণ ঘটেছিল। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—“এই আহ্বান দেশের শুভবুদ্ধির সিংহদ্বারে আঘাত করিয়াছিল বলিয়াই আজ ইহা এতো দ্রুত সমাদর পাইয়াছে।”

19. বয়কট আন্দোলন সম্পর্কে যা জানো, আলোচনা করো।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের একটি ধ্বংসাত্মক দিক ছিল বয়কট আন্দোলন। এই আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যে ছিল যা কিছু বিলিতি তা বর্জন করার অঙ্গীকার। পরিবর্তে স্বদেশি দ্রব্য ও পণ্য ব্যবহার করার প্রতিশ্রুতি।

বয়কট আন্দোলন –

কর্মসূচি – বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ধ্বংসাত্মক বা নেতিবাচক দিক ছিল বয়কট আন্দোলন। বয়কট শব্দের অর্থ বর্জন; অর্থাৎ, যা কিছু বিদেশি তা বর্জন করা। এই আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল—

  • বিলিতি বস্ত্র, লবণ, জুতো, চুড়ি, প্রসাধনসামগ্রী, সিগারেট ইত্যাদি পণ্যসামগ্রী বর্জন করা।
  • সমস্ত সরকারি খেতাব, পদবি ও চাকরি পরিহার করা।
  • ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সরকারি স্কুল ও কলেজ বয়কট করা।
  • আইনসভা, আদালত ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ।
  • বিলিতি পণ্যসামগ্রীর দোকানের সামনে পিকেটিং বা অবস্থান ধর্মঘট করা।
  • এর সঙ্গে ছিল শোভাযাত্রা, মিছিল, মিটিং প্রভৃতি কর্মসূচি।

আন্দোলনের স্বরূপ – জাতিবর্ণধর্মনির্বিশেষে বাংলার আপামর নরনারী বয়কট আন্দোলনে শামিল হয়। মেয়েরা পর্যন্ত দলে দলে বিলিতি কাপড় ও প্রসাধন সামগ্রী বর্জন করে। ছাত্ররা সরকারি স্কুল-কলেজ ত্যাগ করে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। ধোপারা ইংরেজদের কাপড় ধুতে এবং চর্মকাররা বিলিতি জুতোয় হাত দিতে অস্বীকার করে। বাংলার আকাশ বাতাস মুখর হয় মিটিং মিছিলের ধ্বনিতে।

গুরুত্ব – বয়কট আন্দোলন ব্যর্থ হলেও তার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কারণ—

  • বিলিতি পণ্য বয়কট শুরু হলে দেশি পণ্য ও শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটে।
  • জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের বিকাশ হয়।
  • হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে।
  • শেষপর্যন্ত সরকার আন্দোলনের চাপে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।

20. সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উন্মেষের কারণগুলি উল্লেখ করো।

নরমপন্থী নেতাদের কার্যাবলি ও আবেদন-নিবেদন নীতি জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই এই ধারার বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল বা চরমপন্থী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। প্রত্যক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবিদাওয়া পূরণ করা ছিল এই জাতীয়তাবাদের মূল উদ্দেশ্য। ড. অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, উনবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অসাম্য থেকেই সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে।

  • আবেদন-নিবেদন নীতির ব্যর্থতা – ব্রিটিশ সরকারের কাছে কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের আবেদন-নিবেদন নীতি ব্যর্থ হয়েছিল। এই নীতিকে অনেকে ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি’ বলে মনে করতেন। ‘ইন্দুপ্রকাশ’ পত্রিকায় অরবিন্দ ঘোষ কংগ্রেসের নরমপন্থী নীতিকে দেশ ও জাতির প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করেছেন। কংগ্রেসের মধ্য থেকেই কিছু নেতা গতানুগতিক আন্দোলনের প্রতিবাদ করে চরমপন্থার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।
  • অর্থনৈতিক শোষণ – ব্রিটিশ শাসনের নামে ভারতে যে ঔপনিবেশিক শোষণ চালানো হয়েছিল, তা ছিল ধ্বংসাত্মক। এই শোষণ নীতির ফলে ভারতের কুটিরশিল্প ও কৃষি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। উইলিয়াম ডিগবি, রমেশচন্দ্র দত্ত, দাদাভাই নওরোজির গ্রন্থগুলিতে ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন দিকগুলি তুলে ধরা হয়েছিল।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারি ঔদাসীন্য নীতি – দুর্ভিক্ষ, শস্যহানি, প্লেগ, মহামারি, যুদ্ধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীর স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। রজনীপাম দত্ত ও উইলিয়াম ডিগবির লেখা থেকে জানা যায় যে, সেই সময়কার দুর্ভিক্ষে ও অনাহারে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়, অথচ ব্রিটিশ সরকার সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল।
  • দমনমূলক আইন – অস্ত্র আইন, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন, নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন, মিউনিসিপ্যাল আইন, বিশ্ববিদ্যালয় আইন ইত্যাদি আইনগুলি ছিল জনস্বার্থবিরোধী। এর ফলে ভারতবাসী ক্ষুব্ধ হয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়।
  • মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব – বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কৃষ্ণচরিত’; দয়ানন্দ সরস্বতীর ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ ও ‘বেদভাষ্য’; বিবেকানন্দের জীবনী ও বাণী ভারতবাসীর মনে ঐক্যবোধ ও স্বদেশপ্রীতি জাগ্রত করেছিল। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের কার্যকলাপ, তিলকের ‘মারাঠা’ ও ‘কেশরী’ পত্রিকা এবং ‘শিবাজি’ ও ‘গণপতি’ উৎসব সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের পটভূমি তৈরি করেছিল।
  • আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলির প্রভাব – ইতালির ঐক্য আন্দোলন, জার্মানির ঐক্য আন্দোলন, রাশিয়ার নিহিলিস্ট আন্দোলন, রুশ বিপ্লব (1905), রুশ-জাপান যুদ্ধ ইত্যাদি ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটিয়েছিল।

মূল্যায়ন – সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের আদর্শ, সাফল্য ও ব্যর্থতা নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। অনেকে এই আন্দোলনকে ‘হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মুসলিম সম্প্রদায় অনেকটাই জাতীয় আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়। তথাপি চরমপন্থার আদর্শ জাতীয় আন্দোলনকে গতিশীল, গণমুখী ও সংগ্রামশীল করে তোলে। ঐতিহাসিক দেশাই-এর মতে— ‘এই নতুন জাতীয়তাবাদ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সংগ্রামী মনোভাব ও স্বাধীনতাবোধ সঞ্চার করেছিল।’

21. ভারতের সংগ্রামশীল রাজনীতিতে অরবিন্দ ঘোষের অবদান মূল্যায়ন করো।

ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ ও বিপ্লবী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক ছিলেন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

অরবিন্দ ঘোষের অবদান –

  • স্বদেশি আন্দোলন – বাংলায় স্বদেশি আন্দোলনের সময় থেকে অরবিন্দ ঘোষ জাতীয় আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করেন। তিনি স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের পক্ষে শামিল হন এবং কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মসূচি (যেমন—খাজনা বন্ধ, পিকেটিং, সরকারি বিদ্যালয় বর্জন) পালন করেন। এই সময় তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে একটি কলেজের (বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ) অধ্যক্ষপদ অলংকৃত করেন।
  • বিপ্লবী আন্দোলন – 1906 খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের’ সঙ্গে যুক্ত হন। ইতিমধ্যই তিনি ‘অনুশীলন সমিতি’-র সদস্যপদ গ্রহণ করেন। পরে তাঁর অনুপ্রেরণায় বা প্রত্যক্ষ মদতে (1906 খ্রিস্টাব্দে) ‘যুগান্তর গোষ্ঠী’ গড়ে ওঠে। তাঁর তৎপরতায় বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন মারাত্মক আকার ধারণ করে।
  • সুরাট অধিবেশন – 1907 খ্রিস্টাব্দে চরমপন্থী নেতা হিসেবে তিনি কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে যোগ দেন এবং তিলকের পক্ষ নেন।
  • পত্রপত্রিকা প্রকাশ – ভারতীয়দের মধ্যে বিপ্লববাদ প্রসারের জন্য তিনি ‘বন্দেমাতরম’ (Bande Mataram) নামক ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ‘ইন্দুপ্রকাশ’ পত্রিকায় তিনি কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদন নীতিকে “রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি” বলে কটাক্ষ করেন। ‘ভবানীমন্দির’ গ্রন্থে তিনি দেশবাসীর সংগ্রামকে স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।

মূল্যায়ন – 1908 খ্রিস্টাব্দে আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত হন এবং 1909 সালে নিষ্কৃতি পাওয়ার পর তিনি আর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ফিরে আসেননি। তিনি বাকি জীবন পণ্ডিচেরিতে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন। উত্তরপাড়া অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন, “সনাতন ধর্মই হল জাতীয়তাবাদ”।

22. বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকর স্মরণীয় কেন?

বিশ শতকের প্রথমার্ধে মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তিনি ‘বালসমাজ’ আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হন এবং বিপ্লববাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হন।

সাভারকর ও তাঁর কার্যকলাপ –

  • অভিনব ভারত প্রতিষ্ঠা – ছাত্রাবস্থাতেই সাভারকরের মনে জাতীয়চেতনা গভীরভাবে প্রোথিত হয়। পরে ভারতের মুক্তির জন্য তিনি সশস্ত্র বিপ্লববাদের মন্ত্রে দীক্ষিত হন। 1899 খ্রিস্টাব্দে ম্যাৎসিনির ‘ইয়ং ইতালি’-র অনুকরণে তিনি গড়ে তোলেন ‘মিত্রমেলা’। 1904 খ্রিস্টাব্দে এর নাম বদলে হয় ‘অভিনব ভারত’।
  • বিপ্লবী কার্যকলাপ – 1906 খ্রিস্টাব্দে তিনি বিপ্লবী শ্যামাজী কৃষ্ণবর্মার ডাকে লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি ‘ইন্ডিয়া হাউস’-এর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পরে তিনি ইন্ডিয়া হাউস পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লন্ডনে বসে তিনি ভারতের বিপ্লবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। সেখান থেকেই তিনি বিপ্লবীদের হাতে বোমা তৈরির কৌশল ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠাতেন।
  • জ্যাকসন হত্যা – ইতিমধ্যে সাভারকরের প্রচেষ্টায় লন্ডনের বিপ্লবী মদনলাল ধিংড়া কার্জন উইলি নামে এক সরকারি কর্মচারীকে হত্যা করেন। এদিকে 1909 খ্রিস্টাব্দে (21 ডিসেম্বর) তাঁরই প্রেরিত অস্ত্রে অভিনব ভারতের বিপ্লবীরা নাসিকের অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. জ্যাকসনকে হত্যা করে।
  • নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা – সব ঘটনা জানাজানি হলে ব্রিটিশ পুলিশ 1910 খ্রিস্টাব্দে সাভারকরকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা’। বিচারের রায়ে তাঁকে 26 বছরের জন্য আন্দামানে দ্বীপান্তর করা হয়। এই মামলার অধীন অনন্ত লক্ষণ ও তাঁর দুই সহযোগী—নারায়ণ পান্ডে ও কৃষ্ণগোপাল কার্ভেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

মন্তব্য – কিন্তু নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সাভারকর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। 1924 খ্রিস্টাব্দে তাঁর কারামুক্তি হয় এবং তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি হন। 1966 খ্রিস্টাব্দে এই মহান দেশপ্রেমী বিপ্লবীর জীবনাবসান হয়। বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব ও ভারতের মুক্তি আন্দোলনের জন্য ‘বীর সাভারকর’ উপাধিতে ভূষিত হন।

