অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া-সহযোগিতা ও বিদ্রোহ-অষ্টম শ্রেণী ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

1. সতীদাহ প্রথা নিবারণ আইন প্রণয়ন এবং রাধাকান্ত দেবের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।

উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতের সমাজ জীবনে নানা কুসংস্কারের শৃঙ্খল ছিল। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সতীদাহ প্রথা। স্বামী মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে হতো। সতীদাহ প্রথা মারাত্মক উপদ্রবের আকার ধারণ করলে, এই প্রথা যারা বন্ধ করার চেষ্টায় সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তবে এই সমাজ সংস্কার কার্যে তিনি বেশ কয়েকবার বাধার সম্মুখীন হন।

রাধাকান্ত দেবের বিরোধিতা – এই অমানবিক সতীদাহ প্রথা বিলোপে রাজা রামমোহন রায় সরব হন। তিনি এই বর্বর প্রথা বিলোপের জন্য পথে নামেন। পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার শাস্ত্র পাঠ করে প্রমাণ করেন যে, এই প্রথা ধর্মবিরোধী। এই প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য তিনি 1818 খ্রিস্টাব্দে ‘সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তক’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এই বছরেই তিনি বাংলার 300 জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষর সংবলিত একটি আবেদনপত্র বড়লাট হেস্টিংসের নিকট জমা দেন।

সরকারি আইন – শেষপর্যন্ত রাজা রামমোহন রায়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভারতের বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 খ্রিস্টাব্দে ‘সপ্তদশ বিধি’ দ্বারা ভারতে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই আইনে বলা হয় যে, সতীদাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

মন্তব্য – এইভাবে রামমোহন রায়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও ব্রিটিশ সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের ফসল ছিল সতীদাহ প্রথা বিরোধী আইন। এই আইন প্রণয়নের পর থেকেই ভারতে সতীদাহ প্রথার অবসান ঘটে।

2. রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে কী জানো?

উনিশ শতকে হিন্দু সমাজে একাধিক কুসংস্কার চালু ছিল, যা সমাজের পক্ষে মোটেই সুখকর ছিল না। রামমোহন রায় এই সব কুসংস্কার দূর করতে উদ্যোগী হন।

রাজা রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলন

সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা – সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বই পড়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, এই প্রথা হলো ধর্মবিরুদ্ধ। এ বিষয়ে জনমত গঠনের জন্য তিনি কলম ধরেন এবং বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দেন। শেষপর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ সরকারের দ্বারস্থ হন। রামমোহনের আবেদনে সাড়া দিয়ে 1829 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এই প্রথার অবসান ঘটায়।

অন্যান্য আন্দোলন – এছাড়া সে যুগের সমাজে আরও কিছু সামাজিক ব্যাধির প্রচলন ছিল, যেমন—বহুবিবাহ, পণপ্রথা, কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি। রামমোহন এসবের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছিলেন।

নারীজাতির উন্নতির প্রয়াস – সমাজে অনগ্রসর ও অবহেলিত নারীজাতির উন্নতির জন্য তাঁর আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথা রদ করতে উদ্যোগী হন। তিনি নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং নারীশিক্ষার প্রসারের জন্য আন্দোলন করেন। স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জন্য তিনি আন্দোলন করেছিলেন।

মূল্যায়ন – তা সত্ত্বেও অনেকেই তাঁর সংস্কার ও জীবনাদর্শের মধ্যে স্ববিরোধিতা লক্ষ করেছেন। তাঁদের মতে, তিনি স্বয়ং কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতাবাদ ও সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি যতটা সরব ছিলেন, ততটাই নীরব ছিলেন বহুবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে।

3. বিধবাবিবাহ আন্দোলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো।

উনিশ শতকে বাংলার হিন্দু সমাজে বিধবা নারীদের অবস্থা ছিল করুণ। তারা নানা সামাজিক বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এদের এক নতুন জীবন দানের জন্য বিধবা বিবাহ আন্দোলন পরিচালনা করেন।

বিধবাবিবাহ আন্দোলন –

পত্রিকা প্রকাশ – বিধবাবিবাহের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য বিদ্যাসাগর ‘সর্বশুভকরী সভা’ গড়ে তোলেন। এই সভার মুখপত্র হিসেবে তিনি সর্বশুভকরী (1850) নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাতে তিনি ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন। এছাড়া তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে বিধবাবিবাহের পক্ষে তিনি জোরালো বক্তব্য পেশ করেন।

গ্রন্থ রচনা – 1855 খ্রিস্টাব্দে ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদবিষয়ক প্রস্তাব’ নামক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। তাতে তিনি ‘পরাশর সংহিতার’ উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত।

জনমত গঠন – শুধু তাই নয় বিধবাবিবাহের পক্ষে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তিনি প্রচার করেন। 1855 খ্রিস্টাব্দে তিনি 987 জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষর গ্রহণ করে সরকারের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দেন।

আইন প্রণয়ন – শেষপর্যন্ত বিদ্যাসাগরের আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ভারতের বড়োলাট লর্ড ক্যানিং 1856 খ্রিস্টাব্দে পঞ্চদশ আইন দ্বারা ‘বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করেন। আইন প্রণয়নের পর তিনি তাঁর নিজের পুত্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে অনন্য নজির সৃষ্টি করেন। জানা যায় তিনি 50 জনের বেশি বিধবার পুনর্বিবাহ দিয়েছিলেন।

মন্তব্য – কিন্তু সেই সময় বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত উদ্যোগ সত্ত্বেও রক্ষণশীল সমাজের প্রবল বিরোধিতার কারণে এই প্রথা খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। তবুও নারীমুক্তি ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর এই অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

4. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে কী জান?

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনের এক প্রাতঃস্মরণীয় যুগপুরুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যিনি প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করেছিলেন।

বিদ্যাসাগরের সংস্কার আন্দোলন

  • বিধবা বিবাহ আন্দোলন – সেসময় হিন্দুসমাজে বাল্যবিধবাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। নানা সামাজিক বাধানিষেধের ফলে তাদের জীবন ছিল ওষ্ঠাগত। এই দুঃখদুর্দশার হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে বিদ্যাসাগর লড়াই শুরু করেন। সেই লড়াইয়ের ফল ছিল 1856 খ্রিস্টাব্দের পঞ্চদশ আইন। এই আইনের সাহায্যে ব্রিটিশ সরকার এদেশে বিধবা বিবাহ আইন বলবৎ করে।
  • বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন – সেযুগে হিন্দু সমাজে পুরুষরা বহুবিবাহ করত। বিদ্যাসাগর এই প্রথার বিরুদ্ধে সরব হন। এজন্য তিনি সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করেন।
  • বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন – সে যুগে হিন্দু সমাজে কমবয়সি মেয়েদের বিবাহ দেওয়া হত। এই অবৈজ্ঞানিক প্রথার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করেন। শেষপর্যন্ত সরকার আইন পাস (1860) করে মেয়েদের বিবাহের বয়স কমপক্ষে 10 বছর ধার্য করে।
  • অন্যান্য প্রথার বিরোধিতা – এ ছাড়া তিনি সে যুগে প্রচলিত কৌলিন্য প্রথা, গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন দেওয়ার প্রথা, জাতিভেদ প্রথা ও কুষ্ঠরোগীকে হত্যা করার মতো ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

মূল্যায়ন – এসব কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মানবতাবাদী সমাজসংস্কারককে বলেছেন, ‘এই ভীরুর দেশে তিনিই একমাত্র পুরুষ সিংহ।’ অন্যদিকে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

5. উনিশ শতকে বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান কী ছিল?

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পুরোধায় ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নারীমুক্তি আন্দোলনে তিনি এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন।

বিদ্যাসাগরের অবদান –

  • বিধবা বিবাহ আন্দোলন – বৈধব্য ছিল সেযুগের নারীদের কাছে এক চরম অভিশাপ। এই বৈধব্যের ফলে তাদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তারা ছিল সামাজিক অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। তাদের এই দুরবস্থা দূর করার জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় এগিয়ে আসেন। তিনি এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার 1856 খ্রিস্টাব্দে পঞ্চদশ আইন জারি করে বিধবা বিবাহের পক্ষে রায় দেয়। এই আইন বলবৎ হওয়ার পর বিদ্যাসাগর নিজের পুত্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে বিধবা বিবাহ আইনের মর্যাদা দেন।
  • অন্যান্য আন্দোলন – সেযুগে বাংলায় বেশ কিছু সামাজিক কুসংস্কার চালু ছিল। এগুলি ছিল—বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ। এইসব সামাজিক কুসংস্কারের শিকার হত বাংলার হতভাগ্য নারীসমাজ। সরকার 1860 খ্রিস্টাব্দে এক আইন দ্বারা মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স 10 বছর ধার্য করে।
  • নারীশিক্ষা আন্দোলন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন নারীশিক্ষা ছাড়া নারীমুক্তি সম্ভব নয়। তাই নারীজাতির শিক্ষার জন্য তিনি বাংলায় 35টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ ও স্ত্রীশিক্ষা সম্মিলনী।

মন্তব্য – বিদ্যাসাগর বিভিন্ন জনহিতকর কাজে নিজের জীবন অতিবাহিত করেন। তাই তাঁকে বাংলার মানবতাবাদী সংস্কারক বলা হয়।

6. বাংলায় ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের পরিচয় দাও।

উনিশ শতকে বাংলা ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের একটি দিক ছিল ব্রাহ্ম আন্দোলন।

ব্রাহ্ম আন্দোলন –

রাজা রামমোহন রায় – ভারতে ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন রামমোহন রায়। একেশ্বরবাদ প্রচার করার জন্য তিনি 1815 খ্রিস্টাব্দে ‘আত্মীয়সভা’ গড়ে তোলেন। তিনি 1829 খ্রিস্টাব্দে ‘ব্রাহ্মসভা’ স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে এটি ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত হয়। হিন্দুধর্মের নানাবিধ কুসংস্কার, মূর্তি-পুজো, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কন্যা পণপ্রথা, সহমরণ প্রভৃতি প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। অবশেষে তাঁরই উদ্যোগে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 খ্রিস্টাব্দে আইন করে সতীদাহ প্রথা রদ করেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর – রামমোহন রায়ের অর্ধসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে এগিয়ে আসেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ব্রাহ্ম আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে এই আন্দোলনের সপক্ষে বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখেন। তিনি হিন্দুধর্মের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে বৈদিক নিয়মনিষ্ঠা পালন করার পক্ষে ছিলেন।

কেশবচন্দ্র সেন – কেশবচন্দ্র সেনের প্রচেষ্টায় ব্রাহ্ম আন্দোলন আরও জোরদার হয়। তাঁর প্রচেষ্টায় এই আন্দোলন সর্বভারতীয় রূপ নেয়। তিনি ব্রাহ্মধর্মে প্রগতিশীল ধারা আনতে সচেষ্ট হন। বিধবাবিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ প্রভৃতির পক্ষে তিনি সওয়াল করেন। কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল কথা ছিল ভগবৎপ্রেম, প্রার্থনা ও অনুশোচনা।

ব্রাহ্মসমাজ – ব্রাহ্মসমাজের শুদ্ধতা প্রশ্নে এই সংগঠন দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি কেশবচন্দ্র সেনের ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ এবং অন্যটি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’। নারী স্বাধীনতার প্রশ্নে ব্রাহ্মসমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়। কেশবচন্দ্র সেনের প্রগতিশীল নীতি, বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষানীতিতে বিরক্ত হয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ 1878 খ্রিস্টাব্দে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যদিকে কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠা করেন ‘নববিধান ব্রাহ্মসমাজ’। কেশবচন্দ্র সেনের প্রচেষ্টায় 1872 খ্রিস্টাব্দে সরকার ‘তিন আইন’ পাস করে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে এবং অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ করে। এর সমর্থক ছিলেন পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী।

মন্তব্য – কিন্তু নানা কারণে এই সংস্কার আন্দোলন বেশি সংখ্যক মানুষের মনে রেখাপাত করেনি। উনিশ শতকের শেষদিকে এই আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মূল কারণ ছিল ব্রাহ্মসমাজে বারংবার ভাঙন এবং মতানৈক্য।

7. ভারতীয় ধর্ম ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের কী প্রভাব লক্ষ করা যায়?

উনিশ শতকে ভারতের সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে ব্রাহ্মসমাজের কার্যকলাপ এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ভারতীয় হিন্দুধর্ম ও সমাজে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের প্রভাব –

নারীজাতির উন্নতি – সেসময় ভারতের বঞ্চিত ও অবহেলিত নারীজাতির উন্নতির জন্য ব্রাহ্মসমাজের অবদান কম ছিল না। এই আন্দোলনের ফলে এদেশে অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়, নারীদের পর্দা প্রথার অবসান হয়। পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং নারীরা উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পায়।

জনসেবার ধর্ম – ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের একটি ইতিবাচক দিক ছিল মানবসেবার ধর্ম। দুর্ভিক্ষ ও মহামারি পীড়িত বাংলায় মানুষদের পাশে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন ও তাঁর অনুগামীরা যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তা ছিল অভূতপূর্ব।

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা – একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ধর্মীয় উদারনীতি ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রচার করে ব্রাহ্মসমাজের নেতারা ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় সংহতির ধারণা গড়ে তুলেছিলেন।

কুসংস্কার দূরীকরণ – ব্রাহ্মনেতাদের অনেকেই ছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামি মুক্ত। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী। ফলে তাঁদের হাত ধরে ভারতে প্রচলিত অনেক সামাজিক কুসংস্কার দূর হয়।

মূল্যায়ন – ব্রাহ্মসমাজের মতাদর্শ ভারতীয় ধর্ম ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। এই সংগঠনের মতাদর্শ ভারতীয়দের মধ্যে নতুন চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিল। আবার অনেকের মতে, এই আন্দোলনের ফলে ভারতীয় সমাজ খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত হয়েছিল।

8. ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল বক্তব্য কী ছিল? এই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাগুলি উল্লেখ করো।

একেশ্বরবাদ প্রচার করার জন্য রাজা রামমোহন রায় 1828 খ্রিস্টাব্দে ‘ব্রাহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ব্রাহ্ম-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ।

ব্রাহ্ম আন্দোলনের বক্তব্য – এই আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল—

  • একেশ্বরবাদের প্রসার – ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রধান কার্যাবলি ছিল সার্বজনীন একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করা। ব্রাহ্মবাদীরা মনে করতেন ঈশ্বর এক ও অভিন্ন এবং তিনি নিরাকার। তাঁরা পৌত্তলিকতা অর্থাৎ, পুতুল পূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁরা আড়ম্বরপূর্ণ ধর্মীয় আচারের ধার ধারতেন না।
  • কুসংস্কারের বিরোধিতা – অন্যদিকে তাঁরা বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ প্রথা, কৌলিন্য প্রথা, অস্পৃশ্যতা প্রভৃতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্যই ছিল এইসব সামাজিক ব্যাধি দূর করে এক সংস্কারমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ব্রাহ্ম আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা – কিন্তু নানা কারণে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণগুলি হল—

একতার অভাব – ব্রাহ্ম আন্দোলনের লক্ষ্য ও পদ্ধতি নিয়ে ব্রাহ্মনেতাদের মধ্যে বারবার মতপার্থক্য দেখা দেয়। সেজন্য ব্রাহ্মসমাজ বারবার বিভাজিত হয়ে গড়ে ওঠে— আদি ব্রাহ্মসমাজ, ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, নববিধান সমাজ ইত্যাদি। এর ফলে ব্রাহ্ম আন্দোলন ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালিত হতে পারেনি।

শহরকেন্দ্রিকতা – এই আন্দোলন সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। শহরের শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

হিন্দুসমাজের উদাসীনতা – ব্রাহ্মবাদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ উদাসীন ছিল। কারণ সে সময় ব্রাহ্মনেতারা হিন্দুধর্মকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা শুরু করেন। রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ ব্রাহ্ম সমাজের এই দিকটি ভালো চোখে দেখেনি।

9. প্রার্থনা সমাজ – টীকা লেখো।

উনিশ শতকে ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে একাধিক সংস্কারবাদী সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল প্রার্থনা সমাজ।

প্রার্থনা সমাজের সংস্কার আন্দোলন –

প্রতিষ্ঠা – ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে প্রভাবিত হন ডা. আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ। তিনি 1867 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে প্রার্থনা সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।

আদর্শ –

  • প্রার্থনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।
  • তিনি বেদকে অভ্রান্ত বলে মনে করতেন না।
  • প্রার্থনা সমাজ সনাতন হিন্দু রীতিনীতি মেনে সমাজসংস্কারের ব্রত গ্রহণ করেছিল।
  • সর্বোপরি এই সমাজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল হিন্দুসমাজকে উন্নত করে তোলা।

প্রসার – প্রার্থনা সমাজের আন্দোলন মহারাষ্ট্রের জনসমাজে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও রামকৃষ্ণ ভান্ডারকরের মতো নেতা প্রার্থনা সমাজে যোগদান করায় এই আন্দোলন এক আলাদা মাত্রা লাভ করে।

কার্যাবলি –

  • প্রার্থনা সমাজের উদ্যোগে মহারাষ্ট্রে বেশ কিছু নৈশ বিদ্যালয় ও অনাথ আশ্রম গড়ে ওঠে।
  • বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, মদ্যপান ও অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলন পরিচালিত হয়।
  • স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের জন্য মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রতিষ্ঠা করেন বিধবা বিবাহ সমিতি, পুনা সার্বজনিক সভা, দাক্ষিণাত্য শিক্ষা সমিতি ইত্যাদি।

মন্তব্য – প্রার্থনা সমাজের কার্যকলাপ মূলত হিন্দুধর্ম ও সমাজকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। তবুও সময়ের নিরিখে তাঁদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও মহত্ত্বকে কখনোই ছোটো করে দেখা যায় না।

10. উনিশ শতকে বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ডিরোজিও/নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর অবদান মূল্যায়ন করো।

অথবা, টীকা লেখো – নব্যবঙ্গ আন্দোলন / ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী

উনিশ শতকে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও বাংলায় এক প্রগতিশীল সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন। ইয়ংবেঙ্গল বা নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী ছিল এই আন্দোলনের ধারক ও বাহক।

ডিরোজিও/নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর অবদান –

  • ডিরোজিওর অবদান – বাংলায় নব্যবঙ্গ আন্দোলনের জনক ছিলেন ডিরোজিও। পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে তিনি সেসময় হিন্দু সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস—দূর করতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ‘এজ অব রিজন’ গ্রন্থটি ছিল তাঁর সংস্কার আন্দোলনের প্রেরণা।
  • কার্যকলাপ – 1827 খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ নামক এক বিতর্ক সভা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে হিন্দুধর্মের জাতিভেদপ্রথা, মূর্তিপূজা, অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি বিষয়ে মত বিনিময় চলত। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ ব্যবস্থাকে আঘাতের সাহায্যে জাগ্রত করতে তিনি বেশ কয়েকটি পত্রপত্রিকাও সম্পাদনা করেন।
  • ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী – মাত্র 23 বছর বয়সে ডিরোজিওর জীবনদীপ নিভে যায়। কিন্তু তাঁর সংস্কার আন্দোলন থেমে থাকেনি। তাঁর ছাত্রবৃন্দ এই আন্দোলনের গতি সচল রেখেছিলেন। ডিরোজিওর অনুগামীরা ‘নব্যবঙ্গ’ দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই দলের সদস্যগণ ছিলেন—রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণমোহন মুখোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার প্রমুখ।
  • কার্যকলাপ – নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী জাতিভেদপ্রথা মানত না। পৈতা ছিঁড়ে, গোরুর মাংস খেয়ে, গঙ্গা স্নান বন্ধ করে বা কালীঘাটের কালীমাকে ‘গুডমর্নিং ম্যাডাম’ সম্বোধন করে হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতাকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন।

মূল্যায়ন – নব্যবঙ্গ আন্দোলন বেশি সংখ্যক মানুষের মনে রেখাপাত করেনি। ডিরোজিয়ানদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়ে আসে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাঁদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কারণ ছিল তাঁদের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ ভালোবাসা। এই কারণেই ড. অমলেশ ত্রিপাঠী ডিরোজিয়ানদের ‘নকলনবিশের দল’ বলে বিদ্রুপ করেছেন।

11. স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, টীকা লেখো – আর্যসমাজ

উনিশ শতকে ভারতে সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তি ছিলেন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী।

আর্যসমাজ/দয়ানন্দের সংস্কার আন্দোলন –

  • উদ্দেশ্য – দয়ানন্দ সরস্বতী অনুভব করেছিলেন যে, ভারতীয় হিন্দুসমাজ জাতপাত, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধকারে নিমজ্জিত। এসবের হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে তিনি 1875 খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে (অধুনা মুম্বই) আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • আদর্শ – তিনি মূর্তিপূজা ও জাতিভেদপ্রথার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি স্ত্রীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ ও সমুদ্রযাত্রার পক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে পাশ্চাত্যের কাছ থেকে আমাদের শেখার কিছু নেই; বেদই যথেষ্ট। তিনি চেয়েছিলেন ভারতবাসীর জাতীয় চেতনার জাগরণ। তিনি তাঁর আদর্শ প্রচারের জন্য ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ ও ‘বেদভাষ্য’ নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।
  • শুদ্ধি আন্দোলন – যে সমস্ত হিন্দুরা হিন্দু ধর্মত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছে, দয়ানন্দ তাদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য এক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যা শুদ্ধি আন্দোলন নামে পরিচিত।

প্রসার – 1883 খ্রিস্টাব্দে স্বামী দয়ানন্দের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর সংস্কার আন্দোলন থেমে থাকেনি। ক্রমে এই আন্দোলন উত্তর ভারতের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লালা হংসরাজ লাহোরে ‘অ্যাংলো-বৈদিক কলেজ’ প্রতিষ্ঠা (1886 খ্রিস্টাব্দ) করেন। 1902 খ্রিস্টাব্দে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ হরিদ্বারে ‘গুরুকুল আর্য বিদ্যালয়’ গড়ে তোলেন।

মন্তব্য – এইভাবে আর্যসমাজের আন্দোলন বিশেষ করে শুদ্ধি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুসমাজের পুনর্জাগরণ ঘটে। হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যবোধ ও জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়।

12. আলিগড় আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো। অথবা, এই আন্দোলনের দুর্বলতা আলোচনা করো।

রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে — ‘উনিশ শতকের নবজাগরণ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিন্দুদের কাছে যা ছিল, আলিগড় আন্দোলনও মুসলিমদের কাছে ছিল ঠিক তাই।’ আলিগড় আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

  • ব্রিটিশদের সাহায্য নিয়ে মুসলিম সমাজের সংস্কার ঘটানো।
  • ব্রিটিশের সঙ্গে আপোসের মাধ্যমে মুসলিমদের স্বার্থ বজায় রাখা। তাই কংগ্রেসের পরিবর্তে ব্রিটিশের প্রতি রাজনৈতিক দিক থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
  • এই আন্দোলনে সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মুসলমান শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল না।
  • এই আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম ধর্মের উন্মাদনা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
  • গোঁড়া মৌলবিরা এই আন্দোলনের সংস্কারমুখিতায় বাধা দান করেছিল।
  • শুধুমাত্র হিন্দুদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক আন্দোলনগুলির বিরোধিতা করার জন্য মুসলমানরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে।

মূল্যায়ন – মুসলিম সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিবর্তনের জন্য এই আন্দোলন গড়ে তোলা হলেও উত্তরপ্রদেশের কিছু জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের নেতিবাচক ভূমিকায় এই আন্দোলন গতিশীল হতে পারেনি। আলিগড় কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পেত মুষ্টিমেয় উচ্চবংশজাত মুসলিম পরিবার। ফলে এই কলেজকে কেন্দ্র করে পরিচালিত আন্দোলনে মুসলিম সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেনি।

13. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সংঘটিত কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহগুলির কারণ কী ছিল?

1818 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোম্পানির ঔপনিবেশিক অর্থনীতি তথা অপশাসন ও শোষণের যাঁতাকলে পড়ে এদেশের কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তাই তারা বাধ্য হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

কৃষক বিদ্রোহের কারণ –

  • ভূমিরাজস্ব নীতি – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছিল ভূমিরাজস্বকেই। তাই দেওয়ানি লাভের পর (1765 খ্রিস্টাব্দ) কোম্পানি এদেশে নানান ভূমিরাজস্ব নীতি প্রয়োগ করে। যার মধ্যে ছিল চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি, মহলওয়ারি, তালুকদারি প্রভৃতি বন্দোবস্ত। এই সমস্ত রাজস্বনীতিতে কৃষকরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • খাজনা বৃদ্ধি – 1765 খ্রিস্টাব্দে দ্বৈতশাসন চালু করে কোম্পানি সুবে বাংলায় ভূমিরাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে। আবার কোম্পানিকে সন্তুষ্ট করার জন্য সুবাদার দেওয়ান রেজা খাঁ ‘নজর’ নামক এক উপরিকর আদায় করতেন।
  • কৃষকদের ওপর অত্যাচার – কোম্পানি প্রবর্তিত বিভিন্ন ভূমিবন্দোবস্ত নীতি দ্বারা কৃষকরা জমিহারা হয়। জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। জমিদাররা নানাভাবে কৃষকদের ওপর অত্যাচার চালাতেন। খাজনা বাকি পড়লে কৃষকদের মারধর থেকে শুরু করে জমি থেকে উৎখাত পর্যন্ত করা হত।
  • মহাজনী শোষণ – কৃষিজমি চাষ করার জন্য বা জমিদারদের রাজস্ব মেটাতে কৃষকরা মহাজনদের কাছে ঋণ নিত। সুযোগ বুঝে মহাজনরা কৃষকদের কাছ থেকে চড়া সুদ আদায় করত। কখনও বা কৃষকরা মহাজনি সুদ মেটানোর জন্য কম দামে মহাজনদের ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হত।

মূল্যায়ন – এসব কারণে কোম্পানির আমলে ভারতে একাধিক কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা ইত্যাদি।

14. সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি উল্লেখ করো।

মহাবিদ্রোহের পূর্বে ভারতে যতগুলি আদিবাসী কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ।

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ –

  • দিকুদের শোষণ – সাঁওতালগণ জমিদার, বহিরাগত বণিক, মহাজন এবং কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে বাধ্য হয়েছিল।
  • জমি বেদখল – সাঁওতালগণ অমানুষিক পরিশ্রম করে ‘দামিন-ই-কোহি’ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু কোম্পানি ধীরে ধীরে সেখানে তাদের অধিকার কায়েম করে। সাঁওতালদের নিষ্কর জমিগুলি বিদেশি জমিদার ও ইজারাদারদের হাতে চলে যায়।
  • জমিদারদের শোষণ – জমিদার ও ইজারাদারগণ সাঁওতাল রায়তদের কাছ থেকে অত্যন্ত চড়া হারে রাজস্ব আদায় করত, যা পরিশোধ করার ক্ষমতা এই হতদরিদ্র কৃষকদের ছিল না।
  • মহাজনী শোষণ – জমির ওপর নিজেদের স্বত্ব বজায় রাখতে সাঁওতালরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিত। এই সুদের হার ছিল 50-500 শতাংশ। জমিদার ও মহাজনরা সাঁওতালদের ঋণ দেওয়ার সময়েও কারচুপি করত। কারণ গরিব সাঁওতালদের মধ্যে অনেকেই লেখাপড়া জানত না বা হিসাব করতে পারত না। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগে মহাজন ও জমিদাররা সাঁওতালদের ঠকাত। ফলে অশিক্ষিত চাষিরা মহাজনদের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হত। মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় সাঁওতালদের দুটি বন্ডে সই দিতে হত। একটি হল ‘কামিয়াতি’ অর্থাৎ মহাজনদের জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দান এবং অন্যটি হল ‘হারওয়াহি’ অর্থাৎ মহাজনদের জমিতে লাঙল দেওয়া।
  • বণিকদের শোষণ – বিদেশি বণিকরাও সাঁওতাল চাষিদের ঠকাত। তাদের দু-রকমের বাটখারা ছিল। তারা যখন ফসল ক্রয় করত তখন বেশি ওজনের বাটখারা (কেনারাম) ব্যবহার করত এবং যখন ফসল বিক্রি করত তখন কম ওজনের (বেচারাম) বাটখারা ব্যবহার করত। এর ফলে সাঁওতাল চাষিদের ভাগ্যে জুটত কেবল অভাব আর দুঃখ।
  • ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা – অন্যদিকে খ্রিস্টান মিশনারিরাও এই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে এবং তারা গরিব সাঁওতালদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে থাকে। তাই খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ সাঁওতালগণ ভালো চোখে দেখেনি।

মূল্যায়ন – এইভাবে শোষিত হতে হতে একদিন সাঁওতালদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা সংগঠিত হয়। 1855 খ্রিস্টাব্দের 30 জুন শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ।

15. সাঁওতাল বিদ্রোহের (1855 খ্রিস্টাব্দ) সুদূরপ্রসারী ফল কী হয়েছিল? অথবা, এই বিদ্রোহের গুরুত্ব আলোচনা করো।

নানা কারণে সাঁওতাল বিদ্রোহ অবদমিত হয়। পরাধীন ভারতের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। নানা কারণে এই বিদ্রোহ অবদমিত হলেও এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব –

  • সাঁওতাল পরগনা গঠন – সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও শেষপর্যন্ত কোম্পানি সাঁওতালদের বিশেষ কিছু দাবি-দাওয়া মেনে নেয়। সাঁওতালদের বসবাসের জন্য প্রায় 9 হাজার বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে এক নতুন পরগনা গঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকার এটিকে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ বলে চিহ্নিত করে।
  • অরণ্য আইন ঘোষণা – 1859 খ্রিস্টাব্দে অরণ্য আইন বলবৎ হয়। অরণ্যের কিছু অংশে সাঁওতালদের বিশেষ অধিকার স্বীকৃত হয়। সাঁওতাল গোষ্ঠীপতিদের অধিকার পুনঃস্বীকৃত হয়। বিদ্রোহ চলাকালে তাদের বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হয়।
  • সাঁওতালদের উন্নতি – সাঁওতাল বিদ্রোহের পর কোম্পানি সাঁওতালদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে। অবস্থাসম্পন্ন সাঁওতালদের মধ্যে এই সময় ইংরেজি শেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে বহু ভূমিহীন সাঁওতাল পরিবার রুজি-রোজগারের আশায় নিজেদের এলাকা ছেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন – আধুনিককালের ঐতিহাসিকগণ এই বিদ্রোহকে শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহ বলে মনে করেন না। ড. সুপ্রকাশ রায়ের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল ভারতের প্রথম সশস্ত্র বিপ্লব। তিনি আরও বলেছেন যে, সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের অগ্রদূত। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার একে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘পূর্ব মহড়া’ বলে অভিহিত করেছেন।

16. মুন্ডা বিদ্রোহের পটভূমি নির্ণয় করো।

অথবা, কী কী কারণে মুন্ডা বিদ্রোহ হয়?

সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে বেশ কয়েকটি কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মুন্ডা বিদ্রোহ (1899-1900 খ্রিস্টাব্দ)। এই বিদ্রোহ ‘উলগুলান’ নামেও সমধিক পরিচিত।

মুন্ডা বিদ্রোহের পটভূমি/কারণ –

  • চিরাচরিত প্রথার অবসান – ছোটোনাগপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে মুন্ডা সম্প্রদায়ের কৃষকদের বসবাস ছিল। এখানে তারা দীর্ঘদিন ধরে যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে জমি চাষ করত। একে বলা হয় খুৎকাঠি প্রথা। ইংরেজদের আগমনে সেখানে এই প্রথার অবসান হয়। এ ছাড়া মুন্ডা সমাজে প্রচলিত সামাজিক আইন-কানুনগুলিরও অবসান হয়। এসবের ফলে মুন্ডারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
  • জমি হস্তান্তর – এদেশে ইংরেজ কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ছোটোনাগপুর এলাকাতেও জমি-জায়গা জমিদারদের অধীন হয়ে যায়। ফলে মুন্ডারা জমিদার ও জোতদারদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণের শিকার হয়।
  • প্রতারণা – এই এলাকায় বহিরাগত মহাজন ও বণিকরা মুন্ডাদের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে তাদের নানাভাবে শোষণ করত। তাদের বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করা হত। কম মজুরি দিয়ে আসামের চা বাগানে চালান করা হত।
  • অন্যান্য কারণ – খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের ধর্মান্তকরণের চেষ্টা করত। বণিকরা নেশার দ্রব্য বিক্রি করে তাদের সর্বস্বান্ত করত।

মূল্যায়ন – এইভাবে নানা কারণে মুন্ডা সমাজের মধ্যে ক্ষোভ জমা হতে থাকে। শেষপর্যন্ত মুন্ডা নেতা বীরসা মুন্ডা শোষিত মুন্ডাদের জমিদার, বহিরাগত ও ইংরেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। ফলস্বরূপ 1899 খ্রিস্টাব্দে মুন্ডা বিদ্রোহের সূচনা হয়।

17. দাক্ষিণাত্যে কৃষকবিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল লেখো।

বা, দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা বলতে কী বোঝো?

বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে ইংরেজ সরকার যে ভূমি রাজস্বব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল তাকে বলা হয় ‘রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত’। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে 1875 খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের কৃষকরা যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তা ‘দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা’ বা ‘ডেকান রায়ট’ নামে পরিচিত।

হাঙ্গামার কারণ –

কৃষকদের জমি থেকে উৎখাত – রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে সরকার সরাসরি কৃষকের সঙ্গে জমির বন্দোবস্ত করলেও কৃষকরা জমির মালিক ছিল না। তাদের প্রায়শই জমি থেকে উৎখাত করা হত।

রাজস্বের হার বৃদ্ধি – এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার মাঝে মাঝে বাড়ানো হত, যা কৃষকদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হত না।

রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি – জমি জরিপ করে খাজনা নির্ধারিত না হওয়ার ফলে প্রায়ক্ষেত্রেই জমির পরিমাপের থেকে রাজস্বের পরিমাণ বেশি হত।

ঋণ মুকুব না হওয়া – মহারাষ্ট্রের জমি খুব অনুর্বর। তাছাড়া মাঝে মাঝে সেখানে খরার ফলে ফসল ফলত না। কিন্তু ফসল না ফললে ঋণ মুকুবের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

চাষিদের অজ্ঞতার সুযোগ – চড়া হারে রাজস্ব মেটাতে গিয়ে কৃষকরা সাউকারদের কাছ থেকে ঋণ নিত। এই সাউকাররা নিরক্ষর চাষিদের অজ্ঞতার সুযোগে সাদা কাগজে টিপসই করিয়ে নিয়ে সর্বস্ব আত্মসাৎ করত।

সরকারি আইনের অপ্রতুলতা – চাষিদের রক্ষা করার কোনো সরকারি আইন ছিল না।

তুলার মূল্য হ্রাস – এই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা চরম দুর্দশার শিকার হয়।

এই অবস্থায় 1870 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে খরার ফলে প্রচন্ড খাদ্যসংকট দেখা দেয়। মানুষ তখন মহাজন ও সাউকারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

বিদ্রোহের বিস্তার – কৃষকরা প্রথমে মারোয়াড়ি ও গুজরাটি মহাজনদের কাছ থেকে নথিপত্র কেড়ে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিতে থাকে। তাদের তাড়া খেয়ে মহাজনরা বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালায়। মহারাষ্ট্রের প্রায় সাতটি জেলায় এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ফলাফল –

  • এই আন্দোলন প্রথমে ব্রিটিশ বিরোধী ছিল না। পরে তা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়।
  • এই বিদ্রোহের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন ছিল। পুণার সার্বজনিক সভার নেতা রানাডে, যোশী বা রানাডের মতো বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলনকে সমর্থন জানায়।
  • সরকার কৃষকদের ক্ষোভ নিরসনের জন্য ‘দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ কমিশন’ গঠন করেন।

মূল্যায়ন – কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও কৃষকদের সমস্যার সমাধান হয় না। এই অবস্থার মধ্য দিয়েই বিংশ শতকের গোড়ায় মহারাষ্ট্রে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা ঘটে।

18. ওয়াহাবি আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল? এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আহমেদের ভূমিকা লেখো।

পটভূমি – ‘ওয়াহাবি’ শব্দের অর্থ নবজাগরণ। এই আন্দোলনের আসল নাম ‘তারিখ-ই-মহম্মদিয়া’ (মহম্মদ নির্দেশিত পথ)। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আবদুল ওয়াহাব আরবে ইসলাম ধর্মের কুসংস্কারগুলি দূর করার জন্য এই আন্দোলন শুরু করেন। ভারতে এই আন্দোলন প্রচলন করেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও তাঁর পুত্র আজিজ।

উদ্দেশ্য –

  • ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করা।
  • অত্যাচারী জমিদার ও সামন্তদের শোষণ থেকে কৃষকদের রক্ষা করা।
  • দার-উল-হারব (বিধর্মী) ভারতকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করা। সরকারি ভাষারূপে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা গ্রহণ এই আন্দোলনের পটভূমি রচনা করে।

সৈয়দ আহমেদের ভূমিকা – উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলির বাসিন্দা সৈয়দ আহমেদ মক্কায় হজ করতে গিয়ে ওয়াহাবি মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন। ভারতে ফিরে এসে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তুলে এই আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে ‘দার-উল-হারব’ রূপে চিহ্নিত করেন। তিনি ঘোষণা করেন ধর্মযুদ্ধের দ্বারা ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ করতে হবে। তিনি ইসলাম ধর্মের ‘শুদ্ধিকরণ’ আন্দোলন শুরু করেন। লক্ষ লক্ষ মুসলমান তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কলকাতা এবং বিহারে তিনি প্রচার চালান। ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে বিহারের পাটনা।

আন্দোলনের প্রসার – এনায়েত আলি, মহম্মদ হোসেন, আব্দুল গফুর, আব্দুল রহিম প্রমুখ সৈয়দ আহমেদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্দোলনের প্রসার ঘটান। এনায়েত আলি ফরিদপুর, নদীয়া, রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চলে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেন। নোয়াখালি, ময়মনসিংহ, পাবনা, শ্রীহট্ট প্রভৃতি অঞ্চলে এই আন্দোলন জঙ্গীরূপ ধারণ করে।

যুদ্ধ – সৈয়দ আহমেদ ইংরেজ বিরোধী আদর্শ প্রচার করলেও শিখদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। 1831 খ্রিস্টাব্দে বালাকোটের যুদ্ধে ওয়াহাবিরা পরাজিত হয় ও সৈয়দ আহমেদ নিহত হয়। সৈয়দ আহমেদের মৃত্যুর পর এনায়েত আলি, ইলাহি বক্স প্রমুখ ওয়াহাবি আদর্শ প্রচার করেন। তাঁরা এরপর ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু 1857 খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির ফলে ওয়াহাবি আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন – ঐতিহাসিক তারাচাঁদের মতে, উনিশ শতকের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করায় এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়। কিন্তু ওয়াহাবি আন্দোলনকারীদের ব্রিটিশ বিরোধী ভূমিকা মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনচন্দ্র পালের মতে, ‘ওয়াহাবিদের আত্মত্যাগ প্রথম পর্বের জাতীয় আন্দোলন কর্মীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।’ প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গ।

19. ওয়াহাবি আন্দোলনে তিতুমিরের ভূমিকা কী ছিল উল্লেখ করো। এই আন্দোলনের গুরুত্ব আলোচনা করো।

বাংলায় মির নিসার আলি বা তিতুমির ওয়াহাবি আন্দোলনকে তীব্রতর করেন। বাংলায় উত্তর 24 পরগনার বারাসাত অঞ্চলে তিতুমিরের নেতৃত্বে যে ওয়াহাবি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল তা ইতিহাসে ‘বারাসাত বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তির দ্বারা তিতুমির যশোর, পাবনা ও রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকদের নিয়ে ওয়াহাবি আন্দোলন সংগঠিত করেন।

বিদ্রোহের কারণ –

  • তিনি সুদখোর মহাজন ও অত্যাচারী নীলকরদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করার জন্য এই আন্দোলন শুরু করেন।
  • তিনি দার-উল-হারব ভারতকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
  • তিনি ইসলাম বিরোধী কাজকর্ম (মূর্তিপূজা, ফয়তা, তেজারতি ব্যবসা) দূরীভূত করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন।
  • তিনি বাংলায় ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে নিজেকে ‘বাদশাহ’ রূপে পরিগণিত করতে চেয়েছিলেন। [ফয়তা কথাটির অর্থ—শ্রাদ্ধ ও শান্তি]

বিদ্রোহের প্রসার – তিতুমিরের ডাকে সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ তীব্র আন্দোলন শুরু করেন যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে খুলনা, যশোর, ঢাকা, মালদা, নদীয়া, উত্তর চব্বিশ পরগনায়। নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমির বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে খাজনা আদায় শুরু করেন। তিতুমির 1830 খ্রিস্টাব্দের 16 নভেম্বর পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের গৃহ আক্রমণ করেন। এরপর তিনি নিজেকে ‘বাদশাহ’ বলে ঘোষণা করেন। নিজের ভাগিনেয় গোলাম মাসুমকে প্রধান সেনাপতিরূপে নিযুক্ত করেন।

বিদ্রোহ দমন – অবশেষে 1831 খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমিরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে কামানের আঘাতে বাঁশের কেল্লা গুঁড়িয়ে দেন। 1831 খ্রিস্টাব্দে 19 নভেম্বর তিতুমির যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে বারাসাত বিদ্রোহের অবসান ঘটে। ড. বিনয়ভূষণ চৌধুরির মতে, তিতুমিরের সংগ্রাম ছিল জমিদারের অনাচারের বিরুদ্ধে।

গুরুত্ব – এই আন্দোলন বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

  • এই আন্দোলনের হাত ধরেই সর্বপ্রথম মুসলিম সমাজের সংস্কার শুরু হয়।
  • বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের পথ প্রশস্ত হয়।
  • পরবর্তীকালের কৃষক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল এই আন্দোলন।

মূল্যায়ন – অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরির মতে—‘ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল ধর্মীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত কৃষক আন্দোলন।’ ‘Modern Islam in India’ গ্রন্থে তিতুমিরের আন্দোলনকে জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে শ্রেণি-সংগ্রাম বলে উল্লেখ করা হয়। ওয়াহাবিরা বহির্দেশের মুসলিম দেশগুলির সাহায্য নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেছিল যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে নতুন পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।

20. ভারতে ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলনের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা তথা ভারতে ব্রিটিশ শাসক ও হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গীয় মুসলিম সমাজ যেসব ধর্মীয় আন্দোলনে লিপ্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলন। ওয়াহাবি শব্দটি এসেছে ‘ওয়াহাব’ (নবজাগরণ) এবং ফরাজি শব্দটি এসেছে ‘ফরাইজ’ (ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য) শব্দ থেকে। উভয় আন্দোলনই ধর্মীয় আন্দোলন রূপে প্রতিভাত হলেও দুটি আন্দোলনের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।

সাদৃশ্য –

  • উভয় আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দার-উল-হারব ভারতকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করা।
  • সূচনালগ্নে উভয় আন্দোলন কোরানকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল—উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের পুনর্জাগরণ।
  • ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী ও অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।

বৈসাদৃশ্য – ওয়াহাবি ও ফরাজি উভয় আন্দোলনই ছিল সমসাময়িক (উনবিংশ শতাব্দী)। দুটি আন্দোলনের মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেও বেশ কিছু বৈসাদৃশ্যও পরিলক্ষিত হয়—

  • বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার দিক থেকে ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল ফরাজি আন্দোলনের তুলনায় অনেক শক্তিশালী।
  • ওয়াহাবি আন্দোলনের সঙ্গে কৃষকদের স্বার্থ জড়িত ছিল না। ওয়াহাবি আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম রাজ্য গঠন।
  • ইসলামের নবজাগরণ ও শুদ্ধিকরণ উভয় আন্দোলনের লক্ষ্য হলেও ফরাজি নেতা কোরান বহির্ভূত উৎসব বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ তেমন কোনো নির্দেশ দেননি।
  • বেন্টিঙ্ক বারাসাত বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে ওয়াহাবি আন্দোলন দমন করেন। অন্যদিকে দুদুমিঞার উত্তরসূরীরা ধর্মসংস্কারে মনোনিবেশ করায় ফরাজি আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন – ওয়াহাবি আন্দোলন ফরাজি আন্দোলনের তুলনায় ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। দুটি আন্দোলনেই সাধারণ মানুষকে সংঘবদ্ধ করার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করা হলেও একইসঙ্গে তা মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।

21. নীল বিদ্রোহের (1859-1860 খ্রিস্টাব্দ) কারণ আলোচনা করো।

অথবা, কোন্ পটভূমিকায় বাংলায় নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়?

বাংলায় কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে (1859-60 খ্রিস্টাব্দ) সংঘটিত নীল বিদ্রোহ এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। নীল বিদ্রোহের পশ্চাতে নানা কারণ ছিল।

নীল বিদ্রোহের কারণ/পটভূমি –

  • কৃষকের ক্ষতি – বাংলার চাষিরা নীল চাষ করে দারুণ ক্ষতির শিকার হত। প্রথমত, যে জমিতে একবার নীল চাষ করা হত সেই জমিতে ভালো ধান উৎপাদন করা যেত না। দ্বিতীয়ত, নীল চাষ ছিল একটি অলাভজনক চাষ। যেখানে ধান চাষ করলে বিঘা প্রতি 7.5 টাকা চাষির লাভ হত, সেখানে নীল চাষ করলে চাষির লাভ হত বিঘা প্রতি 5.5 টাকা।
  • দাদনপ্রথার কুফল – নীলকররা বে-এলাকা জমিতে চাষিকে নীলচাষ করার জন্য বিঘা পিছু 2 টাকা হারে দাদন দিত। কিন্তু চাষিরা নীল চাষ করে বেশি লাভের মুখ দেখতে পেত না। তাই তারা দাদনের অর্থ নীলকরদের পরিশোধ করতে পারত না। ফলে তারা বার বার ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়ত।
  • প্রতারণা – দারিদ্র্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে নীলকর, বণিক ও মহাজনরা চাষিদের নানাভাবে ঠকাত। কখনও সুদে-আসলে কারচুপি, কখনও বা ফসল কেনাবেচার সময় ওজন ও দামে কারচুপি করা হত।
  • সরকারি আইন – সরকারি আইন, পুলিশ-প্রশাসন সবই নীল চাষিদের বিপক্ষে যেত। আবার নীল চাষ না করলে, জোরজুলুম করা হত। শারীরিক অত্যাচার থেকে শুরু করে বাড়িতে আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটানো হত। এমনকি নীলচাষ না-করলে কৃষক সম্প্রদায়ের মহিলাদের ওপরও অত্যাচার করা হত। এর ফলে চাষিরা মুখ বুজে নীল চাষ করতে বাধ্য হত।

মন্তব্য – এইভাবে বিভিন্ন অত্যাচার ও অবিচার সহ্য করে নীল চাষ করতে করতে একদিন চাষিদের সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায়। 1859 খ্রিস্টাব্দে নদিয়ার চৌগাছা গ্রামের দুই চাষি বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস নীলচাষ বন্ধ করে নীল বিদ্রোহের সূচনা করেন।

22. বাংলায় নীল বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল উল্লেখ করো।

1859-60 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় সংঘটিত নীল-বিদ্রোহ এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বাংলা তথা ভারতের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে এর অবদান অনস্বীকার্য।

বিদ্রোহের কারণ –

  • দাদন প্রথা – নীলকর সাহেবরা ‘বে-এলাকা’ জমিতে বিঘা প্রতি 2 টাকা হারে চাষিকে দাদন দিত। প্রতিবছর এই দাদনের সুদ জমে গিয়ে বিশাল পরিমাণ সুদের পরিমাণ দাঁড়াত। ফলে চাষিরা কখনোই তাদের ঋণ শোধ করতে পারত না। তাই বাধ্য হয়ে তারা নীলচাষ করত।
  • চাষিদের লোকসান – চাষিদের জন্য নীলচাষ ছিল এক অলাভজনক চাষ। ধানচাষ করে চাষিরা বিঘা প্রতি জমিতে যেখানে 7.5 টাকা লাভ করত, সেখানে নীলচাষ করে লাভ পেত 5.5 টাকা। আবার একবার জমিতে নীলচাষ করলে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পেত।
  • প্রতারণা – গরিব ও অশিক্ষিত চাষিরা নানাভাবে প্রতারিত হত। কখনও সুদে-আসলে কারচুপি, কখনও বা ফসল কেনা-বেচার ক্ষেত্রে কারচুপি। স্থানীয় বণিকেরা জোর করে চাষিদের কাছ থেকে ‘দস্তুরি’ আদায় করত।
  • সরকারি আইন – ইংরেজ-কোম্পানি নানা ধরনের আইন করে নীলকর সাহেবের পক্ষে দাঁড়াত। তাই মুখ বুজে তারা নীলচাষ করতে বাধ্য হত। না হলে দৈহিক অত্যাচার করা হত।

মূল্যায়ন – এইভাবে অত্যাচারিত হতে হতে একসময় চাষিদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। ফলস্বরূপ 1859 খ্রিস্টাব্দে নদিয়ার চৌগাছা গ্রামের বাসিন্দা বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস নীলচাষ বন্ধ করে নীল বিদ্রোহের সূচনা করেন।

বিদ্রোহের গুরুত্ব –

নানা কারণে এই বিদ্রোহ ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কারণ—

  • কৃষকের জয় – শেষপর্যন্ত নীলচাষিদের জয় হয়। ইংরেজ-সরকার চাপে পড়ে আইন করে (অষ্টম আইন) 1868 খ্রিস্টাব্দে নীলচুক্তি আইন বাতিল করে। এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে ইংরেজ সরকার মাথা নত করতে বাধ্য।
  • প্রথম ধর্মঘট – অনেকের মত যে, নীলচাষিদের ধর্মঘটই বাংলা তথা ভারতের প্রথম ধর্মঘট। এই মতের সমর্থক গবেষক এল. নটরাজন। 1860 খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘নীলচাষিদের ধর্মঘট’ নামক প্রবন্ধে এর উল্লেখ করেছেন।
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি – নীল বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে সমকালীন বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল তা বলাই বাহুল্য।
  • গণ আন্দোলন – এটি ছিল একটি গণ আন্দোলন। কারণ এই বিদ্রোহে নীলচাষিরা নীলকর সাহেব, ইংরেজ প্রশাসন তথা সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে লড়াইয়ে শামিল হয়।

মন্তব্য – নীল বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই সর্বপ্রথম বাংলার কৃষক, জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। তাদের সংঘবদ্ধ লড়াই প্রমাণ করে যে, অত্যাচারী ইংরেজ রাজশক্তিরও মাথা নত করা যায়।

23. মহাবিদ্রোহ/সিপাহি বিদ্রোহের সামাজিক কারণগুলি কী কী ছিল?

1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজদের সামাজিক বঞ্চনা।

সিপাহি বিদ্রোহের সামাজিক কারণ –

  • ভারতীয়দের প্রতি ঘৃণা – ইংরেজরা এদেশীয় মানুষদের অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখত। তারা ভারতীয়দের নেটিভ, কালা আদমি বলে ডাকত। যা ভারতীয় সমাজকে গভীরভাবে মর্মাহত করত।
  • সমদূরত্ব নীতি – তারা ভারতীয়দের সঙ্গে মেলামেশা করত না। এক জায়গায় বসা, ট্রেনের এক কামরায় ভ্রমণ এসব নিষিদ্ধ ছিল। ইউরোপীয় নাইট ক্লাবের দরজায় লেখা থাকত—এখানে ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’।
  • চাকুরিতে বঞ্চনা – যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরিস্থলে ভারতীয়রা সম্মান পেত না। তাদের উচ্চপদে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। বিচারকপদেও ভারতীয়দের নিয়োগ করা হত না।
  • সামাজিক সংস্কার – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বিভিন্ন সামাজিক সংস্কার করে, যেমন—সতীদাহ প্রথা নিবারণ আইন, বিধবা-বিবাহ আইন প্রভৃতির প্রচলন ঘটায়। এগুলি রক্ষণশীল হিন্দু ও মুসলমান সমাজ ভালো চোখে দেখেনি।

মন্তব্য – এইভাবে ইংরেজদের প্রতি ভারতীয়দের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে।

24. সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণগুলি উল্লেখ করো।

1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ আধুনিক ভারতের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই বিদ্রোহের পিছনে নানা কারণের মধ্যে রাজনৈতিক কারণ ছিল অন্যতম।

সিপাহি বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ –

  • ঔপনিবেশিক শাসন – 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর থেকেই ইংরেজ কোম্পানি এদেশে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করতে শুরু করে। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা ছিল তার চরম নমুনা। এই ব্যবস্থায় বাংলার কৃষকদের জীবনে ঘনিয়ে আসে অন্ধকার।
  • সাম্রাজ্যবাদ নীতি – লর্ড ওয়েলেসলি ও লর্ড ডালহৌসি এই দুই বড়োলাট এদেশে কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের জন্য সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেন। ফলে বহু দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি দ্বারা এবং লর্ড ওয়েলেসলি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রয়োগ করে ভারতের বহু রাজ্য কোম্পানির শাসনাধীনে নিয়ে আসেন।
  • শাসনের নামে শোষণ – এদেশে কোম্পানি যে সমস্ত আইন-কানুন প্রচলন করে তা সবই ছিল ভারত বিদ্বেষী ও শোষণমূলক। বিচার ব্যবস্থা এতটাই পক্ষপাতমূলক ছিল যে ভারতীয়রা কোনো ক্ষেত্রেই সুবিচার পেত না।

মন্তব্য – এইভাবে আপামর ভারতবাসী কোম্পানির শাসন তথা শোষণের যাঁতাকলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিল। তাই তাদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহে যোগদান করে।

25. সিপাহি বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ কী ছিল?

কোম্পানি শাসনাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজ বিরোধী যতগুলি বিদ্রোহ হয়েছিল। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল 1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল অর্থনৈতিক।

সিপাহি বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ –

  • ঔপনিবেশিক অর্থনীতি – 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর থেকেই ইংরেজ কোম্পানি সুবা বাংলায় ঔপনিবেশিক অর্থনীতি প্রয়োগ করে। যার ফলে বাংলার কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংস হয়। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা চালু করে ভূমিরাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়ানো হয়।
  • সম্পদ নিষ্কাশন – পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে কোম্পানি বাংলার ‘প্রকৃত ক্ষমতা’ লাভ করে। এরপর দেওয়ানি লাভ করার ফলে শাসন ব্যবস্থায় কোম্পানির ‘বৈধ ক্ষমতা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীরা বাংলার সম্পদ নানাভাবে লুঠ করে বিলেতে পাচার করতে শুরু করে।
  • অতিরিক্ত কর ও রাজস্ব – কোম্পানি সুবা বাংলায় রাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তার সঙ্গে ছিল নানা ধরনের অতিরিক্ত কর। এর ফলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে।
  • দেশীয় রাজ্যবর্গের রাজ্য চ্যুতি – কোম্পানির সাম্রাজ্যবিস্তার নীতির দরুন এদেশের বহু স্বাধীন রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। তাতে এই সমস্ত রাজ্যের রাজকর্মচারীদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হয়।
  • বেতন বৈষম্য – এ ছাড়া ইউরোপীয় কর্মচারীদের বেতন ভারতীয় কর্মচারীদের তুলনায় বেশি দেওয়া হত। এমনকি ভারতীয় কর্মচারীদের সময়মতো বেতনও দেওয়া হত না।

মন্তব্য – এইভাবে ইংরেজ কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনা এদেশের সর্বস্তরের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। তাই তারা এই বঞ্চনার প্রতিশোধ নিতে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সিপাহি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে।

26. সিপাহি বিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ কী ছিল?

1857 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সিপাহিরা যে বিদ্রোহের সূচনা করে, তাকে বলা হয় সিপাহি বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নানা কারণের মধ্যে ধর্মীয় কারণ ছিল অন্যতম।

সিপাহি বিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ –

  • ধর্মযাজকদের কার্যকলাপ – কোম্পানি শাসনের শুরু থেকেই খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য দলে দলে বহু ইংরেজ পাদ্রি ও ধর্মযাজকগণ ভারতে আসেন। খ্রিস্টান মিশনারিরা ভারতীয়দের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত। তাতে ব্যর্থ হলে তারা ভারতীয়দের নানারকম প্রলোভন দেখাত।
  • ‘দি টাইমস’ পত্রিকার প্রতিবেদন – 1857 খ্রিস্টাব্দের 10 জুন ‘দি টাইমস’ পত্রিকার এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে—লর্ড ক্যানিং, লর্ড পামারস্টোনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে সমস্ত ভারতবাসীকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন।
  • ম্যাঙ্গেলসের মনোবাসনা – 1857 খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অফ ডাইরেক্টরস-এর সভাপতি ম্যাঙ্গেলস আশা করেছিলেন যে, সারা ভারতবর্ষে একমাত্র খ্রিস্টধর্মের পতাকা উড্ডীন থাকবে।
  • আইন মোতাবেক অধিকার দান – 1850 খ্রিস্টাব্দের 21 নং আইনের মাধ্যমে মিশনারিরা ভারতীয়দের জানায় যে তারা খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করলে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি ভোগের অধিকার দান করা হবে।

উপসংহার – বিভিন্ন পন্থায় মিশনারি কর্তৃক ভারতীয়দের ধর্মান্তরিতকরণের প্রচেষ্টা ভারতবাসী ভালোভাবে মেনে নেয়নি। এর ফলে ভারতবাসীদের মনে বিক্ষোভের সঞ্চার হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে।

27. সিপাহি বিদ্রোহের সামরিক কারণ কী ছিল?

কোম্পানি শাসনাধীন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নানা কারণের মধ্যে অন্যতম ছিল সামরিক কারণ, যা সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।

সিপাহি বিদ্রোহের সামরিক কারণ –

  • বৈষম্যমূলক নীতি – ভারতীয় সিপাহিদের প্রতি ইংরেজ সরকার বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। তাদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হতো। ইংরেজ সেনা ও কর্মচারীদের বেতনের তুলনায় ভারতীয়দের বেতন ছিল অতি সামান্য। তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি সত্ত্বেও পদোন্নতির কোনো সুযোগ ছিল না। তাছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বেছে বেছে ভারতীয় সেনাদের পাঠানো হতো।
  • ক্যানিংয়ের ঘোষণা – 1856 খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড ক্যানিং ঘোষণা করেন যে, প্রয়োজন পড়লে বেঙ্গল আর্মির সিপাহিদের ভারতের যে-কোনো স্থানে পাঠানো হতে পারে। এই ঘোষণায় ধর্মভীরু হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিরা কালাপানি পার হয়ে ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছিল।
  • ইংরেজদের দুর্ব্যবহার – ভারতীয় সিপাহিদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন ইংরেজ সেনারা খারাপ ব্যবহার করত। জাত তুলে গালিগালাজ করত। ভারতীয়দের মধ্যে ক্ষোভ যখন ধূমায়িত হচ্ছিল, তখন তাদের দিয়ে কুরুচিপূর্ণ কাজ করাত। ঊর্ধ্বতন সেনাদের জন্য বেগার শ্রমদান করতে হতো।

প্রত্যক্ষ কারণ – এইভাবে ভিতরে ভিতরে ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে যখন অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, তখন এনফিল্ড রাইফেলের ঘটনা সিপাহিদের ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দেয়। সিপাহি বিদ্রোহের প্রাক্কালে রটে যায় যে, ভারতীয় সেনাদের জাত মারার জন্য এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গোরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো হয়েছে। ফলে ভারতীয় সিপাহিরা এই কার্তুজ ব্যবহার করতে অসম্মত হয়।

সূচনা – এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম সরব হন মঙ্গল পান্ডে। 1857 খ্রিস্টাব্দের 29 মার্চ দুজন শ্বেতাঙ্গ সেনাকর্তাকে গুলি করে হত্যা করার ফলে ভারতে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা হয়।

28. সিপাহি বিদ্রোহে ভারতীয় রাজন্যবর্গের নেতৃত্ব তথা অবদান কীরূপ ছিল? অথবা, সিপাহি বিদ্রোহ কীভাবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারলাভ করে?

1857 খ্রিস্টাব্দের 29 মার্চ ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে মঙ্গল পান্ডে নামক এক সিপাহি দুজন সেনাকর্তাকে হত্যা করে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই ঘটনার সূত্র ধরে ধীরে ধীরে বিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

সিপাহি বিদ্রোহের বিস্তার ও নেতৃত্ব –

  • 1857 খ্রিস্টাব্দে 24 এপ্রিল মিরাটের সিপাহিরা এনফিল্ড রাইফেলের টোটা দাঁতে কাটতে অস্বীকার করে। 10 মে বিদ্রোহী সেনারা বহু ইংরেজ কর্মচারীদের হত্যা করে এবং ভারতীয়দের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। এরপর বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লির সিপাহিদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে মোগল সম্রাট বলে ঘোষণা করে।
  • ইতিমধ্যে জনসাধারণের সমর্থনে অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশে সিপাহি বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থান, যেমন—লখনউ, বারাণসী, কানপুর, আগ্রা, বেরিলি, মোরাদাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করে।
  • ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই বুন্দেলখণ্ডে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন।
  • কানপুরে নানা সাহেব এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজ সেনাপতি কলিনকে পরাজিত করেন।
  • তাঁতিয়া টোপী ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি। তিনি গোয়ালিয়রে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। তিনি কানপুরে উইন্ডহামের বাহিনীকে পরাজিত করেন।
  • সিপাহি বিদ্রোহের সময় অন্যতম গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন বিহারের আরা-র জমিদার কুনওয়ার সিং। 1857 খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে তিনি দানাপুরের বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 1857 খ্রিস্টাব্দের মে মাসে অযোধ্যা থেকে ব্রিটিশ শাসন অপসারিত হয়। এছাড়া সিপাহি বিদ্রোহ মুজফফরনগর, সাহারানপুর, ফারুখাবাদ, ফতেপুর, আলিগড়, মথুরা, আগ্রা, বান্দা, হামিরপুর, বিজনোর প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

29. সিপাহি বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি উল্লেখ করো (4টি)।

দারুণ সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে 1857 খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলেও, নানা কারণে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

সিপাহি বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

  • আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা – সিপাহি বিদ্রোহ ভারতের সর্বত্র সংঘটিত হয়নি, বরং বিক্ষিপ্তভাবে ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে প্রসার লাভ করে। দক্ষিণ ভারত, পাঞ্জাব, রাজপুতানা, সিন্ধুপ্রদেশ প্রভৃতি অঞ্চলে সিপাহি বিদ্রোহ প্রসার লাভ করেনি।
  • অসহযোগিতা – সিপাহি বিদ্রোহে বেঙ্গল আর্মি অংশগ্রহণ করলেও পাঞ্জাব ও বোম্বাই আর্মি এই বিদ্রোহে অংশ নেয়নি। শিখ ও গোর্খা বাহিনী বিদ্রোহীদের সমর্থন করেনি। নিজাম, সিন্ধিয়া, পাতিয়ালা ও কাশ্মীরের শাসকগণ বিদ্রোহে শামিল হননি; বরং তাঁরা ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন।
  • জাতীয় লক্ষ্যের অভাব – বিদ্রোহীদের কোনো জাতীয় লক্ষ্য ছিল না। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। অযোধ্যার নবাব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব প্রমুখ নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য যে অস্ত্রধারণ করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
  • নেতৃত্বের অভাব – বিদ্রোহ পরিচালনা করতে গেলে চাই একজন সর্বজনগ্রাহ্য নেতা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করার জন্য যেমন অনেক জাতীয়তাবাদী নেতার আবির্ভাব ঘটেছিল, সিপাহি বিদ্রোহ পরিচালনা করার মতো সেরূপ কোনো নেতা ছিল না।

মূল্যায়ন – উপরোক্ত কারণগুলি ছাড়াও আরও অন্যান্য নানা কারণে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। যেমন—ভারতীয় সিপাহিদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না। তারা রেলপথের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেনি। তাছাড়া, সরকারি দমনপীড়ন নীতির কাছে বিদ্রোহীরা মাথা নত করতে বাধ্য হয়।

30. সিপাহি বিদ্রোহের গুরুত্ব/ফলাফল আলোচনা করো।

দারুণ সাফল্যের ইঙ্গিত রেখে 1857 খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলেও, সরকারি দমন নীতির কাছে বিদ্রোহীরা মাথা নত করে। ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে এই বিদ্রোহের গুরুত্ব কম নয়।

বিদ্রোহের গুরুত্ব/ফলাফল –

  • মোগল ও কোম্পানি শাসনের অবসান – সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে মোগল শাসন ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয়।
  • ভারত শাসন আইন – ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঘোষিত ভারত শাসন আইন দ্বারা—
    • ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর হাতে চলে যায়।
    • ভারতের শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয় ভারত সচিবের উপর।
    • ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং।
  • মহারানির ঘোষণাপত্র – 1858 খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত হয় মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র। এতে বলা হয় —
    • ভারতীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সরকার কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করবে না,
    • জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে সকলেই চাকরির সুযোগ পাবে,
    • স্বত্ববিলোপ নীতি রদ হবে,
    • ব্রিটিশরা আর ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না।
  • কাউন্সিল অ্যাক্ট – 1861 খ্রিস্টাব্দে সরকার ব্রিটিশ ভারতে কাউন্সিল অ্যাক্ট ঘোষণা করে। এই আইন দ্বারা—
    • কেন্দ্রীয় আইনসভায় ভারতীয় প্রতিনিধি নেওয়ার কথা বলা হয়,
    • প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে হাইকোর্ট গঠনের কথা বলা হয়।

মন্তব্য – যদিও আইন সংস্কার সত্ত্বেও ভারতীয়দের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং, ব্রিটিশ সরকার এদেশীয়দের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক ও শোষণমূলক নীতিই অনুসরণ করেছিল।

31. 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা যায় কি? ব্যাখ্যা করো।

1857 খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা যায় কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্কের শেষ নেই। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন জনে বিভিন্ন মত দিয়েছেন, যেমন—

  • পক্ষে মত – 1857 খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে দাবি করেছেন বিপ্লবী দামোদর বিনায়ক সাভারকর। এই মতকে সমর্থন করেছেন অনেকেই। তাঁদের মত যে,—
    • এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বিদেশি শাসনের অবসান চেয়ে মুক্তি সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন।
    • কার্ল মার্কসও এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে দাবি করেছেন।
    • জে. বি. নর্টন, আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে এটি ছিল একটি জাতীয় বিদ্রোহ। তাঁদের মতে, এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জনগণ প্রথম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলেছিল।
    • অধ্যাপক সুশোভন সরকারের মতে, সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম না বললে সেই অর্থে ইতালির কার্বোনারি আন্দোলনকে ইতালির মুক্তিযুদ্ধ বলা যাবে না।
    • বামপন্থী নেতা পিসি যোশিও মহাবিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে দাবি করেছেন।
  • বিপক্ষে মত – অন্যদিকে অনেকেই এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা জাতীয় বিদ্রোহ বলে মনে করেন না। এই মতের সমর্থক ড. নরহরি কবিরাজ, সুরেন্দ্রনাথ সেন, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিক। তাঁদের মতে—
    • এই বিদ্রোহে ভারতের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেনি বা ভারতের সর্বত্র সমানভাবে বিদ্রোহের বিস্তার ঘটেনি। পাঞ্জাব, রাজপুতানা ও দক্ষিণ ভারতে বিদ্রোহের কোনো প্রভাব পড়েনি।
    • ভারতের অনেক সামন্ত, জমিদার ও রাজন্যবর্গ এই বিদ্রোহে যোগ দেননি, বরং তাঁরা ইংরেজদের সহযোগিতা করেছিলেন।
    • আবার ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে গোর্খা ও শিখ বাহিনী বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করে।

মন্তব্য – উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা ঠিক হবে না। কারণ—

  • সে সময় ভারতীয়দের মধ্যে যেমন আধুনিকতার অভাব ছিল, তেমনি তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনার অভাব ছিল।
  • আবার বিদ্রোহ পরিচালনা করার মতো কোনো জাতীয় নেতাও ছিলেন না।
  • বিদ্রোহীদের সামনে না ছিল জাতীয় লক্ষ্য, না ছিল জাতীয় আদর্শের মন্ত্র।

আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিষয়সংক্ষেপ