আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের অষ্টম অধ্যায়, “সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. সৈয়দ আহমেদকে কেন ভারতের ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক’ বলা হয়?
অথবা, তাঁর সাম্প্রদায়িক মনোভাব ব্যক্ত করো। অথবা, সৈয়দ আহমেদ খানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কীরূপ ছিল?
জাতীয় কংগ্রেসের জন্মের পর স্যার সৈয়দ আহমেদ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের শেষদিকে কংগ্রেস সম্পর্কে তাঁর ধারণার পরিবর্তন ঘটে। ফলে তিনি কংগ্রেস বিরোধিতায় সরব হন।
দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক –
- প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি – প্রথম দিকে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান যেমন ভারতে হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যের কথা প্রচার করেন, তেমনই তিনি জাতীয় কংগ্রেসের কর্মপন্থায় সহমত পোষণ করেন। এই সময় তিনি কংগ্রেসের সুরে সুর মিলিয়ে সিভিল সার্ভিস ও ইলবার্ট বিল আন্দোলন এবং ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভের পক্ষে সরব হয়েছিলেন। এই সময় তিনি প্রচার করেন, “হিন্দু ও মুসলমান ভারতের দুটি চক্ষুর মতো, একটির ক্ষতি হলে আর একটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” তিনি আরও বলেন যে, “এই উভয় সম্প্রদায়কেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে; না হলে উভয় সম্প্রদায়ের বিপর্যয় অনিবার্য।”
- মত বদল – আলিগড় মহামেডান কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন থিওডর বেক। তাঁর চিন্তাধারা সৈয়দ আহমেদকেই প্রভাবিত করে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়। তিনি বলেন যে, ভারতে হিন্দু-মুসলমান হল দুটি পৃথক জাতি। কংগ্রেস হল বাঙালি হিন্দু পরিচালিত একটি ‘হিন্দু সংগঠন’। কংগ্রেসের আন্দোলনকে তিনি একটি ‘অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ’ বলেও কটাক্ষ করেন। তিনি মনে করতেন, ইংরেজদের হাতেই ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। তাই ভারতের স্বায়ত্তশাসন মুসলমানদের পক্ষে সুখকর নয়।
মন্তব্য – এসব কারণে স্যার সৈয়দ আহমেদকে ভারতের “দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক” বলা হয়।
2. হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠার পটভূমি আলোচনা করো।
শুধুমাত্র মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাই নয়, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষও এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য যেভাবে মুসলিম লিগ গড়ে ওঠে, অনেকটা সেইভাবে হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে হিন্দু মহাসভা (1915 খ্রিস্টাব্দ)। হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা বিকাশের জন্য নানা কারণ দায়ী ছিল।
হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠার পটভূমি –
- ধর্মপ্রচার – মহাবিদ্রোহের পর থেকে বাংলায় হিন্দু-জাগরণবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মসমাজ, হিন্দুমেলা, রাজনারায়ণ বসুর রচনা, শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের নব্যবেদান্তবাদ দেশে হিন্দু ধর্ম জাগরণের বাতাবরণ সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও হিন্দুধর্ম রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কলকাতার ‘সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভা’, ‘যশোর ধর্মরক্ষিণী সভা’ প্রভৃতি। ফলে হিন্দুদের মধ্যে এক ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি হয়।
- ব্রিটিশের বিভেদনীতি – ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই প্রধান ধর্মের অনুগামীদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিভেদকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকশ্রেণি পরস্পরের বিরুদ্ধে প্ররোচনা যুগিয়েছে। ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অতি তুচ্ছ কারণে সাম্প্রদায়িক হানাহানি দেখা দেয়। মুসলিমরা পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লিগ গঠন করে। বঙ্গভঙ্গ রোধ করার পরেই স্বদেশি আন্দোলনের প্রথম পর্বে পূর্ব বাংলার কিছু কিছু জেলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দেয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এইভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ায় হিন্দুদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
- গো-হত্যা বিরোধী আন্দোলন – 1890-এর দশকে হিন্দুরা সারাদেশ জুড়ে গো-হত্যা বিরোধী প্রচারকার্য চালায়। তা মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগকে আহত করে। মহাবিদ্রোহের সময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ গো-হত্যা নিষিদ্ধ করলেও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ প্রশাসন গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য কোনো সুস্পষ্ট নীতি নেয়নি। এর ফলে হিন্দুদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে।
- হিন্দি-উর্দু ভাষা বিতর্ক – হিন্দুরা হিন্দিকে তাদের ভাষা এবং মুসলিমরা উর্দুকে তাদের ভাষা বলে মনে করত। এর ফলে এই ভাষার পার্থক্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ সরকার অযোধ্যায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উর্দু ভাষা চালু করলে মধ্যপ্রদেশ, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে হিন্দি ভাষা প্রচলনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
- আর্যসমাজের ভূমিকা – স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্যসমাজ শুদ্ধি আন্দোলনের দ্বারা ধর্মত্যাগী হিন্দুদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। তিনি ‘গোকরুণানিধি’ গ্রন্থে গো-হত্যার তীব্র নিন্দা করেন। স্বামী দয়ানন্দের আন্দোলনের ফলে হিন্দুধর্ম শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
- চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ – তিলকের ‘গণপতি উৎসব’, ‘শিবাজি উৎসব’-এর মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদ প্রকাশ পায়। অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ চরমপন্থী নেতৃবৃন্দ তাঁদের রাজনৈতিক বক্তৃতায় উপনিষদ ও পুরাণকে ব্যবহার করতেন। ভারতকে মাতারূপে চিহ্নিত করে বিভিন্ন হিন্দু দেবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়।
- মুসলিম লিগের দায়িত্ব – মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য তারা একতরফা ভাবে প্রচার চালায়, ফলে হিন্দুরা উদবিগ্ন হয়ে পড়ে। তার ফলেই হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ঘটে।
3. মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি আলোচনা করো। এই লিগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কী ছিল?
পটভূমি –
সিমলা দৌত্যের সাফল্যে ভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে উৎসাহিত হয়। তাঁরা মুসলিমদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য একটি পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এর ফলে 1906 খ্রিস্টাব্দে 30 ডিসেম্বর ঢাকা শহরে ‘মুসলিম লিগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা –
স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁ প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের (Educational Congress) অধিবেশন ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত হয় (30 ডিসেম্বর 1906 খ্রিস্টাব্দ)। ওই সম্মেলনেই ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম প্রতিনিধিদের সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় 8 হাজার প্রতিনিধি শিক্ষা সম্মেলনে উপস্থিত হন। শিক্ষা সম্মেলনের সভাপতি ভিখার-উল-মুলক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হাকিম আজমল খাঁ নবাব সলিমউল্লাহর প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। এইভাবে এই অধিবেশনের শেষে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠিত হয় (1906 খ্রিস্টাব্দ)।
লক্ষ্য –
মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার সময় লিগের নেতারা এই দলের লক্ষ্য স্থির করেন—
- ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আনুগত্য নিশ্চিত করা।
- সরকারি নীতি বা কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে মুসলমানদের মনে যাতে সংশয় সৃষ্টি না হয়, সেদিকে মুসলিম লিগ দৃষ্টি রাখবে।
- মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।
- জাতীয় কংগ্রেস-এর রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খর্ব করা।
- ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে মৈত্রীভাব বজায় রাখা।
4. খিলাফত আন্দোলন কেন শুরু হয়েছিল? গান্ধিজি কেন এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন?
- প্রেক্ষাপট – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধে মিত্রশক্তি জয়লাভ করায় তুরস্ক সাম্রাজ্যের অনেক অংশ ব্রিটিশের হস্তগত হয়। তুরস্কের সুলতানের মর্যাদাও কমে যায়। তুরস্কের সুলতান ছিলেন মুসলিম জগতের ধর্মগুরু। তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি বিনষ্ট হওয়ায় মুসলমান সমাজে আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
- খিলাফত কমিটি – তুরস্কের সুলতানের বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিকারে 1919 খ্রিস্টাব্দের 13 নভেম্বর বোম্বাই শহরে কেন্দ্রীয় ‘খিলাফত কমিটি’ গঠিত হয়। সারাদেশে খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে মোহাম্মদ আলি, শৌকত আলি প্রমুখ অনেকে নেতৃত্ব দেন।
- গান্ধিজির সমর্থন – গান্ধিজি খিলাফত আন্দোলনের সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যে বিশ্বাসী গান্ধিজি মুসলমান নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে কংগ্রেসের ভিত্তি প্রসারিত করতে খিলাফত সমস্যাকে গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে নেন।
- প্রতিক্রিয়া – গান্ধিজির অহিংস নীতিতে খিলাফতি নেতারা বিশ্বাসী ছিলেন না। গান্ধিজির জনপ্রিয়তা ও হিন্দু সমাজের সমর্থন তাঁরা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। ফলে আন্দোলন চলাকালীন হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঐক্যের অন্তরায় হয়ে ওঠে।
মূল্যায়ন – গান্ধিজি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করে প্রকারান্তরে মুসলমানদের পৃথক জাতি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে খিলাফত আন্দোলন বন্ধ হয়ে গেলেও এর ফলে যে ধর্মীয় ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়েছিল তা মুসলিম লিগকে প্রভাবিত করে।
5. ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্ভবের কারণ বা পটভূমি নির্ণয় করো। ভারতে সাম্প্রদায়িকতা বিকাশে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা কী ছিল?
পরাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বিকাশে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অবদান ছিল এককথায় অনস্বীকার্য।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পটভূমি –
- বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া – ভারতে ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানগণ হিন্দুদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু যুবকগণ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের চেয়ে এগিয়ে যায়। ফলে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
- ডিভাইড অ্যান্ড রুল – ইংরেজ সরকারের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি তথা ‘মুসলমান তোষণ নীতি’ ভারতে এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অদৃশ্য বিভেদের প্রাচীর গড়ে তোলে।
- নিরাপত্তার অভাব – ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে হিন্দুদের বেশি প্রাধান্য থাকায় সংখ্যালঘু মুসলমানগণ নিরাপত্তার অভাব তথা হীনম্মন্যতায় ভুগছিল।
- বিভেদ – সমকালীন ঐতিহাসিকদের সংকীর্ণ ইতিহাস-চেতনা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের দেওয়াল তুলে দেয়।
- হিন্দুত্ববাদের প্রাবল্য – ভারতের সংগ্রামশীল রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদের প্রাবল্যকে কম দায়ী করা যায় না।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ভূমিকা –
- ধর্মীয় আচার – এই আন্দোলনের সঙ্গে হিন্দুধর্মেও অনেক আচার-অনুষ্ঠান সংযুক্ত হয়। যেমন—আন্দোলনের শুভারম্ভে কালীঘাটের মন্দিরে পুজো দেওয়া, মানত করা বা শপথ নেওয়া ইত্যাদি। তাই হিন্দুদের এই সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মুসলমানরা মন থেকে মানতে না পারার কারণে তারা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেনি। বরং কয়েকজন মুসলিম রাজনৈতিক নেতা ব্রিটিশের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন।
- বয়কটের প্রভাব – বলা বাহুল্য যে, বয়কট আন্দোলনের ফলভোগ করতে হয়েছিল হতদরিদ্র মুসলমানদের। বয়কটের ফলে মুসলমানরা সস্তায় বিলেতি পণ্য থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের পক্ষে বেশি দাম দিয়ে স্বদেশি পণ্য কেনা সম্ভব ছিল না।
- চরমপন্থী মনোভাব – চরমপন্থী কংগ্রেসি নেতারা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ঘোরতর সমর্থক ছিলেন। এঁরা বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু। তাঁরা প্রধানত হিন্দু ঐতিহ্যকেই জাতীয় ঐতিহ্য বলে মনে করতেন। গীতা, আনন্দমঠ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শ গ্রহণ করতেন।
- জমিদারি শোষণ – পূর্ববঙ্গে হিন্দু জমিদারগণ সংখ্যালঘু মুসলিম কৃষকদের ওপর দারুণ শোষণ ও নির্যাতন করতেন। ইংরেজ প্রশাসন এই ঘটনাকে সামনে রেখে রাজনীতি শুরু করে। তারা মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব উসকে দেয়।
মন্তব্য – উপরোক্ত কারণে মুসলিমদের একটা অংশ এই আন্দোলনে যোগ দেয়নি; বরং তারা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে। এই বিরোধিতার ফলেই 1906 খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের জন্ম হয় এবং ক্রমে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মহীরুহে পরিণত হয়।
6. মুসলিম লিগের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ – টীকা লেখো।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্বে মুসলিম লিগ পরিচালিত ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম
পটভূমি – ক্যাবিনেট মিশনের সুপারিশে ভারতের জন্য একটি সংবিধান রচনা করার কথা বলা হয় এবং আরও বলা হয় যে, যত দিন পর্যন্ত এই সংবিধান রচনার কাজ শেষ না হচ্ছে, ততদিন দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেইমতো 1946 খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে সংবিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে কংগ্রেস আশাতীত সাফল্য লাভ করে। 1946 খ্রিস্টাব্দের 6 আগস্ট ‘কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি’ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার সদিচ্ছা প্রকাশ করে। কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে মুসলিম লিগ ক্ষুব্ধ হয়। মহম্মদ আলি জিন্নাহ অন্তর্বর্তী সরকারকে মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা বলে দাবি করেন। তাই এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ মুসলিম লিগ তা বয়কট করে এবং মহম্মদ আলি জিন্নাহ 16 আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামের’ ডাক দেন।
প্রসার – বাংলাদেশে (কলকাতা, নোয়াখালি) হিন্দু বিরোধী প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন হোসেন সুরাবর্দী। শুরু হয় লুণ্ঠন, ধর্ষণ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও হিন্দু নিধন যজ্ঞ। এই দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ হতাহত হন। দাঙ্গাকারীরা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ধ্বনি তুলে হিন্দু নিধন যজ্ঞে শামিল হয়। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার লেলিহান শিখা ভারতবর্ষের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
ফলাফল – তাই বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি 1947 খ্রিস্টাব্দের 3 জুন ভারত বিভাগের প্রস্তাব ঘোষণা করেন।
7. মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন (1940) অথবা, ‘লাহোর প্রস্তাব’ – টীকা লেখো।
ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল 1940 খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন।
মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন –
পটভূমি – 1935 খ্রিস্টাব্দের ‘ভারত শাসন আইন’-এর ভিত্তিতে 1937 খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম আইন সভার নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। এই সাফল্য মুসলিম লিগ মেনে নিতে পারেনি। বলা বাহুল্য যে, এরপর থেকেই মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা উগ্র আকার ধারণ করে। মুসলিম লিগ কংগ্রেসকে ‘ক্ষমতা লোভে মত্ত’ বলে অভিহিত করে। 1939 খ্রিস্টাব্দের একটি ঘোষণায় মহম্মদ আলি জিন্নাহ বলেন, মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজন।
লাহোর প্রস্তাব – 1940 খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের লাহোরের বাৎসরিক অধিবেশনে ‘লাহোর প্রস্তাব’ গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবের খসড়া রচনা করেন সিকান্দার হায়াৎ খান এবং এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক।
- বস্তুত ‘লাহোর প্রস্তাবে’ মুসলমান সম্প্রদায়ের দ্বিজাতিতত্ত্বের চড়া সুর ধ্বনিত হয়।
- ফজলুল হক মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবি জানান। লিগের বিখ্যাত নেতা চৌধুরী খলিকুজ্জমান এই দাবি সমর্থন করেন।
- অপরপক্ষে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ভারতের কংগ্রেস পরিচালিত সরকারকে ‘হিন্দু-রাজ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে সোচ্চার হন।
প্রতিক্রিয়া – জাতীয় কংগ্রেস সহ অনেক মুসলিম নেতাই মুসলিম লিগের ‘লাহোর প্রস্তাব’-এর সমালোচনা করেন। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ সহ মুসলমান সম্প্রদায়ের একাংশ লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্তের নিন্দা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, লিগ কখনোই ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের একমাত্র প্রতিনিধি নয়।
8. ভারতীয় রাজনীতিতে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ভূমিকা আলোচনা করো।
- প্রথম জীবন – মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ 1876 খ্রিস্টাব্দে করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে তিনি বোম্বে হাইকোর্টে যোগ দেন। 1906 খ্রিস্টাব্দে তিনি জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন।
- কংগ্রেসের বিরোধিতা – 1921 খ্রিস্টাব্দে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন; কারণ কংগ্রেসকে তিনি হিন্দুদের সংগঠন বলে মনে করতেন। তিনি আইনসভাগুলিতে আরও বেশি মুসলিম প্রতিনিধিত্ব দাবি করেন।
- সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি – 1928-29 খ্রিস্টাব্দে নেহরু রিপোর্ট প্রকাশিত হলে জিন্নাহ মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ‘চোদ্দো দফা দাবি’ পেশ করেন। প্রধানত জিন্নাহর বিরোধিতার কারণেই গান্ধীকে গোল টেবিল বৈঠক থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়।
- 1937 খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে লিগের ব্যর্থতা – 1937 খ্রিস্টাব্দের প্রাদেশিক নির্বাচনে লিগের ভরাডুবি ঘটে। নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থায় না থাকলেও, ভবিষ্যৎ সংবিধান সংক্রান্ত যে-কোনো আলোচনায় মুসলিম লিগকে তৃতীয় দল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
- 1940 খ্রিস্টাব্দের লাহোর সম্মেলন – 1940 খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের লাহোর সম্মেলনে জিন্নাহ সভাপতিত্ব করেন। এই সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমানদের ‘আলাদা জাতি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
- জিন্নাহর অনমনীয় মনোভাব – 1944 খ্রিস্টাব্দে চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী জিন্নাহর কাছে এক সমঝোতা প্রস্তাব পেশ করেন, কিন্তু এতে পাকিস্তানের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকার কারণে জিন্নাহ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। 1945 খ্রিস্টাব্দে শিমলা অধিবেশনে তিনি দাবি করেন, মুসলিম লিগ ভারতে সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করবে। 1945 খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়াভেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শিমলা বৈঠকে জিন্নাহ সমতার ভিত্তিতে অনড় থাকায় সেই বৈঠক ব্যর্থ হয়।
9. ‘ওয়াভেল পরিকল্পনা’ সম্পর্কে কী জানো?
ভূমিকা – 1943 খ্রিস্টাব্দে ভারতে বড়লাট হিসেবে লর্ড ওয়াভেল দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই সময় গোটা দেশ জুড়ে চলছিল সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা। এই অবস্থায় 1945 খ্রিস্টাব্দের 14 জুন লর্ড ওয়াভেল কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের কাছে কতগুলি সুপারিশ বা পরিকল্পনা পেশ করেন। এই সুপারিশগুলিকেই বলা হয় ‘ওয়াভেল পরিকল্পনা’।
ওয়াভেল পরিকল্পনার বিষয়বস্তু –
- সরকার শীঘ্রই ভারতীয়দের জন্য একটি সংবিধান রচনা করবে এবং তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
- এই সংবিধান রচনার কাজ যতদিন না শেষ হচ্ছে, ততদিন ভারতের শাসনভার দেখাশোনা করবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
- বড়লাটের কার্যনির্বাহী সমিতিতে বর্ণহিন্দু ও মুসলমানদের অনুপাত সমান হবে।
- বড়লাটের কার্যনির্বাহী পরিষদে বড়লাট ও একজন প্রধান সেনাপতি ছাড়া সকলেই ভারতীয় সদস্য হবেন।
- ভারতের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব যতদিন ব্রিটিশদের হাতে থাকবে, ততদিন সামরিক দপ্তর তথা সামরিক ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতেই থাকবে।
তৎকালীন ভারত সচিব এল. এম. আমেরি লর্ড ওয়াভেলের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন যে, “আমরা ভারতীয়দের হাতেই ভারতের তাৎক্ষণিক ভবিষ্যৎ তুলে দিতে চাই।”
ফলাফল – ওয়াভেল তাঁর পরিকল্পনাগুলি আলোচনা করার জন্য 1945 খ্রিস্টাব্দের 25 জুন শিমলায় একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করেন। কিন্তু এই বৈঠক ব্যর্থ হয়, কারণ মুসলিম লিগ ‘পাকিস্তান’ গঠনের দাবিতে অনড় ছিল। জিন্নাহ দাবি তোলেন যে, বড়লাটের কার্যনির্বাহী পরিষদের মুসলিম সদস্যগণ লিগ কর্তৃক মনোনীত হবেন। তাই কংগ্রেস লিগের প্রস্তাবে গররাজি হয়।
10. সি. আর. ফর্মুলা বা রাজাজির সূত্র – টীকা লেখো।
ভারত বিভাজন বন্ধ করার জন্য 1944 খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী মুসলিম লিগের নিকট যে সমঝোতা পত্র উত্থাপন করেন, তা ‘সি. আর. ফর্মুলা’ বা ‘রাজাজি সূত্র’ নামে খ্যাত।
সি. আর. ফর্মুলা / রাজাজির সূত্র –
পটভূমি – ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের শেষদিকে লিগ তথা জিন্নাহ পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র বা পাকিস্তান গঠনের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রে অকংগ্রেসি সরকার গঠনেও তৎপর হন। তাই কংগ্রেস অত্যন্ত বিচলিত হয়। এই অবস্থায় রাজাগোপালাচারী লিগের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে একটি সমাধান সূত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন।
রাজাজির সূত্র – রাজাজির প্রস্তাবে বলা হয়েছিল—
- মুসলিম লিগ জাতীয় কংগ্রেসের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকে মেনে নেবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যোগদান করবে।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলের গণভোটে ঠিক হবে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠন হবে কি না। যদি তারা পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে মত দেয়, তবেই ভারত বিভাজিত হবে।
- এই গণভোটের পূর্বে সব দলকেই তাদের মত প্রচারের সুযোগ দেওয়া হবে।
- তবে ভারত পূর্ণ স্বাধীনতা পেলেই এই প্রস্তাব কার্যকরী হবে।
ফলাফল – রাজাজির সূত্র শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ এই সূত্র মুসলিম লিগ তথা মহম্মদ আলি জিন্নাহ মেনে নেননি। গান্ধীজি বোম্বাইয়ের বাসভবনে জিন্নাহর সঙ্গে 21 বার বৈঠক করেও ব্যর্থ হন। জিন্নাহ গণভোট দ্বারা মুসলিমদের মত প্রকাশের বিষয়টিকে মোটেই গুরুত্ব দিতে রাজি ছিলেন না। স্বভাবতই গান্ধীজির দেশ ভাগ না-করার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। গান্ধীজির দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় 1947 খ্রিস্টাব্দের 15 আগস্ট।
11. মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা কী ছিল?
1947 খ্রিস্টাব্দের 24 মার্চ লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের বড়লাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অবসান ঘটাতে ব্রিটিশ সরকার দেশভাগ অনিবার্য বলে মনে করে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতভাগ সম্পর্কিত এক প্রস্তাব পাঠান ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই প্রস্তাবটি 1947 খ্রিস্টাব্দের 18 জুলাই ‘ইন্ডিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ বা ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’ রূপে পাস হয়; যা ‘মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা’ নামে পরিচিত।
মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা –
মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনার প্রস্তাবে বলা হয়—
- সমগ্র ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডমিনিয়নে বিভক্ত হবে।
- দুটি ডমিনিয়ন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করবে।
- মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলি যেমন—সিন্ধুপ্রদেশ, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ব বাংলা নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হবে।
- বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করা হবে এবং কোন অঞ্চল কোন ডমিনিয়নে যাবে, তা স্থির করবে একটি সীমানা নির্ধারণ কমিশন (র্যাডক্লিফ কমিশন)।
- গণভোটের মাধ্যমে স্থির হবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও অসমের শ্রীহট্ট জেলা কোন ডমিনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে।
- দেশীয় রাজ্যগুলি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার পাবে এবং তারা ইচ্ছা করলে যে-কোনো ডমিনিয়নে যোগ দিতে পারবে।
প্রতিটি ডমিনিয়ন তাদের গঠিত আইনসভা বা গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করতে পারবে।
মূল্যায়ন – সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত থেকে রেহাই পেতে কংগ্রেস এই পরিকল্পনা মেনে নিলেও গান্ধীজি, বল্লভভাই প্যাটেল, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ কংগ্রেস নেতা দেশভাগের বিরোধী ছিলেন (যদিও প্যাটেল পরে মেনে নেন)। সমগ্র বাংলা ও পাঞ্জাব দাবি করেও সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় জিন্নাহ মনক্ষুণ্ন হন। এই পরিকল্পনাকে তিনি ‘বিকলাঙ্গ ও কীটদগ্ধ’ (Moth-eaten) বলে মন্তব্য করেন।
পাঠ্যবইয়ের ছবি এবং ঐতিহাসিক তথ্য যাচাই করে, বানান ও যতিচিহ্ন (punctuation) সংশোধন করার পর চূড়ান্ত সংস্করণটি নিচে দেওয়া হলো। এখানে সংখ্যাগুলি ইংরেজিতে রাখা হয়েছে।
12. ক্রিপস কেন ভারতে আসেন? তাঁর প্রস্তাবগুলি কী ছিল? কেন তাঁর প্রস্তাব ব্যর্থ হয়েছিল?
পটভূমি – 1941 খ্রিস্টাব্দের 7 ডিসেম্বর মার্কিন নৌ-ঘাঁটি পার্লহারবার আক্রমণের মধ্য দিয়ে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় এবং দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জয় করে ভারত আক্রমণ করে। ভারত-রক্ষা ও ভারতের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও চিনা প্রেসিডেন্ট চিয়াং-কাই-শেকের পরামর্শে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল 1942 খ্রিস্টাব্দে ভারতে ক্রিপস মিশন পাঠান।
ক্রিপস প্রস্তাব –
ক্রিপস 1942 খ্রিস্টাব্দের 24 মার্চ ভারতে এসে পৌঁছোন। তারপর কংগ্রেস, মুসলিম লিগ সহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি কতগুলি প্রস্তাব পেশ করেন। সেগুলি হল—
- যুদ্ধে সাহায্যের বিনিময়ে যুদ্ধাবসানে ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়া হবে।
- ভারতীয় প্রতিনিধিদের ওপর সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
- সংবিধানের ভিত্তিতে ভারতের কোনো প্রদেশ বা রাজ্য ইচ্ছে করলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকতে পারবে।
- সংবিধান সভার সদস্যরা পৃথক পৃথক ভাবে নির্বাচিত হবেন।
- ভারতের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের হাতে থাকবে।
- যে-কোনো সিদ্ধান্তের ওপর বড়লাট ভেটো প্রয়োগ করে তা বাতিল করতে পারবেন।
ব্যর্থতার কারণ –
- ক্রিপসের প্রস্তাবে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার উল্লেখ ছিল না। ফলে জাতীয় কংগ্রেস এই প্রস্তাবগুলির ঘোরতর বিরোধিতা করে।
- ক্রিপসের প্রস্তাব ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়কেও হতাশ করে। কারণ এই প্রস্তাবে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’-এর দাবি উপেক্ষিত হয়।
- ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল, ভারতসচিব আমেরি, ভাইসরয় লিনলিথগো ও প্রধান সেনাপতি ওয়াভেল-এর বিরোধিতার জন্যও ক্রিপস ব্যর্থ হন।
- ভারতবিভাগের কথা থাকায় হিন্দু মহাসভা ক্রিপস প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে।
- ভারতের হরিজন সম্প্রদায়ও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।
মহাত্মা গান্ধি ক্রিপস প্রস্তাবের অসারতা বোঝাতে বলেন— “এটি একটি ফেল পড়া ব্যাঙ্কের ওপর আগামী দিনের চেক” (a post-dated cheque on a crashing bank)।
13. ভারতবর্ষের দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভবের কারণগুলি আলোচনা করো।
ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে ভারতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এক সহজ সরল সহাবস্থান ছিল। হিন্দু-মুসলিম দুটি আলাদা জাতি এই ধারণা সে সময়ের মানুষের মনে ছিল না। বিপানচন্দ্র বলেছিলেন, “1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহে হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল।” কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজবপন করে। তারপর থেকেই ভারতের আধুনিক রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা এক জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
বিভিন্ন কারণ –
- হিন্দু মুসলিমের অসম উন্নয়ন – পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে হিন্দুরা যেভাবে নিজেদের উন্নয়ন ঘটিয়েছিল ও উচ্চ সরকারি পদগুলি করায়ত্ত করেছিল, মুসলিমরা তা পারেনি। ব্রিটিশদের প্রতি তাদের বৈরী মনোভাব তাদের উন্নতিতে বাধা দিয়েছিল। এর ফলে মুসলিমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ে।
- বুর্জোয়াদের ভূমিকার ক্ষেত্রে হিন্দু বুর্জোয়াদের সাফল্য – ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে হিন্দু বুর্জোয়াদের সাফল্য দেখে মুসলিম বুর্জোয়াশ্রেণি ঈর্ষান্বিত হয়। মুসলিম বুর্জোয়াশ্রেণি হিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে অনেকটা পিছিয়ে থাকায় হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে।
- প্যান-ইসলামিক আদর্শ – বহু ভারতীয় মুসলমান প্যান-ইসলাম বা বিশ্ব ইসলামীয় সংস্কৃতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের বিদেশি বলে ভাবত। তাদের ভারতবর্ষ অপেক্ষা আরব, ইরাক ও সিরিয়া প্রভৃতি দেশগুলির প্রতি আত্মিক আকর্ষণ বেশি ছিল। তাদের এই ধারণা দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্য দায়ী ছিল।
- নেতাদের ভূমিকা – স্যার সৈয়দ আহমেদ খান থেকে শুরু করে আগা খাঁ, আলি ভ্রাতৃদ্বয় (সওকত আলি ও মহম্মদ আলি), চৌধুরী রহমত আলি, মহম্মদ ইকবাল, মহম্মদ আলি জিন্না পর্যন্ত প্রত্যেকে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য সারাজীবন কাজ করে গেছেন। অপরদিকে ‘হিন্দু মহাসভা’, ‘জনসংঘ’ প্রভৃতি সংগঠনগুলিও একইরকমভাবে হিন্দুদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকায় দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে।
- বিভিন্ন মুসলিম অধিবেশনগুলির ভূমিকা – 1928 খ্রিস্টাব্দে ড. আনসারির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী মুসলিম দল এবং 1929 খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে মেহের আলি, ইউসুফ, ব্রেলভি প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কংগ্রেস মুসলিম দল সাম্প্রদায়িকতার অবসান চাইলেও, মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন ও লখনউ অধিবেশন সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেয় এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের পরিণতি রূপে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
- ব্রিটিশের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি – ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে জাতীয় আন্দোলনের মূলস্রোত থেকে মুসলিম সম্প্রদায়কে আলাদা করতে পারলে জাতীয় আন্দোলনের গতি অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়বে। তাই ব্রিটিশ সরকার ‘Divide and Rule policy’ চালু করে।
মূল্যায়ন – দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রচারের ক্ষেত্রে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ ও সংগঠনগুলি দায়ী ছিল। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থিওডর বেক-এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সৈয়দ আহমেদ খান দ্বিজাতি তত্ত্বের যে প্রচার শুরু করেছিলেন, সেই ধারা বহন করেছিলেন মোহাম্মদ ইকবাল, চৌধুরী রহমত আলি, মোহাম্মদ আলি জিন্না প্রমুখ। অপরদিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব ও ধারা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আর্যসমাজ, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি হিন্দু সংগঠনগুলি দায়ী ছিল।
এখানে ঐতিহাসিক তথ্য, বানান এবং যতিচিহ্ন (punctuation) সংশোধন করে চূড়ান্ত সংস্করণটি দেওয়া হলো। সংখ্যাগুলো আপনার অনুরোধ অনুযায়ী ইংরেজিতে রাখা হয়েছে।
14. দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলাফল আলোচনা করো।
ভারতীয় রাজনীতিতে দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলাফল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ—
- ঐক্য বিনষ্ট – স্যার সৈয়দ আহমেদের সময় থেকেই ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রসার হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে বিনষ্ট করে।
- দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম – দ্বিজাতি তত্ত্বের চরম পরিণতিরূপে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ দু-টুকরো হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
- মুসলিম সম্মেলন অনুষ্ঠান – বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত মুসলিম সম্মেলনগুলি মুসলিম লিগের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে।
- পাকিস্তান দাবি – কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলি ‘Now or Never’ ইস্তেহার পত্রে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের যে পরিকল্পনা জানান (1933 খ্রিস্টাব্দ), জিন্নাহ্ দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়ে তা বাস্তবায়িত করেন।
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা – দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলে স্বাধীনতার প্রাক্কালে যে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে, তাতে লক্ষ লক্ষ নির্দোষ, অসহায় হিন্দু ও মুসলিম প্রাণ হারায়। কলকাতা, নোয়াখালি, ত্রিপুরা সহ ভারতের বিভিন্ন অংশে শুরু হয় এই দাঙ্গা।
- অগ্রগতি ব্যাহত – দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রে অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
মূল্যায়ন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন—“একথা বলিয়া নিজেকে ভুলাইলে চলিবে না যে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে কোনো পাপই ছিল না, ইংরেজরাই মুসলমানকে আমাদের বিরুদ্ধ করিয়াছে।” ব্রিটিশরা বিভাজন নীতির এমন প্রয়োগ ঘটিয়েছিল যাতে মুসলিমরা ভারতের কল্যাণ অপেক্ষা নিজেদের কল্যাণেই বেশি মগ্ন ছিল।
15. ভারতের স্বাধীনতা আইনে দেশভাগ সম্পর্কে কী কী প্রস্তাব ছিল?
1947 খ্রিস্টাব্দের 4 জুলাই ভারতের ‘স্বাধীনতা বিলটি’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমন্স সভায় গৃহীত হয়। 18 জুলাই এই বিলটি ‘ভারতের স্বাধীনতা আইনে’ পরিণত হয়।
ভারতের স্বাধীনতা আইন –
- দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন – ভারতের স্বাধীনতা আইনে বলা হয় 1947 খ্রিস্টাব্দের 15 আগস্ট ভারতবর্ষ দ্বিবিভাজিত হবে। একটি হবে পাকিস্তান এবং অন্যটি ভারত।
- ভারত ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হবে বোম্বাই, মাদ্রাজ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পূর্ব পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, দিল্লি, আজমির প্রভৃতি প্রদেশ।
- পাকিস্তান ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হবে সিন্ধুপ্রদেশ, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ববঙ্গ।
- গণপরিষদ সম্পর্কে – উভয় ডোমিনিয়নেই একটি করে গণপরিষদ থাকবে এবং তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের শাসনতন্ত্র বা সংবিধান রচনা করবে।
- দেশীয় রাজ্য সম্পর্কে – এই আইনে বলা হয় যে, ভারত স্বাধীন হলে ভারতের দেশীয় রাজ্যের ওপর থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটবে। তারা তাদের ইচ্ছানুসারে ভারত অথবা পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগদান করতে পারবে।
- সীমানা সম্পর্কে – এতে বলা হয় যে, দুজন কংগ্রেস ও দুজন মুসলিম লিগের সদস্য এবং স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে নিয়ে গঠিত হবে একটি বর্ডার কমিশন (সীমানা কমিশন)। এই কমিশন পাঞ্জাব ও পূর্ববঙ্গের সীমানা নির্ধারণ করবে।
মন্তব্য – শেষপর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা আইন অনুসারে 1947 খ্রিস্টাব্দের 14 ও 15 আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
16. ‘মন্ত্রী মিশন’ বা ‘ক্যাবিনেট মিশনের’ প্রস্তাবগুলি আলোচনা করো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জটিল আকার ধারণ করে। এই সময় নৌবিদ্রোহ, মুসলিম লিগের ‘পাকিস্তান’ গঠনের উন্মাদনা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভারতের রাজনীতিতে এক অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। এই অচলাবস্থা দূর করার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি মন্ত্রীমিশন গঠন করেন।
- মন্ত্রী মিশনের প্রস্তাব বা পরিকল্পনা
- ব্রিটিশ শাসিত ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা হবে। এই ব্যবস্থায় প্রাদেশিক সরকারগুলি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাবে।
- হিন্দু অধ্যুষিত প্রদেশগুলি ‘ক’, মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলি ‘খ’ এবং বাংলা ও আসাম প্রদেশগুলি ‘গ’—এইভাবে চিহ্নিত হবে।
- প্রয়োজনে প্রদেশগুলি পৃথক পৃথক সংবিধান রচনা করতে পারবে।
- উক্ত শ্রেণিভুক্ত রাজ্যগুলি এবং দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধিগণ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা করবে।
- এই সংবিধান রচনার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে।
- সাম্প্রদায়িক নীতি অনুসরণ করে গঠিত হবে এই নতুন সংবিধান।
- ফলাফল
- জাতীয় কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিলেও মুসলিম লিগ তা বর্জন করে। তারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর পথে হাঁটে।
- ওয়াভেল পরিকল্পনা অনুসারে এই প্রথম দেশীয় রাজ্যের জনগণকে সংবিধান সভার প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়।
- ব্রিটিশ সরকার ভারতের সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে গণপরিষদ গঠনের কথা বলেছিল, তা ছিল ভারতীয় রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের অষ্টম অধ্যায়, “সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন