আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘আকাশে সাতটি তারা’ -এর কিছু ব্যাখ্যাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘আমি এই ঘাসে/বসে থাকি;’ – কে, কখন, কেন ঘাসে বসে থাকেন?
যে, যখন, যে কারণে বসে থাকে – আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে কবি জীবনানন্দ দাশ ঘাসের ওপর বসে থাকেন। বাংলার নিসর্গপ্রকৃতিতে মায়াময় সন্ধ্যা নামার সময় রচনা করে এক রূপকথার জগৎ। তখন অস্তমিত সূর্যের আলোয় ভাসমান মেঘ যেন গঙ্গাসাগরের ঢেউ -এর সঙ্গে মিলনাকাঙ্ক্ষায় কামরাঙা লাল বর্ণ পায় এবং ক্ষণিকের মধ্যেই মৃত মুনিয়ার মতো প্রাণের অস্তিত্ব হারায়। খোলা আকাশে ফুটে ওঠা সাতটি তারাকে সঙ্গী করে কামনায় রাঙা বঙ্গপ্রকৃতির সান্ধ্য সৌন্দর্য উপভোগের জন্য কবি বসে থাকেন।
‘আমি এই ঘাসে/বসে থাকি;’ – যখন কবি বসে থাকেন তখন প্রকৃতির রূপ কেমন?
সন্ধ্যা প্রকৃতির রূপ – কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন বাংলা প্রকৃতির অপরূপ রূপ। সন্ধ্যার সূচনায় গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে অস্তমিত সূর্যের আলোয় ভাসমান মেঘ কামরাঙার মতো লাল বর্ণ ধারণ করে। কবির তা দেখে প্রাণচঞ্চল মুনিয়া পাখির মৃতদেহের কথা মনে পড়ে। রোজকার মতো শান্ত অনুগতভাবে সন্ধ্যা নামে। কেশবতী কন্যার ঘন চুলের মত অন্ধকার কবির চোখে মুখে ভাসে। এমন এক সন্ধ্যায় কবি বসে থাকেন ঘাসের ওপর আকাশে সাতটি সন্ধ্যা তারাকে সঙ্গী করে।
‘কামরাঙা-লাল মেঘ’ – কথাটির তাৎপর্য কী?
তাৎপর্য – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ আসন্ন সন্ধ্যার পরিবেশে ভাসমান মেঘকে কামরাঙা-লাল বলেছেন। মেঘের বর্ণ কামরাঙা-লাল হয়ে উঠেছে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলোর আভায়। কামরাঙা ফল পেকে গেলে তার বর্ণ যেমন লালচে হয়ে যায়, গোধূলিবেলায় রাতের অন্ধকারে ডুবে যাওয়ায় আগে মেঘের তেমন বর্ণই প্রত্যক্ষ করেছে প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দের সৌন্দর্যপিয়াসি মন। অন্যদিকে অস্তমিত সূর্যের রক্তিম আলোয় রাঙা মেঘ যেন গঙ্গাসাগরের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ। তাই তার বর্ণ কামনায় রাঙা এবং লাল।
‘কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো/গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে’ – কবি এমন বলেছেন কেন?
উক্তির কারণ – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার সান্ধ্যকালীন অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা করেছেন। কবি সন্ধ্যার আসন্ন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া প্রাণের অস্তিত্বহীন মেঘকে তুলনা করেছেন প্রাণচঞ্চল মুনিয়া পাখির মৃতাবস্থার সঙ্গে। গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে মিলনের কামনায় যে মেঘ অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলোয় রঙিন হয়েছে, তার রং কামরাঙার লাল বর্ণের মতো। সেই মেঘ যেন ক্ষণিকের মিলনাবেশের শেষে মৃত মুনিয়া পাখির স্থবির দেহের মতোই গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে।
মৃত মনিয়ার সঙ্গে কামরাঙা-লাল মেঘের তুলনা করার কারণ কী?
তুলনার কারণ – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের উপমা প্রয়োগের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। আলোচ্য কবিতায় কবি সন্ধ্যার অস্তাচলগামী সূর্যের রক্তিম আলোয় লাল বর্ণের মেঘকে মৃত মুনিয়া পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রাণচঞ্চল রঙিন মুনিয়া পাখির মৃত্যু হলে সে নিশ্চুপ হয়ে যায়, তেমনি লাল বর্ণের মেঘ চারপাশ নিস্তব্ধ করে সন্ধ্যায় গঙ্গাসাগরে ডুবে যায়। এরপর কালো কেশের মত ঘন অন্ধকার সমগ্র চরাচরকে স্তব্ধ করে।
বাংলার সন্ধ্যাকে নীল এবং শান্ত, অনুগত বলার কারণ কী?
সন্ধ্যাকে নীল, শান্ত অনুগত বলার কারণ – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বঙ্গ প্রকৃতির বুকে নেমে আসা সন্ধ্যাকে শান্ত ও অনুগত বলেছেন। প্রতিদিন প্রকৃতির নিয়মে বাংলায় সন্ধ্যা নামে। সেখানে কোনো আড়ম্বর নেই, রয়েছে অদ্ভুত প্রশান্তি। এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে না বলেই সন্ধ্যার নীল আলোয় নিসর্গপ্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং বিচিত্র গন্ধের মাঝে কবি খুঁজে পেয়েছেন বাংলার প্রাণের সন্ধান।
‘কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে;’ – তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
তাৎপর্য – ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ বঙ্গপ্রকৃতির উপর নেমে আসা মায়াবী, মেদুর, নীল সন্ধ্যাকে তুলনা করেছেন কেশবতী কন্যার সঙ্গে। কবির কল্পনায় চরাচর জুড়ে নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকার যেন কোনো কেশবতী কন্যার ঘন চুলের মতো মোহময় আবেশ তৈরি করেছে। ঘন চুলের আবরণে, তার স্নিগ্ধ গন্ধে বঙ্গপ্রকৃতির সান্ধ্যকালীন সৌন্দর্য অনন্য হয়ে উঠেছে।
‘আমার চোখের পরে আমার মুখের ‘পরে চুল তার ভাসে;’ – কবির এমন কথা বলার কারণ উল্লেখ করো।
উদ্ধৃতিটির কারণ – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ বঙ্গপ্রকৃতির উপর নেমে আসা মায়া-মেদুর নীল সন্ধ্যাকে তুলনা করেছেন কেশবতী কন্যার সঙ্গে। কবির মনে হয়েছে আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কেশবতী কন্যার চুলের মতো মোহময় সন্ধ্যার সমাহিত সৌন্দর্য। সেই আবেশে আবিষ্ট হয়েছে হিজল-কাঁঠাল-জামের বন। কেশবতী কন্যারূপী সন্ধ্যা তার ঘন চুলের মতো অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। সেই অপূর্ব শোভা যেন কবির প্রেয়সীর মতোই পরম মমতায় কবিকে স্পর্শ করে যায়।
‘পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো’ – কোন কন্যাকে দেখেনি? তার রূপের বর্ণনা দাও।
কন্যার পরিচয় – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ আলোচ্য উদ্ধৃতিতে কেশবতী কন্যা অর্থাৎ বাংলার সান্ধ্যকালীন সৌন্দর্যকে দেখার কথা বলা হয়েছে।
রূপের বর্ণনা – কেশবতী কন্যার ঘন চুলের মত সন্ধ্যার অন্ধকারে পরিব্যাপ্ত চারপাশের পরিবেশ। তার চুলের স্পর্শে অর্থাৎ সন্ধ্যার আবেশে আবিষ্ট হয় হিজল কাঁঠাল-জামের বন। স্নিগ্ধ গন্ধের মাদকতা ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র। কবি বলেছেন ঘন চুলের পরশ তার চোখে মুখে ভেসে বেড়ায়। বাংলাদেশে নিসর্গ প্রকৃতির বুকে নেমে আসা সন্ধ্যার যে রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ তা কবি সমগ্র সত্তায় অনুভব করেছেন, তা কবিতায় মূর্ত হয়েছে।
‘পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নিকো – দেখি নাই অত’-আলোচ্য উদ্ধৃতিতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
কবির বক্তব্য – প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ বঙ্গপ্রকৃতির নৈসর্গিক বিরল সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেছেন। তিনি পৃথিবীর অন্য কোথাও এইরূপ মায়াবী পরিবেশ খুঁজে পাননি। কবি বাংলায় নেমে আসা নীল সন্ধ্যার মধ্যে দেখেছেন কেশবতী কন্যার সৌন্দর্য, যার ঘন চুলের কোমল পরশ ছড়িয়ে রয়েছে কবির চোখে মুখে। হিজল-কাঁঠাল কিংবা জাম গাছে। কবির চেতনায় পৃথিবীর আর কোনো পথে রূপসী কেশবতী কন্যার চুলের বিন্যাসে এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে পড়ে না। এই গন্ধ কবি কেবল অনুভব করেছেন বাংলাদেশের নরম ধানে, কলমির ঘ্রাণে, হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল এবং চাঁদা ও সরপুঁটিদের সংস্পর্শে। জীবনানন্দ দাশ বঙ্গপ্রকৃতির এই অতুলনীয় সৌন্দর্য পৃথিবীর আর কোথাও দেখেন নি।
কার ‘অজস্র চুলের চুমা’ কোথায় কীভাবে ঝরে পড়ে?
‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার নীল সন্ধ্যাকে কেশবতী কন্যার সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মনে হয়েছে ঘন চুলের ন্যায় অন্ধকার খেলা করছে বঙ্গপ্রকৃতির চোখে মুখে। সেই ঘন চুলের চুম্বন অবিরত ঝরে পড়ছে বাংলার হিজল-কাঁঠাল জামের উপর। রূপসীর চুলের স্নিগ্ধ মায়াবী পরশ ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্র চরাচরে।
‘জানি নাই এত স্নিগ্ধ ঝরে ‘রূপসীর চুলের বিন্যাসে’ – আলোচ্য অংশে কবি কী না জানার কথা বলেছেন?
প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ খেয়াল করেছেন প্রকৃতির বিরল নৈসর্গিক সৌন্দর্য শুধুমাত্র বাংলার পটভূমিতে লক্ষ করা যায়। এই মায়াময় পরিবেশ পৃথিবীর অন্য কোথাও অনুভব করা যায় না।
কবির বক্তব্য – নীল সন্ধ্যার আবেশ যেমনভাবে ঘিরে রেখেছে সমগ্র পারিপার্শ্বিককে, তাতে মনে হয়েছে এ যেন কোনো কেশবতী কন্যার ঘন চুলের পরশ। কবি বলেছেন এই পরশ তার চোখে মুখে ভাসছে। অজস্র চুলের চুম্বন অন্য কোথাও ছুঁয়ে যায় না হিজল-কাঁঠাল-জামকে। অথবা কবির জানা নেই আর কোথাও কন্যার চুলের এমন স্নিগ্ধ গন্ধ মাদকতায় ভরিয়ে রেখে কিনা পৃথিবীর কোনো পথকে। নরম ধানের সুবাস, কলশির গন্ধ, হাঁসের পালক প্রভৃতির গন্ধ মেঘে শুধুমাত্র বঙ্গপ্রকৃতি পূর্ণ হয়।
বঙ্গপ্রকৃতির স্নিগ্ধ গন্ধ কবি কোন্ কোন্ অনুষঙ্গে উপলব্ধি করেছেন?
অনুসঙ্গ – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় বঙ্গপ্রকৃতির সান্ধ্যসৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি বাংলার পরিচিত সাধারণ, তুচ্ছ অনুষঙ্গে বঙ্গপ্রকৃতির স্নিগ্ধ গন্ধ উপলব্ধি করেছেন। কখনও সে গন্ধ কবি অনুভব করেন নরম ধানে কিংবা কলমির ঘ্রাণে; কখনও বা হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মৃদু ঘ্রাণে। আবার কখনও বঙ্গপ্রকৃতির ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা কবির কাছে উপলব্ধ হয় কিশোরের পায়ে দলিত ঘাসে, কিশোরীর চাল ধোয়া হাতে মুথাঘাস কিংবা লাল লাল বটের ফলে।
পৃথিবীর পথে কবি কী কী দৃশ্য দেখেছেন?
পৃথিবীর পথে দৃশ্য – চিত্ররূপময় কবি জীবনানন্দ দাশের মতে, বাংলা প্রকৃতির স্নিগ্ধ শান্তরূপ পৃথিবীর আর কোনো পথে তিনি দেখেননি। কখনও নরম ধানে, কলমির ঘ্রাণে; আবার কখনও হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মুদু ঘ্রাণে বাংলার সন্ধ্যা আবিষ্ট করেছে কবিকে। এসবের মাঝে কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতে শীত অনুভব করেছেন তিনি। কিশোরের পায়ে দলা ঘাস কিংবা বটের লাল ফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতায় কবি পেয়েছেন প্রাণের স্পর্শ। এই দৃশ্যই কবি সেদিন পল্লিপ্রকৃতির পথের মাঝে দেখেছেন।
‘হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল,’ – এগুলো ছাড়া আর কী চিত্রকল্প কবি কবিতায় উল্লেখ করেছেন?
কবিতায় উল্লিখিত চিত্রকল্প – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ বঙ্গ প্রকৃতির স্নিগ্ধ গন্ধ অনুভব করেছেন নরম ধানে, কলমির ঘ্রাণে; কখনও বা হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মৃদু ঘ্রাণে। এর মধ্য দিয়ে আলোচ্য কবিতায় কবি নির্মাণ করেছেন অসাধারণ কিছু চিত্রকল্প। তিনি কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত প্রসঙ্গে শীতের উল্লেখ করেছেন। আবার কিশোরের পায়ে দলিত ঘাস কিংবা বটের লাল ফলের ব্যথিত গন্ধে থাকা ক্লান্ত নীরবতার মাঝে বঙ্গপ্রকতির প্রাণের স্পর্শ খুঁজে পেয়েছেন।
‘ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা’ – তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
তাৎপর্য – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ সান্ধ্যকালীন পরিবেশে বঙ্গপ্রকৃতির তুচ্ছ অনুষঙ্গে বাংলার প্রাণস্পন্দন অনুভব করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ‘ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা’-র প্রসঙ্গটি এনেছেন। কবি বলেছেন কিশোরের পায়ে দলিত ঘাস কাতর হলেও তার ব্যথা প্রকাশের ভাষা নেই। তেমনি বটের পাকা লাল ফল পরমুহূর্তে ঝরে পড়ার ভয়ে ভীত। এরা কেউ তাদের কণ্ঠ জানাতে পারে না। কবি তাই এদের ব্যথিত গন্ধ উপলব্ধি করেছেন, যা ক্লান্ত ও নিঃস্তব্ধ।
‘এরই মাঝে বাংলার প্রাণ;’ – কার মাঝে বাংলার প্রাণ খুঁজে পান কবি?
যেখানে কবি বাংলার প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ সান্ধ্যকালীন বঙ্গপ্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং বিচিত্র গন্ধের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রাণের হদিস। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলোয় রাতের অন্ধকারে ক্রমশ ডুবে যাওয়া মেঘের কামরাঙা লাল বর্ণের মধ্যে, বাংলার নীল সন্ধ্যার মোহময় আবেশে; নরম ধান, কলমির ঘ্রাণ কিংবা হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মৃদু ঘ্রাণে, কিশোরীর মমতাময়ী হাতের স্পর্শে কিশোরের পায়ে দলিত মুথাঘাস কিংবা পাকা বটফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতায় কবি উপলব্ধি করেছেন বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন।
‘আমি পাই টের’ – ‘আমি’ কে? তিনি কী টের পান? কখন টের পান?
‘আমি’-র পরিচয় – ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটিতে ‘আমি’ অর্থে স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশ।
তিনি যা টের পান – আলোচ্য কবিতায় বঙ্গপ্রকৃতির মায়াময় সৌন্দর্য এবং বিচিত্র গন্ধের মাঝে কবি টের পান বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন।
যখন টের পান – সন্ধ্যার সূচনায় আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে কবি সৌন্দর্যপিয়াসি মন নিয়ে ঘাসের উপর বসেন, তখনই তিনি উপলব্ধি করেন বাংলার প্রাণ স্পন্দন।
কামরাঙা – লাল মেঘ যেন মৃত মনির মতো / গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে – পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
কবির বক্তব্য: আকাশে সাতটি তারা কবিতাটিতে জীবনানন্দ বাংলার বুকে দিন শেষ হয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যার নেমে আসার এক অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর তার শেষ আভাটুকু রাঙিয়ে দেয় আকাশের মেঘকে। লাল টকটকে মেঘকে দেখে কবির পাকা কামরাঙা ফলের কথা মনে হয়। সেই মেঘ যখন গঙ্গাসাগরে ডুবে যায়, তা এতটাই নিঃশব্দে—ঠিক যেমন মৃত মনি ডুবে যায় তরঙ্গহীনভাবে।
আসিয়াছে শান্ত অনুগত / বাংলার নীল সন্ধ্যা — কবি বাংলার সন্ধ্যাকে শান্ত, অনুগত, নীল কেন বলেছেন?
শান্ত, নীল, অনুগত সন্ধ্যা – আকাশে সাতটি তারা কবিতায় জীবনানন্দ বাংলার সন্ধ্যা প্রকৃতির এক অসামান্য বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলার গ্রামে শহরের মতো কোলাহল নেই—জীবনযাত্রা সেখানে শান্ত। তাই গ্রামবাংলার বুকে সন্ধ্যাও নামে শান্তভাবে। পল্লিবাংলার সন্ধ্যা গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই—তার চাকচিক্য নেই, আছে স্নিগ্ধতা। তাই সন্ধ্যা অনুগত। সন্ধ্যায় অন্ধকার আর দিনের আলো মিশে যে আবছায়া তৈরি করে, তার সঙ্গে গাছপালার সবুজ আভা মিলে সন্ধ্যাকে নীল করে তোলে।
কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে — পঙ্ক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
পঙ্ক্তির ব্যাখ্যা – আকাশে সাতটি তারা কবিতায় জীবনানন্দ তাঁর একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিতে পল্লিবাংলার সন্ধ্যাকে বর্ণনা করেছেন। সূর্য ডুবে গেলে যখন দিনের আলো ফিকে হয়ে আসে, কবির মনে হয় যেন এক কেশবতী কন্যা এসেছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলে ঘনিয়ে আসে রাতের অন্ধকার। কবির চোখে এভাবেই কাব্যিকরূপে ধরা দেয় পল্লিবাংলার সন্ধ্যা।
আমার চোখের পরে আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে — পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
তাৎপর্য – আকাশে সাতটি তারা কবিতায় সবে যখন সূর্য অস্ত গেছে, আকাশে তারার বিন্দু ফুটে উঠছে, সেইসময় কবি ঘাসের উপর বসে গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ দিয়ে পল্লিবাংলার সন্ধ্যাকে অনুভব করেন। তাঁর মনে হয় যেন এক এলোকেশী মেয়ে দেখা দিয়েছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের মতো ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। কবি তাঁর চোখে-মুখে সেই চুল (অর্থাৎ অন্ধকারের স্পর্শ) অনুভব করেন।
পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো — কবির বক্তব্য বিশ্লেষণ করো।
বক্তব্য বিশ্লেষণ – আকাশে সাতটি তারা কবিতায় কবি ঘাসের উপর বসে পল্লিবাংলার দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণে সন্ধ্যাকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মনে হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে যেন এক এলোকেশী কন্যার আবির্ভাব হয় বাংলার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া চুল ছুঁয়েই নেমে আসে অন্ধকার। কবির কল্পনার এই কন্যা আসলে বাংলার সান্ধ্য প্রকৃতি। রূপসী বাংলার মতো সৌন্দর্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই, তাই আর কেউ এই কন্যাকে দেখেনি।
অজস্র চুলের চুম্বন হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত, — পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? অথবা, অজস্র চুলের চুম্বন বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অজস্র চুলের চুম্বন – আকাশে সাতটি তারা কবিতাটিতে জীবনানন্দের কল্পনাপ্রবণ চোখে ধরা পড়েছে পল্লিবাংলার সন্ধ্যার অপরূপ সৌন্দর্য। তাঁর মনে হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে যেন এক রূপসী এলোকেশী মেয়ে দেখা দেয় বাংলার আকাশে। আকাশ থেকে তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুল ধীরে ধীরে অন্ধকারের স্পর্শ নিয়ে আসে প্রকৃতির বুকে। হিজল, কাঁঠাল, জামের পাতায় সেই সোহাগভরা অন্ধকারের স্পর্শ যেন আসলে সেই রূপসীর চুলের চুম্বন।
এরই মাঝে বাংলার প্রাণ — পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। অথবা, এরই মাঝে বাংলার প্রাণ; — কবি কোথায় বাংলার প্রাণকে অনুভব করেন?
তাৎপর্য – বাংলাদেশ জীবনানন্দের কাছে শুধু এক ভূখণ্ড নয়, প্রাণময়ী মূর্তি। শব্দ-গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ দিয়ে কবি তাকে অনুভব করেন। আকাশে সাতটি তারা কবিতাটিতে তিনি বাংলার সন্ধ্যাকালীন প্রকৃতির এক অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। হিজল, কাঁঠাল, বট প্রভৃতি বৃক্ষ, ধানগাছ, কলমিশাক, মুথাঘাস, পুকুর, মাছ, কিশোর-কিশোরী (অর্থাৎ মানুষ)—এই সব নিয়েই বাংলার পরিপূর্ণ প্রকৃতি। এই প্রকৃতির মধ্যেই কবি বাংলার জীবন্ত সত্তাকে উপলব্ধি করেছেন।
লাল লাল বটের ফলের / ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা — তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
তাৎপর্য – আকাশে সাতটি তারা কবিতায় কবি পল্লিপ্রকৃতির মধ্যে বাংলার প্রাণকে খুঁজে পেয়েছিলেন। গাছ থেকে খসে পড়া বটফলের মধ্যে রয়েছে এক নীরব ক্লান্তি। বাংলার শান্ত নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির মধ্যে থাকা বিষাদময়তাকেই যেন কবি এখানে প্রত্যক্ষ করেন। গাছ থেকে খসে পড়া বটফলের মধ্যে রয়েছে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা।
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের – আমি কে? তিনি কী টের পান?
আমির পরিচয় – আকাশে সাতটি তারা কবিতা থেকে গৃহীত আলোচ্য পঙ্ক্তিটিতে আমি হলেন কবি জীবনানন্দ দাশ নিজে।
টের পাওয়া বিষয় – যখন আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তখন কবি টের পান যে বাংলার প্রকৃতি এবং সেই প্রকৃতিলালিত জীবনের মধ্যেই রয়েছে বাংলার প্রাণ। নরম ধানের গন্ধ, কলমির গন্ধ, হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মৃদু গন্ধ—এসবে কবি বাংলার প্রাণ খুঁজে পান। আবার কিশোরীর চালধোয়া-ভিজে হাত কিংবা কিশোরের পায়ে দলা মুথাঘাসে এই প্রাণময়তাকেই কবি দেখেন। খসে পড়া লাল বটফলের ক্লান্ত নীরবতাতেও তিনি বাংলার প্রাণকে উপলব্ধি করেন। এসবই তিনি টের পান আকাশে সাতটি তারা উঠলে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘আকাশে সাতটি তারা’ -এর কিছু ব্যাখ্যাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন