অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ”-এর কিছু “সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া-সহযোগিতা ও বিদ্রোহ-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

কারা এবং কেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আদর্শের প্রতি আস্থাবান ছিলেন?

ইংরেজি শিক্ষা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফলভোগী ভারতীয়রা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আদর্শের প্রতি আস্থাবান ছিলেন। এই সকল ভারতীয়রা মনে করতেন ইংরেজদের দ্বারাই এদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নতি সম্ভব। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁরা ভারতীয় সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

ইংরেজি শিখলে কী কী সুবিধা হবে বলে ভারতীয়রা মনে করেছিলেন?

ভারতীয়রা মনে করেছিলেন যে, ইংরেজি শিখতে পারলে তাঁদের নিজেদের ও তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হবে। চাকরি পেতে সুবিধা হবে। কিন্তু ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে শিক্ষিত ভারতীয়দের অনেকেরই ধারণা ছিল যে, ব্রিটিশ শাসনের অনুগত হলেই ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নতি সম্ভব।

হল্কা কী?

দুদু মিঞা জমিদারি শোষণ ও বিদেশি ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। এই উদ্দেশ্যে তিনি পূর্ববাংলাকে কতকগুলি অঞ্চলে বিভক্ত করেন ও প্রত্যেক অঞ্চলে একজন করে খলিফা নিয়োগ করেন। এই অঞ্চলগুলিকে বলা হত ‘হল্কা’।

শুদ্ধি আন্দোলন কী?

অ-হিন্দুদের শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার যে প্রথা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী চালু করেন, তা ‘শুদ্ধি আন্দোলন’ নামে পরিচিত।

দক্ষিণ ভারতের বিদ্যাসাগর কে ছিলেন? তাঁর সম্পাদিত দুটি পত্রিকার নাম লেখো।

দক্ষিণ ভারতের বিদ্যাসাগর ছিলেন বীরেশলিঙ্গম পান্তুলু। তিনি ‘বিবেকবর্ধিনী’ ও ‘হাস্যসঞ্জীবিনী’ পত্রিকাদ্বয়ের সম্পাদক ছিলেন।

পতিদার কাদের বলা হত?

‘পতিদার’ কথার প্রধান অর্থ হল গ্রামের প্রধান। এরা কোম্পানির হয়ে গ্রামের ভূমিরাজস্ব আদায় করত। গুজরাটের প্যাটেল উপাধিধারী ভূমিরাজস্ব আদায়কারীদের বলা হত ‘পতিদার’।

ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?

ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল—
1. হিন্দুসমাজে প্রচলিত কুসংস্কার দূরীভূত করা।
2. একেশ্বরবাদ প্রচার করা।
3. পৌত্তলিকতা বর্জন করা।

সতীদাহ প্রথা কীভাবে নিষিদ্ধ হয়?

ভারতীয় সমাজে প্রচলিত একটি মধ্যযুগীয় নৃশংস প্রথা ছিল সতীদাহ প্রথা। উনিশ শতকেও কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এই প্রথা বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় 1829 খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 17 নং রেগুলেশন আইন পাশ করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন কীভাবে চালু হয়?

ভারতীয় সমাজে বিধবারা অবহেলিত ও নির্যাতিত হতেন। বিধবাদের এই অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বিধবা নারীদের পুনরায় বিয়ে দেওয়া নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি প্রশাসনের কাছে আইন জারি করে বিধবাবিবাহ চালু করার দাবি জানিয়ে ছিলেন। এর ফলে শেষপর্যন্ত 1856 খ্রিস্টাব্দে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন জারি করা হয়।

ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

কলকাতার হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়োর অনুগামীদের বলা হয় ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা ‘নব্যবঙ্গ’। ডিরোজিয়ো তাঁর ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করেন। বিভিন্ন সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁদের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি প্রথার বিরুদ্ধেও তাঁরা সোচ্চার হয়েছিলেন, তবে এঁরা ব্রিটিশ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক ছিলেন।

নব্যবঙ্গ কাদের বলা হয়? এই দলের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

ডিরোজিয়োর অনুগামীদের বলা হয় নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী। এই দলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন প্রথা ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করা এবং কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, জাতপাত, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রভৃতি প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।

বীরেশলিঙ্গম পান্তুলু কে ছিলেন?

বীরেশলিঙ্গম পান্তুলু ছিলেন একজন দক্ষিণ ভারতীয় সমাজসংস্কারক, তাঁর নেতৃত্বে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে বিধবাবিবাহ আন্দোলন শুরু হয়। তিনি ব্রাহ্ম আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং মূর্তি পুজো, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ ও বাল্যবিবাহের ঘোর বিরোধী ছিলেন, বীরেশলিঙ্গম নারীশিক্ষা ও বিধবাবিবাহের পক্ষেও সওয়াল করেন। তিনি দক্ষিণ ভারতে প্রার্থনা সমাজের সংস্কার আন্দোলন ছড়িয়ে দেন।

জ্যোতিরাও ফুলের সমাজসংস্কার আন্দোলন সংক্ষেপে লেখো।

জ্যোতিরাও ফুলে ছিলেন মহারাষ্ট্রের একজন সমাজসংস্কারক। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী বাই ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গীয় সাধারণ মানুষের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন। তিনি 1851 খ্রিস্টাব্দে পুনা শহরে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাষ্ট্রে বিধবাবিবাহ প্রচলনে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তিনি ‘সত্যশোধক সমাজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠান মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করেছিল।

নারীশিক্ষা প্রসারে রমাবাই-এর ভূমিকা কী ছিল?

উনিশ শতকে নারীশিক্ষা প্রসারে যেসকল নারী উদ্যোগী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহারাষ্ট্রের রমাবাই। রমাবাই ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে কিন্তু তিনি শূদ্রকে বিবাহ করে জাতিভেদপ্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেন। বিধবা অবস্থায় ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি ডাক্তারি পড়েন। বিধবা মহিলাদের জন্য তিনি ‘সারদা সদন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দের কী অবদান ছিল?

হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকের চাকরিজীবী অসংখ্য শহুরে মানুষ রামকৃষ্ণের ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। 1893 খ্রিস্টাব্দে তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্মসম্মেলনে যোগ দেন ও তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষায় ভারতীয় দর্শন ও হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ। বিবেকানন্দ নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের লেখা দুটি গ্রন্থের নাম লেখো।

উনিশ শতকের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদ প্রসারের উদ্দেশ্য তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বিবেকানন্দের লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হল—
1. পরিব্রাজক,
2. বর্তমান ভারত।

বাংলায় কীভাবে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল?

উনিশ শতকে বাংলায় সমাজসংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সমাজ সংস্কারকদের মধ্যে রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র প্রমুখের কার্যকলাপ হিন্দুধর্মের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। রাজনারায়ণ বসুর ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’ ও নবগোপাল মিত্রের ‘জাতীয় মেলা’ স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে হিন্দুধর্মের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। জাতীয়মেলা পরবর্তীকালে ‘হিন্দুমেলা’-য় পরিবর্তিত হয়। হিন্দু মেলার উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের আদর্শে সকলকে উদ্বুদ্ধ করা।

ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলনে আর্যসমাজের ভূমিকা আলোচনা করো।

উনবিংশ শতাব্দীতে ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর অবদান উল্লেখযোগ্য। 1875 খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আর্যসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি ও কুসংস্কার দূর করার জন্য উদ্যোগী হন। তাঁর সমস্ত চিন্তাধারা ও আদর্শের মূলে ছিল ‘বেদ’। বৈদিক ধর্মের ওপর তাঁর অবিচল বিশ্বাসের কারণে তাঁর সংস্কার আন্দোলন ‘আর্যসমাজ আন্দোলন’ নামে পরিচিত। তিনি বিধবাবিবাহ ও নারীশিক্ষার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু মূর্তিপূজা, পুরোহিতদের প্রাধান্য, বাল্যবিবাহ, অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদপ্রথার বিরোধী ছিলেন।

ভারতের সমাজসংস্কার আন্দোলনে ধর্মশাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা কেমন ছিল?

উনবিংশ শতাব্দীর ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করতেন যে, ধর্মশাস্ত্রে যেসব আচরণের কথা বলা আছে তা পালন করতে হবে। তাঁদের মতে কিছু স্বার্থপর মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মশাস্ত্রগুলির অপব্যাখ্যা করে। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মশাস্ত্রগুলি না-পড়ায় শাস্ত্রের মূল বক্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার ফলে শাস্ত্রীয়প্রথার নামে তারা নানা কুপ্রথার শিকার হত।

সৈয়দ আহমেদের শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি সংক্ষেপে লেখো।

মুসলমান সমাজসংস্কারকদের মধ্যে সৈয়দ আহমেদ খান ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তিনি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 1864 খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেন। তাঁর-ই প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানের নানা বই উর্দু ভাষায় অনুবাদ করা হতে থাকে। তাঁর-ই প্রচেষ্টায় 1875 খ্রিস্টাব্দে ‘আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

আলিগড় আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?

