নবম শ্রেণি – বাংলা – ইলিয়াস – রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

Souvick

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘ইলিয়াস’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

নবম শ্রেণি - বাংলা - ইলিয়াস - রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
Contents Show

‘ইলিয়াস’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

ভূমিকা – সাহিত্যের ক্ষেত্রে শিরোনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নামকরণের মধ্যে দিয়ে পাঠক সাহিত্যিকের সৃষ্টি সম্বন্ধে সাহিত্যরচনার পূর্বেই একটি আভাস পেয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সাহিত্যিক ও পাঠকের মাঝে নামকরণ এক প্রারম্ভিক সেতু রচনা করে, যার আলোয় সচেতন পাঠকের মূল বিষয়ে প্রবেশ করা সহজতর হয়। নামকরণে সাহিত্যিকের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে – সেই স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটেছে লিও তলস্তয় রচিত এবং মনীন্দ্র দত্ত কর্তৃক অনূদিত ‘ইলিয়াস’ গল্পটিতে। গল্পকার এখানে মূল চরিত্রের প্রতি বিশেষ আলোকসম্পাত করে আলোচ্য শিরোনামটি ব্যবহার করেছেন।

সুখ যে অর্থ-নিরপেক্ষ এক মহার্ঘ মানসিক বিষয়, সেই উপলব্ধির কথা ব্যক্ত হয়েছে উত্থানপতনে ভরা ইলিয়াসের বর্ণময় জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে। প্রত্যন্ত প্রদেশ উফার সামান্য এক বাস্কির ইলিয়াস তার স্ত্রী শাম-শেমাগির সহায়তায় শ্রম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে বিপুল সম্পদশালী হয়ে ওঠে। গুটিকয়েক পশু নিয়ে যাত্রা করে পঁয়ত্রিশ বছরে ইলিয়াস দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ আর বারোশো ভেড়া’র বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়; তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে, ঈর্ষান্বিত হয় প্রতিবেশীরা।

নামকরণের সার্থকতা – এহেন ধনী ইলিয়াসের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে পারিবারিক কলহ, দুর্ভিক্ষ, মড়ক। সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে বৃদ্ধ দম্পতি। সর্বহারা হয়ে তারা আশ্রয় নেয় জনৈক প্রতিবেশী মহম্মদ শা-র বাড়িতে। শুরু হয় মজুরের জীবন। তারা মেনে নেয় ভাগ্যের এই পরিহাস। কিন্তু এমন জীবনে সম্পদরক্ষাজনিত উৎকণ্ঠা থাকে না, বরং প্রাণের কথা বলার সুযোগ থাকে, ঈশ্বর আরাধনার অবসরও হয় – সেই পথেই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে তারা প্রথমবার সুখের পরশ লাভ করে। ইলিয়াসের জীবনের আপাত এই অবিশ্বাস্য কাহিনি শুনিয়েছিল বৃদ্ধা শাম-শেমাগি। আর মোল্লাসহ মহম্মদ শা-র সমাগত অতিথিরা স্তম্ভিত হয়েছিল। জ্ঞানের কথার সঙ্গে ইলিয়াসের জীবনকথা মিলে গিয়েছিল চমৎকারভাবে। গল্পের যাবতীয় ঘটনাক্রম ইলিয়াসকে অবলম্বন করেই আবর্তিত বলে, এ গল্পের নামকরণ সহজবোধ্য ও সার্থক হয়েছে।

‘ইলিয়াস’ গল্পে যে জীবনদর্শন ব্যক্ত হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করো।

অথবা, ‘ইলিয়াস’ গল্পের মূল সুর কী?

ইলিয়াসের জীবন – লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পে ইলিয়াস প্রধান চরিত্র। সমগ্র গল্পটিতে এই চরিত্রের সামগ্রিক উত্থান ও পতনের ছবিটি চিত্রিত হয়েছে, তার এই উত্থানপতনেই গল্পের মূল সুর ফুটে উঠেছে। এককালের সম্পন্ন ব্যক্তি ইলিয়াস ভাগ্যের পরিহাসে দারিদ্র্যে উপনীত হয়। তখন তার আশ্রয় হয়ে ওঠে মহম্মদ শা। মহম্মদ শা’র বাড়িতে থেকে নানা কাজকর্ম করেই ইলিয়াস ও তার স্ত্রী দিনাতিপাত করতে থাকে। প্রথম জীবনে ইলিয়াস যথাযথ সম্পত্তির মালিক না থাকলেও পরবর্তীতে প্রচুর সম্পত্তির সত্বাধিকারী হয়ে ওঠে। অথচ পুত্রদের অকর্মণ্যতা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণে সেই সম্পত্তিকে সে ধরে রাখতে পারেনি, ফলে অসহায় হয়ে পড়ে। মহম্মদ শার বাড়িতে কাজ করার সময় অতিথি অভ্যাগতদের চোখে পড়ে ইলিয়াস। খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারে একসময় ইলিয়াস ছিল দানবীর, কিন্তু আজ তাকেই দানের অন্ন গ্রহণ করতে হয়। সে কারণে ইলিয়াসের জীবন অভিজ্ঞতার আয়তনও নেহাত কম নয়।

ভাঙাগড়ার জীবন – তলস্তয় উল্লিখিত গল্পের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের ভাঙাগড়ার চিত্রটিও তুলে ধরেছেন। এই ভাঙাগড়ার জীবনে ইলিয়াস অভিজ্ঞ, তাই তার স্বভাবও শান্ত। কিন্তু সর্বহারা হবার পরে মালিকের বাড়িতে থেকে তাদের সেবা করাকেই সে তার জীবনের অন্যতম কর্তব্য বলে মেনে নিয়েছিল। অতীতের জন্য কোনোরকম হীনমন্যতা বা জীবনযন্ত্রণা তাকে ভারাক্রান্ত করেনি। শ্রম ও নিষ্ঠাকে সঙ্গী করেই সে এগিয়ে চলেছে জীবন পথে।

জীবনের স্বরূপ উদ্‌ঘাটন – জীবনের অন্তিমে পৌঁছে ইলিয়াস ও তার পত্নী উপলব্ধি করেছিল জীবনে সাফল্য কখনও লোকবলে বা অর্থবলে আসে না। জীবন ভোগের জন্য যেমন নয়, তেমন যন্ত্রণার জন্য নয়। জীবন শান্তির। এই শান্তির সন্ধানই তার প্রভুর বাড়িতে খুঁজে পেয়েছিল ইলিয়াস। এজন্য ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। ইলিয়াসের এই উপলব্ধি যখন অতিথিমহলে উত্থাপিত হল তখন অবুঝের মতো তারাও হেসে উঠল, কিন্তু এ প্রসঙ্গে ইলিয়াসের উক্তি – ‘বন্ধুগণ হাসবেন না। এটা তামাশা নয়। এটাই মানুষের জীবন, আমার স্ত্রী আর আমি অবুঝ ছিলাম, তাই সম্পত্তি হারিয়ে কেঁদেছিলাম। কিন্তু ঈশ্বর আমাদের কাছে সত্যকে উন্মুক্ত করেছেন।’

এইভাবেই ইলিয়াস তার জীবনের স্বরূপকে উপলব্ধি করেছিল। এখানেই ইলিয়াসের জীবনদর্শনটি ধরা পড়েছে।

‘ইলিয়াস’ পাঠ্যাংশে ইলিয়াসের জীবনের যে উত্থানপতন, সুখদুঃখের দোলাচলতা লক্ষ করা যায় তা নিজের ভাষায় লেখো।

ইলিয়াসের জীবনের উত্থান – ‘ইলিয়াস’ গল্পটি আদ্যন্ত ইলিয়াসের জীবনের উত্থানপতনের জীবনচরিত হয়ে উঠেছে। প্রথম জীবনে ইলিয়াস দরিদ্র থাকলেও 35 বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিল সে। এইসময় তার সম্পত্তি বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন – “তখন তার দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ, আর বারোশো ভেড়া।” এই সময় ইলিয়াসের ‘বোলবোলাও’ কম ছিল না। তার প্রভূত সম্পত্তিতে পাড়া-প্রতিবেশী হিংসা করত, বলত – ‘ইলিয়াস তো ভাগ্যবান পুরুষ; কোনো কিছুরই অভাব নেই; ওর তো মরবারই দরকার নেই।’

পতন – কিন্তু ইলিয়াসের জীবনে শান্তি চিরস্থায়ী হল না। পুত্রদের সঙ্গে কলহ, পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অন্যান্য কারণে ইলিয়াসের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। নিঃস্ব, রিক্ত ইলিয়াসের সম্বলের মধ্যে রইল শুধু একটা পুঁটলি যাতে ছিল লোমের তৈরি কোট, টুপি, জুতো আর বুট এবং তার সঙ্গী বৃদ্ধা স্ত্রী। এইসময় তাদের সাহায্য করবার কেউ ছিল না।

ইলিয়াসের জীবনের সুখ – এ অবস্থায় প্রতিবেশী মহম্মদ শা ইলিয়াসকে আশ্রয় দিল। কারণ সে জানত ইলিয়াস অত্যন্ত সৎ, কর্মঠ এবং অতিথিবৎসলও বটে। তাই সহজেই ঘরের সমস্ত কাজ ও জমির কাজ সে করতে পারবে। প্রথম প্রথম ইলিয়াসের পরিশ্রম হত, কষ্টও হত, কিন্তু ধীরে ধীরে সব সয়ে গেল। এরকম পরিস্থিতিতে মহম্মদ শার বাড়িতে অতিথি অভ্যাগতদের আগমন ঘটল। মহম্মদ শা-র এই আত্মীয়দের ইলিয়াস সযত্নে আপ্যায়ন করল। ভেড়ার মাংস, কুমিস খেতে দিল। কিন্তু অতিথিদের মনে আগ্রহ থেকে গেল ইলিয়াসকে জানার। এরপর মৃদু হেসে ইলিয়াস সম্মতি জানাল যে তার কোনো আপত্তি নেই তার জীবনের কথা জানাতে। ইলিয়াসের স্ত্রী জানাল দরিদ্র হওয়ার ফলে তাদের জীবন থেকে টাকা পয়সা হয়তো-বা চলে গেছে কিন্তু শান্তি ফিরে এসেছে। সে বলেছে – ‘যখন ধনী ছিলাম, বুড়োর বা আমার এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না।’ ঝগড়া, অশান্তি লেগেই থাকত। কিন্তু এখন তারা একসঙ্গে সকালে ওঠে, দুটো সুখ-শান্তির কথা বলে। এই শান্তি মানসিক শান্তি। এ প্রসঙ্গে সে বলেছে – ‘আমাদের একমাত্র কাজ প্রভুর সেবা করা। যতটা খাটতে পারি স্বেচ্ছায়ই খাটি, কাজেই প্রভুর কাজে আমাদের লাভ বই লোকসান নেই।’ আবার এই শান্তিতে তারা এতটাই তৃপ্ত ছিল যে, তারা অনায়াসেই বলতে পেরেছে – ‘আজ এমন সুখের সন্ধান আমরা পেয়েছি যে আর কিছুই আমরা চাই না।’

উপসংহার – সমগ্র গল্পটিতে ইলিয়াসের জীবনচিত্রের মধ্যে দিয়ে তার জীবনের উত্থানপতন, সুখ-দুঃখের দোলাচলতা প্রকাশ পেয়েছে।

ইলিয়াস চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

ভূমিকা – ‘ইলিয়াস’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তথা নায়ক চরিত্র ইলিয়াস। ইলিয়াসের বন্ধুর জীবনের ছবিটি সম্যকভাবে ধরা পড়েছে আলোচ্য গল্পে। আর এখান থেকে ইলিয়াসের চরিত্রের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখে ধরা পড়েছে।

পরিশ্রমী ও কর্মপ্রিয় – ইলিয়াস একই সঙ্গে পরিশ্রমী ও কর্মপ্রিয় ছিল। লেখক জানিয়েছেন – ‘…. ইলিয়াসের সুব্যবস্থায় তার সম্পত্তি কিছু কিছু করে বাড়তে লাগল।’

নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যেত। তার সঙ্গী হত তার স্ত্রী। মালিক হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। কীভাবে সম্পত্তি রক্ষা করা যায়, সম্পত্তি কীভাবে বজায় থাকে – এ সব নিয়ে নানা চিন্তায় মগ্ন থাকত সে।

কর্তব্যপরায়ণ পিতা – তদুপরি ইলিয়াস ছিল কর্তব্যপরায়ণ পিতাও। কারণ তার সমস্ত পরিশ্রমের ফল তার সন্তানের জন্যই। কিন্তু একসময় যখন পুত্রদের যন্ত্রণা আর মেনে নিতে পারেনি তবুও কর্তব্যপরায়ণ পিতার ন্যায় পুত্রদের সে সম্পত্তির অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করেনি।

কর্তব্যপরায়ণ দায়িত্বসুলভ মানসিকতা – ইলিয়াস ধনী হবার পর তার পরিচিতি বেড়ে যায়। সে অতিথিদের সন্তুষ্ট করতে জানত। লেখক জানিয়েছেন, – “দূরদূরান্ত থেকে অতিথিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে। সকলকেই স্বাগত জানিয়ে সে তাদের ভোজ্য পানীয় দিয়ে সেবা করে। সে যখনই আসুক, কুমিস, চা, শরবত আর মাংস সব সময়েই হাজির।”

আদর্শ পিতার পাশাপাশি ইলিয়াস ছিল একজন দায়িত্বপরায়ণ ব্যক্তি। ভাগ্যের কারণে ভৃত্যে পরিণত হয়েও তার কর্তব্যবোধ, প্রভুর প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্বপরায়ণতা কমেনি।

অধ্যাত্মচেতনা – সংসারজীবনে অনেক কিছু পাওয়া ও হারানোর পর ইলিয়াসের আধ্যাত্মিক চেতনা প্রসারিত হয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল বিষয়সম্পত্তি নয়, মানুষ সেবার মধ্যে মুক্তি বা শান্তি প্রাপ্ত হয়। তাই মালিককে প্রভুজ্ঞানে সেবা করেছে সে।

উল্লিখিত গুণগুলির সমাহারে ইলিয়াস চরিত্রটি অসাধারণ হয়ে উঠেছে।

‘ইলিয়াস’ গল্প অবলম্বনে ইলিয়াসের স্ত্রীর চরিত্র বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা – চরিত্ররূপায়ণ ছোটোগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লিও তলস্তয়ের ‘ইলিয়াস’ গল্পে এক অনন্যসাধারণ নারী চরিত্র হল ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগি। নানা গুণের সমাহার দেখা যায় তার চরিত্রে।

পরিশ্রমী – প্রথম জীবনে ইলিয়াস অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে সঙ্গ দিয়েছে তার স্ত্রী। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে – “সে আর তার স্ত্রী সকলের আগে ঘুম থেকে ওঠে আর সকলের পরে ঘুমোতে যায়।”

বড়োলোক হবার পরও তার এই চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শেষজীবনে যখন মহম্মদ শা-র বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে তখনও তার পরিশ্রমের ঘাটতি দেখা যায়নি। জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে একই পরিশ্রম করে গেছে সেও।

কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী – ইলিয়াসের জীবনে সুখের সময় যেমন তার স্ত্রী পাশে ছিল, দুঃখের সময়েও কিন্তু সে সঙ্গ ছাড়েনি। একজন যোগ্যতম স্ত্রীর সমস্ত গুণ তার মধ্যে ছিল। অতিথি আপ্যায়নে সে কোনো কার্পণ্য করেনি। নির্দ্বিধায় সমস্ত দায়িত্ব পালন করে গেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা – একসময় অত্যন্ত সম্ভ্রান্তশালী হলেও পরে যখন মহম্মদ শা-র বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছে তখনও পিছপা হয়নি বরং সেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সে সক্ষম হয়েছে।

গভীর জীবনবোধ – জীবনের শেষপর্যায়ে পৌঁছে জীবনের স্বরূপটি উপলব্ধি করতে পেরেছে সে, সঙ্গী হয়েছে তার স্বামীও। এই সময় সে অনায়াসেই বলতে পেরেছে – “যখন ধনী ছিলাম, বুড়োর বা আমার এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না, – কথা বলবার সময় নেই। অন্তরের কথা ভাববার সময় নেই, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবার সময় নেই। দুশ্চিন্তারও অন্ত ছিল না।” ইলিয়াসের স্ত্রী পরবর্তীকালে বুঝতে পেরেছে বিষয়সম্পত্তির মোহে জীবন বড়োই সংক্ষিপ্ত। প্রকৃত শান্তি তথা জীবনবোধের সন্ধান পেয়ে তার চরিত্রের উত্তরণ ঘটেছে।

মহম্মদ শা কে ছিলেন? ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর প্রতি তিনি যে মানবিক আচরণ করেন তার বর্ণনা দাও।

অথবা, মহম্মদ শা-র চরিত্র আলোচনা করো।

মহম্মদের উদার মানসিকতা – লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পটি ভাগ্যের পরিহাসে, ইলিয়াসের জীবনের উত্থান ও পতনের কাহিনি। আর ইলিয়াসের এই দুর্দশাগ্রস্ত জীবনে যে আশার আলো এনেছিল সেই মানুষটি হল মহম্মদ শা। সমগ্র গল্পে তার উপস্থিতি প্রত্যক্ষভাবেই ইলিয়াসের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। একসময়ের দরিদ্র ইলিয়াস তার জীবনে প্রভূত পরিশ্রমে অনেক বিষয়সম্পত্তি করেছিল। কিন্তু পারিবারিক অশান্তিতে সেই সম্পত্তি হারিয়ে সে সর্বহারা হয়ে পড়েন। কোনো আত্মীয়-পরিজন না থাকায় গভীর বিপদে ইলিয়াস যখন বিপন্ন সেই সময় মহম্মদ শা-ই তাকে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন – “মহম্মদ শা নামে এক প্রতিবেশীর করুণা হলো বুড়ো-বুড়ির জন্য। সে নিজে ধনীও নয়, গরিবও নয়, তবে থাকত সুখে, আর লোকও ভালো।”

অতিথিবৎসল – অতিথি আপ্যায়নে ইলিয়াস চরিত্রের ইতিবাচক মানসিকতা দেখা গেলেও মহম্মদ শা-ও ছিল অতিথিবৎসল। বাড়িতে অতিথিরা এলে সে গৃহকর্তা হিসেবে ত্রুটিহীন আপ্যায়ন করেছে।

জনপ্রিয় – এইরূপ অতিথিবৎসলতার কারণে সকলেই মহম্মদ শা-কে পছন্দ করত। ইলিয়াস তার ভৃত্য হলেও কখনও সে কিন্তু সক্রিয় মনিবের মতো আচরণ করেনি, বরং ইলিয়াসের প্রশংসাই করেছে। সব মিলিয়ে একজন সৎ, সজ্জন ও অতিথিবৎসল ব্যক্তি রূপেই মহম্মদ শা চরিত্রটি চিত্রিত হয়েছে।

“এইভাবে পঁয়ত্রিশ বছর পরিশ্রম করে সে প্রচুর সম্পত্তি করে ফেলল।” – এখানে কার কথা বলা হয়েছে? কীভাবে কোন্ অবস্থা থেকে তিনি প্রচুর সম্পত্তির মালিক হতে পেরেছিলেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দাও।

ইলিয়াসের কথা – প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ শীর্ষক ছোটোগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। এই গল্পের মুখ্য চরিত্র ইলিয়াসের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

ইলিয়াসের প্রথম জীবনের সম্পত্তি – ইলিয়াস প্রথম জীবনে দরিদ্র ছিল। এই সময় তার ছিল – “সাতটা ঘোটকী, দুটো গরু আর কুড়িটা ভেড়া – এই তার যা কিছু বিষয়-সম্পত্তি।”

সম্পত্তি বৃদ্ধি – ইলিয়াস অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বিচক্ষণও ছিল। নিজ প্রচেষ্টায় সে নিজের সম্পত্তি একটু একটু করতে বাড়াতে লাগল। তার সঙ্গী ছিল তার স্ত্রী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে ধীরে ধীরে অর্থ সঞ্চয় করতে লাগল। লেখক এই প্রসঙ্গে অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন – “এইভাবে পঁয়ত্রিশ বছর পরিশ্রম করে সে প্রচুর সম্পত্তি করে ফেলল। তখন তার দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ, আর বারোশো ভেড়া।”

প্রতিবেশীদের ঈর্ষা – সম্পত্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় একা ইলিয়াস আর তার স্ত্রী দেখাশোনা করতে পারত না। ভাড়াটে মজুরেরা তার গোরুর দেখাশোনা করত। ভাড়াটে মজুরানিরা দুধ দোয়, কুমিস, মাখন আর পনির তৈরি করে। তার এই উন্নতিতে প্রতিবেশীরা ইলিয়াসকে ঈর্ষার চোখে দেখতে থাকে। তাদের কথায় – ‘ইলিয়াস তো ভাগ্যবান পুরুষ কোনো কিছুরই অভাব নেই; ওর তো মরবারই দরকার নেই।’

উপসংহার – ভালো ভালো লোকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার জন্য ইলিয়াসের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এইভাবেই একদিনের সাধারণ ইলিয়াস তার প্রভূত পরিশ্রমে অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছিল।

“ইলিয়াস প্রতিবেশীকে ধন্যবাদ দিল।” – প্রতিবেশী কে? তাকে ধন্যবাদ দেবার কারণ কী?

ইলিয়াসের প্রতিবেশী – ইলিয়াস’ গল্পে ইলিয়াস মুখ্য চরিত্র হলেও তাকে কেন্দ্র করে পার্শ্বচরিত্র ইলিয়াসের জীবনকে বেশ প্রভাবিত করেছিল, এমনই এক চরিত্র মহম্মদ শা – যে সমগ্র গল্পে ইলিয়াসের প্রতিবেশী রূপেই পরিচিত। ইলিয়াসের জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থিতিশীলতা আসে এই প্রতিবেশীর সহায়তায়। প্রশ্নাংশে ‘প্রতিবেশী’ বলতে মহম্মদ শা-কেই বোঝানো হয়েছে।

প্রতিবেশীকে ধন্যবাদ দেওয়ার কারণ – প্রথম জীবনে ইলিয়াস দরিদ্র থাকা সত্ত্বেও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে 35 বছর পরে প্রভূত সম্পত্তি গড়ে তোলে। এই সময় তার খুব ‘বোলবোলাও’ ছিল। কিন্তু ইলিয়াসের এই পরিস্থিতিকে হিংসা করতে থাকে বেশ কিছু পাড়া-প্রতিবেশী। তাদের কুনজরের কারণেই হোক অথবা ইলিয়াসের দুর্ভাগ্যের জন্যই হোক ইলিয়াসের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। তার দুই ছেলে, এক মেয়ে। সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু ইলিয়াস বিত্তশালী তার ছেলেরাও আয়েশি হয়ে উঠল। বড়োটি মারা গেল, আর ছোটোটিকে বিবাহের পর অশান্তির কারণে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। এই সময় ইলিয়াস তাকে একটা বাড়ি দিলে কিছু ঘোড়া গোরুও দিলে। ফলে তার সম্পত্তিতে টান পড়ল। এর উপর আবার কিরবিজরা তার ঘোড়া চুরি করে নিয়ে গেল। ইলিয়াসের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ল। তার উপর বার্ধক্যও তাকে পীড়া দিল। এহেন পরিস্থিতি সামলে ওঠা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ল। সম্বলের মধ্যে রইল একটা বোঁচকা – যাতে কোট, টুপি, জুতো, বুট ছিল আর তার সঙ্গী হল তার স্ত্রী। ইতিমধ্যে ইলিয়াসের বিতাড়িত পুত্রটি চলে গেছে অনেক দূর, মেয়েটিও মারা গেছে – সে এই সময় একেবারে একা হয়ে পড়ল। এই সময় ইলিয়াসের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না – কারণ তারা সকলেই একসময় ইলিয়াসকে হিংসা করত, তাই তাদের দুঃখে ওদের কারো প্রতিক্রিয়া হল না, কেবল মহম্মদ শা নামে এক প্রতিবেশী ছাড়া। সে ইলিয়াসকে পছন্দ করত। তাই তাদের দুঃখের অংশীদারি হওয়ার জন্য সে বলল – “ইলিয়াস, তুমি আমার বাড়ি এসে আমার সঙ্গে থাকো। বুড়িকেও নিয়ে এসো…………..আমি তোমাদের দুজনেরই খাওয়া-পরা দেবো।”

এই কথা শুনে কৃতজ্ঞতাবশত ইলিয়াস তার প্রতিবেশীকে ধন্যবাদ দিলে। এই বিপদে অন্তত একজন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে – এটা ভেবে সে অত্যন্ত আশ্বস্ত হল। তাই আন্তরিকভাবেই ইলিয়াস তাঁর প্রতিবেশী মহম্মদ শা-কে ধন্যবাদ দিয়েছে।

“সব কাজই তারা ভালোভাবে করতে পারত।” – কোন্ কাজের কথা বলা হয়েছে? কারা, কেন তা ভালোভাবে করতে পারত?

যে কাজের কথা বলা হয়েছে – আলোচ্য অংশটি লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ শীর্ষক ছোটোগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। ইলিয়াস জীবনের অন্তিমে তার প্রতিবেশী মহম্মদ শার কাছে কাজ করত, গ্রীষ্মকালে তরমুজের খেতে কাজ করা, শীতকালে গোরু ঘোড়াদের খাওয়ানো, তাদের দেখাশোনা করা, গোরু ঘোড়ার দুধ থেকে কুমিস তৈরির কাজও ইলিয়াস ও তার স্ত্রী মিলে করত। এ ছাড়াও বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তাদের সেবা যত্ন করার দায়িত্বও তাদেরই ছিল। প্রশ্নাংশে এইসব কাজের কথাই বলা হয়েছে।

ভালোভাবে করা – ইলিয়াস ও তার বৃদ্ধা স্ত্রী এইসব কাজ করত। ইলিয়াস অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিল। সেই কারণেই 35 বছরের পরিশ্রমে প্রভূত সম্পত্তি তৈরি করতে পেরেছিল। নিজেরাই গোরু ঘোড়া সামলাত, পরে যখন এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল তখন তারা ভাড়াটে মজুর রেখে দিল। কিন্তু তাদের কাজের পরিমাণ মোটেও কমল না। সমস্ত কিছু দেখভাল করে সমস্ত হিসেব নিকেশ মিলিয়ে নিত। তাই পরবর্তীকালে যখন তাদের হতদরিদ্র অবস্থা হয়ে গেল তখন তারা মহম্মদ শা-র বাড়িতে আশ্রয় পেল, সেখানে নানা কাজ করতে তাদের অসুবিধা হত না। যেহেতু একসময় এইসব কাজ পর্যালোচনা করত তাই পরবর্তীকালে এটা নিয়ে কোনোরকম অসুবিধা হতে পারে – এটা ভাবতেই পারত না মহম্মদ শা। আবার তারা মোটেও অলস ছিল না – সাধ্যমতো কাজকর্ম করত। বলা বাহুল্য সব কাজই তাঁরা ভালোভাবে করতে পারত।

“তবু এই সম্পন্ন মানুষ দুটির দুরবস্থা দেখে মহম্মদ শার দুঃখ হতো।” – ‘তবু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কেন? মানুষ দুটির কোন্ দুরবস্থা দেখে মহম্মদ শা-র দুঃখ হত?

তবু শব্দ ব্যবহারের কারণ – আলোচ্য অংশটি লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্প থেকে গৃহীত। একসময়ের ধনী ইলিয়াস ভাগ্যচক্রে দরিদ্র মানুষে পরিণত হয়েছিল। তার দারিদ্র্য প্রসঙ্গে মহম্মদ শা উদ্ধৃত উক্তিটি করেছে। যখন ইলিয়াস দরিদ্র হয়ে পড়ল তখন মহম্মদ শা তাদের সাময়িক অন্নসংস্থানের জোগাড় করে দিল। কিন্তু একসময়ের ধনী ব্যক্তি আজ দাসত্ব বৃত্তি করছে – এই বিষয়টা ভেবে মহম্মদ শা-র খুব দুঃখ হত। তাই প্রশ্নাংশে ‘তবু’ শব্দটি ‘ব্যবহৃত হয়েছে।

দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইলিয়াস এক সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে প্রভূত সম্পত্তির সত্বাধিকারী হয়ে উঠেছিল। ধনী ইলিয়াসের সম্পত্তি প্রসঙ্গে লেখকের উক্তি – ‘…..তার দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ, আর বারোশো ভেড়া।’

ইলিয়াসের সম্পত্তি – এই সময় কাজের চাপ এতই বেশি ছিল নিজে একা বা তার স্ত্রী মিলে সমস্ত কাজ শেষ করতে পারত না। তাই তারা ভাড়াটে মজুর রেখেছিল। তাদের প্রতিপত্তি পাড়া প্রতিবেশীদের ঈর্ষার কারণ হয়েছিল। পড়শিদের কথায় – ‘ইলিয়াস তো ভাগ্যবান পুরুষ; কোনো কিছুরই অভাব নেই; ওর তো মরবার দরকারই নেই।’

ইলিয়াসের দারিদ্র্য – কিন্তু বিত্তশালী হবার পরই ইলিয়াসের ছেলেরা আয়েশি হয়ে উঠল। নানা পারিবারিক কারণে ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ল। একসময় ইলিয়াসের বাড়বাড়ন্ত ছিল, কিন্তু এখন সে নিঃস্ব হয়ে পড়ল – “সম্বলের মধ্যে রইল শুধু কাঁধে একটা বোঁচকা – তাতে ছিল একটা লোমের তৈরি কোট, টুপি, জুতো আর বুট। আর তার বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগি।”

মহম্মদের মানসিকতা – মহম্মদ শা-র করুণা হল। তাই নিজের বাড়িতে কাজ দিয়ে তাদের সাময়িক স্বস্তি দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু মনে মনে সে নিজে স্বস্তি পেল না। একসময়কার ধনী মানুষ আজ সময়ের কোপে পড়ে ভিখারিতে পরিণত হয়েছে – এটাই মন থেকে সে মেনে নিতে পারত না। এর মাধ্যমে তার দায়িত্বশীলতা ও অপরের দুঃখে ব্যথিত হবার মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

“সত্যি, ভাগ্য যেন চাকার মত ঘোরে;” – কখন এ কথা বলা হয়েছে? এ কথা বলার কারণ কী?

উক্তির প্রসঙ্গ – আলোচ্য অংশটি লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ শীর্ষক রচনাংশ থেকে গৃহীত হয়েছে। সমস্ত গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইলিয়াস। তার ভাগ্যচক্রের বিবর্তনের ধারাটি সমগ্র গল্প জুড়ে আবর্তিত হয়েছে। প্রথম জীবনে সে দরিদ্র থাকলেও পঁয়ত্রিশ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমে প্রভূত সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে – এই ইলিয়াসই আবার পরবর্তী জীবনে তার ভাগ্যের ফেরে দৈন্যদশায় উপনীত হয়। তার প্রথম জীবন উত্থানের কাহিনি আর পরবর্তী জীবন পতনের। তার জীবনের কাহিনি শুনে মহম্মদ শা-র আত্মীয় উল্লিখিত উক্তিটি করেছে।

ইলিয়াসের প্রথম জীবন – প্রথম জীবনে ইলিয়াস দরিদ্র ছিল। কিন্তু পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রভৃত সম্পত্তির অধিকারী হয় সে। প্রথম জীবনে তার সম্পত্তি বলতে ছিল – ‘সাতটা ঘোটকী, দুটো গোরু আর কুড়িটা ভেড়া’।

কিছু পরবর্তীকালে এই সম্পত্তি দাঁড়িয়েছিল – ‘…..তার দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ আর বারোশো ভেড়া। ভাড়াটে মজুররা তার গোরু-ঘোড়ার দেখাশোনা করে, ভাড়াটে মজুরানিরা দুধ দোয়, কুমিস মাখন আর পনির তৈরি করে।’

উক্তির কারণ – এইসময় বিদেশের অনেক মানুষের সঙ্গেও ইলিয়াসের যোগাযোগ হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে পারিবারিক ও অন্যান্য কারণে ইলিয়াসের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। বৃদ্ধ বয়সে তার আর অন্য কোনোভাবে উপার্জন করার সম্ভাবনাও ছিল না। তাই একসময় যে ইলিয়াস নিজেই এত কিছুর মালিক ছিল, আজ সময়ের আবর্তনে সে নিঃস্ব এই – বিষয়কেই ভাগ্যের চাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ভাগ্যের চাকা নিয়ত পরিবর্তনশীল, যার আবর্তনেই রচিত হয় জীবনের উত্থানপতনের কাহিনি। ইলিয়াসও তার ব্যতিক্রম নন। তাই এরূপ কথা বলা হয়েছে।

“যতদিন ধনী ছিলাম, কখনও সুখ পাইনি।” – ধনী অবস্থায় ইলিয়াসের সংসারে সুখ ছিল না কেন? দুঃখের জীবন থেকে বুড়োবুড়ি কীভাবে সুখের জীবন লাভ করল?

ধনী অবস্থায় ইলিয়াসের সংসারে সুখ না থাকার কারণ – পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইলিয়াসের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা এসেছিল। এইসময় তার কোনো অভাব অনটন ছিল না, সংসারে শান্তি ছিল অটুট। পাশাপাশি গুণীজনের সঙ্গে পরিচয় হতে লাগল, কিন্তু এই সুখ বেশিদিন টিকল না। অত্যন্ত ধনী হওয়ার কারণে তার ছেলেরা আয়েশি হয়ে উঠল। বড়োটি এক মারামারিতে পড়ে মারা গেল। ছোটোটি এমন ঝগড়াটে মেয়ে বিয়ে করল যে বাবা মাকে অমান্য করতে শুরু করল। এজন্য তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। ইলিয়াস তাকে একটা বাড়ি দিল, কিছু গোরু-ঘোড়াও দিল। এতেই ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ল। ইলিয়াসের জীবনে নেমে এল নিদারুণ অর্থাভাব। ধনী অবস্থায় ইলিয়াসের শান্তি চলে গেল, সর্বদা কীভাবে সকলকে খুশি রাখবে সেই চিন্তায় তারা তৎপর থাকত। এ প্রসঙ্গে তাদের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি – “যখন ধনী ছিলাম, বুড়োর বা আমার এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না, কথা বলবার সময় নেই।”

শুধু তাই নয়, এর উপরে অতিথি আগমনের প্রসঙ্গে বলেছে – ‘হয়তো অতিথিরা এলেন – এক দুশ্চিন্তা; কাকে কী খেতে দিই, কী উপহার দিই যাতে লোকে নিন্দা না করে।’

সব সময় নানা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা লেগেই থাকত, সেই প্রসঙ্গে দুশ্চিন্তার কথা বলা হয়েছে।

বুড়োবুড়ির সুখের জীবনলাভ – যখন ইলিয়াস সর্বহারা হয়ে পড়ল তখন তার সঙ্গী ছিল শুধু স্ত্রী ও প্রয়োজনীয় আচ্ছাদন-সহ একটি বোঁচকা। এইসময় ইলিয়াসের নতুন করে হারানোর আর কিছু ছিল না। নিশ্চিন্তে মহম্মদ শা-র বাড়ির কাজ করে দিত। এই সময় তারা তাদের প্রকৃত সুখ ফিরে পেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তার স্ত্রীর উক্তি –

‘এখন বুড়ো আর আমি একসঙ্গে সকালে উঠি, দুটো
সুখ-শান্তির কথা বলি। ঝগড়াও কিছু নেই, দুশ্চিন্তাও
কিছু নেই,’

সর্বোপরি যে মানসিক শান্তির সন্ধান পেয়েছিল এইসময় তা হল ঈশ্বর দর্শনচিন্তা বা আধ্যাত্মিক চেতনার। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার জন্য এখন তারা যথেষ্ট সময় পায়। মোটকথা সর্বহারা হবার পরেই তাদের জীবনে তারা সুখের খোঁজ পেয়েছিল। তাই উল্লিখিত মন্তব্যটি করা হয়েছে।

“কিন্তু ঈশ্বর আমাদের কাছে সত্যকে উন্মুক্ত করেছেন।” – কোন্ সত্যের কথা বলা হয়েছে? তা কীভাবে উন্মুক্ত হয়েছে?

যে সত্যের কথা বলা হয়েছে – মহম্মদ শা-র গৃহে দূরাগত অতিথিদের কাছে বৃদ্ধা শাম-শেমাগি ইলিয়াসের জীবনের অবিশ্বাস্য বিপর্যয়ের ঘটনা বিবৃত করে। তা যে যথার্থ সত্য ঘটনা তা ইলিয়াস বিশ্বাস করতে অনুরোধ করে সমাগত অতিথিদের। ধনবৃদ্ধির লালসা তথা নেশা তাদের জীবন থেকে যে সুখ কেড়ে নিয়েছিল, সেই সুখের দেখা পাওয়া গেল আক্ষরিক অর্থে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে – সেই সত্যের কথা এখানে উদ্‌ঘাটিত হয়েছে।

সুখের অপসারণ – ইলিয়াসের জীবনে যখন দারিদ্র্য ছিল তখন তাঁদের পারিবারিক বন্ধন ছিল মধুর। দুই পুত্র, এক কন্যা নিয়ে পঁয়ত্রিশ বছরে তারা প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু তখন তাদের নিজস্ব ভাববিনিময়ের কোনো সুযোগ ছিল না, ঈশ্বর আরাধনায় মন পবিত্র করার অবসরও তারা পেত না। সম্পদ ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিয়েছিল তাদের সুখকে।

সত্য উন্মুক্ত হবার কারণ – কিন্তু তাদের সীমাহীন অর্থ সংসারে অনর্থ ডেকে আনল। পারিবারিক কলহ-মড়ক-দুর্ভিক্ষে সব হারিয়ে ইলিয়াস বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগিকে নিয়ে আশ্রয় নিল মহম্মদ শা-র বাড়িতে। সেখানে তারা কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেল, পেল ঈশ্বর আরাধনার সময়। নির্ভার দায়হীন সে জীবনে তারা প্রকৃত সুখী হয়ে উঠল। পরাশ্রয়ে সর্বহারা অশক্ত বৃদ্ধ দম্পতি সুখের পরশ পেয়ে তাই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন, প্রমাণ করলেন সুখ হল সম্পদ নিরপেক্ষ এক মানসিক অনুভূতি।

“এটা খুবই জ্ঞানের কথা।” – বক্তা কে? জ্ঞানের কথাটি কী? বক্তা কেন এমনতর কথা বলেছেন?

বক্তা – প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ শীর্ষক ছোটোগল্প থেকে গৃহীত। উক্তিটির বক্তা মোল্লা সাহেব।

প্রকৃত সুখের হদিশ না পাওয়ার কথা – পঁয়ত্রিশ বছরের প্রভূত পরিশ্রমে ইলিয়াস যে সম্পত্তি তৈরি করেছিল তার দেখাশোনা করত ইলিয়াস নিজেই, যদিও তার স্ত্রীও তাকে এই কাজে সাহায্য করত। এই সময় ইলিয়াসের বহু ধনী গুণী মানুষের সঙ্গে পরিচিতি হয়েছিল। এরপর সে সর্বহারা হয়ে পড়ল। সর্বহারা ইলিয়াসের অতীত জীবনের সমৃদ্ধি ও প্রতিপত্তির কথা দেশবিদেশের বহু মানুষই জানত, ইলিয়াসের অতিথি-বৎসলতার কথাও অজ্ঞাত ছিল না তাদের কাছে। কিন্তু বৃদ্ধ ইলিয়াসের কোনো দুঃখ ছিল না সম্পত্তি হারিয়ে। কারণ প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হলেও তার জীবনে সুখ ছিল না, শান্তি ছিল না। সবসময় চিন্তা হত অতিথিদের সঠিকভাবে আপ্যায়ন করা হল কি না। ঘোড়ার বাচ্চা, গোরুর বাছুর নেকড়ে নিয়ে গেল কি না – এসমস্ত দুশ্চিন্তা তার মাথায় থাকত। তাই জীবনের প্রকৃত সুখের হদিস তখন সে পায়নি।

বক্তার বলার কারণ – ইলিয়াস এখন মহম্মদ শা-র বাড়িতে মজুরের কাজ করে, কিন্তু সব হারিয়ে এখানে এসে সর্বহারা ইলিয়াস তার জীবনের প্রকৃত সুখ খুঁজে পেয়েছে। এখন তাদের আর কোনো পিছুটান নেই, নেই অশান্তি ও দুশ্চিন্তাও। তাদের এখন একটাই মাত্র কাজ প্রভুর সেবা করা। বাড়ি এলে তারা খাবার ও কুমিস পায়। এখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সময়ও আছে তাদের। সে বুঝেছে মানুষ মোহাসক্ত হয়েই সম্পত্তি হারিয়ে কাঁদে। কিন্তু ঈশ্বর সাধনাই মুক্তি লাভের একমাত্র পথ, ঈশ্বরই প্রকৃত সত্যটিকে তাদের সামনে উদ্‌ঘাটিত করেছে। এই বিষয়টিকেই মোল্লা জ্ঞানের কথা বলেছে।

“শুনে অতিথিরা ভাবতে বসল।” – কোন্ কথা শুনে অতিথিরা ভাবতে বসল? সে-কথা ভাবার মতো কেন?

উফা প্রদেশের একজন সাধারণ বাসকির ইলিয়াস। তার জীবনের রোমাঞ্চকর উত্থান পতনের কাহিনি এবং নিঃস্ব অবস্থায় প্রকৃত সুখ লাভের কথা শুনে মোল্লা বললে ‘এটা খুবই জ্ঞানের কথা।’ ইলিয়াসের উপলব্ধিজাত কথাগুলি সত্য এবং পবিত্র গ্রন্থ অনুমোদিত। মোল্লার এ কথা শুনে মহম্মদ শা’র বাড়িতে উপস্থিত অন্য অতিথিরা ভাবতে বসে।

অতিথিদের ভাবনার কারণ – বিত্তশালী ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগি সর্বহারা হয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রিত থেকে, দিনমজুরের মতো জীবন কাটিয়ে প্রকৃত সুখের পরশ পায়। প্রভূত বৈভবের মাঝে থেকেও যে সুখ মেলেনি, ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে সর্বহারা দম্পতি সে বহুকাঙ্ক্ষিত সুখের দেখা পেল – সেই আপাত অবিশ্বাস্য কাহিনিকে যথার্থ বলে নিদান দিল জনৈক মোল্লা।

মহম্মদ শা-র বাড়িতে দূরাগত অতিথিদের কৌতূহল চরিতার্থ করতে বৃদ্ধা শাম-শেমাগি তাদের বৈভবে পূর্ণ জীবন এবং সেই বিত্তশালী অবস্থা থেকে সর্বহারা হবার কাহিনি তুলে ধরে। কিন্তু আপাত অবিশ্বাস্য হলেও মিতভাষী শাস্ত্রজ্ঞ মোল্লা যখন সেই অশ্রুতপূর্ব ঘটনাকে সরবে সমর্থন করে, তখন সমাগত অতিথিরা তাদের সাময়িক বিস্ময় কাটিয়ে ইলিয়াসের জীবনকাহিনিকে সত্য বলে মেনে নিল।

ভাবনার বিষয় হওয়ার কারণ – অতিথিরা মহম্মদ শা-র বাড়িতে এসেছিল সাময়িক বিনোদনের মাধ্যমে সময় কাটাতে। তাদের সেই অগভীর ভাবনায় প্রথমে সমর্থন পায়নি ইলিয়াসের অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনি। কিন্তু জীবন অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞ মোল্লা যখন সে কাহিনির সঙ্গে পবিত্র গ্রন্থের সাদৃশ্য খুঁজে পায় এবং সে কাহিনিকে সরবে সমর্থন করে, তখন অতিথিদল সকল দ্বিধামুক্ত হয়ে বিশ্বাস করতে থাকে ইলিয়াস ও শাম-শেমাগির জীবনকথাকে। প্রাচুর্য-বৈভব যে জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়, সর্বহারা হলেও পাওয়া যায় মহার্ঘ সুখের ঠিকানা; আসলে সুখ মোহমুক্ত হৃদয়ের উপলব্ধি – সেই সত্যের দ্বারে পৌঁছে অভিভূত হয় অতিথিদল।

“ইলিয়াস তো ভাগ্যবান পুরুষ;” – কারা, কেন ইলিয়াসকে ভাগ্যবান পুরুষ বলতে চায়? এই উক্তি তুমি সমর্থন কর কি না যুক্তি-সহ লেখো।

ইলিয়াসকে ভাগ্যবান পুরুষ বলার কারণ – লিও তলস্তয়ের “ইলিয়াস” গল্পে ইলিয়াসের আশেপাশে থাকা লোকজন তার সম্পর্কে “ইলিয়াস তো ভাগ্যবান পুরুষ;” মন্তব্যটি করেছিল। ইলিয়াসের বিয়ের পরে যখন তার বাবা মারা গিয়েছিল তখন সে না ধনী, না দরিদ্র। সাতটা ঘোটকী, দুটো গোরু আর কুড়িটা ভেড়া ছিল তার সম্পত্তি। কিন্তু ইলিয়াসের সুপরিচালনা আর তার ও তার স্ত্রীর কঠোর পরিশ্রমে প্রতি বছরই ইলিয়াসের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। পঁয়ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে ইলিয়াস দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মহিষ আর বারোশো ভেড়ার মালিক হয়। ভাড়াটে মজুররা তার গোরু-ঘোড়ার দেখাশোনা করত। ভাড়াটে মজুরনিরা দুধ দোয়ত, কুমিস, মাখন-পনির তৈরি করত। ইলিয়াসের নামডাক তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার আশেপাশের লোকেরা তখনই হিংসায় জ্বলে গিয়ে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছিল।

আমার মত – ইলিয়াসের উন্নতি হয়েছিল ভাগ্যের জোরে নয়, তার পরিশ্রমের কারণে। চেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি এবং লক্ষ্যে স্থির থাকলে যে নিশ্চিতভাবে সাফল্য পাওয়া যায়, তার সার্থক উদাহরণ ইলিয়াস। তাই ভাগ্যকে ইলিয়াসের সাফল্যের ভিত্তি বললে তার পরিশ্রমকেই ছোটো করে দেখানো হয়।

“দূর-দূরান্ত থেকে অতিথিরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে।” — কার সঙ্গে অতিথিরা দেখা করতে আসে? অতিথিদের দেখা করতে আসার কারণ কী? সে আগত অতিথিদের কীভাবে সেবা করত?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতাংশে উফা প্রদেশে বসবাসকারী বাস্কির জনগোষ্ঠীভুক্ত ইলিয়াসের সঙ্গে অতিথিদের দেখা করতে আসার কথা বলা হয়েছে।

অতিথিদের দেখা করতে আসার কারণ – ইলিয়াস তার অতি সাধারণ অবস্থা থেকে কঠোর পরিশ্রম এবং ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়। পঁয়ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ, বারোশো ভেড়া এবং অসংখ্য মজুরের মনিবে পরিণত হয় ইলিয়াস। তার প্রতিপত্তি প্রতিবেশীদের ঈর্ষার কারণ হয়ে ওঠে। ক্রমে তার সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে “দূর-দূরান্ত থেকে অতিথিরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসতে থাকে”।

ইলিয়াস কর্তৃক আগত অতিথিদের সেবা – ইলিয়াস ছিল অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ মানুষ। ফলে আগত অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে তাদের ভোজ্য-পানীয় দিয়ে সেবা করত। অতিথিদের জন্য কুমিস, চা, শরবত, মাংস সবসময়ই তৈরি থাকত। অতিথির সংখ্যা অনুযায়ী ভেড়া এবং ঘোটকী মারা হত। বাড়িতে আসা অতিথিদের যথাযথ আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখত না ইলিয়াস।

“আসল অবস্থা বুঝে উঠবার আগেই সে একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ল।” — সে বলতে কার কথা বোঝানো হয়েছে? সে কীভাবে সর্বহারা হল? তারপর তার কী হল?

সে-র পরিচয় – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতাংশে “সে” বলতে বৃদ্ধ ইলিয়াসের কথা বলা হয়েছে।

সর্বহারায় পরিণত হওয়া – দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফলে ইলিয়াস প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ইলিয়াস তার ছোটো পুত্র ও তার মুখরা স্ত্রীকে আলাদা করার সময় একটি বাড়ি ও কিছু পশু দিয়ে দেওয়ায় তার সম্পত্তিতে টান পড়ে। এরপরেই মড়কের ফলে ইলিয়াসের অনেকগুলি ভেড়া মারা যায়। তার ওপর আবার দুর্ভিক্ষের ফলে খাদ্যের অভাবে অনেক গোরু-মোষও মারা যায়। কিরগিজরা তার ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করার ফলে ইলিয়াসের অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। সত্তর বছরের বৃদ্ধ ইলিয়াস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তার পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু এবং অবশিষ্ট গৃহপালিত পশুগুলি বিক্রি করে। কিন্তু তাতেও তারা দুর্দশার চরমে পৌঁছে যায়। এইভাবে “সে একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ল”।

পরিণতি – বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রী শাম-শেমাগিকে নিয়ে ইলিয়াস এক অপরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে কাজ করে দিন কাটাতে থাকে। ছোটো ছেলে দূরদেশে চলে যাওয়ায় এবং একমাত্র মেয়ে মারা যাওয়ায় অসহায় বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্যের জন্য কেউ ছিল না। এই সময় তাদের এক দয়ালু প্রতিবেশী মহম্মদশাহ্ কাজের বিনিময়ে ইলিয়াস দম্পতিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় ও খাবার দেয়। ইলিয়াস গ্রীষ্মে মহম্মদের তরমুজের খেতে কাজ করত এবং শীতে গোরু-ঘোড়ার দেখাশোনা করত। তার বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগি ঘোটকীর দুধ দোয়ত এবং কুমিস বানানোর কাজ করত। এভাবেই একদা বিত্তশালী ইলিয়াস সম্পত্তি হারিয়ে ভাড়াটে মজুরের কাজ করে দিন চালাতে থাকে।

“বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করবার তখন কেউ নেই” – বৃদ্ধ দম্পতি বলতে কাদের কথা বোঝানো হয়েছে? তাদের কোন্ পরিস্থিতিতে সাহায্য করার কেউ ছিল না?

বৃদ্ধ দম্পতি-র পরিচয় – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্পে বৃদ্ধ দম্পতি বলতে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগিকে বোঝানো হয়েছে।

উদ্দিষ্ট পরিস্থিতি – দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুব্যবস্থাপনার গুণে ইলিয়াস বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ, বারোশো ভেড়া এবং অসংখ্য মজুরের মনিব ইলিয়াসের সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর হঠাৎই ইলিয়াসের বড়ো ছেলে একটি মারামারির ঘটনায় মারা যায়। ছোটো ছেলে এবং তার ঝগড়াটে স্ত্রী ইলিয়াসকে অমান্য করতে শুরু করলে সে তাদের একটা বাড়ি ও কিছু গোরু-ঘোড়া দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকেই ইলিয়াসের অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। মড়কে ইলিয়াসের অনেকগুলি ভেড়া মারা যায়। দুর্ভিক্ষের ফলে খড়ের অভাবে শীতকালে অনেক গোরু-মোষও না খেতে পেয়ে মরে যায়। কিরগিজরা তার ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করে নিয়ে যায়। সত্তর বছর বয়সে ইলিয়াস বাধ্য হয়ে তার পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু এবং অবশিষ্ট গৃহপালিত পশুগুলি বিক্রি করে দেয়। তাদের বিতাড়িত পুত্র সেই সময় দূরদেশে ছিল এবং একমাত্র মেয়েও মারা গিয়েছিল। “বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করবার তখন কেউ নেই” অবস্থায় তারা চরম অসহায়ত্বে পতিত হয়।

“ইলিয়াসের অতিথিবৎ-সলতার কথা স্মরণ করে তার খুব দুঃখ হলো।” — কার কথা বলা হয়েছে? সে কী করেছিল? ইলিয়াসের জীবনে তার কী প্রভাব পড়েছিল?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় – “ইলিয়াস” গল্পে উল্লিখিত অংশে ইলিয়াসের প্রতিবেশী মহম্মদশাহ্-র কথা বলা হয়েছে।

ইলিয়াসের জীবনে তার প্রভাব – মহম্মদশাহ্ নিজে ধনী না হলেও তার অভাব ছিল না। সে ছিল খুব ভালো লোক। তাই “ইলিয়াসের অতিথিপরায়ণতার কথা স্মরণ করে তার খুব দুঃখ হলো”। সে ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে এসে থাকতে বলে। এর বিনিময়ে ঠিক হয় ইলিয়াস তার ক্ষমতা অনুযায়ী গরমকালে তরমুজের খেতে কাজ করবে আর শীতকালে গোরু-ঘোড়াদের খাওয়াবে। তার স্ত্রী শাম-শেমাগি ঘোটকীগুলোর দুধ দোয়ত এবং কুমিস তৈরি করবে। মহম্মদশাহ্ তাদের দুজনেরই খাওয়া-পরার দায়িত্ব নেয়। এ ছাড়াও যদি কিছু লাগে, তা দিতে প্রতিশ্রুত হয়।

ইলিয়াসের জীবনে এর প্রভাব – ইলিয়াস এই উদারতার জন্য মহম্মদশাহ্-কে ধন্যবাদ দিয়েছিল। ভাড়াটে মজুরের মতো কাজ করতে গিয়ে প্রথমদিকে তাদের খুবই কষ্ট হত, কিন্তু ক্রমে সবই সহ্য হয়ে গেল। নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী তারা যত পারত কাজ করত। জীবনের কোনো সময় নিজেরাও মনিব ছিল বলে তারা সব কাজই ভালোভাবে করতে পারত। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ যে, অর্থ-সম্পত্তিই সুখের ভিত্তি নয়— তা ইলিয়াস এবং তার স্ত্রী এই সময় উপলব্ধি করে। কাজের বাইরে ফাঁকা সময়টা তারা গল্প করা বা ভাবার কাজে লাগাতে পারে। আগের থেকে অনেক দুশ্চিন্তামুক্ত এরকম জীবনেই তারা প্রকৃত সুখ খুঁজে পায়।

“ভাগ্য যেন চাকার মতো ঘোরে” – কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে? বক্তার এমন বক্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করো?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি – লিও তলস্তয়ের “ইলিয়াস” গল্পে মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে আগত জনৈক অতিথি মহম্মদশাহ্-কে “ভাগ্য যেন চাকার মতো ঘোরে” মন্তব্যটি করলেও মন্তব্যটির উদ্দেশ্য ছিল ইলিয়াস।

এমন বক্তব্যের কারণ – পঁয়ত্রিশ বছরের কঠোর পরিশ্রমে ইলিয়াস এবং তার স্ত্রী প্রচুর সম্পত্তির অধিকারী হয়। দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মহিষ এবং বারোশো ভেড়ার মালিক হয় ইলিয়াস। চারপাশে তার প্রচুর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরাও তাকে ঈর্ষা করতে শুরু করে। অতিথিরা দূর-দূরান্ত থেকে আসতে থাকে এবং ইলিয়াসও উদারভাবে অতিথিসেবা করতে থাকে। কিন্তু নানা কারণে ইলিয়াসের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে। ছেলের সঙ্গে বিবাদে তাকে আলাদা করে দেওয়া, মড়ক, কিরগিজদের ঘোড়া চুরির ঘটনা, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি নানা কারণে তার পালিত পশুর সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। শেষ অবধি নিজের পশমের কোট, কম্বল ইত্যাদির সঙ্গে অবশিষ্ট গৃহপালিত পশুগুলোকে বিক্রি করে দিয়ে সে সর্বহারা হয়ে পড়ে। তাদের অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিন কাটাতে থাকে। এই অবস্থায় প্রতিবেশী মহম্মদশাহ্ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। ইলিয়াসদের করা সাধ্যমত কাজের বিনিময়ে তাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নেয় মহম্মদশাহ্। অবস্থাপন্ন ইলিয়াসের এই মজুর জীবনে রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতেই মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে আগত অতিথিরা এই মন্তব্যটি করেছেন।

“লোকটির সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি কি?” – বক্তা কে? তিনি কার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন? এরপরে কী হল?

বক্তার পরিচয় – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে আগত অতিথি মুসলিম ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি মোল্লাসাহেবের এক আত্মীয়।

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি – ওই ব্যক্তি মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে কর্মরত বৃদ্ধ ইলিয়াসের সঙ্গে “লোকটির সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি কি?” বলে কথা বলতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তী ঘটনা – গৃহস্বামী মহম্মদশাহ্ বৃদ্ধ ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে অতিথিদের কাছে নিয়ে আসেন। জনৈক অতিথি ইলিয়াসের কাছে জানতে চান যে অতীতজীবনের সুখসমৃদ্ধির কথা স্মরণ করে এবং বর্তমানের দুরবস্থার কথা ভেবে সে কতটা কাতর ও বিষাদগ্রস্ত। ইলিয়াস প্রত্যুত্তরে হাসিমুখে বলে যে এই বিষয়ে তার স্ত্রীই সম্পূর্ণ সত্য বলতে পারবে। শাম-শেমাগি অতিথিদের জানায় যে পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্যজীবনে তাদের অর্থের অভাব না থাকলেও প্রকৃত সুখ ছিল না। তারা সবসময়ই দুশ্চিন্তা ও পাপবোধে জর্জরিত ছিল। সম্পত্তির মোহে তারা ছিল অন্ধ; ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও সুখ-দুঃখের আলোচনার সময় হত না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করারও সময় ছিল না। কিন্তু সর্বহারা হয়ে ভাড়াটে মজুর হিসেবে কাটানো জীবনের দু-বছরেই তারা প্রকৃত সুখ ও শান্তি পেয়েছে। অর্থের তুলনায় মনের সুখ তাদের গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে। মনের কথা আলোচনা করে এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের মন প্রকৃত সুখ খুঁজে পেয়েছে। ইলিয়াসও তার স্ত্রীর কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করে।

“কিন্তু ওর মধ্যে বিশেষ করে দেখবার কিছু আছে নাকি?” — কে, কার কথা বলেছে? তাকে কী উত্তর দেওয়া হয়েছিল? এতে বক্তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তিদ্বয়ের পরিচয় – “ইলিয়াস” গল্পের উল্লিখিত অংশে দরজার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বুড়ো মানুষ অর্থাৎ ইলিয়াসের কথা বলা হয়েছে এবং মন্তব্যটি করেছিলেন মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে আগত অতিথিদের একজন।

প্রত্যুত্তর – দরজার পাশ দিয়ে যে বুড়ো মানুষটি চলে গিয়েছিল তাকে অতিথিরা লক্ষ করেছেন কি না, তা মহম্মদশাহ্ জানতে চেয়েছিলেন। একজন অতিথি তাকে না দেখার কথা বলে “কিন্তু ওর মধ্যে বিশেষ করে দেখবার কিছু আছে নাকি?” জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে মহম্মদশাহ্ জানান যে সে ওই তল্লাটে একসময় সবচেয়ে ধনী ছিল, তার নাম ইলিয়াস। নামটা হয়তো অতিথিরা শুনে থাকবেন। অথচ এখন তার কিছুই নেই; মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে সে আর তার স্ত্রী বর্তমানে মজুরের মতো থাকে।

বক্তার প্রতিক্রিয়া – একজন অতিথি এই কথাবার্তার সময়ে জানান যে লোকটিকে কখনও চোখে না দেখলেও তার নাম তাঁরা শুনেছিলেন, কারণ লোকটির নাম বহুদূর অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল। ইলিয়াসের বর্তমান দুরবস্থার কথা শুনে লোকটি বিস্মিত হন এবং বলেন যে ভাগ্য যেন চাকার মতো ঘোরে, কখনও একজন ওপরে ওঠে তো আর-একজন তলায় পড়ে যায়। অতিথি ব্যক্তিটি বৃদ্ধ ইলিয়াস এখন অত্যন্ত দুঃখী কি না তা মহম্মদশাহ্-র কাছে জানতে চান এবং তার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জীবন সম্পর্কে তার কাছে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে চান বলে সেই ব্যক্তি জানান।

“এই হলো আমার মনের কথা” — বক্তা কে? সে কী বলেছিল? বক্তার মনের কথার মধ্য দিয়ে তার কোন্ উপলব্ধি ফুটে উঠেছে?

বক্তার পরিচয় – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগি।

বক্তব্য – মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে আগত জনৈক অতিথির প্রশ্নের উত্তরে শাম-শেমাগি “এই হলো আমার মনের কথা” বলে জানায়, তারা দাম্পত্য জীবনের পঞ্চাশ বছরে অর্থের প্রাচুর্য এবং ধনী জীবনযাপনের মধ্যে অন্তরের সুখকে বহু খুঁজেছে। কিন্তু সুখ কখনও তাদের কাছে ধরা দেয়নি। বর্তমানে ভাড়াটে মজুরের কষ্টকর জীবনে মাত্র দু-বছরেই তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছে। তাই জীবন থেকে তাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।

উপলব্ধি – ধনসম্পত্তি থাকলেও মনে শান্তি ছিল না ইলিয়াস দম্পতির। অর্থ, লোকবল, সম্পত্তি ইত্যাদির প্রাচুর্যের মধ্যেও ছিল দুশ্চিন্তা ও অশান্তি। সম্পত্তি হারিয়ে শাম-শেমাগি প্রকৃত সুখ এবং সত্যের তাৎপর্য বোঝে। তখন ভাড়াটে মজুর হিসেবে কাজের বিনিময়ে অন্ন-বাসস্থান পেলেও স্বামী-স্ত্রীতে একান্তে মনের কথা আলোচনা করতে পারত। ঝগড়া ও দুশ্চিন্তার বদলে মনিবের কাজেই তাদের অধিকাংশ সময় কেটে যেত। মনের কথা আলোচনা বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করারও অবকাশ ছিল। তাই শাম-শেমাগির এই উপলব্ধি হয়, পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত সুখ খুঁজে বেড়ালেও এতদিনে তারা সেই সুখের হদিস পেয়েছে।

ইলিয়াস গল্পে বৃদ্ধ দম্পতির কী কী বিষয়ে দুশ্চিন্তা হত?

দুশ্চিন্তার বিষয় – “ইলিয়াস” গল্পে ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগি নিজেদের বর্তমান সর্বহারা জীবনের সঙ্গে অতীতের সম্পন্ন জীবনের তুলনা করতে গিয়ে বলেছে যে, যখন তারা ধনী ছিল তখন ইলিয়াস বা তার মনে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না। পরস্পর কথা বলার, মনের কথা ভাবার বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সময় ছিল না তাদের। অজস্র দুশ্চিন্তা সবসময় ভিড় করে থাকত:

  • “অতিথিরা এলে তাদের উপযুক্ত সমাদর করার জন্য”
  • “অতিথিরা চলে গেলে মজুরদের দিকে নজর রাখা — যাতে তারা কাজে ফাঁকি না দেয়”
  • “নিজেদের স্বার্থে এইভাবে নজরদারি পাপ”
  • “নেকড়ে হয়তো ঘোড়ার বাচ্চা বা গোরুর বাছুর নিয়ে গেল”
  • “চোর এসে ঘোড়াগুলোকে নিয়ে সরে পড়ল”
  • “মা-ভেড়া হয়তো ছানাগুলোকে চেপে মেরে ফেলল”
  • “শীতের দিনে যথেষ্ট খড় মজুত আছে কি না”
    এ ছাড়া ইলিয়াসের সঙ্গে কাজকর্ম নিয়ে মতবিরোধ হত, ঝগড়া হত। দুশ্চিন্তা এভাবে তাদের যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত, আর সুখ চলে যেত দূরে।

“সুখী জীবন কাকে বলে কোনোদিন বুঝিনি।” — বক্তা কে? এই প্রসঙ্গে সে কী বলেছে?

বক্তার পরিচয় – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল ইলিয়াসের বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগি।

বক্তার মন্তব্য – বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির মালিক হয়েও ইলিয়াস দম্পতির পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখ ছিল না। অর্থ ছিল ঠিকই, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মনের কথা আলোচনার সময়টুকুও ছিল না। সময় ছিল না অন্তরের কথা ভাবারও। সবসময় দুশ্চিন্তার ফলে ঈশ্বরের প্রার্থনা করার অবকাশও ছিল না। বাড়িতে অতিথিদের যথাযথ আপ্যায়ন, অতিথি বিদায়ের পর মজুরদের ওপর নজরদারি ইত্যাদি কাজেই সময় কেটে যেত তাদের। রাত্রিকালে নেকড়ের মতো বন্য হিংস্র পশু বা চোর যাতে পশু চুরি না করে তা নিয়েও দুশ্চিন্তা ছিল। ভেড়ার ছানাগুলো সুরক্ষিত আছে কি না সেই ভাবনায় ঘুমোতে গিয়ে ঘুমও আসত না। এইসব চিন্তার পাশাপাশি আবার চিন্তা ছিল ভবিষ্যতেরও। শীতের যথাযথ রসদ মজুত আছে কি না তা নিয়েও ভাবনার শেষ ছিল না। এ ছাড়া মতবিরোধের কারণে ইলিয়াস দম্পতির মধ্যে ঝগড়াও হত। নানান দুশ্চিন্তা, পাপবোধ থেকে মানসিক শান্তি ও সুখ ছিল না তাদের জীবনে। তাই অর্থ-সম্পত্তি থাকলেও শাম-শেমাগি বলেছে: “সুখী জীবন কাকে বলে কোনোদিন বুঝিনি।”

“অতিথিরা হেসে উঠল।” কার, কোন্ কথা শুনে অতিথিরা হেসে উঠল? অতিথিদের হাসি শুনে ইলিয়াস কী বলেছিল?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি – লিও তলস্তয় রচিত “ইলিয়াস” গল্পে ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগির কথা শুনে “অতিথিরা হেসে উঠল”।

শাম-শেমাগি অতিথিদের বলে যে, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের সম্পদশালী জীবনে সুখের সন্ধান করেও সুখ তারা খুঁজে পায়নি। তাদের জীবনে একান্তে কথা বলার বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার অবকাশ ছিল না। সবসময়ই ভাবনা হত আতিথেয়তা নিয়ে কেউ নিন্দা করবে কি না সে কথা ভেবে। মজুরদের দিকে কড়া নজর দিতেই ইলিয়াস দম্পতির সময় কেটে যেত। কিন্তু শেষবয়সে ভাড়াটে মজুর হিসেবে কাজ করার সময় তারা জীবনের প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পেয়েছে। মনের সুখে স্বামী-স্ত্রীর আলাপ-আলোচনা বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার অবকাশও তাদের রয়েছে। পঞ্চাশ বছর ধরে সুখ খুঁজে ফিরলেও প্রকৃত সুখ তাদের জীবনে কখনও আসেনি। অতিথিরা ইলিয়াসপত্নীর বলা এই কথাগুলি শুনেই হেসে ওঠে।

ইলিয়াসের বক্তব্য – অতিথিদের হাসি শুনে ইলিয়াস বলে, এই কথাগুলি কৌতুক বা পরিহাসের নয়। তারা সম্পত্তির মোহে অন্ধ ছিল বলেই নিঃস্ব হয়ে দুঃখ করছিল। সম্পত্তির লোভে মত্ত থাকায় কোনোদিনই তারা প্রকৃত সুখ উপভোগ করেনি। কিন্তু সর্বহারা হওয়ার পর ঈশ্বর তাদের প্রকৃত জীবনসত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। জীবন থেকে পাওয়া এই শিক্ষা ইলিয়াস সকলের কল্যাণের জন্যই তুলে ধরেছে।

“আর সে কথা যে আমরা আপনাদের বললাম তা ফুর্তির জন্য নয়, আপনাদের কল্যাণের জন্য।” বক্তা কে? বক্তা কখন এ কথা বলেছে? তার এ কথা বলার কারণ কী?

বক্তার পরিচয় – “ইলিয়াস” গল্প থেকে নেওয়া প্রশ্নোদ্ধৃত মন্তব্যটির বক্তা ইলিয়াস স্বয়ং।

মন্তব্যের সময় – একসময় সমৃদ্ধ ধনী থেকে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ইলিয়াস মহম্মদশাহ্-র বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে কাজ করার সময় প্রকৃত সুখের সন্ধান খুঁজে পেয়েছিল। এর আগে সে ধনী থাকলেও, প্রচুর গোরু-ঘোড়া ইত্যাদির মালিক হলেও, চারপাশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও নানারকম দুশ্চিন্তা তাকে তাড়া করে বেড়াত। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে সে যে আনন্দে এবং সুখে আছে, তা বোঝাতে গিয়ে মহম্মদশাহ্-র বাড়ির অতিথিদের উদ্দেশ্যে ইলিয়াস “আর সে কথা যে আমরা আপনাদের বললাম তা ফুর্তির জন্য নয়, আপনাদের কল্যাণের জন্য।” বলেছিল।

মন্তব্যের কারণ – ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগি অতিথিদের জানাচ্ছিল, তাদের আগের ধনী জীবনে নয়, বরং বর্তমানের নিঃস্ব জীবনেই তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু তার কথা শুনে অতিথিরা হেসে ওঠে। অর্থ-সম্পত্তির মধ্যে নয়, অন্যের বাড়িতে কাজ করে, সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থাতেই যে সুখের সন্ধান পাওয়া যায় — এ কথা সম্ভবত অতিথিদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। কিন্তু ইলিয়াস সবাইকে বোঝাতে চায়, মানুষ অবুঝ থাকে বলেই বিষয়সম্পত্তির দিকে ঝোঁকে; কিন্তু প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় ভোগ নয়, ত্যাগের মাধ্যমে। ঈশ্বর তাদের কাছে যে সত্যকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তা সমস্ত মানবজাতির জন্যই প্রয়োজনীয়। মানুষ যত আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করবে, ততই তাদের মঙ্গল। জীবনের এই নিগূঢ় সত্যটা তুলে ধরতেই ইলিয়াস উক্ত মন্তব্যটি করেছিল।


আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘ইলিয়াস’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

নবম শ্রেণী ইতিহাস - প্রাককথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ

নবম শ্রেণী ইতিহাস – প্রাককথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ

নবম শ্রেণী ইতিহাস - বিপ্লবী আদর্শ,নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ - বিষয়সংক্ষেপ

নবম শ্রেণী ইতিহাস – বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ – বিষয়সংক্ষেপ

নবম শ্রেণী ইতিহাস - বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

নবম শ্রেণী ইতিহাস – বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

আলোর বিক্ষেপণ কাকে বলে? দিনের বেলায় আকাশকে নীল দেখায় কেন?

আলোর বিচ্ছুরণ ও আলোর প্রতিসরণ কাকে বলে? আলোর বিচ্ছুরণ ও প্রতিসরণের মধ্যে পার্থক্য

আলোক কেন্দ্র কাকে বলে? আলোক কেন্দ্রের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব

উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্স কাকে বলে? উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্সের মধ্যে পার্থক্য

একটি অচল পয়সার আত্মকথা – প্রবন্ধ রচনা