আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের নবম অধ্যায় ‘উত্তর আমেরিকা’ এর উপবিভাগ ‘উত্তর আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল নবম অধ্যায়: উত্তর আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য (রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর)
উত্তর আমেরিকার ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ করো। যে-কোনো একটি বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করো।
অথবা, উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিমের পার্বত্যভূমি সম্পর্কে আলোচনা করো।
প্রাকৃতিক শ্রেণিবিভাগ – উত্তর আমেরিকা মহাদেশটি প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ভূখণ্ড লরেশিয়ার (Laurasia) অংশবিশেষ। সমগ্র মহাদেশটিকে ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অনুসারে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা –
- পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল বা কর্ডিলেরা,
- মধ্যভাগের সমভূমি অঞ্চল,
- কানাডীয় বা লরেন্সীয় উচ্চভূমি, ও
- পূর্বদিকের উচ্চভূমি।

পশ্চিমের পার্বত্যভূমি বা কর্ডিলেরা –
1. অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিমাংশ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর উত্তরে আলাস্কা থেকে দক্ষিণে পানামা যোজক পর্যন্ত পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল বা কর্ডিলেরা অবস্থান করছে। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের এই কর্ডিলেরা পর্বতশ্রেণি আরো দক্ষিণে প্রসারিত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে আন্দিজ নামে অবস্থান করছে। উল্লেখ্য, সমগ্র পশ্চিমের কর্ডিলেরাটি ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় পার্বত্য অঞ্চল’ নামে পরিচিত।
2. উৎপত্তি – পৃথিবীর অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের তরল উত্তপ্ত ম্যাগমার ওপর ভাসমান প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত ও উত্তর আমেরিকান মহাদেশীয় পাতের অভিসারী সীমানা বরাবর মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে এই নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে।
3. বিস্তার – এই পার্বত্য ভূমিটির উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য প্রায় 6,900 কিমি এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থ প্রায় 1,600 কিমি। হিমালয়, আল্পস্ ও আন্দিজের মতো এটিও একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি। এর গড় উচ্চতা প্রায় 600 মিটার। উল্লেখ্য, স্পেনীয় ভাষায় ‘কর্ডিলেরা’ শব্দের অর্থ হল ‘পর্বতশৃঙ্খল’ বা ‘পর্বতশ্রেণি’।
4. পর্বতশ্রেণি – এখানকার তিনটি সমান্তরাল ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি হল যথাক্রমে –
- পূর্বের পর্বতশ্রেণি – কর্ডিলেরার পূর্বদিকে পৃথিবীবিখ্যাত নবীন ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি রকি অবস্থান করছে। রকি পর্বতশ্রেণি উত্তরে আলাস্কাতে এন্ডিকট রেঞ্জ বা ব্রুকস্, মধ্যভাগে রকি এবং দক্ষিণে মেক্সিকোতে সিয়েরা মাদ্রে পর্বত নামে পরিচিত।
- মধ্যের পর্বতশ্রেণি – রকি পর্বতমালার পশ্চিমে মধ্যভাগের দ্বিতীয় পর্বতশ্রেণি অবস্থিত। এই পর্বতশ্রেণি উত্তরে আলাস্কা পর্বত, মধ্যভাগে (কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র) কাসকেড ও সেলকার্ক এবং সর্ব দক্ষিণে ক্যালিফোর্নিয়াতে সিয়েরা নেভাদা নামে পরিচিত। সিয়েরা নেভাদা ও সিয়েরা মাদ্রে এখানে একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। আলাস্কা পর্বতশ্রেণির মাউন্ট ম্যাকিনলে (6,195 মিটার) সমগ্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। তবে সিয়েরা নেভাদার মাউন্ট হুইটনি (4,418 মিটার) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
- পশ্চিমের পর্বতশ্রেণি – প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে পশ্চিমপ্রান্তে এই পর্বতশ্রেণি অবস্থিত। এর উত্তরাংশকে আলাস্কাতে সেন্ট ইলিয়াস পর্বতশ্রেণি এবং দক্ষিণাংশকে (কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র) কোস্টরেঞ্জ বলে।

5. মালভূমি – এই পার্বত্য অঞ্চলে পর্বতবেষ্টিত মালভূমি হল – কানাডার উত্তর-পশ্চিমে এন্ডিকট ও আলাস্কা পর্বতশ্রেণির মধ্যে ইউকন মালভূমি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে কলম্বিয়া ও লাভা মালভূমি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমে স্নেক বা আইডাহো, গ্রেট বেসিন, কলোরাডো, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার মালভূমি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
6. নদী উপত্যকা – এখানকার পার্বত্য অঞ্চলে পর্বতবেষ্টিত মালভূমির ওপর দিয়ে কলোরাডো, ইউকন, ফ্রেজার, কলম্বিয়া প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়েছে। কলোরাডো নদী এই জায়গায় পৃথিবীর বৃহত্তম গিরিখাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সৃষ্টি (গভীরতা 6,000 ফুট) করেছে।
7. মৃত্যু উপত্যকা – ক্যালিফোর্নিয়ার পূর্বাংশে অবস্থিত মৃত্যু উপত্যকা (Death Valley) উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে নিম্নতম স্থলভাগ। উপত্যকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 90 মিটার নীচে অবস্থিত।
8. আগ্নেয়গিরি – ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা’-র অন্তর্গত এই পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরিগুলি হল – ওরিজাবা পোপোক্যাটিপেট্ল, কোলিমা প্রভৃতি।
9. গিজার – পশ্চিমের এই পার্বত্য অঞ্চলে ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে ওল্ড ফেথফুল গিজার আছে। গিজারটি প্রায় 60 মিনিট অন্তর 60 মিটার ওপরে ফোয়ারার মতো গরম জল উৎক্ষেপণ করে।

উত্তর আমেরিকার মধ্যভাগের সমভূমি অঞ্চলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
উত্তর আমেরিকার মধ্যভাগের বিস্তীর্ণ সমভূমি –
- অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগের এই সুবিস্তৃত সমভূমিটি উত্তরে উত্তর মহাসাগর থেকে দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগর এবং পূর্বের উচ্চভূমি থেকে পশ্চিমে পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থান করছে। সেজন্য এই সমভূমি বৃহৎ সমভূমি বা Great Plain নামে পরিচিত।
- উৎপত্তি – মূলত মিসিসিপি-মিসৌরি, ম্যাকেঞ্জি নদীর বিপুল পলি সঞ্চয়ের ফলে এই উর্বর সমভূমি অঞ্চলটির সৃষ্টি হয়েছে।
- ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য – সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি সমভূমি হলেও, এর ভূপ্রকৃতি ঢেউ খেলানো, মাঝে মাঝে উঁচু পাহাড় বা টিলা, অবনমিত ভূমি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এই সমভূমির উত্তরভাগে হাডসন উপসাগরকে বেষ্টন করে কানাডিয়ান শিল্ড অবস্থান করছে। এটি দীর্ঘদিন হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং কিছু কিছু স্থান অবনমিত হয়ে হ্রদে পরিণত হয়েছে। যেমন – উইনিপেগ, গ্রেট বিয়ার, আথাবাস্কা, গ্রেট স্লেভ প্রভৃতি হ্রদ।
- শ্রেণিবিভাগ – মধ্যভাগের সমভূমিটির স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও উচ্চতার তারতম্য অনুসারে এই বিস্তৃত অঞ্চলটিকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –
- সেন্ট লরেন্স নদী অববাহিকার সমভূমি – পূর্বের উচ্চভূমি ও কানাডিয়ান শিল্ডের মধ্যবর্তী অংশে এই সমভূমি গড়ে উঠেছে।
- হ্রদ অঞ্চলের সমভূমি – উত্তর-পূর্বাংশে মহাদেশীয় হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট ‘পঞ্চহ্রদ’ (Great lakes) অঞ্চলের সমভূমি। হ্রদগুলি হল – সুপিরিয়র, মিচিগান, হুরন, ইরি ও অন্টারিও।
- প্রেইরি সমভূমি অঞ্চল – এই সমভূমি রকি পর্বতমালার অনুবাত ঢালে অবস্থিত হওয়ায় এখানে বৃষ্টিপাত অপেক্ষাকৃত কম হয়। সেজন্য এখানে পৃথিবীবিখ্যাত নাতিশীতোষ্ণ ‘প্রেইরি তৃণভূমি অঞ্চল’ সৃষ্টি হয়েছে।
- মিসিসিপি-মিসৌরি অববাহিকার সমভূমি – সমভূমিটি পূর্বের উচ্চভূমি ও পশ্চিমের কর্ডিলেরার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় সমভূমিটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ক্রমশ ঢালু। দক্ষিণে মিসিসিপি-মিসৌরি নদীর মোহানায় পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবাহের দিক অনুসারে উত্তর আমেরিকার নদীগুলির শ্রেণিবিভাগ করো এবং প্রধান 5টি নদীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের নদীগুলিকে প্রবাহের দিক অনুসারে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়, যথা –
- পূর্ববাহিনী নদী – সেন্ট লরেন্স, হাডসন, জেমস, মোহক প্রভৃতি নদীগুলি পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে।
- দক্ষিণবাহিনী নদী – মিসিসিপি-মিসৌরি, রিওগ্রান্ডি, আলবামা প্রভৃতি নদীগুলি দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হয়েছে।
- পশ্চিমবাহিনী নদী – কলোরাডো, কলম্বিয়া, স্নেক, ফ্রেজার প্রভৃতি নদী পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়েছে।
- উত্তরবাহিনী নদী – ম্যাকেঞ্জি, নেলসন, চার্চিল, ইউকন প্রভৃতি নদী উত্তরে প্রবাহিত হয়ে সুমেরু মহাসাগর ও হাডসন উপসাগরে পতিত হয়েছে।
উত্তর আমেরিকার প্রধান পাঁচটি নদীর বর্ণনা –
- সেন্ট লরেন্স –
- উৎস – সুপিরিয়র হ্রদের পশ্চিমের সেন্ট লুই নদী। (অন্টারিও হ্রদ থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর সেন্ট লরেন্স নাম হয়েছে)।
- দৈর্ঘ্য – প্রায় 3,200 কিমি।
- মোহানা – আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট লরেন্স উপসাগর।
- উপনদী – সেন্ট মরিস এবং অটোয়া।
- বৈশিষ্ট্য – পঞ্চহ্রদকে এই নদী একত্রে যুক্ত করেছে। জলপথ পরিবহণে এই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নদীতেই বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।
- মিসিসিপি-মিসৌরি –
- উৎস – সুপিরিয়র হ্রদের পশ্চিমের শিল্প অঞ্চলের ইটাস্কা হ্রদ।
- দৈর্ঘ্য – মিসিসিপির দৈর্ঘ্য প্রায় 4,000 কিমি। তবে মিসৌরির সঙ্গে যুগ্মভাবে এর দৈর্ঘ্য প্রায় 6,420 কিমি (যুগ্মভাবে পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী)।
- মোহানা – মেক্সিকো উপসাগর।
- উপনদী – মিসৌরি, রেড, আরকানশাস, ওহিও প্রভৃতি।
- বৈশিষ্ট্য – উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম নদী। এই নদীর মোহানায় পাখির পায়ের ন্যায় বদ্বীপ গড়ে উঠেছে।
- কলোরাডো নদী –
- উৎস – রকি পার্বত্য অঞ্চলের গ্র্যান্ড লেক।
- দৈর্ঘ্য – প্রায় 2,300 কিমি।
- মোহানা – ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগর।
- উপনদী – গিলা, ফ্রেজার, ভার্জিন প্রভৃতি।
- বৈশিষ্ট্য – পৃথিবীবিখ্যাত গিরিখাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এই নদীতে অবস্থিত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচের উদ্দেশ্যে এই নদীতে অনেক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন – হুভার বাঁধ।
- ম্যাকেঞ্জি নদী –
- উৎস – আথাবাস্কা হ্রদ।
- দৈর্ঘ্য – প্রায় 4,200 কিমি।
- মোহানা – উত্তর সাগর।
- উপনদী – পিস, লি, লিয়ার্ড।
- বৈশিষ্ট্য – গ্রীষ্মকালে নদী নৌপরিবহণযোগ্য হলেও শীতকালে জল জমে যাওয়ায় নৌপরিবহণ সম্ভব হয় না।
- কলম্বিয়া নদী –
- উৎস – সেলকার্ক পর্বত।
- দৈর্ঘ্য – 1,954 কিমি।
- মোহানা – প্রশান্ত মহাসাগর।
- উপনদী – স্নেক, স্পোকেন প্রভৃতি।
- বৈশিষ্ট্য – বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীতে অনেক বাঁধ নির্মিত হয়েছে।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের জলবায়ুর বৈচিত্র্য বা বিভিন্নতার কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের জলবায়ু অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। জলবায়ুর এই বিভিন্নতার কারণগুলি হল –
- অক্ষাংশগত অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশটি 7° উত্তর অক্ষাংশ থেকে 84° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে বিস্তৃত হওয়ায় মহাদেশের উত্তর প্রান্তে হিমশীতল জলবায়ু, মধ্যভাগে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, দক্ষিণাংশে অতি উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু দেখা যায়।
- পর্বতের অবস্থান বা ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য – এই মহাদেশটির পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে উচ্চভূমি ও পার্বত্যভূমি উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হওয়ায় উত্তর মেরু অঞ্চলের হিমশীতল বায়ু বাধা না পেয়ে দক্ষিণ দিকে অনেক দূরে চলে আসে। ফলে, মহাদেশের অধিকাংশ স্থানের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়। আবার, দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু রকি পর্বতের পশ্চিমদিকে বাধা পেয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পূর্বদিকে স্বল্প বৃষ্টিপাতের জন্য তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে। আবার, পর্বতের উচ্চতা, মালভূমি ও ক্ষয়জাত পর্বতের অবস্থান ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে জলবায়ুর বৈচিত্র্য ঘটে থাকে।
- সমুদ্রস্রোত – উত্তর আমেরিকার উভয় উপকূলভাগ (পূর্ব ও পশ্চিম) দিয়ে উষ্ণ ও শীতল সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। যেমন – দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত, উত্তর-পশ্চিম উপকূলে উষ্ণ আলাস্কা স্রোত, উত্তর-পূর্ব উপকূলে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে শীতল ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত প্রবাহিত হয়।
- বায়ুচাপ বলয় – বিশালাকৃতির উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন অংশে নানাপ্রকার বায়ুচাপ বলয় অবস্থান করছে, যা জলবায়ুকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।
- আকৃতি ও সমুদ্র থেকে দূরত্ব – উত্তর আমেরিকার আকৃতি অনেকটা উলটানো ত্রিভুজের মতো, সেজন্য উত্তরাংশ বেশি চওড়া হওয়ায় মধ্যভাগের অঞ্চলগুলি সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান করছে, ফলে এখানকার জলবায়ু চরমভাবাপন্ন বা মহাদেশীয় প্রকৃতির, অন্যদিকে মহাদেশের দক্ষিণাংশ অনেকটা সংকীর্ণ হওয়ায় কোনো স্থান সমুদ্র থেকে অধিক দূরে নয়, সেজন্য উপকূলভাগের জলবায়ু সমভাবাপন্ন।
- বায়ুপ্রবাহ – উত্তর আমেরিকার মধ্যভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়। আবার, দক্ষিণ প্রান্তে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়, ফলে দক্ষিণাংশে মধ্যভাগ অপেক্ষা অধিক বৃষ্টিপাত হয়। বসন্তকালের প্রথমদিকে রকি পর্বতের পূর্ব ঢালে চিনুক (তুষার ভক্ষক) নামক এক উষ্ণ স্থানীয় বায়ু প্রবাহিত হয়। যতই এই বায়ু পূর্বদিকে এগিয়ে যায়, ততই জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়, ফলে বৃষ্টিপাত কম হয়। এই কারণে মধ্যভাগে বৃক্ষের পরিবর্তে ঘাস, গুল্ম ও ঝোপঝাড় জাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়। এখানকার নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি ‘প্রেইরি’ নামে পরিচিত।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের জলবায়ু অঞ্চলগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্থানের উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, পর্বতের অবস্থান, সমুদ্র থেকে দূরত্ব প্রভৃতির ভিত্তিতে মহাদেশটিকে মোট দশটি জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা যায়। এগুলি হল –
- তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চল –
- অবস্থান – উত্তর আমেরিকার সমগ্র উত্তরাংশে গ্রিনল্যান্ড এবং পশ্চিমে আলাস্কা থেকে ল্যাব্রাডর পর্যন্ত এই জলবায়ু লক্ষ করা যায়।
- বৈশিষ্ট্য – তুন্দ্রা জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রচণ্ড শুষ্ক ও হিমশীতল দীর্ঘস্থায়ী শীতকাল (8-9 মাস)। অন্যদিকে, গ্রীষ্মকাল স্বল্পস্থায়ী (2-3 মাস)।
- উষ্ণতা – শীতকালীন গড় উষ্ণতা -35°C থেকে -45°C থাকে এবং গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা 10°C থাকে।
- বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত – তুন্দ্রা অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র 25-30 সেমি। শীতকালে তুষারপাত এবং তুষারঝড় (ব্লিজার্ড, পারগা) হয়।
- তৈগা জলবায়ু –
- অবস্থান – তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চলের দক্ষিণে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে নিউ ফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
- বৈশিষ্ট্য – শীতকাল (6-7 মাস) দীর্ঘস্থায়ী ও অতি শীতল এবং গ্রীষ্মকাল স্বল্পস্থায়ী (4-5 মাস) ও নাতি উষ্ণ।
- উষ্ণতা – শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে থাকে ও গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা 15°C থাকে।
- বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত – গ্রীষ্মকালের শুরুতে 30-50 সেমি বৃষ্টিপাত হয় ও শীতকালে প্রবল তুষারপাত হয়।
- লরেন্সীয় জলবায়ু –
- অবস্থান – তৈগা জলবায়ু অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে হ্রদ অঞ্চল থেকে শুরু করে সমগ্র পূর্বে উচ্চভূমি অঞ্চল এবং মিসিসিপি-মিসৌরি সমভূমি ও পূর্ব উপকূলভাগে এই জলবায়ু দেখা যায়।
- বৈশিষ্ট্য – সারাবছর বৃষ্টি হলেও গ্রীষ্মকালে অধিক বৃষ্টি হয়। আটলান্টিকের শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে উপকূলভাগ বেশি শীতল হয়।
- উষ্ণতা – সামগ্রিকভাবে গ্রীষ্মকাল মৃদু (17°C-25°C), শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে থাকে ও ব্যাপক ঠান্ডা পড়ে।
- বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত – দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে প্রায় সারাবছর বৃষ্টি (50-100 সেমি) হয়।
- প্রেইরি জলবায়ু বা শীতল নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় জলবায়ু –
- অবস্থান – মহাদেশের প্রায় মধ্যভাগে রকি পার্বত্য অঞ্চল ও হ্রদ অঞ্চলের মধ্যাংশ এই জলবায়ুর অন্তর্গত।
- বৈশিষ্ট্য – এখানকার জলবায়ু মহাদেশীয় প্রকৃতির বা চরমভাবাপন্ন প্রকৃতির।
- উষ্ণতা – গ্রীষ্মকালে গড়ে 25°C-30°C এবং শীতকালে হিমাঙ্কের নীচে (-10°C) উষ্ণতা থাকে।
- বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত – গ্রীষ্মকালের শুরুতে অধিক বৃষ্টি হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 50 সেমি। শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তে তুষারপাত হয়।
- আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু –
- অবস্থান – সমগ্র মধ্য আমেরিকার দেশসমূহ (পানামা, কোস্টারিকা, হন্ডুরাস প্রভৃতি), ফ্লোরিডার দক্ষিণাংশ ও পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জসমূহ।
