থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে? প্রকারভেদ ও উপসর্গ

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Madhyamik Life Science) বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে? ইহা কত প্রকার ও কী কী? থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গগুলি উল্লেখ করো।” — নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় “বংশগতি এবং কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ” -এর “কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা (Madhyamik Exam) এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে? ইহা কত প্রকার ও কী কী? থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গগুলি উল্লেখ করো।

থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে?

অটোজোমবাহিত যে বংশগত রোগে জিনগত ত্রুটির ফলে মানবদেহের রক্তে লোহিত রক্তকণিকার ভাঙন এবং হিমোগ্লোবিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার সৃষ্ট হয়, তাকে থ্যালাসেমিয়া বলে।

থ্যালাসেমিয়া কত প্রকার ও কী কী?

থ্যালাসেমিয়া মূলত দু-প্রকার। যথা –

  • α থ্যালাসেমিয়া (Alpha Thalassemia)
  • β থ্যালাসেমিয়া (Beta Thalassemia)

থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গগুলি উল্লেখ করো

থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণগুলি নিম্নরূপ –

  • অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা – হিমোগ্লোবিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অ্যানিমিয়া ঘটে।
  • যকৃৎ ও প্লীহার বৃদ্ধি – যকৃৎ ও প্লীহার বৃদ্ধি (স্প্লিনোমেগালি) ঘটে, জন্ডিস হয়।
  • মূত্রের রং পরিবর্তন – কালচে বর্ণের মূত্র নির্গত হয়।
  • দৈহিক গঠনে বিকৃতি – অস্থিগুলি ভঙ্গুর হয় এবং দৈহিক বৃদ্ধির হার স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়, দৈহিক গঠন বিকৃত হয়ে যায়।
  • বিলম্বিত বৃদ্ধি – আক্রান্ত ব্যক্তির বিলম্বিত যৌবনপ্রাপ্তি ঘটে।

থ্যালাসেমিয়ার কারণ (বংশগতি ও জিনগত ত্রুটি)

থ্যালাসেমিয়া বর্ণান্ধতা বা হিমোফিলিয়ার মতো সেক্স ক্রোমোজোম (X বা Y) ঘটিত রোগ নয়; এটি একটি অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন রোগ (Autosomal Recessive Disease)।

আলফা (α) থ্যালাসেমিয়ার কারণ –

  • মানুষের 16 নম্বর ক্রোমোজোমে অবস্থিত দুটি জিন (HBA1 এবং HBA2) আলফা থ্যালাসেমিয়ার জন্য দায়ী।
  • এই দুটি জিনের মোট 4টি অ্যালিল (Allele) থাকে। এই অ্যালিলগুলোতে মিউটেশন বা স্থায়ী পরিবর্তন ঘটলে হিমোগ্লোবিনের ‘আলফা গ্লোবিন পলিপেপটাইড’ শৃঙ্খল তৈরি ব্যাহত হয়।
  • মাইনর (Minor) – যদি 4টি অ্যালিলের মধ্যে 2টিতে মিউটেশন ঘটে, তবে তাকে ‘আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর’ বলা হয়। এক্ষেত্রে রোগীর লক্ষণ মৃদু হয় এবং সে রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে।
  • মেজর (Major) – যদি 4টি অ্যালিলের সবকটিতেই (4টিতেই) মিউটেশন ঘটে, তবে তাকে ‘আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর’ বলা হয়। এটি অত্যন্ত মারাত্মক রূপ ধারণ করে।

বিটা (β) থ্যালাসেমিয়ার কারণ –

  • মানুষের 11 নম্বর ক্রোমোজোমে অবস্থিত HBB জিনের মিউটেশনের ফলে ‘বিটা গ্লোবিন পলিপেপটাইড’ তৈরি ব্যাহত হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয়।
  • এক্ষেত্রে 1টি জিন এবং 2টি অ্যালিল থাকে।
  • মাইনর (Minor) – 2টির মধ্যে 1টি অ্যালিলে মিউটেশন ঘটলে তাকে ‘বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর’ বলে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি রোগের বাহক হয়।
  • মেজর (Major) – 2টি অ্যালিলেই মিউটেশন ঘটলে তাকে ‘বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর’ বলা হয়। এটি একটি মারাত্মক অবস্থা।
  • বিজ্ঞানী থমাস কুলির নামানুসারে বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর-কে ‘কুলির অ্যানিমিয়া’ (Cooley’s Anemia)-ও বলা হয়ে থাকে, যা শর্ট প্রশ্নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বংশগতি এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং

অনেক সময় দেখা যায় বাবা-মা দুজনেই বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক, কিন্তু তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হয়েছে। এর কারণ হলো, বাবা এবং মা দুজনেই হয়তো থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা বাহক ছিলেন যা বাইরে থেকে বোঝা যায়নি।

বাহক পিতামাতার (Carrier Parents) সন্তান হলে তার জিনগত সম্ভাবনাগুলি নিম্নরূপ –

  • 25% সম্ভাবনা থাকে সন্তান সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়ার।
  • 50% সম্ভাবনা থাকে সন্তান রোগের বাহক (মাইনর) হওয়ার।
  • 25% সম্ভাবনা থাকে সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত (মেজর) হওয়ার।

এই 25% মারাত্মক ঝুঁকির কারণে বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে বাবা-মাকে অবশ্যই জেনেটিক কাউন্সেলরের (Genetic Counselor) কাছে গিয়ে রক্ত ও জিন পরীক্ষা করানো উচিত, যাতে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির O₂ বহন ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম হয় কেন?

রক্তে O₂ এবং CO₂ পরিবহণের কাজ করে লোহিত রক্তকণিকা মধ্যস্ত হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশ অর্থাৎ গ্লোবিন তৈরি হয় দুটি α এবং দুটি β পলিপেপটাইড শৃঙ্খল দিয়ে। থ্যালাসেমিয়ায় গ্লোবিন তৈরির জিনের মিউটেশনের ফলে α ও β পলিপেপটাইড শৃঙ্খল তৈরি হয় না বা কম তৈরি হয়, ফলে হিমোগ্লোবিনের গঠন ত্রুটিপূর্ণ হয়। হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিক গঠনের কারণে লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণও কমে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির O₂ বহন ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম হয়।

থ্যালাসেমিয়া রোগীকে বারবার রক্ত দিতে হয় কেন?

যে যে কারণের জন্য থ্যালাসেমিয়া রোগীকে বারবার রক্ত দিতে হয় তা হল –

1. থ্যালাসেমিয়া রোগটি হিমোগ্লোবিনের গঠনজনিত ত্রুটির কারণে হওয়ায় এদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম থাকে এবং এরা রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভোগেন। RBC -এর পরিমাণ কমে যাওয়ায় রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়। তাই রক্তদানের মাধ্যমে দেহে অক্সিজেন পরিবহণ সহজেই সম্ভব হয়।

2. দেহের সার্বিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হল রক্ত। থ্যালাসেমিয়ায় দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ স্বাভাবিকের তুলনায় হ্রাস পাওয়ায় রক্ত সঞ্চারণের মাধ্যমে এই ত্রুটি নির্মূল করা সম্ভব।


এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে? ইহা কত প্রকার ও কী কী? থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গগুলি উল্লেখ করো।” — নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় “বংশগতি এবং কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ” -এর “কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।

Please Share This Article

Related Posts

অসুস্থ ভ্রূণ তথা সন্তান যাতে না জন্মায় তার জন্য জেনেটিক কাউন্সেলর দম্পতিকে সাধারণত কী কী পরামর্শ দেবেন?

অসুস্থ ভ্রূণ যাতে না জন্মায় তার জন্য জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

জেনেটিক কাউন্সেলিং কাকে বলে? বংশগত রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন দিকগুলি লেখো।

জেনেটিক কাউন্সেলিং কাকে বলে? বংশগত রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

বর্ণান্ধতার কারণ ও লক্ষণ উল্লেখ করো।

বর্ণান্ধতার কারণ ও লক্ষণ (বংশগতি ও জিনগত রোগ) – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

থ্যালাসেমিয়া কাকে বলে? প্রকারভেদ ও উপসর্গ

অসুস্থ ভ্রূণ যাতে না জন্মায় তার জন্য জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

জেনেটিক কাউন্সেলিং কাকে বলে? বংশগত রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

বর্ণান্ধতার কারণ ও লক্ষণ (বংশগতি ও জিনগত রোগ) – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ ও প্রকারভেদ (α ও β থ্যালাসেমিয়া) – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান