এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “নাইট্রোজেন চক্রের ধাপগুলি একটি পর্যায়চিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো” — নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের পঞ্চম অধ্যায় “পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ”-এর “নাইট্রোজেন চক্র (Nitrogen Cycle)” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নাইট্রোজেন চক্রের ধাপগুলি একটি পর্যায়চিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো।
(অথবা, প্রাকৃতিকভাবে কীভাবে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ ঘটে? জীবদেহ থেকে নাইট্রোজেনের মাটিতে প্রবেশের পদ্ধতিগুলি বর্ণনা করো।)
বায়ুমণ্ডলে সবথেকে বেশি পরিমাণে (77.17%) নাইট্রোজেন গ্যাস উপস্থিত থাকে। এছাড়াও নাইট্রোজেন মাটিতে নাইট্রেট ও নাইট্রাইট রূপে এবং প্রাণীদেহে প্রোটিন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি যৌগ রূপে উপস্থিত থাকে।
নাইট্রোজেন চক্রটি প্রধানত কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, যেমন –
- নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বা নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণ বা নাইট্রোজেন সংবন্ধন
- মাটি থেকে নাইট্রোজেনের জীবদেহে প্রবেশ
- মৃত, পচা-গলা জীবদেহ থেকে কিংবা জীবদেহের রেচনজাত নাইট্রোজেনের পুনরায় মাটিতে প্রবেশ এবং
- নাইট্রোজেনের মোচন বা ডিনাইট্রিফিকেশন
নাইট্রোজেন চক্রের বিভিন্ন ধাপ –
1. নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বা নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণ –
যে পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন নাইট্রোজেনঘটিত যৌগে রূপান্তরিত হয়, তাকে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বলে। তিনটি পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ ঘটে, সেগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হলো –
- প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ – তড়িৎমোক্ষণের (বজ্রপাত) ফলে বায়ুর নাইট্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) গঠন করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড বায়ুর অতিরিক্ত অক্সিজেন দ্বারা জারিত হয়ে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইডে (NO₂) পরিণত হয়। এই নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড জলীয় বাষ্প বা বৃষ্টির জলের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে নাইট্রাস অ্যাসিড (HNO₂) এবং নাইট্রিক অ্যাসিডে (HNO₃) পরিণত হয়।রাসায়নিক সমীকরণ –
স্থলভাগে বৃষ্টির জলের সঙ্গে এই HNO₂ এবং HNO₃ পতিত হওয়ার পর, তা মাটির ক্যালশিয়াম বা পটাশিয়াম লবণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যথাক্রমে উক্ত মৌলগুলির নাইট্রাইট অথবা নাইট্রেট লবণে পরিণত হয় এবং উদ্ভিদের শোষণের উপযোগী হয়ে ওঠে।
জীবজ নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বা সংবন্ধন –
- ব্যাকটেরিয়া দ্বারা নাইট্রোজেন সংবন্ধন – নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে স্বাধীনজীবী Azotobacter (অ্যাজোটোব্যাকটর), Clostridium (ক্লসট্রিডিয়াম) এবং মিথোজীবী Rhizobium (রাইজোবিয়াম)। Azotobacter ও Clostridium মাটিতে স্বাধীনভাবে বসবাস করে। অন্যদিকে Rhizobium শিম্বিগোত্রীয় উদ্ভিদমূলের অর্বুদে বসবাস করে। এরা বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে জলে দ্রাব্য নাইট্রেট লবণে পরিণত করে।
- সায়ানোব্যাকটেরিয়া দ্বারা নাইট্রোজেন সংবন্ধন – জলজ পরিবেশে বসবাসকারী কিছু নীলাভ সবুজ শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যেমন – Nostoc (নস্টক), Anabaena (অ্যানাবিনা), Spirulina (স্পাইরুলিনা) বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে হেটেরোসিস্টের মধ্যে আবদ্ধ করে এবং রেচনের মাধ্যমে মাটিতে মিশ্রিত করে। অথবা, এইসব সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মৃত্যুর পর তাদের দেহে আবদ্ধ থাকা নাইট্রোজেন মাটিতে মেশে।
শিল্পজাত উপায়ে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ – কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন নাইট্রোজেনঘটিত রাসায়নিক সার, যেমন – ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম সালফেট ইত্যাদি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যার ফলে মাটিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধ হয় এবং নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
2. মাটি থেকে নাইট্রোজেনের জীবদেহে প্রবেশ –
উদ্ভিদ মাটি থেকে নাইট্রেট লবণ রূপে নাইট্রোজেনকে শোষণ করে, যা উদ্ভিদদেহে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন হিসেবে সঞ্চিত থাকে। প্রাণীরা যখন উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেই নাইট্রোজেন প্রাণীদেহে প্রবেশ করে। জীবদেহে নাইট্রোজেন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গঠনগত উপাদান হিসেবে কাজ করে।
3. জীবদেহ থেকে নাইট্রোজেনের পুনরায় মাটিতে প্রবেশ –
অ্যামোনিফিকেশন এবং নাইট্রিফিকেশন—এই দুই পদ্ধতির মাধ্যমে জীবদেহ থেকে নাইট্রোজেন পুনরায় মাটিতে প্রবেশ করে।
- অ্যামোনিফিকেশন – এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ এবং মৃতদেহের জটিল প্রোটিনগুলি বিভিন্ন অণুজীব দ্বারা বিশ্লিষ্ট হয়ে প্রথমে অ্যামিনো অ্যাসিড এবং পরে অ্যামোনিয়া বা অ্যামোনিয়াম যৌগে পরিণত হয়। অ্যামোনিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়াকে অ্যামোনিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে। উদাহরণ – Bacillus mycoides (ব্যাসিলাস মাইকয়ডিস), Clostridium (ক্লসট্রিডিয়াম)।
- নাইট্রিফিকেশন – এই পদ্ধতিতে মৃত্তিকাস্থিত অ্যামোনিয়া বা অ্যামোনিয়াম যৌগ বিভিন্ন অণুজীব দ্বারা বিশ্লিষ্ট হয়ে প্রথমে নাইট্রাইট \(\left(NO_2^-\right)\) এবং পরে নাইট্রেটে \(\left(NO_3^-\right)\) পরিণত হয়। সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়াকে নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে। প্রক্রিয়াটি দুটি পর্যায়ে ঘটে। প্রথমত, Nitrosomonas (নাইট্রোসোমোনাস) দ্বারা অ্যামোনিয়া, নাইট্রাইট যৌগে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, নাইট্রাইট যৌগ Nitrobacter (নাইট্রোব্যাকটর) দ্বারা নাইট্রেটে পরিণত হয়।
4. নাইট্রোজেনের মোচন বা ডিনাইট্রিফিকেশন –
ডিনাইট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে মাটি থেকে নাইট্রোজেনের মোচন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া দ্বারা নাইট্রেট যৌগ বিজারিত হয়ে নাইট্রোজেন গ্যাস, অ্যামোনিয়া বা নাইট্রোজেনের কিছু অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে মুক্ত নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডলে পুনরায় ফিরে যায়। Pseudomonas denitrificans (সিউডোমোনাস ডিনাইট্রিফিক্যান্স), Thiobacillus denitrificans (থিয়োব্যাসিলাস ডিনাইট্রিফিক্যান্স) এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কত?
বায়ুমণ্ডলে সবথেকে বেশি পরিমাণে অর্থাৎ প্রায় 77.17% নাইট্রোজেন গ্যাস উপস্থিত থাকে।
একটি স্বাধীনজীবী নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়ার নাম কী?
একটি স্বাধীনজীবী নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়ার নাম হলো Azotobacter (অ্যাজোটোব্যাকটর)।
অ্যামোনিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সাহায্যকারী একটি ব্যাকটেরিয়ার নাম লেখো।
অ্যামোনিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সাহায্যকারী একটি ব্যাকটেরিয়া হলো Bacillus mycoides (ব্যাসিলাস মাইকয়ডিস)।
ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া কাকে বলে?
যেসব ব্যাকটেরিয়া মাটিতে আবদ্ধ নাইট্রেট যৌগকে বিজারিত করে মুক্ত নাইট্রোজেন গ্যাসে পরিণত করে বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয়, তাদের ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে। যেমন – Pseudomonas।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “নাইট্রোজেন চক্রের ধাপগুলি” — নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করি এই নোটসটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।





Leave a Comment