1875 খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আহমেদ খান উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে ‘আলিগড়-অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে মুসলমান সমাজের মধ্যে যে সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা আলিগড় আন্দোলন নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান।

জনমত গঠনে সংবাদপত্রগুলি কী ভূমিকা পালন করেছিল? এ বিষয়ে অগ্রণী একটি সংবাদপত্রের নাম লেখো। ওই পত্রিকার সম্পাদক কে?

জনমত গঠনে সংবাদপত্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এদেশের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রগুলির অবদান অপরিসীম। অনেক সংবাদপত্র নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে সরকারের বিরাগভাজন হয়। এবিষয়ে অগ্রণী একটি সংবাদপত্র হল ‘বেঙ্গল গেজেট’। ‘বেঙ্গল গেজেট’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ইংরেজ ব্যবসায়ী জেমস অগাস্টাস হিকি।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল কী হয়েছিল?

বিদ্রোহী সাঁওতালদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতা ছিল ‘সিধু, কানহু, চাঁদ ও ভৈরব’। তাদের নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ ভাগলপুর থেকে রাজমহল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহ দমন করার জন্য ব্রিটিশ প্রশাসন নির্মম আক্রমণ চালায়। সিধু ও কানহুসহ হাজার হাজার সাঁওতালদের হত্যা করা হয়। তবে এই বিদ্রোহের ফলে ব্রিটিশ প্রশাসন সাঁওতালদের জন্য গড়ে তোলে ‘সাঁওতাল পরগনা’। সাঁওতাল পরগনায় জমিদার ও দিকুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

ফরাজি আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

পূর্ব বাংলার (অধুনা বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলা নিবাসী মৌলবি হাজি শরিয়ৎউল্লাহ ছিলেন ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক। তিনি ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করে তাকে পুনর্জাগরণ করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। শরিয়ৎউল্লাহ ব্রিটিশ শাসনকে ‘দার-উল-হারব’ (শত্রুর রাষ্ট্র) বলে ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশ মদতপুষ্ট মহাজন ও জমিদার শ্রেণির শোষণের কবল থেকে দরিদ্র চাষি সম্প্রদায়কে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করেন।

মুন্ডা উলগুলান কী?

1899–1900 খ্রিস্টাব্দে, বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে সংঘটিত বিদ্রোহ মুন্ডা উলগুলান বা ‘মুন্ডা বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। বহিরাগত দিকুরা মুন্ডাদের জমি দখল করে নিতে চাইলে এই বিদ্রোহ হয়। ব্রিটিশ শাসকের অবসান ঘটিয়ে বিরসা মুন্ডার শাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল এই আন্দোলনের লক্ষ্য। তবে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী নির্মমভাবে এই আন্দোলন দমন করে।

‘উলগুলান’ ও ‘ধরতি আবা’ কথা দুটির অর্থ কী?

‘উলগুলান’ কথাটির অর্থ বিরাট আলোড়ন বা তোলপাড়। ‘ধরতি আবা’ কথাটির অর্থ ধরিত্রি বা পৃথিবীর ঈশ্বর। বিরসা মুন্ডা নিজেকে ‘ধরতি আবা’ আখ্যায় ভূষিত করেছিলেন।

নীল বিদ্রোহ কেন সংগঠিত হয়েছিল?

1859–60 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ নীলচাষ ও নীলকরদের অত্যাচারকে কেন্দ্র করে বাংলায় নীল বিদ্রোহ হয়েছিল। এই বিদ্রোহের দুজন প্রথম সারির নেতা হলেন ‘দিগম্বর বিশ্বাস’ ও ‘বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস’। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক থেকে এই বিদ্রোহের কথা জানা যায়। এ ছাড়া ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ ও ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকাও নীলচাষিদের সমর্থন করে। ফলে নীলকরদের ওপর চাপ বৃদ্ধি হওয়াতে 1863 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই বিদ্রোহ থেমে যায়।

1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের মূল পটভূমি কী ছিল?

1857 খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে কলকাতার দমদম সেনাছাউনির সিপাহিদের মধ্যে বন্দুকের টোটা সম্পর্কে গুজব রটে যায়। বলা হয়, নতুন ‘এনফিল্ড’ রাইফেলের টোটাগুলিতে নাকি গোরু ও শূকরের চর্বি লাগানো আছে। ওই টোটাগুলি রাইফেলে ভরার আগে দাঁত দিয়ে কেটে নিতে হত। ফলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা জাত ও ধর্ম নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এইসব নানা কারণে সিপাহিরা বিদ্রোহ শুরু করেছিল।

কীভাবে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়?

1857 খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের শেষের দিকে ব্যারাকপুরের সেনাছাউনির সিপাহি ‘মঙ্গল পাণ্ডে’ এক ইউরোপীয় সেনা আধিকারিককে গুলি করেন। তাঁর সহকর্মীদের বলা হয় মঙ্গলকে গ্রেফতার করতে, কিন্তু তারা নির্দেশ মানেনি। তাই কর্তৃপক্ষ তাদের সকলকে গ্রেফতার করে ফাঁসি দেয়। এরপর নানা সেনাছাউনিতে এই খবর প্রচারিত হওয়ার পর সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশিত হয়।

সমস্ত সিপাহিবাহিনী কি মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল? তোমার অভিমত লেখো।

না, ব্রিটিশ কোম্পানির সমস্ত সিপাহিবাহিনী এই বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। মাদ্রাজ ও বোম্বাই-এর সিপাহিরা বিদ্রোহ থেকে সরে এসেছিল। পাঞ্জাব ও গোরখা সিপাহিরা বিদ্রোহী সিপাহিদের দমন করার দায়িত্ব পালন করেছিল। আসলে বেঙ্গল আর্মির সিপাহিরাই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। কোম্পানির মোট সিপাহিদের প্রায় অর্ধেকই ছিল বেঙ্গল আর্মিতে। তাই বলা যেতে পারে, সিপাহিবাহিনীর প্রায় অর্ধেক অংশই কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল।

মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন হয়েছিল?

মহাবিদ্রোহের পর ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে 1858 খ্রিস্টাব্দের 2 আগস্ট একটি আইন পাস করা হয়। ভারত শাসনসংক্রান্ত এই আইনটি ওই বছরের 1 নভেম্বর বলবৎ হয়। এই আইনে রানির মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পূর্বতন গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে রানির হয়ে ভারত শাসন করবেন ভাইসরয়।

1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ দমন হওয়ার কারণ কী ছিল?

নানা দমন-পীড়ন সত্ত্বেও সিপাহি বিদ্রোহ একেবারে থেমে যায়নি। 1859 খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সৈন্য উত্তর ও মধ্য ভারতের নানা এলাকায় বিদ্রোহিদের পরাজিত করে। আসলে কোম্পানির বিরুদ্ধে সিপাহিরা এক অসম যুদ্ধ চালিয়েছিল। তাদের পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব ছিল, নিজেদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না, ফলে এই বিদ্রোহ বেশি দূর বিস্তারলাভ করতে পারেনি। তাই কোম্পানি সহজেই সিপাহি বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়।

1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ফল কী হয়েছিল?

1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ফলে ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সরাসরি ভারতের শাসন ক্ষমতা হাতে নেয়। রানি ভিক্টোরিয়াকে ভারতের সম্রাজ্ঞী বলে ঘোষণা করা হয়। ভারত শাসনের জন্য একজন সচিব নিয়োগ করা হয়। গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে রাজপ্রতিনিধি বা ‘ভাইসরয়’ পদ তৈরি করা হয়। লর্ড ক্যানিং হন প্রথম ভাইসরয়। 1858 খ্রিস্টাব্দের 1 নভেম্বর থেকে ‘ভারত শাসন আইন’ বলবৎ হয়।

মহাবিদ্রোহের পর থেকে ভারতের ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলকে ভাইসরয় বলা হয় কেন?

‘ভাইসরয়’ কথার অর্থ রাজপ্রতিনিধি। 1858 খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন দ্বারা কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের উপর অর্পিত হয়। এইজন্য ‘ভাইসরয়’ কথাটি ব্যবহার করা হয়।


আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ”-এর কিছু “সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিষয়সংক্ষেপ