অষ্টম শ্রেণির ভূগোল প্রথম অধ্যায়: ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’ – গুরুত্বপূর্ণ টীকা

Souvick

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের প্রথম অধ্যায় ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন্দ্রমণ্ডল (Core) সম্পর্কে টীকা লেখো।

কেন্দ্রমণ্ডলের সংজ্ঞা – গুরুমণ্ডলের নীচে এবং পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টনকারী সর্বাধিক ঘনত্বযুক্ত স্তরকে কেন্দ্রমণ্ডল বা কোর বলে।

কেন্দ্রমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য –

  • গভীরতা – গুরুমণ্ডলের নীচে 2,900 কিমি থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র 6,370 কিমি গভীরতা পর্যন্ত কেন্দ্রমণ্ডল বিস্তৃত। অর্থাৎ, এই স্তরটি প্রায় 3,470 কিমি পুরু।
  • উপাদান – এই স্তর অত্যন্ত ভারী নিকেল (Ni) ও লোহা (Fe) দিয়ে গঠিত বলে একে নিফে (Nife) বলে।
  • উষ্ণতা – এই স্তরের গড় উষ্ণতা প্রায় 5000°C।
  • ঘনত্ব – এই স্তরের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। গড় ঘনত্ব প্রায় 9.1-13.1 গ্রাম/ঘন সেমি।

উপস্তর – বিজ্ঞানীরা কেন্দ্রমণ্ডলকে দুটি অংশে ভাগ করেছেন।

  1. বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল – 2,900-5,100 কিমি গভীরতায় রয়েছে বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল। এর চাপ, তাপ ও ঘনত্ব অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের তুলনায় কম হওয়ায় এখানে পদার্থ অর্ধকঠিন অবস্থায় আছে।
  2. অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল – পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টন করে রয়েছে অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল। এর গভীরতা 5,100-6,370 কিমি। এই স্তরের চাপ, তাপ ও ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। অত্যধিক চাপে পদার্থগুলি এখানে কঠিন অবস্থায় আছে।

বিযুক্তিরেখা – গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা দ্বারা কেন্দ্রমণ্ডল গুরুমণ্ডল থেকে আলাদা হয়েছে। বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে রয়েছে লেহম্যান বিযুক্তিরেখা।

ভূত্বক (Crust) সম্পর্কে টীকা লেখো।

ভূত্বকের সংজ্ঞা – সবার ওপরে অবস্থিত হালকা ও কঠিন পদার্থে গঠিত যে স্তরটি পৃথিবীকে শক্ত আবরণে মুড়ে রেখেছে, তাকে ভূত্বক বা ক্রাস্ট বলে। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত স্তরগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা – কেন্দ্রমণ্ডল (Core), গুরুমণ্ডল (Mantle) এবং শিলামণ্ডল (Lithosphere)। ভূগর্ভের এই বিভিন্ন স্তরগুলির প্রকৃতি, উষ্ণতা, ঘনত্ব ও চাপ ভূকম্প তরঙ্গের গতিবেগের পার্থক্যের মাধ্যমে বোঝা যায়।

ভূত্বকের বৈশিষ্ট্য –

  • গভীরতা – মহাদেশের নীচে গড়ে 60 কিমি এবং মহাসাগরের নীচে গড়ে 5 কিমি গভীরতা পর্যন্ত ভূত্বক বিস্তৃত। এর গড় গভীরতা প্রায় 30 কিমি।
  • উপাদান – ভূত্বকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে অক্সিজেন (O₂)। এ ছাড়া সিলিকন (Si), ম্যাগনেশিয়াম (Mg), অ্যালুমিনিয়াম (Al) প্রভৃতি উপাদানে ভূত্বক গঠিত।
  • উষ্ণতা বা তাপমাত্রা – পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে গ্যাসীয় অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে তরল হয়। তরল অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে পৃথিবীর উপরিভাগের এই কঠিন আবরণটি সৃষ্টি হয়। ভূ-অভ্যন্তরের তিনটি স্তরের মধ্যে এই স্তরটির উষ্ণতা সবচেয়ে কম। ভূত্বকের গড় তাপমাত্রা 15°C।
  • ঘনত্ব – ভূত্বক সবচেয়ে হালকা। এর ঘনত্ব 2.2-2.9 গ্রাম/ঘন সেমি।
  • শিলা – ভূত্বক আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত এই তিন প্রকার শিলা দিয়ে গঠিত। এই শিলা নানা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। ভূত্বকের একেবারে ওপরে আছে মাটি।

উপস্তর – ভূত্বকের দুটি অংশ। যথা –

  1. সিয়াল – সিলিকন (Si) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al) দ্বারা গঠিত ওপরের অপেক্ষাকৃত হালকা স্তরটি হল সিয়াল (Si + Al = Sial) বা মহাদেশীয় ভূত্বক। এটি গ্রানাইট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং মহাসাগরের নীচে অনুপস্থিত।
  2. সিমা – সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেশিয়াম (Mg) দ্বারা গঠিত অপেক্ষাকৃত ভারী স্তরটি হল সিমা (Si + Ma = Sima) বা মহাসাগরীয় ভূত্বক। এটি ব্যাসল্ট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং সিয়ালের নীচে অবস্থিত।

বিযুক্তিরেখা – ভূত্বকের সিয়াল ও সিমার মাঝে রয়েছে কনরাড বিযুক্তিরেখা এবং ভূত্বককে গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক করেছে মোহোরোভিসিক বিযুক্তিরেখা।

অ্যাসথেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) সম্পর্কে টীকা লেখো।

অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের সংজ্ঞা – অ্যাসথেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) কথাটি এসেছে গ্রিক ‘অ্যাসথেনেস’ (asthenes) মানে ‘দুর্বল’ আর ‘স্ফিয়ার’ (sphere) মানে ‘মণ্ডল’ শব্দ দুটি থেকে, যার অর্থ দুর্বল মণ্ডল। অ্যাসথেনোস্ফিয়ার হল ঊর্ধ্ব গুরুমণ্ডলের অন্তর্গত এক সান্দ্র, দুর্বল ও নমনীয় প্রকৃতির পরিবর্তনশীল স্তরবিশেষ।

অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের বৈশিষ্ট্য –

  • গভীরতা – প্রায় 200 কিমি গভীরতায় এই স্তরটি মূলত লোহা ও ম্যাগনেশিয়াম দ্বারা গঠিত।
  • প্রকৃতি – প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও চাপযুক্ত এই অঞ্চল স্থিতিস্থাপক ও সান্দ্র অবস্থায় আছে।
  • উষ্ণতা – এই অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেমন – ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম প্রভৃতি থাকার জন্য উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে শিলা গলনাঙ্কের (1,400°C) কাছাকাছি থাকে।
  • ভাসমান পাত – এই স্তরে ম্যাগমার পরিচলন স্রোতের সাহায্যে মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাত ভাসমান অবস্থায় চলমান রয়েছে।
  • ভূকম্প তরঙ্গ – সান্দ্র অবস্থায় থাকার জন্য এই স্তরে ‘P’ ও ‘S’ তরঙ্গ তুলনামূলকভাবে ধীর গতিসম্পন্ন হয়, তাই একে LVZ বা Low Velocity Zone বলে।
  • গুরুত্ব – অগ্ন্যুৎপাত এই অ্যাসথেনোস্ফিয়ার থেকে সংঘটিত হয় বলে একে ক্ষুব্ধমণ্ডল বলে।

ব্যবহার – প্রবহমান ও দূষণহীন এই ভূ-তাপশক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগে।

  • বিদ্যুৎ উৎপাদন – 1904 সালে ইটালির লারডেরেল্লোতে প্রথম ভূতাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। বর্তমানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ভূ-তাপশক্তি উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করে। ফিলিপাইনস দ্বিতীয় ও মেক্সিকো তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এ ছাড়া রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে, নিউজিল্যান্ডের ওয়াইরাকেই-তে ভূ-তাপশক্তি উৎপাদন কেন্দ্র আছে। ভারতে হিমাচল প্রদেশের মণিকরণে একটি বড়ো ভূ-তাপশক্তি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে।
  • সুবিধা –
    • এই শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে কয়লা, খনিজ তেলের ব্যবহার কমানো যায়।
    • এই শক্তি ব্যবহারে পরিবেশ দূষণ হয় না।

উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Spring) সম্পর্কে টীকা লেখো।

উষ্ণপ্রস্রবণের সংজ্ঞা – মাটির নীচ থেকে যখন উষ্ণ জল আপনা-আপনি বেরিয়ে আসতে থাকে, তখন তাকে উষ্ণপ্রস্রবণ বলে।

উষ্ণপ্রস্রবণের উৎপত্তি – মাটির নীচে শিলাস্তরের জল (ভৌমজল) পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপ অর্থাৎ, ভূ-তাপের সংস্পর্শে এসে গরম হয়ে ফুটতে শুরু করে এবং পৃথিবীপৃষ্ঠে কোনো ফাটল বা দুর্বল স্থান পেলে সেখান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে উষ্ণপ্রস্রবণ সৃষ্টি করে।

উষ্ণপ্রস্রবণের উদাহরণ – পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বর, বিহারের রাজগির প্রভৃতি স্থানে উষ্ণপ্রস্রবণ দেখা যা

উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Spring)  সম্পর্কে টীকা লেখো।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের প্রথম অধ্যায় ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’ এর ‘টীকা’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

অস্থিত পৃথিবী - পাতসংস্থান তত্ত্ব - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল দ্বিতীয় অধ্যায় (অস্থিত পৃথিবী) – পাতসংস্থান তত্ত্ব অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

পৃথিবীর অন্দরমহল-অষ্টম শ্রেণী ভূগোল-রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: পৃথিবীর অন্দরমহল (প্রথম অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

পৃথিবীর অন্দরমহল - অষ্টম শ্রেণী ভূগোল - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল প্রথম অধ্যায়: পৃথিবীর অন্দরমহল – গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল দ্বিতীয় অধ্যায় (অস্থিত পৃথিবী) – পাতসংস্থান তত্ত্ব অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: পৃথিবীর অন্দরমহল (প্রথম অধ্যায়) – গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল প্রথম অধ্যায়: পৃথিবীর অন্দরমহল – গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল প্রথম অধ্যায়: পৃথিবীর অন্দরমহল – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল প্রথম অধ্যায়: ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’ – গুরুত্বপূর্ণ টীকা