23. মর্লে-মিন্টো সংস্কারের ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করো।

পটভূমি – 1858 খ্রিস্টাব্দে ‘ভারত শাসন আইন’ দ্বারা কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতে প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ সরকারের শাসনের সূচনা করা হয়। এই আইনে ভারতীয়দের প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে 1861 ও 1892 খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় কাউন্সিল আইনে বড়লাটের কার্যনির্বাহী পরিষদে ভারতীয়দের নেওয়া হলেও তাদের কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ভারতীয়দের আরও প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার দাবি এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে সামলে দেওয়ার জন্য 1909 খ্রিস্টাব্দে প্রণীত হয় মর্লে-মিন্টো শাসন সংস্কার আইন। পার্সিভাল স্পিয়ার বলেছেন—ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভের ক্ষেত্রে 1909 খ্রিস্টাব্দের আইন একটি প্রধান দিকচিহ্ন।

সংস্কারসমূহ

মর্লে-মিন্টো সংস্কারের দ্বারা –

  • ইম্পেরিয়াল ও প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
  • পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়। ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলের সদস্যদের নির্বাচক হলেন প্রাদেশিক কাউন্সিলের সদস্যগণ, প্রাদেশিক কাউন্সিলের নির্বাচক হলেন মিউনিসিপ্যাল বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড।
  • ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল 68 জন। এঁদের মধ্যে 36 জনকে সরকারি কর্মচারীদের মধ্য থেকে মনোনীত করার ব্যবস্থা করা হয়। বেসরকারি সংস্থা থেকেও 5 জন সদস্যের মনোনয়নের ব্যবস্থা থাকে। নির্বাচিত 29 জন সদস্যের মধ্যে 6 জন হলেন জমিদার গোষ্ঠীর এবং 2 জন হলেন ব্রিটিশ বণিক সম্প্রদায়ভুক্ত।
  • এই সংস্কারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। 1906 খ্রিস্টাব্দে আগা খান শিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর কাছে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচনের প্রতিবেদন রেখেছিলেন। মর্লে-মিন্টো সংস্কারে তা বাস্তবরূপ পেল।

প্রকৃতপক্ষে এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদের রাজনীতি প্রকট হয়ে ওঠে।

গুরুত্ব – মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন আধুনিক ভারতের রাজনীতিতে ব্রিটিশ প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই আইনের মাধ্যমেই সমকালীন ভারতের অভিজাত ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সরকারের আইন রচনার কাজে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিল। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ কর্তৃক স্বায়ত্তশাসন প্রদানের ইঙ্গিতবাহী ছিল এই আইন।

সমালোচনা – মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন শেষপর্যন্ত সফল হয়নি।

  • জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে কোনো ক্ষমতাই ছিল না।
  • মুসলিম সম্প্রদায়ের আলাদা নির্বাচন ব্যবস্থা সাম্প্রদায়িকতার পথকেই প্রশস্ত করেছিল।

24. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের পরিচয় দাও।

বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন চলাকালে এদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করার জন্য বাংলার বিভিন্ন স্থানে অনেক গুপ্ত সমিতি ও বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে।

বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস –

  • অনুশীলন সমিতি – 1902 খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে সতীশ চন্দ্র বসু কলকাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন তত্ত্বের’ আদর্শের ভিত্তিতে ‘অনুশীলন সমিতি’ স্থাপন করেন। এই সমিতির সক্রিয় সদস্যগণ ছিলেন—প্রমথনাথ মিত্র (সভাপতি), অরবিন্দ ঘোষ (কোষাধ্যক্ষ), সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, চিত্তরঞ্জন দাশ (সহ-সভাপতি) প্রমুখ। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে এই সমিতির বিস্তার ও কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ঢাকা (মুক্তি সংঘ), ময়মনসিংহ (সাধনা সমিতি), রাজশাহী, ফরিদপুর (ব্রতী সমিতি) প্রভৃতি স্থানে এর শাখা স্থাপিত হয়।
  • যুগান্তর গোষ্ঠী – দলীয় মতাদর্শ নিয়ে অনুশীলন সমিতির ভিতরে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়। বারীন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, উল্লাসকর দত্ত, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ মিলে 1906 খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন ‘যুগান্তর গোষ্ঠী’। কলকাতায় মুরারিপুকুর রোডে এই দলের কর্মকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এঁদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করা।
  • অন্যান্য সমিতি – অন্যান্য বিপ্লবী সমিতিগুলির মধ্যে ছিল বিপিন বিহারী গাঙ্গুলীর ‘আত্মোন্নতি সমিতি’, মতিলাল রায়ের ‘চন্দননগর বিপ্লবী সমিতি’। বাংলার বিভিন্ন শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এই সমস্ত গুপ্ত সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সমিতিগুলির কার্যকলাপ – এই সময় গুপ্ত সমিতির বিভিন্ন কার্যকলাপের অঙ্গ ছিল রাজনৈতিক ডাকাতি ও হত্যা। 1907 খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গ-অসমের ছোটলাট ফুলার, ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট অ্যালেন এবং বাংলার ছোটলাট ফ্রেজার হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব নেন প্রফুল্ল চাকি ও ক্ষুদিরাম বসু। এই অভিযান ব্যর্থ হয়। ধরা পড়ার আগে প্রফুল্ল চাকি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। 1908 খ্রিস্টাব্দের 11 আগস্ট বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। এই ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশ অরবিন্দ ও বারীন ঘোষ সহ 37 জন বিপ্লবীকে বন্দি করে এবং শুরু হয় ‘আলিপুর বোমা মামলা’। অরবিন্দ ঘোষ মুক্তি পেলেও অনেকের দ্বীপান্তর হয়।
  • বুড়িবালামের যুদ্ধ – 1910 খ্রিস্টাব্দের পর বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বাঘাযতীন ওরফে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। 1914 খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার ‘রডা অ্যান্ড কোম্পানির’ দোকান থেকে 50টি মাউজার পিস্তল ও সহস্রাধিক কার্তুজ লুঠ করেন। জার্মানি থেকে অস্ত্র আনার জন্য তাঁর সহকর্মী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (ওরফে এম. এন. রায় ও সি. মার্টিন) জার্মানির ‘ন্যাশনাল পার্টির’ সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঠিক হয় যে, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জাভা হয়ে অস্ত্রবোঝাই জাহাজ সুন্দরবনের রায়মঙ্গলে পৌঁছোবে এবং সেই অস্ত্র পূর্ব বাংলা, কলকাতা ও বালেশ্বরের বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছোবে। সেই মতো যতীন্দ্রনাথ তাঁর দলবল নিয়ে ওড়িশার বালেশ্বরে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অস্ত্রবোঝাই ‘ম্যাভেরিক’ জাহাজ ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে।

1915 খ্রিস্টাব্দের 9 সেপ্টেম্বর পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট বিশাল বাহিনী নিয়ে বালেশ্বরে পৌঁছোন। বুড়িবালাম নদীর ধারে উভয়পক্ষের তুমুল গুলিযুদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলে চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী মারা যান। মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ও নীরেন দাশগুপ্তের ফাঁসি হয়। যতীন্দ্রনাথ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মারা যান।

25. মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী কার্যকলাপের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন চলাকালে এদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ ঘটানোর জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থানে অনেক গুপ্ত সমিতি ও বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে। মহারাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলন –

  • বাসুদেব ফাড়কে – ভারতের ‘সশস্ত্র বিপ্লববাদের জনক’ বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে মহারাষ্ট্রে সমাজের নিচুতলার রামোসি, কোল, ভিল প্রভৃতি সম্প্রদায়ের যুবকদের নিয়ে শিবাজির আদর্শে বিপ্লবী ‘গুপ্ত সমিতি’ গড়ে তোলেন। দলের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য শুরু করেছিলেন রাজনৈতিক ডাকাতি ও লুণ্ঠন। তাঁকে বন্দি করা হয় এবং এডেন দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়।
  • চাপেকর ভ্রাতৃদ্বয় – তিলকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চাপেকর ভ্রাতৃদ্বয়—দামোদর হরি চাপেকর ও বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর—মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। 1895 খ্রিস্টাব্দে তাঁরা একটি গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলেন। 1896 খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ ও পরের বছর প্লেগ আক্রান্ত এলাকায় সরকার চাষিদের খাজনা মকুব না করলে, তাঁরা পুনার কমিশনার মি. র‍্যান্ড ও তাঁর সহকর্মী আমহার্স্টকে হত্যা করেন। ফলে সরকার দুই চাপেকর ভ্রাতাকেই ফাঁসির হুকুম দেয়।
  • বালসমাজ – তিলক ও চাপেকর ভাইদের প্রেরণায় মহারাষ্ট্রে ‘বালসমাজ’ ও ‘আর্যবান্ধব সমাজ’ গঠিত হয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই যাতে ছাত্রদের মধ্যে জাতীয় চেতনা গড়ে ওঠে, সেদিকে নজর দেওয়ার জন্য ‘বালসমাজ’ গড়ে ওঠে। ‘আর্যবান্ধব সমাজের’ লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে উচ্ছেদ করা। প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যকলাপ কালক্রমে বরোদা, হায়দরাবাদ, লাহোর প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। লালা লাজপত রাই এই সমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
  • সাভারকর – 1899 খ্রিস্টাব্দে বিনায়ক দামোদর সাভারকার ‘মিত্রমেলা’ নামে একটি বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলেন। 1904 খ্রিস্টাব্দে এই সমিতি ‘অভিনব ভারত’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি ইতালির ম্যাসিনির অনুকরণে ভারতে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। 1909 খ্রিস্টাব্দে নাসিকের জেলাশাসক জ্যাকসনকে হত্যার অভিযোগে তিনি ধরা পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা’। বিচারে তাঁর দ্বীপান্তর হয়। জ্যাকসন হত্যাকারী অনন্ত কানহেরে ও তাঁর সহযোগী বিনায়ক দেশপান্ডে এবং কৃষ্ণগোপাল কার্ভে-র মৃত্যুদণ্ড হয়।

26. ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ বা জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন গড়ে ওঠার কারণ কী ছিল?

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ভারতের জাতীয় রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠন। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পিছনে নানা কারণ ছিল।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনের কারণ –

উনিশ শতকে নানা তর্কবিতর্কের পর শেষপর্যন্ত ভারতে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পথ প্রশস্ত হয়। কিন্তু নানা কারণে প্রচলিত এই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হন।

প্রথমত, ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। এজন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে মনে করা শুরু করেন।

দ্বিতীয়ত, তাঁরা মনে করতেন শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন না করতে পারলে, ভারতীয়দের একটি মহান জাতি হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, ইংরেজি ভাষা দ্বারা ভারতীয়রা প্রকৃত জ্ঞানার্জন লাভ করতে পারছে না। তাদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তাভাবনারও বিকাশ ঘটছে না। তাই তাঁদের দাবি ছিল মাতৃভাষার মাধ্যমে এদেশের শিক্ষাদান ও পাঠক্রম গড়ে উঠুক।

মূল্যায়ন – 1902 খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য ‘ডন সোসাইটি’ তথা সতীশচন্দ্র মুখার্জির উদ্যোগ। মূলত ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ ছিল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শেষপর্যন্ত 1906 খ্রিস্টাব্দে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গড়ে ওঠে।

27. অনুশীলন সমিতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

বিশ শতকের সূচনায় বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ভাবধারায় গড়ে ওঠা বিপ্লবী সমিতিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল অনুশীলন সমিতি।

অনুশীলন সমিতি ও তার কার্যকলাপ

প্রতিষ্ঠা – 1902 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সতীশচন্দ্র বসু ‘অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র। এর সহ-সভাপতি হন ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ। এই সমিতির অন্যান্য সক্রিয় সদস্য ছিলেন বারীন ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

আদর্শ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অনুশীলন তত্ত্বের আদর্শের ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই বিপ্লবী সমিতিতে বিপ্লবীদের শরীরচর্চার আড়ালে লাঠি খেলা, তরবারি চালনা, সাঁতার শিক্ষা, কুস্তি ও অস্ত্র শিক্ষা ইত্যাদি শেখানো হতো। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবীদের প্রসার ঘটানো এবং সেই উদ্দেশ্যে গোপনে বিপ্লবীদের হাতে-কলমে শেখানো হতো কেমন করে বোমা তৈরি করতে হয় বা আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে হয়। বিপ্লবীদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করার জন্যও তাদের বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত করা হতো।

ব্যাপ্তি – ক্রমে ক্রমে এই সমিতির কার্যকলাপ পূর্ব বাংলায় ব্যাপক সাড়া জাগায়। ঢাকা (পুলিন দাস), রংপুর, গয়ালিয়র, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, মোরাদাবাদ (মীরাট) প্রভৃতি স্থানে এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা অনুশীলন সমিতির তত্তাবধায়ক ছিলেন পুলিনবিহারী দাস। সমিতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে ‘স্বদেশবান্ধব বিপ্লবী সমিতি’।

বিভাজন – কিন্তু শীঘ্রই দলীয় মতাদর্শ নিয়ে এই সমিতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ নেতা 1906 খ্রিস্টাব্দে ‘যুগান্তর গোষ্ঠী’ নামে নতুন একটি গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলেন। এদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লববাদের আদর্শ প্রচার করা।

28. টীকা লেখো – বুড়িবালামের যুদ্ধ।

অথবা, টীকা লেখো – বিপ্লবী ‘বাঘা যতীন’।

বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘাযতীন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ‘যুগান্তর গোষ্ঠীর’ সদস্যপদ গ্রহণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের এদেশ থেকে হঠানোর জন্য তিনি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

বিপ্লবী কার্যকলাপ –

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিপ্লবী কার্যকলাপ জোরদার হয়। এই উদ্দেশ্যে 1914 খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার ‘রডা অ্যান্ড কোম্পানির’ দোকান থেকে 50টি মাউজার পিস্তল ও প্রচুর কার্তুজ লুঠ করেন।
  • ইতিমধ্যে তিনি দেশে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। জার্মানি থেকে অস্ত্র আনার জন্য তাঁর সহকর্মী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য জার্মানির ‘ন্যাশনাল পার্টির’ সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ ব্যাপারে সাংহাইয়ের জার্মান কনসালের সঙ্গে কথাও পাকা হয়।
  • সেই মতো যতীন্দ্রনাথ তাঁর দলবল নিয়ে ওড়িশার বালেশ্বরে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অস্ত্র বোঝাই ‘ম্যাভেরিক’, ‘অ্যানি লারসেন’ ও ‘হেনরি এস’ জাহাজগুলি ধরা পড়ে। 1915 খ্রিস্টাব্দের 9 সেপ্টেম্বর পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে বালেশ্বরে পৌঁছান। বুড়িবালাম নদীর তীরে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলে চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী মারা যান। মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ও নীরেন দাশগুপ্ত ধরা পড়েন এবং তাঁদের ফাঁসি হয়। যতীন্দ্রনাথ গুরুতর আহত হয়ে 11 সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মারা যান।

পরিণতি – এইভাবে শেষ হয় বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের এক অগ্নিময় অধ্যায়। বুড়িবালামের যুদ্ধে বাংলার বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ও বীরগাথা ভারতবাসীকে জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত করে। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, বুড়িবালামের যুদ্ধ বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা।


আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, “জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিষয়সংক্ষেপ