- বৈশিষ্ট্য – এই জলবায়ু নিরক্ষীয় জলবায়ুর মতো উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির। এই অঞ্চলে মাঝে মাঝে প্রবল ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত হ্যারিকেন-এর (ক্যাটরিনা, রিটা প্রভৃতি) আবির্ভাব হয়।
- উষ্ণতা – এখানকার গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা প্রায় 23°C এবং শীতকালীন উষ্ণতা প্রায় 10°C হয়।
- বৃষ্টিপাত – বছরের অধিকাংশ সময় পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 150-200 সেমি।
- ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু –
- অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চল।
- বৈশিষ্ট্য – সারাবছর রোদ ঝলমলে সমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়। গ্রীষ্মকাল শুষ্ক ও শীতকাল আর্দ্র।
- উষ্ণতা – গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা 25°C ও শীতকালীন গড় উষ্ণতা 10°C থাকে।
- বৃষ্টিপাত – এই অঞ্চলে শীতকালে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে 50-75 সেমি বৃষ্টিপাত হয়।
- উষ্ণ মরু জলবায়ু –
- অবস্থান – পশ্চিমে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পূর্বে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃত সোনেরান মরুভূমি অঞ্চলে এই জলবায়ু দেখা যায়।
- বৈশিষ্ট্য – গ্রীষ্মকাল দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত উষ্ণ এবং শীতকাল মৃদুভাবাপন্ন। এখানে গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের উষ্ণতার পার্থক্য অনেক বেশি। এই জলবায়ু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকার সবচেয়ে বেশি হয়।
- উষ্ণতা – গ্রীষ্মকালে গড়ে 30°C-35°C এবং শীতকালে গড়ে 10°C-15°C উষ্ণতা থাকে।
- বৃষ্টিপাত – বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 25 সেমির কম।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের স্বাভাবিক উদ্ভিদ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর মতোই স্বাভাবিক উদ্ভিদেরও বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। প্রধানত ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকা, ভূমিঢাল প্রভৃতি প্রাকৃতিক পরিবেশের তারতম্যের জন্য মহাদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক উদ্ভিদেরও তারতম্য দেখা যায়। সামগ্রিকভাবে উত্তর আমেরিকার স্বাভাবিক উদ্ভিদকে প্রধানত সাতটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল –
তুন্দ্রা উদ্ভিদ –
- অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তরাংশে 65°-75° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যবর্তী (পূর্বে ল্যাব্রাডর থেকে পশ্চিমে আলাস্কা) কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও আলাস্কার সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানগুলিতে তুন্দ্রা উদ্ভিদ জন্মায়।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – অলডার, জুনিপার, বামনাকার বার্চ, উইলো, অ্যাসপেন, ভ্যালেরিয়ান প্রভৃতি ঝোপ তুন্দ্রা; তৃণজাতীয় মস, লাইকেন, সেজ, থাইম প্রভৃতি তৃণ তুন্দ্রা এবং প্রায় 370 রকম বিভিন্ন প্রজাতির বাহারি ফুল জন্মায়।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – ‘তুন্দ্রা’ কথার অর্থ শৈবাল বা শ্যাওলা। অতি তীব্র ঠান্ডার জন্য তুন্দ্রা অঞ্চলে বৃক্ষের পরিবর্তে শৈবাল ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ প্রচুর জন্মায়।
সরলবর্গীয় বৃক্ষের বনভূমি –
- অবস্থান – তুন্দ্রা অঞ্চলের দক্ষিণে অর্থাৎ, পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর (নিউ ফাউন্ডল্যান্ড) থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল এবং দক্ষিণে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সরলবর্গীয় বনভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – এই অরণ্যভূমির প্রধান বৃক্ষগুলি হল – পাইন, ফার, স্প্রুস, লার্চ, উইলো, অ্যাসপেন, অলডার, হেমলক, ডগলাস প্রভৃতি।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – এই সরলবর্গীয় বনভূমি তৈগা অরণ্যভূমি (‘তৈগা’ কথার অর্থ ‘পাইন বন’) নামে পরিচিত। বৃক্ষগুলি শঙ্কু আকৃতির, শাখাপ্রশাখা কম, সরল কাণ্ড সোজা ওপরে উঠে যায়। গাছের কাঠ নরম, হালকা ও মজবুত। এই অরণ্য নরম কাঠের অরণ্য নামেও পরিচিত।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বনভূমি –
- অবস্থান – এই বনভূমি উত্তরে সানফ্রান্সিসকো থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – বৃক্ষগুলির মধ্যে ওক, সাইপ্রাস, ম্যাডরোনা, জলপাই, লরেল, সিডার, রেড উড প্রভৃতি অন্যতম। ঝোপঝাড় জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে চ্যাপারেল প্রধান।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – এখানে একপ্রকার চিরসবুজ ও ঝোপঝাড় জাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়, যা গ্রীষ্মের প্রখর তাপ ও শুষ্ক আবহাওয়াতেও বেঁচে থাকে। বৃক্ষগুলি তৈলাক্ত পত্রবিশিষ্ট, দীর্ঘমূলযুক্ত এবং খর্বাকৃতির হয়ে থাকে।
আর্দ্র ক্রান্তীয় অরণ্য –
- অবস্থান – ফ্লোরিডার দক্ষিণাংশ, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং মধ্য আমেরিকার কিছু দেশে এই প্রকার অরণ্য দেখা যায়।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – আর্দ্র ক্রান্তীয় অরণ্যের বৃক্ষগুলির মধ্যে মেহগনি, পাম, আয়রনউড, রবার, কোকো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের কারণে চিরসবুজ অরণ্যের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ অত্যন্ত ঘনভাবে জন্মায় বলে গাছের পাতাগুলি একত্রে মিশে চাঁদোয়ার সৃষ্টি করে। এই গাছগুলির কাঠ অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির।
মধ্যভাগের তৃণভূমি –
- অবস্থান – পশ্চিমে রকি পার্বত্যভূমি থেকে পূর্বে পঞ্চহ্রদের মধ্যবর্তী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমভূমিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম, সেজন্য এখানে বনভূমির পরিবর্তে তৃণভূমির প্রসার ঘটেছে।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – তৃণই (হে, ক্লোভার, আলফালফা) এখানকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ। এই তৃণভূমি নাতিশীতোষ্ণ প্রেইরি তৃণভূমি নামে পৃথিবীবিখ্যাত।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – প্রেইরি অঞ্চলের পূর্বদিকে 50-80 সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে দীর্ঘাকৃতি তৃণ দেখা যায়। পশ্চিমদিকে 30-50 সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্রাকৃতির তৃণ দেখা যায়।
মরুভূমি ও মরুপ্রায় অঞ্চলের উদ্ভিদ –
- অবস্থান – উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিমপ্রান্তে পূর্বে মেক্সিকো থেকে পশ্চিমে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত অঞ্চলে এই উষ্ণ মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে। এর নাম সোনোরান।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – এখানে অ্যাকাসিয়া, বাবলা, ক্যাকটাস, জশুয়া প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার কাঁটাজাতীয় উদ্ভিদ ও ঝোপঝাড় জন্মায়।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – মরুভূমি অঞ্চলে পর্যাপ্ত জলের অভাবের জন্য কাঁটাজাতীয় ঝোপঝাড় ও ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়। অধিকাংশ উদ্ভিদের পাতা ও বাকল খুব পুরু হয়, কাণ্ড ও পাতার ওপর মোমের আবরণ থাকে। শিকড়গুলি ভূগর্ভের অনেক নীচে প্রবেশ করে, পাতাগুলি কাঁটায় পরিণত হয় ইত্যাদি।
মিশ্র বনভূমি –
- অবস্থান – তৈগা জলবায়ু অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে হ্রদ অঞ্চল থেকে শুরু করে সমগ্র পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চল এবং মিসিসিপি-মিসৌরির সমভূমি ও পূর্ব উপকূলভাগে এই জলবায়ু দেখা যায়।
- স্বাভাবিক উদ্ভিদসমূহ – এই বনভূমিতে চিরহরিৎ বৃক্ষ (আবলুশ, মেহগনি, রবার, পাম, ব্রাজিল নাট, রোজউড), জলাভূমির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ (সাইপ্রাস, নলখাগড়া, লাল আঠার গাছ) এবং নাতিশীতোষ্ণ পর্ণমোচী বৃক্ষ (ওক, এলম, বিচ, বার্চ, ওয়ালনাট) দেখা যায়। তাই একে মিশ্র অরণ্য (Mixed Forest) বলা হয়।
- উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – এই অঞ্চলের উদ্ভিদগুলি অত্যন্ত ঘন সন্নিবিষ্ট হয়, পাতাগুলি বৃহৎ। শরৎকালে পাতাগুলি হলদে কমলা হয়ে ঝরে পড়ে, তাই এখানে শরৎকালকে Fall বলে।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব আলোচনা করো।
পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মহাদেশ উত্তর আমেরিকার (ক্ষেত্রমান 2.47 কোটি বর্গকিমি) ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন –
- বিচ্ছিন্ন মহাদেশ – পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর উত্তর আমেরিকাকে অন্যান্য মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
- কেন্দ্রীয় অবস্থান – ত্রিভুজাকৃতি মহাদেশটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, অতি উন্নত সামুদ্রিক ও বিমানপথের সাহায্যে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।
- ইউরোপের প্রভাব – ইউরোপের অত্যাধুনিক সভ্যতার প্রভাবে মহাদেশটির দ্রুত উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটেছে।
- ভূপ্রকৃতি – পর্বত, মালভূমি ও সমভূমি মহাদেশটির অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে ও জলবায়ুতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
- জলবায়ু – উত্তর আমেরিকার উত্তরে হিমশীতল তুন্দ্রা জলবায়ু, মধ্যভাগে নাতিশীতোষ্ণ, দক্ষিণে ক্রান্তীয় জলবায়ু বিরাজমান।
- উপকূলরেখা – মহাদেশটির ভগ্ন উপকূলে স্বাভাবিক বন্দর ও পোতাশ্রয় গড়ে উঠেছে।
- নদনদী ও হ্রদ – পৃথিবীবিখ্যাত নদনদী ও হ্রদগুলি পরিবহণ ও জল সরবরাহে (কৃষি ও শিল্প) সাহায্য করে।
- খনিজ – খনিজ সম্পদ উত্তোলনে উত্তর আমেরিকা বিশ্বে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে।
- কৃষি – অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ ও বৈজ্ঞানিক কৃষিপদ্ধতি প্রয়োগের ফলে এখানে অত্যধিক ফসল উৎপন্ন হয়। প্রচুর গম উৎপাদনের কারণে প্রেইরি অঞ্চলকে ‘পৃথিবীর রুটির ঝুড়ি’ বলে।
- শিল্প – খনিজ, কৃষিজ, বনজ, জলজ (মৎস্য ও সামুদ্রিক প্রাণী) সম্পদ এবং প্রযুক্তিবিদ্যার কল্যাণে এটি শিল্পে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে।
- বনজ সম্পদ – এখানে পাইন, ফার, স্প্রুস, ওক, ম্যাপল, এলম, অ্যাশ প্রভৃতি উদ্ভিদে সমৃদ্ধ বনভূমি দেখা যায়। এসব বনভূমি থেকে বিভিন্ন প্রকার বনজ সম্পদ আহরণ করা হয়-যা থেকে নানা ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে।
- পশুপালন – প্রেইরি তৃণভূমি পশুপালনে সমৃদ্ধ। এখানে প্রচুর পরিমাণে পশুজাত দ্রব্য (মাংস, দুধ, চামড়া, পশম) উৎপাদিত হয়।
- মৎস্যশিকার – মহাদেশটির পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ ধরা হয়।
- সংস্কৃতি – শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমুদ্র-মহাকাশ গবেষণা, সামরিক শক্তির অগ্রগতি একে সমৃদ্ধতম মহাদেশে পরিণত করেছে।
আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের নবম অধ্যায় ‘উত্তর আমেরিকা’ এর উপবিভাগ ‘উত্তর আমেরিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই প্রশ্নগুলি প্রায়ই পরীক্ষায় দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment