চিত্রসহ ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থানগত বর্ণনা করো।

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “চিত্রসহ ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থানগত বর্ণনা করো। অথবা, একটি ইউক্যারিয়োটিক ক্রোমোজোমের বহির্গঠন বা অঙ্গসংস্থানিক গঠন সংক্ষেপে উল্লেখ করো।” — নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় “জীবনের প্রবহমানতা” -এর “কোশ বিভাজন এবং কোশচক্র” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থানগত চিত্রসহ বর্ণনা করো।

চিত্রসহ ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থানগত বর্ণনা করো।

অথবা, একটি ইউক্যারিয়োটিক ক্রোমোজোমের বহির্গঠন বা অঙ্গসংস্থানিক গঠন সংক্ষেপে উল্লেখ করো।

কোশ বিভাজনের মেটাফেজ দশায় ক্রোমোজোমের বিভিন্ন অংশগুলি সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। একটি ইউক্যারিয়োটিক আদর্শ ক্রোমোজোমের গঠনগত অংশগুলি নিম্নরূপ –

ক্রোমাটিড (Chromatid) –

ইন্টারফেজ দশায় ক্রোমোজোমের দ্বিতকরণের ফলে মেটাফেজ ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য বরাবর যে একজোড়া কুণ্ডলীকৃত ও দণ্ডাকার অংশ দেখা যায় তাদের প্রত্যেকটিকে ক্রোমাটিড বলে। একটি ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিডদ্বয়কে পরস্পরের সিস্টার ক্রোমাটিড বলে যা সেন্ট্রোমিয়ার অঞ্চলে যুক্ত থাকে। প্রতিটি ক্রোমাটিড সূক্ষ্ম প্যাঁচানো সর্পিলাকার অংশ নিয়ে গঠিত, তাদের প্রত্যেককে ক্রোমোনিমা বলে। ক্রোমাটিডের সকল অংশ সমানভাবে স্থূল না হওয়ায় রঞ্জিত করার পর কোনো অংশ গাঢ়ভাবে, আবার কোনো অংশ হালকাভাবে রঞ্জিত হয় এবং এই ঘটনাকে হেটেরোপিকনোসিস বলে। ক্রোমোনিমার দৈর্ঘ্য বরাবর দানার মতো বিন্দু অংশ দেখা যায়, এদের ক্রোমোমিয়ার বলে।

ক্রোমোজোমের গঠন

মুখ্য বা প্রাথমিক খাঁজ (Primary Constriction) –

ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ারের সঙ্গে যুক্ত অরঞ্জিত অংশ, যে অংশে ক্রোমোজোমের বাহু খাঁজ হয়, সেই অংশটিকে মুখ্য খাঁজ বা প্রাথমিক খাঁজ বলে। এই খাঁজ অংশে উপস্থিত যে ঘন, গোলাকার অংশ যা ক্রোমাটিডদ্বয়কে যুক্ত করে এবং ক্রোমাটিডকে বেমতত্ত্বর সঙ্গে যুক্ত করে, তাকে সেন্ট্রোমিয়ার বলে। সেন্ট্রোমিয়ারের সঙ্গে যুক্ত প্রোটিন নির্মিত প্লেট বা চাকতির ন্যায় অংশটিকে কাইনেটোকোর বলে।

গৌণ খাঁজ (Secondary Constriction) –

কোনো কোনো ক্রোমোজোমের মুখ্য খাঁজ ছাড়াও ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য বরাবর উপস্থিত এক বা একাধিক সংকুচিত, অরঞ্জিত স্থানকে গৌণ খাঁজ বলে। ক্রোমোজোমের একটি বাহুতে বা উভয় বাহুতে গৌণ খাঁজ থাকতে পারে। গৌণ খাঁজ দুই প্রকার – গৌণ খাঁজ-Ⅰ এবং II।, গৌণ খাঁজ-Ⅰ কোশ বিভাজনের সময় নিউক্লিয়োলাস গঠনে সাহায্য করে, তাই একে নিউক্লিয়োলার অরগানাইজার রিজিয়ন (NOR) বলে।

স্যাটেলাইট (Satellite) –

ক্রোমোজোমের গৌণ খাঁজের পরবর্তী বোতামের মতো যে ফোলা অংশ বা নবের মতো গঠনযুক্ত অংশ অবস্থান করে, তাকে স্যাটেলাইট বলে। স্যাটেলাইটযুক্ত ক্রোমোজোমকে স্যাট (SAT) ক্রোমোজোম বলে। মানুষের ক্ষেত্রে 13, 14, 15, 21 এবং 22 নম্বর ক্রোমোজোম হল SAT (সাইনো অ্যাসিডো থাইমিডিন) ক্রোমোজোম।

টেলোমিয়ার (Telomere) –

প্রতিটি ক্রোমোজোমের বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রান্তদ্বয়কে টেলোমিয়ার বলে। প্রান্তগুলি মেরুত্বযুক্ত হওয়ায় অন্য কোনো ক্রোমোজোমের ভগ্ন খন্ড কোনো অখণ্ড ক্রোমোজোমের প্রান্তে যুক্ত হতে পারে না। মানুষের টেলোমিয়ারে নাইট্রোজেনযুক্ত ক্ষারকের একটি নির্দিষ্ট সজ্জা থাকে, এটি হল – TTAGGG; এটি ক্রোমোজোমকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। ক্রোমোজোমের এই অংশের সঙ্গে বার্ধক্য এবং ক্যানসারও সম্পর্কযুক্ত।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

ইউক্যারিওটিক ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থান বলতে কী বোঝায়?

ইউক্যারিওটিক ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থান বলতে কোষ বিভাজনের মেটাফেজ দশায় সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান একটি ক্রোমোজোমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গঠনগত অংশ বা অঙ্গগুলির বর্ণনাকে বোঝায়। এর মধ্যে ক্রোমাটিড, সেন্ট্রোমিয়ার, প্রাথমিক ও গৌণ খাঁজ, স্যাটেলাইট, টেলোমিয়ার প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত।

ক্রোমাটিড ও ক্রোমোসোমের মধ্যে পার্থক্য কী?

একটি ক্রোমোসোম ডিএনএ -এর একটি দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন অণু। ইন্টারফেজে ডিএনএ -এর প্রতিলিপিকরণের পর, কোষ বিভাজনের মেটাফেজ দশায় প্রতিটি ক্রোমোসোম দুটি সমান সমবায়ী (সিস্টার) ক্রোমাটিড নিয়ে গঠিত দেখা যায়। এই দুটি ক্রোমাটিড সেন্ট্রোমিয়ার অঞ্চলে যুক্ত থাকে। সুতরাং, একটি মেটাফেজ ক্রোমোসোমে দুটি ক্রোমাটিড থাকে, যারা বিভাজনের সময় আলাদা হয়ে যায়।

সেন্ট্রোমিয়ার বা প্রাথমিক খাঁজের কাজ কী?

সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোসোমের একটি বিশেষায়িত সংকীর্ণ অঞ্চল (প্রাথমিক খাঁজ), যেখানে দুটি ক্রোমাটিড যুক্ত থাকে। এর প্রধান কাজ দুটি –
1. ক্রোমাটিড সংযুক্তি – এটি সিস্টার ক্রোমাটিডদ্বয়কে একসাথে ধরে রাখে।
2. স্পিন্ডল ফাইবার সংযুক্তির স্থান – সেন্ট্রোমিয়ার অঞ্চলে অবস্থিত প্রোটিন নির্মিত গঠন কাইনেটোকোর -এর মাধ্যমে মাইক্রোটিউবুল বা স্পিন্ডল ফাইবার যুক্ত হয়, যা কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোসোমগুলিকে মেরুর দিকে টানতে সাহায্য করে।

গৌণ খাঁজ ও স্যাটেলাইট কী এবং তাদের গুরুত্ব কী?

গৌণ খাঁজ – এটি একটি সংকীর্ণ অরঞ্জিত অঞ্চল যা ক্রোমোসোমের দৈর্ঘ্যে প্রাথমিক খাঁজ ছাড়াও অন্য কোথাও অবস্থান করতে পারে।
স্যাটেলাইট – গৌণ খাঁজের পরবর্তী অংশে অবস্থিত একটি গোলাকার বা বোতামের মতো ফোলা অংশ।
গুরুত্ব – একটি বিশেষ ধরনের গৌণ খাঁজ (গৌণ খাঁজ-Ⅰ বা NOR – নিউক্লিয়োলার অরগানাইজার রিজিয়ন) নিউক্লিয়াসে নিউক্লিয়োলাস গঠনের জন্য দায়ী। যে ক্রোমোসোমে স্যাটেলাইট থাকে তাকে SAT ক্রোমোসোম বলে।

টেলোমিয়ার কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

টেলোমিয়ার হল ক্রোমোসোমের দু’প্রান্তে অবস্থিত বিশেষ নিউক্লিওটাইডের পুনরাবৃত্তিমূলক ধারা (যেমন – মানুষের ক্ষেত্রে TTAGGG)। এর গুরুত্ব হল –
1. সুরক্ষামূলক ক্যাপ – এটি ক্রোমোসোমের প্রান্তকে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া বা অন্যান্য ক্রোমোসোমের সাথে অস্বাভাবিকভাবে যুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
2. বিভাজনীয় সীমা – প্রতি কোষ বিভাজনে টেলোমিয়ার কিছুটা ছোট হয়, যা কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত।
3. ক্যানসারের সাথে সম্পর্ক – অমর কোষ (যেমন – ক্যানসার কোষ) টেলোমেয়ারেজ এনজাইম ব্যবহার করে টেলোমিয়ার দৈর্ঘ্য বজায় রাখে।

হেটেরোপিকনোসিস ও ক্রোমোমিয়ার কী?

হেটেরোপিকনোসিস – ক্রোমাটিডের দৈর্ঘ্য বরাবর রঞ্জনকারক গ্রহণের ক্ষমতার তারতম্যের কারণে কিছু অংশ গাঢ়ভাবে এবং কিছু অংশ হালকাভাবে রঞ্জিত হয়। এই ঘটনাকে হেটেরোপিকনোসিস বলে।
ক্রোমোমিয়ার – ক্রোমোনিমা (ক্রোমাটিড গঠনকারী সুতোর) উপর দানার মতো বা বিন্দুর মতো যে ঘনসন্নিবেশিত অংশগুলো দেখা যায়, তাদের ক্রোমোমিয়ার বলে। এগুলি জিনের অবস্থান নির্দেশ করতে পারে।

আদর্শ ক্রোমোসোম বলতে কী বোঝায়?

আদর্শ ক্রোমোসোম বলতে সেই ক্রোমোসোমকে বোঝায় যাতে উপরে উল্লিখিত সকল অঙ্গসংস্থানিক অংশ যেমন – দুটি ক্রোমাটিড, একটি সুস্পষ্ট সেন্ট্রোমিয়ার বা প্রাথমিক খাঁজ, দুটি টেলোমিয়ার এবং কিছু ক্ষেত্রে গৌণ খাঁজ ও স্যাটেলাইট বিদ্যমান থাকে। কোষ বিভাজনের মেটাফেজ দশায় এই গঠনগুলি স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।


এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “চিত্রসহ ক্রোমোজোমের অঙ্গসংস্থানগত বর্ণনা করো। অথবা, একটি ইউক্যারিয়োটিক ক্রোমোজোমের বহির্গঠন বা অঙ্গসংস্থানিক গঠন সংক্ষেপে উল্লেখ করো।” — নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় “জীবনের প্রবহমানতা” -এর “কোশ বিভাজন এবং কোশচক্র অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। তাছাড়া, আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

মানুষ কোন্ পদ্ধতিতে গমন করে এবং গমনে সাহায্যকারী অঙ্গগুলি কী কী? মানুষের গমনে কোন্ কোন্ অস্থি ও পেশি সাহায্য করে?

মানুষের গমনে কোন্ কোন্ অস্থি ও পেশি সাহায্য করে?

অ্যাবডাকটর পেশি কাকে বলে? উদাহরণ দাও। অ্যাডাকটর পেশি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

অ্যাবডাকটর ও অ্যাডাকটর পেশি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

সচল সন্ধি এবং অচল সন্ধি কী? সচল সন্ধি এবং অচল সন্ধির মধ্যে পার্থক্য লেখো।

সচল সন্ধি এবং অচল সন্ধি কী? সচল সন্ধি এবং অচল সন্ধির মধ্যে পার্থক্য লেখো।

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণী গণিত – কোণ ও বাহুর মধ্যে সম্পর্কের যাচাই – কষে দেখি – 16.1

অষ্টম শ্রেণী গণিত –  বীজগাণিতিক সংখ্যামালার সরলীকরণ – কষে দেখি – 15

অষ্টম শ্রেণী গণিত –  বীজগাণিতিক সংখ্যামালার  গসাগু ও লসাগু – কষে দেখি – 14

অষ্টম শ্রেণী গণিত – বীজগাণিতিক সংখ্যামালার উৎপাদকে বিশ্লেষণ – কষে দেখি – 13.2

অষ্টম শ্রেণী গণিত – বীজগাণিতিক সংখ্যামালার উৎপাদকে বিশ্লেষণ – কষে দেখি – 13.1