আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘চিঠি’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘চিঠি’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
ভূমিকা – বিশ্বকবি একদা তাঁর ‘কাব্যের উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে জানিয়েছিলেন, নাম কে যাঁরা নামমাত্র মনে করেন, তিনি তাঁদের দলে পড়েন না। সাহিত্যে নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণের মধ্যে বিষয়সত্য আভাসিত হলে সাহিত্য সম্পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু নামকরণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রীতি প্রচলিত নেই। আলংকারিকেরা সাহিত্যের নামকরণকে চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক ও ব্যঞ্জনাধর্মী এই ত্রিবিধ সূত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন।
উক্ত নামকরণ – স্বামী বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ রচনাটি আদ্যন্তই একটি চিঠি। বিবেকানন্দ এর কোনো নামকরণ করেননি। তাঁর ‘পত্রাবলী’ পত্রসংকলনে সমস্ত পত্রই সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত। আলোচ্য পত্রটি 371 সংখ্যক পত্র, যা তিনি 1898 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই আলমোড়া থেকে লিখেছেন মিস নোব্লকে। সংকলকগণ বিবেকানন্দের এই 371 সংখ্যক পত্রের নামকরণ করেছেন ‘চিঠি’।
পত্ররচনা রীতিতে যে বৈশিষ্ট্য গুলি বজায় থাকে, তা হল –
- সম্বোধন।
- উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি সম্ভাষণ করে প্রেরকের উদ্বেগ প্রকাশ।
- কোন্ অবস্থায় পত্র লেখার প্রয়োজন হয়েছে, তার কারণ ব্যাখ্যা।
- প্রেরকের বিশেষ আবেদন-আকাঙ্ক্ষা ও অভিলাষ।
সার্থকতা – আলোচ্য ‘চিঠি’ রচনার প্রারম্ভেই দেখি ‘কল্যাণীয়া মিস নোব্ল্’ বলে সম্বোধন, আবার শেষাংশে দেখি ‘ইতি’ লিখে ‘সদা ভগবৎ-পদাশ্রিত, বিবেকানন্দ’ কথাটি ব্যবহার করেছেন পত্র রচনাকার। রচনার ডানদিকে স্থান ও তারিখ লেখা, যা কেবল পত্র রচনা রীতিতেই ব্যবহৃত হয়। মিস নোব্ল্ -এর কথা বিবেকানন্দ মি. স্টার্ডির একখানি পত্র থেকেই জেনেছেন, জেনেছেন তাঁর ভারতে আসার আকাঙ্ক্ষা ও ভারতের সবকিছু চাক্ষুষ দেখার ইচ্ছা; যা পত্রপ্রেরক বিবেকানন্দের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভারতবর্ষ তখন কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে আছে। তাই এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বিবেকানন্দ অনুভব করেছেন এক ‘প্রকৃত সিংহীর’ প্রয়োজনীয়তা, যিনি এসে পথের দিশা দেবেন। তবে পদে পদে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তাও বিবেকানন্দ মিস নোব্লকে জানিয়েছেন। তিনি আমরণ মিস নোব্ল্ -এর পাশে থাকবেন – এই আশ্বাস দিয়েছেন। মিস নোব্লকে সাহায্যের প্রসঙ্গে উঠে এসেছে সেভিয়ার দম্পতি, মিস মুলার, মিস ম্যাকলাউড এবং মিসেস বুলের কথা। প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মিস নোব্ল্ যাতে ভারতের দুরবস্থা দূর করতে পারেন – তারই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন লেখক। পত্রের শেষে ‘অনন্ত ভালোবাসা জানবে’ – লিখে তিনি পত্র সমাপ্তি ঘটিয়েছেন।
পত্ররচনা রীতির সমস্ত শর্ত পূরণ করেছে বিবেকানন্দের লেখা 371 সংখ্যক পত্রটি। সংকলকগণকৃত ‘চিঠি’ নামকরণটি এই বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে সার্থক ও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠেছে।
কোন সামাজিক পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দ মিস নোব্ল্-কে এই ‘চিঠি’ লেখেন?
অথবা, ‘চিঠি’ রচনার সামাজিক প্রেক্ষাপটটি নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিঠিতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে কোন্ কোন্ বিষয়গুলি মিস নোবেলকে লিখেছিলেন?
উনিশ শতকের ভারত – শৈলশহর আলমোড়া থেকে 1897 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই মিস মার্গারেট নোব্ল্ বা ভগিনী নিবেদিতাকে স্বামী বিবেকানন্দ যখন এই চিঠি লেখেন তখন ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসিত। পাশাপাশি ভারতের সমাজ কুসংস্কার, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অস্পৃশ্যতা, অজ্ঞতায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। নারীরা সেদিন নিদারুণ নিপীড়িত নারীসমাজের কল্যাণে ও স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে প্রয়োজন ছিল প্রকৃত নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষের। ইংরেজের দাসত্ব করতে করতে ভারতবাসী এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিল যে বিদেশি শাসকের ‘পাদুকাতলে’ লুটিয়ে পড়ে ‘ঘৃণায় মাখা অন্ন’ খুঁটে বাড়ি যেতে তাদের কুণ্ঠা ছিল না।
সামাজিক প্রেক্ষাপট – স্বামীজি বুঝেছিলেন ভারতীয়রা বহুবছরের প্রাচীন কুসংস্কার ও বিধিনিষেধের বশবর্তী হয়ে চেতনার চারপাশে গড়ে তুলেছিল দুর্ভেদ্য প্রাচীর। জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি, সংস্কার মানুষকে ক্রমশ মানসিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে বীর সন্ন্যাসী চেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে অতলস্পর্শী আর্থসামাজিক জড়ত্বের শিকড় ছিন্ন করে এক উন্নত ভারতবর্ষ গড়ে তুলতে।
স্বামীজির অভিপ্সা – ‘চিঠি’ রচনায় স্বামীজী তাই সামাজিক তথা আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরে মিস নোব্লকে ভারতবর্ষে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তামসিকতা ও জড়তায় আচ্ছন্ন, সীমাহীন দারিদ্র্য, জীর্ণ লোকাচার, জাতিভেদ, মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু, স্ত্রীজাতির প্রতি অবমাননা, অশিক্ষা সর্বোপরি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে আত্মবিশ্বাস হারানো সামাজিক ছবিটি ফুটে উঠেছে এই চিঠিতে। যার জন্য লেখক খুঁজেছেন একজন ‘প্রকৃত সিংহী’কে, যে ভারতবর্ষের সমাজকে তামসিক জড়তা থেকে মুক্তি দেবে। ভারতীয় নারীজাতির মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটাবে। মুক্তি দেবে নারাজাতিকে কুসংস্কারের তীব্র যন্ত্রণা থেকে।
তাই মিস নোব্লকে লিখেছিলেন – ‘এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য-নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে।’ এখানে সামাজিক ছবিটি স্পষ্ট।
পত্রসাহিত্য বলতে কী বোঝো? ব্যক্তিগত পত্র কীভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠে ‘চিঠি’ রচনাটি অবলম্বনে তা আলোচনা করো।
পত্রসাহিত্য – একটি চিঠি তখনই ‘পত্রসাহিত্য’-এ পরিণত হয়, যখন সেটি ভাবনা ও লেখনীর গুণে জীবন ও সমাজের নানা বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করে। ব্যক্তিগত চিঠি তখন ব্যক্তিসীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। লেখকের অভিজ্ঞতা চেতনা-দর্শন সাহিত্যের আঙ্গিকে পাঠককে সমৃদ্ধ করে। বাংলা সাহিত্যে এরূপ পত্রসাহিত্যের নানান উদাহরণ রয়েছে, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রাবলী।
শৈলশহর আলমোড়া থেকে মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোব্লকে লেখা বিবেকানন্দের এই পত্র ব্যক্তিগত পত্র হয়েও পত্রসাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।
বিষয়বস্তু – বিবেকানন্দ উক্ত পত্রে মিস নোব্লকে ভারতবর্ষের সামাজিক-প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিস্থিতি লিখে এদেশে কাজ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এই আমন্ত্রণ পত্রে তিনি মিস নোবলের সামাজিক ও গঠনমূলক কর্মপ্রণালীর একটি রূপরেখা করেছেন। কিন্তু রচনাশৈলীর গুণে ব্যক্তিগত পত্রই ‘পত্র সাহিত্য’ হয়ে উঠেছে।
রচনাশৈলী ও সমাজচিত্র – লেখকের অভিজ্ঞতা, অনুভব, আন্তরিক আবেগ সমৃদ্ধ এই চিঠিটি উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার মার্জিত কথ্যভাষায় রচিত। উপমা এবং তৎসম-তদ্ভব-বিদেশি শব্দব্যবহারের পাশাপাশি তৎকালীন ভারতীয় সমাজচিত্র রচনাটিকে উৎকর্ষতা দিয়েছে। এর প্রতিছত্র দারিদ্র্যপীড়িত, পরাধীন ভারতবাসীর মর্মযন্ত্রণা ও নারী উন্নতির প্রতিবন্ধকতা নিয়ে রচিত।
উপসংহার – ব্যক্তিগত পত্র কীভাবে সর্বজনীন হয়ে ওঠে ‘চিঠি’ তার অন্যতম উদাহরণ। উনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় সমাজের বাস্তবচিত্র যেমন এর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি রচনাশৈলীর গুণে এটি সাহিত্য হয়ে উঠেছে। উপরিউক্ত কারণগুলিকে নির্ভর করে ‘চিঠি’ হয়েছে এক ‘ঐতিহাসিক ভাষ্য’।
‘চিঠি’ রচনার শিল্পশৈলী বিচার করো।
পত্রসংখ্যা – 1897 খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বিবেকানন্দ মিস নোব্লকে যে দুটি পত্র (361, 371 নং) লিখেছিলেন, তার মধ্যে 29 জুলাই লেখা 371 নং পত্রটিই আমাদের পাঠ্য ‘চিঠি’ নামে পাঠ্য তালিকায় সংযুক্ত হয়েছে। পত্রটি পড়লে বিবেকানন্দের রচনাশৈলীর বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়।
পত্রের ভাষা – হৃদয়াবেগমূলক ভক্তিতন্ময়তা থেকে যুক্তিনিষ্ঠ জ্ঞানসাধনার দিকে বাঙালি মনকে আকৃষ্ট করার সাধুবাদ প্রথম ভারতপথিক রামমোহনেরই প্রাপ্য। পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ পণ্ডিতগণ ভাষাকে এক নতুন পথনির্দেশ দিলেও ভাষাকে দক্ষ নাবিকের মতো দিক চেনাতে বিবেকানন্দের সাহিত্য বিকশিত।
রচনাশৈলী – ‘চিঠি’তে স্বামী বিবেকানন্দ বিষয়ানুযায়ী ভাষা নির্মাণ করেছেন। শব্দ নির্বাচন, অনুচ্ছেদ বিভাজন, উপমা উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তাঁর আধুনিক মনের প্রকাশ ঘটেছে। আলোচ্য রচনায় তৎসম শব্দের পরিচয় মেলে, তেমনি তদ্ভব, বিদেশি, সংকর শব্দেরও পরিচয় মেলে। ‘মরদ কি বাত হাতি কি দাঁত’ -এর মতো উপমার প্রয়োগ পত্রটিকে সরস করেছে লেখক আলোচ্য পত্রে। কলকাতার মার্জিত কথ্যবুলির উপর নির্ভর করেই তিনি তাঁর উক্ত পত্রে অন্তরঙ্গ মনের পরিচয় দিয়েছেন। পত্রকাহিনি এমনভাবে ক্রমশ সমাপ্তির দিকে এগিয়ে গেছে, যেন পত্র প্রাপকের সঙ্গে তিনি সরাসরি কথা বলছেন। বিভিন্ন বিষয়ে পত্র প্রাপককে সাবধানতার বার্তা দিয়ে তিনি সিরিয়াস সাহিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। প্রমথ চৌধুরীর গদ্যরচনার মতো ভাষার মারপ্যাঁচ কোথাও নেই। তাঁর ভাষা যেন ওয়াল্টার পেটারের ‘style is the man’। তৎকালীন সময়ে সাধুভাষাই যেখানে ভাবপ্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, সেখানে আলোচ্য পত্রে বিবেকানন্দ চলতি বাংলা ব্যবহার করে সাহসিকতার পরিচয় দান করেছেন।
পাঠ্যাংশের ‘চিঠি’ নামক পত্রটির মধ্য দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের মিস নোব্ল্ -এর প্রতি যে আস্থা ও স্নেহমিশ্রিত শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে, সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ নামক পত্রটিতে বিবেকানন্দের অন্যতমা শিষ্যা মিস নোব্ল্ -এর প্রতি বিবেকানন্দের আস্থা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই প্রকাশ পেয়েছে স্নেহমিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধ।
আস্থাবোধ – স্টার্ডির চিঠিতে বিবেকানন্দ মিস নোব্ল্ -এর ভারতে আসার অভিলাষ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। তিনি মিস মুলারের কাছ থেকে জেনেছেন তাঁর কর্মপ্রণালীর কথা। এরপর তাঁর মনে হয়েছে, ভারতবর্ষের উন্নতিকর্মে মিস নোব্ল্ই হলেন একজন আদর্শ মহিলা। তিনি তাঁর পত্রে মিস নোব্লকে উদ্দেশ করে বলেছেন –
‘এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে।’ ভারতের জন্য, বিশেষত ভারতবর্ষের নারীসমাজের জন্য যে একজন ‘প্রকৃত সিংহী’-র প্রয়োজন, তা উপলব্ধি করেছিলেন বিবেকানন্দ। মিস নোব্ল্ -এর শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, অসীম ভালোবাসা, পবিত্রতা, দৃঢ়তা-সর্বোপরি তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য গভীর আস্থাবোধ হেতু বিবেকানন্দ বলেছেন – “তুমি ঠিক সেই রূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
শ্রদ্ধাবোধ – মিস নোব্ল্ -এর প্রতি আস্থাবোধের পাশাপাশি স্নেহমিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধও ছিল বিবেকানন্দের। তিনি মিস নোব্ল্-কে ভারতের মানুষ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা জানিয়ে সাবধান করেছেন বারবার। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যদি মিস নোব্ল্ কর্মে প্রবৃত্ত হন, তবে স্বামীজি তাঁকে শতবার স্বাগত জানিয়েছেন। তবে স্বামীজি তাঁকে বারবার বলেছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা – ‘যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সবই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।’
মিস নোব্ল্ যাতে কর্মে সফল হন, সে কারণে তিনি মিসেস সেভিয়ারকে সহকর্মী হিসেবে নেওয়ার কথা বলেছেন। আবার পথের একঘেয়েমি যাতে দূর হয়, সেকারণে মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুলের সঙ্গে ভারতে আসার কথাও উল্লেখ করেছেন।
মিস মুলার ও মিসেস সেভিয়ারের পরিচয় দিয়ে তাদের সম্পর্কে বিবেকানন্দের যে মনোভাব ফুটে উঠেছে তা লেখো।
বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দ তাঁর ‘চিঠি’ রচনায় মিস মুলার ও মিসেস সেভিয়ারের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নরূপ –
মিস মুলার – মিস মুলারের সম্পূর্ণ নাম মিস হেনরিয়েটা মুলার। 1896 খ্রিস্টাব্দে স্বামীজি কিছুদিন তাঁর অতিথি ছিলেন। বেলুড় মঠ স্থাপনের কাজে তিনি অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
মিসেস সেভিয়ার – মিসেস সেভিয়ার ছিলেন ক্যাপ্টেন জে. এইচ. সেভিয়ারের স্ত্রী। স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত শিষ্যা ছিলেন তিনি। বেদান্ত প্রচারের কাজে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি স্বামীজির ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণায় ‘মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। রামকৃষ্ণ সংঘে তিনি ‘মাদার’ নামে পরিচিত ছিলেন। 1931 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে মিসেস সেভিয়ারের মৃত্যু হয়।
মনোভাব – মিস মুলারের প্রতি স্বামীজির শ্রদ্ধা থাকলেও তিনি বুঝেছেন মিস মুলার স্বভাবে চমৎকার মহিলা হলেও ছেলেবেলা থেকে একটি ধারণা তাঁর মাথায় এসেছে যে, টাকার দ্বারা তিনি দুনিয়াকে ওলট-পালট করে দিতে পারেন। তবে স্বামীজি তাঁর সহৃদয়তা ও অমায়িকতার পরিচয় পেয়েছেন কলকাতায় তাঁর বাড়ি ভাড়া নেওয়া প্রসঙ্গে। তবে তার সঙ্গে তিনি এও জানিয়ে দিয়েছেন –
‘কিন্তু তাঁর মঠাধ্যক্ষাসুলভ সংকল্পটি দুটি কারণে কখনও সফল হবে না-তাঁর রুক্ষ মেজাজ এবং অদ্ভুত অস্থিরচিত্ততা।’
মিসেস সেভিয়ার স্বামীজির চোখে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ।’ তিনি অমায়িক এবং স্নেহময়ী। সেভিয়ার দম্পতিই একমাত্র ইংরেজ, যারা এদেশীয়দের ঘৃণা করেন না। একমাত্র সেভিয়াররাই ভারতীয়দের ওপর মুরুব্বিয়ানা করতে এদেশে আসেননি, যদিও তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো কার্যপ্রণালী ছিল না। মিসেস সোভিয়ার সম্পর্কে স্বামীজির শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশিত হয়েছে পাঠ্য ‘চিঠি’ প্রবন্ধে।
“কল্যাণীয়া মিস নোব্ল্,” – মিস নোব্ল্ -এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। তাঁকে বিবেকানন্দ চিঠি লিখেছেন কেন?
জন্ম ও পরিচয় – ‘মিস নোব্ল্’ বলতে এখানে বিবেকানন্দের অন্যতম স্নেহধন্যা শিষ্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোব্ল্ -এর কথা বলা হয়েছে। 1867 খ্রিস্টাব্দের 28 অক্টোবর আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মিস নোব্ল্ পরবর্তীতে সিস্টার নিবেদিতা নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এই মহীয়সী নারী স্বামী বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণায় ভারতে আসেন এবং ভারতের সেবায়, স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে, স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। কলকাতার বাগবাজারে তিনি যে বালিকা বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন তা ‘নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। নিবেদিতা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশে আসেন এবং এদেশের নারীদের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। মিস নোব্ল্ বা নিবেদিতার লেখা দুটি বই ‘web of Indian Life’ ও ‘The Master as I saw him’। 1911 খ্রিস্টাব্দের 13 অক্টোবর মাত্র 44 বছর বয়সে এই মহীয়সী নারী দার্জিলিং-এ পরলোক গমন করেন।
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ইংরেজ ভক্তদের অন্যতম মিস্টার স্টার্ডির চিঠি থেকে জানতে পারেন তাঁর প্রিয় শিষ্যা নিবেদিতা ভারতে আসতে আগ্রহী এবং এদেশের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে দৃঢ় সংকল্প। স্বামীজির মনে হয়েছে তৎকালীন ভারতে যে সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ভারতীয় নারী জাতির যে দুরবস্থা সেই পরিস্থিতিতে মিস নোব্ল্ উন্নতি কর্মে একজন আদর্শ মহিলা।
প্রসঙ্গ ও চিঠি লেখার কারণ – স্বামীজী বুঝেছিলেন তাঁর সমকালের ভারতবর্ষের উন্নতি, প্রধানত ভারতীয় নারী সমাজের উন্নতির জন্য একজন ‘প্রকৃত সিংহী’-র প্রয়োজন। মিস নোব্ল্ -এর ঐকান্তিকতা, মনের পবিত্রতা, দৃঢ়তা, শিক্ষা, সর্বোপরি তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তাঁর ওপর স্বামীজির গভীর আস্থাবোধ জন্মেছিল। যদিও স্বামীজী জানতেন ভারতের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ মিস নোব্ল্ এর পক্ষে অনুকূল নয় তবু তাঁর পাশে আমরণ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভারতের মঙ্গলের জন্যই মিস নোব্লকে ‘শতবার স্বাগত’ জানিয়ে এই চিঠি লিখেছেন।
“স্টার্ডির একখানি চিঠি কাল পেয়েছি” – স্টার্ডি সম্পর্কে কী জান? তাঁর চিঠি থেকে বিবেকানন্দ কী জেনেছিলেন?
স্টার্ডির পরিচয় – স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘চিঠি’ রচনায় যে স্টার্ডির চিঠি পেয়েছেন, সেই স্টার্ডির পুরো নাম মি. ই টি স্টার্ডি। স্বামী বিবেকানন্দের একজন ইংরেজ ভক্ত ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে যখন ভারতে ছিলেন, তখন তিনি উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত শৈলশহর আলমোড়ায় তপস্যা করেন। ইংল্যান্ডে বেদান্ত প্রচারের কাজে তিনি স্বামীজিকে সাহায্য করেন। সেভিয়ার দম্পতির মতো স্টার্ডিও ছিলেন এমন ইংরেজ, যিনি এদেশীয়দের ঘৃণা করেননি। মি. স্টার্ডির কাছ থেকে একখানি পত্র পেয়ে বিবেকানন্দ সুখী হলেও তাঁর চিঠি ছিল ‘শুষ্ক এবং প্রাণহীন’। বিবেকানন্দ বলেছেন – “লন্ডনের কাজ পণ্ড হওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন বলে মনে হয়।”
তাঁর পত্র থেকে বিবেকানন্দ জেনেছেন তাঁর অন্যতমা ও অগ্রগণ্যা শিষ্যা মিস নোব্ল্ -এর ভারতে এসে সবকিছু চাক্ষুষ দেখার দৃঢ়সংকল্পের কথা।
“তোমার কর্মপ্রণালী সম্বন্ধে যা জানতে পারলাম, তাতে এ পত্রখানিও আবশ্যক হয়ে পড়েছে;” – এই পত্রটির আবশ্যকতা কোথায়, পাঠ্য ‘চিঠি’ অবলম্বনে তা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
পত্ররচনার কারণ – 1897 খ্রিস্টাব্দে বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দ উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত শৈলশহর আলমোড়া থেকে মিস নোব্ল্-কে মোট চারখানি পত্র লেখেন। আলোচ্য ‘চিঠি’ নামক পত্রটি (371 নং) চতুর্থ পত্র, যা 1897 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই লিখিত। 28 জুলাই, 1897 খ্রিস্টাব্দে বিবেকানন্দ স্টার্ডি নামে তাঁর একজন ইংরেজ ভক্তের কাছ থেকে প্রাপ্ত চিঠিতে মিস নোব্ল্ -এর ভারতে আসার অভিলাষ ও সংস্কারমূলক মানসিকতার পরিচয় পেয়েছেন, তা ছাড়া মিস মুলারের কাছ থেকে বিবেকানন্দ জেনেছেন মিস নোব্ল্ -এর কর্মপ্রণালীর কথা। তাই তিনি মিস নোব্ল্-কে পত্র লিখেছেন এবং তাঁর খোলাখুলি মনের কথা জানিয়েছেন – “তোমাকে খোলাখুলি বলছি, এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে।”
পত্ররচনার আবশ্যিকতা – ভারতবর্ষের স্বাধীনতালাভ করার পঞ্চাশ বছর পূর্বে লেখা পত্রটিতে একদিকে যেমন ‘স্বাধীনতা হীনতা’র কথা প্রকাশিত, তেমনি আছে নারীজাতির বন্দীত্বের তীব্র যন্ত্রণা। দেশ তখন কুসংস্কার, অশিক্ষা ও অজ্ঞতায় ধুঁকছে। ভারতীয়রা ইংরেজদের দাসত্ব করছে, নারীরা তখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। ভারতীয়রা ইংরেজদের ‘পাদুকাতলে’ লুটিয়ে পড়ে “ঘৃণায় মাখা অন্ন খুঁটি, ব্যগ্র হয়ে ভরিয়া মুঠি” বাড়ির পথে নির্লজ্জভাবে রওনা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীজি খুঁজেছেন সঠিক পথের দিশা। তিনি অবগত হয়েছেন মিস নোব্ল্ -এর শিক্ষাদীক্ষা, ঐকান্তিকতা, অসীম ভালোবাসা, পবিত্রতা ও দৃঢ়তা সম্পর্কে। তাই মিস নোব্ল্ -এর মতো ‘প্রকৃত সিংহী’কে তিনি পত্র লেখা আবশ্যক মনে করেছেন, বলেছেন – “তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
“সর্বোপরি তোমার ধমনিতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।” – কার সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে? তাঁর ধমনিতে প্রবাহিত ‘কেল্টিক রক্ত’ বলতে লেখক আসলে কী বুঝিয়েছেন? তাঁর সম্পর্কে লেখকের এই মন্তব্য সঠিক কি না সংক্ষেপে আলোচনা করো।
বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ নামক পত্রে অন্যতমা শিষ্যা মিস নোব্ল্ সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।
‘কেল্টিক রক্ত’-শব্দ প্রয়োগের তাৎপর্য – ইউরোপে একসময় কেল্টিক ভাষার বিস্তার ছিল ব্যাপক, কিন্তু পরে ইটালিক ও টিউটনিক শাখার ভাষার প্রসারে তা একান্তই সংকুচিত হয়ে আসে। এই শাখার প্রধান ও আধুনিক ভাষা হল আয়ারল্যান্ডের ভাষা আইরিস। মিস নোব্ল্ -এর জন্মস্থান আয়ারল্যান্ড, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ধমনিতে প্রবাহিত হয়েছে ‘কেল্টিক রক্ত’। আসলে ‘কেল্টিক রক্ত’ এখানে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
মন্তব্যের যথার্থতা বিচার – মানবপ্রেমিক বিবেকানন্দ তমসাচ্ছন্ন পরাধীন ভারতবর্ষকে আলোর দিশা প্রদানের জন্য বারবার চেষ্টা করে গেছেন। তিনি বুঝেছিলেন “ভারতের জন্য, বিশেষত ভারতের নারী সমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর – একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন।” বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে যেমন দস্যুসর্দার ভবানী পাঠক তাঁর আকাঙ্ক্ষিত দস্যুরানি খুঁজেছিলেন সর্বদা, তেমনি যেন বিবেকানন্দ বারবার অন্বেষণ করেছিলেন একজন ‘প্রকৃত সিংহী’র। তাই মি. স্টার্ডির চিঠিতে মিস নোব্ল্ -এর ভারতে আসার সংবাদ ও মিস মুলারের কাছে তাঁর কর্মপ্রণালী সম্পর্কে অবগত হয়ে তিনি তাঁকে ভারতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ তাঁর শিক্ষাদীক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা ও দৃঢ়তার পাশাপাশি তাঁর ধমনিতে যে কেল্টিক রক্ত প্রবাহিত, তার দ্বারা তিনি সফল হতে পারবেন বলে বিবেকানন্দের ধারণা। তাই তিনি জোর দিয়েই বলেছেন – “তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
‘তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।’ – কোন্ নারীর কথা এখানে বলা হয়েছে? তাঁকে আজ প্রয়োজন কেন?
অথবা, ‘তুমি ঠিক সেইরূপ নারী,’ – বক্তা কাকে এ কথা বলেছেন? তাঁর কোন্ কোন্ গুণ বক্তাকে প্রভাবিত করেছে?
চিন্তানায়ক বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ রচনার উদ্ধৃতাংশে যে নারীর কথা বলা হয়েছে, তিনি হলেন স্বামীজির শিষ্যাদের মধ্যে অন্যতমা মিস নোব্ল্, যিনি বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণায় এদেশে আসেন এবং ভারতের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন।
মিস নোব্লকে প্রয়োজন হওয়ার কারণ – স্বাধীনতা লাভের পঞ্চাশ বছর পূর্বের এই পত্রটিতে পরাধীন ভারতবর্ষের ‘স্বাধীনতাহীনতা’র কথা প্রকাশিত হয়েছে। কুসংস্কারগ্রস্ত ভারতবর্ষে নারীজাতি ছিল চরম অবজ্ঞার। কোনোভাবেই নারীদের স্বাধীনতা দেয়নি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তারা না পেয়েছে শিক্ষার আলো, না পেয়েছে মতবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা। বিবেকানন্দ তাই তাঁর পত্রে মিস নোব্ল্-কে উদ্দেশ করে বলেছেন – “ভারতের জন্য, বিশেষত ভারতের নারীসমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর – একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন।”
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ইংরেজ ভক্ত স্টার্ডির চিঠিতে মিস নোব্ল্ -এর ভারতের আসার অভিলাষের কথা জেনেছেন, সঙ্গে মিস মুলারের কাছে শুনেছেন তাঁর কর্মপ্রণালীর কথা। তাই তিনি মিস নোব্ল্-কে উদ্দেশ করে বলেছেন – “এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে।”
মিস নোব্ল্ -এর গুণাবলি – বিবেকানন্দ জেনেছেন মিস নোব্ল্ -এর শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, দৃঢ়তা, অসীম ভালোবাসা প্রভৃতির কথা। তাই ভারতবর্ষে অশিক্ষা, কুসংস্কার, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে তা থেকে সঠিক দিশা দেখানোর জন্যই বিবেকানন্দ মিস নোব্ল্ -এর মতো কেল্টিক রক্তধারী মহিলাকে স্বাগত জানিয়েছেন, বলেছেন – “তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
“কিন্তু বিঘ্নও আছে বহু।” – ‘কিন্তু’ শব্দপ্রয়োগের কারণ কী? বিঘ্নগুলি কী কী?
অথবা, স্বামী বিবেকানন্দ মিস্ নোব্লকে ভারতে আসার আগে ভারতবর্ষের কোন্ কোন্ সমস্যার কথা বলেছেন?
‘কিন্তু’ শব্দ প্রয়োগের কারণ – চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ তাঁর বিশ্বাস থেকে মিস নোব্ল্-কে খোলাখুলি জানিয়েছেন ভারতবর্ষের কাজে তাঁর এক বিরাট ভবিষ্যতের কথা। পরাধীন ভারতবর্ষকে দুর্দশামুক্ত করতে এবং নারীজাতিকে চরম অপমানের হাত থেকে রক্ষা করতে ‘প্রকৃত সিংহী’রূপী মিস নোব্ল্ -এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন বিবেকানন্দ। তাঁর দৃষ্টিতে মিস নোব্ল্ – “সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
কিন্তু প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও নানা বিঘ্ন রয়েছে। সেইকারণে ‘কিন্তু’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে।
বিঘ্নসমূহ – বিবেকানন্দ বুঝতে পেরেছেন, ভারতের কাজে মিস নোব্ল্ -এর বিরাট ভবিষ্যৎ থাকলেও বিঘ্ন আছে বহু। পরাধীন ভারতবর্ষের দুঃখ-বেদনা, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কী ধরনের, তা ধারণার বাইরে। মিস নোব্ল্ ভারতে এসে নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নরনারী পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পাবেন। ইংরেজ জাতি ও তাদের স্পর্শ সম্বন্ধে পরাধীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতবাসীর বিকট ধারণা, ভয় কিংবা ঘৃণা – যে কারণেই হোক, তারা শ্বেতাঙ্গদের এড়িয়ে চলে। তাই মিস নোব্ল্ যদি ভারতীয়দের জন্য কিছু করেন, তাহলে শ্বেতাঙ্গরা মিস নোব্ল্-কে খামখেয়ালি বলে মনে করবে এবং প্রত্যেকটি গতিবিধি সন্দেহের চোখে দেখবে। তা ছাড়া ভারতবর্ষের জলবায়ু গ্রীষ্মপ্রধান। শহরের বাইরে কোথাও ইউরোপীয় সুখস্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার উপায়ও নেই। স্বামী বিবেকানন্দ এইসব বিঘ্নের কথা মিস নোব্ল্-কে পত্রে জানানোর পর বলেছেন – “এসব সত্ত্বেও যদি তুমি কর্মে প্রবৃত্ত হতে সাহস কর, তবে অবশ্য তোমাকে শতবার স্বাগত জানাচ্ছি।”
“মরদ কি বাত হাতি কা দাঁত।” – সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো।
অথবা, “মরদ কি বাত হাতি কা দাঁত।” – বক্তা কে? কাকে কোন্ প্রসঙ্গে এই উক্তি করেছেন? উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
ভারতবাসীর জীবনযুদ্ধের চিরসারথি বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দের ‘পত্রাবলী’ পত্রসংকলন গ্রন্থের অন্তর্গত ‘চিঠি’ রচনায় আমরা আলোচ্য উপমামিশ্রিত বাক্যটির উল্লেখ পাই।
প্রসঙ্গ – ভারতের সমস্ত মানুষ যখন তামসিকতা ও জড়তায় পরিপূর্ণ, নারীজাতি যখন চরমভাবে অবহেলিত; তখন ভারতবর্ষের এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন বিবেকানন্দ। আহ্বান করেছেন অন্যতম শিষ্যা মিস নোব্লকে। ভারতের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি এবং প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি আমরণ মিস নোব্ল্ -এর পাশে থাকবেন। তাঁর এই প্রতিজ্ঞার যে কোনো নড়চড় হবে না কোনোদিন, তা বোঝাতেই এমন উপমামিশ্রিত বাক্যের আশ্রয় নিয়েছেন বিবেকানন্দ।
ব্যাখ্যা – “মরদ কি বাত হাতি কা দাঁত” – কথাটির অর্থ হল প্রকৃত পুরুষ মানুষের কথা আর হাতির দাঁত একবার বেরোলে আর ভিতরে যায় না। বিবেকানন্দ নিজেকে খাঁটি মানুষ মনে করেন, তাই তাঁর কথারও নড়চড় হবে না বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতবর্ষে শহরের বাইরে কোথাও ইউরোপীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নেই। তা সত্ত্বেও মিস নোব্ল্ ভারতের উন্নতিকল্পে নিজেকে নিয়োজিত করলে, স্বামীজি তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে কাজ করার আগে তিনি বিশেষভাবে চিন্তা করার কথা বলেছেন। কাজে যদি বিফল হন, কিংবা ভারতের জন্য কাজ করতে তিনি অসম্মতও হন, তবুও বিবেকানন্দ তাঁর পাশে আমরণ থাকবেন। তিনি যে কথা দিলেন, সে কথার কখনোই নড়চড় হবে না।
“আবার তোমাকে একটু সাবধান করা দরকার” – মানবপ্রেমিক বিবেকানন্দ কাকে, কীভাবে সাবধান করেছেন?
অথবা, “তোমাকে একটু সাবধান করা দরকার” – কে, কাকে, কী বলে সাবধান করেছেন?
মহান চিন্তানায়ক স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘চিঠি’ রচনায় একান্ত অনুগত শিষ্যা মিস নোব্লকে সাবধান করেছেন।
ভারতবর্ষে সম্ভাব্য বাধাবিঘ্ন – আলোচ্য পত্রের প্রথমাংশে বিবেকানন্দ ভারতের নারীসমাজের জন্য মিস নোবল্ -এর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বেশ কিছু প্রতিকূলতার কথাও বলেছেন। মিস নোব্ল্ -এর পরাধীন ভারতবর্ষের কাজের ক্ষেত্রে ভারতবাসীর কুসংস্কার যেমন বাধা দান করবে, তেমনি বাধা দান করবে ভারতের জলবায়ু। শহরের বাইরে কোথাও ইউরোপীয় সুখস্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার উপায় নেই, তবু বিবেকানন্দ তাঁকে সাহস যোগানোর জন্য বলেছেন – “এসব সত্ত্বেও যদি তুমি কর্মে প্রবৃত্ত হতে সাহস কর, তবে অবশ্য তোমাকে শতবার স্বাগত জানাচ্ছি।” তিনি আমরণ মিস নোব্ল্ -এর পাশে থাকবেন বলে প্রতিজ্ঞা করলেও মিস নোব্লকে সাবধান করে দিয়েছেন।
সাবধান বাণী – স্বামীজির লক্ষ্য মিস নোব্ল্-কে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, মিস মুলার বা অন্য কারোর আশ্রয় নিলে চলবে না। কারণ মিস মুলার স্বভাবে আজন্ম নেত্রী হলেও ছেলেবেলা থেকে একটি ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েছেন যে, দুনিয়ার সবকিছুকে ওলট-পালট করতে শুধু টাকার প্রয়োজন। স্বামীজি মিস নোব্লকে জানিয়েছেন – ‘দিন কয়েকের মধ্যেই তুমি বুঝতে পারবে যে, তাঁর সঙ্গে বনিয়ে চলা অসম্ভব।’ তবে মুলার সংকল্প করেছেন কলকাতায় একটি বাড়ি ভাড়া নেবেন তাঁর নিজের জন্য এবং মিস নোব্ল্ ও ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আগত অন্যান্য বন্ধুদের জন্য। কিন্তু তাঁর এই সংকল্প সফল হবে না দুটি কারণে – তাঁর রুক্ষ মেজাজ ও অস্থিরচিত্ততা। কারো কারো সঙ্গে তাই দূর থেকে বন্ধুত্ব করা ভালো। স্বামীজি মনে করেন – “যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সবই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।”
মিসেস বুল কোন্ সময়ে ভারতে এসেছিলেন? তাঁর সঙ্গে আর কে ছিলেন? মিসেস বুল সম্পর্কে কী জানো?
ভারতবর্ষের জীবনযুদ্ধের চিরসারথি বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ রচনায় বন্ধু মিসেস বুলের 1897 খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে ভারতে আসার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মিসেস বুলের সঙ্গে ছিলেন মিস ম্যাকলাউড, যিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্যদেশীয় প্রধান অনুরাগীর মধ্যে অন্যতম।
পরিচয় – মিসেস বুলের সম্পূর্ণ নাম সারা (Sarah) বুল। তিনি ছিলেন নরওয়েবাসী বিখ্যাত বেহালাবাদক মিঃ ওলি বুলের স্ত্রী এবং স্বামীজির শিষ্যা। অনেক চিঠিতে স্বামীজি তাঁকে ‘মা’ বা ‘ধীরামাতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি বেলুড় মঠ স্থাপনের কাজে স্বামীজিকে প্রচুর অর্থসাহায্য করেছিলেন। এ ছাড়া অন্যান্যভাবেও তিনি এ দেশে ও পাশ্চাত্যে স্বামীজিকে সাহায্য করেছিলেন।
‘এত ভালো, এত স্নেহময়ী তিনি’ – লেখক যার সম্পর্কে একথা বলেছেন, তাকে কোন্ অভিধায় ভূষিত করেছেন? তার সম্পর্কে লেখক আর যা যা বলেছেন, তা থেকে তাঁর কীরূপ মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় তা লেখো।
পরিচয় – মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোব্লকে লেখা ‘চিঠি’ পাঠ্যাংশ থেকে নেওয়া প্রদত্ত উদ্ধৃতিটি বিবেকানন্দ মিসেস সেভিয়ার সম্পর্কে করেছেন। তাঁকে বিবেকানন্দ ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’ অভিধায় ভূষিত করেছেন।
লেখকের মন্তব্য ও উক্ত ব্যক্তির মানসিকতা – স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা ছিলেন ইংরেজ ক্যাপ্টেন জে এইচ সেভিয়ারের স্ত্রী মিসেস সেভিয়ার। স্বামীজির অনুপ্রেরণায় এই দম্পতি বহু বছর ভারতে থেকে বেদান্ত প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। এই দম্পতি উত্তরাখণ্ডে ‘মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম গড়ে তোলেন। রামকৃষ্ণ সংঘে মিসেস সেভিয়ার ‘মাদার’ নামে পরিচিত ছিলেন। 1931 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে এই মহীয়সী নারী প্রয়াত হন। স্বাভাবিকভাবেই নিজের কর্ম ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মিসেস সেভিয়ার স্বামীজির প্রিয়তমা শিষ্যাদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন। স্বামী বিবেকানন্দ মিস্ নোব্লকে লেখা ‘চিঠি’তে এই মহিলা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছেন, মিসেস সেভিয়ার অত্যন্ত ভালো। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ইংরেজ হলেও ভারতীয়দের ঘৃণার চোখে দেখেন না। তাঁরা এদেশের মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে আসেননি। এসেছেন সেবার মনোভাব নিয়ে। আজীবন বেদান্ত প্রচারের কাজে নিবেদিত এই মহীয়সী নারীর প্রতি স্বামীজির মুগ্ধতা ও আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। যদিও স্বামীজী একথাও উল্লেখ করেছেন যে তাঁদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মপ্রণালী গড়ে ওঠেনি। তাই স্বামীজি মিস নোব্লকে ‘চিঠি’ তে লিখেছেন যে তিনি এদেশে এলে সেভিয়ার দম্পতি ও মিস নোব্ল্ উভয়েরই খুব সুবিধা হবে। স্নেহময়ী এই ইংরেজ ভক্ত মিসেস সেভিয়ারের প্রতি স্বামীজি যে খুবই আস্থাশীল ছিলেন ‘চিঠি’ পাঠ্যাংশে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি মনে করতেন মিসেস সেভিয়ার নারী সমাজের রত্ন। যিনি দেশকালের বেড়া ডিঙিয়ে এদেশে এসে স্নেহশীলা মাতৃময়ী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
“উভয়েরই সুবিধা হবে।” – ‘উভয়ের’ পরিচয় দাও। উভয়ের কীভাবে সুবিধা হবে?
চিন্তানায়ক বিবেকানন্দের ‘চিঠি’ রচনায় ‘উভয়’ বলতে সেভিয়ার দম্পতি ও মিস নোব্ল্ -এর কথা বলা হয়েছে।
পরিচয় – সেভিয়ার দম্পতি – সেভিয়ার দম্পতি হলেন ক্যাপ্টেন জে. এইচ. সেভিয়ার এবং তাঁর স্ত্রী মিসেস সেভিয়ার। স্বামীজির ইচ্ছায় বেদান্ত প্রচারের উদ্দেশ্যে সেভিয়ার দম্পতি ‘মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। রামকৃষ্ণ সংঘে মিসেস সেভিয়ার ‘মাদার’ নামে পরিচিত ছিলেন। 1931 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে মিসেস সেভিয়ারের মৃত্যু হয় আর 1903 খ্রিস্টাব্দে মায়াবতীতে ক্যাপ্টেন সেভিয়ারের মৃত্যু হয়।
মিস নোব্ল্ – মিস মুলারের সম্পূর্ণ নাম মিস হেনরিয়েটা মুলার। 1896 খ্রিস্টাব্দে স্বামীজি কিছুদিন তাঁর অতিথি ছিলেন। বেলুড় মঠ স্থাপনের কাজে তিনি অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা – মিসেস সেভিয়ার এত ভালো এবং এত স্নেহময়ী যে, স্বামীজি তাঁকে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’ বলেছেন। সেভিয়ার দম্পতি ছিলেন একমাত্র ইংরেজ, যাঁরা এদেশীয়দের ঘৃণা করেননি। তাঁরা এদেশে মুরুব্বিয়ানা করতে আসেননি। নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী না থাকলেও মিস নোব্ল্ তাঁদের সহকর্মী হিসেবে পেতে পারেন। ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের উন্নতি যেহেতু উভয়েরই লক্ষ্য, এতে উভয়ের সুবিধা হবে ভারতের জন্য কাজ করতে।
এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কী ধরনের, তা তুমি ধারণা করতে পারো না। — স্বামীজির এই উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর স্বদেশপ্রীতির কী পরিচয় পাও?
স্বামীজির স্বদেশপ্রীতি – মিস নোব্লকে লেখা পাঠ্য চিঠিতে স্বামী বিবেকানন্দ প্রশ্নোদ্ধৃত “এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কী ধরনের, তা তুমি ধারণা করতে পারো না।” কথাগুলি জানিয়েছিলেন। মানবসেবায় আত্মনিয়োগ – মিস নোব্ল ভারতে মানবসেবার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা, মি. স্টার্ডির চিঠিতে সে-কথা জানতে পেরেই স্বামীজি এদেশের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে মিস নোব্লকে আগাম ধারণা দিতে এই কথাগুলি লিখেছেন। দেশকে সংকীর্ণতা ও দাসত্বের শৃঙ্খলমুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা – উনিশ শতকের শেষ দশকের ভারত ছিল শ্বেতাঙ্গ ইংরেজদের কুশাসনে জর্জরিত। অজ্ঞতা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, নারীজাতির প্রতি অসম্মান সব মিলিয়ে ভারতীয় সমাজজীবন ছিল চরম দুর্দশাগ্রস্ত। স্বামীজি সমস্ত রকমের সংকীর্ণতা ও দাসত্ব থেকে ভারতবাসীকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারেন মিস নোব্ল। চিঠিতে তিনি নোব্লকে বলেছেন, “এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে।” শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে দেশের উন্নতিসাধন – অস্পৃশ্যতা, জাতি-বর্ণভেদ আর কুসংস্কার ভারতবাসীকে বিচ্ছিন্ন, বিভাজিত করে রেখেছে। মিস নোব্লের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় নারীসমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত ও আত্মনির্ভর করে তুলতে চেয়েছেন। এইভাবে পাঠ্য চিঠিতে স্বামীজির গভীর স্বদেশপ্রীতি ব্যক্ত হয়েছে।
“এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে।” — তুমি কে? বক্তা এমন কথা বলেছেন কেন? এই প্রসঙ্গে বক্তার সমাজভাবনার পরিচয় দাও।
তুমি-র পরিচয় – স্বামী বিবেকানন্দ রচিত পাঠ্য চিঠিতে ‘তুমি’ বলতে মিস মার্গারেট নোব্লকে বোঝানো হয়েছে। বক্তার এমন মন্তব্যের কারণ – উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি মি. স্টার্ডির চিঠি পেয়ে জেনেছেন যে, মিস নোব্ল ভারতে আসতে এবং সব কিছু নিজের চোখে দেখতে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। মিস মুলারের চিঠিতে তিনি নোব্লের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জেনেছেন। কিন্তু ভারতের পরিস্থিতি ইউরোপের মতো নয়। এখানে মানুষেরা দুঃখ-দারিদ্র্যে জীবন কাটায়। অভাবগ্রস্ত অর্ধনগ্ন দুঃখী মানুষগুলির মধ্যে মিস নোব্লকে কাজ করতে হবে। তার জন্য তিনি মানসিকভাবে যথেষ্ট প্রস্তুত কি না, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতেই এবং এদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে ধারণা দিতেই স্বামীজি এ কথা বলেছেন। বক্তার সমাজভাবনা – আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে বক্তা স্বামীজির গভীর সমাজভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি দারিদ্র্যপীড়িত ভারতবর্ষকে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছেন। এদেশের মানুষের শিরায় শিরায় রয়েছে কুসংস্কার। তারা অন্নবস্ত্রের অভাবে, জাতি-বর্ণভেদ, অস্পৃশ্যতায়, ইংরেজদের কুশাসনে আর ঘৃণায় জর্জরিত। ভয়ে বা ঘৃণায় তারা শ্বেতাঙ্গদের এড়িয়ে চলে। নারীসমাজ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। অশিক্ষা-অজ্ঞতা আর পরাধীনতায় বন্দি এদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন স্বামীজি। আর সেই স্বপ্নকে সফল করতে মিস নোব্লের মতো সেবাপরায়ণা, শিক্ষিতা, দৃঢ়চেতা নারীর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন স্বামীজি।
“শ্বেতাঙ্গেরা তোমাকে খামখেয়ালি মনে করবে এবং প্রত্যেকটি গতিবিধি সন্দেহের চক্ষে দেখবে।” — মিস নোব্লকে স্বামীজির এমন সতর্কবার্তা পাঠানোর কারণ কী? কেন শ্বেতাঙ্গরা তাঁকে খামখেয়ালি মনে করবে এবং তাঁর প্রত্যেকটি গতিবিধি সন্দেহের চোখে দেখবে বলে তিনি মনে করেন?
মিস নোব্লকে স্বামীজির সতর্কবার্তা পাঠানোর কারণ – 1897 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই মিস নোব্লকে লেখা চিঠিতে স্বামীজি উল্লিখিত “শ্বেতাঙ্গেরা তোমাকে খামখেয়ালি মনে করবে এবং প্রত্যেকটি গতিবিধি সন্দেহের চক্ষে দেখবে।” সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন। কারণ তিনি মিস্টার স্টার্ডির চিঠি থেকে জেনেছেন, মিস নোব্ল ভারতবর্ষে আসতে এবং এদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি এদেশে আসার আগে স্বামীজি তাঁকে এদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চেয়েছেন। সে কারণেই সরাসরি তাঁকে চিঠি লিখে স্বামীজি ভারতীয়দের অবস্থার কথা খোলাখুলি জানিয়েছেন। স্বামীজির ধারণা – জাতি ও স্পর্শ সম্পর্কে কুসংস্কারের কারণেই ভারতীয়রা শ্বেতাঙ্গদের ভয় কিংবা ঘৃণার চোখে দেখে থাকে এবং একইভাবে শ্বেতাঙ্গরাও ভারতীয়দের অত্যন্ত ঘৃণা করে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের উন্নতির জন্য মিস নোব্ল কাজ করলে তাঁর প্রত্যেকটি গতিবিধি শ্বেতাঙ্গদের কাছে সন্দেহজনক হয়ে উঠবে বলে স্বামীজি মনে করেন। একজন শ্বেতাঙ্গ নারী হয়ে কেন মিস নোব্ল এদেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন, তা যেমন একদিকে শ্বেতাঙ্গদের মনে সন্দেহের জন্ম দেবে, অন্যদিকে তাঁরা মিস নোব্লকে খামখেয়ালি মনে করবেন।
“কর্মে ঝাঁপ দেবার পূর্বে বিশেষভাবে চিন্তা করো” – কে, কোন্ কর্মে ঝাঁপ দিতে চান? ঝাঁপ দেবার পূর্বে কেন বিশেষভাবে চিন্তা করা দরকার?
কর্মে ঝাঁপ দেওয়া – মিস নোব্ল ইংল্যান্ড থেকে ভারতে এসে জনসেবামূলক কাজে, বিশেষত পিছিয়ে থাকা ভারতীয় নারীসমাজের উন্নতির কর্মে ঝাঁপ দিতে চান। বিশেষভাবে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা – প্রেক্ষাপট – মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করা সহজ কথা নয়। মিস নোব্লের বয়স অল্প বলে তাঁর মধ্যে আবেগ-উচ্ছ্বাস বেশি থাকা স্বাভাবিক। ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই। তাই বৃহত্তর ও মহত্তর কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে স্বামীজি তাঁকে বিশেষভাবে চিন্তা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের মানুষের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব – এদেশে এসে মানবসেবার কাজে যোগ দেওয়ার পূর্বে মিস নোব্লকে এদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা দিতে চেয়েছেন স্বামীজি। এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কী ধরনের, সে সম্পর্কে বিবরণ দিয়েছেন স্বামীজি। তিনি জানিয়েছেন, “এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে।” শ্বেতাঙ্গদের দৃষ্টিভঙ্গি – ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা প্রবল। এদেশীয়রা শ্বেতাঙ্গদের ভয়ে বা ঘৃণার কারণে এড়িয়ে চলে। শ্বেতাঙ্গরাও ভারতীয়দের ঘৃণা করে। শাসক ইংরেজরা মিস নোব্লকে খামখেয়ালি মনে করবে, তাঁর প্রতিটি কাজকে তারা সন্দেহের চোখে দেখবে। জলবায়ুর বিরূপতা – ভারতবর্ষ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। এদেশের জলবায়ু ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এইসব বিপত্তি অতিক্রম করার মানসিক শক্তি অর্জনের জন্যই কাজে নামার আগে বিশেষভাবে চিন্তার প্রয়োজন আছে বলে স্বামীজি মিস নোব্লকে পরামর্শ দিয়েছেন।
“কিন্তু বিঘ্নও আছে বহু।” — স্বামীজি কোন্ কোন্ বিঘ্নের কথা বলেছেন আলোচনা করো।
প্রেক্ষাপট – স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিঠি রচনায় মিস নোব্লকে ভারতে আগমনের আগে কিছু নির্দেশ ও পরামর্শ দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। নোব্লের ভারতে আগমন যে এদেশের জনসমাজ, বিশেষত নারীসমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় — সেই মতামত তিনি জানিয়েছেন। তাঁর ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, ভালোবাসা এবং দৃঢ়তা যে এ দেশের মানুষের অত্যন্ত প্রয়োজন, তা দ্বিধাহীনভাবে বিবেকানন্দ বলেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে বিবেকানন্দ মিস নোব্লকে “কিন্তু বিঘ্নও আছে বহু।” বলে কিছু বিষয়ে সতর্কও করে দিয়েছেন। ভারতীয় সমাজের সীমাবদ্ধতা – এদেশের মানুষের দুঃখ, কুসংস্কার ও দাসত্বের মনোভাব নোব্লের ধারণার অতীত। এদেশের মানুষের জাতি এবং স্পর্শ সম্বন্ধেও নোব্লের স্বচ্ছ ধারণা নেই। শ্বেতাঙ্গদের বিরূপতা – ভয় কিংবা ঘৃণা — যে-কোনো কারণেই হোক, তারা শ্বেতাঙ্গদের এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গরা নোব্লকে খামখেয়ালি মনে করতে পারে বা তাঁর গতিবিধিকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। জলবায়ু ও অন্যান্য প্রতিকূলতা – এ দেশের গ্রীষ্মপ্রধান জলবায়ুও তাঁর পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া শহরের বাইরে ইউরোপীয় সুখস্বাচ্ছন্দ্য এখানে কোথাও নেই। এইসব বিঘ্নকে মাথায় রেখেই বিবেকানন্দ মিস নোব্লকে ভারতে আসার কথা বলেছেন।
“তোমাকে একটু সাবধান করা দরকার” – কাকে, কেন সাবধান করা দরকার? কী বিষয়ে সাবধান করা দরকার?
সাবধান করার প্রয়োজনীয়তা – মিস নোব্ল ভারতবর্ষে এসে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে “তোমাকে একটু সাবধান করা দরকার” বলে কিছু বিষয়ে সাবধান করা দরকার বলে মনে করেছেন। এর কারণ হল, ভারতে এসে যে বৃহৎ কর্মযজ্ঞে মিস নোব্ল নামতে চলেছেন, তাতে তাঁকে অবশ্যই স্বনির্ভর হতে হবে। মিস মুলারের মতো কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে মার্গারেটের জনসেবার কাজটি বিঘ্নিত হবে। প্রধানত এ বিষয়েই স্বামীজি মিস নোব্লকে সাবধান করেছিলেন। সাবধান করার বিষয় – ভারতের জন্য, বিশেষত ভারতীয় নারীসমাজের উন্নতির জন্য মিস নোব্লকে অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, অন্যের ওপর নির্ভর করা চলবে না বলে স্বামীজি পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে মিস মুলার বা অন্য কারও ছত্রছায়ায় আশ্রয় না নিয়ে মিস নোব্লকে আত্মনির্ভর হতে হবে। “যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সবই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।” বলে স্বামীজি তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। মিস মুলার ভালো মহিলা হলেও পৃথিবীকে বদলে দিতে একমাত্র টাকারই প্রয়োজন আছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী বলে মনে করেন। তাঁর মেজাজ রুক্ষ, চিত্ত অস্থির। তাই তাঁর সঙ্গে মিস নোব্ল বেশিদিন মানিয়ে চলতে পারবেন না। এইসব বিষয়েই স্বামীজি মিস নোব্লকে সাবধান করে দিতে চেয়েছেন।
“যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সবই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।” — প্রসঙ্গ উল্লেখ করো এবং উক্তিটির তাৎপর্য লেখো।
প্রসঙ্গ – স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিঠি রচনায় মিস নোব্লের ভারতে আগমনের পূর্বে তাঁর জন্য একটি নির্দেশিকা তৈরি করে দিতে চেয়েছেন। সেখানে এদেশের জনসমাজ, আবহাওয়া ইত্যাদির প্রতিকূলতার কথা তিনি যেমন বলেছেন, তেমনই শ্বেতাঙ্গদের বিরূপতার বিষয়েও সাবধান করে দিয়েছেন। বিশেষ কিছু ব্যক্তিত্ব বিষয়ে নোব্লকে সতর্ক থাকার কথাও বলেছেন বিবেকানন্দ। এক্ষেত্রে আত্মশক্তি এবং আত্মনির্ভরতাই যে সাফল্যের একমাত্র পথ, তা উল্লেখ করতে গিয়ে বিবেকানন্দ “যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সবই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।” মন্তব্যটি করেছেন। তাৎপর্য – আত্মনির্ভরতা – বিবেকানন্দ নোব্লকে সাবধান করে দিয়ে বলেছেন যে, মিস মুলার বা অন্য কারও কাছে আশ্রয় নিলে বা তাদের কথামতো চললে তাঁর কর্মপন্থা পণ্ড হয়ে যেতে পারে। তাই নোব্লকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। মিস মুলার বিষয়ে সতর্কতা – মিস মুলারের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে গিয়ে বিবেকানন্দ বলেছেন যে, ছেলেবেলা থেকেই তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী ভাবেন আর মনে করেন যে, দুনিয়াকে ওলট-পালট করে দিতে টাকা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। কলকাতায় তিনি একটি বাড়ি ভাড়া নিতে চেয়েছেন মিস নোব্ল, বিদেশ থেকে আসা অন্যান্য বন্ধুরা এবং তাঁর নিজের জন্য। কিন্তু তাঁর রুক্ষ মেজাজ এবং অদ্ভুত অস্থির চিত্ততার কারণে কোনো সংকল্পই সফল হবে না। সিদ্ধান্ত – তাই বিবেকানন্দ বলেছেন যে, কারও কারও সঙ্গে দূর থেকে বন্ধুত্ব করাই ভালো। আত্মনির্ভরতা থাকলে জীবনে সাফল্য নিশ্চিত হয়। অন্যের ওপর নির্ভরতা সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
“মিসেস সেভিয়ার নারীকুলের রত্নবিশেষ” – এই উক্তির আলোকে নারীজাতির প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দাও।
মিসেস সেভিয়ার সম্পর্কে শ্রদ্ধা – স্বামী বিবেকানন্দ মিস নোব্লকে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে উল্লেখ করেছেন যে, “মিসেস সেভিয়ার নারীকুলের রত্নবিশেষ” – তিনি অত্যন্ত ভালো মহিলা এবং স্নেহময়ী। তিনি ও তাঁর স্বামী ইংরেজ হলেও অন্য ইংরেজদের মতো ভারতীয়দের ঘৃণার চোখে দেখেন না। তাঁরা এদেশের মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে আসেননি। অন্যান্যদের সম্পর্কে মনোভাব – স্বামীজি তাঁর চিঠিতে মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুলের কথাও অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, মিস মুলারের নেতিবাচক গুণাবলি থাকলেও তাঁকে তাঁর নিজের ভাবে চমৎকার মহিলা বলেছেন স্বামীজি। বিদেশ থেকে আগত বন্ধুদের আশ্রয়ের জন্য মিস মুলার যে কলকাতায় একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, সেটি তাঁর সহৃদয়তা ও অমায়িকতার পরিচায়ক বলে স্বামীজি স্বীকার করেছেন। মিস নোব্ল-এর প্রতি মনোভাব – আলোচ্য চিঠির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ব্যক্ত হয়েছে মিস নোব্লের প্রতি স্বামীজির স্নেহ ও সুপরামর্শ। তিনি ভারতীয় নারীজাতির উন্নতির জন্য, শিক্ষা ও সম্মানের জন্য যে গভীরভাবে চিন্তা করেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মিস নোব্লকে এদেশে আহ্বানের মধ্য দিয়ে। তিনি মনে করেন, ভারতের জন্য, বিশেষত এদেশের ভারতের নারীসমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর – একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন। মিস নোব্ল ঠিক সেই রকমের নারী। কেবল বিদেশিনিদের নয়, স্বদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নারীকুলের প্রতি ছিল স্বামীজির একইরকম উদার দৃষ্টিভঙ্গি।
“এত ভালো, এত স্নেহময়ী তিনি।” — যাঁর সম্বন্ধে এই উক্তি লেখক তাঁকে কোন্ অভিধায় ভূষিত করেছেন? তাঁর সম্পর্কে লেখক আর যা যা বলেছেন তা থেকে লেখকের মানসিকতার কী পরিচয় পাও?
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর প্রাপ্ত অভিধা – মিস নোব্লকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের চিঠি পাঠ্যাংশ থেকে উদ্ধৃত “এত ভালো, এত স্নেহময়ী তিনি।” উক্তিটিতে উল্লিখিত ‘তিনি’ হলেন মিসেস সেভিয়ার। লেখক স্বামী বিবেকানন্দ মিসেস সেভিয়ারকে “নারীকুলের রত্নবিশেষ” অভিধায় ভূষিত করেছেন। উদ্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে লেখকের মানসিকতা – তাঁর সম্পর্কে লেখক আরও বলেছেন যে, মিসেস সেভিয়ার ও তাঁর স্বামী ইংরেজ হয়েও অন্য শ্বেতাঙ্গদের মতো ভারতীয়দের ঘৃণা করেন না এবং তাঁরা এদেশের মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে আসেননি। তাঁরা সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করতে চান। যদিও তাঁদের এখনও নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী নেই, মিস নোব্ল এখানে এসে সেভিয়ারদের সহকর্মীরূপে পেলে উভয়েরই কাজের সুবিধা হবে। এইসব কথা থেকে নারীজাতির প্রতি তাঁর সম্মানবোধ, ভদ্রতা, বিনয় ও উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়।
“যাঁরা এদেশীয়দের ঘৃণা করেন না” — যাঁরা কারা? তাদের সম্পর্কে যা জান লেখো।
যাঁরা-র পরিচয় – স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিঠি রচনার উল্লিখিত অংশে “যাঁরা এদেশীয়দের ঘৃণা করেন না” বলতে সেভিয়ার দম্পতির কথা বলেছেন। তাদের পরিচয় – মিস নোব্লের ভারতে আসার আগে বিবেকানন্দ অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তাঁকে এদেশে আগত ইউরোপীয় বা অন্য বিদেশি যাঁরা ভারতের জন্য কাজে উদ্যোগী, তাঁদের সম্পর্কেও ধারণা দিতে চেয়েছেন। সেখানে মিস মুলারের মতো নিজেকে আজন্ম নেত্রী ভাবা এবং বদমেজাজি মানুষের পাশাপাশিই উল্লেখ করেছেন মিসেস সেভিয়ারের কথা। বিবেকানন্দের কাছে তিনি হলেন “নারীকুলের রত্নবিশেষ”। মিসেস সেভিয়ার এবং তাঁর স্বামী ক্যাপটেন জে. এইচ. সেভিয়ার বেদান্ত প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং স্বামীজির ইচ্ছাতেই তাঁরা মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ইউরোপীয় হওয়া সত্ত্বেও এদেশের মানুষদের প্রতি তাঁদের কোনো ঘৃণার ভাব ছিল না। এদেশের মানুষদের ওপর প্রভুত্ব করার কোনো চেষ্টাও তাঁরা করতেন না। তবে সেভিয়ার দম্পতির যে কোনো নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী নেই, বিবেকানন্দ তা-ও বলেছেন। তবুও সহকর্মী হিসেবে তাঁরাই বেশি গ্রহণযোগ্য হবেন বলে বিবেকানন্দ নোব্লকে মত দিয়েছেন।
পত্রসাহিত্য বলতে কী বোঝ? পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধকে, কী পত্রসাহিত্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায়? যুক্তিসহ লেখো।
পত্রসাহিত্য – ব্যক্তিগত বা সাধারণ খবরাখবর, তথ্য ইত্যাদির গণ্ডি পেরিয়ে চিঠিপ্রবন্ধে যখন সমাজ, প্রকৃতি, কল্পনা ইত্যাদি প্রাধান্য পায় এবং তা সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখন তা পত্রসাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হয়। চিঠিপ্রবন্ধের বিষয় যখন ব্যক্তিগত ভাবনা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চিরন্তন সত্যকেও প্রকাশ করে, তখন তা সাহিত্য হয়ে ওঠে।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধের পত্রসাহিত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা – স্বামী বিবেকানন্দের বেশ কিছু চিঠিপ্রবন্ধ সৃজনশীলতার গুণে সাহিত্য হয়ে উঠেছে। আলোচ্য চিঠিপ্রবন্ধটি এমনই একটি দৃষ্টান্ত।
এখানে ব্যক্তিগত তথ্যের চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে লেখকের সমাজভাবনা এবং স্বদেশপ্রীতি। সাহিত্য সমাজের ও মানুষের কথা বলে। স্বামীজি তৎকালীন ভারতের মানুষের দুর্দশা ও নারীসমাজের লাঞ্ছনায় পীড়িত ছিলেন। তাই তিনি মিস নোবলকে লেখেন, “এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কী ধরনের, তা তুমি ধারণা করতে পারো না।” দারিদ্র্য, অস্পৃশ্যতা, জাতিবর্ণের বৈষম্য, শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ শাসকদের অত্যাচার ইত্যাদি থেকে ভারতবাসীর মুক্তির পথ খুঁজেছেন স্বামীজি। বিশেষত ভারতের নারীসমাজের উন্নতির জন্য মিস নোবলের মতো দৃঢ়চেতা, পবিত্র নারীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মঙ্গল তথা মানবতার মুক্তিই যে তাঁর কাম্য, তা ফুটে উঠেছে পাঠ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’–তে। তাই এ চিঠিপ্রবন্ধের বিষয়বস্তুর সর্বজনীনতা ও সমাজভাবনার কারণে সাহিত্যের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধ – কে ব্যক্তিগত পত্র না সামাজিক পত্র — কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায়?
পত্রের ধরন – বিষয়বস্তু অনুসারে চিঠিপ্রবন্ধকে নানা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি ভাগ হল ব্যক্তিগত পত্র ও সামাজিক পত্র। পাঠ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টি একজন ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দ মিস নোবলের উদ্দেশ্যে লিখেছেন। সেদিক থেকে এই চিঠিপ্রবন্ধকে ব্যক্তিগত পত্র বলাই যায়। কিন্তু সব চিঠিপ্রবন্ধই ব্যক্তির সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পর্কিত। তবে স্বামীজির এই চিঠিপ্রবন্ধটি ব্যক্তিগত স্তর অতিক্রম করে সামাজিক স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, কারণ এই চিঠিতে উনিশ শতকীয় ভারত ও তার দুর্দশাময় সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে। মানবসেবার বৃহত্তর স্বার্থে এ চিঠিপ্রবন্ধ লিখিত, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়। ভারতীয় সমাজে মানবসেবার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে মিস নোবল এদেশে আসতে চান। এ কথা জেনে স্বামীজি তাঁকে এদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতটি বোঝানোর জন্য এ চিঠিপ্রবন্ধ লিখেছেন। ভারতীয়দের দাসত্ব, দুঃখদারিদ্র্য, কুসংস্কার, বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতার কথা স্বামীজি মিস নোবলকে জানিয়েছেন। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি ভারতবাসীর মনোভাব, এখানকার আবহাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কেও আগাম ধারণা দিতে চেয়েছেন তিনি। এ চিঠিপ্রবন্ধে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা নেই, আছে ভারতীয়দের দুঃখ এবং দুঃখ থেকে মুক্তির পথ সন্ধানের প্রসঙ্গ। তাই আলোচ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’কে সামাজিক পত্ররূপে গ্রহণ করাই যথাযথ।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধটিকে উনিশ শতকের ভারতের একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দলিলরূপে গ্রহণ করা যায় কি না আলোচনা করো।
অথবা, বিবেকানন্দের চিঠিপ্রবন্ধটি উনিশ শতকে ভারতের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের এক ঐতিহাসিক ভাষ্য। — আলোচনা করো।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব – পাঠ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’র লেখক স্বামী বিবেকানন্দ এবং প্রাপক মিস নোবল—উভয়েই ঐতিহাসিক ব্যক্তি। দুজনেই ভারতের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছিলেন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাসে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। অন্যদিকে, উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতবাসীর জীবনযাত্রা, মানুষের বিশ্বাস-ধারণা, দুঃখ-বেদনা ইত্যাদির উল্লেখে একটি বিশেষ সময়ের পরিচয় আলোচ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’ থেকে পাওয়া যায়। তাই ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টিকে একটি ঐতিহাসিক দলিলরূপে গ্রহণ করা যায়।
অপরদিকে, যে দুর্দশাগ্রস্ত ভারতে মানবসেবার ব্রত নিয়ে মিস নোবল আসতে চান, তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতটি এই চিঠিপ্রবন্ধে বর্ণিত হয়েছে। চিঠিপ্রবন্ধটিতে স্বামীজি নোবলকে জানিয়েছেন, “এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতির শিকড় অনেক গভীরে গাঁথা।” জাতি-বর্ণের বৈষম্য, অস্পৃশ্যতা ভারতীয় জনজীবনের অভিশাপ। অন্নবস্ত্রের অভাবে এদেশের অসংখ্য নরনারী অর্ধভুক্ত, অর্ধউলঙ্গ। নারীদের শিক্ষার সুযোগ নেই। তার ওপর রয়েছে ইংরেজ শাসকদের শোষণ-অত্যাচার। ভারতীয়রা শ্বেতাঙ্গদের ভয় এবং ঘৃণা করে। শ্বেতাঙ্গরাও ঘৃণার চোখে দেখে এদেশের মানুষকে। এমনই এক সমাজে মিস নোবলকে মানবসেবার কাজ করতে হবে। সুতরাং আলোচ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টিকে উনিশ শতকীয় ভারতের একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দলিলরূপে চিহ্নিত করাই যায়।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধটিতে স্বামী বিবেকানন্দের চরিত্রের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
স্বামী বিবেকানন্দের লেখা পাঠ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টিতে তাঁর চরিত্রের নানা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
দূরদর্শিতা – মিস নোবল যে ভারতের, বিশেষত ভারতীয় নারীসমাজের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবেন, তা স্বামীজি বুঝেছিলেন। এবং এই কারণে তাঁকে ভারতে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিচক্ষণতা – ভারতের জলবায়ু, সমাজকেন্দ্রিক নানা সমস্যা যে ইংল্যান্ডের থেকে আলাদা এবং নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে মিস নোবলকে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে তাঁকে স্বামীজি আগে থেকে সচেতন করেছেন। পরোক্ষে কর্মে ঝাঁপ দেওয়ার আগে মানসিকভাবে দৃঢ় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্নেহশীলতা ও উদারতা – ভারতের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে মিস নোবল স্বামীজির সাহায্য পাবেন এবং এদেশের জন্য কাজ না করলেও বা বেদান্ত ধর্ম ত্যাগ করলেও সারাজীবন তিনি নোবলের পাশে থাকবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন။
নারীজাতির প্রতি সম্মান – নিপীড়িত ভারতীয় নারীদের শিক্ষা ও উন্নতির চিন্তা, মিস মুলারকে ‘চমৎকার মহিলা’ বলা এবং মিসেস সেভিয়ারকে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’ বলে অভিহিত করার মধ্যে নারীজাতির প্রতি স্বামীজির সম্মানবোধ প্রকাশ পায়।
সমাজচেতনা ও স্বদেশপ্রীতি – প্রখরভাবে সমাজসচেতন স্বামীজি এদেশের সামাজিক ব্যাধিগুলি সম্পর্কে বিচলিত হয়েছেন। ইংরেজ কুশাসনের পাশাপাশি দুঃখদারিদ্র্য, কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি থেকে তিনি ভারতবাসীকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধ অবলম্বনে স্বামী বিবেকানন্দের বিচক্ষণতা ও উদারতার পরিচয় দাও।
মিস নোবলকে সতর্ক করে দেওয়া – মিস্টার স্টার্ডির চিঠি থেকে স্বামী বিবেকানন্দ যখন জেনেছেন মিস নোবল ভারতে আসতে এবং এদেশের জন্য কাজ করতে দৃঢ়সংকল্প, তখন তিনি তাঁকে প্রয়োজনীয় কতকগুলো তথ্য ও উপদেশ দিয়েছেন। ইউরোপ বা আমেরিকার পরিবেশের তুলনায় ভারতের সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা; তাই সরাসরি মিস নোবলকে চিঠিপ্রবন্ধটি লিখে স্বামীজি তাঁকে এদেশের মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক সমস্যা, বাধাবিঘ্ন আর জলবায়ু সম্পর্কে সচেতন করেছেন এবং ‘নিজের পায়ে দাঁড়াবার’ পরামর্শ দিয়েছেন। এতে স্বামীজির বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়।
উদারতা ও সহমর্মিতা – অন্যদিকে, স্বামীজির উদারতা প্রকাশ পায় যখন তিনি মিস নোবলকে লেখেন যে, মিস নোবল ভারতবর্ষের জন্য কাজ করুন বা না করুন এবং বেদান্ত ধর্ম গ্রহণ করুন বা ত্যাগ করুন, স্বামীজি তাঁকে আজীবন সাহায্য করে যাবেন। আবার, মিস মুলারের স্বভাবের কিছু ত্রুটির কথা জেনেও স্বামীজি তাঁর সহৃদয়তার প্রশংসা করেছেন। মিসেস সেভিয়ারকে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’, ‘ভালো’, ‘স্নেহময়ী’ বলে উল্লেখ করে তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি নোবলকে পরামর্শ দিয়েছেন। দীর্ঘ যাত্রাপথের একঘেয়েমি দূর করার জন্য স্বামীজি মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুলের সহযাত্রী হয়ে নোবলকে ভারতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব ভাবনা ও সুপরামর্শের মধ্য দিয়ে স্বামীজির উদারতার পরিচয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধটি স্বামী বিবেকানন্দ কত সাল-তারিখে কোথা থেকে কার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন? এই চিঠিপ্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিত কী ছিল?
উদ্দিষ্ট স্থান ও ব্যক্তি – পাঠ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টি স্বামী বিবেকানন্দ 1897 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই ভারতবর্ষের আলমোড়া থেকে মিস নোবলের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন।
চিঠিপ্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিত – মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল ছিলেন স্বামীজির শিষ্যাদের মধ্যে অগ্রগণ্যা। স্বামীজির অনুপ্রেরণায় তিনি ভারতে এসেছিলেন এবং এদেশের মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ভারতের নারীসমাজের কল্যাণে, স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে, স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 1895 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে লন্ডনে স্বামীজির বক্তৃতা শুনে অনুপ্রাণিত হন মিস নোবল। এরপর স্বামীজির অন্যান্য বক্তৃতা শুনে, তাঁর কর্মধারা ও স্বদেশের নারীদের কল্যাণের সংকল্পের কথা জেনে মিস নোবল ভারতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই স্বামীজি তাঁকে জানান, “ভারতের জন্য, বিশেষত ভারতের নারীসমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর — একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন।” মিস নোবলের শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, ভালোবাসা, দৃঢ়তা ইত্যাদি গুণের কারণে তিনিই সেই নারী হতে পারেন। কিন্তু ভারতের জলবায়ু, জীবনযাত্রা তাঁর পক্ষে অনুকূল নয়। মানবসেবার কাজেও বাধাবিপত্তি আছে প্রচুর। এসব সত্ত্বেও মিস নোবল যদি ভারতে আসতে চান, তবে স্বামীজি তাঁকে ‘শতবার স্বাগত’ জানিয়ে আলোচ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’টি লিখেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখিত পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধের বিষয়বস্তু আলোচনা করো।
বিষয়বস্তু – লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে মিস নোবলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। স্বামীজির বক্তৃতায় তিনি অনুপ্রাণিত হন। পরবর্তীকালে ইংরেজ ভক্ত মি. স্টার্ডির চিঠি থেকে স্বামীজি জেনেছেন যে, মিস নোবল ‘ভারতে এসে সবকিছু চাক্ষুষ দেখতে দৃঢ়সংকল্প’। মিস মুলারের কাছ থেকে স্বামীজি নোবলের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জেনেছেন। কিন্তু ভারতের সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি ইউরোপ-আমেরিকার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, ইংরেজ প্রভুর দাসত্ব আর প্রবল দারিদ্র্য প্রভৃতি এখানকার মানুষদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এদেশের আবহাওয়াও উষ্ণপ্রধান। এসব জেনেও যদি মিস নোবল ভারতের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চান, তাহলে সেখানে তাঁর সামনে এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় নারীসমাজ তাঁর দ্বারা অসীম উপকৃত হতে পারে। তাঁর মতো শিক্ষিতা, একনিষ্ঠ, পবিত্র, প্রেমময়ী, দৃঢ়চেতা এবং সুপ্রাচীন কেলটিক সভ্যতাজাত উন্নত চরিত্রের নারীকে এদেশের প্রয়োজন। এদেশে এসে স্বনির্ভর হয়ে তাঁকে কাজ করতে হবে। তাঁর পাশে স্বামীজি আমরণ থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এইসব তথ্য ও মতামত জানিয়ে মিস নোবলকে স্বামীজি সরাসরি চিঠিপ্রবন্ধটি লিখেছেন।
এ ছাড়া কয়েকজন ইউরোপীয় ব্যক্তির চরিত্র বিশ্লেষণ ও কর্মপদ্ধতি এই চিঠিপ্রবন্ধে আলোচনা করেছেন লেখক। তারপর তিনি মিস নোবল এদেশে এলে তাঁর কী কাজ হবে সে বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন।
“কল্যাণীয়া মিস নোবল” – এই সম্বোধন থেকে শুরু করে “আমাকে আমরণ তোমার পাশেই পাবে” – এরূপ আশ্বাসে মিস নোবলের প্রতি স্বামীজির যে স্নেহশীলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা সংক্ষেপে লেখো।
স্নেহশীলতার প্রকাশ – মিস নোবল ভারতে আসার প্রায় মাস ছয়েক আগে স্বামীজি মি. স্টার্ডির চিঠিতে জেনেছিলেন নোবল এদেশে আসতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তখন তিনি এই তরুণীকে লিখলেন, “তোমাকে খোলাখুলি বলছি, এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে।” ভারতের জলবায়ু আর কাজের পরিবেশের সঙ্গে বিদেশিনি নোবল মানিয়ে নিতে পারবেন কিনা — এই চিন্তা ছিল স্বামীজির। তাই তিনি তাঁর চিঠিপ্রবন্ধটিতে মিস মার্গারেট নোবলকে এখানকার বাধাবিঘ্নময় পরিবেশ এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকে সচেতন করে দিয়েছেন। এখানে এসে কারও ছত্রছায়ায় না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন নোবলকে আর বলেছেন কাজে নামার আগে ভালো করে ভেবে নিতে। স্বামীজি জানিয়েছেন, এদেশে তাঁর যতটুকু প্রভাব আছে তা দিয়ে তিনি নোবলের কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করবেন। এদেশে কাজ করতে করতে যদি মিস নোবলের বিরক্তি আসে, যদি তিনি কাজে বিফল হন এবং ভারতের জন্য আর কাজ না করতে চান, বেদান্ত ধর্ম ত্যাগও করেন — তবুও তাঁর প্রতি স্বামীজির দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না বলে স্বামীজি জানান। — “আমার দিক থেকে নিশ্চয় জেনো যে, আমাকে আমরণ তোমার পাশেই পাবে।” আশ্বাসে, বিশ্বাসে, ভরসায়, নির্ভরতায় এভাবেই মিস নোবলের প্রতি স্বামীজির অকৃত্রিম স্নেহ প্রকাশ পেয়েছে সমগ্র চিঠিপ্রবন্ধটিতে।
স্বামী বিবেকানন্দের লেখা চিঠিপ্রবন্ধটি থেকে মিস ম্যাকলাউড এবং মিস মুলার সম্পর্কে যা জানা যায় লেখো।
মিস ম্যাকলাউড – 1897 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই আলমোড়া থেকে স্বামী বিবেকানন্দ মিস নোবলকে যে চিঠিপ্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তাতে মিস ম্যাকলাউড এবং মিস মুলারের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। মিস জোসেফাইন ম্যাকলাউড ছিলেন স্বামীজির ইউরোপীয় ভক্তাদের মধ্যে অন্যতমা। আমেরিকার সংবাদে স্বামীজি জেনেছেন, মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুল সে বছর শরৎকালেই ভারত পরিভ্রমণে আসছেন। ‘পারি ফ্যাশনের’ অর্থাৎ প্যারিসের ফ্যাশন অনুযায়ী তৈরি পোশাকে ম্যাকলাউডকে লন্ডনে মিস নোবল দেখেছেন। সেই ম্যাকলাউডদের সঙ্গেই মিস নোবলকে ভারতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন স্বামীজি।
মিস মুলার – মিস মুলার এমনিতে চমৎকার মহিলা, কিন্তু তাঁর ধারণা তিনি আজন্ম নেত্রী এবং দুনিয়াটা বদলে দিতে টাকা ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন নেই। তাঁর নিজের, নোবলের এবং আমেরিকা-ইউরোপ থেকে আগত বন্ধুদের জন্য তিনি কলকাতায় একটা বাড়ি ভাড়া নিতে চান। এদিক থেকে তাঁকে সহৃদয় ও অমায়িক বলা যায়। অন্যদিকে, মানসিকভাবে তিনি খুব অস্থির এবং তাঁর মেজাজ অত্যন্ত রুক্ষ। তাঁর সঙ্গে দূর থেকে বন্ধুত্ব করাই ভালো বলে মনে করেছেন স্বামীজি। ভারতে এসে তাঁর সঙ্গে মিস নোবল মানিয়ে চলতে পারবেন না। তাই স্বামীজির পরামর্শ, মিস মুলার বা অন্য কারও আশ্রয়ে না থেকে মিস নোবল যেন কার্যক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হন।
পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধ থেকে মিসেস সেভিয়ার ও মিসেস বুল সম্পর্কে কী জানা যায়?
মিসেস সেভিয়ার – পাঠ্য চিঠিপ্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ মিসেস সেভিয়ারকে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’ বলেছেন। ‘এত ভালো, এত স্নেহময়ী তিনি’ কথাগুলির মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি স্বামীজির অত্যন্ত উচ্চ ধারণাই প্রকাশ পায়। এই স্নেহশীলা নারী এবং তাঁর স্বামী ইংরেজ হওয়া সত্ত্বেও অন্য ইংরেজদের মতো ভারতীয়দের ঘৃণা করেন না। তাঁরা এদেশে এসেছেন মানুষের সেবার মনোভাব নিয়ে, কর্তৃত্ব ফলানোর কোনো ইচ্ছা বা মানসিকতা তাঁদের নেই। মিসেস সেভিয়ার বেদান্ত ধর্ম প্রচারের কাজে নিবেদিত ছিলেন আজীবন। আলোচ্য ‘চিঠিপ্রবন্ধ’ রচনার সময়ে এদেশে কাজের বিষয়ে মিসেস সেভিয়ারের কোনো নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী গড়ে ওঠেনি। তাই মিস নোবল ভারতের কাজে তাঁকে সহকর্মীরূপে পেলে উভয়েরই সুবিধা হবে বলে স্বামীজি জানিয়েছেন।
মিসেস বুল – মিসেস সারা বুলও ছিলেন স্বামীজির অন্যতমা শিষ্যা। স্বামীজি তাঁকে কোনো কোনো চিঠিতে ‘মা’ বা ‘ধীরামাতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। ইনিও অত্যন্ত স্নেহশীলা রমণী। স্বামীজি যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন তিনি বস্টনের বাসিন্দা মিসেস বুলের কাছ থেকে বিশেষ উপকার পেয়েছিলেন। স্বামীজি খবর পেয়েছিলেন, মিস ম্যাকলাউডের সঙ্গে মিসেস বুল শরৎকালে ইউরোপ হয়ে ভারতে আসছেন। দীর্ঘপথের একঘেয়েমি দূর করতে স্বামীজি মিস নোবলকে মিসেস বুল এবং মিস ম্যাকলাউডের সঙ্গে এদেশে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘চিঠি’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন