এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায় “বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
বিংশ শতকের সূচনায় বাংলা তথা ভারতের বুকে সশস্ত্র বিপ্লববাদের পদধ্বনি শোনা যেতে থাকে এবং তাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে অংশগ্রহণ করে।
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের যোগদানের চরিত্র
প্রাথমিক পর্বে সহযোগীর ভূমিকায় অংশগ্রহণ –
বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাথমিক পর্বে নারীসমাজ মুখ্যত ছিল পুরুষের সহযোগিতার ভূমিকায়। প্রত্যক্ষ বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখা হত। তবে ‘মা’, ‘বোন’, ‘বৌদি’, ‘স্ত্রী’ হিসেবে তারা বহুক্ষেত্রে পলাতক বিপ্লবীদের গোপনে আশ্রয়দান, অস্ত্র-শস্ত্র লুকিয়ে রাখা বা গোপন সংবাদ আদান-প্রদানের কাজ করতেন। ইতিহাসের এই পর্বে দু’কড়ি বালা দেবী, ননীবালা দেবী প্রমুখ বীরাঙ্গনার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু নারীদের অংশগ্রহণ –
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের যোগদানের চরিত্র বিশ্লেষণে বলা যায় যে মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু নারীরাই বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নিতেন। এক্ষেত্রে পারিবারিক সংযোগ ছিল আর একটি লক্ষণীয় দিক।
স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ –
বিপ্লবী আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়গুলিতে নারীসমাজের প্রত্যক্ষ এবং স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের উদাহরণ যথেষ্টই মেলে। সরলাদেবী চৌধুরানি, লীলা রায়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাস প্রমুখ বীরাঙ্গনার নাম এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। সরলাদেবী নিজ বাড়িতেই বিপ্লবী আখড়া খোলেন এবং সশস্ত্র বিপ্লববাদে বাঙালি যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ এবং ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ -এর সূচনা করেন।
বিদেশি নারীদের অংশগ্রহণ –
ভগিনী নিবেদিতা, অ্যানি বেসান্ত, নেলী সেনগুপ্তার মতো বিদেশি নারীরাও ভারতমাতার মুক্তিযজ্ঞে শামিল হয়েছিলেন। ভগিনী নিবেদিতা অনুশীলন সমিতির সদস্যদের একখণ্ড ম্যাৎসিনির জীবনী উপহার দেন। অবনীন্দ্রনাথের ‘বঙ্গমাতা’ চিত্রের ‘ভারতমাতা’ নামকরণ করে তিনি দেশবাসীকে মাতৃমূর্তি উপহার দেন।
নারী বৈপ্লবিক সংগঠন
দীপালি সংঘ –
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীসমাজের যোগদান প্রসঙ্গে ‘দীপালি সংঘ’ -এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিপ্লবী দেশনেত্রী লীলা নাগ (রায়) 1923 খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় দীপালি সংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। মহিলাদের সাহস ও শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দীপালি সংঘের তরফে লাঠি খেলা, শরীর চর্চা, অস্ত্র চালনা প্রভৃতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 1926 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দীপালি ছাত্রী সংঘ’ এবং 1930 খ্রিস্টাব্দে দীপালি সংঘের উদ্যোগে কলকাতায় স্থাপিত হয় ‘দীপালি ছাত্রীভবন’-মহিলাকর্মী ও ছাত্রীদের বাসস্থান। 1930 খ্রিস্টাব্দের আগস্টে পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে দীপালি ছাত্রীভবনের বহু আবাসিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঝাঁসির রানি ব্রিগেড –
স্বাধীনতার মরপণ সংগ্রামে নারী সমাজের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্তটি হল নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আজাদি সেনার ঝাঁসির রানি ব্রিগেড। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় 1500 নারীকে নিয়ে এই বাহিনী গড়ে ওঠে। শ্রীমতি লক্ষ্মী স্বামীনাথন এই বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ‘ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী’ নামে পরিচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে এই বাহিনীর নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। 1944 খ্রিস্টাব্দে বার্মার যুদ্ধে ঝাঁসির রানি বাহিনী খুবই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে।
খ্যাতনামা নারী বিপ্লবী
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সশস্ত্র –
বিপ্লববাদের ইতিহাসে মাস্টারদা’র শিষ্যা অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এক স্মরণীয় নাম। মাস্টারদা’র সহকর্মীরূপে 1930 খ্রিস্টাব্দের 18 এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। চট্টগ্রামের রেল ও টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস, পুলিশ লাইন দখল, জালালাবাদের মুক্তি যুদ্ধ প্রভৃতি কর্মসূচীরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে 1932 খ্রিস্টাব্দের 24 সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ার রিপাবলিকান আর্মির একদল যুবক পাহাড়তলির ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন। এই সময় গুলিবিদ্ধ প্রীতিলতা ধরা পড়ার অসম্মান থেকে বাঁচতে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। তাঁর আত্মবলিদান নারী সমাজের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ইতিবৃত্ত।
কল্পনা দত্ত –
প্রীতিলতার মতোই কল্পনা মাস্টারদার ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মিতে যোগদান করেন। তাঁর নেতৃত্বে ডিনামাইট দিয়ে চট্টগ্রামের জেলখানা উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা রচিত হলেও শেষপর্যন্ত তা কার্যকরী হয়নি। মাস্টারদার সহকর্মীরূপে তিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পাহাড়তলির ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা রচনার সময় তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় মাস্টারদা’র বৈপ্লবির কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। ইতিহাসে তিনি ‘বীরাঙ্গনা কল্পনা’ নামেই বেশি পরিচিত।
বীণা দাস –
সশস্ত্র বিপ্লববাদের ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসুর বাল্যশিক্ষক বেণীমাধব দাসের কন্যা বীণা দাস এক স্মরণীয় নাম। দীপালি সংঘের সদস্যা রূপে তিনি অস্ত্রচালনার প্রাথমিক পাঠ নেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডটি ছিল অত্যাচারী গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যার প্রচেষ্টা। তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরি –
সশস্ত্র বিপ্লববাদের ইতিহাসে শান্তি ও সুনীতি নামের এই দুই স্কুল ছাত্রীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালে কুমিল্লার এই দুই ছাত্রী জেলাশাসক স্টিভেন্সকে হত্যা করেন।
উজ্জ্বলা মজুমদার –
1934 খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিঙের লেবং-এ বাংলার গভর্নর অ্যান্ডারসনকে হত্যা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন উজ্জ্বলা মজুমদার নামে অপর এক তরুণী। এইভাবে বাঙালি বীরাঙ্গনারা সশস্ত্র বিপ্লববাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিলেন।
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের মূল্যায়ন –
মাতৃভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে নারী সমাজ পুরুষের সমানতালে অগ্রসর হলেও সাবেক ইতিহাসচর্চায় নারীর ভূমিকা সর্বদাই প্রান্তিক। বর্তমানের নারীবাদী ইতিহাসচর্চায় নারীর ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায় “বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।





Leave a Comment