নবম শ্রেণি বাংলা – নিরুদ্দেশ – রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

Souvick

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘নিরুদ্দেশ’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

নবম শ্রেণি - বাংলা - নিরুদ্দেশ - রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
Contents Show

‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

ভূমিকা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কাব্যের উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, নামকে যাঁরা শুধুমাত্র নাম বলেই মনে করেন, তিনি তাঁদের দলে পড়েন না। কথাটি বুঝিয়ে দেয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ কতটা জরুরি। তবে সাহিত্যের নামকরণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রীতি প্রচলিত নেই। আলংকারিকেরা নামকরণের ত্রিবিধ সূত্রের কথা বলেছেন – নামকেন্দ্রিক বা চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক ও গূঢ়ার্থমূলক বা ব্যঞ্জনাধর্মী। কবি ও গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পটির নামকরণে বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে নামকরণের দিক থেকে গল্পটি কতখানি সার্থক, তা আমরা বিচার করে দেখব।

বিষয়বস্তু – ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটির দুটি অংশ। দুটি অংশেই আছে নিরুদ্দেশের দুটি কাহিনি। প্রথমটি কমিক, দ্বিতীয়টি ট্র্যাজিক। প্রথম কাহিনিটি কথকের, দ্বিতীয়টি কথকের বন্ধু সোমেশের। প্রথমটিতে আছে মা-বাবার আদরে উচ্ছন্নে যাওয়া একটি ছেলের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ও পরবর্তীকালে বাড়িতে ফিরে আসার একটি হাস্যকর কাহিনি। দ্বিতীয়টিতে শোভন নামে এক উদাসীন ছেলের খেয়ালবশত গৃহত্যাগ, বাবা-মায়ের দেওয়া করুণ বিজ্ঞাপন, অবশেষে ফিরে এলে তাকে না চিনতে পারার এক অশ্রুসজল ট্র্যাজিক কাহিনির পরিচয় পাই।

সার্থকতা বিচার – অতএব দেখা যাচ্ছে, গল্পটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে নিরুদ্দেশকে কেন্দ্র করে। সংবাদপত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপন নিরুদ্দেশকেন্দ্রিক। প্রথম কাহিনিটি হাসির উদ্রেক ঘটালেও দ্বিতীয় কাহিনিটি বেদনাদায়ক। বিষয়কেন্দ্রিক এই গল্পের একটি সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা হল, শোভন তার মা-বাবা ও অন্যান্য আত্মীয় – পরিজনদের মন থেকে চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। এই ভাবনা থেকে গল্পটির বিষয়ানুগ নামকরণ সার্থক ও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠেছে।

‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে লেখক কমেডি আর ট্রাজিডির আশ্চর্য সম্মিলন ঘটিয়েছেন – ব্যাখ্যা করো।

ভূমিকা – সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে দুটি নিরুদ্দেশের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি কথকের বলা হাস্যরসাত্মক নিরুদ্দেশের গল্প। দ্বিতীয়টি কথকের বন্ধু সোমেশের বলা শোভনের ট্র্যাজিডিমূলক কাহিনি।

কমেডির পরিচয় – গল্পকথক মনে করেন, খবরের কাগজে প্রকাশিত নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাস্যকর। অধিকাংশক্ষেত্রে দেখা যায় মায়ের আশকারায় সন্তান রাত করে থিয়েটার দেখে বাড়ি ফেরে, এতে বাবা প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হন, বলেন – “এমন ছেলের আমার দরকার নেই – বেরিয়ে যা।” মা এতে আদরবশত আপত্তি করলেও ছেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর মা বিছানা থেকে ওঠেন না, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেন, দিনরাত কান্নাকাটি করেন আর বাবা এই অশান্তি সহ্য করতে না পেরে শেষপর্যন্ত সংবাদপত্রের অফিসে যান ছেলের নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দিতে। কিন্তু অশ্রুসজল বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার আগেই ছেলে বাড়ি ফিরে আসে।

ট্র্যাজিডির পরিচয় – কিন্তু কথকের বন্ধু সোমেশ কথককে উদ্দেশ করে বলে – “এই বিজ্ঞাপনের পেছনে অনেক সত্যকার ট্র্যাজিডি থাকে।” সোমেশের পরিচিত শোভন বাড়ি ছেড়েছিল নেহাতই খেয়ালের বশে। এদিকে বাবা-মা টানা দুবছর ধরে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেও শোভন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি, সে ফিরেও আসেনি। এরপর হঠাৎ বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে গেলে শোভন বাড়ি ফিরে আসে। দু-বছর নানা উত্থানপতনে তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে, তাই তাকে বাড়ির পুরোনো খাজাঞ্চিবাবু, নায়েবমশাইরা চিনতে পারে না। এমনকি তার বাবাও গুরুত্ব দেন না। কারণ সম্পত্তির লোভে এর আগে দুজন নকল ‘শোভন’ এসেছিল। তা ছাড়া সাতদিন আগে শোভনের পরিবার শোভনের ভুল মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে। শেষপর্যন্ত নায়েবমশাই কিছু টাকা দিয়ে তাকে অনুরোধ করে যে, মৃত্যুপথযাত্রী মা-কে মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য শোভনকে তাদের হারানো ছেলের অভিনয় করতে হবে। এটা শোভনের জীবনে চরমতম ট্র্যাজিডি।

‘নিরুদ্দেশ’ গল্প অবলম্বনে সোমেশ চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল বলেছিলেন – ‘Character is the man’। প্রেমেন্দ্র মিত্র বোধহয় এই কথাটিকে মনে রাখতেন বলে তাঁর ছোটোগল্পের চরিত্রগুলি ছিল সজীব, সচল ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের একটি আকর্ষণীয় চরিত্র সোমেশ। তার চরিত্রের কয়েকটি দিক হল –

উদাসীন – সোমেশ একটু উদাসীন প্রকৃতির। তাই কথক নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের কথা বললে সে কোনো কৌতূহল প্রকাশ না করে উদাসীনভাবে কেবল সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে থাকে।

অমনোযোগী শ্রোতা – সোমেশ কিছুটা অমনোযোগীও বটে। কথক সাধারণ নিরুদ্দেশের একটি গল্প তার কাছে উপস্থাপন করলে, সে তা শুনেছে বলে কথকের মনে হয়নি, কথকের ভাষায় – “একবার একটু নড়িয়া বসিতেও তাহাকে দেখা যায় নাই।”

সুবক্তা – সোমেশ সুবক্তা ছিল বলেই কথক-সহ পাঠকের কাছে শোভনের বলা নিরুদ্দেশের গল্পটি জীবন্ত ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

রহস্যময় চরিত্র – সোমেশ চরিত্রটি বেশ রহস্যময়। গল্পের প্রথম থেকেই তার বাচনভঙ্গি কিংবা আচরণের মধ্যে একটা রহস্যময়তায় ইঙ্গিত মেলে। সোমেশ কথিত শোভনের নিরুদ্দেশের কাহিনি শুনতে শুনতে একটা সময় মনে হয় সোমেশই হয়তো শোভন। শোভন সোমেশের ছায়ামাত্র। তাই কথক গল্পের একেবারে শেষাংশে তা প্রায় ধরেও ফেলেন জড়ুলের প্রসঙ্গ তুলে। কিন্তু সোমেশ হাসি দিয়ে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনা কথক কিংবা পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শোভনের যে ট্র্যাজিক কাহিনি, তা আসলে সোমেশের কাহিনি।

এইভাবে সোমেশ চরিত্রটি গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের কলমে সুনিপুণভাবে অঙ্কিত হয়েছে।

‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের দুটি অংশে বাঙালি মায়ের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তার পরিচয় দাও।

প্রখ্যাত গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের দুটি অংশে দুটি গল্পের অবতারণা করে বাঙালি মায়ের আর্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা গল্পটিকে একটি আলাদা মাত্রা দান করেছে।

গল্পের প্রথমাংশ – বাঙালি মায়ের ছবি – গল্পের প্রথমাংশে গল্পকথক বন্ধু সোমেশকে নিরুদ্দেশের যে গল্প শুনিয়েছেন, তাতে দেখা যায় মায়ের আশকারাতেই সন্তান উচ্ছন্নে গেছে। রোজ রাত করে বাড়ি ফেরা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনায় বাবা সন্তানকে বকাবকি করলে মা সন্তানের পক্ষ অবলম্বন করেন। ঘটনাচক্রে অভিমানী ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে মা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেন, কান্নাকাটি করেন, স্বামীর কাছে অনুরোধ করেন সন্তানকে ফিরিয়ে আনার। এরপর যখন বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে সন্তান বাড়ি ফিরে আসে তখন তিনি স্নেহের শাসন করতে থাকেন। বাবা বাধা দিতে এলে তিনি ধমক দিয়ে বলেন – “তুমি থামো। অত আদর ভালো নয়! একটু বকুনি খেয়েছেন বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে এত বড়ো আস্পর্ধা!” এই ঘটনায় বাঙালি মায়ের সন্তানের প্রতি স্নেহ ও অধিকারবোধ প্রকাশিত হয়েছে।

গল্পের দ্বিতীয়াংশ – বাঙালি মায়ের ছবি – অপরদিকে সোমেশ কথককে যে গল্প শোনায়, তাতেও দেখা যায় সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় মায়ের হতাশা ও হাহাকার। গল্পের এই অংশে মায়ের প্রত্যক্ষ কোনো সংলাপ না থাকলেও বিজ্ঞাপনে প্রকাশিত অংশ দেখে বোঝা যায় মায়ের অবস্থা। সন্তান হারিয়ে চিন্তায়, শোকে মা শয্যাগত হন, তাই বিজ্ঞাপনে দেখা যায় – “শোভন ফিরে এসো। তোমার মা শয্যাগত।” দিনের পর দিন সন্তান শোকে মা ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়েন, সন্তানের আসার অপেক্ষা করেন। বিজ্ঞাপন বেরোয় – “শোভন, তোমার মার সঙ্গে আর তোমার বুঝি দেখা হলো না। তিনি শুধু তোমারই নাম করছেন এখনো।” মৃত্যুর সঙ্গে তিনি লড়াই করেছেন সন্তানকে শেষবারের মতো দেখবেন বলে। সন্তান যে মায়ের কাছে কত প্রিয়, তার হৃদয়ের অংশ তা এই গল্প থেকে বেশ বোঝা যায়।

‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের দুটি অংশে পিতৃহৃদয়ের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা আলোচনা করো।

রবীন্দ্র-পরবর্তী বিখ্যাত গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে আমরা কথকের এবং সোমেশের বলা দুটি কাহিনির উল্লেখ পাই, যা প্রকাশ করেছে পিতৃহৃদয়ের ক্রোধ, উৎকণ্ঠা, হতাশা ও ভালোবাসা।

গল্পের প্রথমাংশ – পিতৃহৃদয়ের পরিচয় – গল্পের প্রথমাংশে গল্পকথক তাঁর বন্ধু সোমেশকে যে গল্প শুনিয়েছেন, তাতে দেখা যায় মায়ের আশকারাতে ছেলে উচ্ছন্নে গেছে। বিশৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে সে পরীক্ষায় ফেল করে। মা -এর দেওয়া টাকায় থিয়েটার দেখে। রাত করে ছেলে বাড়ি ফিরলে বাবা সন্তানকে শাসন করেন। বলেন – “এমন ছেলের আমার দরকার নেই – বেরিয়ে যা।” ছেলে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ছাড়ে। এতে মা বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে উলটে বাবা সন্তানের উশৃঙ্খলতার জন্য মাকেই দায়ী করেন। কিন্তু মা সন্তানশোকে অনাহারে শয্যা নিলে, বাবা শেষপর্যন্ত বিজ্ঞাপন অফিসের দ্বারস্থ হন। সন্তান যাতে বাড়ি ফিরে আসে, সেই ব্যবস্থা করেন। শেষপর্যন্ত ছেলে বাড়ি ফিরে এলে বাবা ছেলেকে ক্ষমা করে দেন।

গল্পের দ্বিতীয়াংশ – পিতৃহৃদয়ের পরিচয় – গল্পের দ্বিতীয়াংশে কথকের বন্ধু সোমেশ শোভনের নিরুদ্দেশের যে গল্প শোনায়, তাতে পিতৃহৃদয়ের গভীর বেদনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাঁর আবেগ-উৎকণ্ঠা-হতাশা-উদবেগ সবই ধরা পড়ে যায় খবরের কাগজে প্রকাশিত নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের ভাষায়। প্রথমে কম্পিত গম্ভীর গলায় ধীর ও শান্তভাবে তিনি বলেন – “শোভন ফিরে এসো। তোমার মা শয্যাগত। তোমার কি এতটুকু কর্তব্যবোধও নেই!” বিজ্ঞাপনের ভাষা ক্রমশ বদলাতে থাকে। সন্তানের চিন্তায় তিনি ক্রমে কাতর ও দুর্বল হয়ে পড়েন। প্রায় দু-বছর অনেক ঝড়ঝাপটা সামলে যখন তিনি শোভনের মৃত্যুর খবর পান, তখন শোভন ফিরে এলে তাকে আর চিনতে পারেন না তিনি। ‘ঝড়ে ভাঙা গাছ’ এর মতো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েও শোকাহত মায়ের কাছে সন্তানকে দেখা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। গল্পে বর্ণিত দুটি কাহিনিতেই পিতৃহৃদয়ে সন্তানের প্রতি গভীর মমত্ব ও ভালোবাসার পরিচয় ফুটে ওঠে।

“ছেলে বিশাল পৃথিবীতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে।” – কোন্ ছেলের কথা বলা হয়েছে? তার নিরুদ্দেশের কারণ ও ঘরে ফেরা পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ দাও।

ছেলের পরিচয় – বিখ্যাত ছোটোগল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘সামনে চড়াই’ (1950 খ্রিস্টাব্দ) গ্রন্থের অন্তর্গত ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পের কথক সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিরুদ্দেশের হাস্যকর বিজ্ঞাপনগুলির কথা বলেছে। সে বলেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়ের আদরে আর আশকারাতে উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে, বাবার তিরস্কারে অপমানিত হয়ে গৃহ ত্যাগ করে। বিশাল পৃথিবীতে অভিমানী সেই ছেলে নিরুদ্দেশ যাত্রা করে।

নিরুদ্দেশের কারণ – কথক বলেছেন, মা-বাবার সংসারে একমাত্র ছেলে মায়ের প্রশ্রয়ে প্রতিদিন থিয়েটার দেখে রাত করে বাড়ি ফেরে। খেতে বসার সময় বাবা কয়েকদিন খোঁজ করেছেন – ‘কোথায় গেলেন বাবু! তোমার গুণধর পুত্রটি!’ মা জেনেও চুপ করে থাকেন। বাবা ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন – ‘দূর করে দেবো, এবার দূর করে দেবো।’ এমন সময় ছেলে বাড়ি ফেরে। বাবা আরও ক্রুদ্ধ হয়ে যান এবং বলেন – “এমন ছেলের আমার দরকার নেই – বেরিয়ে যা।” অভিমানী ছেলে তখন বাবার কথায় “বিশাল পৃথিবীতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে।”

ছেলের ঘরে ফেরা – এরপর মূল ঘটনার সূত্রপাত। মা চিন্তায় সেই রাত থেকে আহারনিদ্রা ত্যাগ করে শয্যা নেন। বাবাও চিন্তাগ্রস্ত, কিন্তু মুখে বলেন না। শেষে মায়ের কান্নায় বিরক্ত হয়ে বাবা বিজ্ঞাপন অফিসের দ্বারস্থ হন। অফিসের নানা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে বিজ্ঞাপন ছাপানোর সিদ্ধান্ত স্থির হয়। বাবা আশ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন, কিন্তু – “অশ্রুসজল বিজ্ঞাপন বার হবার আগেই দেখেন ছেলে ঘরে এসে হাজির।” মা খুব বকাবকি করেন ছেলেকে, কিন্তু বাবা মনে মনে ছেলেকে ক্ষমা করে দেন।

“খবরের কাগজের অফিসের ব্যাপারটা বড়ো জটিল।” – এই জটিলতার বিস্তারিত পরিচয় দাও।

বিজ্ঞাপন অফিসে যাওয়ার কারণ – প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পের প্রথমাংশে কথকের বলা কাহিনিতে মায়ের আদরে ও প্রশ্রয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া এক ছেলে বাবার বকাবকিতে অভিমানে গৃহ ত্যাগ করে। এর ফলে মা অনাহারে-অনিদ্রায় শয্যাশায়ী হন। বাবা বাড়ির এই পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে, শেষপর্যন্ত ছেলের নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেবেন বলে উপস্থিত হন খবরের কাগজের অফিসে।

নিরীহ চেহারার লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ – কাগজের অফিসের জটিল ব্যাপার বুঝতে না পেরে বাবা এদিক-ওদিক বিমূঢ়ভাবে ঘুরে, অফিস ঘরে এক নিরীহ চেহারার ভদ্রলোককে বেছে নিয়ে সাহস করে বলেন – “আপনাদের কাগজে এই-এই একটা খবর বার করতে চাই।” তাতে ভদ্রলোক ব্যঙ্গ করে বলেন – “কেন আমাদের খবরগুলো পছন্দ হচ্ছে না! আমরা কি এতদিন রামযাত্রা বার করেছি।” এতে বাবা হতভম্ব হন এবং অসহায়ভাবে চারিদিকে তাকান।

রূঢ় প্রকৃতির ভদ্রলোকের সহানুভূতি – কাগজের অফিসে এক ভদ্রলোক, যাকে অত্যন্ত রূঢ় প্রকৃতির বলে মনে হয়েছিল, তিনি সহানুভূতির সুরে বাবাকে বসতে বলেন এবং তিনি কীসের বিজ্ঞাপন দিতে এসেছেন তা জানতে চান। এতে বাবা ছেলের নিরুদ্দেশের কথা বললে তিনি বাবাকে প্যাড বের করে বিষয়টি লিখে দিতে বলেন। বিপদগ্রস্ত ও অসহায় বাবাকে দেখে তিনি ছেলের পরিচয় জেনে নেন এবং তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, তারাই বিজ্ঞাপনের বয়ান লিখবেন। তিনি আরও বলেন, তাদের এই অশ্রুসজল লেখা পড়ে ছেলে কেঁদে ভাসাবে।

“অধিকাংশ নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের ইতিহাসই এই।” – উক্তিটি কার? নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের ইতিহাস বিবৃত করো।

ভূমিকা – আধুনিক ছোটোগল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পের কথক শীতের দিনে বন্ধু সোমেশের সঙ্গে থাকাকালীন সংবাদপত্রের পাতা ওলটাতে ওলটাতে হঠাৎ দেখেন একসঙ্গে সাত-সাতটা নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। এই সূত্রে তিনি বলেন নিরুদ্দেশের পেছনে থাকা ঘটনা তাঁর জানা।

ছেলের উচ্ছন্নে যাওয়া – কথকের কথানুযায়ী, বাবা-মায়ের সংসারের একমাত্র ছেলে মায়ের প্রশ্রয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাতের পর রাত থিয়েটার দেখে বাড়ি ফেরে। মা জানা সত্ত্বেও বারণ করেন না, ফলে ছেলের স্পর্ধা ক্রমশ বাড়তেই থাকে।

বাবার বকুনি – বাবা প্রায়ই রাতে খেতে বসবার সময় ছেলের খোঁজ করলেও ছেলের দেখা পান না, ক্রুদ্ধ হয়ে ছেলের উদ্দেশে বলেন – “পয়সাগুলো আমার খোলামকুচি কিনা, তাই নবাবপুত্তুর যা খুশি তাই করছেন। দূর করে দেবো, এবার দূর করে দেবো।”

ছেলের নিরুদ্দেশ যাত্রা – এমন সময়ই গুণধর পুত্র বাড়ি ফেরে। বাবা রাগ সামলে রাখতে না পেরে রুষ্ট হয়ে ছেলেকে বলেন – “এমন ছেলের আমার দরকার নেই – বেরিয়ে যা।” অভিমানী ছেলে তৎক্ষণাৎ পিতৃদেবের আদেশ পালন করতে “বিশাল পৃথিবীতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে।”

নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন – ছেলের চলে যাওয়ায় মা আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে সন্তানশোকে শয্যা গ্রহণ করেন। বাড়ির এ অশান্তি সহ্য করতে না পেরে বাবা শেষপর্যন্ত সংবাদপত্র অফিসে যান এবং বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন – “একটু ভালো করে লিখে দেবেন। ওর মা কাল থেকে জলগ্রহণ করেনি।”

ছেলের ঘরে ফেরা – কিন্তু অশ্রুসজল বিজ্ঞাপন বেরোনোর আগেই সন্তান এসে বাড়িতে হাজির হয়। বাড়ি ফিরলেই মা সন্তানের ওপর রোষ প্রকাশ করতে থাকেন আর বাবা সন্তানকে ক্ষমা করেন। কথকের ভাষায় – “অধিকাংশ নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের ইতিহাসই এই।”

“এই বিজ্ঞাপনের পেছনে অনেক সত্যকার ট্র্যাজিডি থাকে।” – এই ট্র্যাজিডির পরিচয় দাও।

অথবা, “সে বিজ্ঞাপন নয়, সম্পূর্ণ একটি ইতিহাস।” – এই ইতিহাসের পরিচয় দাও।
অথবা, ‘ফিরে আসারই ভয়ানক একটা ট্র্যাজেডির কথা আমি জানি’ – ভয়ানক ট্র্যাজেডি ‘নিরুদ্দেশ’ গল্প অবলম্বনে আলোচনা করো।

আধুনিক ছোটোগল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র সোমেশ গল্পকথককে বিজ্ঞাপনের একটি সত্যকার ট্র্যাজিডির কথা শুনিয়েছেন, যা শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন ছিল না, ছিল সম্পূর্ণ একটি ইতিহাস।

নিরুদ্দেশের সাধারণ কাহিনি – গল্পকথক গল্পের প্রথমাংশে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সাতটি নিরুদ্দেশের প্রসঙ্গে সোমেশকে বলেন – ‘নিরুদ্দেশ’ -এর এই বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে কিন্তু আমার হাসি পায়।’ এরপর নিরুদ্দেশের একটি হাস্যরসাত্মক কাহিনি শোনালে সোমেশ তাকে নিরুদ্দেশের এক সত্য কাহিনি শোনান যার প্রধান চরিত্র শোভন।

শোভনের পরিচয় – প্রাচীন জমিদার বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী শোভন বাড়ি ছেড়েছিল নেহাত খেয়ালের বশে। বিষয়াসক্তি ছিল না বলে সে মুক্তির স্বাদ পেতে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন – এদিকে সংবাদপত্রের পাতায় দিনের পর দিন শোভনের নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন বেরোতে লাগল। সোমেশের কথায় – “সে বিজ্ঞাপন নয়, সম্পূর্ণ একটি ইতিহাস।” প্রথমে ছেলেকে ফিরে আসার অনুরোধ করে মায়ের আর্তনাদ, পরে বাবার কাতর অনুরোধ। এরপর ঘোষিত হয় যে শোভনের সন্ধান দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে, ঘোষিত হয় শোভন জীবিত কিংবা মৃত – এ খবর জানালেও পুরস্কৃত করা হবে। এইভাবে প্রায় দু-বছর ধরে বিজ্ঞাপন চলতে চলতে হঠাৎ বন্ধ হয় এই বলে – “শোভন, তোমার মার সঙ্গে আর তোমার বুঝি দেখা হলো না। তিনি শুধু তোমারই নাম করছেন এখনো।’

শোভনের ট্র্যাজিক পরিণতি – হঠাৎ করে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুই বৎসর পর উদাসীন শোভন বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু বাড়ি ফিরলে তাকে সেরেস্তার কর্মচারী-সহ তার বাবাও চিনতে পারেন না। কারণ তার মৃত্যুর ভুল খবর ইতিমধ্যে বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। এদিকে স্বয়ং জমিদারের অনুরোধে কিছু টাকার বিনিময়ে শেষপর্যন্ত তাকে অসুস্থ মায়ের কাছে হারানো ছেলের অভিনয় করতে হয়। শোভনের এমন করুণ পরিণতি পাঠকের মনকে বিষাদগ্রস্ত করে।

“বিজ্ঞাপন ক্রমশ হতাশ হাহাকার হয়ে উঠল।” – হতাশ ও হাহাকার ভরা বিজ্ঞাপনের বর্ণনা উদ্ধৃতিসহ লেখো।

অথবা, “এত গেল বিজ্ঞাপনের উপাখ্যান।” – এই উপাখ্যানের পরিচয় দাও।

প্রখ্যাত গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পে গল্পকথকের বন্ধু সোমেশের কথানুযায়ী শোভন হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের পাতায় দিনের পর দিন একটি বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, যা শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন নয়, সম্পূর্ণ একটি ইতিহাস। বিজ্ঞাপনের লেখায় কান পাতলে সেখানে যেন কাতর আর্তনাদ শোনা যাবে।

মায়ের কাতরতা – বিজ্ঞাপনে প্রথমেই বের হয় পুত্রহারা শোকার্ত মায়ের ছেলের প্রতি কাতর অনুরোধ ফিরে আসার জন্য। সোমেশের ভাষায় – “অস্পষ্ট আড়ষ্ট ভাষা, কিন্তু তার ভিতর দিয়ে কী ব্যাকুলতা যে প্রকাশ পেয়েছে তা না পড়লে বোঝা যায় না।” এরপর ধীরে ধীরে মায়ের কাতর অনুরোধ হতাশ দীর্ঘশ্বাসের মতো খবরের কাগজের পাতায় মিলিয়ে যায়।

পিতার আর্তনাদ – তারপর শোনা যায় পিতার গম্ভীর স্বর, একটু যেন কম্পিত তবু ধীর ও শান্ত – “শোভন ফিরে এসো। তোমার মা শয্যাগত। তোমার কি এতটুকু কর্তব্যবোধও নেই!” পিতার স্বর ক্রমশ ভারী হয়ে আসে, ক্রমশ তাঁর স্বরে শোনা যায় শুধু কাতরতা, একান্ত দুর্বলতা – “শোভন, জানো না আমাদের কেমন করে দিন যাচ্ছে! এসো, আর আমাদের দুঃখ দিও না।”

সাধারণ বিজ্ঞপ্তি – বিজ্ঞাপন ক্রমশ হতাশ, হাহাকারে ভরে ওঠে। তারপর পুরোপুরি বদলে যায়। তা সাধারণ বিজ্ঞপ্তিতে পরিণত হয়। চেহারা ও বয়সের পরিচয় দিয়ে ঘোষণা করা হয়, কেউ সন্ধান দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কারের পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। বলা হয় – দোহারা ছিপছিপে একটি বছর ষোলো-সতেরোর ছেলে, পরিচয়চিহ্ন ঘাড়ের দিকে ডান কানের কাছে একটি বড়ো জড়ুল, জীবিত না মৃত – এইটুকু কেউ সন্ধান দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে।

অন্তিম বিজ্ঞাপন – এইভাবে প্রায় দু-বছর ক্লান্তভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একদিন বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায় এইভাবে – “শোভন, তোমার মার সঙ্গে আর তোমার বুঝি দেখা হলো না। তিনি শুধু তোমারই নাম করছেন এখনো।” এমনই এক হতাশ হাহাকার ভরা বিজ্ঞাপনের উপাখ্যান সোমেশ শুনিয়েছিল গল্পকথককে।

“একবার আমায় শুধু দেখা করতে দিন।” – এমন কাতর আবেদনের কারণ কী? দেখা করায় বাধাটা কীসের?

কাতর আবেদনের কারণ – প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পে সোমেশের গল্পানুযায়ী শোভন নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন বন্ধ হওয়ার পর নিজ বাড়িতে ফিরে এসে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে। দীর্ঘ দু-বছরের অদর্শনে এবং বিজ্ঞাপন হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় সে বিচলিত ছিল। তার ওপর সেরেস্তার কর্মচারীর কেউই তাকে চিনতে পারেননি। অস্তিত্বহীনতা থেকেই এমন কাতর আবেদন করেছিল সে।

শোভন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর প্রায় দু-বছর কেটে গেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরেই সে ভয়ংকর জটিলতার মধ্যে পড়ে, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও দেখা করার অনুমতি পায় না। সেরেস্তার কর্মচারীরা তাকে বাধা দিয়েছিল, কারণ –

  • দৈহিক পরিবর্তন – দীর্ঘ দু-বছর ধরে শোভন নিরুদ্দেশ। ফলস্বরূপ দু-বছরের নানা ঝড়ঝাপটা তার দৈহিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল অনেকটাই। তাই নায়েবমশাই, খাজাঞ্চিমশাই, অন্যান্য কর্মচারী তাকে চিনতে পারেননি, এমনকি তার বাবাও তাকে চিনতে পারেন না।
  • সংশয় – শোভন বাড়ি ফেরার আগে দুজন শোভনের নাম নিয়ে তার বাড়িতে আসে সম্পত্তির লোভে। এমনকি তাদের একজনের সঙ্গে শোভনের ডান কানের কাছে থাকা জড়ুলেরও পর্যন্ত মিল ছিল। কিন্তু তারা সবাই ছিল মিথ্যেবাদী। তাই সত্যকারের শোভনকে সবাই মিথ্যেবাদী সন্দেহ করে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়।
  • শোভনের মৃত্যুসংবাদ – শোভন বাড়ি ফেরার সাতদিন আগে তারই মৃত্যুসংবাদ বাড়িতে আসে। খবর আসে শোভন মারা গিয়েছে রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে অপঘাতে। এমনকি হাসপাতালের ডাক্তারের বর্ণনার সঙ্গেও সবকিছু মিলে যায়।

“সকলের চোখে অবিশ্বাস” – কাদের কথা বলা হয়েছে? এই অবিশ্বাসের কারণ কী?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি – বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে কথকের বন্ধু সোমেশের পরিচিত শোভনের বাড়ির নায়েবমশাই এবং সেরেস্তাখানার সদস্যদের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস।

শোভন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর প্রায় দু-বছর কেটে গেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরেই সে ভয়ংকর জটিলতার মধ্যে পড়ে, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও দেখা করার অনুমতি পায় না। সেরেস্তার কর্মচারীরা তাকে বাধা দিয়েছিল, কারণ –

  • দৈহিক পরিবর্তন – দীর্ঘ দু-বছর ধরে শোভন নিরুদ্দেশ। ফলস্বরূপ দু-বছরের নানা ঝড়ঝাপটা তার দৈহিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল অনেকটাই। তাই নায়েবমশাই, খাজাঞ্চিমশাই, অন্যান্য কর্মচারী তাকে চিনতে পারেননি, এমনকি তার বাবাও তাকে চিনতে পারেন না।
  • সংশয় – শোভন বাড়ি ফেরার আগে দুজন শোভনের নাম নিয়ে তার বাড়িতে আসে সম্পত্তির লোভে। এমনকি তাদের একজনের সঙ্গে শোভনের ডান কানের কাছে থাকা জড়ুলেরও পর্যন্ত মিল ছিল। কিন্তু তারা সবাই ছিল মিথ্যেবাদী। তাই সত্যকারের শোভনকে সবাই মিথ্যেবাদী সন্দেহ করে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়।
  • শোভনের মৃত্যুসংবাদ – শোভন বাড়ি ফেরার সাতদিন আগে তারই মৃত্যুসংবাদ বাড়িতে আসে। খবর আসে শোভন মারা গিয়েছে রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে অপঘাতে। এমনকি হাসপাতালের ডাক্তারের বর্ণনার সঙ্গেও সবকিছু মিলে যায়।

“তার হাসিটাই বিশ্বাস করিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না।” – বক্তা কেন উদ্দিষ্ট ব্যক্তির হাসিটা বিশ্বাস করতে চাননি? উক্তিটির মধ্যে কীসের ইঙ্গিত আছে?

হাসিটা বিশ্বাস করতে না চাওয়ার কারণ – প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটোগল্পে প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন গল্পকথক। তিনি শীতের এক বৃষ্টির দিনে বন্ধু সোমেশকে নিয়ে আড্ডা দেওয়ার সময় হঠাৎ করে সেদিনের সংবাদপত্রে সাতটি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেখেন। তাঁর নিরুদ্দেশের এই বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে খুব হাসি পায়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় মা-বাবার আদুরে ছেলে বাবার বকুনিতে কয়েকদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তারপর বিজ্ঞাপন বের হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে আসে। এ কথা বন্ধু সোমেশ পুরোপুরি মেনে নিতে পারে না, কারণ তার মতে – “এই বিজ্ঞাপনের পেছনে অনেক সত্যকার ট্র্যাজিডি থাকে।” সে তার পরিচিত শোভনের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা শোনায়। এরপর কথক লক্ষ করেন, নিরুদ্দিষ্ট শোভনের মতো সোমেশেরও একই স্থানে একটা জড়ুল আছে। আর সে-কথা কথক তাকে বললে সোমেশ হেসে বলে “সেই জন্যেই গল্প বানানো সহজ হলো।” কিন্তু কথকের মনে এক সন্দেহ দানা বাঁধে, সোমেশের এই হাসিটা তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি।

রহস্যময়তার ইঙ্গিত – সোমেশ কথকের বন্ধু। কথক সোমেশকে তাই চিনতেন, জানতেন। সোমেশ কথককে শোভনের নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত গল্প শুনিয়েছে, তা বানানো গল্প হলেও আসলে গল্পটি মোটেও বানানো গল্প ছিল না। ওটা আসলে সোমেশেরই জীবনের একটি ট্র্যাজিক কাহিনি। সোমেশ তার গল্পে শোভনকে উদাসীন, নির্লিপ্তমনা করে গড়ে তুলেছে। আমরা সোমেশকেও গল্পের প্রথমাংশে উদাসীন দেখি। কথকের বলা নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের কথা শুনে – “সোমেশ কোনো কৌতূহলই প্রকাশ করিল না।” এ ছাড়া শোভনের আকার-আকৃতির সঙ্গে সোমেশের আকার-আকৃতির মিল ছিল, এমনকি তার ঘাড়ের দিকে ডান কানের কাছে একটি জড়ুলও ছিল। তাই কথকের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, গল্পের শোভন আসলে সোমেশই। তাই কথক সোমেশের হাসির মধ্যে এক রহস্যময়তার ইঙ্গিত পান।

Here are the questions formatted as H2 headings with corrected Bengali spelling/grammar, preserving all original information:

নিরুদ্দেশ – এর এই বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে কিন্তু আমার হাসি পায়। — বক্তা কে? নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলো তার হাসির উদ্রেক করে কেন?

বক্তা – প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে উল্লিখিত মন্তব্যটির বক্তা কথক স্বয়ং।

হাসির উদ্রেকের কারণ – এক বৃষ্টিবিঘ্নিত শীতের দিনে বন্ধু সোমেশের সামনে খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে কথক বলেছিলেন যে, সেদিনের কাগজে একসঙ্গে সাতটি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই এইসব নিরুদ্দেশ সাময়িক এবং ফিরে আসাটাই অনিবার্য। একটি ঘটনার উল্লেখ করে কথক জানান: থিয়েটার দেখে রাত করে বাড়ি ফেরার জন্য ক্রুদ্ধ বাবা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ছেলেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। ছেলেও তৎক্ষণাৎ আদেশ পালন করে। এরপর মায়ের উপর বাবার দোষারোপ, মায়ের ছেলের জন্য নিদ্রাত্যাগ, বাবার খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া—এসব ঘটনা ঘটতে থাকে। এমন সময় ছেলে বই নেওয়ার অজুহাতে বাড়ি ফিরে আসে। মা এবার ছেলেকে বাবার স্বাস্থ্যের কথা তুলে বকতে শুরু করলে, বাবা তাকে নিষেধ করেন। ছেলেটির ফিরে আসায় নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন অর্থহীন হয়ে যায়। এজন্যই কথকের হাসি পায়।

কতটা রাগ দেখানো উচিত ঠিক করতে না পেরে বলার মাত্রাটা একটু বেশি হয়ে পড়ে। — মন্তব্যটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করো। বলার মাত্রা বেশি হওয়ায় কী ঘটনা ঘটেছিল?

প্রসঙ্গ – ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে কথক একটি ছেলের নিখোঁজ হওয়ার কাহিনি বর্ণনা করেন। ছেলেটি গভীর রাতেও বাড়ি না ফেরায় বাবা মায়ের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আগের বছর ফেল করা ছেলে এবারও পাস করতে পারবে না—এ চিন্তায় তিনি বলেন, “পয়সাগুলো আমার খোলামকুচি কিনা, তাই নবাবপুত্তুর যা খুশি তাই করছেন!” ছেলেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথাও জানান। বাবার এই ক্ষোভ মৌখিক আস্ফালনেই থেমে যেতে পারত, কিন্তু ঠিক তখনই ছেলে বাড়ি ঢোকে। রাগ প্রকাশের পর ছেলেকে কিছু না বলাটা হাস্যকর হতো—তাই তিনি ছেলেকে বেরিয়ে যেতে বলেন।

বলার মাত্রা বেশি হওয়ার প্রভাব – “এমন ছেলের আমার দরকার নেই—বেরিয়ে যা!” — এই উক্তিতে অভিমানী ছেলে তখনই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

এ অশান্তির চেয়ে বনবাস ভালো। বক্তা কেন এ কথা বলেছিলেন? অশান্তি এড়াতে তিনি কী করেছিলেন?

বক্তার এ কথা বলার কারণ – ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে রাত করে বাড়ি ফেরায় ছেলেকে বাবা বেরিয়ে যেতে বললে, ছেলে চলে যায়। পুত্রশোকে মা খাওয়া ছেড়ে দেন। পরদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে বাবা দেখেন—ছেলে ফেরেনি, মা বিছানায় শুয়ে আছেন। এই পরিস্থিতি তাঁকে বিব্রত করে।

অশান্তি এড়াতে করণীয় – বাবা খবরের কাগজের অফিসে গিয়ে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেন। কর্মচারীকে ছেলের নাম-পরিচয় লিখে দিয়ে অনুরোধ করেন: “একটু ভালো করে লিখে দেবেন। ওর মা কাল থেকে জল গ্রহণ করেনি।” আশ্বস্ত হয়ে তিনি বাড়ি ফিরেন।

ছেলে বিশাল পৃথিবীতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। — ছেলের নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ার কারণ কী? তার ঘরে ফেরা পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ দাও।

নিরুদ্দেশ যাত্রার কারণ – গভীর রাতে বাড়ি ফেরায় বাবা ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন: “পয়সাগুলো আমার খোলামকুচি কিনা, তাই নবাবপুত্তুর যা খুশি তাই করছেন!” ছেলে সেখানে উপস্থিত হলে বাবা তাকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। অভিমানে ছেলে চলে যায়।

ঘরে ফেরা পর্যন্ত ঘটনাক্রম – ছেলের চলে যাওয়ার পর মা খাওয়া বন্ধ করে দেন। পরদিন বাবা অফিস থেকে ফিরে দেখেন মা বিছানায়, ছেলে ফেরেনি। তিনি বিজ্ঞাপন দিতে খবরের কাগজের অফিসে যান। ফিরে এসে দেখেন ছেলে বই নেওয়ার জন্য ফিরেছে। মা এবার তাকে “কুলাঙ্গার” বলে বকলেও বাবা বকতে নিষেধ করেন।

অধিকাংশ নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের ইতিহাসই এই। — বিজ্ঞাপনের কোন ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে?

বিজ্ঞাপনের ইতিহাস – কথকের মতে, অধিকাংশ নিরুদ্দেশের পেছনে থাকে একই কাহিনি: ছেলে রাগের বশে বাড়ি ছাড়ে, বাবা বিজ্ঞাপন দেন, কিন্তু ছেলে ফিরে আসে। উদাহরণস্বরূপ—এক ছেলে থিয়েটার দেখে রাত করে ফেরায় বাবা তাকে তাড়িয়ে দেন। মা পুত্রশোকে আহার ত্যাগ করেন। বাবা বিজ্ঞাপন দিতে যান, কিন্তু ফিরে দেখেন ছেলে বই নিতে এসেছে। মা ছেলেকে বকলেও বাবা বারণ করেন। বিজ্ঞাপনটি অর্থহীন হয়ে যায়।

ফিরে আসারই ভয়ানক একটা ট্র্যাজেডির কথা আমি জানি। — বক্তা কে? তিনি যে ঘটনার কথা বলেছেন তা লেখো।

বক্তা – গল্পকথকের বন্ধু সোমেশ

ঘটনার বিবরণ – একটি পুরোনো সংবাদপত্রে ধারাবাহিক নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়: প্রথমে মায়ের কাতর অনুরোধ, তারপর বাবার আহ্বান, শেষে পুরস্কারের ঘোষণা। শোভন (জমিদারপুত্র) নির্লিপ্ত মনের ছিল, তাই বাড়ি ছাড়ে। দু-বছর পর ফিরে এলে কর্মচারীরা তাকে চিনতে পারে না—ইতিমধ্যে তার মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল। নায়েবমশাই তাকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেন। শোভনের বৃদ্ধ বাবাও তাকে চিনতে ব্যর্থ হন। শেষে নায়েবমশাই টাকার বিনিময়ে তাকে মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের সামনে “শোভন সেজে” দেখা দিতে বলেন। এটিই ট্র্যাজেডি।

এত গেল বিজ্ঞাপনের উপাখ্যান। – বিজ্ঞাপনটি কীসের জন্য? এই বিজ্ঞাপনের উপাখ্যানের পরিচয় দাও।

বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য – নিরুদ্দেশ শোভনকে ফিরিয়ে আনা বা তার সন্ধান জানা।

বিজ্ঞাপনের উপাখ্যান – দিনের পর দিন প্রকাশিত এই বিজ্ঞাপনে প্রথমে ছিল মায়ের কাতর অনুরোধ, তারপর বাবার ফিরে আসার আবেদন (মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে), শেষে চেহারার বর্ণনা ও ক্রমবর্ধমান পুরস্কারের ঘোষণা। বিজ্ঞাপনটি কাহিনির মতো বিকশিত হয়: মায়ের আকুলতা → পিতার কণ্ঠস্বর → হতাশ হাহাকার → বিজ্ঞপ্তি। হঠাৎ মায়ের গুরুতর অসুস্থতার খবরে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায়।

হঠাৎ শোভনের কাছে সমস্ত ব্যাপারটা ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল। — শোভনের কাছে কী স্পষ্ট হয়েছিল? সে মুক্তি পেয়েছিল কি?

স্পষ্ট হওয়া বিষয় – বাড়ি ফিরে নায়েবমশাই শোভনকে বাধা দেন। মায়ের অবস্থা সম্পর্কে অস্পষ্ট উত্তর, খাজাঞ্চিমশাইয়ের অস্বাভাবিক গলার স্বর—এগুলো তাকে সন্দেহ করায়। নায়েবমশাইয়ের “মিছিমিছি কেলেঙ্কারি করে লাভ নেই!” — এই উক্তিতে শোভন বুঝতে পারে, তাকে শোভন বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

মুক্তি – না। নায়েবমশাই শোভনের মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করেছিলেন। শেষে শোভনকে টাকার বিনিময়ে মায়ের সামনে “নকল শোভন” সেজে দেখা দিতে বলা হয়। এই ট্র্যাজেডি থেকে তার মুক্তি ঘটেনি।

সকলের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। — কাদের কথা বলা হয়েছে? অবিশ্বাসের কারণ কী?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ – শোভনের বাড়ির নায়েবমশাই ও অন্যান্য কর্মচারী।

অবিশ্বাসের কারণ –

  1. শোভনের চেহারা-গলার স্বর পরিবর্তন।
  2. এর আগে দুজন “শোভন সেজে” পুরস্কার চেয়েছিল।
  3. সাত দিন আগে শোভনের গাড়িচাপা পড়ে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল (প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে নিশ্চিত)।
  4. দীর্ঘ দু-বছরের অনুপস্থিতি।

শোভন এই অবস্থাতে না হেসে পারলে না। — শোভন কে? কোন অবস্থার কথা বলা হয়েছে? হাসির কারণ কী?

শোভনের পরিচয় – প্রাচীন জমিদারবংশের উত্তরাধিকারী যে নিরুদ্দেশ হয়েছিল।

অবস্থা – দু-বছর পর বাড়ি ফিরেও তাকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। নায়েবমশাই বলেছিলেন: “শোভন সাত দিন আগে মারা গেছে!”

হাসির কারণ – নিজেকে সশরীরে উপস্থিত জানার পরও তার মৃত্যুসংবাদ শোনানোয়। এই বিদ্রুপাত্মক পরিস্থিতিতে তার হাসি পায়। সে বিদ্রূপ করে জিজ্ঞাসা করে: “শোভন কীভাবে মারা গেল?”

নায়েবমশাই নোটের তাড়াটা শোভনের হাতে গুঁজে দিলেন। — নায়েবমশাই কেন নোটের তাড়া দিয়েছিলেন?

কারণ – শোভনকে চিনতে না পেরে নায়েবমশাই তাকে একটি প্রস্তাব দেন: মৃত্যুপথযাত্রী মা (যিনি ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানেন না) এর সামনে “হারানো ছেলে শোভন” সেজে দেখা দিতে হবে (চেহারার মিল থাকায়)। এই ভূমিকাভিনয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি টাকার নোটের তাড়া শোভনের হাতে গুঁজে দেন।

সেই জন্যেই গল্প বানানো সহজ হলো। — এই মন্তব্যের আলোয়ে মূল বিষয়টি আলোচনা করো।

মূল বিষয়ের ব্যাখ্যা – কথক প্রথমে একটি “কল্পিত” নিরুদ্দেশ গল্প বলেছিলেন (ছেলে ফিরে আসার কাহিনি)। পরে সোমেশ শোভনের ট্র্যাজিক গল্প শোনান – শোভন ফিরেও স্বীকৃতি পায়নি, তাকে নকল হয়ে মায়ের সামনে যেতে বলা হয়। সোমেশের গল্প শেষ হলে কথক লক্ষ করেন—সোমেশের কানের কাছে শোভনের মতোই একটি জঙুল (তিল) আছে। সোমেশ “গল্প বানানো সহজ হলো” বলে বিষয়টা এড়াতে চাইলেও কথক বুঝতে পারেন, সোমেশই আসল শোভন। অর্থাৎ, সোমেশের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিই এই গল্পের ভিত্তি।

নিরুদ্দেশ গল্প অবলম্বনে শোভন চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে কথকের বন্ধু সোমেশ যে নিরুদ্দেশ-বিষয়ক উপকাহিনিটি বলেছে, তার প্রধান চরিত্র শোভন।

পরিচয় – শোভন এক প্রাচীন জমিদার বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী ছিল এবং সে জমিদারিকে অনেক দুর্দিনেও রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিল। শোভন ছিল ষোলো-সতেরো বছর বয়সী একটি ছেলে, দোহারা গড়নের। নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে তার ডান কানের কাছে একটি জঙুল আছে।

নিরুদ্দেশের কারণ – সোমেশের বর্ণনা থেকে জানা যায়, কোনো অভিমান নয়, বরং সংসারের প্রতি আকর্ষণ না থাকার জন্যই শোভন বাড়ি ছেড়েছিল। পৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছে যারা কোনো কিছুতেই বাঁধা পড়ে না; শোভন ছিল তেমনই একজন।

শোভনের ট্র্যাজেডি – দু-বছর পর বাড়ি ফিরে শোভন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। বাড়ির পুরনো নায়েবমশাই বা খাজাঞ্চিমশাই কেউই তাকে চিনতে পারেননি। তাকে বারবাড়িতে থাকতে বলা হয়। শোভনকে শুনতে হয় তার নিজের মৃত্যুসংবাদ। এমনকি তার বৃদ্ধ বাবাও তাকে চিনতে ব্যর্থ হন। সবচেয়ে ট্র্যাজিক মুহূর্তটি আসে যখন নায়েবমশাই শোভনের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন, তাকে মায়ের সামনে শোভনের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। এভাবে তাকে এক মিথ্যা কাহিনির নায়কে পরিণত করা হয়।

শোভন এবং সোমেশ – গল্পের সমাপ্তিতে এই ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে সোমেশই শোভন। কারণ সোমেশের কানের কাছেও একটি জঙুল ছিল এবং সোমেশ ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেছিল — “সেই জন্যেই গল্প বানানো সহজ হলো।”


আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘নিরুদ্দেশ’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

নবম শ্রেণী ইতিহাস - প্রাককথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ

নবম শ্রেণী ইতিহাস – প্রাককথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ

নবম শ্রেণী ইতিহাস - বিপ্লবী আদর্শ,নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ - বিষয়সংক্ষেপ

নবম শ্রেণী ইতিহাস – বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ – বিষয়সংক্ষেপ

নবম শ্রেণী ইতিহাস - বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

নবম শ্রেণী ইতিহাস – বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

আলোর বিক্ষেপণ কাকে বলে? দিনের বেলায় আকাশকে নীল দেখায় কেন?

আলোর বিচ্ছুরণ ও আলোর প্রতিসরণ কাকে বলে? আলোর বিচ্ছুরণ ও প্রতিসরণের মধ্যে পার্থক্য

আলোক কেন্দ্র কাকে বলে? আলোক কেন্দ্রের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব

উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্স কাকে বলে? উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্সের মধ্যে পার্থক্য

একটি অচল পয়সার আত্মকথা – প্রবন্ধ রচনা