এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “উদ্ভিদদেহে সংঘটিত বিভিন্ন অযৌন জনন পদ্ধতিগুলি উদাহরণসহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।” — নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় “জীবনের প্রবহমানতা” -এর “জনন” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

উদ্ভিদদেহে সংঘটিত বিভিন্ন অযৌন জনন পদ্ধতিগুলি উদাহরণসহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উদ্ভিদদেহের অযৌন জনন পদ্ধতিটি প্রধানত খণ্ডীভবন, রেণু উৎপাদনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
খণ্ডীভবন –
খণ্ডীভবন একটি বিশেষ অযৌন জনন পদ্ধতি যেখানে জনিতৃ জীবদেহটি প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক আঘাতে দুই বা তার বেশি খণ্ডে ভেঙে যায় এবং পরবর্তীকালে মাইটোসিস কোশ বিভাজনের মাধ্যমে প্রতিটি খণ্ড বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে তার থেকে নতুন অপত্যের সৃষ্টি হয়। যেমন – Spirogyra (স্পাইরোগাইরা) নামক শৈবালের দেহটি সরু সুতোর ন্যায় হয় যা জলস্রোতের ধাক্কায় অসংখ্য খণ্ডে খণ্ডিত হয়, যা থেকে মাইটোসিসের মাধ্যমে নতুন অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়।

রেণু উৎপাদন –
এটি একটি অযৌন জনন পদ্ধতি, যেখানে বিভিন্ন অপুষ্পক উদ্ভিদের রেণুস্থলী থেকে নির্গত রেণু আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে যা অনুকূল পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। রেণু প্রকৃতিগত ভাবে দু-প্রকার, যেমন-চলরেণু এবং অচলরেণু। চলরেণু বা জুস্পোরগুলি ফ্ল্যাজেলাযুক্ত হয়, অপরদিকে অচলরেণু বা অ্যাপ্লানোস্পোরগুলি ফ্ল্যাজেলাবিহীন হয়। মস, ফার্নের ক্ষেত্রে রেণুস্থলীতে সৃষ্ট সকল রেণুগুলি একই আকৃতিবিশিষ্ট হয়, এগুলিকে সমরেণু বলে। অপরপক্ষে Selaginella (সেলাজিনেল্লা) নামক ফার্নের রেণুস্থলীতে থাকা রেণুগুলির আকার ও আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হয়, এগুলিকে অসমরেণু বলে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
অযৌন জনন কী এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কী?
অযৌন জনন হলো এমন এক প্রকার প্রজনন প্রক্রিয়া যেখানে যৌন মিলন বা গ্যামেট সংযুক্তি ছাড়াই নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। এতে শুধুমাত্র একটি মূল উদ্ভিদ বা জনক উদ্ভিদ জড়িত থাকে এবং সৃষ্ট অপত্য উদ্ভিদ জিনগতভাবে জনকের সমগোত্রীয় হয়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি, পরিবেশগত প্রতিকূলতা সহনশীলতা এবং নতুন আবাস দখলের সহজ পদ্ধতি।
খণ্ডীভবন পদ্ধতিটি কীভাবে সংঘটিত হয়?
খণ্ডীভবনে উদ্ভিদদেহ প্রাকৃতিক বা বাহ্যিক কারণে (যেমন জলস্রোত, প্রাণীর পদদলন, কাটা ইত্যাদি) কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত হয়। প্রতিটি খণ্ড মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদে পরিণত হয়। উদাহরণ – স্পাইরোগাইরা শৈবাল, হাইড্রা (প্রাণী), কিছু কাকটাস।
রেণু উৎপাদন পদ্ধতিতে সমরেণু ও অসমরেণুর পার্থক্য কী?
সমরেণু হলো একই আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যযুক্ত রেণু, যা সাধারণ মস ও ফার্নে দেখা যায়। অসমরেণু হলো ভিন্ন আকৃতি ও আকারের রেণু, যা কিছু বিশেষ ফার্ন (যেমন সেলাজিনেলা) বা সপুষ্পক উদ্ভিদের বীজে দেখা যায়। অসমরেণু ক্ষেত্রে সাধারণত দুধরনের রেণু থাকে – মেগাস্পোর (বড়, মাদী গ্যামেটোফাইট গঠন করে) ও মাইক্রোস্পোর (ছোট, নরম গ্যামেটোফাইট গঠন করে)।
চলরেণু ও অচলরেণুর মধ্যে প্রধান বৈসাদৃশ্য কী?
চলরেণু (জুস্পোর) ফ্ল্যাজেলা বা সিলিয়া থাকে, তাই এরা স্বতঃসঞ্চালিত ও জলে সাঁতার কাটতে পারে। অচলরেণু (অ্যাপ্লানোস্পোর) ফ্ল্যাজেলাবিহীন, তাই এরা বাতাস, জল বা প্রাণীর সাহায্যে ছড়ায়।
উদ্ভিদের অযৌন জননের অন্যান্য উপায়গুলো কী কী?
উদ্ভিদে অযৌন জননের অন্যান্য সাধারণ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে – কন্দায়ন (আলু, আদা), রাইজোম (হলুদ, ঘাস), স্তলক (পেঁয়াজ, রসুন), পত্রকন্দ (ব্রায়োফিলাম, বেগুনিয়া), রোমূলাস (স্ট্রবেরি)
, কলম বা কাটিং (গোলাপ, আঙ্গুর), কোরম (কলা, ওল)।
অযৌন জননের সুবিধা ও অসুবিধা কী?
অযৌন জননের সুবিধা – দ্রুত বংশবিস্তার, একক উদ্ভিদ থেকেই নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি, জিনগত স্থিরতা বজায় রাখা।
অযৌন জননের অসুবিধা – জিনগত বৈচিত্র্যের অভাব, পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর সীমিত ক্ষমতা, রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়াতে পারে।
স্পাইরোগাইরা ছাড়া আর কোন কোন জীব খণ্ডীভবন প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার করে?
শৈবাল (যেমন – ফিলামেন্টাস শৈবাল), কিছু ছত্রাক (ইস্ট), প্রোটোজোয়া (আমিবা), এবং কিছু নিম্নশ্রেণির প্রাণী (প্ল্যানেরিয়া, স্পঞ্জ)।
রেণু উৎপাদন কাদের মধ্যে দেখা যায়?
মূলত অপুষ্পক উদ্ভিদ যেমন – শৈবাল, ছত্রাক, মস, ফার্ন, হর্সটেল ও লাইকোপোডিয়াম। কিছু ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটিস্টও রেণু সদৃশ কাঠামো তৈরি করে।
অযৌন জনন ও অঙ্গজ জননের মধ্যে পার্থক্য কী?
অযৌন জনন একটি ব্যাপক ধারণা, যার মধ্যে রেণু উৎপাদন, খণ্ডীভবন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। অঙ্গজ জনন মূলত উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের বিশেষায়িত কাণ্ড, শিকড়, পাতার মাধ্যমে নতুন উদ্ভিদ গজানো (যেমন কন্দ, রাইজোম)। তাই অঙ্গজ জনন অযৌন জননেরই একটি উপশ্রেণি।
ফার্নে রেণু কীভাবে ছড়ায়?
ফার্নে রেণুস্থলীতে (স্পোরেঞ্জিয়া) রেণু উৎপন্ন হয়। রেণুস্থলী শুকিয়ে ফেটে গেলে রেণুগুলি বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনুকূল আর্দ্র মাটিতে পড়লে রেণু অঙ্কুরিত হয়ে প্রোথ্যালাস নামক গ্যামেটোফাইট তৈরি করে, যা পরে নিষেকের মাধ্যমে নতুন স্পোরোফাইট উদ্ভিদ গঠন করে।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “উদ্ভিদদেহে সংঘটিত বিভিন্ন অযৌন জনন পদ্ধতিগুলি উদাহরণসহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।” — নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় “জীবনের প্রবহমানতা” -এর “জনন” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। তাছাড়া, আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন